সন্ধিক্ষণ – ২৭

২৭

কাজটা বড়ই কঠিন। হাত দিয়ে মাটি খোঁড়া। চাষের জন্য তো অনেকটা মাটি কোপাতে হয়। বীজ বপনের জন্য। নিয়মটা হল, ঝোরা থেকে জল নিয়ে আসতে হবে। সেই জল ছিটিয়ে দেওয়া মাটি জুড়ে। যতক্ষণ সময় লাগবে নরম নরম হয়ে আসতে, ততক্ষণ টানা জল দিয়ে যেতে হবে।

এরপর মাটিতে হাত লাগাতে হবে। হাত দিয়ে মাটি খোঁড়া, আগের বছরের ফসল থেকে সংগ্রহ করা বীজ জমিয়ে রাখা। সেই বীজ এই ভেজা মাটিতে ছড়ানো।

তবে এখানেই শেষ নয়। এবার গাছের কাঠ জড়ো করে সেগুলো নিয়ে একটি একটি বেড়া দিতে হবে। কাঠের বেড়া যেন শক্ত হয়। পেন্ডা চাষে ফসল হবে কোলহা, কোসরা, ধান।

এভাবেই তথাগত চাষ শিখছে। কঠিন। তবে বারহি মারিয়া বলেছে, সে পারবে। তার হাতের আঙুলগুলো সরু।

আগুন্দা নদীর উপর সূর্যাস্তের ছায়া পড়েছে। এই সময়টায় রং নিয়ে খেলা করে আকাশ, মাটি আর নদী। প্রথমে হলুদ। তারপর গেরুয়া। সবশেষে লাল…। সেই রং শেষ পর্যন্ত মিশে যায় রাঘোমেটা পাহাড়ের গায়ে। মার্চ মাসে রাঘোমেটা পাহাড়ের ঠিক নীচে থাকা পলাশের জঙ্গল প্রতিদিন গোধূলিতে এই রঙিন খেলায় অংশ নেয়। পলাশের গেরুয়া আর আকাশের গেরুয়ার মধ্যে হয় প্রতিযোগিতা। তবে মার্চ আসতে এখনও দেরি আছে।

তথাগত গন্ধ পাচ্ছে মহুয়ার। নতুন ফুল এসেছে। এই ফুলের থেকে মধু আহরণ করলেও খাওয়া যাবে না। আগে হবে ‘দরিওর তোরা’ তৈরি। যাকে বলা মহুয়া মদ। একটা পার্বণ হবে এখানে। ইরপু পান্দম। সেই পার্বণের আগে মহুয়া খাওয়া নিষেধ। মারিয়া আদিবাসীদের এটাই নিয়ম। ওরাই এই অবুঝমাড়ের আদিমতম মানুষ।

ঘরে আচার নেই। তথাগতকে কাল সকালে শুধুই পান্তা খেতে হবে। এখানে রোজই পান্তা আর আচার সকালের খাবার।

সারাদিন ধরে ময়ূরগুলো ডাকে। সন্ধ্যার পরে সাধারণত অন্য পাখিদের ডাক পাওয়া যায় না। অথচ ময়ূরের ডাক যে কেন মধ্যরাতেও পাওয়া যায়, কে জানে!

কতদিন হয়ে গেল এই অবুঝমাড়ে? না, না। অবুঝমাড় তো নয়! মারিয়া আদিবাসীরা তো এই অঞ্চলকে বলে মেতাভূম। পাহাড়ভূমি। একদিকে ইন্দ্রাবতী, অন্যদিকে গোদাবরীর পাশে এই দেশের কথা বাইরের পৃথিবীর মানুষ কতটাই বা জানে! তাই তো রহস্যের পর্দায় ঢেকে দিতে ওরা নাম দিয়েছে অবুঝমাড়। এই নামটা শুনলেই হাসে মাড়িয়া আদিবাসী গোষ্ঠী। তোমরা বাইরের মানুষ, তোমরাই অবুঝ! তাই তোমাদের কাছে এ স্থান অবুঝমাড়।

প্রতিদিন বিকেল আর সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণের এই সময়টায় তথাগত আগুন্দা নদীর তীরে আসে। চোখ ভরে সূর্যাস্ত দেখে। আর তারপর নদীতীরের ভেজা ভেজা চুনোপাথরের বিছানায় তার চোখে ঘুম নেমে আসে।

প্রায়ই তথাগতের স্বপ্নে আসে আদরের বোন স্তুতি। সে আকুল হয়ে ডাকছে। দাদা…দাদা…দাদা…তুই কোথায়? কোথায় হারিয়ে গেলি?

তথাগত কেঁপে উঠেই স্বপ্নের মধ্যে বলে, তোকে আমি নিয়ে আসব মেতাভূমে। আমাদের নগরসভ্যতা মরে গিয়েছেরে স্তুতি…আমরা বুঝতে পারিনি। আমরা ভেবেছি দারুণভাবে বেঁচে আছি। মৃত নগরীগুলোয় আমরাও আসলে মৃত হৃদয়ের দল। এখানে এসে দেখলাম, এখানে আছে হৃদয়সঞ্জীবনী সুধা। ভাবিস না বোন…। সভ্যতা! তথাগত ঘুমের মধ্যেই হাসতে হাসতে বলে, সভ্যতা কাকে বলে? যারা আর কিছুদিন পর মেশিন ছাড়া চিন্তা করতেও ভুলে যাবে, তারা সভ্য? যারা ধর্মের নামে মানুষকে হত্যা করে, তারা সভ্য?

না রে স্তুতি! আমি সব ছেড়ে এখানে এসে বুঝেছি কাকে বলে সভ্যতা! কাকে বলে মানবজন্মের শক্তি! কাকে বলে মহাকালের আদিগন্ত ব্যাপ্তি! একদিন সকলে আসতে চাইবে এই আগুন্দা নদীর রঙের উৎসবে। একটু অপেক্ষা কর স্তুতি। আমি নিয়ে আসব তোকে!

আকাশ হয় অন্ধকার। দূরের বকুলবাহী জঙ্গলে তখন নক্ষত্রের ফুলকি জ্বালিয়েছে হাজার হাজার জোনাকি। হঠাৎ রাঘোমেতা পাহাড়ের পাদদেশের বনভূমি আলোয় লাল হয়ে ওঠে। দাবানল! দাবানল! শুকনো বনে আগুন লেগেছে। কী ভয়ঙ্কর সুন্দর।

এ যেন তথাগতর নতুন জীবনে বেঁচে থাকার এক অলৌকিক আলো।  

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *