সন্ধিক্ষণ – ৬

গরম লাগছে কেন? সন্ধ্যা উসখুস করছে। ভ্যাপসা একটা হাওয়া ঢুকছে জানালার ফাঁক দিয়েও। জানালা তো বন্ধ। ওটা কীসের আলো? বউদি…বউদি…কুশদা… কুশদা…

একটা চিৎকার। সন্ধ্যা উঠে বসল। এই জানালার ওপাশ থেকেই ডাকছে কেউ। প্রভাস ততক্ষণে উঠে পড়েছে। ঘর অন্ধকার। এখন মধ্যরাত পেরিয়েছে। তবু ওই খড়খড়ি থেকে আসা আলোয় যেন ঘরে এক আবছায়া তৈরি হল। পরস্পরের মুখ দেখতে পাচ্ছে না কেউ। সন্ধ্যা উঠে আন্দাজে ঘরের বালব জ্বালিয়ে দিয়েছে। প্রভাস প্রথম কথা বলল, মাণিকের গলা!

সন্ধ্যা বলল, হ্যাঁ।

প্রভাস দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, যেও না!

ততক্ষণে মাণিক আবার ধাক্কা দিয়েছে জানালায়। সন্ধ্যা এসে জানালা খুলে দিল। মাণিকের শরীরের ছায়ার পিছনে দাউ দাউ আগুন। সন্ধ্যার সদ্য ঘুম ভেঙে যাওয়া মস্তিষ্ক ঠিক ধরতে পারছে না তৎক্ষণাৎ যে, এটা কী হচ্ছে? তার মধ্যে সেদিন থেকেই আতঙ্ক দানা বেঁধেছে। কয়েকদিন ধরে যখন তখন আগুন ধরার খবর আসছে বিভিন্ন বাড়ি থেকে। সন্ধ্যার জানালা খুলতেই প্রতিবেশী মাণিকের চিৎকার কুশদা তোমার জমির ঘরে আগুন লাগছে…বাইরায় আসো…জলদি..।

জমির ঘরে? মানে সবজির জমিতে যে একটা মাত্র ঘর তোলা হয়েছিল সেটায়? তার মধ্যে তো জামাকাপড়, দোকানের স্টক!…

প্রভাস আর সন্ধ্যা দেখতে পাচ্ছে, তাদের চোখের সামনে গুদামঘর জ্বলছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাথা ঘুরে গেল যেন। সর্বস্ব চলে যাবে?

প্রভাস ছুটে বেরিয়ে গেল। সন্ধ্যা প্রভাসের পিছন গেল।

বাড়ির পিছনে একটা কুয়ো। এই কুয়ো আর সেভাবে ব্যবহার করা হয় না।

বালতিতে দড়ি লাগানোই ছিল। সেটার সাহায্যে প্রভাস চেষ্টা করল ছুটে গিয়ে জ্বলন্ত ঘরে জল দিতে। নিতান্তই অনর্থক হল প্রচেষ্টা।

সুধাময়ীর ঘর উলটোদিকে। তাঁর ঘুম পাতলা। প্রভাস আর সন্ধ্যার দরজা খুলে ছুটে যাওয়ার শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙেছে। তিনিও খিড়কির দরজা পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। মুখ শক্ত। আশ্চর্য ব্যাপার হল যাদের বাড়িতে আগুন ধরেছে তারা তিনজনই চুপ। মানিকও প্রভাসের সঙ্গে জল ঢালছে। সন্ধ্যার চোখ থেকে দরদর করে জল পড়ছে শুধু। মানিক একমাত্র চিৎকার করছে। সে বলছে, এসব কইব়্যা নিজেদের দ্যাশের মাইনষেরে ভাগাইতে চাইস তরা…আমাগো একটাই দোষ আছিল…এহেনে রইয়া যাওন ঠিক হয় নাই…।

হঠাৎ বড় একটা পাইপ কাঁধে ছুটতে দেখা গেল লতিফকে। পাশে তার ভাই আরশাদ। লতিফের ছেলে আসলামও এসেছে। এই মোটা পাইপ লতিফের ফসলের খেতে কাজে লাগে। টিউবওয়েলের জল যেখান থেকে বেরোয়, সেখানে লাগানো

লতিফ ছুটে এসে প্রভাসকে বলল, ওই বালতি কিছু না। তুই টিপকলে এই নলের মুখ ধরে থাক শক্ত কইরা। এইডা তর দোকানে মাল রাখনের জায়গা না?

এই শীতেও প্রভাসের গোটা শরীর ভিজে গিয়েছে ঘামে। সে মাথা নেড়ে বলল, শ্যাষ হয়ে গেলাম।

আরশাদ সন্ধ্যাকে সরিয়ে বলল, ভাবী আপনে সরেন। আমিই টিউকল পাম্প করি।

সন্ধ্যা একটাও কথা না বলে সরে গেল। অনতিদূরে জামরুল গাছের নীচে আসলাম আর বাবু দাঁড়িয়ে। তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন সুধাময়ী। দুজনের মাথায় হাত রাখলেন তিনি। ওরা দুজন মুখ উঁচু করে দেখল সুধাময়ীকে।

সুধাময়ী ফিসফিস করে তাদের বললেন, দুইজন মাইনষের মধ্যে সবথিক্যা সহজ হইল ভেদ তৈর করা। সবরকম ভেদ। বোঝলা? এই যে এহন তোমরা বাচ্চা, তোমাগো এহন থিইক্যা বুঝতে হইব কারা আমাগো মইধ্যে ঝগড়া লাগাইতে চায়! তোমরা যখন একসাথে খেলা করো, তোমাগো কখনও মনে আসে হিন্দু কি মোসলমান? এইগুলো সারা জীবন মনে রাখবা।

বাবু জানতে চাইল, আগুন কীভাবে লাগল ঠাম্মা?

সুধাময়ী বললেন, জানা নাই। তবে এই আগুন মনে ঢোকতে দিও না।

আসলাম বলল, আমার জানা আছে। আব্বু আগেই কইছে, রশিদচাচা, আবদুলচাচারা তগো বাসায় হামলা করতে পারে। অরাই করছে!

সুধাময়ী বললেন, কেউ তো দেখি নাই আসলাম! তয় কীভাবে কইতে পারি কে লাগাইছে? তবে এই আগুন মনে ছড়াইতে দিস না তরা।

আমরা কেন ছড়াব?

সুধাময়ী বুঝলেন তিনি যা ভেবে এই সব কথা বলছেন, সেটা এই সাত আট বছরের বাচ্চাদের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

ঘরটা খুব বড় নয়। আগুন তাই ছড়ায়নি। আশেপাশে অন্য ঘর অথবা দাহ্য পদার্থও ছিল না। লতিফ, আরশাদ আর প্রভাসের মিলিত প্রয়াসে আগুন বাগে এল। ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে প্রভাস প্রবেশ করল। তার সর্বস্ব এভাবে চলে যাবে এটা সে কল্পনা করেনি। ততক্ষণে মানুষ জমতে শুরু করেছে। এরকম সময় রাগ আর পারস্পরিক দোষারোপ অথবা নতুন করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে টেনশন তৈরি হওয়াই প্রত্যাশিত। কিন্তু তার পরিবর্তে সকলের মুখে ভয় আর বিস্ময়ের চিহ্ন। এই যুগীগঞ্জে এরকম হতে পারে এটা কেউ কল্পনা করেনি।

রমাপদ ছুটে এসেছে। সে চিৎকার করে বলল, এই আগুনের শ্যাষ কোথায় লতিফ?

লতিফ ঘর্মাক্ত, পরিশ্রান্ত। সে বলল, যাদের জিগাইনোর কথা, তারা এহেনে আসার মুরাদ দেখায় না। তারা এতই কাপুরুষ যে অন্ধকারে আগুন লাগায়। এর শ্যাষ দেখব আমরাও।

অগ্নিদগ্ধ ঘর থেকে কোনও শব্দ আসছে না। রমাপদ আর লতিফ ভিতরে ঢুকে দেখল ঠিক মাঝখানে একটি কাপড়ের গাঁটরির উপর বসে আছে প্রভাস। শূন্য দৃষ্টি। গাঁটরির মধ্যে কাপড় বলে কিছু যে আর অবশিষ্ট নেই সেটা স্পষ্ট। আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে আরও কিছু প্যাকিং বাক্সের দগ্ধাবশেষ। প্রভাস রমাপদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের মনে হয় চলে যেতেই হবে। আর থাকা যাবে না।

লতিফ চিৎকার করে উঠল, না, না, না। কুশ তরা চইল্যা গেলে ধ্বংস হইয়া যাইবে গ্রাম। এটাই দস্তুর হইব যে এভাবে ভয় দেখাইলে হিন্দুরা ভাইগ্যা যায়। আর সেই সম্পত্তি নিয়া কুকুর শেয়ালের মতো কামড়াকামড়ি হয়।

প্রভাস হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে লতিফের চোখে চোখ রেখে বলল, তুই কী চাস? এরপর ঘরে ঢুকে আমাদের কুড়াল দিয়ে মেরে ফেলুক? ঠেকাতে পারবি? এই আগুন কারা লাগাল তুই জানিস না? তারা কী চায় জানিস না? তোরা তাদের ঠেকাতে পারছিস না কেন? তাদের সংখ্যা অনেক বেশি।

আরশাদ এবার ঢুকে এসেছে। সে বলল, বড়ভাই এইডা আপনে কী কন? আমরা জান লাগাই দিব! আমরা হগ্গলে মিইল্যা আপনেদের রক্ষা করুম।

প্রভাস বলল, তোর জান থাকলে তবে তো আমার জান রক্ষা করবি আরশাদ! ওদের যা মতিগতি তোদেরও রেয়াত করবে না। শুনছিস ঢাকায় কী হচ্ছে? তোদের লোকদেরও জানমাল খতম করে দিয়েছে।

ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লতিফ দেখল বাইরে তখনও ভিড় আছে। সকলেই আতঙ্কিত। কারা করল এই কাজ? লতিফ বলল, সকলরে কই আজ বিকালে পুকুরঘাটের গাছতলায় আসেন। আমাদের বসা দরকার। একটা কিছু করতে তো হইবেই। পুলিশরে খবর দেওয়া চাই। আরশাদ সঙ্গে যাক। কুশ থানায় যা।

প্রভাস বলল, চারদিকে মানুষ মরছে। সেখানে মাত্র একটা ঘরে আগুন দিয়েছে। কেউ মরেনি। কারও কিছু হয়নি। এটা শুনে পুলিশ হাসবে, তুই বুঝিস না। আমি যাব না।

লতিফ বলল, তাই বলে ছাইড়্যা দিবি?

প্রভাস বলল, আমার আর এসব ভালো লাগছে না লতিফ। আমাকে ছেড়ে দে।

লতিফ আরশাদকে বলল, তাইলে তুই যাইবি। বলবি আমরা বিকেলে মিটিং ডাকছি। এর জবাব চাই। বিচার চাই।

সুধাময়ী এগিয়ে এসে বললেন, লতিফ, গ্রামের মোসলমানরা আইব সেই মিটিংয়ে?

লতিফ বলল, ক্যান আইব না? হগ্গলে আইব। আমি তোমারে কই! ভরসায় থাকো।

ঠিক তখনই অনেক মানুষের জমায়েত হয়ে গেল এক নিমেষে।

দেখা গেল রশিদ, আবদুল্লা, মওলানা সাহেবরা সামনে। পিছনে বেশ কিছু লোকের ভিড়। তাদের মধ্যে মাণিকপুরের হোসেন মিয়ার পাঠানো সেই লোকগুলোও আছে।

আবদুল্লা এসে বলল, আমরা আগুন দিছি? এই কথা এখানে কে কয়?

হঠাৎ এক নীরবতা নেমে এল। কেউ কোনও শব্দ করল না।

লতিফ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, হ্যাঁ রে আবাগীর পূত! তরাই দিছস আগুন! ধইব়্যাদ নে আমিই কইছি! কী করবা?

রশিদ বলল, লতিফ তর বড্ড বাড় বাইড়ছে! তরে একটা ডোজ দেওন দরকার!

লতিফ বলল, তর গলায় হাত দিয়ে একটা দাবান দিলে অহনও দুধ বাইরবে রশিদ! রক্ত ঘন হয় নাই এখনও তর দেহে। তুই ডোজ দিবি আমারে?

রশিদ হাসল। বলল, একটা দাবান দিতে হাত তোল না লতিফ মিয়া! দেহি ক্ষমতা।

লতিফ কিছু বলতে যাচ্ছিল, মওলানা বললেন, বাইরে থেকে কারা এহেনে আসছে, কীভাবে কারা কার সঙ্গে লড়াই করছে, এসব আমাগো বিষয় না। তাই প্রভাস তরে আর রমাপদরে কইয়া দিই, যদি কাউরে নিজের চক্ষে না দেহিস, যার তার নামে বদনাম দিস না। লড়াই করবি তরা আর বদনাম দিবি অন্যের এইডা কী কথা?

প্রভাস শুনে অবাক হয়ে গেল। সে ক্লান্ত স্বরে বলল, আমি? আমরা কখন বদনাম করলাম?

মওলানা বললেন, আমরা ভোর থিইক্যা শুনছি এই আগুনের জন্য তরা রশিদ আর আবদুল্লার নাম নিছিস।

কার কাছে নাম নেব?

মওলানা বললেন, সে আমার জানা নাই। এরপর কিছু হইলে আমাদের কাউন্সিলের করনের কিছুই নাই।

লতিফ বলল, মওলানা সাহেব এইডা কি আপনে হুঁশিয়ারি দিয়া রাখলেন? নাকি হোসেন মিয়ার গুন্ডাগো লাইসেন্স দেলেন যা খুশি করার?

মওলানার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। বললেন, লতিফ, কার সাথে কথা কও সে খেয়াল রাইখ্যো!

লতিফ হেসে বলল, আমরা আপনেরে তো চিনি। আমারে আপনে চেনেন নাই অখনও।

রশিদ এবার লতিফকে ধাক্কা দিয়ে বলল, এই লতিফ, তুই কারে কী কস?

হঠাৎ রশিদ পড়ে গেল। একটা লাঠি তার পায়ে এসে লেগেছে। পিছনেই আরশাদ। আরশাদ চিৎকার করে বলল, রশিদ, কার গায়ে হাত দিছস? আজ তর মরণ আছে!

সুধাময়ী বুঝলেন, এই সংঘাত চাইছে মওলানার দল।

তিনি এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন পড়ে যাওয়া রশিদ আর লতিফের ঠিক মাঝখানে। মওলানার দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, মওলানা সাহেব, আসল কথাডা কী কয়েন! আমাগো চইল্যা যাইতে কন?

মওলানা চোখ নামালেন। পিছন থেকে এবার আরেকজন বলল, আপনাগো সুবিধার জন্যি কইছি কয়েকদিন বাইরে থাকেন। এদিকে ঝামেলা বাড়ছে।

সুধাময়ী বললেন, কারা ঝামেলা বাধায়? আপনেরা যদি শক্ত থাকেন কাদের সাহস? আমার ছেলেরে নিঃস্ব কইব়্যা কার লাভ হবে? এই বাড়ি দখল কইব়্যাব লওয়ার চেষ্টা কে করতাসে? কারা চায় আমরা চইল্যা যাই ভিটেমাটি ছাইব়্যাক? আপনেরা যা কইবেন, সেই কাম করুম।

মওলানা বললেন, আমরা মোটেই চাই না হিন্দুরা চইল্যা যাউক! তবে বাইরে থিইক্যা অজানা জজন আইস্যা এহেনে হিন্দুদের উপর হামলার ছক করতাসে খবর পাই। গ্রামে দাঙ্গা হোক এইডা চাই না। আমরা যদি তাগো আগেই জানাইয়া দেই যে এ গ্রামে হিন্দু নাই, তয় আর তারা এহেনে আসে না।

সুধাময়ী চোখে চোখ রেখে বললেন, এইডা কোনও মীমাংসা মওলানা সাহেব? আমাদের গ্রাম। আমাদের ভিটে। আমাদের চেনা মনিষ্যি চাইরদিকে। আর আমাদের এহেনে থাকা না থাকা বাইরের লোকের ডরে ঠিক হবে!

পিছন থেকে কেউ একজন ফের বলে উঠল, এত কথার দরকারডা বুঝলাম না। এহেনে থিইক্যা সদরে যান। ক্যাম্প হইছে! সেহেনে থাকেন। মামলা খতম। সব শেতল হইলে ফেরেন।

রমাপদ, প্রভাস, সন্ধ্যা, কুসুম, সুলতা, মালতী, মাণিক, রতনরা যেন চিত্রার্পিতের মতো শুনছে। ভোর হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। বাতাসের ঠান্ডার কামড় আরও বেড়েছে। অথচ এই মানুষগুলোর শরীরে তাপ-উত্তাপের বোধ আর নেই। পার্টিশানের সময় এই দেশ এই মাটি ছেড়ে তারা যায়নি। রয়ে গিয়েছে। আর তো কোনও পার্টিশান নেই। তাও তাদের এভাবে পালাতে হবে? এই সব ছেড়ে?

লতিফ নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল, মওলানা সাহেব, আমরা মানছি না। এরা কেউ কোথাও যাবে না। ঝামেলা বাইরে থিইক্যা আইলে আমরা এক লগেই তাদের বুইঝ্যা লব। এতকাল যারা একলগে আছি তাদের পালানোর প্রশ্নই নাই।

মওলানা বললেন, ঠিক আছে। এবার হগ্গলে যে যার বাসায় যাও।

লতিফ কিন্তু নড়ল না। সে বলল, মওলানা সাহেব, এইডা কইলেন না এই সাঙ্গপাঙ্গ লইয়া এই সাতসকালে মিছিল কইব়্যা আইলেন ক্যান?

মওলানা মুখ শক্ত করে বললেন, মিটিং ডাকছি। তাই এরা আইছে।

লতিফ বলল, মিটিং? আপনে আমাদের গ্রামের কাউন্সিল প্রধান। আমরাই সেই মিটিংয়ে ডাক পাইলাম না! এইসব বাইরের মাইনষেদের লইয়া কী মিটিং ডাকেন?

মওলানা বললেন, এইডা অন্য মিটিং! তোমরা কীসের মিটিং ডাকলে আজ একটু আগে?

লতিফ বলল, আমাদের মিটিংয়ের নাম জান কবুল! মানে হইল গিয়া, সব আপদের দল যত চেষ্টা করুক যুগীগঞ্জরে হিন্দুশূন্য করবার, পারবে না। এইডা ঠেকাইতে আমাদের জান কবুল। ইনশাল্লাহ!

মওলানা আর লতিফ শ্যেণ দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকল। কয়েক মুহূর্ত যেন সব চরাচর স্তব্ধ। মৌলানার প্রভাব ও সামাজিক ক্ষমতা অনেক বেশি। এ গ্রামের মুসলিম সমাজ এককথায় তার বিরুদ্ধাচারণ করতে পারবে না। ধর্মীয় অনুশাসনের বাধা আর কাজেকর্মে মৌলানার সাহায্য, সার্টিফিকেট এসবও দরকার হয় সারা বছর ধরে। তাই মৌলানাকে কে চটাতে চাইবে?

একথা লতিফও জানে। তবু সে পণ করেছে। গোটা পূর্ব পাকিস্তান যখন জ্বলছে, হিন্দু শূন্য গ্রাম হয়ে যাচ্ছে, ঢাকা থেকে খবর আসছে রাস্তায় রাস্তায় শুরু হয়েছে উদ্বাস্তু শিবির, ঠিক তখন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর কাছে যুগীগঞ্জ গ্রামের সামান্য গৃহস্থ লতিফের ক্ষমতা কতটুকু যে, সে একা একটি গ্রামকে রক্ষা করবে? একে একে সকলেই চলে গেল প্রভাসের বাড়ি ছেড়ে।

দগ্ধ হওয়া ঘরের দিকে তাকিয়ে সুধাময়ী নিজেই নিজেকে বিড়বিড় করে বললেন, এ জীবন য্যান এক অবিরাম পার্টিশান!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *