সন্ধিক্ষণ – ১৭

১৭

সুন্দরপুর গত কয়েক বছরে রূপ নিয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামের। সাত নম্বর পাহাড় যেন এই গ্রাম আর আদিবাসী পাড়ার সীমানা। দুটি স্কুল। একটি মাধ্যমিক। পাহাড়ের পিছনে আরেকটা। সেটা চালান পাদ্রী ম্যাথিউজ। পাহাড়ের দক্ষিণে একটা লম্বা মাঠ। সুন্দরপুরের উত্তর প্রান্তে রয়েছে এখনও বহু ফাঁকা জমি। রয়েছে ঝিনুক নদী। পাহাড় আর জঙ্গল। পরিত্যক্ত বাংলো আর ময়দান। খেলা হতো ব্রিটিশ আমলে। কোপারাম সেখানেই পড়াশোনা করেছে। এইট পাশ করে আর এগোয়নি। চলে এসেছে দণ্ডকারণ্য ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে।

বাঙালি কর্মী অফিসারদের বেশি করে আনা হয়েছিল। যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ভাষা নিয়ে সমস্যা না হয়। মাঝেমধ্যেই আসতেন সুকুমার সেন, আইসিএস। ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। তাঁর উপরই ছিল দণ্ডকারণ্য উন্নয়ন প্রকল্প রূপায়ণের ভার। সেই থেকে কতবার যে কত প্রকল্পের বদল হল। উমরকোট, পারলকোট, মালখানগিরি, জগদলপুর, পাখানজোড়, কোরাপুট, গড়চিরোলি। ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ আর মহারাষ্ট্রের রুক্ষ ধু-ধু প্রান্তর কিংবা জঙ্গলে ঢাকা। এখানে মানুষ থাকবে কীভাবে? শস্যসুফলা পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষদের এখানেই তোলা হয়েছিল। সেই কর্মযজ্ঞ এখনও চলছে। কবে যে শেষ হবে, কে জানে!

ডেভেলপমেন্ট অফিসকে ডানদিকে রেখে সোজা হাঁটলে একটা মন্দির কয়েক বছর হল তৈরি হয়েছে। সেখানে দুর্গাপুজো হচ্ছে। তারই পিছনদিকে ঝিনুক নদী চলে গিয়েছে। শোনা যায় দান্তেওয়াড়ার দুই নদী ডংকিনী আর শঙ্খিনীর মতোই ঝিনুকেরও নাকি ছিল এক সহোদর বোন। তার নাম ধিরাম। সে নদী কি শুকিয়ে গেছে? কেউ জানে না। এই মন্দিরের পাশের জমিতে গড়ে উঠেছে একের পর এক দোকান।

যারা চাষবাস করতে পারেনি কিংবা পারবে না, তাদের দেওয়া হয়েছিল ট্রেড লোন। প্রভাসকে নলিনাক্ষ পাঠিয়েছিল রায়পুরে। সেখানেই সার্টিফিকেট দেখিয়ে এসেছে নিজের গ্রাজুয়েশনের। পেয়েছে রিফিউজি ট্রেড লোন। সেই টাকায় জামাকাপড়ের দোকান খুলছে। এখানে তো আদমজী, লক্ষ্মী আর অন্নপূর্ণা কটন মিল নেই। একমাত্র ভরসা বিলাসপুর। সে অনেক দূর, রায়পুর একটু সুবিধা হয়। কিন্তু রায়পুরে কলকাতার জামাকাপড় আসে কম। তার থেকে বেশি আসে বিলাসপুরে। কারণ বিলাসপুরই ছিল বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে লাইনের বড় স্টেশন। দলে দলে বাঙালি রেলবাবুদের এখানে পাঠায় ব্রিটিশ। সেই থেকেই বিলাসপুরে বাঙালিদের বাস। তাদের অনেকেই ফিরে যায়নি। এখানে থেকে গিয়েছে। প্রভাস বিলাসপুরে গিয়ে জামাকাপড় আনে মাসে দু-মাসে একবার।

আরেকটা উপায় অবশ্য ছিল। সুন্দরপুর থেকে প্রায় এগারো বারো মাইল দূরে একটা জায়গা আছে। তার নাম রূপধারিয়া। সেখানে রয়েছে কেমিকেল প্ল্যান্ট। প্রভাস লেখাপড়া করা। সে কি চেষ্টা করলে ওখানে একটা কাজ পেত না?

নলিনাক্ষ বলেছে, উদ্বাস্তুদের কাছে যথাযোগ্য নথিপত্র, পড়াশোনার কাগজপত্র আছে কিনা সেসব নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। আর তাছাড়া তোমরা তো এখনও ইন্ডিয়ান সিটিজেন হওনি। রিফিউজি কার্ড চলছে। তাই রূপধারিয়ার প্ল্যান্টে গিয়ে লাভ হবে না।

সন্ধ্যা সেদিন প্রভাসকে বলল, এভাবে কতদিন চলবে? এখানে বাবু আর তপু কি একদিন মরে যাবে?

প্রভাস চমকে তাকাল।

সন্ধ্যা বলল, সেদিন আঙ্গা না থাকলে কী হতো? এটা তো কোনও মানুষের জীবন হতে পারে না!

প্রথম প্রথম ফকিরচাঁদ এই বাড়ির দাওয়ায় ঘুমাত। কিন্তু যখন সে স্থির করল আর ফিরবে না, তখন জমির একাংশে একটা ঘর করে নিয়েছে। ছোট টিনের চাল। সন্ধ্যা অথবা বাবু গিয়ে খাবার পৌঁছে দিয়ে আসে। ঘরের পিছনে ফকিরচাঁদের কাজ। কাঠের ঠাকুরদেবতা বানায়।

এক এক দিন বড় ব্যাগের মধ্যে নানারকম পুতুল আর ঠাকুর দেবতা নিয়ে সে ভোরের বাসে চলে যায় অন্য ক্যাম্প কিংবা গ্রামগুলোয়। জগদলপুরের দোকানে দোকানে সাপ্লাই করে। খবর নিয়ে আসে অন্য উদ্বাস্তু গ্রাম আর ক্যাম্পের। এখানে থাকলেও বা সে কতক্ষণই বা ঘরে কাটায়! চলে যায় জঙ্গলে। কোপারামের দাদা, তার বউরা যায় জঙ্গলে কাঠ আনতে। তাদের সঙ্গেই ফকিরচাঁদ ভিড়ে যায়।

প্রভাস বলল, তাহলে কী করব?

সন্ধ্যা জানে, একথার উত্তর নেই। ভাসতে ভাসতে আজ যেখানে এসে ঠেকেছে তারা, এটাকেই স্থায়ী ঠিকানা হিসেবেই ভেবে নিতে হবে। গ্রামের অনেকেই অবশ্য মেনে নিতে পারছে না। তাদের ইচ্ছা সুযোগ পেলেই চলে যাবে আবার বাংলায়। কিন্তু সুধাময়ী প্রভাসের ইচ্ছা নেই। কুপার্স ক্যাম্প রানাঘাট কলকাতা ঘুরে দেখেছে, কেউ করে দয়া, কেউ ঘৃণা। অনেক মানুষ আর সরকারের কর্মীদের চোখে একটা চাপা বিরক্তি। তারা যেন বোঝা। জোর করে এসে বসে পড়েছে।

রিফিউজি নামটা ক্রমেই পদবীর সঙ্গে চেপে বসছে। এখানে ছোট একটা দোকান হয়েছে। সামান্য আয়। কজনই বা সারা বছর ধরে জামাকাপড় কেনে। তবু ফকিরচাঁদ চাষ করে। মাঝেমধ্যেই নিজের রোজগারের টাকাও তুলে দেয় সুধাময়ীকে। সুধাময়ী মানা করেননি। বলেছেন, তুমি আমার আর এক ছাওয়াল। বেশ করবা, দিবা। এদের সংসারে তুমি বাইরের লোক হয়ে চিরকাল থাকবা নাকি? আমার এক ছেলের লগে দেখা হইল না। অথচ একই দ্যাশে আছি। তাই দ্যাহো ভগবান আমারে আবার একটা বড় ছাওয়াল দিল।

সন্ধ্যাকে প্রভাস বলল, এখান থেকে কোথায় যেতে পারি। বলো?

সন্ধ্যা বলল, যাওয়ার কথা বলিনি। কিন্তু ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে আমাদের ভাবতে হবে।

প্রভাস বলল, কীরকম?

সন্ধ্যা বলল, বাবুর এখানে পড়াশোনা করালে সে ভবিষ্যতে কী করবে, ভেবেছ? বড় স্কুল নেই। কলেজ নেই। ম্যাট্রিকের পর কী করবে ও?

প্রভাস বলল, কিন্তু উপায় কী?

সন্ধ্যা বলল, জোনাকি আর সবিতাদির ছেলেকে রায়পুর আশ্রম স্কুলে দিয়েছে। থাকতে হয় সেখানেই। বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়া। তারপর ওরাই কী যেন একটা পড়ায়।

প্রভাস বলল, কত টাকা করে নেবে? কিন্তু তুমি বাবুকে ছেড়ে থাকতে পারবে?

সন্ধ্যা গম্ভীর। মাথা নিচু করে বলল, এই গ্রামকে বাকি দুনিয়ার সঙ্গে আলাদা করে রাখা হয়েছে। একটা অদৃশ্য কাঁটাতার আছে। ওপারে এ দেশের আসল মানুষ এপারে আমরা। ছয়-সাত বছর আগেও একটা কথা নিজেদের সম্পর্কে ভাবতাম না। সেটা হল আমরা রিফিউজি। বাবু আর তপুরা বড় হতে হতে একদিন এই পরিচয়টাই নিজেদের জীবনে জড়িয়ে ফেলবে। এখন ওরা ছোট। তাই ওরা অমল আর তাপসী। যত দিন যাবে, বড় হবে, আর ভাববে। আমরা এই রিফিউজি কথাটা ওদের মনের মধ্যে ঢোকাব? বলো?

প্রভাস চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে। বাবুকে পাঠাব রায়পুরের আশ্রমে।

প্রভাস উঠে গেল পাশের ঘরে। সুধাময়ী বসে ছিলেন পিছন ফিরে। কিছু লিখছেন।

প্রভাস বলল, মা একটা কথা বলার ছিল।

সুধাময়ী তাকালেন। প্রভাস বলল, বাবুর এখানের স্কুলে তেমন পড়াশোনা হয় না। একজন মাস্টার ওদের ক্লাসে। সে না এলে ক্লাস হয় না। আর সন্ধ্যা বলছিল, এখানকার দু-চারটে ছেলেকে রায়পুরের আশ্রম স্কুলে পাঠিয়েছে। সেখানেই থাকার ব্যবস্থা। বাবুকে সেখানে দিলে পরে কোথাও ভর্তি করা নিয়ে ভাবতে হবে না।

সুধাময়ী বললেন, ভালো কথাই তো কইছে সন্ধ্যা! যদি এই সুবিধা পাওয়া যায়, ঠিক হইব। বাবুরে ওখানেই ভর্তি কর। কবে যাইতে হইব?

প্রভাস সন্ধ্যার দিকে তাকায়। সন্ধ্যা বলল, মা, আমি জোনাকির সঙ্গে কথা বলে জানব। এই কেলাসের পরীক্ষা হয়ে যাক। তারপর।

সুধাময়ী বিড়বিড় করে বললেন, ‘বহু যুগের উপহারে বরণ করি নিল কারে/কার জীবনে প্রভাত আজি ঘুচায় অন্ধকার…।’ বাবুর জীবনে নতুন প্রভাত আসুক। অর জীবনে অন্ধকার ঘুচাইয়া দিক ঈশ্বর।

হঠাৎ দরজায় ছায়া। প্রভাস ফিরে দেখল, ফকিরচাঁদ। চোখে-মুখে উত্তেজনা।

প্রভাস বলল, কী হল দাদা?

ফকিরচাঁদ বলল, পাকিস্তানের কথা শোনলাম! রেডিয়োয় কইছে যুদ্ধ। সাংঘাতিক কাণ্ড!

সন্ধ্যা উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে এসে বলল, কী ব্যাপার। আবার যুদ্ধ?

ফকিরচাঁদ বলল, সেসব না। গোটা পূর্ববঙ্গে রক্তারক্তি। হাজার হাজার মাইনষেরে পাকিস্তানের সেনা মাইব়্যা ফেলাইতেছে।

প্রভাস বলল, সেনারা মারছে? হিন্দুদের আবার তাড়াচ্ছে?

ফকিরচাঁদ বলল, হিন্দুগো তো আছেই, এবার নাকি মোসলমানদেরও খতম করত্যাছে খানসেনার দল।

খানসেনা কী? সন্ধ্যা বলল।

ফকিরচাঁদ বলল, রেডিয়োতে শুনতেছিলাম। পাকিস্তানের সেনারে খানসেনা কইতাছিল।

প্রভাস বলল, ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকছে না ফকিরদা। মোসলমানদের মোসলমান সেনারা মারছে? এ কীভাবে হয়?

ফকির বলল, বাঙালিদের শ্যাষ করাই নাকি এবার অগো উদ্দেশ্য। এবার আর হিন্দু মোসলমান না বাঙালি আর অবাঙালি।

প্রভাস বলল, তার মানে সেই বাহান্নর মতন। ভাষা নিয়ে?

সন্ধ্যার মুখের সামনে ঝলসে উঠল রূপসা নদীর তীর…একটা সাইকেল…একজনের মুখ।

তারা তিনজনে চলে এল পাশের ঘরে। সুধাময়ীর হাতে যথারীতি গীতবিতান। কৌতূহলী চোখে তাকালেন।

প্রভাস বলল, ফকিরদা বলছে পাকিস্তানে নাকি বাঙালিদের মারছে সেনারা। হিন্দুই হোক, আর মুসলমান!

সুধাময়ী বললেন, এ ক্যামনে হইল? কী থিইক্যা শুরু হইল?

ফকিরচাঁদ বলল, ঢাকা থিইক্যা শুরু। তারপর গোটা পূর্ববাংলায়! হাজার হাজার খুন মা জননী। অহন আবার শুনতেছি, সব বাঙালি এককাট্টা হইয়া খান সেনাগো পেটায়। সত্যি কিনা জানি না। রেডিয়োয় তো কয়েকদিন ধইব়্যা এই খবর আমি এই শুইন্যা আইলাম। আর একটা কথা কইতেছিল রেডিয়োয়। মুজিবরে নাকি নিয়া গেছে আওয়ামি লিগ, জানায় দিছে পূর্ব বাংলা আর পাকিস্তানে থাকতে রাজি না। এবার তাদের স্বাধীন হওয়ার লড়াই!

সুধাময়ীর মুখে রহস্যময় হাসি। প্রভাস, সন্ধ্যা অবাক। এ তো আশ্চর্য খবর। সুধাময়ী বিস্মিত হচ্ছেন না হাসছেন!

সুধাময়ী বললেন, আজ যে মোসলমানেরা মরছে খানসেনাগো হাতে, তারাই সাতচল্লিশের আগে পাকিস্তান চাইছিল জিন্নার কথায় নাইচ্যা। তহন আমাগো শুনতে হইছিল ধর্ম আগে, ভাষা পরে। কয়েক বছরের মইধ্যেই আটচল্লিশ বাহান্নতে পাকিস্তান বুঝাইয়া দিল তাদের কাছে পূর্ব বাংলার মোসলমানেদের দাম নাই। তারা মোসলেম কম, বাঙালি বেশি। তাই ভাষা কাইব়্যা লইছিল। কত কিছু হইল। কিছু লাভ হয় নাই। ধর্মের জিগির তুইল্যা হিন্দুগো বছর বছর তাড়াইচ্ছে। আর আজ সেই পাকিস্তান ছাইড়্যা নিজেদের আলাদা দ্যাশ চায় অরা? এবার লড়াই নিজেদের মইধ্যে! কত কিছু দেখুম এক জীবনে!

হঠাৎ সচকিত সুধাময়ী। বললেন, আমার আর-এক ছাওয়াল আছে ওই দ্যাশে। সে ক্যামন আছে? তার কিছু হয় নাই তো? ফকির, আমারে নারানগঞ্জের খবর আইন্যা দিতে পারবা? লতিফের খবর কী? সে বাঁইচ্যা আছে তো? লতিফের খবর আইন্যা দে আমারে কেউ!

ঘরে একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এই পরিবার ১৯৬৪ সালে এসেছিল ইন্ডিয়ায়। সন্ধ্যা কয়েকবার চিঠি লিখেছিল বাবা-মাকে। এই সুন্দরপুর এসে ঘুরে গিয়েছে অমূল্য। কিন্তু সুধাময়ীর জীবনের গোপন কষ্ট, বড় ছেলে লবকে তিনি দেখেননি। তারা কোথায় থাকে সেটা জানাও যায়নি। প্রভাস, চেষ্টা করবে একবার কিশোরগঞ্জে যাওয়ার কিন্তু যাবে কেমন করে?

১৯৬৫ সালের যুদ্ধে বন্ধ হয়েছে গোয়ালন্দ যাওয়ার ট্রেন। এখন যেতে হলে পাসপোর্ট লাগে। তাদের সেসব নেই। রিফিউজিদের পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে না। তাদের আগে পুনর্বাসন হোক। অতএব প্রভাসের আর পূর্ববঙ্গে যাওয়া হয়নি। এখন আবার এসব শুরু হল। তার মানে তো আবার দলে দলে মানুষ চলে আসবে ইন্ডিয়ায়। হয়তো এই গ্রামেও আসবে নতুন উদ্বাস্তুরা। জমি, কাজ, সরকারি সাহায্যের আবার টানাটানি হবে।

কী আশ্চর্য! উদ্বাস্তুর ইতিহাসে এই ঘটনা ঘটেই চলেছে বারবার। যারা প্রথমে এসেছে উদ্বাস্তু হয়ে, তারা যখন কোথাও স্থায়ীভাবে বসেছে, তখন আবার নতুন উদ্বাস্তুর দল এসেছে। তাদের সমগোত্রীয় ভাবেনি। বরং ভেবেছে নতুন উৎপাত।

কয়েকদিনের মধ্যেই গোটা উদ্বাস্তু গ্রামে একটাই কথা। মুক্তিযুদ্ধ। সেটা কী? পূর্ববাংলার মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে।

ওয়ার্ক সাইট অফিস থেকে ফিরে নলিনাক্ষ ঢুকেছে ডিসপেনসারিতে। সাধন কম্পাউন্ডার রোগী দেখছে। আজ ডাক্তার আসেনি। সাধন বলল, কী খবর?

নলিনাক্ষ বলল, খুব যুদ্ধ হচ্ছে।

সাধন বলে, যুদ্ধ তো দুই দেশে হয়। পাকিস্তানে আবার কার সঙ্গে কার যুদ্ধ? এই মুক্তিযুদ্ধটা কী?

নলিনাক্ষ উজ্জ্বল মুখে বলল, পূর্ব পাকিস্তান লড়াই করছে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে। ওরা বলছে, এ লড়াই স্বাধীনতার লড়াই। শুনলাম এসবের পিছনে আসল মদত দিচ্ছে ইন্দিরা গান্ধী। পাকিস্তান বুঝেছে যে এবার তাদের দেশ ভাঙবে।

সাধন বলল, আহা আহা! কী শুনাইলে নলিনাক্ষ। এই সংবাদ যদি সত্য হয়, তাহলে আমার সব দুঃখ ভুলে যাব। যারা আমাদের দেশ ভেঙেছিল, তাদের দেশ এবার ইন্দিরা ভেঙে দিক। তাঁকে আমি সারাজীবন মাথায় করে রাখব।

নলিনাক্ষ বলে যাচ্ছে, নতুন দেশের নামও ঠিক হয়ে গেছে। বাংলাদেশ।

বলো কী? সাধনের দু-চোখে অপার বিস্ময়—বাংলাদেশ! পাকিস্তানের মধ্যে যারা একদিন স্বেচ্ছায় চলে গেছিল, আজ তারাই সেই দেশ ছেড়ে আলাদা বাংলাদেশ হতে চায়, নিজেদের পাপের নিজেরাই প্রায়শ্চিত্ত করবে?

নলিনাক্ষ বলল, সাধন, তোমার এই মনে হওয়ায় দোষ নেই। যেভাবে তোমাদের আসতে হয়েছিল দেশ ঘর ছেড়ে। তার কারণ একমাত্র দেশভাগ। তবে এবার ওখানে আশ্চর্য ব্যাপার হল, হিন্দু-মুসলিম সব বাঙালি একসঙ্গে খানসেনার বিরুদ্ধে লড়ছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।

সাধনের সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ওপারের হিন্দুরা মোসলমানের সঙ্গে একজোট হয়েছে? পাকিস্তানের মুসলমান শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বাঙালি সত্তা? সেখানে ধর্ম নেই? এরকম আশ্চর্য কথা বিশ্বাস হয় না! কিন্তু সবার আগে সাধনের মনে এল একটাই প্রশ্ন নলিনাক্ষ, বাংলাদেশ হলে আমরা কি আবার ফিরে যেতে পারব?

নলিনাক্ষ মাথা নাড়েন! এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। দুজনেই নীরব হয়ে রইল।

সবই করছে, স্কুল যাচ্ছে। জঙ্গল পাহাড়ে আঙ্গার সঙ্গে ঘোরাফেরা করছে। তবু বাবুর মন গুটিয়ে যাচ্ছে। রাতের বেলা যখন সে ঘুমাতে যায় তখনই যেন বেশি বেশি মনে পড়ে। আঙ্গা বলে ওদের ঠাকুর দেবতাদের নাম বুধা দেও, মাইলি মাতা, কুনারদেও। ভৈরব পেনু ওই সাত নম্বরের পাহাড়ের পিছনে।

পাহাড়কেই পুজো করে আঙ্গারা। বাবুকে আঙ্গা নিয়ে গিয়েছে ওই ভৈরব পেনু পাহাড়ে। আঙ্গার হাত ধরে এই পাহাড়, জঙ্গল আর খোলা মাঠে সূর্যাস্ত দেখেছে বাবু। দেখেছে ইন্দ্রাবতীর সবুজ জল। আঙ্গার সঙ্গে বাবু পেরিয়েছে কাঠগোলাপ, লজ্জাবতীর ঝোপ। কাঁটায় পা কেটে গেলে এক নিমেষের মধ্যে কিছু একটা পাতা নিয়ে দাঁতে চিবিয়ে আঙ্গা লাগিয়ে দিত সেখানে। রক্ত বন্ধ হতো।

এসব ছেড়ে আবার তাকে চলে যেতে হবে রায়পুরের ইশকুলে। রাতে শুয়ে শুয়ে বাবু ভাবছিল, তার কোথাও কি থাকা হবে না? একবার ঠাকুমা বলেছিল, যারা নিজের দেশ, ঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় বারবার চলে যায়, তাদের বলে রিফিউজি। এখন তাদের নিজের ঘর হয়েছে। ইন্ডিয়াই তাদের দেশ। তাহলে তাকে আবার একা একা বাবা মা, ঠাকুমা, বোন সকলকে ছেড়ে আবার চলে যেতে হবে? চলে যেতে হবে আঙ্গাকে ছেড়ে! বাবু ভাবল, আমিও তাহলে আর এক রকম রিফিউজি! চোখ ভিজে যায় বাবুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *