২৫
কোথা থেকে মিসিং?
তা তো জানি না।
তাহলে যে অবুঝমাড়ের কথা বললেন?
স্তুতি বলল, শেষবার ফোন করেছিল। বলেছিল, আজ অবুঝমাড়ে ঢুকব। সুযোগ পেলে তোকে জানাব। চিন্তা করিস না। তারপর থেকে আর খোঁজ নেই। এখানে এসে জেনেছি যে, অবুঝমাড় আপনাদের এই থানার এলাকায়।
নারায়ণপুরের ডিএসপি বীরেন্দর ঠাকুর বলল, এভাবে খোঁজ পাওয়া যাবে না। ওখানে আমরা ঢুকি না। একমাত্র মিশনকে ওরা অ্যালাউ করে। তাও ওরছা পর্যন্ত। ব্লক অফিস। ওখানে রেশন নিতে আসে। আপনারা কোথা থেকে?
বৈশাখ মুখ খুলল। বলল, সুন্দরপুর।
সে তো অনেক দূর! এদিকে আগে কখনও এসেছেন?
বৈশাখ বলল, না।
বীরেন্দর বলল, আপনাদের প্ল্যান কী? আমাদের এখানে ইনফর্ম করবেন। আর তারপর হেঁটে হেঁটে কিংবা একটা গাড়ি অথবা বাসে চেপে অবুঝমাড় ঢুকবেন?
বৈশাখ কিছু বলল না।
বীরেন্দর বলল, হুম, বুঝলাম। এই আমরা যেখানে বসে আছি, এর সবথেকে কাছে যে গেটওয়েটা রয়েছে, সেটার মধ্যে সাতেরোটা গ্রাম পঞ্চায়েত। সত্তরটা ভিলেজ। এইসব গ্রাম থেকে মারিয়ারা যখন রেশন নিতে আসে, তখন ওদের কতটা পথ পেরোতে হয় জানেন? অন্তত সত্তর কিলোমিটার। আসা যাওয়া একশো চল্লিশ কিলোমিটার। পাহাড়ি রাস্তা। তিনটে পাহাড়, কয়েকটা ছোট নদী। গোমাগল, মুরুমভাদা, গোদাই, ঝাড়ওয়াহি, বোতের, হারবেল…এসব গ্রাম জঙ্গলের মধ্যে। দশ বছর আগেও মারিয়া ইনার রোডে ট্রাকে করে রেশনের মালপত্র যেত। পনেরো দিনের মতো জিনিসপত্র নামিয়ে দিয়ে আসত। বছর দশেক হল বন্ধ। রাস্তা করার চেষ্টা হলে মাওবাদীরা উড়িয়ে দেয়। গাড়ি উড়িয়ে দেয়। সোজা কথায় অবুঝমাড়ের বিস্তীর্ণ জায়গায় এখনও প্রশাসন পুলিশ পৌঁছোতে পারেনি। বীরেন্দর বলে যাচ্ছে, শুনুন, অফিসিয়ালি আমরা আপনাদের অ্যালাও করব না। লুকিয়ে যেতে চাইলেও হয় আমাদের, নয়তো মাওবাদীদের হাতে ধরা পড়বেন বা গুলিতে মারা যাবেন। জার্নালিস্টরা কেন যে হিরো হতে চায় বুঝি না। এসব জায়গায় এলে আমাদের একটা ইনফর্ম করে রাখতে হয়। এটাই প্রোটোকল। অ্যাট লিস্ট আরওপি দিয়ে আমরা হেল্প করি। রাস্তায় ল্যান্ডমাইন ছড়ানো। আমাদের পুলিশ ফোর্সের রোড ওপেনিং পার্টি মাঝেমধ্যেই রাস্তা ক্লিয়ার করতে যায়।
বীরেন্দর বলে চলেছেন, আমি আপনাদের মিথ্যা স্তোকবাক্য দিতে চাই না।
স্তুতির দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার দাদা কোথায় সাংবাদিকতা করতে এলেন? অবুঝমাড়। কোন অবুঝমাড়? অবুঝমাড় মানে কী? একটা ছোট গ্রাম? একটা ছোট জেলা? কোনও আইডিয়া আছে আপনাদের? অবুঝমাড় তিনটে জেলা নিয়ে। অলমোস্ট গোয়ার সমান। বস্তার, নারায়ণপুর, বিজাপুর। পাহাড়ে ঘেরা। ইন্দ্রাবতী, গোদাবরী ছাড়াও অন্য অসংখ্য ছোট নদী, ঘন জঙ্গল।
একবার যদি কেউ ঢোকে, চিনে আর ফিরতে পারবে না। এই বস্তার, দান্তেওয়াড়া, সুকমার বিরাট এলাকা জুড়ে আনলিমিটেড যুদ্ধ চলছে। শহরে ক্রিসমাস পার্টি আছে, দশেরা আছে, নবরাত্রি আছে। দেওয়ালি, ফিফটিনথ আগস্ট আছে। এমনকী আপনাদের বাঙালিদের দুর্গাপুজো আছে।
বীরেন্দর নিজের সঙ্গে কথা বলছেন, ওই সব সময়ে এখানে কী হয়? এখানে সারা বছর ধরে চলে অদৃশ্য দাবাখেলা। বন্দুক, আরডিএক্স আর বুবি ট্র্যাপের যুদ্ধ। হয় আমরা মরছি, নয় ওরা। বিরাট এরিয়া ধরে ওরা চালায় নিজেদের গভর্নমেন্ট। নাম দিয়েছে জনতানা সরকার। জনতানা মানে হল জনতা। বলুন তো, ওরা কি আদিবাসীদের সত্যিই ভালোবাসে? তাহলে কেন বাসে ব্লাস্ট করায়? কেশকালের ব্লাস্টে কি শুধু প্যারা মিলিটারি জওয়ানরা মরেছে? গরিব আদিবাসী মেয়ে পুরুষ বাচ্চা মরেনি?
পাঞ্চালি ঠোঁট চেপে ধরে। সেও এটা ভেবেছে। বলল, স্যার, এই অ্যাটাক আর কাউন্টার অ্যাটাকের শেষ কোথায়?
বীরেন্দর বলল, সলিউশন একটাই। ওরা আর্মস ফেলে সারেন্ডার করুক। নর্থ ইস্টে তো এরকম বহু অর্গানাইজেশন সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করছে। আর্মস সারেন্ডার করেছে। ওখানে তো টেররিজম কমছে। মাওবাদীরাও তাই করুক! আচ্ছা, ওরা কি জানে না, ইন্ডিয়ার মতো এত বড় স্টেট পাওয়ারের সঙ্গে লড়াই করা যায় না? তবে আপনারা ইমশনালি কোনও ডিসিশন নেবেন না। নিজেরাই খুঁজতে চলে যাবেন না।
স্যার, মিসিং ডায়েরি বলে একটা ব্যাপার আছে না? পাঞ্চালি জানতে চাইল।
বীরেন্দর বললেন, মানে?
পাঞ্চালি বলল, স্যার আপনি এতক্ষণ ধরে যা যা বললেন, খুব দামি কথা। আমরা অবুঝমাড় সম্পর্কে ধারণা পেলাম। আমাদের একজন ফ্যামিলি মেম্বার আপনার এরিয়ায় এসে হারিয়ে গিয়েছে। আমরা কাকে বলব? আপনাদের। তথাগতর অফিস থেকে মিসিং ডায়েরি করা হয়েছিল দু-মাস আগে। আপনিও বলছেন সেটা জানেন। কিন্তু ইনভেস্টিগেশন কী হয়েছে?
বীরেন্দর বলল, নিশ্চয়ই হয়েছে।
পাঞ্চালি চোখে চোখ রেখে বলল, সেটাই তো জানতে চাইছি স্যার। আপনি আমাদের ইনভেস্টিগেশন ট্রেইল দেখান। কেসটা কে দেখছে? একজন জার্নালিস্ট কাজ করতে এসে মিসিং!
বীরেন্দর সোজা হয়ে বসল, ওয়ান মিনিট। আপনি বলছেন আমাদের এরিয়া থেকে মিসিং। কী প্রমাণ আছে? আপনাকে একটু আগে তো বললাম অবুঝমাড় কতটা ছড়ানো। উনি কোন গেটওয়ে আর কোন পয়েন্ট হয়ে এসেছিলেন কোনও কনফার্মড ইনফো নেই। আমরা কোনদিক থেকে এগোব?
পাঞ্চালি বলল, তার মানে গোটা অবুঝমাড়ে ইনটেলিজেন্স জিরো? মাওবাদীদের মধ্যে আপনাদের এজেন্ট নেই? যারা আপনাদের মাঝেমধ্যেই ইনফরমেশন থ্রু করে?
বীরেন্দর এবার সত্যিই স্তম্ভিত। বললেন, ওয়েট, ওয়েট ম্যাডাম! আপনি কী বলছেন? হাউ ক্যান ইউ সে দ্যাট?
পাঞ্চালি হেসে বলল, আমি তো মিডিয়া মাওবাদীদের বলছি না। আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি আপনাদের কাউন্টার ইনটেলিজেন্স নেই, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?
বীরেন্দর হেসে বলল, আপনি লোকাল মেয়ে। হয়তো সিকিউরিটি সেক্টরে কাজ করেন। আপনার প্রফেশন কী জানি না। বাট সিম্পল একটা কথা বলি। কোনও নতুন মুখ দেখা গিয়েছে কোনও মিটিংয়ে, এমন খবর নেই। থাকলে আগেই ট্র্যাপ করতাম।
থ্যাংক ইউ। এটাই জানার ছিল।
বীরেন্দর বলল, আরেকটা কথা আমাদের কাছে ওনার ছবি নেই। রায়পুরেই বোধহয় পড়ে আছে। আশা করি ছবি এনেছেন। আমরা ট্রাই করব।
পাঞ্চালি স্তুতির দিকে তাকাল। স্তুতি ব্যাগ থেকে ছবি বের করে দিল। হাতে নিয়ে পাঞ্চালি দেখল। চশমার ফাঁকে অসম্ভব উজ্জ্বল দুটো চোখ। ছবিটা সে দিল বীরেন্দরের হাতে।
বীরেন্দর দেখল, স্তুতির চোখে জল।
প্লিজ ডোন্ট বি আপসেট। আমি পার্সোনালি কথা দিচ্ছি, চেষ্টা করব! অবশ্য যদি বেঁচে থাকেন।
স্তুতি কেঁপে উঠল। বৈশাখ ধীর স্বরে বলল, সেই প্রবাবলিটি কি আছে?
বীরেন্দর বলল, দেখুন একজন সাংবাদিককে অপহরণ করে তারপর বিনা কারণে তাঁকে মেরে ফেলে মাওবাদীদের লাভ কী? ওরা জেনারেলি মিডিয়ার গায়ে হাত দেয় না। যদি না কেউ ডাবল এজেন্ট বলে ওদের সন্দেহ হয়। তখন সবার সামনেই জনতানা সরকারের রায়—শ্যুট করে মেরে ফেলো। বাট আপনার দাদা তো তেমন কিছু করেননি। ভাববেন না। আপনাদের ফোন নম্বর দিয়ে যান। আমি কন্ট্যাক্ট করে নেব!
একটা কথা। বীরেন্দর পাঞ্চালির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি সাংবাদিক?
পাঞ্চালি বলল, না স্যার। আমি একটা বিজনেস করি। বাবার গার্মেন্টের শপ। আর একটু আধটু এনজিওর কাজ করি।
বীরেন্দর বলল, রিয়্যালি! উইল ট্রাই টু হেল্প ইউ।
পাঞ্চালিরা বেরিয়ে এল। বৈশাখ বলল, এবার কী?
পাঞ্চালি বলল, পুলিশ লেভেলে আর কিছু করার নেই। তবে আমার ইনস্টিংকট বলছে যে, তথাগতর কোনও ক্ষতি হয়নি। হলে সেটা জানা যেত। যদি আদৌ এই জোনে এসে থাকে সে।
বৈশাখ বলল, আমাদের কি আর কোনও সোর্সে ট্রাই করা উচিত?
পাঞ্চালি তাকাল বৈশাখের দিকে। অন্য সোর্স মানে বৈশাখ কী বোঝাতে চাইছে সেটা সে আন্দাজ করছে। সেটা সে নিজেও ভেবেছে! যুগলপ্রসাদ সেদিন ডেকে স্তুতি আর বৈশাখের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন হেল্প করতে। এরা দুজন তার বাড়িতেও এসেছিল। ওরা প্রায় সমবয়সিই হবে।
পাঞ্চালি বলল, অন্য সোর্স মানে কী বলছ? অবুঝমাড়ে আমরা এন্ট্রি নেব? তার আগে তো জানা দরকার তথাগত কোথায় আছে।
বৈশাখ একটু ইতস্তত করে বলল, না, তা নয়। মানে যদি কোনও সলিড নেটওয়ার্কের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করা যায়! আমাদের হাতে তো বেশি সময় নেই।
পাঞ্চালি বলে, আমাদের হাতে বেশি সময় নেই মানে?
বৈশাখ দ্বিধান্বিত হয়ে বলে, মানে স্তুতি তো এখানে চিরকাল থাকবে না! ওর বাড়ির মানুষেরাও অপেক্ষা করছে।
স্তুতি বলল, শোনো দিদি, বৈশাখের ধারণা ও অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ও দাদাকে খুঁজে বের করতে চায় অন্ধ হওয়ার আগেই।
পাঞ্চালি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, অন্ধ হয়ে যাবে মানে?
স্তুতি বলল, একটা চোখে দেখতে পাচ্ছে না। অন্য চোখও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
পাঞ্চালি বলল, চিকিৎসা হচ্ছে না?
বৈশাখ বলল, ডক্টর চক্রবর্তী দেখছেন।
পাঞ্চালির অবাক ভাবটা যায়নি। সে বলল, এর মানে কী বৈশাখ? আপনি কোনও বড় হাসপাতালে যান। যতটা সম্ভব ট্রাই করে দেখুন। আপনি যেটা বলছেন, তার তো কোনও ভ্যালিড রিজন নেই।
স্তুতি বলল, আছে দিদি। ও চক্রবর্তী ডাক্তারের জয় দেখতে চায়। একবার অন্য শহরে গিয়ে দেখালে ওর চোখ যদি সেরে যায়, তাহলে নাকি সুন্দরপুরে চক্রবর্তীর উপর অনেকের বিশ্বাস চলে যাবে।
কী! পাঞ্চালি বিরক্ত, এটা কি কোনও সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট? চোখ যায় যাক, চক্রবর্তীর উপর বিশ্বাস যেন না যায়!
বৈশাখ বলল, না-না, স্তুতি তুমি ওভাররিয়াক্ট করছ। আচ্ছা আমিই বলছি। পাঞ্চালি, আমি সাউথ ইন্ডিয়ায় যাব চোখ দেখাতে। তবে আমিই বলেছি, আমার সঙ্গে ডক্টর চক্রবর্তীও যাবেন। তাহলে ওখান থেকে ফিরে এসে এখানে চক্রবর্তী বেটার চোখের চিকিৎসা করতে পারবেন।
পাঞ্চালি বলল, বুঝলাম। কিন্তু এই জেদটার অর্থ কী? ডক্টর চক্রবর্তীর হাতে সুস্থ হওয়া? আগে তো ওনাকে চিনতেনই না।
বৈশাখ বলল, ওনার কাছে আমার সেকেন্ড চোখের প্রবলেম ধরা পড়ে। আমরা যদি একসঙ্গেই যাই, তাহলে মর্ডান ট্রিটমেন্টের ব্যাপার একসঙ্গেই জানব দুজনে।
পাঞ্চালি হাত ঘুরিয়ে বলল, আমি হয়তো আপনার লজিকটা ধরতে পারছি না। যাকগে, এখন আমি একটু জগদলপুর যাব।
একটি বাস এসে দাঁড়িয়েছে। জগদলপুর যাবে। পাঞ্চালি বাস ধরল। আর বৈশাখরা এগিয়ে গেল বাসস্ট্যান্ডের দিকে।
স্তুতি বলল, বীরেন্দরের কথা শুনে কী মনে হল?
বৈশাখ বলল, আমি কনভিন্সড! খুবই প্র্যাগম্যাটিক। মনে হল না যে, মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে। আর আমার মনে হচ্ছে, পাঞ্চালিও অন্য কিছু ভাবছে। চিন্তা কোরো না। আমি নিশ্চিত তোমার দাদা ফিরে আসবে।
স্তুতি বলল, দাদাকে আমার খুব দরকার। আমরা দুজনে দুজনকে খুব চিনি। একজন নারী কেমন মানুষ চায়? সে যখন তাকাবে, তাকে দেখে সেই মানুষ বুঝে যাবে যে, সে কী চাইছে। এই ব্যাপারটা প্রেমিকের মধ্যেও চায় মেয়েরা। এটাই হল ভালোবাসা! বাবা দেয়। দাদারা দেয়। প্রেমিক বা স্বামীও দেয়।
একটু শ্বাস ফেলে বলে, দাদা ছাড়া আমার তাই চলা কঠিন। ও এই অভ্যাসটা আমার মধ্যে করিয়ে দিয়েছে। এখন আর আমার কিছু মুখ ফুটে বলতে ইচ্ছা করে না। আমাকে একজনই সম্পূর্ণ বুঝত। সে দাদা। সেই মানুষটি এখন নেই। এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। আবার ধরো, আমি কোনওদিন যা ভাবিনি কারও সম্পর্কে, সেই মানুষটি হলে তুমি। তোমার এই আপাত পাগলামি, তোমার আমাকে মনের কথাগুলো বোঝাতে চাওয়ার মরিয়া চেষ্টা, আমি তোমার কথা বুঝলে তোমার মুখেচোখে ছেলেমানুষের মতো ভালো লাগার আভা, এসব আমার কাছে নতুন। তোমাকেও আমার চাই।
বৈশাখ বলল, স্তুতি, আমার চোখটা…তুমি কেন জড়াবে? বিশেষ সম্পর্কটার মায়ায় একবার ঢুকলে তারপর তুমি সহ্য করতে পারবে আমার অন্ধত্ব?
স্তুতি কানে হাত দিল, উঃ, বারবার এক কথা কেন বল? এই যে তুমি হায়দরাবাদে যাবে, আমি জানি তুমি আবার সেরে যাবে। আমি শুধু দাদাকে খুঁজতে এসেছিলাম। এখানে এসে তোমার দেখা পেলাম। সব পালটে গেল। তোমার মনে হয় না, কে যেন আমাদের দেখা করিয়ে দিল?
বৈশাখ উৎসুক চোখে চাইল।
স্তুতি বলল, যে গাছেরা তোমার সঙ্গে কথা বলে, তারা। কেন সেদিন আমি জঙ্গলের দিকে গেলাম? গাছেরা টেনে নিয়ে গেছিল।
বৈশাখ হেসে বলল, যে কথাগুলো আমার শুনতে ভালো লাগবে, তুমি সেসব কথাই বলছ। অথচ বাস্তব জীবন অন্য! একদিন তোমার চোখে যদি অনুকম্পা অথবা বিরক্তি ফুটে ওঠে, সেই মুহূর্তটা আমার জন্য কতটা অপমান হবে স্তুতি?
তুমি আমাকে এই চিনলে?
কে বলল, জানি না? দাঁড়াও আমার সামনে। এই দেখো আমি চোখ বন্ধ করছি। তোমার হাত বাড়াও। ডান হাত। চোখ বন্ধ করল বৈশাখ।
নারায়ণপুরের বাসস্ট্যান্ড। এখনও সুন্দরপুরের বাস নেই। রোদ থেকে বাঁচতে ওরা একটা জামরুল গাছের নীচে এসে দাঁড়িয়েছে। অদূরে একটি বাসের সামনের সিটে কয়েকটি মেয়ে বাচ্চা নিয়ে বসেছে। বাস যাবে কোন্দগাঁও। উলটোদিকে কাংকের ফরেস্ট। কখন আসবে সুন্দরপুরের বাস? নিঝুম দুপুরে রেডিয়োয় একটা বাঁশি বাজছে।
আজকাল আর অবাক হয় না স্তুতি। সে যন্ত্রের মতো হাত বাড়িয়ে দিল। চোখ বন্ধ করে বৈশাখ স্তুতির বাড়িয়ে দেওয়া ডান হাতের কবজি থেকে ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা একসঙ্গে করে উপরের দিকে ওঠায়। চোখ বুজে।
কনুইয়ের ঠিক প্রান্তে আঙুল থামিয়ে দিয়ে বলে, এই দেখো, এখানে আছে একটা লাল তিল! চোখ বন্ধ রাখে বৈশাখ। তার চোখের পাতা কাঁপছে। তারপর স্তুতির কপালের ডানদিকে এসে পড়া চুল সরিয়ে বৈশাখ বলল, এই হল তোমার সেই কপালের কাটা দাগ। আমি তোমাকে চিনি না? এখনও বলবে?
স্তুতির বুক থরথর করে কাঁপছে! চোখ বন্ধ করে বৈশাখ প্রতিটি কথা ঠিক বলছে। মধ্যাহ্নের এই রুক্ষ মধ্যাহ্ন যেন অলৌকিক আলোর জন্ম দিচ্ছে।
বৈশাখের বন্ধ চোখের পাতায় হাত রেখে স্তুতি বলে, আমাকে ছেড়ে যাবে না তো! বৈশাখ? আমার যে আর কিছু থাকবে না তুমিও চলে গেলে!
বৈশাখ বিড়বিড় করে বলে ওঠে, সূর্যকল্পে এই বিশ্বাস রাখো নিষ্পন্দ মৃত্তিকা/ তোমার রীতিতে সতেজতা হোক চিরস্থায়ী।
দমকা বাতাস দিল। জামরুল গাছ থেকে কয়েকটি পাতা খসে পড়ল স্তুতির ওপর!
