সন্ধিক্ষণ – ১৮

১৮

হস্টেলের চার্জ হঠাৎ এত বাড়িয়ে দেওয়া হল কেন? আমেদাবাদের এল ডি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সুপারভাইজারকে ঘেরাও করা হলে তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, এত কম টাকায় আর চলবে না। সরকারি নির্দেশ।

ছাত্ররা বলল, সরকার নির্দেশ দিয়েছে? সব জিনিসের দাম এত বাড়ছে কেন? সরকার আগে সেই জবাব দিক!

সুপারভাইজার বললেন, এসব আমাকে বলে লাভ নেই। নতুন চার্জ দাও। নয়তো হস্টেল ছেড়ে দিতে হবে।

২০ ডিসেম্বর ১৯৭৩। ছাত্ররা হস্টেল ছাড়ার বদলে ক্যান্টিনে আগুন ধরিয়ে দিল। তারপর রেক্টরের কোয়ার্টারে হামলা। আসলে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। পনেরো দিন পর যখন হস্টেলের ভাড়া কমানো হল না, তখন ছাত্ররা ধর্মঘটের ডাক দিয়ে একে একে ফার্নিচার, ল্যাব রুম ভেঙে দিতে শুরু করল।

আর সামলানো যাচ্ছে না। অতএব পুলিশকে খবর দিতে হল। কেন এত ক্ষোভ ছাত্রদের? শুধু ছাত্র নয়, ততদিনে মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেলের কুশাসনের বিরুদ্ধে প্রবল ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। দুর্নীতি, কালোবাজারি, মজুতদারি। সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। চিমনভাই প্যাটেলের নাম দেওয়া হয়েছ চোর চিমন!

চিমনভাইয়ের পুলিশ ছাত্রদের বেধড়ক মারধর করে জেলে পাঠিয়ে দিল। আরও কয়েকশো আহত হয়ে হাসপাতালে। ছাত্ররা অবশ্যই বাড়াবাড়ি করেছিল। নিজেদের কলেজকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা কোনও সুস্থ গণতান্ত্রিক আন্দোলন নয়। কিন্তু পুলিশ লঘু পাপে গুরুদণ্ড দিল। কারও জামিন হবে না। বিনা বিচারে জেলে রাখা হবে। সকলের রেজিস্ট্রশনও ক্যান্সেল করার হুমকি দিয়ে শোকজ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ব্যস! আমেদাবাদের সমস্ত স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এল। ১০ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট। কিন্তু এ কী? ছাত্র ধর্মঘট কোথায়? সরকারি কর্মী, ব্যাঙ্ক ও বিমা সংস্থার কর্মীরা পর্যন্ত বন্ধকে সমর্থন করেছে। কাজকর্ম বন্ধ করার ঘোষণা করেছে।

সর্বাত্মক বন্‌ধ। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সুরাতে, বরোদায়, রাজকোটে। ছড়াচ্ছে ক্ষোভ, ছড়াচ্ছে আগুন, ছাত্র আন্দোলন ক্রমে সামাজিক আন্দোলন। কিন্তু আন্দোলন শৃঙ্খলাবদ্ধ না হলে কী হয়? দুষ্কৃতী, অপরাধী ও সুযোগসন্ধানী লুম্পেন শ্রেণি ঢুকে পড়ে। তাই হল। দোকানে আগুন, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস।

ছাত্ররা একটি সংগঠন তৈরির কথা ভাবল। নবনির্মাণ যুবক সমিতি। এবার সামাজিক সংস্কারের স্লোগান। যা ছিল হস্টেলের চার্জ কমানোর আন্দোলন, সেটি হয়ে গেল রাজনৈতিক মুভমেন্ট! এই প্রথম সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হল।

বিধানসভার ১৬৮ জন বিধায়কের মধ্যে ১৪০ জনই এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে চিঠি দিলেন। ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়াল কংগ্রেস (সংগঠন), জনসঙ্ঘ এবং কংগ্রেসের চিমনভাই বিরোধী অংশ। চরম আকার দিল এই আন্দোলন। কয়েকশো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আট হাজার গ্রেপ্তার। সাড়ে তিন হাজার হাসপাতালে। আন্দোলন সাধারণ মানুষের প্রবল সমর্থন পাচ্ছে। খবরটি পৌঁছে গিয়েছে দিল্লিতে। প্রধানমন্ত্রী কে? স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী।

৯ ফেব্রুয়ারি তিনি চিমনভাই প্যাটেলকে বললেন, ইস্তফা দিন। বিধানসভাকে সাসপেন্ড করে রাখুন। তাহলে এরপর? রাষ্ট্রপতি শাসন। ১১ ফেব্রুয়ারি রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া এক বৃদ্ধ বিহার থেকে আমেদাবাদে এসেছিলেন সর্বোদয়ের কাজে। তিনি পাটনা থেকেই জানতে পারছিলেন গুজরাতের ছাত্র আন্দোলনের কথা।

সোজা ছাত্রদের জমায়েতস্থলে গেলেন ব্যাপার চাক্ষুষ করতে। নবনির্মাণ যুবক সমিতির আন্দোলনরত ছাত্রদের বললেন, সাম্প্রতিককালে স্বাধীনতার পর এরকম আন্দোলন আমি দেখিনি। এটা সকলের কাছে অনুপ্রেরণা। দেশের অন্য রাজ্যেও ঠিক এই ধাঁচেই দুর্নীতি, কালোবাজারি, অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়া উচিত! তোমরাই তাদের মডেল! তোমরা হয়তো জানো না, বিহারে কিন্তু তোমাদের এই বিক্ষোভের পরই শুরু হয়েছে একইরকম আন্দোলন। ছাত্ররা আপ্লুত হয়ে প্রণাম জানাল মানুষটাকে।

বৃদ্ধের নাম জয়প্রকাশ নারায়ণ! জেপি।

জয়প্রকাশ ঠিক বলেছেন। বিহারে গুজরাত মুভমেন্টের সময়ই শুরু হয়েছিল একইরকম একটি ছাত্র বিক্ষোভ। ছাত্রদের নিজস্ব দাবিদাওয়ার সঙ্গেই সেখানে যুক্ত হয়ে যায় মূল্যবৃদ্ধি কালোবাজারি ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবাদ। চরম পুলিশি অত্যাচার হয়েছে ছাত্রদের উপর।

জানুয়ারি মাসে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ ছাত্র একদিন কদমকুয়ায় জয়প্রকাশ নারায়ণের বাড়িতে এল। তার সঙ্গে আরও কয়েকটি যুবক। সকলেই ছাত্র। ইউনিয়নের সভাপতি সেই ছেলেটি বলল, বাবুজি, আমরা তো শিশু। কীভাবে আন্দোলন করতে হবে, কোন ইস্যুতে সরব হতে হবে এসব এখনও ঠিক জানি না আমরা। তাই ভুলচুক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমরা আপনার নির্দেশিকায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে চাই। আমাদের আপনি আপনার শিষ্য হিসেবেই বিবেচনা করুন। ভুলত্রুটি শুধরে দিন। একটি সভার আয়োজন করেছি। পাটনা ইউনিভার্সিটির হুইলার সেনেট হলে। সেখানে যদি একবার আপনি ভাষণ দিয়ে আমাদের পথনির্দেশ করেন, চিরকৃতজ্ঞ থাকব। সেই সভায় আমন্ত্রণ করেছি অন্য কিছু অকংগ্রেসী দলকে।

জেপি দেখলেন, ছেলেটি বেশ স্পষ্টবক্তা। ছেলেটিকে তাঁর পছন্দ হয়ে গেল। বললেন, আমি আসছি। গোটা রাজ্যের কলেজগুলি থেকে তিনশোর বেশি ছাত্রছাত্রী যোগ দিল কনফারেন্সে। জয়প্রকাশ নারায়ণ বক্তৃতা দিলেন এবং কোনদিকে যেতে পারে আন্দোলনের অভিমুখ, তার রূপরেখা দিলেন।

ছেলেটি জয়প্রকাশের পায়ের পাশে বসে রইল। ছেলেটিকে দেখিয়ে ছাত্রছাত্রীদের জয়প্রকাশ বললেন, তোমাদের এই সভাপতির নেতৃত্বে এবার ময়দানে নেমে পড়ো।

১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে বিহারের ওই ছাত্ররা তৈরি করল একটি সংগঠন। বিহার ছাত্র সঙ্ঘর্ষ সমিতি। পাটনা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি সেই তরুণের নাম কী ছিল? লালুপ্রসাদ যাদব!

১৮ মার্চ থেকে সেই সঙ্ঘর্ষ সমিতি লাগাতার বিক্ষোভ শুরু করে দিল। এপ্রিলে জয়প্রকাশ নারায়ণের কাছে গিয়ে সঙ্ঘর্ষ সমিতির ছাত্ররা অনুরোধ করল, বাবুজি, এই আন্দোলনের নেতা আপনি। আপনাকেই নেতার পদ নিতে হবে। জেপি সামান্য ভেবে বললেন, আমি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছি। তবু আমি রাজি হতে পারি। তবে নিছক নেতা নয়। আমি সকলের সঙ্গে কথা বলব। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার যেন আমার থাকে। নিছক সরকার বদল করে লাভ নেই, সিস্টেম বদল করতে হবে। একটি দুর্নীতিবাজকে সরিয়ে আর একটি দুর্নীতিবাজকে নিয়ে আসার জন্য এই আন্দোলন যেন না হয়। এই আন্দোলনের লক্ষ্য কী হবে জানো?

ছাত্ররা তাকিয়ে আছে। জয়প্রকাশ বললেন, টোটাল রিভোলিউশন। সম্পূর্ণ ক্রান্তি। সর্বাত্মক বিপ্লব!

প্রথমে নীরব মিছিল। তারপর স্বাক্ষর সংগ্রহ। টোটাল রিভোলিউশন মানে কী? মানে হল, এই দুর্নীতিগ্রস্ত বিহার সরকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসহযোগিতা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে ছাত্র সঙ্ঘর্ষ সমিতি গঠন হবে। প্রতিটি গ্রামে জনতা সরকার গঠন করা হবে। তারা কী করবে? যে কোনও রকম অন্যায়, দুর্নীতি ও অসাধুতার প্রতিবাদ করবে। তার মানে কি সমান্তরাল সরকার চালাবে? হ্যাঁ তাই! নতুন করে নির্বাচন হোক। এই সরকার ইস্তফা দিক।

১০ অক্টোবর। পাটনায় এক মহাসমাবেশ। জয়প্রকাশ নারায়ণ ভাষণে বললেন, জনতার দাবি কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্ব শুনছে না। কারণ দুর্নীতি শুধু বিহারেই নেই। কালোবাজারি, দুর্নীতি আর মূল্যবৃদ্ধির আসল কারণ বসে আছেন দিল্লিতে। অতএব আমাদের আসল লক্ষ্য তাঁকেই সরানো। প্রধানমন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে হবে।

সরাসরি ইন্দিরা গান্ধী এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের মধ্যে শুরু হল চরম স্নায়ুর লড়াই।

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের নারোরায় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে কংগ্রেসের একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, যেভাবে জেপি আন্দোলন মোমেন্টাম পাচ্ছে, আপনার একবার উচিত জেপির সঙ্গে কথা বলে মীমাংসাসূত্র নিয়ে আলোচনা করা।

সেকথা শুনলেন ইন্দিরা। পয়লা নভেম্বর ১৯৭৪ সালে তাঁদের মধ্যে মুখোমুখি আলোচনা হল। সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় সেই আলোচনা। ইন্দিরা গান্ধী ভাষণে বললেন, আমাকে অনেকে নেগোশিয়েট করতে বলছেন! কীসের নেগোসিয়েশন? গণতন্ত্র ধ্বংস করে অরাজক দেশ নির্মাণ নিয়ে আলোচনা? জেপি ঠিক কী চাইছেন? সরকার বদল করতে হলে তো নির্বাচনে জয়ী হতে হবে! কংগ্রেস কি নির্বাচনে জেতেনি? বিরোধীরা কি নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত হয়নি?

ইন্দিরা গান্ধী জেপিকে চ্যালেঞ্জ করলেন, ১৯৭৬ সালে ফেব্রুয়ারিতে লোকসভা ভোট! পারলে সেই ভোটে আমাদের পরাস্ত করুন।

জেপি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তিনি গঠন করলেন ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেশন কমিটি। অর্থাৎ সব দলকে নিয়ে একটি জোট হবে। জেপি চেয়ারম্যান। কংগ্রেস বিরোধী সব দলকে ডাকা হল। ভারতীয় জনসঙ্ঘ, কংগ্রেস (সংগঠন), ভারতীয় লোকদল, আকালি দল, এসএসপি। আদর্শগত ফারাক দূরে রেখে শুরু হল সঙ্ঘবদ্ধ পথ চলার ইঙ্গিত।

এক বছর আগে গুজরাত বিধানসভাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি শাসন চলছে। অথচ এখনও নির্বাচন হচ্ছে না। গুজরাত তো শান্ত। তাহলে এর মানে কী?

মোরারজী দেশাই দেখলেন এটাই সুযোগ। আরও চাপ দিতে হবে ইন্দিরা গান্ধীকে। গুজরাতের মুড তিনি বুঝেছিলেন। অতএব আমরণ অনশন শুরু করলেন। তিনটি দাবি। গুজরাতে অবিলম্বে নির্বাচন, এসমা (এক্সটারনাল ইমার্জেন্সি) প্রত্যাহার এবং মেইনটেন্যান্স অফ ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (মিসা) অনুযায়ী যখন তখন যাকে তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। মোরারজী দেশাইয়ের বয়স ততদিনে ৮০ পেরিয়েছে। সাতদিন ধরে অনশন করছেন। পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হচ্ছে। সমস্ত বিরোধী দল তাঁর পাশে।

গুজরাতে দানা বাঁধছে ক্ষোভ। এরকম সময় তাঁর কিছু হলে তো সর্বনাশ! তাই ঝুঁকি নিলেন না ইন্দিরা গান্ধী। তিনি ঘোষণা করলেন গুজরাতের নির্বাচন। ১০ জুন নির্বাচন হবে। এই সুযোগটাই চাইছিলেন জেপি। তিনি সকলকে একজোট হয়ে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থীর ফরমুলা দিলেন। জনসঙ্ঘ, কংগ্রেস (সংগঠন) সোস্যালিস্ট এবং লোকদল। জোট করে লড়াই হবে। জোটের নাম জনতা দল!

গুজরাত নির্বাচনে জোটপ্রার্থীদের জয়ী করতে জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্বশক্তি দিয়ে প্রচারে নামলেন। তাবৎ বিরোধী দল একদিকে, অন্যদিকে একা ইন্দিরা গান্ধী। গুজরাতে জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং মহাজোটের প্রধান ঘোষণা কী ছিল? জে পি মুভমেন্ট সর্বাত্মক একটি লক্ষ্যকে ছড়িয়ে দিল! জন্ম নিল নতুন স্লোগান—ইন্দিরা হটাও!

১২ জুন! ১৯৭৫। সকালটা শুরু হল খারাপভাবে। কিছুদিন আগেই মস্কোয় ভারতের রাষ্ট্রদূত থাকা দুর্গাপ্রসাদ ধরকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ইন্দিরা। কিছু জরুরি পরামর্শ ছিল। অনেকদিন ধরে যিনি ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বাসভাজন।

১২ জুন ফোন ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনে। দুর্গাপ্রসাদ ধরের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে একটু আগে। সে কী? এই তো দু-দিন আগে কথা হল। হাসপাতালে গেলেন ইন্দিরা গান্ধী।

সকাল দশটা। আবার ফোন। এলাহাবাদ হাইকোর্ট থেকে এল চরম দুঃসংবাদ। ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭১ সালের নির্বাচন বাতিল হল। তাঁর প্রতিপক্ষ রাজনারায়ণ মামলা করেছিলেন। অন্যতম অভিযোগ ছিল ইন্দিরা গান্ধী সরকারি পরিষেবার অপব্যবহার করেছেন প্রচারে। তাই তিনি দোষী সাব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী পদে আর থাকতে পারবেন না। ছয় বছর নির্বাচনেও লড়াই করা যাবে না।

তৃতীয় ধাক্কা। জনতা দলের কাছে গুজরাতে কংগ্রেস পরাস্ত। ইন্দিরা গান্ধী সর্বশক্তি দিয়ে প্রচার করেছিলেন। মানুষ হারিয়ে দিয়েছে ইন্দিরা গান্ধীকে। এখন কী করবেন তিনি?

খবর পেয়েই চলে এসেছেন জগজীবন রাম। তাঁকে দেখে ইন্দিরা গান্ধীর চোখে জল। বললেন, সকলে মিলে আমাকে খতম করতে চাইছে বাপু। আমাকে এখন ইস্তফা দিতে হবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই এলেন দুজন। সঞ্জয় গান্ধী এবং বংশীলাল। দুজনেই ইস্তফার বিপক্ষে। প্রায় একই সুরে বললেন, কোনওভাবেই ইস্তফা দেওয়া যাবে না। সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার রাস্তা তো রাখা হয়েছে আদালতের রায়ে। আটজন মুখ্যমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজির।

১৮ জুন কংগ্রেস সংসদীয় দলের বৈঠক। জগজীবন রাম একটি প্রস্তাব পেশ করলেন। যেখানে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর উপর সংসদীয় দলের সম্পূর্ণ আস্থা আছে। প্রতিদিন হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে দলে দলে কংগ্রেস সমর্থক দিল্লির রাস্তায় আছড়ে পড়ছে। কেউ কাঁদছে, কেউ আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছে। সবটাই সঞ্জয় গান্ধীর প্ল্যানিং। ইন্দিরা গান্ধীর ইস্তফা দেওয়া চলবে না।

বোট ক্লাবের জমায়েতে দলের সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়া স্লোগান দিলেন, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা, ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া! এটা স্পষ্ট, ইন্দিরা গান্ধী ইস্তফা দিতে চাইছেন না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যদি একই রায় বহাল রাখে! তখন?

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে ১৪ জুলাই আবেদনের শুনানি হবে। কিন্তু হঠাৎ ভ্যাকেশন জাজ অর্থাৎ অবকাশকালীন বিচারপতি ভি আর কৃষ্ণ আয়ার একটা বিস্ময়কর নির্দেশিকা দিলেন। বললেন, যতদিন না ইন্দিরা গান্ধীর সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চে, আবেদনের নিষ্পত্তি হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, এমপি হিসেবে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হচ্ছে না। সংসদেও হাজির হতে পারেন। তবে সংসদে ভোট দিতে পারবেন না এবং বেতনও পাবেন না।

এটা কি ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে? নাকি বিপক্ষে? বিরোধীরা বলল, সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন রায়ে ইন্দিরা গান্ধীকে চরম ধাক্কা দিল। বুঝিয়ে দেওয়া হল তারা দুর্নীতির অভিযোগটি মেনে নিচ্ছে! শর্তাধীন প্রধানমন্ত্রীর কোনও সম্মান আছে নাকি? ইন্দিরা পন্থীরা ঘোষণা করল, একেবারেই নয়। আসলে এর মানে হল তাঁর সব অধিকার আবার ফিরিয়ে দেওয়া হল। চুড়ান্ত বিচারে যা হবে দেখা যাবে।

২৫ জুন। দিল্লিতে বিরাট সমাবেশ করেছে বিরোধীরা। ঘোষণা করা হল দীর্ঘকালীন জনমোর্চা। জনতা ফ্রন্ট! সেই মঞ্চ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, ইন্দিরা গান্ধী এখনও যদি প্রধানমন্ত্রী পদে কাজ চালিয়ে যান, আমরা সেটা তাঁকে করতে দেব না। অসহযোগ এবং আইনঅমান্য চলছে জেলাসদর শহরে এবং সমস্ত রাজ্যের রাজধানীতে। কয়েকলক্ষ ভলান্টিয়ার আসছে। পরের সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করবে তারা। স্তব্ধ করে দেওয়া হবে সরকারকে।

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন সন্ধ্যায় বিরোধীরা যখন পরদিন থেকে বৃহত্তর জন আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ততক্ষণে একটি ড্রাফট তৈরি হচ্ছিল ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনে। প্রধানমন্ত্রী পরদিন সকালে রেডিয়োয় যে বক্তৃতা দেবেন তার ড্রাফট। সেই বক্তৃতায় জানা গেল ২৫ জুন মধ্যরাত থেকে ভারতে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা!

প্রভাসকে যেতে হবে রায়পুরে সন্ধ্যাকে নিয়ে। অনেকটা পথ। সন্ধ্যার শরীর ভালো না। সে গর্ভবতী। তাকে হাসপাতালে দেখানো দরকার। সাধন কম্পাউন্ডার বলেছে কোন হাসপাতালে যেতে হবে। কয়েকদিন ধরেই সন্ধ্যা বারবার অচেতন হয়ে যায়। সন্তান প্রসবের এখনও সময় হয়নি। সন্ধ্যার ব্যাপারটায় একটু লজ্জা লাগছে।

বাবু এখন আঠেরো বছরের প্রাপ্তবয়স্ক। এই বয়সে মায়ের সন্তান হওয়া ভাবতে তার কেমন লাগবে?

রায়পুরে বাস থেকে নামতেই প্রভাস দেখতে পায় কেমন একটা জটলা চলছে এখানে ওখানে। কী ব্যাপার! দোকানপাট যেমন খোলা থাকে, তেমন নয়। বেশি পুলিশ মোতায়েন। এমনিতে এই জগদলপুর থেকে রায়পুর বা ভিলাই থেকে বিলাসপুরের সবথেকে বড় সমস্যা শহরে যাওয়া। ভোপালে সব সুবিধে। রাজধানী বলে কথা। বাকি অংশ পড়ে আছে অবহেলিত হয়ে।

ন্যাশনাল হাইওয়ে জগদলপুর বিজাপুর হয়ে বিশাখাপত্তনম গেছে, সেই দিকে হয় থাকে আদিবাসী, নয় কিছু উদ্বাস্তু। এই দুই সম্প্রদায় কি আর মানুষ পদবাচ্য! এই মধ্যপ্রদেশের মানুষ দুই দলের ভাষা বোঝে না, রীতিনীতি জানে না। আদিবাসী আর বাঙালি, তাদের কাছে সব সমান। রায়পুরেও বড় বড় হাসপাতাল নেই। তবে সুফলা আছে। সাধন কম্পাউন্ডারের মেয়ে। হাসপাতালে সে থাকবে। বলা আছে তাকে।

বাস থেকে নেমে প্রভাস সন্ধ্যাকে বলল, হাঁটতে পারবে?

সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বলল, পারবে।

প্রভাস বলল, আচ্ছা, আগে একটু বসে নাও।

চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়ল সন্ধ্যা। দু-কাপ চা দিতে বলল প্রভাস। অনেক পথ পেরিয়ে আসা। ভোরে রওনা দিয়ে। বিকেল হয়ে গেল। আজ আর ফেরার বাস পাওয়া হবে না। সুফলাদের বাড়িতে আজ থেকে কাল ফেরা। রেডিয়ো বাজছে। কিছু মানুষ উদ্‌গ্রীব হয়ে রেডিয়োর সামনে বসে। দোকানিদের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা।

কেয়া হুয়া ভাই? প্রভাস ভাঙা হিন্দিতে বলল।

দোকানি বলল, আপৎকাল লাগু হুয়া।

আপৎকাল? ইয়ে কেয়া হোতা হ্যায়?

প্রভাসের প্রশ্নের উত্তরে দোকানি মাথা নাড়ে। আপৎকাল মানে জরুরি অবস্থার মানে সে জানে না। তবে পুলিশ যেভাবে হঠাৎ রাস্তায় নেমেছে, এমন থমথমে ভাব যে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না এটা হলে কী হয়!

সন্ধ্যা আর পারছে না। পেটে ব্যথা হচ্ছে। সে বেঞ্চিতেই শুয়ে পড়ে। দোকানি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বলে, ভাবীজি কা তবিয়ৎ খারাব হ্যায় কেয়া?

প্রভাস বলে, হাঁ ভাই! হাসপাতাল যানা হ্যায়।

দোকানি তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসে। অদূরেই ছিল ভ্যানরিকশা। সেই ভ্যানে চাপিয়ে সন্ধ্যাকে নিয়ে রায়পুর জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছল প্রভাস। ইমার্জেন্সিতে অপেক্ষা করছিল সুফলা।

তিন ঘণ্টার মধ্যে দৃশ্যটা পালটে গেল। রায়পুরে স্টেট জেনারেল হাসপাতালের লেবার রুমে অচেতন সন্ধ্যার শরীরের পাশে তখন সদ্যোজাত এক শিশুকন্যা! সন্ধ্যাকে রক্ত দিতে হচ্ছে! অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। প্রিম্যাচিওর বেবি।

সন্ধ্যা বাঁচবে তো? প্রভাস দিশাহারা। ভাবছে এত বড় ক্ষতি নিশ্চয়ই হবে না। মাকে কীভাবে জানাবে? সন্ধ্যাকে ছেড়ে সে এখন যেতে পারবে না! বাসও বন্ধ।

সুন্দরপুরে তপু আর সুধাময়ী বাড়িতে একা। সুধাময়ীর মনে উদ্বেগ। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, বউমার কয়েকদিনের মধ্যেই বাচ্চাটা হয়ে যাবে। অথচ মহেন্দ্র ডাক্তার সময় হয়নি বলেছে।

এদিকে আজ ফকির নেই। ফকিরচাঁদ জগদলপুর কাঠের মূর্তি নিয়ে গেছে। তপু ঘরে ঢুকে সুধাময়ীকে বলল, কোপাদাদাদের পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছে।

সুধাময়ী বলেন, ক্যান? কোপারে পুলিশ ধরবে ক্যান! কী করছে সে?

ওদের সবাইকে—দাদাকে, মাকে, বউদিকেও, গ্রামের অনেককে ধরে নিয়ে গেছে। শুধু মায়েরা আছে।

সুধাময়ী বলেন, কী সব কইস!

তপু হাঁফায়। সে শুনে এসেছে একটু আগে যে আদিবাসী পাড়ার বাইরে এসেছে পুলিশের গাড়ি।

তপু বলল। ওদের থেকে টাকা চায় পাটোয়ারি।

সুধাময়ী বলেন, টাকা চায়? জঙ্গলে তো অরা বরাবর যায়। টাকা চায় ক্যান?

তপু এর বেশি কিছু জানে না। সুধাময়ী বাইরে আসেন। দেখতে পান অদূরে জটলা।

হঠাৎ আঙ্গাকে দেখা যায়। ছুটে আসছে। তপু…তপু…তপু…। তপুকে ডাকছে। এক দৌড়ে তপু বেরোল। জটলা করা মানুষগুলোও চলে আসে বেড়ার গেট খুলে। আঙ্গা হাঁফাচ্ছে। বলল, দাদাদের মারধর করছে পুলিশ। ঘিরে ফেলেছে গ্রাম।

সুধাময়ী হঠাৎ নিরাপদকে ডাকেন, নিরাপদ! আমাদের কোপার কাছে যাওন লাগব!

নিরাপদ ইতস্তত করে। সে বলে, জেঠিমা ওরা নিশ্চয়ই কিছু চুরি-চামারি করেছে। পুলিশ এমনি এমনি আসবে?

আঙ্গা চিৎকার করে উঠল, না, না, না, আমার দাদারা কেউ চোর না। আমরা কেউ চোর না। আমাদের পাটোয়ারি ঢুকতে দেয় না জঙ্গলে। কাঠ আনা, মহুয়া কুড়ানো সব বন্ধ। ঢুকতে গেলে টাকা চায়। মেয়েদের টেনে নিয়ে যায়।

সুধাময়ীর রক্ত ছলকে ওঠে। তিনি বলেন, কোপারাম আমাগো এহেনে সারাদিন খাটে। পেত্থম দিন থিইক্যা আমাগো সাথে আছে। এই আঙ্গা, আমার তপুকে বাঁচাইছে। এসব ভুলে যাব নিরাপদ?

নিরাপদ বলেন, আপনি কীভাবে যাবেন জেঠি? আমরা যাচ্ছি। আপনাকে আমরা খবর দেব।

সুধাময়ী বলল, তোমরা দল বাইন্ধ্যা যাও। তোমগো যেন কোনও ক্ষতি না করে।

নিরাপদ বলে, আপনি চিন্তা করবেন না। তবে চুরি-টুরির কেস হলে—

সুধাময়ী মুখ শক্ত করে বললেন, নিরাপদ আমার এই চোখ দুইখান অনেক কিছু দ্যাখলো এই জীবনে। তাই আমার চোখ ভুল করে না। কোপারাম চোর হইতে পারে না। হাড়ভাঙা পরিশ্রম কইব়্যা যায় পাহাড়ে। কাঠ আনে, মহুয়া আনে। আমাগো ফকিরচাঁদ অদের লগে যায় কখনও সখনও। আদিবাসীদের কাছে জঙ্গলই ঘরবাড়ি। তাদের আইজকাল জঙ্গলে যাওনের জইন্য পাটোয়ারি টাকা দিতে কয়?

নিরাপদ বলে, হ্যাঁ জেঠিমা, সেটা আমিও শুনেছি। মাঝখানে একবার তুলুং আর ভীমা গ্রামের হালবা গোন্দিরা পুলিশ থানায় মিছিল করে গিয়েছিল। তারপর কী হয়েছে জানি না।

হঠাৎ সার্চলাইটের তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। পরপর দুটো জিপ এসে থাকে। পুলিশ নামে জিপ থেকে।

তারা আঙ্গাকে লক্ষ্য করে বলে, বেরিয়ে আয়!

আঙ্গা এক দৌড়ে ভিতরে চলে যায় ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে। সুধাময়ীকে গ্রাহ্য না করে আঙ্গাকে ধরতে দুজন কনস্টেবল ঘরে ঢোকে। যেখানে ঠাকুর আর শ্রীমাকে একটু আগে পুজো করেছেন সুধাময়ী। তিনি স্তম্ভিত।

সুধাময়ী ঘরের সামনে যান। কনস্টেবলরা আঙ্গাকে টানতে টানতে বাইরে আনছে। সুধাময়ী বলেন, ও কী করেছে? অরে ক্যান লইয়া যাও?

পুলিশ সুধাময়ীর কথা বুঝতে পারে না। তারা হিন্দিতে কিছু বলে।

নিরাপদ ততক্ষণে ছুটে গিয়ে কয়েকজনকে খবর দিয়েছে। অনেকেই ছুটে আসছে। প্রভাসের বাড়ির সামনে তারা জড়ো হয়ে গেল। বাইরে পুলিশের জিপ।

নলিনাক্ষ বলে, এইসব কী হাবিলদার সাহেব?

হাবিলদার জানিয়ে দেয়, এরা থানায় ইট-পাটকেল ছুড়েছিল। আগুন ধরানোর ভয় দেখিয়েছে। বনকর্মীদের মারধর করেছে। এদের গোটা গ্রাম অ্যারেস্ট করার অর্ডার আছে। ল অ্যান্ড অর্ডারের ব্যাপার। নয়তো বড় কিছু হবে। আর তাছাড়া দুজন বাইরের লোক ছিল তুলুং গ্রামে। তাদের থাকতে দিয়েছিল। এই মেয়েটার বাড়ির লোকও হতে পারে।

কারা তারা? দুজন লোককে থাকতে দেওয়ার জন্য গোটা গ্রামকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হবে?

এবার জিপ থেকে নামে এক অফিসার। সে বলে, সেই দুজন তোমাদের এই এলাকায় ঢুকলে তোমাদেরও ক্ষতি। তাই এদের সাপোর্ট করবে না। তারা কারা জানো? তোমাদের যেখান থেকে এখানে এসেছিলে, সেই পশ্চিমবঙ্গের পাপের একটা অংশ।

নলিনাক্ষ এবার ভয় পেলেন। বললেন, স্যার কী বলছেন? কীসের পাপ?

অফিসার বলে, সিপিআইএমএল নামটা শুনেছ? কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট?

নলিনাক্ষ মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ। সে তো নকশাল! তারা তো সব খতম!

অফিসার বলল, খতম! তারা রক্তবীজের ঝাড়। অন্ধ্রপ্রদেশের সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন কমিটির এই দুই কুত্তা এদিকে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে এসেছে। আমরা খবর পেয়েই এসব গ্রামে স্পাই লাগাই। তুলুং গ্রামে এসেছিল তারা দুজন। ওদের বাড়িতে থেকেছে। তারপরই থানায় অ্যাটাক করার সাহস পেয়েছে গ্রামের এইসব আদিবাসী। এই বীজকে এখনই ধ্বংস করতে হবে।

নলিনাক্ষ কোনও কথা বলতে পারছেন না। নকশাল! এখানে?

অফিসার বলে, ওই বুড়িকে বলো কোনও ঝামেলা না করতে। আমাদের হাতে মেয়েটাকে তুলে দাও। তোমরা রিফিউজি। ফালতু ঝামেলায় জড়িও না।

নলিনাক্ষ এগিয়ে গিয়ে সুধাময়ীকে কিছু বললেন।

সুধাময়ী এক ঝটকায় আঙ্গাকে ছিনিয়ে নিলেন। আঙ্গা কাঁদছে।

সুধাময়ী বললেন, খবরদার! আমি বাঁইচ্যা থাকতি এই মেয়েরে কেউ নিয়া যাইতে পারবা না।

হঠাৎ অফিসারের চোখের ইশারায় সুধাময়ীকে ধাক্কা দিয়ে দুজন হাবিলদার আঙ্গাকে আবার ছিনিয়ে নিতে গেল। সুধাময়ী ছিটকে গেলেও একটা হাতে আঙ্গার হাত ধরে রইলেন।

তিনি ছাড়বেন না। চোখ বন্ধ করে তিনি শুধু শক্তি সঞ্চয় করছেন। আমার তপুরে যে মাইয়্যা বাঁচাইছে…আমাগো এই জমি যে দ্যাখাইছিল সেই আঙ্গা, কোপাদের হাত আমি ছাড়ুম না!

সুধাময়ীকে ওভাবে লড়াই করতে দেখে সাধন, নিরাপদরা আর স্থির থাকতে পারছে না। একজন বৃদ্ধাকে তিনজন পুলিশ এভাবে টানাটানি করবে?

নিরাপদ ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচাতে গেল সুধাময়ীকে। হঠাৎ অফিসারের চিৎকার শোনা গেল…হারামজাদোকো সিরপে মারো! চার্জ সিং! চার্জ…।

মুহূর্তে হাবিলদার লাঠি চালাল! লাঠি লাগল সুধাময়ীর মাথায়। একবার…দুবার…তিনবার…আঙ্গার হাত কোথায়? তপুর মুখ কোথায়? সুধাময়ীর চোখের সামনে যেন এই এতদিন পর শীতলক্ষ্যার জলস্রোত। মাথা থেকে নামছে সেই জলের ধারা। আঙ্গাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। সুধাময়ীর মাথা ধরে বসে পড়েছে তপু। সাধন কম্পাউন্ডার দৌড়োল ডিসপেনসারির দিকে। আবছা চোখে সুধাময়ী দেখলেন ফকিরচাঁদ ছুটে আসছে! তারপর আর দেখা গেল না। রক্তস্রোত ঢেকে দিল চোখকে।

সুধাময়ীর চোখের সামনে আর কিছু নেই। সবুজ সবুজ এক গন্ধওয়ালা পাতার ঝোপ। কীসের গন্ধ! কীসের পাতা! সুধাময়ী অনেক কষ্টে বুঝলেন, এ সেই তুলসীগাছটা। যুগীগঞ্জের বকুলপুরে উঠোনের এই তুলসীর ডাল তিনি নিয়ে এসেছিলেন কুমিল্লা থেকে।

কুমিল্লা রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোয় এবার আর যাওয়া হবে না? দুর্গাপুজো কবে? সুধাময়ী অস্ফুট স্বরে বলেন, লব…কুশ…সেই সেই গানটি যেন কী? শেষ লাইন…‘ভাবিতেছি মনে যাব তবে সনে / অচেনা অসীম আঁধারে’…এই তাহলে সেই অচেনা অসীম আঁধার?

সুধাময়ী হাসলেন অসীমের দিকে চেয়ে! আঁধার কোথায়? এ যে আলোকের ঝরনাধারা! আঁধারেও থাকে আলোর উদ্ভাস!

সুধাময়ী নিশ্চিন্তে সেই আলোকের ঝরনায় হাত বাড়ালেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *