৪
হাতে দা নিয়ে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে সন্ধ্যা। ছাদে রয়েছে বাবু। মুহূর্তে যেন চক্রব্যুহ তৈরি হল। কারণ হামলাকারীদের আশেপাশে এসে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশীরা। সবার আগে চিৎকার শোনা গেল লতিফের। তাঁর হাতে বল্লম।
লতিফ বাঘের মতো এসে পড়ল সামনে। বলল, অ্যাই পুঙ্গির পুতের দল! কইত্থিকা আইছস এহেনে! কে পাঠাইছে? এহনই কয়ে ফ্যাল। নয় এহেনেই দাফনের ব্যবস্থা হবে! বল্লম তুলে তাক করলেন লতিফ!
এক যুবক এবার বলল, আরে মিয়া, মাথাডা খারাপ হইছেনি তুমার! কাফের হিন্দুদের লাইগ্যা জাতভাইরে আঘাত করবা?
বাবুর বন্ধু আসলামের আব্বু লতিফ। তিনি হুংকার দিলেন, অই শালা! তুই মোগো কীসের জাতভাই! তরা তো বেজাত, বেইসলাম। জাত কেউটা সাপ! আমাগো সনে তদের কুনও সম্পর্ক আছে নাকি? মাণিকপুর থিক্কা আইছে বুঝছি। সেহেনে হোসেন মোল্লা এইসব তদের মাথা খাইছে। এই হল যুগীগঞ্জ। আমরা থাকতি এইসব হইব না। কয়ে দিলাম। এখনই পালা। এখনই। নয়তো আজই জাহান্নামে পাঠামু।
ততক্ষণে হিন্দু প্রতিবেশীরা ছুটে এসে প্রভাসকে তুলে ধরেছে। বাড়িতে ঢুকিয়ে নিয়ে গেল তাকে। লতিফের আশেপাশে ভিড় জড়ো হয়েছে। তার নিজের আত্মীয়স্বজনই এক দঙ্গল। সুতরাং তাদের দেখে ওই হাঙ্গামাকারীর দল পিছু হটল। পুকুরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, এইডা ঠিক করলা না! বিষয়টা শ্যাষ হইয়া গেল এমন না। শুরু হইল। দ্যাখবো কীভাবে বাঁচাও। এই গ্রাম খালি করব আমরা! ইনশাল্লা! আর দরকার পড়লে তোমারেও!
লতিফ সঙ্গে সঙ্গে বর্শা ছুড়ে মারল সামনে। একজনের পায়ে বিঁধে গেল। সে আর্তনাদ করে পড়ে গেল মাটিতে। গেল লতিফের ভাই আরশাদ। গিয়ে বলল, এরপরেরটা বুকে বিঁধব! যাঃ পালা, কুত্তার দল! আর এই পানে আইলে জ্যান্ত দাফন, মনে রাখবা! হোসেনরে কইয়া দিস একথা আরশাদ কইছে!
ততক্ষণে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সুধাময়ী। তাঁকে দেখে বল্লম ফেলে এগিয়ে আসে লতিফ। কাছে এসে হাত ধরে বলে, খালা, তুমি ভাইব না! আমরা আছি!
সুধাময়ী চিন্তিত হয়ে লতিফের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তর পাশে তর দিকের কয় জনা আছে লতিফ? তুই একা নাই তো! আগে হেইডা ভাবিস! সুলতার বাড়িতে এই গ্রামের মুরুব্বিরাই কিন্তু কইয়া আইছে যে আর গ্রামে থাকা সুবিধার নয় হিন্দুদের! তারা তো আমাদের চেনা মানুষ লতিফ! তারাও যদি এই কথা কয়, তুই একা কয়জনার সাথে লড়বি বাবা!
লতিফ দিশাহারা চোখে তাকিয়ে হঠাৎ হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে বলল, খালা তুমি চইল্যা যাইও না। সব ঠিক হইয়্যা যাইব। আমি কইতাছি!
সুধাময়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখলেন, অদূরেই স্থির দৃষ্টিতে কারা যেন তাকিয়ে আছে। মওলানা আশফাকউদ্দিন সামনে দাঁড়িয়ে। তার সঙ্গে বেশ কয়েকজন চেনা পরিচিত গ্রামের মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন প্রভাসের স্কুলের বন্ধু আফতাব। সে এগিয়ে এসে লতিফকে বলল, একবার দরগায় আসিস আজ!
সুধাময়ী এদের চোখ পড়তে পারলেন না। চেনা মানুষদের চোখের ভাষা তাঁর অচেনা লাগল।
সারারাত ঘুম হয়নি। শেষরাতে সামান্য ছেঁড়া ছেঁড়া তন্দ্রা। প্রভাস শুধুই এপাশ ওপাশ করেছে নিজের খাটে, সেটা টের পেয়েছে সন্ধ্যা। মনোজ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ভরসা হয়নি। যদি রাস্তায় আবার কিছু হয়। তাই কোনওমতে বাড়িতে থাকা লাল রঙের ওষুধ প্রভাসের ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিয়েছে সন্ধ্যা।
প্রভাস যতটা শরীরের যন্ত্রণায় কাতর, তার থেকে অনেক বেশি যেন অবাক হয়েছে। সন্ধ্যাকে সে কয়েকবার বলেছে, এরকম তো কখনও হয়নি। এই গ্রামেও এসব শুরু হল! কিন্তু আমাকে তো ওই মাণিকপুরের রাস্তায় দোকানে যেতে আসতে হবে। কাল আমাকে সাইকেল থেকে নামিয়ে মারবে। পরশু আবার আমরা ওদের কাউকে এই গ্রামে দেখলে পালটা মারব। কিন্তু এভাবে কতদিন? আমরা তো হিন্দু। শেষ পর্যন্ত মাইনরিটি। মার খেতে হবে। থানা আমাদের কতকাল আগলে রাখবে? আমার তো মনে হয় অন্য কিছুর জন্য তৈরি থাকতে হবে।
সন্ধ্যা বলেছে, আগেই এত কিছু ভাবছ কেন? এখানে তো সরাসরি কিছু ঘটেনি। হঠাৎ করে এরকম হয়ে গেল আমাদের সঙ্গে। রমা ঠাকুরপো কেমন আছে কে জানে?
সন্ধ্যা উঠে পড়েছে ভোরেই। শাশুড়ি সুধাময়ীর ঘরে একবার উঁকি মেরে দেখেছে তিনি জানালার সামনে বসে আছেন। চোখ বন্ধ। জপ করছেন? সন্ধ্যা বুঝতে পারল না। তবে সুধাময়ী কাল থেকে যেন অনেক বেশি চুপচাপ হয়ে গিয়েছেন।
সন্ধ্যা উনুন জ্বালাতে বসল। এই প্রথম তার চিন্তা হচ্ছে সংসার খরচের টাকা নিয়ে। টাকাপয়সা তো হাতে তেমন নেই। সদরে এখনও চলছে তাণ্ডব। কালই মালতী বলেছে ঢাকার রাস্তায় মহল্লায়, স্কুলে নাকি ঘরছাড়া হাজার হাজার মানুষকে দেখেছে। মালতী সন্তানসম্ভবা। গ্রামেরই মেয়ে।
সুলতা আর সুধাময়ী কমবেশি একই সময়ে এই গ্রামে বিয়ে হয়ে এসেছেন। সেই থেকেই দুজনের বন্ধুত্ব। সুলতামাসির স্বামী ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করতেন। তাদের দুই মেয়ে এক ছেলে। এক মেয়ে রাজশাহীতে থাকে। ছোট মেয়ে মালতী থাকে ঢাকায়। পল্টন বাজারের এক অফিসে কাজ করে ওর স্বামী। সন্তান-সম্ভবা অবস্থায় ঢাকায় থাকাই সবথেকে সুবিধাজনক। সুলতাকে বহুবার বলেছে মালতী আর তার স্বামী, তাদের কাছে ঢাকায় গিয়ে থাকতে। সেখানে মালতীরা স্বামী-স্ত্রী একাই থাকে। মালতীর শ্বশুরবাড়ি টাঙ্গাইল। স্বামী নরেনের ঢাকায় চাকরি। তাই সে বাসা ভাড়া নিয়েছে। একা একা তার পক্ষে স্ত্রীর এই অবস্থায় সামলানো সম্ভব নয়। আর তাছাড়া এসব সময় নিজের মায়ের কাছেই থাকা বেশি সুবিধাজনক।
কিন্তু সুলতার এতকাল পর অন্য কোথাও গিয়ে রান্নাঘরে কোথায় কী আছে, কোন আলমারি খুলতে নেই কিংবা কখন কী কী হয় এই সংসারে, সেসব জানার ইচ্ছা নেই। তিনি বলে দিয়েছেন মালতীকে যুগীগঞ্জেই এসে থাকতে হবে। আর যুগীগঞ্জ, মাণিকপুর, নিমাইসড়কের মতো গ্রামের বউদের বাচ্চা কি হচ্ছে না? সবাই কি ঢাকায় মেডিকেলে যায়? তাই মালতীই আপাতত মা-বাবার কাছে এসে থাকছে।
ওই মুসলমানগুলোর হাঙ্গামার আগে কালই সকালে মালতী এসেছিল। সন্ধ্যাকে কথায় কথায় জানিয়েছে, তার বরের চিঠিতে কী কী লেখা। নরেন লিখেছে, ঢাকায় আগুন জ্বলছে। নবাবপুর রেল ক্রসিংয়ের সামনে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করে তাদের রক্ষা করতে গিয়ে দুষ্কৃতীর হাতে নিহত হয়েছেন আন্তর্জাতিক নজরুল ফোরামের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট কবি গবেষক আমির মোহেদ চৌধুরী। মোহম্মদপুরে হিন্দু ছাত্রীদের হস্টেলে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
নরেনের হয়েছে উভয় সঙ্কট। একদিকে মালতী রয়ে গেছে যুগীগয়ঞ্জে। আবার নরেনের নিজের বাড়ি টাঙ্গাইলের পরিবারও চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ঢাকার সব রাস্তাই সিল করে দেওয়া হয়েছে।
সন্ধ্যা ভাবছে, এরকম কতদিন চলবে? যদি সব স্বাভাবিক হয়ে যায়ও, তাহলেও কি এখন আর কেউ জামাকাপড় কেনার বিলাসিতা দেখাবে? সামনে বিয়ের মরশুম। মাঘ ফাল্গুন। তারপর পয়লা বৈশাখ। এরকম সময় এ কী সর্বনাশ হচ্ছে!
হঠাৎ হু-হু করে উঠল সন্ধ্যার বুক। চোখ ঝাঁপিয়ে এল জল। তার প্রিয় গান মনে পড়ল। মন খারাপ হলেই এই গান সে মনে মনে গায়। রেডিয়োতে শুনেছিল।
জলে ভাসা পদ্ম আমি
শুধুই পেলাম ছলনা
ও আমার সহেলি
আমার নাইতো কোথাও কোনও ধাম
বুকের জ্বালা কোথা যে জোড়াই
ও আমার সহেলি
আমার নাইতো কোথাও কোনও ধাম…
শ্যামলদা কেমন আছে খুলনায়? অমূল্যর কাছে খুলনা আর দৌলতপুরের দাঙ্গার কথা শোনার পর থেকেই বুকের মধ্যে গোপন এক চাপ। অমূল্যকে তো জিজ্ঞাসা করা যায় না। শ্যামলদার স্বভাবই হল কারও কোনও অসুবিধা দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়া। সে এরকম সময় তো ঘরে বসে থাকার মানুষ নয়। রূপসা নদীর কাছে সেই বকুল গাছের কথা ভাবছে সন্ধ্যা।
১৯৫২ সালের সেই দুপুর। আফসানা, নিয়তি আর সন্ধ্যা ফিরছিল স্কুল থেকে। রূপসা নদীর সামনে সাইকেল থেকে নেমেছিল শ্যামলদা। ভুরু কুঁচকে বলল, সন্ধ্যা, আজ বিকেলে এখানে একবার আসবে। তোমার সঙ্গে কথা আছে।
ক্লাস নাইনের সন্ধ্যার বুক ধরাস ধরাস করছিল। কথা আছে? কী কথা? শ্যামলদা শুধু এলাকার এক দুর্দমনীয় তরুণ নয়, সকলের খুব প্রিয়। সন্ধ্যার বাড়ির লোকজনও খুব পছন্দ করে। তাদের বাড়িতে শ্যামলদা আসে। কলেজ পাশ করে গিয়ে এখন ওকালতি পড়তে শুরু করেছে। সন্ধ্যার বাবা উকিল। তাই তাঁর কাছে কিছু কিছু বিষয় জানতে আসে।
শ্যামলদাকে মুড়ি আর নাড়ু দেওয়ার জন্য একবার তার হাতে বাটি দিয়েছিল মা। সেই বাটি নেওয়ার সময় অজান্তেই শ্যামলদার আঙুল স্পর্শ করেছিল সন্ধ্যার করতল।
অল্প বয়সের নারীরাও স্পর্শসচেতন হয়ে ওঠে। কোন স্পর্শের মধ্যে কী ইঙ্গিত আর মনোভাব থাকে সেটা বোঝা নারী মনের সহজাত প্রবৃত্তি।
সন্ধ্যা ততদিনে জেনে গেছে খারাপ স্পর্শ। ছোটপিসির বিয়ের রাতে বরযাত্রীদের মধ্যে এক যুবক সন্ধ্যার পিঠে হাত রেখেছিল। তৎক্ষণাৎ সন্ধ্যা সংকুচিত হয়ে গেছিল। সেই ছেলেটি তারপর ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে বলেছিল, বাসর জাগবে তো? তার আর বাসর জাগা হয়নি।
শ্যামলদার আঙুলের ছোঁয়া এরকম ছিল না। তবে শ্যামলদা হাত সরিয়ে নিয়ে মুড়ির বাটি ধরে সামান্য কয়েক মুহূর্ত তার দিকে চেয়েছিল। সন্ধ্যার অন্তরাত্মা যেন অবশ হয়ে গেছিল। শ্যামলদার চোখই কি বলে দেয়নি যে সে কী বলতে চায়?
তারপর থেকে যতবারই শ্যামলদা এসেছে বাড়িতে, তার চোখ খুঁজেছে সন্ধ্যাকে। আর সন্ধ্যাও যেন সেই চোখের কথা পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আড়াল থেকে সন্ধ্যা শুনেছে শ্যামলদা আর বাবার কথাবার্তা। শুধুই যে ওকালতি শেখা তাই নয়। শ্যামলদা বাবার কাছে জানতে চাইত ঢাকার খবর। সন্ধ্যা শুনে কিছু কিছু বুঝত।
সেদিন রোজকার মতোই আফসানা ডাকতে এসেছিল সন্ধ্যাকে। দুজনে সোজা চলে গিয়েছিল রূপসা নদীর কাছে সেই জায়গায়।
দূর থেকে শ্যামলদাকে দেখে সন্ধ্যার অবাক হয়েছিল। শ্যামলদা সিগারেট খায়? সিগারেট খাওয়া কি ভালো? সিগারেট খায় জানতে পারলে শ্যামলদাকে বাবা, মা তাদের বাড়ির মানুষ কি এরকমই পছন্দ করবে?
শ্যামলদা বলেছিল, কী, ওরকম ভ্রু কুঁচকে আছ কেন? সন্ধ্যা তার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে শ্যামলদা হেসে বলেছিল, ওহ! সিগারেট খাওয়া তুমি বুঝি পছন্দ করো না? আচ্ছা তাহলে আর খাব না!
সন্ধ্যার মনের মধ্যে আবার রূপসার জলের কুলুকুলু ধ্বনি। তার পছন্দ অপছন্দ এত মূল্যবান শ্যামলদার কাছে?
এই কেনর উত্তর যাই হোক, সন্ধ্যা মনে মনে যা চায় সেটাই ভেবে নিতে ইচ্ছা করল। অর্থাৎ শ্যামলদা তাকে ভালোবাসে।
শ্যামলদা বললল, সন্ধ্যা, ওকালতি ব্যাপারটা এক পুরুষের পেশা নয়। পেশা মানে জানো তো? মানে যা থেকে মানুষের আয় হয়!
সন্ধ্যা জানে! কিন্তু এটা বলার কারণ কী?
শ্যামলদা শেষ না হওয়া সিগারেট ছুড়ে ফেলে বলল, চলো নদীর পাশে বসি। তারা দুজনে বসল। আফসানা একটু হেসে চলে গেল অন্য দিকে।
এসব কেন বলছ আমাকে? সন্ধ্যা জানতে চেয়েছিল।
শ্যামলদা বলেছিল, তোমার মন আমারে যে জানতে হবে সন্ধ্যা।
আমার মন? মানে?
মানে আবার কী? তুমি জানো না, তোমার মন কী চায়?
পাশাপাশি দুজনে বসে আছে। সামনে বয়ে যায় রূপসা। শ্যামলদার কথাটা শুনে সন্ধ্যা চকিতে তাকায় শ্যামলদার দিকে। দেখতে পায় শ্যামলদা তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে।
সন্ধ্যা মুখ নামিয়ে বসে থাকে। সে ঠিক জানে না এরকম সময় কী বলতে হয়! এই ষোলো বছরের জীবনে এরকম কোনও প্রশ্নের সামনে সে তো আগে পড়েনি। মা মাঝেমধ্যে তাকে রান্নাঘরে শিখিয়ে দেয় রান্না করা। বিয়ের পর অচেনা বাড়িতে গেলে কীভাবে কথা বলতে হবে, কী কী করতে হয়, সেসবও শিখিয়েছে। কিন্তু এরকম সময় কী করতে হয়? আর তার এত বড় সাহস হল কেন? শ্যামলদা এরকম বিকেলে সবার চোখের সামনে তাকে নদীর তীরে ডাকল। সে এক ডাকে চলেও এল! এখন কেউ যদি তাদের দেখতে পায়? বাবাকে বলে দেয়?
শ্যামলদা বললে, কিছু বলছ না তো?
আমি তো জানি না।
শ্যামলদা একটা শ্বাস ফেলে বলল, আমি ওকালতি পড়ছি। আমাদের পরিবারে কেউই কখনও ওকালতি করেনি। ওকালতি ব্যাপারটা এমনই যে পসার জমতে জমতে অনেক বছর চলে যায়। তোমার বাবাকে দেখতে পাও? তোমার দাদু উকিল ছিল। তোমার বাবাও উকিল। দাদুর মক্কেলরাই তোমার বাবার মক্কেল। তাদের সুবাদেই তোমার বাবার পসার। তাই আমার সামনে দুটো চিন্তা। এক হল, এই ওকালতিতেই থেকে যাওয়া। কিন্তু তাহলে তোমাকে বিয়ে করব কীভাবে? কবে আর আমি নিজের মতো করে দাঁড়াব!
সন্ধ্যা কি ভুল শুনল? শ্যামলদা ওটা কী বলল? তাকে শ্যামলদা বিয়ে করবে? কিন্তু শ্যামলদা তো কোনওদিন তাকে কিছুই বলেনি! শ্যামলদার সঙ্গে বিয়ে দেবে তার বাবা? সবাই পছন্দ করে শ্যামলদাকে। কিন্তু পাত্র হিসেবে কি পছন্দ করবে?
সন্ধ্যা তাকিয়ে দেখল শ্যামলদা হাসছে। সন্ধ্যাকে কিছু বলতে না দিয়ে হঠাৎ শ্যামলদা সন্ধ্যার বাঁ-হাত ধরে নিজের হাতে নিল। বলল, আমি সোজাসুজি বললাম এবার বলো, আমি কী করব?
সন্ধ্যা অবশ হয়ে যাচ্ছে! এসব কি ঠিক হচ্ছে? সে কি শ্যামলদার কাছে মনের দিক থেকে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে? এই যে সময়টা চলে যাচ্ছে এখন, এই সময়টার উপর নির্ভর করছে তার জীবন। তার ভবিষ্যৎ? বিয়ে শ্যামলদাকে? কবে? যদি কেউ রাজি না হয় তাহলে কি ওদের পালিয়ে যেতে হবে?
সন্ধ্যা বলল, আমি চাই তুমি তোমার যেটা ইচ্ছা সেটাই করো। ওকালতিই পড়ো।
শ্যামলদা সন্ধ্যার হাতে চাপ দিল। বলল, তোমার এখনও হয়তো বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু এই যে তুমি আমার নিজের ইচ্ছার কথাটা বুঝতে পেরেছ, এটার কী নাম জানো তো?
সন্ধ্যা মাথা নাড়ল।
সন্ধ্যা শ্যামলদার আর একটা হাত হাতে নিল। সন্ধ্যা বলল, আবার কবে দেখা হবে?
শ্যামলদা বলল, কাল তো তোমাদের বাড়ি যাব!
সেরকম নয়। এরকম দেখা!
খুব তাড়াতাড়ি। এবার ওঠো!
দুজনে উঠে পড়ল। আফসানাও অদূরে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাবা সেদিন কোর্ট থেকে এসে বলল, একুশে হরতাল হবে ঢাকায়। শোনলাম এহেনেও নাকি হাঙ্গামা হইব। এ কয়দিন ইশকুল যাইস না কেউ। হরতালে কখন কী হইব কে জানে!
কীসের লাইগ্যা হইতাছে এইসব ঝামেলা? সন্ধ্যার মা প্রশ্ন করে।
বাবা উত্তর দেয়, এতদিন ধইব়্যাম এত কথা চলত্যাছে, এহেনেও মিছিল হইছে, কিছুই জানো না তুমি!
সুলতা বলল, আমারে বলবে কে? আমি তো খাওন দেওয়ার লইগ্যা আছি। কেউ কোনও কথা কও আমারে?
সুলতার অভিমান অন্যদিন হলে সন্ধ্যাকে স্পর্শ করত। আজ তার সংসারের কথাও স্পর্শ করছে না। আজ তার মনে আর জায়গা নেই। সবটা ভরে আছে আজকের বিকেল!
কিন্তু কী হল সেই প্রতিজ্ঞার? কোথায় গেল শ্যামলদা?
