৭
বিকেলে অশ্বত্থতলায় মিটিং। যত মানুষ আসার কথা তত লোক আসেনি। লতিফ নিজে গিয়ে সারাদিন ধরে গ্রামের সকলকে বলে এসেছে। হিন্দু মুসলিম দু’পক্ষকেই। তবে সুখের কথা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পূর্ণ বয়কট করছে এমন নয়। অনেকেই এসেছে। এমনিতেই এখানে হিন্দু কম। তাই বেশিরভাগই এসেছে।
লতিফ, প্রভাস, রমাপদ সামনে। মেয়েদের আসতে বলা হয়নি। যেরকম থমথমে ভাব, তাদের বাইরে না আসাই ভালো এখন।
লতিফ বলল, সবার আগে কইয়া রাখা যাক যে, এইহেনে মোরা কোনও ঝুটঝঞ্ঝাট চাই না। কোনওরকম না। এইডা আপনেরা হগ্গলেই মনের মইধ্যে ঢুকাইয়া ফ্যালেন। আমাগো ভড়কাইয়া মারামারি কাটাকাটি কারা লাগাইত্যাছে! আমাগো নিজের লোক কেউ না। হঠাৎ বাইরের লোকগুলোর আমাগো গেরামের উপর দরদ উছলাইয়া ওঠল এডা কি পিত্যয় হয়! এইডা সম্ভব না।
লতিফ বলছে, এতগুলো বচ্ছর একলগে রইলাম। আমাগো কেউ কারো বাসায় যাওনের সময় ভাবছি নাকি যে অখন আমি হিন্দুদের বাসায় যামু! নাকি ভাবছি কুশের বাসায় যামু! যে আমার পাড়ার লোক। কল্পনা খালার বাসায় যাই। তারাও আমাগো বাসায় যখন মন চায় আইছে। কোথাও কুন কাশ্মীরে কী হইছে, আমাগো এখানে আগুন জ্বালায় ক্যান? তাই ভাইয়েরা আপনেরা এখানে শপথ নিয়ে বলেন, আমরা কাউরে এই গেরামে আগুন জ্বালাইতে দিমু না।
আরিফুল উঠে বলল, লতিফ ভাই, যারা আইছে তারা ফের আসবে। অগো সাথে মৌলানা সাহেব হোসেনচাচারা আছে এইডা তো তুমিও জানো!
আমরা অগো কীভাবে বাধা দিমু?
লতিফ বলল, আমরা পাহারা চালু করুম। বাড়ির পুরুষ মাইনষেরা দিনে রাতে গেরামে ঢোকার মুখে আর গেরামের মইধ্যে টহল দেওয়া লাগব। কে কখন কীভাবে পারবা, সেটা জানায়ে দাও। কয়েকদিন এই পাহারার খবর বাইরে চাউর হইলে কাজ হইব।
আরশাদ স্থানীয় আউটপোস্টে গিয়েছিল পুলিশকে খবর দিতে। কিন্তু দেখা গেল কোনও পুলিশ আসেনি। তবে একজন অচেনা মানুষ একটু দূরে দাঁড়িয়ে সাইকেলে। তাকে দেখেই বোঝা গেল সে একজন চর। তবে কাদের চর সেটা জানা গেল না। পুলিশ পাঠিয়েছে? নাকি মওলানার দল?
জামিরউদ্দিন উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, আমাগো এইসব পাহারা দেওনের কাম কি আসে? এইডা তুমি কী কও! ঘরসংসার, চাষের কাম, গোরু মাঠে লওয়া যাওয়া এইসব কেডা করব তাইলে! অরা আইস্যা একবার হামলা কইরলে আমাগো আর উপায় কী?
লতিফ একটা শ্বাস ফেলে বলল, জামির, তোমরা শুরুতেই যদি এইভাবে ভাবতে থাকো, তাইলে করনের কী বাকি থাকে সেইডা বোঝাও। কিছু না কইব়্যাও তাইলে বইস্যা থাহি। দেখি কবে হিন্দুরা চইল্যা যায়। আমাগো তো শরীলে আঁচ লাগব না। আমাগো ঘরে আগুন দিবে নাই। তয় একটা কথা কও, মনেও কি কামড়ানি লাগব না? ধর্মের কারণে হানাহানি কইব়্যাদ আমাগো গেরামকেও পশ্চিম পাকিস্তান বানাইয়া দিমু আমরা? এইডা চাও?
মওলানার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সুরাবর্দীর এসব হিন্দুপ্রেম মোটেই ভালো লাগছে না। সে এসেছে মজা দেখতে। কারণ একবার যখন বিতাড়ন শুরু হয়েছে, তখন সেই একই বিতাড়ন এই গ্রামেও হবে না কেন? এতকাল হয়ে গেল দেশভাগ, গ্রামে গ্রামে হিন্দুরা ভয় পাচ্ছে, তাদের ধরে ধরে আল্লা হো আকবার বলতে বাধ্য করা হচ্ছে, ভয়ে মেয়েদের অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিংবা মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এটা এই গ্রামে দেখা যায়নি একবারও। সুরাবর্দীর অনেকদিন ধরেই ইচ্ছা এসব দেখার। তাঁর একটা কারণও আছে।
রতনের বউ তপতীর উপর তার খুব লোভ। রাস্তাঘাটে কথা বলার সময় সে আড়ে আড়ে দেখতে থাকে সেই শরীর। এই তো একটা সুযোগ এসেছে। এমনিতে তো পাওয়া যাবে না। এই দাঙ্গাহাঙ্গামার গোলমাল একবার এ গ্রামেও শুরু হলে তপতীকে পাওয়া যাবে। তাই অবদমিত সেই আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে সুরাবর্দীর মধ্যে। এবার গ্রামে ঝামেলা বাধলেই ঠিক করেছে সে টার্গেট করবে তপতীকে। সেই হাঙ্গামার পথ বন্ধ করে দিতে চায় লতিফ? এটা হতে দেওয়া যায় না।
সুরাবর্দী তাই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আরে মিয়া, তুই পাকিস্তানের মানুষ না? পাকিস্তান তর দ্যাশ না? তাইলে এইসব কী কথা কস? এমন কথা কইছস জানি পশ্চিম পাকিস্তান অইন্য কোনও দ্যাশ। আমরা এক দ্যাশ। মালাউনদের মতোই তর মনের অর্ধেক কি ইন্ডিয়ার জইন্য কান্দে নাকি? তুই এত বড় বড় কথা কচ্ছিস, কইলকাতায় কী হচ্ছে খবর রাখস? সেখেনে যে হাজারের বেশি মুসলমানরে কোতল করেছে হিন্দুরা সে খবর পাইছ? তর এই হিঁদুয়ানি বর্ডার পেরিয়ে দেখাইতে যা। এহেনে আছস ক্যান!
আরশাদ লাফ দিয়ে উঠল। বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন সুরাবর্দীর ঘাড়ে। ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে গেল সামনে। আর প্রবল জোরে একটা চড় মারল। লতিফ জানে, আরশাদের মাথা গরম। কিন্তু কিছু বাধা দেওয়ার আগেই এরকম কাণ্ড যে ঘটাবে লতিফ সেটা বোঝেনি।
যখনই আরশাদের চড় খেয়ে গালে হাত দিয়ে হতভম্বের মতো তাকিয়ে রয়েছে সুরাবর্দী তখনই রমাপদ উঠে এল সামনে। দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল, এসব না…এসব না….ছাড়ান দে…ছাড়ান দে…। সুরাবর্দী পিছন থেকে ধাক্কা দিল রমাপদকে।
হুমড়ি খেয়ে রমাপদ পড়ে যেতেই প্রভাস সামনে এসেই সুরাবর্দীর কাঁধে হাত রেখে ধাক্কা দিল। সামান্য ধাক্কা। পড়ে যাওয়ার মতো নয়। তবু সুরাবর্দী একটু টলে যাওয়ায় লতিফ হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে চেষ্টা করল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল দ্রুত সেই হাত সরিয়ে সুরাবর্দী তৎক্ষণাৎ মাটিতে পড়ে গেল। বোঝাই গেল যে ইচ্ছাকৃত। আর সঙ্গে সঙ্গে সে সেই অবস্থায় চিৎকার করে বলল, মাইব়্যায় ফেলাইল আমারে…মাইব়্যাছ ফেলাইল আমারে…।
একটু দূরে সেই সাইকেলে এতক্ষণ ধরে বসে থাকা লোকটা এক নিমেষে প্যাডেল করে নিঃশব্দে চলে গেল। সে এই সময় ঘটনাটি দেখেই দ্রুত সরে পড়ছে কেন? তাকেও মারধর করা হবে এই ভয়ে নাকি এই খবর কাউকে দিতে যাচ্ছে?
মাটি থেকে উঠে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি সুরাবর্দী। সে দৌড়চ্ছে। আর চিৎকার করছে, হিন্দুরা অ্যাটাক করতেছে…হিন্দুরা অ্যাটাক করতেছে…।
ঘটনার আকস্মিকতায় এবং মূলত সুরাবর্দীর ওই চিৎকারের ভাষা থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেল নিমেষে যে, এটা একটা প্ল্যান। অর্থাৎ প্রচার করে দেওয়া হবে যে, হিন্দুরাই মুসলমানকে মেরেছে। আর তারপর কী হবে সেটা সহজবোধ্য। লতিফের কয়েক সেকেন্ড লাগল বুঝতে। সে আরশাদকে বলল, পিছু পিছু যা আরশাদ…বজ্জাতটার ধান্দা খারাপ। লোক জড়ো করতে যায়। অরে পাকড়াও কইব়্যা রাখ। সিধা নিয়ে যাওন লাগব কাউন্সিল অফিসে।
আরশাদ দৌড়ল। কিন্তু মিটিং আর জমছে না। এরপর প্রভাস রমাপদ, জামিরুদ্দিনদের কিছু বলার কথা ছিল। কিন্তু বোঝা গেল সকলের মন যেন সুরাবর্দীর পিছনে পিছনেই ছুটছে। হিন্দুদের মধ্যে যারা উপস্থিত ছিল তাদের আশঙ্কা হোলো যে সুরাবর্দীর ওই কথাগুলো শুনে এবার মুসলিম গ্রামবাসীরা ছুটে এসে তাদের কিছু করবে না তো!
আজ থেকে কয়েকদিন আগেও এরকম ভাবনা মাথায় আসত না এই গ্রামের হিন্দুদের। কিন্তু এখন হচ্ছে। এটাই চায় দাঙ্গাকারীরা।
এই যে দেশে প্রভাসেরা আজ সংখ্যালঘু, সেখানে এই তো মাত্র সতেরো বছর আগেও তারা ছিল সংখ্যাগুরু। যখন ভারত অখণ্ড ছিল। শুধুমাত্র মানচিত্রে কয়েকটি কাঁচির দাগ লক্ষ লক্ষ হিন্দুদের সংখ্যালঘু করে তুলল, এতকালের পাশাপাশি থাকা মুসলিমদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তৈরি হল অবিশ্বাসের সম্পর্ক। তবু এই গ্রামের উপর হয়তো মা শীতলক্ষ্যার আশীর্বাদ আছে। তা আজ পর্যন্ত এখানে প্রবেশ করেনি সেই অবিশ্বাসের ছোঁয়াচে মহামারি। অবশেষে তা ঢুকল। অথচ এই দেশেই লতিফ আরশাদের মতো অসংখ্য মুসলিম আছে যারা হিন্দুদের বিদ্বেষের চোখে দেখেই না। তাদেরই বরং রক্ষা করতে নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করছে। তাহলে সর্বদাই খারাপ মানুষই সংখ্যায় বেশি হচ্ছে কেন? কেন তারা জিতে যাচ্ছে?
লতিফ, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ হা হা হা হা করে শব্দ! দেখা গেল যেদিকে সুরাবর্দী ছুটেছে, আর তার পিছনে দৌড়েছে আরশাদ, তার উলটোদিক থেকে ছুটে আসছে একটি বাহিনী। অনেকের হাতে লাঠি। আর উদ্যত তরবারি।
লতিফ বিপদের আঁচ পেল। আরশাদকে সুরাবর্দীর পিছনে পাঠানো ভুল হয়েছে। আরশাদ অনেক আগ্রাসী। সে থাকলে এই আক্রমণের জবাব দেওয়া যেত। কিন্তু সে ছুটেছে অন্যদিকে। সুরাবর্দী গ্রামের মধ্যে ঢুকে মুসলিমদের প্ররোচিত করার চেষ্টার জন্য ছুটে গিয়েছে। সেই উস্কানি শুনে না হয় কিছু মানুষের মধ্যে পালটা আক্রমণের একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যেদিকে সুরাবর্দী গিয়েছে, তার বিপরীত প্রান্ত থেকে কীভাবে এইসব লোক আসছে? লতিফের মনে পড়ল, সাইকেলের লোকটা কিন্তু এই দিকেই গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। তার মানে সে খবর দিয়েছে। আর এরা এতক্ষণ অনতিদূরে অপেক্ষা করছিল? সবটাই একটা চক্রান্ত?
লতিফ চিৎকার করে বলল, পালা তোরা কুশ…পালা রমা…পালা পালা পালা…রতন, মাণিক, মন্টু সব পালা বাড়ির মইধ্যে চইল্যা যা!
লতিফ একটা পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে একাই ঠেকাবে ওই বাহিনিকে। তার হাতে উদ্যত লাঠি। বাঘের মতো সে লাফ দিতে দিতে সেই লাঠি ঘোরাচ্ছে। আর বলছে, হগ্গলে আমারে মাইব়্যা ফ্যাল। আমি তার আগে একজনকে মারুম। কে হইবি সেডা? তরা ঠিক কইব়্যা ল! আয় আউগায় আয়!
সামনে রশিদ ছিল। সে বলল, লতিফ আজ তরে কেউ বাঁচাইতে আসি নাই! আজ তুই আমাগো লোক না!
লতিফ বলল, তগো লোগ হওয়া মানে হিন্দুগো মাইরতে হইব! এই কইতে চাস তো? আমি যদি তগো লোগ একবার হইয়া যাই, তর দাদাগিরি কুথায় যাইব ভাবছস?
রশিদ লাঠি চালাল শূন্যে! লতিফ এক লাফে রশিদের মুখের সামনে এসে নিমেষের মধ্যে লাঠি ফেলে দিয়ে, একটা ছুরি বের করে আনল পাজামার পকেট থেকে। লতিফের অনুমান ছিল এই মিটিং খুব একটা সফল হোক এটা চাইবে না মৌলভির দল। তাই অন্তত আত্মরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে কী মনে করে পাজামার পকেটে একটা ছুরি এনেছিল।
একহাতে ধাক্কা মেরে রশিদের হাতের লাঠি ফেলে দিল লতিফ। আর ছুরিটা রশিদের গলায় ধরে সামনে থাকা বাকি বাহিনির দিকে তাকিয়ে বলল, এরে সবার আগে কোরবানি করি? কী কস তোরা?
এই আকস্মিকতায় রশিদ হতভম্ব। একটু আগেই সে সঙ্গে থাকা বাহিনির বলে বলীয়ান হয়ে ভেবেছিল লতিফকে কবজায় পাওয়া গিয়েছে। এবার লতিফকে একটা বড়সড় শিক্ষা দেওয়া গেলে শুধু যে লতিফ শায়েস্তা হবে তাই নয়! গোটা গ্রামে যে সব মুসলিম আজও হিন্দুপ্রীতিতে আচ্ছন্ন, তারা ভয় পাবে। আর কোনও দ্বিতীয় লতিফ এগিয়ে আসবে না তাদেরকে বাঁচাতে।
রশিদের গলার উপর একটু একটু করে লতিফের ছুরি বসছে! অনতিদূরে এই দৃশ্য দেখে উদ্যত বাহিনি থমকে গেল। তাদের মধ্যে কেউ চিৎকার করে বলল, লতিফ ভুল করিস না।
লতিফ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তরা ভুল করিস না! কী রে রশিদ, তুই যাগো লগে আইছস, তুই নিজেরে যাদের লোগ ভাবস, তারা তরে মরতে দেইখ্যাও যে আউগায় আসে না রে! তর প্রাণ তো এরা রক্ষা হোক এডা চায় না। আমি আর কী করুম ক দেহি!
হঠাৎ ছুটে আসে প্রভাস আর রমাপদ। ঠ্যাঙাড়ে বাহিনির সামনে। লতিফকে আড়াল করে।
লতিফ বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে, কুশ! রমা! তদের পলাইতে কইছি! পলায় যা! তদের কিছু হইলে এই শকুনের দল তগো বউরে ছিঁড়ে ধাবে! রমা তর বুনরে বাঁচাইতে পারবি না এগো হাত থিহে! পলা…পলা…
রমা বলল, তুই থাম লতিফ! তুই একা একা এহেনে মরবি! আর আমরা পলায় যাব?
হঠাৎ পিছনে জোরদার চিৎকার। আরশাদের সঙ্গে একঝাঁক মানুষ গ্রামের ভিতর থেকে ছুটে আসছে। আরশাদের শক্ত হাতে একটা লোকের হাত ধরা। যাকে আরশাদ টেনে নিয়ে আসছে। এ হল সেই সুরাবর্দী। তাকে ধরে ফেলেছে আরশাদ! গ্রামের মানুষকে সুরাবর্দী চিৎকার করে জড়ো করে বলছিল, হিন্দুরা অ্যাটাক করেছে। তোমরা সব হিন্দুদের বাড়ি বাড়ি যাও। আগুন লাগাও চালে খড়ের গাদায়! একটা উত্তেজনা তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। অনেকেই বেরিয়ে আসে লাঠি বল্লম নিয়ে।
কিন্তু আরশাদ সময় মতো পৌঁছে সুরাবর্দীকে ধরাশায়ী করে আবার মিটিংয়ের দিকে নিয়ে আসছিল। আর মুসলমান গ্রামবাসী যারা জড়ো হয়েছিল সুরাবর্দীর কথায়, তাদেরকে আরশাদ হাঁক দিয়ে বলেছিল, তরা সব আমার লগে আয়! দ্যাখ আসলে মিটিংয়ে কী হইত্যাছে, এই শুওরটার কথায় নাচস না! সেই গ্রামবাসী এখন সুরাবর্দীর পিছনে।
আরশাদ এসেই এক ধাক্কায় সুরাবর্দীকে মাটিতে ফেলে দিল। আর তারপর সামনে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ তার চোখে পড়ল আশ্চর্য দৃশ্য। রশিদের গলায় ছুরি ধরে আছে লতিফ। ঠিক সামনে প্রভাস আর রমাপদ। আর তাদের ওপ্রান্তে একদল মানুষ। হাতে লাঠি আর তরবারি।
মুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝে ফেলল আরশাদ। এবার সে নিজের লুঙ্গির গিঁটে ভাঁজ করে রাখা একটা ছুরির ধারালো ফলা সুরাবর্দীর গলায় ঠেকাল। তারপর চিৎকার করে বলে, কী রে সুরাবর্দী? তোর চাচা খালা দোস্তের দল ওই দ্যাখ দাঁড়ায়ে আছে তোর এন্তেকাল চক্ষে দেখবে বলে। তৈয়ার হয়ে যা মরার জন্য।
সুরাবর্দীর চোখে মৃত্যুভয়। লতিফ যতটা ভয়ঙ্কর, তার থেকে অনেক বেশি সাংঘাতিক আরশাদ। লতিফ ভয় দেখাবে। আরশাদের মাথা গরম। সে যে কোনও সময় গলায় ছুরিও বসিয়ে দেবে। তাই জড়ো হওয়া লোকগুলো এবার পিছু হটবে মনে হচ্ছে। একবার শুধু পিছন থেকে বেরিয়ে এল আরিফ উদ্দিন। হোসেন সাহেবের জামাই। আরিফ হিসহিস করে বলল, লতিফ আরশাদ, মনে য্যান থাকে আজকের কথা!
লতিফ বলল, হেই আরিফ! তর শ্বশুররে কইয়া দাও এই গেরামে তার জমি বাড়ি দখল করার ব্যবসা চলব না। হিন্দুগো ভয় দেখাইয়া তাগো জমি বাড়ি দখল করার এইসব ছক হোসেন সাহেব যে সেই পার্টিশান থিইক্যা করতাছে, এসব বেবাক গেরাম জানে! আর তুমি হইছ শ্বশুরের পেয়াদা! কামকাজ করো না! হারামের টাকার ভাগ পাও! তাই তো! আমাগো শরীলের তাগদ দ্যাখো? ক্যান কও তো! খাটি আমরা। আর তদের অন্ন অইন্য লোগের ভাত মাইব়্যাদ আসে। বুঝছস! তাই সাহস থাকলে আউগায় আয়! ফণা তুলিস না! তগো মতো ঢোঁড়ারে মারতে ওঝার দরকার নাই! আমিই আছি!
সঙ্গে সঙ্গে সকলে পিছিয়ে গেল। আর আরিফের ক্রুর মুখেও যেন ভয়ের রেখা দেখা গেল। সে বলল, রশিদ আর সুরাবর্দীরে মাইব়্যা ফেলাইলে তরাও কি রক্ষা পাইবি ভাবছস?
লতিফ হেসে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, আরিফ, তুই অহনও বাচ্চা আছস। এরে মাইব়্যাছ আর তরে মাইব়্যাও যদি আমি বাশার সাহেবের কাছে গিয়ে কই তারেই এবার ইউনিয়নের ভোটে আমাগো গোটা গেরাম জিতাইবে, তহন বাশার সাহেবের দোয়ায় আমার সাত খুন মাফ! যে মৌলানার ক্ষ্যামতায় তোর এত লম্ফঝম্প, সেই মৌলানার আমাদের দরকার জেতার সময়। তুই অইন্য গেরামের মানুষ। তরে আর কোনও কাজে দরকার নাই মৌলানার।
আরিফ থমকে গেল। কোনও কথা বলল না। কারণ ততক্ষণে পিছন থেকে তার কাঁধে হাত রেখেছে শফিকুল মোল্লা। মুখে হাসি। বলল, লতিফ ভাই আসসালাম আলাইকুম। এত রেগে রেগে আছেন কেন? ঠান্ডা হয়ে কথা বলুন। আপনার বন্ধু তো এই হিন্দু ভাইয়েরা! আমাদেরও বন্ধু। কোনও চিন্তা নাই। কাউর কোনও ক্ষতি হবে না। রশিদ আর সুরাবর্দীকে ছেড়ে দিন। ওরা মোটা বুদ্ধির মানুষ। বোঝসোঝ নাই। আপনার মতো বোঝদার মানুষ থাকতে এই গ্রামের মানুষের চিন্তা কী! আমরাও চিন্তামুক্ত হলাম আপনার মতো মানুষকে দেখে।
শফিকুল বলল, আমরা চলে যাচ্ছি। আপনারা খুব মিলেমিশে, আনন্দে থাকেন। লাঠি-তরবারি নিয়ে আসা লোকগুলি শফিকুল মোল্লার দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। তাদের ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না, এটা কী হচ্ছে! সামনে প্রভাস, রমাপদের মতো হিন্দু এখানে উপস্থিত। আর তাদের সামনে এভাবে অভয় দান করার অর্থ কী? বরং এদেরই যখন সামনে পাওয়া গেল একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল! শফিকুল ভাই শেষে লতিফকে দেখেই ভয় পেয়ে গেল?
শফিকুলের কথায় আশ্চর্য হয়েছে লতিফও। কিন্তু সে দেখল একটা সুযোগ যখন পাওয়া গেল তখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তাই রশিদকে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে লতিফ বলল, ইসলামের নামে একটাও হিন্দুর দিকে চোখ দিছস কী তরে জহান্নামে পাঠাইমু। তরা বলদ! কীসের লগে কার হইয়া কেন এসব করছস সেইডা বোঝতেই পারস না। তরা যে গরিব সেই গরিবই রইয়া যাস। আর মুনাফা হয় হোসেন আর মৌলানাদের। যাহ ভাগ!
আরশাদও সুরাবর্দীর গলার কাছে এতক্ষণ ধরে রাখা ছুরি সরিয়ে বলল, ওঠ, এই অশ্বত্থতলার পেরোইয়া আর কখনও গেরামের দিকে যাবি না। শ্যাষবার হুঁশিয়ারি!
রশিদ আর সুরাবর্দী লাফ দিয়ে উঠে সরে গেল।
তারপর সে বলল, তোমরাও যাও। কোনও চিন্তা নাই। তোমাদের সঙ্গে ভরসা লতিফ আছে যখন, আর চিন্তা কীসের! লতিফের সামনে এসে দাঁড়ালেও এতক্ষণ প্রভাস আর রমাপদ চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আর অবাক হয়ে দেখছিল লতিফের একার লড়ে যাওয়া।
সকলেই অশ্বত্থতলায় বসল এবার। প্রভাস লতিফের কাঁধে হাত রাখল। লতিফ হাত ধরে বলল, কুশ, তর শরীলের ঘা শুকায়নি এহনও। এই অবস্থায় তর এভাবে ঝাঁপাইয়া পড়া ঠিক হয় নাই। এসব পুঙ্গির পূত আমারে কিছু করতে পারব না। তদের তাড়ানোই ওদের আসল কাজ।
প্রভাস বলল, লতিফ, তোকে তো ওরা একঘরে করে দেবে। মৌলানা তোকে মসজিদেও ঢুকতে দেবে না। এসব ভাবছিস না কেন? এতটা দরকার কী?
লতিফ জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে বলল, মানেডা কী? এই যে এরা আইছিল লাঠি তলোয়ার নিয়া এর কারণ কী? আজ তো তদের শ্যাষ কইরবার লাইগ্যাই আইছিল! কী হইত খালাম্মার? কী হইত সন্ধ্যার? বাবুর? ধর ওদের কিছু হইল না! তরে খতম করল। তারপর?
ততক্ষণে গ্রামের যে মানুষেরা মিটিংয়ে এসেছিল তারা জড়ো হয়েছে আশেপাশে। সুকুর ইসলাম বলল, লতিফ এইডা তো মানবি যে মওলানা আর হোসেনের সঙ্গে শত্রুতা কইর্যার আমাগো মতো মানুষ বাঁইচতে পারব না!
লতিফ শ্বাস ফেলে বলল, হের জইন্য গেরামের হিন্দুদের খেদায়ে দিতে চান চাচা!
সুকুর চুপ করে মাথা নিচু করল।
সেই রাতে আগুন লাগল গ্রামে। প্রভাসের বাড়ি থেকে শোনা গেল হইচই। আবার কোনও হিন্দুর বাড়িতে আগুন? প্রভাস বেরোবে? সন্ধ্যা দরজা আগলে বলল, যেও না! তোমাকে দেখলে মেরে ফেলবে। তার চোখে আতঙ্ক!
সুধাময়ী এসে দাঁড়ালেন নিজের ঘরের সামনে। শান্ত স্বরে বললেন, অরে আটকাইয়ো না! যাইতে দাও! আমাগো ঘরের আগুনে আইছিল হগ্গলে। আইজ যাদের ঘরে আগুন, তাদের পাশে যাওন দরকার। আর আমাগো মাইরতে চাইলে দরজা ভাইঙ্গাই মারতে পারে অরা। দোর আগলাইয়া কাদের ঠেকাবা বউমা! তুই যা কুশ! সুধাময়ীর গলা কাঁপছে না একটুও।
প্রভাস অবাক হল। এই মা সেদিনও বলেছিল, কেউ যেন বাইরে না যায়। হঠাৎ মায়ের কী হল?
প্রভাস বেরিয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। কোলাহলের দিকে এগোতে এগোতে দেখতে পেল দাউ দাউ আগুনের শিখা।
এ কী দেখছে? লতিফের বাড়ি জ্বলছে! সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই কানে এল হাহাকার আর কান্না!
