সন্ধিক্ষণ – ২৬

২৬

পাঞ্চালি আজ কাজে মন দিতে পারছে না। আশ্রম থেকে ভীমার সঙ্গে মঞ্জালিও এসেছে আজকে। প্রায় দুই ব্যাগ ভর্তি সাদা কাপড়। তিনটি গ্রামের আদিবাসীদের আসতে বলা হয়েছিল। যেখানে আজ এসেছে সেই গ্রামের নাম সুরাকি বোতা। সুধীরকাকা বারবার পাঞ্চালিকে বুঝিয়ে বলেছেন, বনপার্টি এলে সে কোনও ঝগড়াঝাটি কিংবা তর্কাতর্কি যেন না করে।

আশ্চর্যের বিষয় হল, আজ চিনুক আর কুন্তন তাদের নিয়ে এসেছে রাস্তা থেকে। তাদের সঙ্গে বনপার্টির কেউ ছিল না। কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে একটা বিল্ডিং করা হয়েছিল। কিন্তু করাই সার। ভয়ে কেউ আসে না। কারণ সালওয়া জুড়ুম বনাম মাওবাদীদের লড়াই।

সালওয়া জুড়ুম গোন্দি শব্দ মানে কী? সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছিল, মাওবাদীদের বিরুদ্ধে জন আন্দোলন। মাওবাদীদের উলটো দাবি, নামেই সাধারণ আদিবাসীদের আন্দোলন। আসলে বিস্তীর্ণ দণ্ডকারণ্যের মাটির নীচে থাকা বক্সাইট এবং নানারকম খনিজের প্রতি লোভ দেশের সরকার আর দেশে-বিদেশে কর্পোরেটের। কর্পোরেট এখানে তাদের মিনারেলস প্ল্যান্ট করতে চায়। হাজার হাজার কোটি টাকার খনিজ সম্পদ আহরণ করা হবে মাটি থেকে। রপ্তানি হবে দেশ ও বিদেশে।

বেছে বেছে তাই ঠিক সেইসব গ্রাম, ব্লক ও জেলায় শুরু হয়েছে সালওয়া জুড়ুম, যেখানে খনিজের অফুরন্ত ভাণ্ডার। সালওয়া জুড়ুমের বাহিনিতে আদিবাসী যুবকদেরই নিয়োগ করা হচ্ছে। তাদের পদের নাম দেওয়া হয় এসপিও। স্পেশাল পুলিশ অফিসার। সরকারি বন্দুক হাতে। মাওবাদীদের সিংহভাগ আদিবাসী, এসপিওরাও আদিবাসী।

সুতরাং এখন গ্রামে গ্রামে, ব্লকে ব্লকে যে সঙ্ঘর্ষ চলছে, সেখানে আদিবাসীরাই মারা পড়ছে। আদিবাসীদের হাতে আদিবাসী হত্যা। শূন্য হয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। গ্রামে শুধু হতভাগী মেয়ে আর শিশু। মাওবাদীদের সঙ্গে সংঘর্ষে যাতে সাধারণ মানুষের প্রাণ না যায়, সেই লক্ষ্যে সরকার গ্রামের মানুষকে ট্রাকে করে নিয়ে আসতে শুরু করেছে শহরের কাছে। যাকে বলা হয় স্ট্র্যাটেজিক হ্যামলেটিং। মাওবাদীদের দাবি, এসব আসলে আদিবাসীদের জমি গ্রাম দখলের চক্রান্ত। গ্রাম ফাঁকা করে গ্রামের দখল নাও। খনিজের ভাণ্ডার তুলে দাও কর্পোরেটকে। সরকার বলে, বাজে কথা। মাওবাদীরা যাতে পুলিশের অভিযানের হাত থেকে রক্ষা পেতে গ্রামের মানুষদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে কিংবা দুপক্ষের লড়াইতে যাতে গ্রামবাসী না মারা যায়, সেই কারণেই গ্রামের লোকদের নিরাপদে সরিয়ে আনা হচ্ছে।

মাওবাদীরাও সালওয়া জুড়ুম, জন জাগরণ আন্দোলনকে লাগাতার আক্রমণ করতে শুরু করেছে। এসপিও বনাম মাওবাদীদের অন্তহীন সংঘর্ষে হতদরিদ্র আদিবাসী জনজাতির জীবন বিপর্যস্ত।

এই তো গত মার্চ মাসে কারেমারকা গ্রামে যখন পাঁচজন মাওবাদী গুলি করে সিআরপিএফকে মেরে ফেলল, তার পরপর দুটো সরকারি প্রোগ্রাম শুরু হল। দান্তেওয়াড়ায় সালওয়া জুড়ুম, আর রাজনন্দগাঁওয়ে জন জাগরণ।

গ্রামে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম করতে চায় সরকার। স্বাস্থ্যকেন্দ্র হবে। স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম হবে। সেজন্য রাস্তা চাই, বিল্ডিং চাই। কিন্তু গ্রামের পর গ্রামে মাওবাদীদের বাধা। রাস্তা উড়িয়ে দেওয়া হয়, বিল্ডিং ধ্বংস করা হয়।

তেমনই এক পরিত্যক্ত কমিউনিটি বিল্ডিংয়ের সামনে আজ ভিড়। তিনটে গ্রাম থেকে এসেছে প্রায় ত্রিশ জন গ্রামবাসী। মেয়েরাই বেশি। কিন্তু এই আয়োজন পাঞ্চালিরা করতে পারছে কীভাবে? কারণ দুয়েকটি বামপন্থী দল রয়েছে, যারা মূলস্রোতের রাজনীতি করে। ভোটেও প্রার্থী দেয়। দেশের রাজনীতিতে পরিচিত নাম। তারাই মাওবাদীদের সঙ্গে সংযোগসেতু। তাদের মাওবাদীরা বাধা দেয় না। যদিও তাদের সঙ্গে আদর্শগত মতান্তর রয়েছে।

সেরকমই এক দলের নেতাকে জগদলপুরে গিয়ে অনুরোধ করেছিল পাঞ্চালি। তাদের আশ্রমের কাজও বুঝিয়েছিল। তিনি এসেওছিলেন সুন্দরপুরে। বিশ্বাসযোগ্য না হলে, মাওবাদীরা ভাববে পুলিশের চর। পুলিশ প্রশাসনকেও জানিয়ে রাখতে হয়। নতুবা তারাও ভাবতে পারে এই অর্গানাইজেশন আসলে মাওবাদীদের শাখা। সুতরাং ধরপাকড় শুরু হবে।

সাদা কাপড় সকলকে দেওয়া হবে। সেখানে পেন্টিং করতে হবে। এছাড়া ডোকরার কাজ করে দিতে বলেছে। এই কাজটা আন্তনাড়ের ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে শেখানো হয়েছে। এদের অনেকেই শিখেছে। এই প্রথমবার পাঞ্চালি হাতে টাকা নিয়ে এসেছে। পাঁচজন করে একটি গ্রুপ। প্রত্যেক গ্রুপকে আপাতত পাঁচ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। এই টাকায় তাদের সংসার চলবে।

কাপড়, ডোকরা বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে, সেই টাকা দেওয়া হবে মেয়েদের। প্রতিটি গ্রুপ পাঞ্চালিকে প্রথম দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা ফেরত দেবে। যত দ্রুত টাকা তারা ফেরত দেবে, ততই পরের ধাপে বেশি টাকা পাবে। এক কথায় প্রথম এই মাইক্রোফিনান্স প্রজেক্ট স্বনিযুক্তি মহিলা গোষ্ঠীর মাধ্যমে করতে চাইছে পাঞ্চালি। এই ভাবনা কোথা থেকে পেয়েছে সে? সুধাময়ীর থেকে।

পাঞ্চালি ফকিরচাঁদের কাছ থেকে জেনেছে কুপার্সে এরকম সেল্ফ হেল্প গ্রুপের মতো করে মেয়েদের সমিতি করেছিলেন সুধাময়ী। খুবই আশাপ্রদভাবে সেটা শুরু হয়, তারপর সেখান থেকে চলে আসতে হয়।

ফকিরচাঁদ যখন শুনলেন, পাঞ্চালি এই কাজ করতে যাচ্ছে, বলেছিলেন, আমি জানতাম যে, মা জননী আমাগো ছাইড়্যা যাননি। তিনি তর মইধ্যে আছেন। নইলে এটা খুব আশ্চয্যি নয় যে, ঠিক যা যা মা ঠাকরুন কইব়্যাছিলেন, আজ তিরিশ বছর পর সেই সেই কাজ তর হাত দিয়া হইতাছে, এইডা হয় ক্যামনে?

পাঞ্চালি আদিবাসী মেয়েদের তার প্ল্যান বোঝাচ্ছে, আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে! তার একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ধারেকাছে বনপার্টির কেউ নেই! এটা বেশ আশ্চর্য ঘটনা। এভাবে তারা বাইরের লোকদের সামনে আদিবাসীদের ছেড়ে দিচ্ছে?

পাঁচটা গ্রুপ হল। পাঁচজন করে থাকবে। সাম্পানি কোথায়? পাঞ্চালি চিনুককে জিগ্যেস করল।

চিনুক রহস্যময় হেসে বলল, দাঁড়াও ডেকে আনছি।

একটু পরে সাম্পানি এল। টাকার পরিমাণ আর সাদা কাপড়, ডোকরার হিসেব সব খাতায় লিখে নিল।

পাঞ্চালি বলল, সাম্পানি, এই কাজটা আমাদের জন্য কিন্তু খুব জরুরি। যদি তোরা ঠিকমতো পারিস, তাহলে আমার খুব ভালো লাগবে। আমি একা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি সফল হই, তাহলে অন্য অনেক গ্রামে এটা হতে পারে। আমি দুটো ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথা বলেছি। ওরা বলেছে কয়েকটা পাইলট প্রজেক্ট দেখে লোন দেবে।

সাম্পানি বলল, দিদি একবার স্কুলের পিছনে আসবে?

পাঞ্চালি বলল, কেন?

সাম্পানি বলল, একবার এসো, আমার সঙ্গেই এসো।

পাঞ্চালি উঠে যাচ্ছিল, সামনে এসে দাঁড়াল সুধীরকাকা আর ভীমা।

সুধীরকাকা বলল, ও কোথায় যাবে? আমিও যাব।

সাম্পানি পাঞ্চালির দিকে তাকাল।

পাঞ্চালি বলল, কাকা তুমি চিন্তা কোরো না। ঘুরে আসছি।

সুধীর বললেন, নিশ্চয়ই বনপার্টি! ওরা যদি তোকে আটকে রাখে?

পাঞ্চালি বলল, তার জন্য আড়ালে যেতে হবে কেন? ওরা এখানে এসেও সেটা করতে পারে। ওরা তো কেউ নেই আজ! সাম্পানি হয়তো অন্য কাজে ডাকছে।

স্কুলের পিছনে অনেকটা ফাঁকা জমি। সেখানেই রয়েছে কমিউনিটি কিচেন বিল্ডিং। একতলা বাড়ি। দুটো ঘর, সামনে বারান্দা। চতুর্দিক আগাছায় ভরা।

পাঞ্চালিকে নিয়ে ঘরে ঢুকল সাম্পানি। পাঞ্চালি চমকে গেল। একটা কংক্রিটের স্ল্যাবে বসে আছে ক্যাপ্টেন। সেল্ফ লোডিং রাইফেল পাশে রাখা তার। মাথায় টুপি।

হ্যালো ম্যাডাম! কেমন আছেন? ক্যাপ্টেন বলল। সাম্পানি, আমরা একটু কথা বলব। তুমি লক্ষ্য রেখো, এদিকে কেউ না আসে।

পাঞ্চালি বাধা দিল না। কোনও মন্তব্য করল না। নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। এই ঘরে চারটে ওরকম কংক্রিটের স্ল্যাব কমিউনিটি কিচেনের ভাবনায় বানানো।

ক্যাপ্টেন সামনের স্ল্যাব দেখিয়ে বলল, বসুন।

পাঞ্চালি বসল।

ক্যাপ্টেন চুপ। পাঞ্চালিও। আজ লোকটাকে অন্যরকম লাগছে। আনমনা।

পাঞ্চালি বলল, আমাদের ফিরতে হবে। আপনি কী জানতে চাইছেন? আমাদের প্রজেক্টের প্ল্যান?

ক্যাপ্টেন বলল, আপনাদের প্ল্যান শাহজির কাছে শুনেছি। খুবই ভালো আপনার এই স্কিম। এরকম মাইক্রো লেভেলের সেল্ফ হেল্প গ্রুপ হলে ভালোই হবে। চিন্তা করবেন না, এরা আপনাদের টাকা ফেরত দিয়ে দেবে। এরা শহুরে মানুষের থেকে অনেক বেশি সৎ। দানের টাকায় ক্ষুণ্ণিবৃত্তি এদের ধাতে নেই। তাই জঙ্গলে জঙ্গলে নদীতে নদীতে এদের দিন কাটে। কিন্তু এই সরকার সেটাও বন্ধ করে দিচ্ছে। ফরেস্ট রাইটস আইন নিয়ে এসে এদের জঙ্গলে যাওয়া আটকাচ্ছে। এদের জমির উপর নজর দিচ্ছে।

পাঞ্চালি বলল, আপনি কি আমাকে আপনাদের পার্টি আদিবাসীদের রক্ষা করতে কেন এই পথ নিয়েছে সেটা বোঝানোর জন্য ডাকলেন?

ক্যাপ্টেন বলল, না। আমি শুধু আপনাকে বলতে চাইছিলাম, আমাদের হয়তো আর দেখা হবে না। সাউথ দণ্ডকারণ্য জোন থেকে আমায় চলে যেতে হবে। চিরুনি তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। একদিকে প্যারা মিলিটারি, আরেকদিকে সালওয়া জুড়ুম। আপাতত আমরা রিট্রিট করছি।

একটু থেমে সে আবার বলে, কোনদিকে যাব সেটা বলা যাবে না। তবে আপনি যে কাজটা এখানে করছেন, সেটা যাতে কোনওভাবেই ডিসটার্বড না হয়, সেটা আমার প্রথম কাজ। চিনুক, সাম্পানিদের সঙ্গে আমি কথা বলে দেখেছি ওরা আপনাকে দেবীর মতো সম্মান করে। আপনি ওদের রোলমডেল। জানি না, আমার পরে এই জোনে দলের পক্ষ থেকে কাউকে পাঠানো হবে কিনা। জানি না, তারা আপনাদের অ্যালাউ করবে কিনা। তবে আমি নিজে জোনাল কমিটিতে আপনার প্রজেক্টের কথা বলেছি।

পাঞ্চালি অবাক হল। তার প্রতি এমন বদান্যতার কারণ কী? সে বলল, এই ওভার অ্যাকশনের কারণ কি ওই সুকমার বাসে ব্লাস্ট হওয়া?

মাথা নাড়ে ক্যাপ্টেন, হ্যাঁ। ওটাই কারণ।

পাঞ্চালি বলল, আপনাকে একটা ছোট প্রশ্ন করছি। এই যে বাসে ব্লাস্ট করা হল, সরল একঝাঁক সিআরপি, আর তেতাল্লিশ জন সাধারণ মানুষ, যাদের বেশিরভাগ আদিবাসী। আমরা জানি আপনাদের টার্গেট সিআরপি। বলুন তো, আদিবাসীদের কী অপরাধ? পুলিশ গ্রামে গ্রামে রেইড করে, অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায় গ্রামবাসীকে, গুলির লড়াইয়ে মারা যায় সাধারণ মানুষ। তখন বলে কোল্যাটারাল ড্যামেজ! সব যুদ্ধেই নাকি হয়। কিন্তু এদের পরিবার কেন বিশ্বাস করবে যে, আপনারা এদের ভালো চান? এদের হত্যা করে এদের ভালো চান?

ক্যাপ্টেন শ্বাস ফেলে বলল, আমি আপনার সঙ্গে একমত। এই ব্লাস্টের পক্ষে একটাও যুক্তি দেব না। আর যে বাসে সিকিউরিটি ফোর্স আসে তাকেই আমরা টার্গেট করি বলেই এই ট্রেন্ড হয়েছে। আসলে সাধারণ মানুষেরও ওই একই বাসে যাতায়াত। ওরাই ঢাল করছে সাধারণ মানুষকে। তাই তাদের শিক্ষা দেওয়ার বিকল্প হয়তো ছিল না। তবে আমি এই ডিসিশনের বিরোধী। এরপর আমাদের সাপোর্ট বেস বলে কিছু থাকবে না।

পাঞ্চালি বলল, আমি কয়েকদিন আগে একজন পুলিশ অফিসারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এভাবে কতদিন চলবে? সলিউশন কী? আপনাকেও একই প্রশ্ন করছি। এই লড়াই কি চলতেই থাকবে? হত্যার রাজনীতি, উন্নয়নকে আটকে দেওয়া, আদিম যুগে রেখে দেব গ্রামগুলোকে, নির্বাচিত সরকার নয়, আমাদেরই এক সমান্তরাল শাসন চলবে, এসবের মধ্যে কমিউনিজম কোথায়? এর মধ্যে কি ডিকটেটরশিপ নেই?

ক্যাপ্টেন বলল, আছে তো! বিকল্প কী? লোভী সরকার, মুনাফাবাজ কর্পোরেট, আদিবাসীদের জমি হাঙরদের কাছে চিরকালীন দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া?

দাসত্ব কেন? পাঞ্চালি বলল, সরকার স্কুল করছে, স্কিম করছে, ফান্ডিং দিচ্ছে, ট্রেনিং দেওয়াচ্ছে। সরকার সব ব্যাপারেই ভালো, সেটা বলছি না। কিন্তু আপনার মনে হয় না, যা চলছে তাতে সবথেকে বড় ক্ষতি হচ্ছে আদিবাসীদেরই? এই যে আপনি এত বড় ব্লাস্ট হয়েছে বলে নিজেকে রক্ষা করতে এই জোন থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন, আদিবাসীরা কোথায় যাবে? এই রণক্ষেত্র আপনারাই তৈরি করলেন, এখন আপনারাই চলে যাবেন?

ক্যাপ্টেন মাথা নিচু করল। তারপর বলল, আপনার কথার অনেকটাই ঠিক। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না যে, আমি কি এতদিন ধরে ভুল করলাম?

পাঞ্চালি চমকে উঠল। বিপরীত যুক্তি খাড়া করার বদলে লোকটা অনুতাপের সুরে কথা বলছে? সত্যিই কি ও ভুল বুঝতে পারছে? সে বলল, কিছু মনে করবেন না, অনেকদিন ধরে এই প্রশ্ন আমার মন তোলপাড় করেছে। আপনার মতো কাউকে সামনে পাইনি।

ক্যাপ্টেন বলল, দেখুন আমার আসল নাম পরিচয় আপনাকে বলিনি। বাঙালি হয়ে এই দণ্ডকারণ্যে এসে এক বাঙালি মেয়ের কাজ আর মনের জোর দেখে চমকে গিয়েছিলাম। আমি জানি আপনার কাজটা জেনুইন।

পাঞ্চালি বলল, আপনাদের শেষ লক্ষ্য কী? আপনারা কী অর্জন করতে চাইছেন?

ক্যাপ্টেনের দীর্ঘশ্বাস পড়ল। বলল, এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। আমি সত্যিই জানি না এই পথের শেষ কোথায়।

পাঞ্চালি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আজ ২০০৫ সাল। ২০২৫ সালেও কি এই ঘটনার কোনও ফারাক হবে? মাঝখান থেকে একের পর এক আদিবাসী জেনারেশন ধ্বংস হয়ে যাবে।

ক্যাপ্টেন হঠাৎ দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পরে মুখ তুলে ক্যাপ্টেন বলল, যাক গে, আপনাকে যেটা বলার, সেটা হল, আমি জোনাল কমিটিকে রাজি করাব। আপনি যে ব্লকে কাজ করছেন, সেটা আমাদের কবজায় রাখব না। আপনি সরকারি প্রজেক্ট থেকে উন্নয়নের কাজ আনতে পারেন। আপনার আশ্রমের মাধ্যমেই কাজ হোক।

পাঞ্চালির মাথা ঘুরে গেল। লোকটা বলে কী? এবার তো সে ব্যাঙ্ক লোন পাবে। বিডিও অফিসের প্রজেক্ট নিয়ে আসতে পারবে এইসব গ্রামে। তার স্বপ্ন সত্যি হবে। লোকটা এত বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কেন? মাওবাদীরা দখল করা এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে, এরকম তো শোনা যায় না। এটা কি সত্যি? পুলিশ, প্রশাসন, সালওয়া জুড়ুম, যা পারছে না, সেটা তার মতো অতি সাধারণ মেয়ের কাজের ফলে হবে? মাওবাদীরা এই জোন ছেড়ে দেবে? মাওবাদীদের সিদ্ধান্ত? নাকি এই যুবকের একক সিদ্ধান্ত?

ক্যাপ্টেন উঠতে যাচ্ছিল। পাঞ্চালি আবেগরুদ্ধ গলায় বলল, আপনাকে আমার কী বলা উচিত! আমি জানি না। একটাই কথা! বলব?

ক্যাপ্টেন বলল, বলুন।

পাঞ্চালি বলে, আপনি আবার মেইনস্ট্রিমে ফিরে আসতে পারেন না? সারেন্ডার করে? না-না, এটা পুলিশের শেখানো কথা নয়, আমার নিজস্ব।

ক্যাপ্টেন ম্লান হাসল। বলল, পারি! তবে সারেন্ডারও করতে হবে না। কারণ, আমার নাম কোনও কেসে ওঠেনি। ওয়ান্টেড লিস্টে তো নেই-ই।

তাহলে? পাঞ্চালি সাগ্রহে বলে ওঠে, প্লিস, ছেড়ে বেরিয়ে আসুন।

ক্যাপ্টেন বলল, দেখি ভাবছি। এখন নিজের সম্পর্কে অন্য কিছু ভাবতেই চাইছি।

তাহলে প্লিস…দেরি করবেন না…আপনার নাম পুলিশের খাতায় ওঠার আগে…

ক্যাপ্টেন এই প্রথম হাসল। পাঞ্চালির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, যা আমি কখনও উচ্চারণ করিনি তাই আজ করছি। আমার আসল নাম অরণ্য। অরণ্য মিত্র। হয়তো সে কারণেই ভারতের প্রাচীনতম অরণ্যে এসে পড়েছি। রয়েছি অজ্ঞাতবাসে। জানি না, এরপর জীবন কোনদিকে বাঁক নেবে। বাঁকের প্রান্তে এসে আপনার সঙ্গে দেখা হল। আপনাকে জানা হল। এটাও অসামান্য অভিজ্ঞতা। হয়তো কোনওদিন আবার দেখা হবে, অথবা আজ কালের মধ্যেই কোনও অপারেশনে পুলিশের হাতে মারা যাব। তবে বেঁচে থাকলে আমাদের দেখা হবে।

পাঞ্চালি স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর বলল, একটা ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে আপনাকে অনুরোধ করব ভেবেছিলাম!

অরণ্য বলল, অবশ্যই!

পাঞ্চালি বলল, কলকাতার এক সাংবাদিক। এই অঞ্চলের কোথাও এসেছিল সংবাদ সংগ্রহের কাজ করতে। তারপর সে উধাও। মিসিং ডায়েরি হয়েছে। অবুঝমাড়ের দিকে নাকি তার যাওয়ার কথা। এরকমই সে বলেছে নিজের বোনকে। বোন দাদাকে খুঁজতে আকুল হয়ে এসেছে এখানে। আমার চেনা। এখানে সে মামার কাছে আছে। আপনি কোনওভাবে হেল্প করতে পারেন?

অরণ্য বলল, পাঞ্চালি অবুঝমাড় অনেক বড় এরিয়া! কমপ্লিটলি আইসোলেটেড! কোনও স্পেসিফিক লোকেশন বলেছে?

পাঞ্চালি বলল, বলেছে আসলে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিল। সেখানে ওই এনজিওর কিছু ডেভেলপমেন্টের কাজ আছে। নারায়ণপুরের কাছে জায়গাটা। নারায়ণপুর থেকে হয়তো ঢুকেছে। অবশ্য আমরা জানি না সত্যিই কী হয়েছে!

অরণ্য কিছুক্ষণ ভেবে বলল, আচ্ছা, আমি দেখছি। আপনার কোনও ফোন নম্বর থাকলে দিন। কোনও খবর পেলে নিজে না পারলেও কাউকে দিয়ে আপনাকে নিশ্চয়ই জানাব।

পাঞ্চালি বলল, আমার ওই প্রস্তাবটা?

অরণ্য বলল, যুক্তি বলছে, প্রস্তাবটা সঠিক। ভিতরের আবেগ প্রশ্ন করছে, নীতি আদর্শ আর সঙ্গীদের কি পরিত্যাগ করব?

নীতি আদর্শ যে আপনাকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে, তার পরীক্ষা কি হয়েছে?

অরণ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না হয়নি।

তারপর পাঞ্চালির চোখে চোখ রেখে বলল, আপনার সঙ্গে নিশ্চয়ই দেখা হবে একদিন!

আমিও মনেপ্রাণে তাই চাই! নিজের জীবনে ফিরে আসুন। আপনি অন্য মানুষের জীবন কাটাচ্ছেন!

অরণ্য বলল, কী নিখুঁত সত্যি বলছেন। আপনাকে দেখে আজ অন্য উপলব্ধি হল। সকলেরই উচিত, নিজের জীবন কাটানো।

পাঞ্চালি বলল, সবসময় নয় অরণ্য। আমিও নিজের জীবন কাটাচ্ছি না! তবে সে জন্য আমার একটুও অনুতাপ নেই। বরং গৌরব আছে, আত্মতৃপ্তি আছে।

অরণ্য অবাক হয়ে বলল, আপনি কার জীবন কাটাচ্ছেন? আপনার কাজের সঙ্গে আপনার নীতি আদর্শ কথা বলা সবই তো সাযুজ্যপূর্ণ।

পাঞ্চালি হেসে বলল, একজনের দেখানো পথে আমি চলার চেষ্টা করছি। বলতে পারেন, তাঁর জীবন পথে হাঁটছি।

অরণ্য বলল, কে তিনি?

পাঞ্চালি বলল, তিনি সুধাময়ী! আপনি ফিরে আসুন অরণ্য! তখন তার কথা বলব!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *