সন্ধিক্ষণ – ১১

১১

আগামীকাল চলে যেতে হবে। তবে কেন কে জানে, এই প্রথম জওহরলাল নেহরুর ইচ্ছে করছে না দেরাদুন ছেড়ে যেতে। এই পাহাড়ি জনপদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘকালের সম্পর্ক। এখানেই তিনি বহুদিন কারাবন্দি ছিলেন। এই ওক, মেপল, ইউক্যালিপটাস গাছে ঘেরা সার্কিট হাউসের লনে একা একা হাঁটা তাঁর খুব প্রিয় অবকাশযাপন। এই লনের এক পাশে তাঁর প্রিয় একটি কর্পূর গাছ রয়েছে। সেই গাছের পাশে বসে থেকে ওয়াল্টার ডে লা মেয়ারের কবিতা পাঠ যেন এক স্বর্গীয় অনুভব।

তিনদিন হয়ে গেল দেরাদুনে এসেছেন নেহরু। আজ ২৫ মে হয়ে গেল। কাল বিকেলে ফেরা। ফেরার পরদিন আবার পরপর অ্যাপয়েন্টমেন্ট। তাঁকে আজকাল বড় ক্লান্তি ঘিরে ধরে। আগের মতো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছেটাই নেই। কয়েকমাস আগে এআইসিসি অধিবেশনের মধ্যেই ভুবনেশ্বরে একটা স্ট্রোক হয়ে গেল। তারপর থেকে সব কিছুই শ্লথ হয়ে গিয়েছে।

নেহরু আজ লাঞ্চ করলেন তাঁর প্রিয় বন্ধু শ্রী প্রকাশের সঙ্গে। প্রাক্তন মন্ত্রী এবং রাজ্যপাল। জায়গাটা কোটালগাঁও। মুসৌরি রোড ধরে প্রায় আট কিলোমিটার যেতে হয়। বড় মনোরম বিকেলে কন্যা ইন্দিরাকে নিয়ে গেলেন সহস্রধারা ঝরনা দেখতে। ঠিক যখন তাঁরা সহস্রধারার সামনে, তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে। কমলা রঙের বর্ণচ্ছটা ছড়িয়েছে আকাশ থেকে ঝরনার জলে। পৃথিবী যেন কমলা রঙের জল দিয়ে স্নান করছে। নেহরুর কোলরিজের একটি কবিতার কথা মনে পড়ল।

ইন্দিরাকে নেহরু বললেন, কাল না গেলেই ভালো হতো।

ইন্দিরা হেসে বললেন, তাহলে থেকে যাও।

নেহরু বললেন, অনেকগুলো কাজ আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট যে আছে পরশু।

জেলাশাসক দীক্ষিত একবার বললেন, কাজ তো স্যার এখান থেকেই হয়ে যাবে।

নেহরু বিড়বিড় করে বললেন, হ্যাঁ তা হয়ে যাবে। কিন্তু মিটিংগুলো…

ইন্দিরা বললেন, আমি জানি, তুমি মোটেই ক্যান্সেল করবে না! তাহলে এখন মন খারাপের মানে হয় না। কিছুদিন পর আবার আসব না-হয়।

নেহরু হাসলেন।

২৬ মে ১৯৬৪। বিকেলে ফেরা। হেলিকপ্টারে করে নেহরু প্রথমে যাবেন সাহারাণপুরে এয়ারফোর্সের বেস স্টেশনে। সেখান থেকে এয়ারফোর্সের স্পেশাল এয়ারক্র্যাফটে দিল্লি। হেলিকপ্টারের ডোরওয়েতে উঠে নেহরু পিছন ফিরলেন। আজ হাসার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেমন ম্লান হাসি। নেহরুর কি শরীর খারাপ?

২৬ মে রাতে দিল্লি ফিরে নেহরু শুধু স্যুপ খেলেন। সেদিন রাতে তাঁর কিছু্তেই ঘুম আসছে না। রাত দেড়টার মধ্যে বারবার ঘুম ভেঙে গেল। ব্যক্তিগত সহায়ক নাথুরাম ঘুমের ওষুধ দিল। খবর দিল ইন্দিরা গান্ধী এবং পার্সোনাল ফিজিশিয়ান ডক্টর বেদিকে।

তাঁরা এলেন সাড়ে ছ’টায়। তাঁদের দেখে নেহরু প্রশ্ন করলেন, কী হয়েছে বলো তো?

এটুকু বলেই নেহরু আচমকা বিছানায় স্থির হয়ে গেলেন। ডক্টর বেদি পরীক্ষা করে বললেন, মনে হয় কোমায় চলে গিয়েছেন। হাসপাতালে শিফট করানো দরকার।

কিন্তু নেহরুকে বাঁচানো গেল না। ২৭ মে দুপুর পৌনে দুটোয় ভারতের প্রধধনমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মৃত্যু হল। মতিলাল নেহরুর এই পুত্র লন্ডন থেকে ফিরে এসে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আহ্বানে যোগ দিয়েছিলেন দেশের কাজে। জওহরলাল বাপুর সঙ্গে শেষ দিন পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বাপুর সবথেকে প্রিয় পাত্র। নয় বছর জেলে কাটিয়েছেন। আর সেই জেলপর্বে লিখেছেন একের পর এক অবিস্মরণীয় বই। নেহরুর সমালোচনায় মুখর দেশবাসী, আবার নেহরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ভারত সরকার আর নেহরু যেন সমার্থক। হঠাৎ বিকেলবেলা যদি জানা যায় যে নেহরু নেই, সেটা বিশ্বাস করা যায় না।

রানাঘাটে কিছু জামাকাপড়ের ছিট নিতে এসেছিল প্রভাস। কুপার্স ক্যাম্পে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই প্রভাস বুঝতে পারল এভাবে চলবে না। একটা কিছু করতে হবে।

যেটুকু টাকা ছিল সেই নিয়ে প্রথমে চাদর, শতরঞ্চি আর দুটো লেপ কিনতে হয়েছে। এর মধ্যেই সন্ধ্যা বলল, তোমার জামাকাপড় নিয়ে এখানে হাটে-বাজারে গেলে হয় না? নারায়ণগঞ্জের মিলের মতো কাপড় এখানে কে পাবে? দাম বেশিই পাব।

সুধাময়ী কোনওদিনই বেশি কথা বলেন না। তবে এখানে আসার পর তুলনামূলকভাবে কথা বলছেন নানা ব্যাপারে। কারণ একটাই। তিনি বুঝতে পারছেন, প্রভাস মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপে পড়েছে।

সুধাময়ী বলেছেন, সন্ধ্যা ঠিক কইছে। কাপড়গুলোন নিয়ে বিক্রির চেষ্টা কর। আর সেই টাকায় আবার কাপড় কিইন্যা বেচবি। এভাবেই দেখা যাউক কিছু হয় কিনা। আর আমাগোও কিছু করনের দরকার। একা একা কুশ পারবে ক্যামনে?

তিনি কিছুদিন ধরে বিকেলে হলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কলোনির মধ্যে ঘোরেন। প্রভাস ভাবে, একটা ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ পাঁচটা মানুষ থাকতে পারে না। সুধাময়ীর নিজের একা একটা ঘরে থাকার অভ্যাস। তার হাঁপ ধরে যাওয়া স্বাভাবিক।

তাদের যে স্কুলে থাকতে দেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিক কলোনির মধ্যে না। যারা আগে এসেছে তারা থাকে মূল কলোনি এরিয়ায়। তবে তারা যে অনেক ভালো আছে এমন নয়। তার উপর সর্বদাই ভয় কাজ করে। কখন যে তাদের অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেবে কে জানে!

গত দেড় মাসে যে কাপড়ের গাঁটরি সঙ্গে এনেছিল সেগুলো বিক্রি হয়ে গিয়েছে রানাঘাট বাজারে। একদিন আড়ংঘাটা, ধানতলার হাটেও গিয়েছিল প্রভাস। এখানে বিক্রিবাটার নিয়ম, লোকজনের পছন্দ অপছন্দ কেমন এটা জানতে হবে।

প্রভাস রানাঘাটে এসেছিল কিছু শাড়ি কিনতে। আজ সঙ্গে এসেছে সন্ধ্যা। সুধাময়ীর কাছে ছেলেমেয়ে। সন্ধ্যা এই নিয়ে দু-দিন এল। রানাঘাট থেকে একটা বাস যায় কুপার্সে। কিছু কাপড় কেনার পাশাপাশি বইপত্র কিনতে হল। সুধাময়ী বলে দিয়েছেন, বাবুর এভাবে বসে থাকা চলবে না। তাকে ঘরেই পড়তে হবে।

সেই বইখাতা কেনার জন্য একটা দোকানে ঢোকার আগেই প্রভাস দেখতে পেল একের পর এক দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনও গোলমাল হয়েছে? বইখাতার দোকানের সামনে এসে প্রভাস জানতে চাইল কী হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু মারা গেছে। বলতে বলতে লোকটি দোকান বন্ধ করে দিল।

যাহ্! আজ আর তাহলে বাবুর বইখাতা কেনা হবে না। সব দোকান বন্ধ হয়ে গেলে উপায় কী? একটাই বাস সেই সাড়ে চারটের সময়। সবেমাত্র একটা বাজে। এতক্ষণ কী করা যায়?

সন্ধ্যা ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে-ও শুনেছে।

শুধু যে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাই নয়, রাস্তার উপর কিংবা বাজারে অনেকেই কান্নাকাটি শুরু করেছে। কেউ কেউ বলছে, এখন কে থাকবে আমাদের মাথার উপর? নেহরু নেই মানে তো দেশ রসাতলে যাবে!

প্রভাসের কোনও অনুভুতি হচ্ছে না। ইন্ডিয়া সম্পর্কে, ইন্ডিয়ার পলিটিক্স নিয়ে তার ধারণাও নেই। তবে এত বড় একটা দেশে সাতচল্লিশ থেকে একজন প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন এটাই বেশ আশ্চর্য লাগে। পাকিস্তানে তো সারাক্ষণ গদিতে শাসক বদল হতে থাকে। জিন্নার চলে যাওয়ার পর সব ওলটপালট। লিয়াকৎকে মুসলিম লিগের মধ্যেই বেশিরভাগ পছন্দ করত না। আর তারপর আয়ুব খানের রাজত্ব। মিলিটারি রুল।

সন্ধ্যা বলল, চলো একটা জায়গায় যাই।

প্রভাস বলল, কোথায়?

নদীর কাছে। কতদিন নদী দেখিনি।

এখন?

হ্যাঁ।

প্রভাস ভারি আশ্চর্য হয়ে বলল, ঝামেলা টামেলা শুরু হলে?

সন্ধ্যা প্রভাসের হাত ধরে বলল, তোমার কথা, তোমার ব্যবহার এসব দেখে মনে হয়, তোমার এখনও একটা আশা আছে যে, আবার আমরা ফিরে যাব গ্রামে।

প্রভাস বলল, আছে তো। তাতে অন্যায়ের কী হল? এইটা কোনও জীবন?

সন্ধ্যা বলল, কোথায় ফিরবে? তারপর ম্লান হেসে বলল, তোমার সঙ্গে গ্রামের কোনও সম্পর্ক আছে? আমাদের বাড়ি আমাদেরই বাড়ি আছে কিনা তুমি জানো? আমাদের দোকান তালাচাবি বন্ধ হয়েই কি পড়ে আছে? কেউ ভাঙেনি সেই তালা? কেউ দখল করেনি?

প্রভাসের দিশাহারা লাগছে। এসব কী বলছে সন্ধ্যা? চরম সত্যি। কিন্তু প্রভাস এখনও মনে মনে ভাবে, একদিন আবার ফিরে যাবে।

প্রভাস বলল। কিন্তু লতিফ যে…

সন্ধ্যা যেন এই কথাটার জন্য অপেক্ষা করছিল। বলল, লতিফ ভাই এখনও বেঁচে আছে? তাকে যে ওরা খতম করেনি আমরা কি জানি?

প্রভাসের মুখে কোনও কথা আসছে না।

সন্ধ্যা একটা রিকশা ডেকেছে। তাকে বলল, এখানে যে নদীটা আছে, সেখানে নিয়ে চলো।

রিকশাচালক বলল, বউদি, আজ নেহরু মরে গেছে। কতক্ষণ সওয়ারি পাব জানি না। চার আনা বেশি দিয়েন।

সন্ধ্যা ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়ে রিকশায়। আজ প্রচণ্ড গরম। মে মাসে নারানগঞ্জেও গরম পড়ে। কিন্তু এরকম মারাত্মক না। এ যেন গা পুড়ে যাচ্ছে। প্রভাসও উঠল। রিকশাচালক কথা বলতে ভালোবাসে। সে ধীরে সুস্থে রিকশা চালাতে চালাতে বলল, নদীর ওপারে যাবেন নাকি? নৌকা আছে।

সন্ধ্যা বলল, না, ওপারে যাব না।

রিকশাচালক মুখ ঘুরিয়ে জানতে চায়, নদীর ধারে তো কোনও বাড়িঘর নাই। যাবেন কোথায়? ওসব জায়গা এই মন্টুর সব চেনা। যাইবেন কোথায়? নামটা বলেন।

সন্ধ্যা বলল, তুমি চলো। বলে দেব।

রিকশাচালক বলল, এখন কী মনে হয় দাদা? নেহরুর মেয়ে হবে প্রধানমন্ত্রী? মাস্টারমশাই তো সেরকমই বলল।

কে মাস্টারমশাই এটা আর প্রভাস জানতে চাইল না। বোঝা যাচ্ছে যে, মন্টু নিজেই বলবে। রিকশা চালক সত্যিই বলল, মাস্টারমশাইকে আপনারা চিনবেন না। বীণাপাণি হাইস্কুলের সার। আমার ছেলেও ওই স্কুলে পড়ে। প্রাইজ পেয়েছে। পড়াশোনায় না। রান দিয়ে। গোটা বীণাপাণি জানে যে রান হলে সুবীর ফার্স্ট হবেই। এই নিয়ে তিন বার। তিনটে জলের বোতল দিয়েছে তিনবার। কোনও মানে হয় বলেন?

প্রভাস বলল, আর কতক্ষণ?

সারের তাড়া আছে নাকি? তাইলে বলেন। মন্টু তিনরকম স্পিড দেয়। কলেজ স্পিড। অফিস স্পিড। আর বয়স স্পিড।

অবাক, এই তিনরকম স্পিডের মানে কী?

রিকশাচালক এমনিতেই কথা বলতে ভালোবাসে। সে বলল, কলেজের ছেলেমেয়ে প্রেম পিরিত করার জন্য যখন নদীর ধারে যেতে চায় রিকশায়, তখন কম স্পিড দিতে হয়। তাদের কথা বলা, হাত ধরাধরির টাইম দিতে হয়। তাই একেবারে আস্তে। এটা হল কলেজ স্পিড।

ট্রেন ধরতে যাওয়া লোকজনের জন্য অফিস স্পিড। আমি ঠিক বুঝি না যারা রোজ ট্রেন ধরে, তারা রোজই দেরি করে বেরোয় কেন? দেরি করে বেরোবে আর আমাকে বলবে জোরে চালা। তাদের জন্য অফিস স্পিড।

আর বয়স্ক মানুষজন রিকশায় উঠলে সাবধানে চালাই। রাস্তাঘাট দেখছেন না? গর্ত ভাঙাচোরা। বয়স্কদের মাজা ভেঙে গেলে আমার দোষ। তাই বয়স স্পিড।

সন্ধ্যা লক্ষ্য করল, লোকটা রিস্কা বলছে না। শুদ্ধ ভাবেই উচ্চারণ করছে রিকশা।

প্রভাস বলল, আমরা কোন স্পিডে যাচ্ছি?

রিকশাচালক হেসে বলল, বেড়ানো স্পিড। আপনাদের কোনও কাজ নাই। আপনারা বেড়াতে যাচ্ছেন নদীর ধারে। নদীর কাছে যাওয়ার পর ভাড়া দেওয়ার সময় আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন আমি কি ওখানে রাস্তায় দাঁড়াব কিছুক্ষণ? তাহলে আপনারা আবার আমার রিকশায় ফিরবেন। আমি বলব, কতক্ষণ লাগবে? দিদিমণি বলবেন, বেশিক্ষণ না। আমি বলব, যান। আমি এখানে আছি। ডানদিকে যাবেন না। যেদিকে নৌকা বান্ধা আছে ওইদিকে যান। তাই না?

রিকশার হ্যান্ডেল ধরে প্রভাস আর সন্ধ্যা হো হো হো করে হেসে উঠল। কতদিন পর তারা এভাবে হাসল। মনে মনে তারা মন্টুকে ধন্যবাদ দিল।

এই নদীর নাম চুর্ণী। রিকশা থেকে নেমে মন্টু একটা বিড়ি ধরাল। বলল, আমি এইখানে আছি। আপনারা ঘুরে আসেন।

প্রভাস একটা গাছের ছায়া খুঁজছিল। পেয়েও গেল। অশ্বত্থ গাছের নীচে দুজনে গিয়ে বসল। অদূরে নদী।

প্রভাস বলল, আমরা তাহলে ফিরব না?

সন্ধ্যা বলল, ফিরব না তো বলিনি। বলছি, ফিরবই এরকম ভেবো না। ফকিরচাঁদ বলেছে, মনের ইচ্ছার উলটোটা বেশি করে ভাবতে হয়। বিশ্বাসও করতে হয়। তাহলে যখন মনের ইচ্ছা পূরণ হয় তখন অনেক বেশি আনন্দ হয়। আর একান্তই না হলে তেমন দুঃখ হয় না।

প্রভাস বলল, এই ফকিরচাঁদ লোকটাকে তোমার বিশ্বাস হয়?

সন্ধ্যা বলল, আমাদের কাছে কী আছে যে ধান্দাবাজি করে কেড়ে নেবে? এখনও পর্যন্ত তো উপকারই করেছে। আর মায়ের সঙ্গে যেভাবে লেগে থাকে, মা ওকে যেরকম প্রশ্রয় দেয়, আমার বিশ্বাস লোকটা ঠগবাজ নয়। তবে একটাই ভয় করে। লোকটা হঠাৎ হঠাৎ কীভাবে যেন মনের কথা জেনে যায়। বলেও দেয়। কুসুম নাকি এখানে বেশিদিন থাকবে না।

প্রভাস অবাক হল, বেশিদিন থাকবে না? কেন? একা একা কোথায় যাবে?

সন্ধ্যা বলল, সে আমি কী জানি? তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে বলে তোমার মন খারাপ হল নাকি?

প্রভাস বিরক্ত হয়ে বলল, মানে কী?

সন্ধ্যা হাসতে হাসতে বলল, কেন? তোমার উপর তো কুসুমের খুব টান। তোমার কি একটুও থাকতে নেই?

প্রভাস বলল, সন্ধ্যা, সমস্যা কী জানো? মেয়েদের সবথেকে বড় শক্তি হল আবেগ। আর মেয়েদের সবথেকে দুর্বলতাই ওই আবেগ। একটু বড় হলেই মেয়েদের নিজেদের মধ্যে সবথেকে বেশি কথা, স্বপ্ন সবই প্রেম-ভালোবাসা-বর এসব নিয়ে।

এদিকে আমার ভিখারির অবস্থা। আমার নিজের ঘর নেই। এমনকী নিজের দেশ নেই, ঠিকানা নেই। জানি না কাল কোথায় থাকব। আমার থাকা না থাকা নির্ভর করছে একটা দেশের সরকারের উপর।

প্রভাস যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে, আমাদের ভাগ্য কোনদিকে যাবে সেটা কে ঠিক করবে? এখানকার রিলিফ ডিপার্টমেন্টের কয়েকটা লোক! কুমিল্লার রায়চৌধুরীদের মেয়ে সুধাময়ী, আমার মা, বিকেল হলে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে বাতাস নেওয়ার জন্য। একটা ঘরে তাঁর দমবন্ধ লাগে। তাঁকে একটা নিজের ঘর জীবনে আর দিতে পারব? আমরা কোথায় আছি! ওটা আদৌ ঘর? কিছুই না।

প্রভাস থামছে না। বলে যাচ্ছে, আমার ছেলে আর মেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে? কখনও লেখাপড়া করতে পারবে? আর এইরকম একটা সময় তোমার মনে কী আসছে? আমার কুসুমের উপর প্রেম প্রেম ভাব আছে কিনা! একবার ভেবে দ্যাখো, এটা কি খুব স্বাভাবিক? কুসুমের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা করার পর আমি কী করব? তাকে আর তার ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাব? তাকে বিয়ে করব? এখন এসব ভাবার সময়! আমি, রমাপদ, সুবল এসব ভাব-ভালোবাসার কথা ভাবতে পারি? সকাল হলেই যে-যার ধান্দায় বেরিয়ে পড়ি। আর তুমি ঘরে বসে এইসব ভাবো?

এরকম একটানা প্রভাসকে কথা বলতে অনেকদিন শোনেনি সন্ধ্যা। তার প্রচণ্ড লজ্জা হল। এভাবে যে প্রভাসের প্রতিটি কথা তিরের মতো এসে বুকে বিঁধবে সেটা সন্ধ্যা কথাটা বলার আগে ভাবেনি। তার এখন অনুতাপ হচ্ছে।

সন্ধ্যা প্রভাসের হাত ধরে বলল, আমার বলার ভুল হয়েছে। ক্ষমা করে দাও। ফকিরচাঁদ বলেছে কুসুমের যাওয়ার সময় হয়েছে। একথা কেন বলল?

প্রভাস বলল, ফকিরচাঁদ যা বলে, সেটাই মিলে যায় এরকম কোনও প্রমাণ আমরা পাইনি এখনও। সবেমাত্র কয়েকমাস হল তাকে দেখছি। ওসব নিয়ে ভেবো না।

সন্ধ্যা বলল, তবে তুমি মা সম্পর্কে যা বললে, সেটা ঠিক নয়।

প্রভাস বলল, মানে?

সন্ধ্যা নদী দেখতে দেখতে বলল, মা কলোনির মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে কিছু একটা করতে চাইছে। যাতে আমরাও কিছু কিছু রোজগার করি। তাই বিকেলে মা সব ঘরে ঘরে যায়।

প্রভাস ভুরু কুঁচকে বলল, রোজগার করবে? তোমরা? কী রোজগার করবে?

সন্ধ্যা বলল, মা বলেছে আমরা কলোনির মেয়েরাও যেন সংসারের কাজে আসি। মা মনে হয় রিলিফ অফিসে যাবে এর মধ্যে। কিছু টাকার ব্যবস্থা করতে।

প্রভাস এসবের কিছুই জানে না। বুঝতে পারছে না। বলল, তারপর?

আমরা সকলে জামাকাপড় তৈরি করব, আমের আচার, চাটনি, ঝুড়ি তৈরি করব। আর সেগুলো বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করবে তোমরা।

প্রভাস বলল, এসব মায়ের প্ল্যান?

সন্ধ্যা বলল, হ্যাঁ।

প্রভাস আশ্চর্য হয়ে গেল। যুগীগঞ্জের সংসারে মা ক্রমেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। বেশি কথা বলত না। জপ, পড়া, বাচ্চাদের কাছে রাখা আর গ্রামের বাছাই করা বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বলেই তাঁর সময় কাটাত। সেই মা এখানে এসে মাত্র তিন চার মাসে বদলে গিয়েছে।

দিদিমণি এবার যাবেন তো? পাঁচটা দশের ট্রেনে আমার প্যাসেঞ্জার আছে। মন্টুর গলা পাওয়া গেল।

প্রভাস আর সন্ধ্যা উঠে পড়ল। তাদের বাস সাড়ে চারটেয় ছাড়ার কথা। চারটে দশ বেজে গেছে। প্রভাসের উদ্বেগ আছে। সন্ধ্যার মন প্রফুল্ল। কতদিন পর তারা এভাবে দুজনে সারাদিন একসঙ্গে কাটাতে পারল! জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুর জন্য এরকম একটা বিকেল পাওয়া গেল।

রিকশায় উঠে প্রভাস রিকশাচালককে বলল, মন্টু দেরি হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চালাও।

রিকশাচালক বলল, হাতে ভাড়াটা রেডি রাখেন। চার আনা বেশি দেওয়ার কথা মনে রাখবেন। তাড়া থাকলে হাতে সর্বদা সঠিক ভাড়া বের করে রাখতে হয়। যাতে নামার পর ব্যাগ থেকে খোঁজাখুঁজি করতে না হয়।

বলেই প্যাডেলে চাপ দিয়ে বলল, হ্যান্ডল ধরে রাখেন। এখন হবে অফিস স্পিড!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *