সন্ধিক্ষণ – ৫

সন্ধ্যার এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনগুলোর কথা। যশোর রোড আর সারদাবাবু রোডের মোড়ে ব্রজলাল কলেজের ছাত্র ফেডারেশনের নেতা নূরউদ্দিন থাকে দোতলায়। আর হাসানউজ্জমান নীচের তলায় একটা ছোট লাইব্রেরি চালায়। লাইব্রেরির নাম আজাদি। আজাদি লাইব্রেরিতে মেম্বার কম। বই আরও কম। হাসান আর শ্যামল বাড়ি বাড়ি ঘোরে সাইকেল নিয়ে। পুরোনো ছেঁড়া বই তারা সংগ্রহ করে। রোজ তা সম্ভব নয়। রবিবার আর ছুটির দিনে। কিন্তু খুলনার এই প্রান্তে আর সাধারণ মানুষের কাছেই বা কত বই থাকে! সুতরাং আজাদি লাইব্রেরির মধ্যে সবথেকে বেশি পাওয়া যায় পত্রিকা। যখনই কেউ অন্য জেলায় যায়, শ্যামল সকলকে বলে দেয় যাতে হাতে যে যা পত্রিকা পাবে যেন নিয়ে আসে। লাইব্রেরিতে রাখা হবে।

সারাদিনে যে যার কাজ শেষে মাঝেমধ্যেই হাসানের নীচের তলায় বসে আড্ডা দিতো। শ্যামল, হাসান আর নূরউদ্দিন। মাঝেমধ্যেই গল্পে এসে যোগ দিতেন বাবুলকাকা। ইউনিয়ন স্কুলের শিক্ষক। ঢাকা তখন উত্তাল। বাঙালিদের থেকে বাংলা ভাষাই কেড়ে নেওয়া হবে। রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের এই হুংকার চলছে সেই স্বাধীনতার সময় থেকেই। দেশের রাজনীতিই এই তিন তরুণের আলোচ্য বিষয়। সব ব্যাপারে যে সকলে সহমত হয়, তা নয়। কারণ, দেশের অংশ হয়েও যেন এই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। আজও মনে পড়ে কায়েদ এ আজম মহম্মদ আলির জিন্নার সেই ভাষণ। কী বলেছিলেন জিন্না?

একটা কথা স্পষ্ট করে বলছি শুনুন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অন্য কোনও ভাষা নয়। এই নিয়ে কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, তাহলে বুঝবেন সে রাষ্ট্রের শত্রু। একটিমাত্র রাষ্ট্রভাষা ছাড়া কোনও জাতির পক্ষে একই সূত্রে গ্রোথিত হয়ে পারস্পরিক সমন্বয় সাধন করা সম্ভব নয়। মহম্মদ আলি জিন্নাহ বললেন। এরপর জনতাকে প্রশ্ন করলেন,…আপনারা কি পাকিস্তানে বিশ্বাস করেন?

হ্যাঁ…হ্যাঁ…হ্যাঁ…।

আপনারা চান বাংলা কিংবা অন্য কোনও অংশ ভারত ইউনিয়নে চলে যাক?

না…না…না…।

…এই প্রদেশে এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, সেটা নিয়ে কিছু উত্তেজনার সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা প্রশাসনকে বিব্রত করার লক্ষ্যে ছাত্রসমাজকে ব্যবহার করছে। এসব বরদাস্ত করা হবে না।

….আমরা আমাদের রাষ্ট্রে বিশ্বাসঘাতক ঘরোয় শত্রুদের সহ্য করব না।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় দেওয়া বক্তৃতায় এভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে নস্যাৎ করে পাকিস্তানের রূপকার মহম্মদ আলি জিন্নাহ সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তাঁর এই ভাষণের পরই বাঙালি অস্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সিংহভাগ পূর্ববঙ্গবাসী স্তব্ধ হয়ে যান। এতদিন লিয়াকৎ আলি খান কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য নেতৃকুল বাংলা ভাষার এই দাবিকে নিয়ে তাচ্ছিল্যসূচক মন্তব্য করেছিলেন। পূর্ববঙ্গের অপেক্ষা ছিল, স্বয়ং জিন্নাহ কী বলেন দেখার। আশা করা হয়েছিল তিনি নিশ্চয়ই বাঙালির আবেগকে সম্মান দেবেন। জিন্নার কাছে এই উদার মনোভাব আশা করা যায়।

কিন্তু বোঝা গেল, জীবনযাপনের প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার পণ করেছে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। যে ভাবনার জনক জিন্না। আর তখন থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল, আসলে দেখতে একটা দেশ। কিন্তু দেশভাগের পর নতুন এই রাষ্ট্রেও আদতে একটি ফল্গুধারার মতোই রয়ে যাচ্ছে টু নেশন থিওরি! পশ্চিম পাকিস্তান সুয়োরানি। পূর্ব পাকিস্তান দুয়োরানি।

এখন ১৯৫২। শুধু ঢাকায় নয়, পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলা ভাষাকে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে আন্দোলন। রংপুর, মাদারিপুর, পাবনা সর্বত্র রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের শাখাকে ছড়িয়ে দেওয়া হল। বলা হল, যে যেমনভাবে পারবে সেভাবেই সভা করুন, সমাবেশ করুন।

সেইমতোই ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যুব লীগের কার্যকরী কমিটির বৈঠক রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের কর্মসূচিকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্থির হয় ২১ ফেব্রুয়ারি সারা বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে। এছাড়া ১১ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি হবে পতকা দিবস। হঠাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠি ফাঁস হল। জানা গেল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শেখ মুজিবুর রহমান এবং বরিশালের মহিউদ্দিন আহমেদ মুক্তির দাবিতে অনশন শুরু করেছেন। সংবাদটিতে একটা যেন বিদ্যুৎ চমকের অভিঘাত সৃষ্টি হল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তো আছেই। এবার রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতেও পাকিস্তান সরকারকে চেপে ধরতে হবে। বাংলার প্রাদেশিক সরকারকে বিশ্বাস করা যায় না। কারণ স্বয়ং পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ২৭ জানুয়ারি প্রকাশ্যে বলেছেন, উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। সুতরাং তাঁর কাছে সুবিচারের আশা করা যায় না। এবার লক্ষ্য আন্দোলন।

আমাগো কিন্তু চুপ করে থাকলে চলব না। নূরউদ্দিন বলল।

শ্যামল বলল, আলবৎ! খুলনা পিছিয়ে থাকবে কেন? বাঙালি হিসেবে আমাদের সকলের একটা দায়িত্ব যে, আমাদের এই খুলনার কণ্ঠও যেন পৌঁছে যায় করাচি ইসলামাবাদে।

হাসান বলল, আমরা কী করতে পারি? আমাদের তো কোনও সংগঠন নেই।

ক্যান! এইটা তরা কী কস? আমরা চারজনই তো সংগঠন! হঠাৎ বাবলুকাকার কণ্ঠ পাওয়া গেল। সকলে পিছনে তাকিয়ে দেখল দরজায় বাবলুকাকা। হাতে একগোছা কাগজ।

বাবলুকাকা ঘরে ঢুকে সেই কাগজগুলো দেখিয়ে বললেন, তদের কথাগুলোন শুনতেছিলাম। আমাদের এই শহরের মানুষ হয়তো চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ভুইল্যা গ্যাছে যে ভাষা আন্দোলনে আমাদের কতটা ভূমিকা আছিল! আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনে ছাত্র ফেডারেশনের স্বদেশ বসু, সন্তোষ দাশগুপ্ত, আনোয়ার হোসেন, এম এ গফুর, ধনঞ্জয় দাসেরা। কেউ কিন্তু এক বারের জইন্য চিন্তা করেনি যে তাদের কাছে সংগঠনের শক্তি আছে কিনা। আনোয়ার হোসেন তো রাজশাহী জেলে সিকিউরিটির গুলিতে শহিদ হইয়া গেল। তারা যেভাবে ঝাঁপায়ে পড়ছিল, আমাগো সেভাবেই ঝাঁপাইতে হইব।

শ্যামল উত্তেজিত হয়ে পড়ল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তাহলে কী করা উচিত?

বাবলুকাকা বলল, এই দ্যাখ, এগুলোন হইল সব নানারকম পত্রিকা, লিফলেট। এইগুলোয় লেখা আছে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হইলে বাংলার হাল কী হইব! স্কুলে অফিসে দপ্তরে, কোর্টে পরীক্ষায় সব জায়গায় উর্দুই হইব আসল ভাষা। এসব আমাগো ছড়ায়ে দিতে হইব। সবাই জানুক।

হাসান চুপ করে আছে। কোনও কথা বলছে না। তার দিকে তাকিয়ে নূর বলল, কী রে হইছে কী? কথা কস না যে!

হাসান বলল, যখন এই দ্যাশ ভাগ হইল, তখন ধর্মরে হয়তো মনে করছিলাম মিলন আর শক্তির আধার হইয়া আমাগো এক নতুন স্বপ্ন দিবে। মাত্র এই কয়েক বছরের মধ্যে চোখের সামনে এসব দেখে এখন আমরা বুঝছি যে ভাষা আরও শক্তিশালী। ধর্ম ছাড়াও একটা মানুষের জীবন চইল্যা যাবে। কিন্তু তার যদি কোনও মাতৃভাষা না থাকে? তার মাতৃভাষারে যদি জেলবন্দি করা হয়? এইডা কেমন স্বাধীনতা?

ঘরে একটা স্তব্ধতা নেমে এল। এই নিয়ে বেশি আলোচনা বিপজ্জনকও বটে। কারণ হাজার হোক এই ঘরে দুজন মুসলিম আর দুজন হিন্দু। শ্যামল আর বাবলুকাকা হিন্দু। সুতরাং তাদের পরিবারের কাছে দেশভাগ ছিল একটি বিয়োগের নাম। স্বজন, স্বজাতি, স্বধর্ম থেকে বিয়োগ। পক্ষান্তরে নতুন দেশ, নিজের দেশ এবং স্বধর্মের আবেগে নূরউদ্দিন আর হাসানদের পরিবারের কাছে দেশভাগ ছিল নয়া সংযুক্তির নাম। মুসলিমদের মধ্যে যোগস্থাপন। নতুন দেশ। একজনের কাছে যা বিয়োগ, অন্যজনের কাছে সেটাই যোগ!

হাসান একটা শ্বাস ফেলে বলল, আমরা তাইলে এই লিফলেট আর পত্রিকায় যা যা ল্যাখা আছে সেইগুলো নিজেরাই বাড়ি নিয়া গিয়া যত বেশি সম্ভব কপি করি। তারপর সেগুলো ছড়ায় দেওন দরকার।

সেদিন সকলকে ভাগাভাগি করে দেওয়া হল কাগজপত্র। সাদা কাগজ কিনে সেগুলোর মধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো লিখে বিলি করা স্থির হল। তবে তারা ছাড়া আর কেউ বিষয়টি নিয়ে ভাবছে না এমন নয়। বরং সর্বত্র একটা চাপা উত্তেজনা রয়েছে। হরতাল আর মিছিল ডাকা হয়েছে ২১ তারিখ। সেটা কেমন হবে? ঢাকা ইউনিভার্সিটি এ ব্যাপারে সবথেকে নাকি অগ্রগামী হবে।

হঠাৎ করেই কিছুদিন আগে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব হায়দারকে বদলি করে দেওয়া হল। হায়দার সাহেব ছিলেন বয়স্ক মানুষ। শান্ত আর ধীরস্থির ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া লোক। কিন্তু তাঁকে সরিয়ে দিয়ে আচমকা নিয়ে আসা হল এক কমবয়সি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস এইচ কোরেশীকে।

নয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকা শহরে ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে নোটিশে জানালেন, এই ১৪৪ ধারা এক মাসের জন্য বলবৎ করা হচ্ছে। সেদিনই সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা। নবাবপুর। আওয়ামি মুসলিম লিগ দপ্তরে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির বৈঠক। কিছুতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না যে, ১৪৪ নং ধারা ভঙ্গ করা হবে নাকি মেনে নেওয়া হবে?

অবশেষে তুমুল তর্কবিতর্কের পর ঠিক হল ভোটাভুটি হোক। ভোটে শান্তিকামীদের জয় হল, অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা উচিত নয় বলে যাঁরা মনে করেন। কিন্তু অন্য পক্ষ জানিয়ে দিল, ভোটাভুটি যাই হোক, আগামীকাল আমরা ১৪৪নং ধারা ভঙ্গ করব। দেখা যাক কী হয়!

২১ ফেব্রুয়ারি। সকাল সাড়ে সাতটা। ঢাকা শহরের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার সিদ্দিক দেওয়ান বড়সড় বাহিনী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এসে পজিশন নিয়েছেন। তিনি জানতে পারছেন, ছাত্ররা একা নয়। ছাত্রীর দলও বেরিয়ে আসতে পারে। সেরকম প্ল্যান। মেইন গেটের সামনে অবশ্য এসপি সাহেব আছেন। পি মাহমুদ ইদ্রিশ। মেডিকেল কলেজ গেটের সামনে একটা বাহিনী রাখা হয়েছে। আর সেলিমউল্লা মুসলিম হলের সামনে এগারো জন কনস্টেবলকে আর্মস সহ পোস্টিং করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তখনও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ও তার বিরোধিতা করা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতান্তর চলছে। একটা প্রস্তাব এল। দশ জন করে করে গেট থেকে বেরোনো হবে। যাতে কোনও বড়সড় অস্থিরতা অথবা অরাজকতার বার্তা না যায়। প্রতীকী প্রতিবাদ বলা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পুলিশ, প্রশাসন সরকার বলতে পারবে না যে ছাত্ররাই প্ররোচনা দিয়েছে অথবা আক্রমণ করেছে। এই সিদ্ধান্ত মনঃপূত হল সকলের।

সকলকেই বলা হল, যে যার রুমাল আগে ভিজিয়ে নাও। কারণ কাঁদানে গ্যাস ছুড়বে পুলিশ। চোখে ভেজা রুমাল চেপে ধরবে সকলে। তৎক্ষণাৎ স্লোগান উঠল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’…‘১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে’…

কোথায় যাওয়া হবে? পরিষদ ভবনের দিকে! অর্থাৎ যাকে আমরা বিধানসভা বলি। সেখানে সভা চলছে। সুতরাং, কিছুতেই ঢুকতে দেওয়া যাবে না। পুলিশ প্রস্তুত। গেট থেকে কয়েকটি ব্যাচের ছাত্ররা বেরোতেই গ্রেপ্তার করা হল। তবে ছাত্রীদের নয়।

হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটা হুড়োহুড়ি। এবার সকলেই বেরোতে চায়। পুলিশ আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়। বাধা দিল। ছাত্রদের দল ঢিল ছুড়ছে। আর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস। একটা চরম আতঙ্ক। কোনটা কাঁদানে গ্যাস আর কোনটা গুলি কে বুঝবে? শোনা গেল মেডিকেল কলেজের গেটের দিকে গুলি চলছে।

আবদুল জব্বারকে ফল কিনতে হবে। মেডিকেল কলেজের বাইরে এসেছেন তিনি। তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন। হঠাৎ ধরা পড়েছে শাশুড়ির ক্যান্সার। তাই ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসা। এক চেনা ছাত্রের সঙ্গে হস্টেলে থেকে যাচ্ছেন তিনি। আজ শাশুড়ির অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। জব্বারের মন ভালো নেই। অন্যমনস্ক হয়ে গেট থেকে বেরিয়ে দেখলেন মিছিল। আর দূরে পুলিশ পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মিছিল থেকে স্লোগান আসছে বাংলা আমার মাতৃভাষা…বাংলা ভাষার সম্মান চাই…ইত্যাদি। মাথাটা কেমন করে উঠল। মিছিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁদের কথা শুনছেন। ময়মনসিংহের এক গ্রাম থেকে মাত্র পনেরো বছর বয়সে জব্বার চলে গিয়েছিলেন বার্মায়। দশ বছর পর আবার ফিরে এসেছিলেন। ন্যাশনাল গার্ডে কাজও নিয়েছেন।

তাঁর মনে বাংলাভাষার প্রতি এক অদম্য টান। মিছিল দেখতে দেখতে হঠাৎ জব্বার মাটিতে পড়ে গেলেন। তাঁর গুলি লেগেছে। অনর্গল রক্তপাত। সিরাজুল ইসলাম আর হুরমৎ আলিরা ছুটে এলেন। জব্বারকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে। সময় পাওয়া গেল না। জব্বার আর নেই। তিনি প্রথম ভাষার জন্য শহিদ হলেন।

মেডিকেল কলেজের হস্টেল গেট অবরুদ্ধ করেছে পুলিশ। কিছুতেই তাদের হস্টেলে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছাত্রেরা। বীরভূম জেলার সিউড়ির সৈয়দ জাকির সাহেবের আত্মীয় আবুল বরকতকে আবাই নামেই সম্বোধন করেন তাঁর বন্ধুরা। মেডিকেল ছাত্র শামসূল বারি দেখলেন সেই আবাই মামু বারান্দার করিডর ধরে এগিয়ে আসছেন। কিছু একটা বলবেন।

২০ নম্বর ব্যারাকের কামরায় একটা সিগারেট খাচ্ছিলেন শামসূল। হঠাৎ দেখলেন চলতে চলতেই মাটিতে পড়ে গিয়েছেন আবুল বরকত।

কী ব্যাপার? কাঁদানে গ্যাস? চোখের জ্বালা? ততক্ষণে ১৭ নম্বর ব্যারাক থেকে ছুটে এলেন শফিকুর রহমান। তিনি পানি খুঁজছেন। বরকতের মুখে চোখে দেবেন। কিন্তু এ তো রক্ত! অর্থাৎ গুলি লেগেছে।

বরকতের বড়সড় শরীর বহন করে মাঠের মাঝখান থেকে দৌড়চ্ছেন শামসূল আর শফিকুর। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে এসে বরকতকে ওভাবে দেখে উপস্থিত কয়েকজন কেঁদে ফেললেন। তাঁকে সকলেই চেনে। এ কী হল! ঝড়ের বেগে আরও দুজন আর একটি শরীর নিয়ে ঢুকল। সেদিকে তাকানো যাচ্ছে না। কারণ, সেই শরীরের মস্তিষ্কের একাংশ নেই। উড়ে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সালাহুদ্দিন।

 আবার একটি শরীর আসছে। তাঁর চোখ দুটি তখনও যেন খোলা। সেই চোখে বিস্ময়। তবে প্রাণ আছে। কী তাঁর পরিচয়? রফিক উদ্দিন আহমেদ।

কতজন শহিদ হয়েছিলেন? সত্যিটা আজও জানা যায়নি। কারণ বহু লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। নিরুদ্দেশের সংখ্যাও জানা নেই। কোথায় গেলেন তাঁরা?

বিকেলের মধ্যেই সেই খবর এসে পৌঁছল খুলনায়। তৎক্ষণাৎ আগুন জ্বলে উঠল মানুষের বুকে। হরতাল এখানেও ডাকা হয়েছে। আর শ্যামল, হাসান, নূরউদ্দিন, বাবলুরা বিভিন্ন পাড়ায় যেমন লিফলেট বিলি করেছে, তেমনই দেওয়ালে দেওয়ালে আলতা দিয়ে, কালি দিয়ে বড় বড় পোস্টার লাগাচ্ছে। ‘বাংলা ভাষা, মায়ের ভাষা’…রাষ্ট্রভাষা মাতৃভাষা…ভাষা ডাকাতি চলবে না…। রাস্তায় সাধারণ মানুষ নেমে এসেছে। আজাদি লাইব্রেরির সামনে জমায়েত। ঠিক করা হল পরদিনও খুলনায় হরতাল হবে।

২২ তারিখ হরতালের দিন গোটা শহরের মানুষ যেন রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ দেখাল সরকারের অত্যাচারী ভূমিকার বিরুদ্ধে।

জানালা থেকে দেখা যায় মিছিল। সন্ধ্যা আন্দাজ করতে পারছে ওই মিছিলে কে থাকবে। তাই বাড়ির সামনে থেকে একটি করে মিছিল গেলেই বারবার এসে দাঁড়ায় বাবার চেম্বারের জানালায়।

শ্যামল একেবারে সামনের সারিতে। তার হাতে একটি পতাকা। স্লোগান শুনে বাবা আর মা এসে দাঁড়িয়েছে জানালায়। শ্যামল যাওয়ার সময় একবার তাকিয়ে দেখল। জানলার ভিতর থেকে শ্যামলের জ্বলে থাকা চোখ দেখতে পেল সন্ধ্যা। চলে গেল মিছিল। তবে ওই চোখটা মনে রইল সন্ধ্যার।

মা বলল, শ্যামলের কিছু হইব না তো!

বাবা বলল, হইতেই পারে। তার লাইগ্যা সে কি ঘরে বইস্যা থাকবে? একটা তাজা ছেলে। অর মইধ্যে আগুন আছে।

মা বলল, আজ আমাগো বাড়ি আইলে অরে কইও একটু সাবধানে থাকতে।

সন্ধ্যার বুকে যেন ধক ধক করে শব্দ হচ্ছে! বাবাকে বলল, পুলিশ যদি শ্যামলদাকে ধরে মারে! তুমি শ্যামলদার উকিল হবে?

বাবা হেসে ফেলল, ওরে মাইয়া! এর মধ্যেই আমার মক্কেল খুঁইজ্যা নিছ! ছেলেগুলোন প্রাণ হাতে কইব়্যাম এইসব করতাছে। আর তুমি ভাবতিছ আমার ক্যামনে দুইডা ট্যাহা আসবে!

সন্ধ্যা প্রাণপনে মাথা নাড়ে। সে বলে, আমি তা বলতে চাইনি বাবা! আমি বলছি জেলে থাকতে হবে না তো?

বাবা বলল, চিন্তা নাই। অর কিছুই হইব না। পুরা শহরের সব ছেলেরা রাস্তায়। কজনরে জেলে রাখবে!

সেদিন শনিবার। স্কুল যায়নি সন্ধ্যা। এক দু-দিন পর পর হরতাল হচ্ছে। তাই স্কুল বন্ধ। সাইকেল নিয়ে শ্যামলদা সকালেই এসেছিল বাসায়। বাবার সঙ্গে কথা বলতে। লাইব্রেরিতে সংগ্রাম পরিষদের নেতা কাজি রফিক ইসলাম এসেছিলেন। ঢাকায় যে কী সাংঘাতিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে সেকথা তিনি শুনিয়েছেন।

মহীতোষ বললেন, সরকারপন্থী লিগের সমর্থকরা কিন্তু রাস্তায় পাড়ায় গোপনে ঘোরে। পুলিশের চর তারা। পুলিশরে যেমন খবর দেয়, তেমনই নিজেরাও টার্গেট করে কীভাবে তোমাগো মতো যুবকদের মারধর করে হাত পা-ও ভাইঙ্গা তোমাদের মনোবলও ভাইঙ্গা, দেওয়া যায়। তাই যা করবা সংগঠনের মইধ্যে থাইক্যা কইরো!

শ্যামল চিন্তা করল একটু। বলল, বিপদ আছে কাকা জানি। একটা কথা বলি আপনাকে। এই একটা সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ নিতে হবে। দেশের মধ্যে আমরা সংখ্যালঘু। আমাদের নিয়তি হল, দাঙ্গা হবে আর হিন্দুরা বর্ডার পেরিয়ে চলে যাবে ইন্ডিয়া। আমি আপনি কেউ জানি না কবে আমাদেরও চলে যেতে হবে। এই প্রথম ভাষাকে সামনে রেখে হিন্দু মুসলিমরা বাঙালি হিসেবে একজোট হয়ে অবাঙালি মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলছে। বাংলা ভাষা যদি দেশভাগের পর হিন্দু আর মুসলিমকে চিরকালের মতো বেঁধে রাখতে পারে, তার থেকে ভালো তো আর কিছু হয় না!

মহীতোষ বললেন, তোমার লগে আমিও একমত। কিন্তু এত আশা নাই আমার। আসলে এত কিছু দেখছি না সেই পার্টিশানের আগে থিইক্যা যে, এখন আর এসব মিলন, ঐক্য, একজোট হওয়া এইসব শব্দ শুইন্যা কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। বারবার ধাক্কা খাইছি, বোঝলা না!

মহীতোষের চোখে জল আসছে। বললেন, তুমার কথা আমি উড়াইয়া দিতে পারি না! তাই আমি তুমারে বাধা দিমু না! আমরা পারি নাই পার্টিশান আটকাইতে। তুমরা নতুন ভাবে চেষ্টা কইরা দ্যাখো যাতে এই দ্যাশে আমাগো সমান অধিকার কায়েম হয়।

বাবা! মহীতোষ তাকালেন। দরজায় সন্ধ্যা, মা শ্যামলদাকে বলল, আজ এখানে খেয়ে যেতে।

শ্যামল বলল, না না আমি বাসায় বলে আসিনি। আমার মা অপেক্ষা করবে।

মহীতোষ বললেন, আচ্ছা আমি রঘুকে কইয়া দিমু। মারে কও শ্যামলা এহেনেই খাইয়া যাবেনে।

বারো বছর আগে ঘটে যাওয়া এসব কথা আজও স্পষ্ট মনে গাঁথা হয়ে আছে সন্ধ্যার। মনে পড়ছে সেই দিনের ছবিটি। শ্যামলদা স্নান করে এসে বাবার একটা ধুতি আর গেঞ্জি পরে খেতে বসেছে। বাবা আর শ্যামলদা খাচ্ছিল। সামনে সন্ধ্যা বসেছিল। মা মাঝেমধ্যে উঠে গিয়ে রান্নাঘর থেকে খাবার আনছে। সন্ধ্যা কেন যেন ভাবছিল এটা হল জামাইষষ্ঠী। আর কিছু বছর পর এরকমই দৃশ্য বারংবার ঘটবে এই বারান্দায়। এক আশ্চর্য সুখে আচ্ছন্ন হচ্ছিল সন্ধ্যা।

সেদিন বাবার চেম্বারের রুমে সন্ধ্যা আর শ্যামল একা ছিল।

সন্ধ্যা বলল, শ্যামলদা আজকাল আসা কমে গেছে তোমার।

শ্যামল সন্ধ্যাকে এই কদিনের সব কথা শোনাল।

সন্ধ্যা বলল, এসব কবে শেষ হবে?

শ্যামল বলল, এটা তো জানা নেই। হয়তো বছরের পর বছর। যখন একটাই দেশ ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য তখন ইংরেজের বিরুদ্ধে ছিল সকলের লড়াই। এখন ইংরেজ চলে গেছে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা নতুন ইংরেজ হয়েছে। তারা আমাদের সব স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে।

সন্ধ্যা বলল, আমি তো এত সব বুঝি না।

শ্যামল বলল, আমাদের দেশে এটাই সমস্যা সন্ধ্যা। তোমরা মনে করো তোমরা বাইরের জগৎ বোঝো না। আর আমরা পুরুষেরা সেটা শুনে নিজেদের খুব বোঝনদার মনে করি। আর মনে করি তোমাদের রান্না আর সংসার সামলানোই কাজ। এটা ভুল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় কত শত মেয়েরা যে প্রাণ দিয়েছে সে কথা তো তুমি জানো। আমাদের পাশে মেয়েরা না থাকলে চলবে? তোমাদের দরকার দেশগঠনে!

সন্ধ্যা শিহরিত হয়। শ্যামলদা অন্যরকম। কই বাবা তো মাকে বলে তোমরা মেয়েমানুষ, কী হচ্ছে বাইরে বোঝবা না!

শ্যামল বলল, এত কী ভাবছ?

সন্ধ্যা বলল, কেমন ভয় করছে।

শ্যামলদা বলল, এই যে একটা নতুন দেশ হয়েছে। এই দেশ সবেমাত্র শিশু। এই দেশকে আমরা সকলে ভালো মন্দ বিচার করে তৈরি করছি ভবিষ্যতের জন্য, এটা ভাবতে ভালো লাগে না? এই যে ভাষা আন্দোলন হচ্ছে, এটা হয়তো ্পঞ্চাশ বছর পর ইতিহাসে থেকে যাবে।

সন্ধ্যা বলল, আমাদের কী হবে?

শ্যামলাদা বলল, কেন তুমি জানো না কী হবে?

সন্ধ্যা বলল, তুমি তো আমাদের নিয়ে কোনও কথাই বলো না। শুধু বড় বড় ব্যাপার নিয়ে কথা বলো।

শ্যামল বলল, বাইরের বড় বড় ব্যাপারগুলোই কিন্তু আমাদের ছোট ছোট জীবনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।

সন্ধ্যা বলল, নিয়ন্ত্রণ, আন্দোলন…তুমি এত গম্ভীর গম্ভীর কথা বলো কেন?

শ্যামল হেসে বলল, আমি কী নিয়ে রাস্তায় নেমেছি?

সন্ধ্যা বলল, কেন বাংলা নিয়ে!

শ্যামল বলল, তাহলে মুখের বাংলাটা ভালো করতে হবে না?

সন্ধ্যা বলল, আমাকে শিখিয়ে দিও।

শ্যামল বলল, পরশু জমায়েত আছে। অনেক পোস্টার বানাতে হবে। একেবারে রবিবার রূপসার কাছে। দেখা হবে। সেই শিমুল গাছের নীচে। আসবে কিন্তু বিকেল চারটের সময়। এখন আমি যাই। লাইব্রেরিতে যেতে হবে।

সন্ধ্যা হাত ধরল শ্যামলের।

সেদিনই জানা গেল সারদা রোডের লাইব্রেরিতে পুলিশ হানা দিয়েছে। প্রায় দশ জন ছিল। পোস্টার লিফলেট বই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আর সকলকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে এসব আন্দোলনে জমায়েত মিটিংয়ে কাউকে দেখলে গ্রেপ্তার করা হবে। জেল অবশ্যম্ভাবী। দেশদ্রোহের মামলা দেওয়া হবে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে গান্ধী পার্কের মিটিং থেকে যে মিছিল বেরোল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আর ঢাকার গণহত্যার বিচার চেয়ে, সেই মিছিলে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল পুলিশ। পা লক্ষ্য করে গুলিও চালাল। যদিও পুলিশ বলেছে কোনও গুলি চলেনি। বহু যুবক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

আশ্চর্যভাবে শ্যামলও উধাও! তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না!

সন্ধ্যার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল বাহান্নর ভাষা আন্দোলন!

আজ এই ১৯৬৪ সালে সন্ধ্যার সামনে আবার বিপদসংকেত নিয়ে এসেছে দাঙ্গা! তার কেন যেন মনে হচ্ছে আবার জীবনের মোড় ঘুরতে চলেছে! সন্ধ্যা এসেছে রূপসার মতো এক শান্ত নদীর প্রান্ত থেকে। অথচ আজ নাটকীয়ভাবে তাকে জীবন যেখানে নিয়ে এসেছে সেই নারায়ণগঞ্জের বর্ষার শীতলক্ষ্যার মতোই অশান্ত হতে চলেছে সন্ধ্যার জীবন?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *