সন্ধিক্ষণ – ৮

লঞ্চের নাম সুখের রানি। সবুজ রং দিয়ে সুখের রানির ছবিও আঁকা আছে সাদা শরীরের লঞ্চের দুই দিকে। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে সুখের রানি হিসেবে শিল্পী যাকে কল্পনা করেছে, তার কপালের উপর চুল এসে পড়ছে। ভারতের হিন্দি সিনেমার এক হিরোইন আছে। তার নাম সাধনা। সাধনার চুলের স্টাইল এরকম। এই স্টাইলের নাম সাধনা কাট। পূর্ব পাকিস্তানেও সেই সিনেমা দেখা হয়। সাধনা কাট এখানেও জনপ্রিয়। হিন্দু মুসলিম সব মেয়েরাই চায় এরকম চুল করতে। সেই সাধনা কাট সুখের রানি লঞ্চে যে যাত্রীরা বসে আছে, তারা অবশ্য সুখ থেকে অনেকটা দূরে এখন।

একটু পর হবে সূর্যোদয়! সূর্যকে স্বাগত জানানোর জন্যই প্রস্তুত হচ্ছে চরাচর। শীতলক্ষ্যা নদীর প্রান্তে কুয়াশার মধ্যে সাদা বক উড়ে যাচ্ছে ইতিউতি। ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে।

এখন ভোর। তাই ঘনঘন লঞ্চের সাইরেন শোনা যাচ্ছে না। বরং নিঃশব্দে চলছে সুখের রানি। ডেকের উপর তিনটি চেয়ার। সেখানে বসে আছে তিনজন গম্ভীর মানুষ। লঞ্চের মালিক রওশন সাহেব। বন্দর থানার মেজ দারোগা মোজাম্মেল হক। আর সুবিনয় চক্রবর্তী। মুন্সিগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক।

এই লঞ্চের নীচের কেবিনে ঠাসাঠাসি করে বসে থাকা হিন্দু পরিবারগুলো জানে না কোথায় যাচ্ছে তারা। শুধু জানে তাদের চলে যেতে হবে। তাদের নিরাপদে গোয়ালন্দে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করবে এই তিনজন। সুবিনয় চক্রবর্তী নীরবতা ভেঙে বললেন, দারোগাসাহেব, এরপর এরা কী করবে?

মোজাম্মেল হক বাতাসের মধ্যে সিগারেট ধরাতে পারছেন না। বারবার নিভে যাচ্ছে। মনমেজাজ ভালো নেই তাঁর। মেয়ের জামাইয়ের হালচাল ভালো ঠেকছে না। সে মাঝেমধ্যেই এটা ওটা ভুজুং ভাজুং বলে মেয়েকে বাপের বাড়িতে দিয়ে যাচ্ছে। মেয়েকে তার মা প্রশ্ন করেছে। মেয়ে কিছু বলে না। শুধু মাথা নেড়ে বলে, কিছুই হয় নাই!

এসব ফাজলামো মোজাম্মেল হক পছন্দ করছেন না। কিছুই হয় নাই তো তোরে মাসের মধ্যে দুইবার বাপের বাড়ি ফেলায়ে যায় ক্যান? তিনি একজন দারোগা। তাঁকে যদি মেয়ের জামাইই ভয় না পায়, তাহলে চোর ছ্যাঁচোর কেন ভয় পাবে? সে ছেলে অত্যন্ত চতুর। যখন তখন থানায় এসে হাজির হয়ে বলে, আপনের সাথে তো দ্যাখ্যা হইল না বাসায়। ফুলিরে দিয়া গেলাম কয়দিনের জইন্য। একটু খেয়াল রাইখ্যেন। আমার ওহেনে কুনও কামকাজ করতে দেই না। উনানের কাজ য্যান আম্মা না দেয়, এইডা আপনের দ্যাখা লাগব। হাঁসের ডিম ভালো খায় ফুলি। তাই মাঝেসাঝে হাঁসের ডিম খাওয়াইয়েন। আইজ ফিরতে হইব। তাই আর বেশি কথা নয়। খোদা হাফেজ!

রেজিনাকে তিনি এখন বকেন যে, টাঙ্গাইলের এই ছেলের সঙ্গে কেন তিনি মেয়ের বিয়ে দিলেন। রেজিনার এক কথা। তার ছোটবেলার সইয়ের ছেলে। ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময়ই কথা চালাচালি হয়ে গেছে যে তাদের ছেলেমেয়ের বিয়ে হবে। মোজাম্মেল হক অতি কষ্টে রেজিনাকে বলা থেকে বিরত থাকেন যে, মেয়ের বিয়ে দেওয়া আর সংসারের দায়িত্ব পালন করাটা রান্নাবাটি খেলা নয়। যদিও ছেলে ভালো চাকরি করে, ফুলি কান্নাকাটি করে না।

গতকাল ফুলি রেজিনাকে বলেছে, তার বর চায় না নিজের বাড়ির লোকের ভিড়ের মধ্যে থাকতে। সে চাইছে ফুলিকে আলাদা বাসায় নিয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে। মোজাম্মেল হক বুঝতে পারছেন না তার মানে কী? এই কারণেই কি জামাই ফুলিকে বারবার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে নিজের পরিবারের লোকদের বোঝাতে চায় যে ফুলি অখুশি?

জামাই মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতে চাইলে সাধারণত মেয়ের বাবা মা খুশি হয় মনে মনে। কিন্তু মোজাম্মেল কিংবা রেজিনা কেউই এই ব্যাপারে খুশি নয়। এ ব্যাপারে বরং রেজিনার মেয়ের থেকে বেশি টান নিজের সইয়ের প্রতি।

মোজাম্মেল হকের কানে আসছে মাঝেমধ্যেই ফুলির সঙ্গে রেজিনার কথা কাটাকাটি। রেজিনা কাল রাতেও ফুলিকে বলেছে, এত জামাই সোহাগ আমি পছন্দ করি না। তোমাগো আলাদা হওন যাইব না। আমাদের মত নাই!

দারোগা সাহেব যে সিগারেট ধরাতে পারছে না, অনেকক্ষণ ব্যাপারটা লক্ষ্য করে এবার রওশন সাহেব নিজের পকেট থেকে লাইটার বের করে সন্তর্পণে মোজাম্মেল হকের সিগারেট ধরিয়ে দিলেন।

মোজাম্মেল হক সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, মাস্টারমশাই, একটা সিধা কথা কই! এরপর কী হইব এদের এইডা আমি জানি না। আমারে আপনে রিকোয়েস্ট করছেন। আমি এই লঞ্চের ব্যবস্থা কাইল রাতের মইধ্যে করছি। রওশন সাহেব রাজি হইছেন এই ঝামেলার মইধ্যে তার লঞ্চ বাইর করতে! এও কম না। আর আমার হাতে নাই যুগীগঞ্জ, নিতাইগঞ্জ, সুন্দরপাড়া, নবীগঞ্জ, কুতুবাইল এইসব এরিয়া। ঘুরপথে এই মানুষগুলোনকে আপনে আইন্যা ফেলাইছেন মুন্সিগঞ্জে।

মোজাম্মেল বলে যান, আমার হাতে থাকলে যারা হাঙ্গামা করতাছে, তাদের সোজা গুলি করতাম! একদিকে এসব চলছে, আর অইন্যদিকে নেতা জাতীয় পার্টি করব নাকি ইপিএএল পার্টি করব, এই দড়ি টানাটানিতেই বিজি। আমাগো অবস্থা হইছে শাঁখের করাত! আমি এদের নিরাপদে লঞ্চঘাটে নামাইয়া দিমু। এদের ব্যবস্থা আমার আপনের হাতে নাই।

সুবিনয় বললেন, দারোগা সাহেব, দুনিয়ার যেখানেই যা হবে, তখনই এখানে মানুষ হিন্দুদের তাড়ানো প্রধান কাজ মনে করবে এটা কতদিন ধরে চলবে?

রওশন বলে, আমারও এইডা প্রশ্ন! এসবের মানে কী? ব্যবসাপাতি বন্ধ! এগো পিছনে কারা থাকে?

ডেকের উপরে যখন এইসব আলোচনা চলছে, তখন লঞ্চের বেসমেন্টে একটা জানালার বাইরে তাকিয়ে স্থির চোখে নদীর জল দেখছেন সুধাময়ী। তাঁর পাশে বাবু আর তপু ঘুমাচ্ছে। ঠিক উল্টোদিকের সিটে পাথরের মতো মুখ নিয়ে বসে আছে প্রভাস আর সন্ধ্যা। কেবিনে তারা একা নয়। আরও সাতটি পরিবার।

কেউ একটাও কথা বলছে না। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। দুই চোখজুড়ে এক অপার শূন্যতা। সুধাময়ী ভাবছেন, এই সেই শীতলক্ষ্যা। অনেক বছর আগে যখন বাস চালু হয়নি, তখন ধলেশ্বরী হয়ে একদিন নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন তিনি স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে। মাঝখানে কতগুলো বছর কেটে গেল।

একদিকে ধলেশ্বরী আর অন্যদিকে শীতলাক্ষ্যা আর এদের সংযোগস্থল। ঠিক মাঝখানের ছোট বর্ধিষ্ণু গ্রাম যুগীগঞ্জকে ক্রমেই নিজের পৃথিবী হিসেবেই দেখেছেন সুধাময়ী। বকুলপুর পাড়া ছিল তাঁর কাছে প্রাণের জায়গা। কিন্তু এতকাল থেকেও বোঝেননি যে, তিনি চাইলেও যুগীগঞ্জ তাঁকে নিজের মনে করেনি। ১৯৪৭ সালের ওই অগ্নিবলয়ের মধ্যেও তিনি ছেলেদের নিয়ে পালাননি। থেকে যান যুগীগঞ্জে। লতিফের বাবা তাঁর বাসায় এসে বলে গিয়েছিলেন, আপনে আমার ছোট বোন। লব-কুশ আমারই ছেলে। আপনেরা কোথাও যাইবেন না! আজ এতকাল পর লতিফ ঠিক তার বাবার মতোই চেষ্টা করল আরও একবার তাদের রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়াতে। সেই লতিফকে ধ্বংস হয়ে যেতে হল চোখের সামনে।

সুধাময়ীর চোখে জল আসছে না কেন? শীতলক্ষ্যার জলের শব্দ তাঁর বুকে কোনও আগুনের জন্ম দিচ্ছে না কেন? আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন সুধাময়ী। আর কোনও দুঃখ হচ্ছে না। সুধাময়ীর চোখ শুধু জ্বালা করছে, অপমানবোধ হচ্ছে। ওই যে লোকটা লঞ্চ চালাচ্ছে, ওই যে লঞ্চের মালিক, দারোগা, এরা সবাই এই দেশের লোক। এরা সকলে তার থেকে কম দিন এই দেশে এসেছে। সকলের আগে তিনি এই দেশে জন্মেছেন। অথচ আজ এই লোকগুলোর অধিকার তাঁর থেকে অনেক বেশি।

সুধাময়ী কুমিল্লার চৌধুরী পরিবারের কন্যা। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ঢাকার নবাবের কানুনগো। ঘোড়ায় চেপে খাজনা আদায় আর তদারকি করতেন। সেই গগন চৌধুরীর বংশের কন্যা আজ নারায়ণগঞ্জ থেকে অন্যের দয়ায় পালাচ্ছেন! আর মাত্র একদিন! তারপর এই দেশ থেকে চলে যেতে হবে। সুধাময়ী দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ালেন! ভাবলেন, দেশ বলে কিছু হয় না। স্বভূমি বলে কিছু হয় না।

প্রভাস যখন দেখল লতিফের ঘর আগুনে জ্বলছে, সে দিগ্বিবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে গিয়েছে উঠোনে। দেখল লতিফ আর আরশাদ বসে আছে। ওদের ঘিরে ধরেছে একদল মানুষ। কারও হাতে মশাল, কারও হাতে লাঠি। কেউ বা বর্শা নিয়ে এসেছে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। গোটা বাড়ি ঘিরে রেখেছে তারা। রমাপদ, রতন, সুবল, আশফাক, গফরু চাচা, রমজান চাচা, মুরাদ ভাইয়ের মতো গ্রামের অনেকেই ঘটনাস্থলে হাজির। এই সময় তো ছোটাছুটি করে আগুন নেভানোর কথা। সকলে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে কেন? প্রভাসের অস্থির লাগছে। সে লতিফের সামনে এসে বসে পড়ল। লতিফের বউ রেহানা হাউ হাউ করে কাঁদছে। কাঁদছে লতিফের ছেলে আসলাম। আরশাদের বউ কিছুটা দূরে জামরুল গাছের নীচে বসে। সে গর্ভবতী। তার চোখে মুখে আতঙ্ক, সে ফোঁপাচ্ছে।

কীভাবে হল? কীভাবে হল? প্রভাসের ঝাঁকুনিতে মাটির দিক থেকে চোখ তুলল লতিফ। মাথা নাড়ল শুধু। প্রভাস বুঝতে পারছে না এই মাথা নাড়ার অর্থ কী? কীভাবে আগুন লেগেছে লতিফ জানে না? তাহলে এই যে এতগুলো লোক সামনে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে, এরা কারা? এদের হাতে শুধু নয়, চোখেও আগুন। সেই আগুন থেকে স্পষ্ট যে, তারা আর যাই হোক লতিফকে সান্ত্বনা দিতে আসেনি।

হঠাৎ জমায়েতের ভিতর থেকে একজন এগিয়ে এসে বলল, আমাগো লতিফ ভাইয়ের ঘরে আগুন দেছে হিন্দুরাই! তাই এবার আমরাও চুপ থাইকব না! এই তো এই কুশ, রমাপদ, রতনরা জানে কেডা দেছে আগুন। নয়তো এরাই দেছে। এখন সাধু সেজে আসছে।

প্রভাস নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এসব কী বলছে এরা? হিন্দুদের পরিবারের সাহস হবে যে লতিফের বাড়ি আগুন দেবে? যে লতিফ তাদের কাছে একমাত্র রক্ষাকর্তা এই দুঃসময়ে?

সেই লোকটি আবার গলার সুর চড়িয়ে বলল, খবর আছে এডা হিন্দুদের কাম। তাই এবার আমাগো আমাদের কাম কইরতে হইব।

প্রভাস ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার বন্ধু লতিফ। তোমার জন্মের আগে থেকে আমাদের পরিবারগুলোর সঙ্গে লতিফের পরিবারের সম্পর্ক। আমাদের গ্রামে রেখে দেওয়ার জন্য এই লতিফ তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া করছে। লতিফ না থাকলে আমরা এখানে এতদিন থাকতেই পারতাম না। আর সেই আমরাই তার ঘরে আগুন দেব? এটা কী বলো তোমরা?

তুই থাম মালাউনের বাচ্চা! ধমকে উঠল আরও এক চেহারা। তোরাই করছস এই কাম। তগো জ্বালায় এহেনে কোনও সাচ্চা মোসলমান থাকতে পারুম না। তগো জাহান্নামে পাঠাইতে হইব।

রমাপদ ছুটে এসে লতিফের পাশে বসে থাকা আরশাদের কাছে বসে পড়ে বলল, আরশাদ তর পেত্যয় হয় এই কাম আমাগো? তুই বল!

আরশাদ মাথা নাড়ে। তারপর ফিসফিস করে বলে, তরা বুইজছস না যে এইডা একটা চাল।

মানে?

আরে এসব কী হচ্ছে? আমাদের লতিফের ঘরে আগুন! কে করল এই কাজ?

একটু উচ্চস্বরের এই গলা শুনে সকলে তাকিয়ে দেখতে পেল শফিকুলকে। বিকেলে অশ্বত্থতলার মিটিংয়ে হামলা করার চেষ্টা হয়েছিল। সেখানে রশিদ আর সুরাবর্দীদের ধরে শিক্ষা দিচ্ছিল লতিফ আর আরশাদ। তখন এই শফিকুল এগিয়ে এসে ঠান্ডা করেছিল পরিস্থিতি। সকলকে আশ্বাস দিয়েছিল এবার আর কোনও অশান্তি হবে না।

শফিকুল থাকে পাশের গ্রামে। ফতুল্লায় মাদ্রাসার টিচার। শফিকুলের গলা শুনে যে লোকটি এতক্ষণ হুমকি দিচ্ছিল, সে চকিতে একবার সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, শফিকুল ভাই, গ্রামের হিন্দুরা একজোট হইয়া এই কাম করছে।

শফিকুল বলল, সে কী! এ কি সত্য? আমাদের প্রিয় হিন্দু ভাইয়েরা এই কাজ করেছে? এ যে বিশ্বাসই করা যায় না! না না এসব আমার পক্ষে বিশ্বাস করা শক্ত। হে আল্লাহ! এসব কী শোনাও আমারে!

লতিফ এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। হঠাৎ সে লাফ দিয়ে উঠল! চিৎকার করে বলল, এই শফিকুল! তুমি আমাগো গাধা মনে করো? এই কুত্তাগুলোরে তুমি পাঠাইছ আমার ঘরে আগুন দিবার লইগ্যা! তুমি মিঠা মিঠা কথা কও কীর লইগ্যা? তোমার কৌশল কী? এই রামছাগলদের হাতে আগুন ধরাইয়া দিয়া আমারে পথ থেকে সরাইয় দেবা তাই তো? আমার ঘরে আগুন লাগাইলে আমারে ভয় দেখান যাইব আর হিন্দুগো বোঝানো যাইব যে আমার ঘরেই যদি আগুন লাগে, তয় তাদের অবস্থা কী হবে, এই তো!

শফিকুল বলল, আহা-হা, এইসব কী কথা কও লতিফ? এইসব কাজ আমি করব? আমি কোনও পিঁপড়া মারি না। আমি তোমার ঘরে আগুন লাগাতে লোক পাঠাব? আমারে তুমি ভুল বুঝছ মিয়া।

লতিফ বলল, আমি বুঝছি শফিকুল মিয়া। ওই মওলানা আর হোসেনের থিইক্যা ঢের বেশি শয়তান তোমার মইধ্যে বাস করে। আমি বুঝছি আমার ঘরে আগুনের জইন্য এইবার হিন্দুদের ঘাড়ে দোষ চাপাইয়া তুমি লোক খেপাইবা! এহনও আমি যদি তোমার বশে না আসি, তয় এই গেরামের আরও মোসলমানের ঘরে আগুন লাগব। তবে মনে রাইখ্যো, আমি আল্লার নামে কসম নিই, আমি কিন্তু গেরামেই থাকুম। তোমারে এই গেরামে আইস্যা হাঁটু মুইব়্যা মাফি চাইতে হইব একদিন। এই হিন্দুরা থাকুক, না থাকুক, অরা যেহানেই থাউক, অদের আমি ঠিক খুঁইজ্যা বার করুম। আজ এই পোড়া ঘরের কসম শফিকুল মিয়া। আমি আর আমার ভাই শ্যাখ সাহেবের পার্টি এই গেরামে কায়েম করুম। তোমাদের উৎখাত করতে হইব!

লতিফ হাঁফাচ্ছে। প্রভাসের কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল, কুশ, আমি হয়তো পারুম না তদের বাঁচাইতে! যদি যাইতেই হয় বাড়ির চাবি আমার হাতে দিয়া যাবি! ওই বাড়ি খালাম্মার। ওই বাড়ি ওরকমই থাকবে। তরা আবার ফিরবি। আজ নয় কাল।

প্রভাস বলল, তার মানে? আমাদের চলে যেতে হবে! কেন?

শফিকুল চুপ করে ছিল। এবার কথা বলল, আহা! চলে যেতে হবে মানে কী? যতদিন ঝামেলা আছে, ততদিন একটু ঘরে তালাচাবি দিয়ে কোনও আত্মীয় বাড়ি ঘুরে এসো। এখন তো দেখছ, কখন কী হয়! তার উপর তোমাদের মধ্যে কারা আবার মোসলমানদের ঘরে আগুন লাগাতে শুরু করলে। যাও…এখন বাসায় যাও তোমরা সবাই। এখানে কেউ থেকো না। কখন এসব ছেলেছোকরার মাথা গরম হয়ে যাবে কেউ কি বলতে পারে? যাও, বাসায় গিয়ে একটু ভাবো কী করা উচিত!

শফিকুল শেষ কথাটা বেশ জোরে বলল। এতদিন এই রকম কণ্ঠস্বর শোনা যায়নি। এই প্রথম হুমকির সুর শোনা গেল। প্রভাস, রমাপদ, রতন, সুবল, কালী, মণি, সুহাস প্রত্যেকে চমকে উঠল। আজ এই মুহূর্তে বুঝতে পারছে যে, তাদের চলে যেতে হবে এই গ্রাম ছেড়ে। লতিফের বাড়িতে আগুন দিয়ে তাদেরই ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, যারা বাধা দেবে তারা মুসলিম হলেও তাদের প্রাণে মেরে দিতেও কসুর করবে না ওরা। এখন একটাই পথ তোমাদের সামনে খোলা আছে। পালাও।

এতকাল ধরে ওরা যুগীগঞ্জে বসে শুনে এসেছে যে ঢাকা, খুলনা, পাবনা, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, ময়মনসিং থেকে হিন্দু পালিয়েছে ভিটেমাটি খুইয়ে। তাহলে এবার সেই দিন এখানেও এল? চলে যাওয়ার? এই যে চোখের সামনে যে মানুষগুলোকে এত বছর ধরে দেখে আসছে, হঠাৎ তারা এতটা অচেনা হয়ে যাবে ধর্মের জন্য? লতিফ আর আরশাদ? তারাও তো ওদের ধর্মের। তারা কেন হিন্দুদের বাঁচাতে নিজেরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেল?

লতিফ আজ রাতে কোথায় থাকবে? শফিকুল ঠান্ডা গলায় যে যার বাড়ি চলে যাও বলে, হুঁশিয়ারি দিলেও প্রভাস যাচ্ছে না। রমাপদও দাঁড়িয়ে। প্রভাস এগিয়ে এসে রেহানাকে বলল, আমাদের বাসায় চলো। যা হওয়ার কাল হবে। লতিফকে উদ্দেশ্য করে বলল, লতিফ আরশাদ চল আমার বাসায়। এইভাবে বসে থেকে কী হবে? সকালে এসে যা করার করব সকলে মিলে।

লতিফ কোনও আপত্তি করল না। উঠে দাঁড়াল। হাতের ইশারায় শফিকুল তার দলকে বলল, চলে যেতে। লতিফকে বলল, কাল কথা হবে লতিফ!

লতিফ বলল, ইনশাল্লা! কাইলই কথা হবে শফিকুল!

লতিফের কথা শেষ হওয়ার আগে হঠাৎ হো হো হো হো করে দলবদ্ধ হুঙ্কার! আবার দূর থেকে আসছে কিছু কান্নার রোল। আগুনের ঝলক আকাশে। কিছু দূরে। চমকে উঠল সকলে। কী হয়েছে আবার? কোন বাড়িতে আবার আগুন? কে লাগাল? দেখতে দেখতে পঞ্চাশ জনের একটা দল হাজির হয়ে গেল। আর তাদের পিছনে আরও কয়েকদল। প্রত্যেকের মুখে আগ্রাসী চিৎকার! শোনা গেল রশিদের গলা, মোসলমানের ঘরে আগুন দিসে? তগো সব ঝাড়েবংশে আগুনে দিমু।

রমাপদকে সামনে দেখে মাটিতে ফেলে মাথায় লাঠি মারতে উদ্যত হল রশিদ। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই হতচকিত। এমনকী হয়তো শফিকুলও।

তার পরিকল্পনা ছিল এই আগুন দেখিয়েই হিন্দুদের গ্রামছাড়া করা। কিন্তু সে পরিকল্পনা তার হাতের বাইরে চলে গিয়েছে এখন। কারণ ওই প্রচার চারদিকে ছড়িয়েছে। এখন দলে দলে মুসলিম ছুটে এসেছে বদলা নিতে!

একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে শফিকুল মাটিতে পড়ে গেল। বিস্ফারিত হয়ে দেখল তার গলায় এক বড় কাস্তে ধরা আছে। লতিফ!

লতিফ বলল, এই শফিকুল, এখনই গলার নলি কাটুম। আইজ আমার লগে চ। তর বাড়বাড়ন্তি দেখি কদ্দূর। একটা হিন্দুর ঘরে আগুন লাগাইলে, একটা হিন্দুর জান গেলে তর জান আমার হাতে! তরে কোথায় মারুম জানস! হিন্দুর ঘরে! কুশের ঘরে। তোর এই পোষা কুত্তাগুলোরে তুই খেপাইছস! এখন তুই সামলা! অহন তুই যাইবি আমার লগে! কুশের বাসায়। আরশাদ, রেহানা, আসলাম হগ্গলে চল আমার লগে।

অ্যাই ওঠ!

শফিকুল উঠে দাঁড়ায়। তার গলায় কাস্তে ধরে রেখেছে লতিফ! সামনে আসা লোকগুলোকে লতিফ বলল, দেখলি তো তরা! তগো আব্বা আমার হাতে ধরা খাইছে! এবার যা! বাকিগুলোনরে গিয়া বল ঘটনা কী! বল তদের আব্বাজান মহান শফিকুল সাহাবের জান লতিফের হাতে! যা আগুন লাগানো বন্ধ কর! নয়তো শফিকুল সাহেবের দাফনের ব্যবস্থা কইব়্যা রাখ।

শফিকুলের চোখেমুখে মৃত্যুভয়। সে চিৎকার করে বলল, লতিফ…লতিফ…শোনো আমার কথা? আমাকে মেরো না! আমি তোমায় কথা দিচ্ছি!

লতিফ বলল, চুপ যা কুত্তা! তর আবার কথা কী হারামজাদা? আমার কথা শোন তুই! এক্কেরে চুপ থাক!

প্রভাস আর রমাপদকে লতিফ বলল, চইল্যা আয়। আরশাদ, তুই সুবল রতন, কালী, মণিরে বল সবাইরে লইয়া কুশের বাড়ি যেন চইল্যা আসে। সকলের বাড়ির চাবি দেবে আমার হাতে।

ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল মারমুখো লোকগুলো। তারা বুঝতেই পারছে না কী করবে। তাদের সামনে দিয়ে লতিফ শফিকুলকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে! একটু বাধা দিলেই লতিফ যে শফিকুলের গলা কেটে দেবে সেকথা বোঝা যাচ্ছে।

শফিকুল হাতের ইশারায় লোকগুলোকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল।

শফিকুলকে প্রভাসের বাড়িতে নিয়ে প্রভাসের দাদার ঘরে আটকে দিল লতিফ! শফিকুলকে বলল, তরে বিশ্বাস নাই শফিকুল। তুই কালসাপ! তাই তর লগে কাজিয়া কইব়্যা আমি এদের বাচাইয়া রাখতে পারুম না। হেইডা বুইঝ্যা গেছি। তর লগে আমার হিসাব হবে নিশ্চয়। তার আগে এদের নিরাপদে আমার গেরাম থেকে বাইর করতে হবে।

প্রভাস আর রমাপদকে লতিফ বলল, কুশ, রমা, তরা এহন কিছুদিন যা কোথাও! আগে জান বাচা! এরা পাগল হইয়া গ্যাছে। সে হিসাব আমি চুকতা করুম। তরা কই যাইবি ভাবছস কিছু?

প্রভাস বলল, মালতীরা যদি যায় তাহলে তো ঢাকা যাওয়া ভালো ওদের নিয়ে। নরেনের কাছে। একটা কিছু হবে।

লতিফ বলল, হ্যাঁ। তাই কর! এদিক ঠান্ডা হইলে আমিই গিয়া খবর দিমু। মালতীর বাড়ির ঠিকানা দিয়া যাস! আরশাদ তদের লইয়া মুন্সিঘাট যাউক।

সুধাময়ী ঘরের মধ্যে বসে। সেই যে প্রভাস বেরিয়ে গেল, তিনি আর কোনও কথা বলেননি। একমনে শুধু জপ করছেন। গুরুকে স্মরণ করছেন। এটাই তাঁর অভ্যাস! সন্ধ্যা বুঝে গেছে। সে কথা বলে না।

সুধাময়ীর কাছে গেল লতিফ। সামনে বসল। পাথরের মতো বসে আছেন সুধাময়ী। তাঁকে সন্ধ্যা বলেছে একটু আগে যা ঘটেছে। তিনি মনে মনে তৈরি হয়েছিলেন যে, এরকম সময় আসছে। কেন যেন আগেই টের পেয়েছেন। লতিফ ঢুকেই আর আবেগ সামলাতে পারল না। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। বলল, খালাম্মা!

সুধাময়ী শান্ত কণ্ঠে বললেন, লতিফ! তুই আমার আর এক ছাওয়াল বাবা! তরে আমার ঘরদোর সংসার দেখবার জন্য তর জিম্মায় রাইখ্যা গেলাম! দেখিস বাবা, সব য্যান ঠিকঠাক থাকে!

লতিফ বলল, খালাম্মা, আমি তোমার খারাপ পোলা! আমি তোমারে রাখতে পারলাম না ক্যান! তোমারে ফিরাইয়া আনুম।

সুধাময়ী বললেন, আমাগো নিয়তি! ফিইব়্যা আইলেও আবার হইব এইসব! আইজ এই পেত্থম ঘর ছাইব়্যা পথে নামুম। ভাসা শুরু হইল! মাইনষের জীবন তো বাবা কচুরিপানা! অনেকদিন আটকাইয়া ছিলাম। এবার ভাসার সময় আইছে। দেহি কই যাই! গুরুর কৃপা!

সন্ধ্যা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। ছুটে গেল নিজের ঘরে। প্রভাস রমাপদকে কী যেন এক ইঙ্গিত করল। রমাপদ মাথা নেড়ে বেরোল। প্রভাস খাটের নীচে থাকা একটা জামাকাপড়ের গাঁটরি বের করল। আর কিছু হোক না হোক, এই গাঁটরি সে নিয়ে যাবে। এই জামাকাপড় তাদের এতকাল খাইয়েছে পরিয়েছে। এই গাঁটরি তাই সঙ্গে থাকলে প্রভাস মনে করবে তার একটা শক্তি আছে। যতক্ষণ না কেউ কেড়ে নিচ্ছে, ততক্ষণ এই তার পুঁজি। আর নিল ঘরে থাকা টাকাপয়সা যতটুকু অবশিষ্ট ছিল। সন্ধ্যা নিল তার গয়না।

ভোর তিনটের সময় যুগীগঞ্জ থেকে পাঁচটি পরিবার বেরিয়ে পড়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীর দিকে! আরশাদকে রমাপদ বলে দিয়েছিল সবাইকে পৌঁছে দিতে হবে সোনাকান্দা। সেখানে হেডমাস্টার মশাই সুবিনয় চক্রবর্তীর কাছে গেলেই একটা ব্যবস্থা হবে। সুবিনয়বাবুই দারোগা সাহেবকে বলে এই লঞ্চের ব্যবস্থা করলেন। সুধাময়ী বলেছিলেন, সুবিনয়দার কাছেই যেন তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। বহুবছর ধরে তাদের পরিবারের বন্ধু।

শীতলক্ষ্যা নদীবক্ষে চলেছে পাঁচটি পরিবার, অজানার উদ্দেশে! ঢাকা যাওয়া হচ্ছে না। ঢাকায় আগুন জ্বলছে। তাই উপায় নেই, বর্ডার পেরনো ছাড়া! কোথায় যাওয়া হবে? মনে হয় কলকাতায়!

সুখের রানি লঞ্চের কেবিনে সুধাময়ীর কোলের কাছে ঘুমিয়ে থাকা বাবু হঠাৎ লঞ্চের সাইরেনের শব্দে কেঁপে উঠল! সুধাময়ী বুঝতে পারলেন না যে, বাবু ঘুমের মধ্যে লঞ্চের সাইরেনে কাঁপছে না, সে কাঁদছে! তার স্বপ্নে ফিরে আসছে শেষ বিদায়ের দৃশ্য! বন্ধু আসলাম দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল! দুজনের চোখেই ছিল জলের ধারা! তারা ঠিক জানে না এই চলে যাওয়ার মানে কী? আর কি দেখা হবে না?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *