১৫
মানা ক্যাম্পে তাঁবু আছে। তবে একটা বড় পাঁচিল মাঝামাঝি। ওই পাঁচিল কীসের? ওই পাঁচিলের ওপারে যারা থাকে তাদের এখানেই জমি মিলেছে। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের বাড়ি তৈরি করেছে। দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের নিয়ম হল, জমি দেওয়া হবে প্রত্যেককে। বাড়ি তৈরির উপকরণও দেওয়া হচ্ছে। দেওয়া হবে গোরু, আর চাষের জমিও। বাড়ি তৈরির উপকরণ মানে হল বড় বড় শাল খুঁটি, টিন। মাটির ব্যবস্থা করতে হবে নিজেদের। এভাবেই এই মানুষগুলো এখানে নিজের বাড়ি পেয়েছে।
তবে এই দফায় যারা এল তাদের এখানে আর বসত করতে দেওয়া হবে না। নিয়ে যাওয়া হবে অন্য কোথাও। রায়পুর থেকে বিশাখাপত্তনম যাওয়ার টানা হাইওয়ে। দুধারে পাহাড়, জঙ্গল, নদী। হাইওয়ে থেকে বাঁদিকে ডানদিকে একটা করে রাস্তা ঢুকেছে। ভাঙাচোরা রাস্তা। তাও একটা দুটো বাস যায়। পরপর ধমতেরি, কাংকের, কোন্ডগাঁও। কোন্ডগাঁও থেকে সোজা এগিয়ে বাঁদিকে আবার একটা রাস্তা, নারায়ণপুরের দিকে। বস্তার গ্রাম ছাড়ালে জগদলপুর। তবে হাইওয়ে গেছে আরও সোজা। এই রাস্তায় শুধু বাস লরি চলে। এখন রেললাইন পাতা হচ্ছে।
প্রভাসদের থাকতে হবে মানা ক্যাম্পের শিবিরে। সেখানে কিছুদিন, তারপর আবার পাঠানো হবে অন্য কোথাও।
সনাতন পাল আর সুদাম মিস্ত্রি রেজিস্ট্রেশন টেবিলে। আজ প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার এসেছে। সনাতন চিৎকার করে বলল, যে কাগজ বর্ডারে দিয়েছিল সেটা হাতে বের করে রাখো। মেয়েদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখো না। সোজা যে বড় তাঁবু দেখছে ওখানে চলে যেতে বলো। খাবার জল আর প্যাকেট দেবে।
প্রভাসের মুখ শক্ত। সন্ধ্যার চোখ থেকে জল নামছে। পাশে এসে দাঁড়ায় ফকিরচাঁদ। বলে, দিদিমণি কাইন্দো না। আমি খোঁজ নিছি। যেহেনে ছিলা এই জায়গা তার থিইক্যা আর খারাপ কি হইব! হ্যাঁ, এই কথা ঠিক যে বাংলায় থাকা হল না। তবে ইশকুল বাড়ি থিইক্যা তোমাগো তাড়াইতই। আর এহেনে যদি পাকাপাকি ঘর পাওয়া যায়, সে মন্দ কী। শোনলাম ঘর ট্যাকা সবই দিবে। জঙ্গলে না হইলেই হইল।
ফকিরচাঁদ এগিয়ে গেল। সে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না যে, এখানে থেকে যাবে, নাকি ফিরে যাবে কুপার্সে? সে একা মানুষ। একটা মাথা গোঁজার জায়গা হলেই হল। এই পরিবারটিকে তার বড় ভালো লেগেছে।
কিন্তু এখানে সে থাকবে কী করে? তার তো কাজ ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়ানো। ঢাকা মেল, বরিশাল এক্সপ্রেস, চিটাগাং মেল যেখানে যেখানে আসে, সেইসব জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। যদি সুফলা আসে!
সুফলার সঙ্গে ফকিরচাঁদের দেখা হয়েছিল ক্যাম্পে। সুফলার মা বাবা ছিল না। মামার কাছেই মানুষ। সেই মামা মরে গেল দাঙ্গায়। সুফলা পালাল গ্রামের মানুষদের সঙ্গে। কিন্তু সেই যে হামলা হয়েছিল ক্যাম্পে, থানার মধ্যে যে দুটো মেয়েকে ন্যাংটো করে তাদের যৌনাঙ্গে পুলিশ গরম সিদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে আনন্দে হা হা করে হাসছিল, সে একটা ভুল করেছিল।
জামাকাপড় সব খুলে নিলেও সুফলার হাতের দুটো চুড়ি সে খুলে নেয়নি। সেই চুড়িতে ছিল সেফটি পিন। প্রথমে মাটিতে ছটফট করলেও যখন সুফলাকে ওই সেই দারোগা থানার ভিতরের ঘরে নিয়ে যায়, তখন সুফলা তার চোখে ঢুকিয়ে দেয় সেফটি পিন।
পুলিশটা কল্পনাই করেনি এরকম প্রত্যাঘাত। চোখ চেপে পাগলের মতো চিৎকার করেছিল। মুহূর্তে বেরিয়ে এসেছিল সুফলা। গোটা শরীরে কাপড় নেই, হাতে সেফটিপিন!
ফকিরচাঁদের দেখে মনে হয়েছিল, এ সুফলা নয়, কালী স্বয়ং। হাতে খড়্গের জায়গায় সেফটিপিন। তাদের অফিসারের চিৎকার শুনে ভিতরে যাওয়ার চেষ্টা করে দুই হাবিলদার। কিন্তু ততক্ষণে বন্দিনীরা পেয়ে গিয়েছে নতুন অস্ত্রের সন্ধান।
সকলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনজন হাবিলদারের চোখে সেফটি পিন ঢোকায়। তারপর সকলেই ছুটে পালাতে শুরু করে। ফকিরচাঁদের বাবা-মা ছিল নেত্রকোণায়। সেদিন ফকিরচাঁদ সেই থানায় গিয়েছিল। সেই মুহূর্তে ফকিরচাঁদ দুম করে হাত ধরেছিল সুফলার। বলেছিল, পালাও।
সুফলা পালিয়েছিল ফকিরের হাত ধরেই। কতক্ষণ ওভাবে তারা দৌড়েছে, জানে না। অন্ধকার বাঁশবাগানে গিয়ে তুলে আনা শাড়ি পরেছিল সুফলা। দু-দিন পর দুজনে এসে পৌঁছয় ঢাকা। ভেবেছিল ঢাকায় এসে সুরাহা হবে। হল না।
ভারতের হাইকমিশনে হামলা করেছে দাঙ্গাবাজেরা। চারদিকে ঘেরা। বাইরে যে হিন্দু পরিবারেরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য গেছিল, তাদের ধরে ধরে মারধর করা হচ্ছে। টেনে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মেয়েদের!
সুফলাকে নিয়ে কোথায় যাবে ফকিরচাঁদ? সঙ্গে মেয়ে দেখলে সবার আগে তাকে নিয়ে টানাটানি করবে, ফকিরকে মরতে হবে। ফকির বলেছিল, আমরা ইন্ডিয়া যামু। সুফলা মাথা নেড়ে সায় দেয়।
তেজগাঁও স্টেশনে একের পর এক ট্রেন এসে থামছে। আর আছড়ে পড়ছে ঘরছাড়ার দল।
আতঙ্ক ফকিরকে সুফলা বলেছিল, আমারে ছাইড়্যা দিও না তুমি! কাউর হাতে তুইল্যা দিও না!
ফকির বলে, কী কও তুমি? ঢাকায় না, আমাগো ব্যানাপোল যাইতে হইব। একবার গিছিলাম।
কিন্তু যাবে কীভাবে? চারদিকে সব বন্ধ! ঢাকা অবরুদ্ধ। খাবে কী? রোকেয়া বিদ্যালয় কাছেই। সেখানেই ক্যাম্প। আশ্রয় মিলল। কিন্তু সে ক্যাম্প শুধু মেয়েদের জন্য। তাও আবার যারা অনাথ। তাই দুজন পুলিশ, মোতায়েন।
ফকিরচাঁদ ভাবল, এটাই ভালো ব্যবস্থা। এখানে রাখা যাক সুফলাকে। সে কাছেই কোথাও থেকে যাবে। এখানে সুফলাকে অন্তত খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। সুফলা বলেছিল, না—না। আমার মনে হয় তুমি আমারে রাইখ্যা গেলে—আর খুঁইজ্যা পামু না।
ফকির হাসে, তা আবার হয় নাকি। আমি তো কাছেই আছি।
ফকির দু-দিন পর আবার ইন্ডিয়ার হাইকমিশনে যায়। ভিতরে ঢুকতে পারে। কিন্তু আর বেরোতে পারেনি। কারণ রাতে আবার সেখানে হামলা হল। যতজন ছিল, সবাইকে বাসে চাপিয়ে সোজা যশোর নিয়ে আনা হয়। ফকির রাজি হচ্ছিল না। সে বলেছিল, আমি একজনরে নিয়া আসতেছি।
ছুটে গেছিল ফকির। কিন্তু শুনল রোকেয়া বিদ্যালয় রিফিউজি ক্যাম্প থেকে প্রায় শখানেক মেয়ে-বউকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইন্ডিয়ায়। সেই দলেই নাকি আছে সুফলা। পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল ফকির। কিন্তু তার হাতে সময় ছিল না। ইন্ডিয়া কমিশন যে বাসের ব্যবস্থা করেছে তারাও তো ছেড়ে যাবে। তাদের সঙ্গে গেলে কোনও বর্ডারে নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে সুফলাকে।
পঞ্চাশ সালের সেপ্টেম্বর। এপারে চলে এল ফকিরচাঁদ। আজ ১৯৬৫। আজও সুফলাকে খুঁজে বেড়ায় সে। এই দণ্ডকারণ্যে থেকে গেলে হবে না ফকিরের। তার কাজ একটাই। সুফলাকে খুঁজে বের করা!
চারদিন পর প্রভাস, সুধাময়ী, ফকিরচাঁদ, সন্ধ্যা, বাবুল তপু আরও চল্লিশ পরিবারের সঙ্গে চলল, দুটো লরিতে। বড় শুকনো হাওয়া। মাঝেমধ্যেই বড় বড় গাছের ছায়া এসে ঢেকে দিচ্ছে রোদকে। যতদূর চোখ যায়, দু-দিকে লালের আগুন লেগেছে। পলাশ শিমুল আর অশোক। মাটিও কেমন লাল লাল। কত ঘণ্টা ধরে চলছে কে জানে। দুবার থামা হল। খাবার, জল সবই দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে চলেছে দুজন বাঙালি সরকারি কর্মী। দণ্ডকারণ্যের প্রজেক্টে বাঙালিদের পাঠানো হয়েছে দিল্লি, কলকাতা, বিহার থেকে।
লরি এসে দাঁড়িয়েছে একটি নদীর পাশে। নদীর নাম ইন্দ্রাবতী। নদী সংলগ্ন গ্রাম। প্লট নম্বর থার্টি এইট। মুখে মুখে নাম হয়েছে সুন্দরপুর। প্রভাসদের বলা হল, এই হল তোমাদের গ্রাম। গ্রাম! এই নাকি গ্রাম? একপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ইন্দ্রাবতী। যদিও সেই ইন্দ্রাবতীর দুই তীরে ঘন সবুজ জঙ্গল। একটা রাস্তা সেইদিকে গিয়েছে। আর যেখানে এসে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হল দূরে দূরে জমিসহ বাড়ি।
কিছু কিছু বাড়ি রয়েছে। আবার অনেক জায়গায় জমি ফাঁকা পড়ে আছে। ফাঁকা হলেও সেগুলি কাউকে না কাউকে বরাদ্দ করা হবে। পাঁচ অথবা দশ কাঠা জমি। পরিবারের আকার ও সংখ্যা দেখে সেটা স্থির হবে। তার সঙ্গে আরও পাঁচ কাঠা জমি দেবে। সে জমিতে বাগান করা যায়।
মূল কথা হল, এখন থেকে নিজেদের খাবার নিজেদেরই ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি ডোল বন্ধ হয়ে যাবে। ওয়ার্ক সাইট ক্যাম্প থেকে আনা হচ্ছে উদ্বাস্তুদের দণ্ডকারণ্য প্রকল্পে। তবে আর ক্যাম্প নয়। ক্যাম্প কলোনির বাসিন্দা বলা যাবে না। এখানে নিজের সবকিছু নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হবে। তারপর সকলেই ইন্ডিয়ার নাগরিক। দেওয়া হবে রেশন কার্ড। সবথেকে দামি সেই গেদে স্টেশনে পাওয়া কাগজটি। সেটিই চাবিকাঠি।
প্রভাস আর ফকিরচাঁদ এগিয়ে গেল সেই কর্মীদের সঙ্গে। ঢোকার মুখে পরপর তাঁবু করা হয়েছে।
কেয়ারটেকারবাবুর নাম নলিনাক্ষ। সাদা কালো গোঁফ। ঢেউ খেলানো চুলের বাহার। কালো রং করা চুল। বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে। সারাক্ষণ মুখের দুটো দাঁত বের হয়ে আছে। নলিনাক্ষ যেন সর্বদা হাসছে।
ফকিরচাঁদ আর প্রভাস সামনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ায়। আবার এক দফা জিজ্ঞাসাবাদ। নলিনাক্ষ বলল, একজন লোক দিচ্ছি। তার সঙ্গে তোমরা যাও। একসঙ্গে পাঁচটা পরিবারের পুরুষ মানুষ। গিয়ে নিজের জমি পছন্দ করে আসো।
প্রভাস আর ফকিরচাঁদ একটু ঘাবড়ে গেল। বলে কী? ভিক্ষার চাল, তার আবার কাড়া-আকাড়া?
নলিনাক্ষ বুঝতে পারে। সে বলে, তোমরা কিন্তু প্রায় লাস্ট পার্টি। সেই ’৫৪ থেকে দণ্ডকারণ্যে আসছে তোমাদের মতো ঘরহারা রিফিউজিরা। জগদলপুর, সাবিত্রী ক্যাম্প, মালখানগিরি, পাখানজোড়, কাংকের, পারোলকোট কত গ্রাম বসে গেল। দেশভাগের সাতেরো বছর হয়ে গেল। তবু এখনও মানুষের আসা বন্ধ হল না। কত আর জমি থাকবে! তোমাদের সঙ্গে কোপারাম যাবে। বাংলা তেমন বোঝে না। ও হল হালবা।
ফকিরচাঁদ বলল, হালবা মানে কী কেয়ারটেকারবাবু?
হালবা মানে এরা আদিবাসী জাতি। ভাষা হালবি। এখানে আর একটা আদিবাসী গ্রুপ আছে। গোন্দি। এদেরই তো সব বাস। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছ এখানে কি ফাঁকা জমি ছিল? জঙ্গল, শুধু জঙ্গল। পাহাড়, ইন্দ্রাবতী, মোদাং নদী, মুরাদং খাল আর ঘন জঙ্গল। মানুষ বলতে হালবা আর গোন্দ। আমরাই ওদের এলাকায় ঢুকে পড়ছি। এই গ্রাম, এই বসতি তৈরি হচ্ছে দেড় বছর ধরে। এখন যাদের বাড়ি দেখছ তারা সবাই ছিল ওয়ার্ক সাইটে।
প্রভাস বলল, ওয়ার্ক সাইট!
হ্যাঁ। ওয়ার্ক সাইটে সকলকে অনেকদিন ধরে রেখে কাজ শেখাতে হয়েছে। কীভাবে মাটি কোপাতে হয়, কীভাবে পাথর ভাঙতে হয়, কীভাবে চাষ করবে।
প্রভাস থমকে গেল। শুকনো গলায় বলল, কেয়ারটেকারবাবু, আমি যে চাষবাস জানি না।
নাম কী? নলিনাক্ষ ঘোষ জানতে চান।
প্রভাস মজুমদার।
নলিনাক্ষর চোখ বড় হয়, মজুমদার! তোমরা তো উঁচু জাত? তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে?
প্রভাস বলল আজ্ঞে, উঁচু-নিচু আর কেউ নেই। সবাই দাঙ্গার ভিকটিম। সবাই রিফিউজি। তবে কি জানেন কেয়ারটেকারবাবু, যদি চাষ করে খেতে হয়, তাহলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
তবে তো ভারি মুশকিল হল! নলিনাক্ষর ভুরু কুঁচকে গেল, প্রথম প্রথম তো তোমাকে এসব কাজ করতেই হবে। উপায় নেই। রোজগার হবে কীভাবে?
ফকিরচাঁদ বলল, কেয়ারটেকার সাহেব, ব্যবস্থাডা ঠিক কী? একটু বুঝায়ে দ্যান!
তোমাদের পিছনে তাকাও। এই লম্বা লাইন। তোমাদের এখন একে একে বোঝাতে গেলে এদের নাম আর রেজিস্ট্রেশন খাতায় তোলা হবে না। এখন যাও। আগে জমি দেখে এসো। শুধু জমি নয়, এলাকাটা দেখে তারপর জানিও এখানে থাকতে পারবে কিনা।
থাকা না থাকা কি আমাগো হাতে বাবু?
আমাকে বাবু বলবে না! আমি বাবু নই। ঠেকায় পড়ে চাকরি করি।
ফকিরচাঁদ বলে, আমাগো কাছে তো বাবু।
আমাগো আর যাওনের জায়গা কই।
নলিনাক্ষ বলে, আরে, নতুন নতুন সবই ওরকম মনে হয় যে দিশা পাচ্ছ না। তারপর একটু একটু করে বসে যাওয়ার পর ইচ্ছা হলে একদিন বাংলায় চলে যেও। তবে যদি থাকতে দেয়, আর যাই হোক এটা তো বাংলা না। অনেক দূর হিন্দির রাজ্য। আদিবাসীদের রাজ্য। মধ্যপ্রদেশ। সব তাদেরই দয়া। এই দণ্ডকারণ্য প্রজেক্ট এখানে আনায় এখানকার মানুষজন আর সরকার কি একটুও খুশি নাকি? রাগে জ্বলছে!
কোপা ডাকে, আও!
চারটে করে খুঁটি পোঁতা চারদিকে। তারপর আবার রাস্তা। আবার ওরকম খুঁটি। ওই খুঁটিগুলোই হল জমির সীমানা। প্রভাস আর ফকিরকে দেখায় কোপা। দেখ লো!
কোপা হিন্দি জানে। তবে প্রভাসের হিন্দির দৌড় কম।
ফকিরচাঁদ বলল, দ্যাখো কোনটা নিবা। আমারেও ফ্যামিলির মইধ্যে রাখো। তাইলে একটু বড় জমি পাইবা। ছয় জন।
প্রভাস বলে, বুঝতে পারছি না যে কোনটা কোন দিক।
ফকিরচাঁদ কয়েকমিনিট আকাশ আর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলে, জমি পূর্ব-দক্ষিণমুখী। এটাই নাও। পাশে খুঁটি নাই। তার মানে রাস্তা হইতে পারে। ওই জমি কাউরে দেবে না।
কোপাকে হাত দেখিয়ে প্রভাস বলে, এটাই!
কোপার পকেটে একটা পেন্সিল। সে প্রভাসের কাছে কেয়ারটেকারের দেওয়া কাগজ চায়। খুঁটির গায়ে দাগ মারে। গোন্দ আদিবাসীর কোপারাম তার মানে পড়াশোনা জানে?
পরদিন থেকে শুরু হল লড়াই। শালখুঁটি, করোগেটেড টিন, মাটি, জানালা দরজা জানালা সব হাতে বয়ে নিয়ে নিজেদের জমিতে আনা। তারপর সেগুলি বসানো। একজন ইঞ্জিনিয়ার আর এক অ্যাসিস্ট্যান্ট। প্রভাস কোনওদিন জানেই না কীভাবে ঘর বাঁধতে হয়। ফরিকচাঁদ জানে। সে এর আগে নিজেই কুপার্সে দোচালা বানিয়েছে। এখানে এই সব উপকরণ দেবে ডিকেপি। মানে দণ্ডকারণ্য প্রজেক্ট।
তবে খেটে খেটে পরিশ্রম করে নিজের ঘর নিজেদের বানাতে হবে। সাহায্য করবে ওই ইঞ্জিনিয়ারের অ্যাসিন্ট্যান্ট। তাঁবুতে রাতে থাকা হবে। এই যে ঘর বাঁধা হচ্ছে, মাটি কুপিয়ে আনা হচ্ছে এখানে এসব কাজের জন্য মজুরি পাওয়া যাবে। তবে এখন না। তাঁবুতে থাকা তো হল। খাবার কোথায়? কাছেই তিনটে দোকান। যারা অনেক আগেই এসেছে, তারা দোকান দিয়েছে। সেই দোকানে চাল, ডাল, তেল, চিনি, নুন, বাসনকোসন আছে। নিজেদের জমানো টাকায় কিনতে হবে।
কয়েকদিনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে গেল বাড়ি। রোজ একবার করে আসেন সুধাময়ী। তিনি বিস্মিত। এই কুশকে তিনি দেখেননি কোনওদিন। ধীর স্থির কুশ নারানগঞ্জের সেই মানুষই নয়। বদলে যাওয়া লোক। যখন সারাদিন খাটনির পর আসে তাঁবুতে, শরীর ভেঙে আসে বোঝাই যায়।
সুধাময়ী চমৎকৃত এই ফকিরচাঁদকে দেখেও। কুপার্সে এই লোকের একফালি জমিতে নিজের ঘর। তাও সে এসেছে এই জনমানবশূন্য জঙ্গলে। সুধাময়ীকে অল্প কয়েকদিনেই সে নিজের মায়ের মতো ভালোবেসে ফেলেছে। ছেলেটা এখানে কি থেকে যাবে? সুধাময়ী মনে প্রাণে চান, থাকুক। ছেলেটি স্বপ্ন দেখেছিল, একদিন সুধাময়ী এক পাহাড়ের কাছে থাকবে। ঘটনাটা রহস্যময়। অথচ সত্যিই তাই হল। বড় ভালো মানুষ। ফকির না থাকলে প্রভাস বন্ধুহীন হয়ে যাবে। বন্ধু রমাপদও চলে গেল।
সারাদিন ধরে এখানে বসে থাকে বাবু অমল। চোখের সামনে একটা বাড়ি উঠছে। এতদিন হয়ে গেল, বাবুর নিজের বাড়ি নেই। এই জায়গাটা বেশ লাগছে তার। চারদিকে অনেক বাড়ি। আবার হচ্ছেও কত নতুন বাড়ি। তারই মধ্যে রাস্তার পাশেই তাদের ঘর উঠছে। টিনের দুটো ঘর হবে। পিছনে সবজির বাগান করবে সন্ধ্যা।
সেইমতোই প্ল্যান করে দিয়েছে ইঞ্জিনিয়ারবাবু। বাবা আর ফকিরজেঠাকে কাজ করতে দেখে উৎসাহের অন্ত নেই বাবুর। সে বারংবার জানতে চায় সে কী করবে। কখনও ছুটে গিয়ে আলকাতরার টিন নিয়ে আসে, কখনও দরজা জানালার নাট বল্টুর বাক্সটা নিয়ে আসে।
ফকিরচাঁদ খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে প্রভাসরা ভাগ্যবান। কারণ, আগে এত তাড়াতাড়ি কাজ হয়নি। এখন ফান্ড আসছে অনেক। অবশেষে একটা বাড়ি হল। মাথার উপরে টিনের চাল যেদিন লাগানো হল, সেদিন আর আনন্দ ধরে না বাবু আর তপুর। ছোটাছুটি করে বেড়ালো।
দুটো ঘর। একটা রান্নার জায়গা ঘিরে দিয়েছে সামনের জমিতে। আর বাকিটা জমি। স্নানের জায়গা আর একটু দূরে। ক্যাম্প আর তাঁবুর জীবন শেষ হল তাহলে! সুধাময়ী ঠাকুর আর শ্রীমায়ের পদতলে সকাল থেকে জপ ধ্যান করলেন। তারপর ঢোকা হল নতুন ঘরে। পূর্ব পাকিস্তানের শীতলক্ষ্যা নদীর কাছের যুগীগঞ্জের পাঁচজন মানুষ পেল ইন্ডিয়ার আর এক প্রান্তে ইন্দ্রাবতী নদীর কাছে এক নতুন ঘর!
সুধাময়ী সে ঘরে ঢুকে সেই রাতে গীতবিতান খুলে পড়লেন,
‘পথ দেখাবার তরে যাব কাহার ঘরে
যেমনি আমি চলি, তোমার প্রদীপ চলে আগে।’
চোখ থেকে অনেকদিন পর জল পড়ে সুধাময়ীর। ফকিরচাঁদ আগেই বলে রেখেছে বারান্দায় ঘুমাবে। খোলা হাওয়া, জঙ্গল পাহাড় আর নদী থেকে আসা বাতাসে সে ঘুমোতে চায় বহুকাল পর।
ফকিরচাঁদ ভাবে, সুফলা এখন কী ভাবছে? তার আর সুফলার একটা নতুন ঘর কি হবে না? সকাল দুপুর পেরিয়ে বয়স এখন বিকেলের দিকে হাঁটছে। সুফলাও নিশ্চয়ই বদলেছে। তার কি নিজের ঘর হয়েছে? নাকি ফকিরচাঁদের মতোই যাযাবর জীবন কাটাচ্ছে? নাহ্, আর সে সুফলাকে খুঁজবে না।
শোঁ-শোঁ করে হাওয়া আসে ইন্দ্রাবতীর জঙ্গল থেকে!
