সন্ধিক্ষণ – ১২

১২

সুধাময়ীকে প্রভাস বলল, মা তুমি কিছু একটা করতে চাইছ। কী সেটা? সুধাময়ী গীতবিতান পড়ছিলেন। বললেন, কাল বউ মাইয়াদের লইয়া একটা মিটিং করুম।

প্রভাস বলল, মা, এখানে আগে থেকেই কেন্দ্রীয় উদ্বাস্তু পরিষদ আছে। তাদের অফিসও আছে। ইউসিআরসি থেকে সন্তোষদা এসে আমাদের বলে গেছে কলকাতার ধর্মতলায় বিক্ষোভ না কী যেন একটা করতে যেতে হবে। আমরা যদি এর মধ্যে নিজেদের মতো করে রোজগারের জন্য ঝাঁপাই, তাহলে সরকার আর কোনও সাহায্যই করবে না। তাই এখন এসব না করাই ভালো।

সুধাময়ী বললেন, তুই, রমা, সুবলরা সারাদিন ধরে বাইরে বাইরে ঘোরোস। আমরা ঘরে পইব়্যা থাহি। এই কলোনির মাইয়ারা কী করে জানস? দুপুর হইলেই সব এর তার লগে শুধু আগড়ম বাগড়ম কথা। মনে কর এহেনে জমি দিল। ঘর করার ট্যাহাও দিল। তারপর কী?

ছেলেপুলেদের ইশকুল করন লাগব না? পড়াশোনার জন্য ট্যাহা লাগে। রিফিউজি মানে কী জানস? গোষ্ঠী। অনেক মানুষ যখন একইরকম জীবনে ঢুইক্যা পড়ে। সকলের নিয়তি যখন সকলের মতোই। তাই আমাগো একলগেই কাম করতে হইব। মাইয়ালোকের বোঝন দরকার যে, তাদের একটা দায় আছে, দায়িত্ব আছে।

প্রভাস চুপ করে শুনছে। মায়ের কথাগুলো নতুন লাগছে।

সুধাময়ী বলেন, পুরুষমাইনষেরা পরিবারের লোকগুলোনরে রক্ষা করবে, মাইয়া লোকগুলোন কী করবে? তারা অহন কিছু করব না তো কখন করব?

আমরাও সংসারের লাইগ্যা কিছু করতেয়াছি, এই ভাবনা তাদের ভরসা দিবে।

ফকিরচাঁদ এসে উপস্থিত। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, মা জননী!

সুধাময়ী বললেন, আস ফকির।

ফকিরচাঁদ বলল, খোঁজ নিছি! পুরানো কিছু সেলাই মেশিন পাওন যাবে।

সুধাময়ী বলল, তাইলে তো ভালোই হয়। কাল সকালে আস। রিলিফ অফিস যামু।

ফকিরচাঁদ বলল, কাল অফিস বন্ধ। প্রধানমন্ত্রীর শোকের জইন্য।

সুধাময়ী বলল, আইচ্ছা। তাইলে পরশু। কাইল মিটিং! সব ঘরের মাইয়া আর বউগো খবর দিবা তুমি!

ফকিরচাঁদ উত্তেজিত। বলল, তাড়াতাড়ি বিষয়টা শুরু করেন মা! আমাগো তো কপাল! আপনের মতো এক দশভুজারে যদি আর বেশিদিন না পাই?

সুধাময়ী বললেন, মানে! আমি মইব়্যা যামু এইডা দ্যাখতেয়াছ নাকি স্বপ্নে?

ফকিরচাঁদ জিভ কেটে বলল, আরে ছি ছি! ধম্মঠাকুরের কিড়া। ওসব না। স্বপ্নে মা জননীর ছবির পিছনে কাইল পাহাড় ক্যান দ্যাখলাম? এহেনে পাহাড় কই!

সুধাময়ী তৈরি হচ্ছেন। আজ তাঁর ক্যাম্পের রিলিফ অফিসে যাওয়ার কথা। ফকিরচাঁদ এলেই বেরিয়ে পড়বেন। ঠিক সেই সময় দুজন মানুষ বারান্দার সামনে এসে উপস্থিত হল। তাদের হাতে কাগজ। প্রভাস, রমাপদদের নাম ডাকল। রমাপদ দু-দিন ধরে নেই। সে কলকাতায় গিয়েছে। প্রভাস বেরিয়ে এল।

প্রভাস জানতে চাইল, কী ব্যাপার?

একজন বলল, আপনারা যদি ইন্ডিয়াতেই থেকে যেতে চান, তাহলে অন্য জায়গায় যেতে হবে। সেটাই হবে আপনাদের পার্মানেন্ট রিহ্যাব। এখানে যা অবস্থা, আপনাদের সেখানে চলে যাওয়াই ভালো। আপনারা সবেমাত্র এসেছেন। এখানে কিছুই চেনেন না। আপনাদের নানাভাবে ভড়কানোর চেষ্টা করা হবে।

একটু থেমে বলল, ভড়কানো মানে জানেন তো? ভুল বোঝানো। কিন্তু আমরা চাই আপনারা নতুন জায়গায় যান। আমরা সরকারের পক্ষে ওকালতি করছি না। কিন্তু এটা জানি ওই কমিউনিস্টদের পাল্লায় আপনারা পড়েছেন। কবে যেন আপনারা কলকাতায় আন্দোলন করতেও যাবেন। ওসব করে কিন্তু লাভ হয়নি কারও। আপনারা অন্য দেশ থেকে এসেছেন। অযথা সরকারের বিষ নজরে পড়ে একুল ওকুল দুইই যাবে। তাই বলছি যখন আপনাদের বলা হবে কোথাও চলে যেতে, যাবেন। ভালো জায়গাতেই পাঠানো হবে। এই কাগজে সই করে দিন আপনাদের কোথাও আপত্তি নেই।

প্রভাস বলল, এটা কীসের কাগজ?

এখানে লেখা আছে সরকার যদি মনে করে, তাহলে আপনাদের ট্র্যানজিট ক্যাম্প থেকে অন্য কোথাও পাঠাতে পারে। আপনাদের আপত্তি নেই। জোর করে সরকার কিছু করছে না। আপনাদের মত নিয়েই করছে। চিন্তা করবেন না, এটা একটা কৌশল।

প্রভাস ইতস্তত করছে। বলল, আপনারা কারা?

একজন বলল, আমার নাম সুদীপ দাস আর ও মনোরম বোস। আপনি কেন্দ্রীয় উদ্বাস্তু পরিষদের কথা শুনেছেন। আমরা হলাম উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সমিতি। আমাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে সকলের ব্যবস্থা করা। আর ওদের লক্ষ্যই হল বিক্ষোভ পাকানো।

ফকিরচাঁদ হঠাৎ বলল, সার একটা কথা কমু? এখন তো আর ট্রানজিট ক্যাম্প বইল্যা কিছু নাই। আমাগো মতো মাইনষের দরকার হল একটা থাকার মতো মাথার উপর ছাদ। আর টাকাপয়সা সরকার হাওলাত দিলে নিজেদের মতো কিছু কইব়্যা নেওয়া। জমির ব্যবস্থা করন যায় না ক্যান? আমারতো চোদ্দো বছর হইয়্যা গেল। আমারে তো জমি দেওয়া হইল না। আপনে হইলেন কংগ্রেসের লোক। আর অন্য দল কমিউনিস্ট। আপনেদের মইধ্যে আসলে আমাগো লইয়া দড়ির লড়াই চলে, তাই না? আপনেরা এই জায়গা যত খালি কইব়্যা বাংলার বাইরে পাঠাইতে পারবেন ততই আপনাগো দল আর সরকারের কাছে আপনাগো দর বাইরা যাব।

ফকির বলেই চলে, আপনেরা নেতা হইয়া যাবেন। আবার ওই কমিউনিস্টরা চায় আমাগো এহেনে রাইখ্যা দিয়া তাদের মিটিং মিছিল সভায় আমরা ভিড় জমাই। পূর্ববঙ্গ থিইক্যা ঘর বাড়ি জমি হারায়ে আমরা কি আসছি আপনাগো রাজনীতির লুডোখেলার গুটি হইতে সার?

মনোরম বোস শুনতে শুনতে অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন। চাপা স্বরে বললেন, ফকিরচাঁদ, তোমার খুব চোপা হয়েছে। তুমি ভুলে যাও যে তুমি এক রিফিউজি। যে-কোনও সময় টাইট করে দেব।

ফকিরচাঁদ হেসে বলে, মনুবাবু সামান্য উস্কানি মার্কা কথায় নিজের চেহারা বাইর কইব়্যা ফ্যালেন ক্যান! রাজনীতি করেন। মনের রাগ মনের বিষ দেখাইবেন না। ভিতরে রাখবেন।

আরও বলে, আপনি এহেনে আইস্যা এই রিফিউজিগো ভাগাইতে চান, উস্কানি দ্যান, কাগজে সই লইতে আইছেন, এইসব কথা কমিউনিস্ট অফিসে গিয়া কইলে আপনের তো মহাবিপদ। অহন বিধানসভা চলত্যাছে না? সেহেনে যদি এইসব বিষয় উঠে তয় আপনার দলের মহাবিপদ। দাঙ্গা থেকে রক্ষা পাইতে পলায় আসা এই উদ্বাস্তুদের এভাবে ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়া হুমকি দিয়া ভাগাইতেছেন, এইডা জানাজানি হইলে কী হইব? আমারে কী টাইট দিবেন? আমি আপনেদের থিইক্যা চোদ্দো বছর ধরে কিছু নিচ্ছি? আপনি কী দিবেন আমারে? আপনেদের সেন্ট্রালে কী হয় আগে সেইডা দ্যাহেন। নেহরুর পর কে? আপনেরা কোন দিকে? অতুল্যবাবু? প্রফুল্লবাবু? শতবাবু? কার ক্যাম্প করেন? বিধানবাবু চইল্যা যাওয়ার পর আপনাগো অবস্থা তো মণিহারা ফণি! নেতা নাই! জ্যোতিবাবুর সামনে দাঁড়াইতে পারে না আপনাগো নেতারা!

মাই গড! এই লোকটা বড় বেশি জানে! মনোরম দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, একটা রিফিউজি আমাদের দেশে এসে ক্যাট ক্যাট করে কথা শোনাবে, আর চুপ করে শুনব?

সুদীপ দাস ঠান্ডা মাথার মানুষ। তিনি বললেন, ফকিরবাবু মাথা গরম করছেন কেন? আমরা তো আপনাদের সাহায্য করতে এসেছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সবেমাত্র মারা গিয়েছেন। গোটা দেশ কাঁদছে। তা সত্ত্বেও আমরা আপনাদের উপকার করতে এই সময়ও ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরছি। প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসছে নতুন করে। তাদের জায়গা দিতে হবে তো? সরকার কীভাবে দেবে?

ফকিরচাঁদ হেসে বলল, আমারে হঠাৎ বাবু কইত্যাছেন ক্যান সার? আমরা গরিব উদ্বাস্তু। আপনাদের মতো বাবুরা আমাগো তুই তোকারি করবেন। আপনেদের বাংলায় আর জায়গা নাই এই কথা আপনেরা সাতেরো বছর আগে জানতেন না? তখন দ্যাশভাগে রাজি হইলেন ক্যান? আপনেরা কী ভাবছিলেন ওই পারের হিন্দুওগো য্যামন ত্যামন কইব়্যা ফ্যালাইয়া রাইখ্যা যায়?

ফকির থামছে না, আপনেরে সার একটা ঘটনা কই। আমরা যহন পঞ্চাশের দাঙ্গায় এই পারে আইলাম, তহন কংস নদীর অন্য পারে যাওনের পর একটা রিফিউজি ক্যাম্পে ছিলাম এক রাইত। সেই রাইতেই হামলা চালাইছিল দাঙ্গাবাজরা। আমরা বাধা দিলে মারামারি হয়। আর পুলিশ আমাগো থানায় লইয়া যায়। সেহেনে এক পুলিশ অফিসার গরম গরম ডিম সিদ্ধ খাওনের আগে আমাগো দলের দুই মেয়েরে ল্যাংটা কইরা তাদের স্ত্রীঅঙ্গের মইধ্যে সেই গরম ধোঁয়া ওঠা সিদ্ধ ডিম ঢুকাইয়া দিয়া মজা পাইছিল। সেই মেয়েগুলোন ব্যথায় চিৎকার করতে করতে কইছিল, আমাগো কী দোষ?…আমাদের এরকম করেন ক্যান…?

সুদীপ বললেন, ফকিরবাবু, আজকাল আপনার কথায় হিন্দু মহাসভার গন্ধ পাই। ওদের দলে ভিড়েছেন নাকি?

ফকিরচাঁদ মুখে চুক চুক শব্দ করে বলে, আরে রাম রাম…ওই সব দল তো আরও খারাপ। অরা এহেনে দাঙ্গা লাগায়। মোসলমান মারে। চায় তারপর ওইপারে আমাগো মতো সাধারণ হিন্দুর উপর আরও অত্যাচার হউক। সেইডা দেখাইয়া আবার এহেনে দাঙ্গা বাধায়। এসব একটা চেইন সিস্টেম। চেইন সিস্টেম কথাডা আমারে শেখাইছেন অবনী ধর। এক উদ্বাস্তু লেখক। তিনি কইছেন, এ পারে দাঙ্গা হইব। তার বদলা ওই পারের হিন্দুগো উপর লওয়া হবে। তার বদলা এইখানে হবে। দুই পক্ষই পাবলিকরে খেপায়ে দিবে। এরে কয় চেইন সিস্টেম। সার একখান ব্যাপার সোজা বুঝছি। সব সরকার আর সব দল নিজেদের ধান্দা বোঝে। আর দাঙ্গাটাঙ্গা হইলে কী হয় জানেন তো? ত্রাণের চাল গম, তেরপল এসব টেন্ডার পায় ব্যবসায়ীর দল। তাই আমরা কী করুম, আমাদের ওপর ছাড়েন।

মনোরম রেগে মেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল, সুদীপ থামিয়ে দিল। বলল, আচ্ছা আমরা আসলে এসেছিলাম আপনাদের এই রিফিউজি পলিসিটা সম্পর্কে একটু জানাতে। আপনারা হয়তো ভুল বুঝলেন। যাক গে! আমরা চলি। এরপর হয়তো সরকারের পুলিশ নিয়ে নোটিশ আসবে। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যাই, যারা আপনাদের বলেছে অবরোধ, বিক্ষোভ, রেল রোকো এসব করে স্থায়ী জমি, ঘর পাওয়া যাবে, তারা ভুল বলছে। তাদের লক্ষ্য হল এসব করে এমন কিছু হাঙ্গামা করা যাতে পুলিশ গুলি চালায়। আর পুলিশ যখন গুলি চালায়, তখন এই নেতারা ঠিক তার আগে সরে যায়।

একটু থেমে সুদীপ বলল, গুলি খেয়ে মরে আপনাদের মতো কিছু মানুষ। আপনাদের কথা আমরা শুনেছি। এখানে বেশিরভাগ যে রিফিউজি ফ্যামিলি এসেছে তারা একটু গরিব শ্রেণির। কৃষক কিংবা খেতমজুর। কিছু কিছু মিডল ক্লাস আছে। এদের সঙ্গে আপনাদের মানায় না। সেই কারণেই আরও বেশি আসা। দরকার হলে বলবেন। এমনিতেও তো এই স্কুলটা চালু করতে হবে। আপনাদের সরে যেতেই হবে!

ফকিরচাঁদ বলল, সার এবার আপনেরা কই যাবেন? পার্টি অফিসে? এই পরিবারগুলোনরে যাতে কোনও কঠিন ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা হয় এইরকম কিছু করতে মন চাইতাছে আপনাদের, তাই না সার?

সুদীপ বলল, ফকিরবাবু, কাদের হয়ে কথা বলছেন? ঠিক বুঝছি না।

ফকিরচাঁদ হেসে বলে, এই কথাডাই শোনতে চাইছিলাম সার। আমি চাই আমাগো আপনেরা য্যান না বুঝেন। আমরা যে কাগো দলে…আমরা যে কী চাই…আমাগো পিছনে কারা আছে…কিছুই য্যান সরকার বোঝতে না পারে, মানুষরে যত সরকার কম বোঝে, ততই তাদের ভয় পায়। আমি চাই আমাগো আপনেরা ভয় পান! আমরা তো সার সেই সাতেরো বছর ধইব়্যা, নানা ফন্দির রাজনীতিরে ভয় পাইয়া আইছি। এইবার আপনেরা আমাগো এট্টু ভয় পাইয়েন।

হতভম্ব হয়ে সুদীপ আর মনোরম বেরিয়ে গেল। সুধাময়ী বেরিয়ে এলেন।

চলেন মা জননী। ফকিরচাঁদ সুধাময়ীকে বলল। ফকিরচাঁদের সঙ্গে বেরিয়ে সুধাময়ী হাঁটছেন। চারদিকে জঙ্গল। কিছুটা এগোনোর পর সেই প্রশস্ত চত্বর। চারদিকে কিছু দোচালা টিনের ঘর। সেগুলোর সামনে ইতস্তত ঘুরছে বাচ্চারা। কয়েকটি মেয়েকে অদূরে দেখা যাচ্ছে একটি টিউবওয়েলের সামনে ভিড় করে। পাকা রাস্তায় পৌঁছতে সময় লাগল দশ মিনিট। সেখানেই একটি ডিসপেনসারি। রেশন দোকান। তার পাশে রিলিফ অফিস। সামনে ভিড়।

একটি মেয়ে কাঁদছে। সামনের টেবিলে এক সরকারি কর্মী। সে বলল, না কেঁদে ঘটনা বলো।

মেয়েটি বলল, সার, এই নিয়ে পাঁচদিন এলাম।

কর্মী বললেন, দরকার হলে ষষ্ঠ দিনও আসতে হবে। কাজ বলো! নো নালিশ। নালিশের সুরে কথা বলবে না। এটা কাজের জায়গা।

মেয়েটি বলল, সার পৈতৃক ভিটে নেত্রকোণা। ধর্মপাশা। পূর্ব পাকিস্তান। রিফিউজি স্টুডেন্টস এডুকেশন গ্রান্টে সরকার আবেদন করতে বলছিল। আমরা তিন ভাইবোন করেছি। আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের হেড সার আমার উদ্বাস্তু সার্টিফিকেট পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের স্কুলে মাত্র পঁয়ষট্টি জন গ্রান্ট পেয়েছে। আমরা পাইনি। আমাদের বলেছে আমার সার্টিফিকেটে ভুল আছে। আমাদের তাহলে কী হবে?

কর্মী বললেন, স্কুলে পড়ছ। সার্টিফিকেট পেয়ে গেছ। আবার গ্রান্টও চাই? এত চাহিদা একবারে চাইবে না।

মেয়েটি বলল, এটা কী বলেন সার? গ্রান্ট ছাড়া আমাদের তো চলবে না। রেল অফিসে কাজ করে বাবা। সামান্য মাইনে। রেগুলোর না।

কর্মী বললেন, না, সার্টিফিকেটে কোনও ভুল নেই।

মেয়েটি কেঁদে ফেলল। বলল, তাহলে কী করব সার?

গম্ভীর হয়ে তিনি বললেন, আবেদনপত্র রেখে যাও। আমরা দেখব। আবার একদিন এসে খোঁজ নাও। ষষ্ঠ দিন।

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল। ছুটে পিছনে গেল ফকিরচাঁদ। তাকে ধরে বলল, তুই নেত্রকোণা থিইক্যা আসছস? ধর্মপাশা! আমারে বল!

মেয়েটি অবাক হয়ে কান্না থামায়। বলে, হ্যাঁ।

ফকিরচাঁদ বলে, কবে আইছস তরা?

মেয়েটি বলল, তিন বছর হইল।

ফকিরচাঁদ উত্তেজিত। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। বলল, তদের লগে সুফলা নামের কেউ আসছেল?

মেয়েটি বলল, না তো! আমি জানি না! কে সুফলা?

ফকিরচাঁদের চোখ নিভে যায়। সে বলে, আমার এক চেনা মানুষ। তুই আমারে কাগজ দিয়ে যা! আমি ব্যবস্থা করুম। আমার জেলার মাইয়্যা তুই। তর আর আসা লাগব না রোজ রোজ!

ফকিরচাঁদের চোখে জল দেখে সেই মেয়ে অবাক। হঠাৎ ফকিরচাঁদ তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।

ততক্ষণে অফিসের টেবিলের সামনে এগিয়ে এলেন সুধাময়ী। বললেন, আমাগো কিছু গ্রান্ট চাই।

চোখ তুলে কর্মী বললেন, মানে? এখানে কি ফ্রিতে গ্রান্ট মেলা হচ্ছে? যে যখন আসছে একটা করে গ্রান্ট চাইছে। আপনি মাসিমা, কী বলছেন?

সুধাময়ী বললেন, সপ্তাহে যে টাকা পাই তা দিয়া চলে না। আমাগো ঘরের পুরুষেরা কিছু কিছু কাজ করে। তাও বড় অল্প। আমরা থাহি এক স্কুলঘরে। সেহেনে তো আজ নয়, কাল স্কুল হইব। আমাগো কী হইব? জমি ঘর কিছুই নাই।

কর্মী বললেন, আপনাকে আগে দেখিছি। নতুন এসেছেন।

সুধাময়ী মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, কয় মাস হইল।

কয় মাস! লোকটি বলল, আর এখানে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের কত বছর হয়ে গেল! আর আপনি কয়মাস এসেই গ্রান্ট চাইছেন? কীসের গ্রান্ট?

সুধাময়ী বললেন, কত বছর হইয়া গেল তাও এদের জমি ঘর ইশকুল কাজের জোগাড় সরকার কইরতে পারল না ক্যান? আমরা কয় মাস আইছি, তাই আমাগো আরও দশ বছর বইয়া থাকতে হইব?

কর্মী ভ্রু কুঁচকে বলল, মাসিমা আপনি একা নয়, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ লোক আসছে লাস্ট সাতেরো বছর ধরে। আমরা কত করব? তাও চেষ্টা করছি।

সুধাময়ী বললেন, আমার কাজটা কি হইব?

কী কাজ?

আমাগো মাইয়াদের সরকার যদি কোনও গ্রান্ট দেয় আমরা সেই টাকায় কিছু কিছু কাম করতে পারি। জিনিস কিইন্যা বানাইব। তারপর নিজেরাই বেচুম। কিংবা ধরেন আপনেরাই কিইন্যা নিলেন। এইডা শুধু মাইয়াদের লইগ্যা! সবাইরে যদি কিছু কিছু দ্যান, কিছু মাস বা বছর পর আমরা টাকা আবার ফিরাইয়া দিমু!

সরকারি কর্মীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল! বললেন, তার মানে? সরকারের থেকে টাকা নিয়ে আবার সেই টাকা কেউ ফেরত দেয় নাকি! আমাদের বোকা ভাবছেন। ওই রকম কোনও গ্রান্ট হয় না।

সুধাময়ী বললেন, মন দিয়া সবটা শুনেন।

একটি অল্পবয়সি ছেলে এতক্ষণ অদূরের টেবিলে বসে কিছু কাজ করছিল। হঠাৎ উঠে এসে সে বলল, মাসিমা, আপনি বসুন। সুভাষদা, তুমি অন্য কেস দেখে নাও। আমি এটা দেখছি।

ছেলেটি বলল, মাসিমা আপনার কথাটা একটু স্পষ্ট করে বলুন।

সুধাময়ীর ফর্সা ত্বক। চোখে চশমা নেই। বেশিরভাগ চুল কাঁচাপাকা। তীক্ষ্ণ নাক। আয়ত চোখ। এমন এক ব্যক্তিত্ব যাকে ঠিক এই কলোনিতে অনুকম্পা চাওয়া রিফিউজি ফ্যামিলির মানুষ মনে হয় না। ছেলেটির নাম অমিতেশ রায়। সে একজন বিসিএস অফিসার। ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরে সদ্য চাকরি করছে। প্রবেশন পিরিয়ডে।

সরকারের রিফিউজি পলিসি অনুযায়ী ১৯৫৯ সালের আগে যে সব উদ্বাস্তু এসেছে, তাদের সমস্ত রকম ডোল, সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে আসা কাউকে আর এ রাজ্যে রাখা সম্ভব নয়। তাদের বিক্ষিপ্তভাবে পাঠিয়ে দেওয়া হবে রাজ্যের বাইরে। বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রে।

সমস্যা হল, মাঝেমধ্যেই একটা করে ধাক্কা আসে। যেমন এই বছর। গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়েছে আবার অগুনতি উদ্বাস্তু আগমন। অমিতেশকে পাঠানো হয়েছে প্ল্যান আর রিপোর্ট পাঠাতে।

অমিতেশ বলল, হ্যাঁ, এবার বলুন।

সুধাময়ী বললেন, শোনেন সার!…

অমিতেশ বললেন, আমাকে সার বলবেন না। আমাকে তুমি বলুন।

সুধাময়ী একটু থমকে গিয়ে চুপ করলেন। তাঁর আজকাল অল্পেই চোখে জল আসছে কেন? যেদিন থেকে ঘরছাড়া হয়েছেন, সেদিন থেকে নিজের ফেলে আসা জীবনের মর্যাদা আর ভুলতে পারছিলেন না।

এই যে ছেলেটি তাঁকে সম্মান করে বসতে বলল, কথা বলছে, এটা অপ্রত্যাশিত। আগে অপমান হলে চোখ জল আসত। এখন সম্মান পেলে চোখে জল আসছে।

সুধাময়ী বললেন, জানুয়ারি মাসে আমরা কিছু পরিবার আইছিলাম ওই পারের তাড়া খাইয়া। যেভাবে আরও হাজার হাজার লোক আইছে এতকাল ধইব়্যা। যেভাবে আইছিলাম সঙ্গে সামান্য কিছু পয়সা ছিল। তাও সব শ্যাষ হওনের পথে। আমাদের ছেলেরা দিন রাইত কষ্ট করে। কিন্তু কে দেবে কাম? তারা তো কিছু চিনেও না। তোমাদের টাকায় তেমন কিছু তো হয় না। তার উপর আমাগো যে কোনও সময় উইঠ্যা যাইতে কইতে পারে।

সুধাময়ী বলে চললেন, থাকি স্কুলের ঘরে। আমাগো এই পরিবারগুলোই শুধু না। কলোনির অনেক মেয়েরাই হাতের কাম জানে। তোমরা যদি সামান্য কিছু পয়সা দিয়া আমাগো উপর ভরসা করো, আমরা সেই পয়সায় জিনিসপত্র কিনুম। ধরো সেলাই মেশিন। কিংবা ঘর গেরস্থালির কাঠের কাজ, পুতুল, সরা, কাঁথার কাজ, আচার, শুকনা খাবার বানানো। শুনছি কইলকাতায় আচার, রুমাল, বেলাউজ বিক্রি হয়। এইসব কইব়্যা যদি বাইবে বেচা যায়। আমাগো ছেলেরাই যাবে বেচতে। আমাদের যা রোজগার হবে, সেখান থিইক্যা বাঁচাইয়া বাঁচাইয়া তোমাগো পয়সা ফিরত দিব।

অমিতেশ উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। সুধাময়ীর সামনে ঝুঁকে পড়ে সে বলল, এটা তো দুর্দান্ত একটা প্ল্যান, মাসিমা! এটাকে বলে মাইক্রোফিনান্স! সবেমাত্র সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট চালু করেছে পাইলট প্রজেক্ট। আপনি জানলেন কীভাবে?

সুধাময়ী বিস্মিত। বললেন, আমি তো কিছু জানি না। কী কইলা তুমি, বোঝলাম না!

অমিতেশ বলল, আপনি একটা কাজ করুন। আমি একবার ডিপার্টমেন্টে কথা বলি। ক্যাম্পের মেয়েদের জন্য ঠিক কী কী করা যায় আপনি একটা লিস্ট করে ফেলুন। ইয়ে আপনি…মানে…আপনি…লিখতে…

সুধাময়ী একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ, লিখতে পারি। লিস্ট মানে তালিকা। এলআইএসটি। ঠিক হইছে? যদি ঠিক হয়, তাইলে আমার কথাডা একটু ভাইবো।

অমিতেশ বলল, মাসিমা, আমি কথা দিচ্ছি। আমার দিক থেকে যতটা সম্ভব আমি করব। ইন ফ্যাক্ট আমার হাতে পুরো থাকলে আমি এখনই গ্রান্ট দিতাম। কিন্তু সরকারের কাজের অনেক নিয়মকানুন আছে। কারা কারা বেনিফিশিয়ারি সেসব চাইবে। কারিগরি, হস্তশিল্প এসবের জন্য আড়াইশো টাকা করে একটা তহবিল দেওয়া হয়। বাট সেটা তো আমাদের যে ভোকেশনাল সেন্টার আছে সেখানে কাজ শেখার পর। তাও আবার সবাইকে নয়, বিধবা, স্বামীহারা এসব মহিলাদের।

সুধাময়ী উঠলেন। বললেন, দ্যাখো পারো কিনা! আমি কীভাবে জানুম?

অমিতেশ ফকিরচাঁদকে দেখিয়ে বলল, এ আপনার সঙ্গে এসেছে তো? ওকে একবার সামনের সপ্তাহে খোঁজ নিতে বলবেন।

ফকিরচাঁদ অবাক। এরপর তারা দুজনে এল ক্যাম্পের সামনে।

অনেক মহিলাদের বলা হয়েছিল। সন্ধ্যাকে বলে রেখেছিলেন সুধাময়ী। সন্ধ্যা সকলকে ডেকেছে নিজেদের বারান্দার সামনের একফালি জমিতে।

ক্যাম্পের মহিলাদের সুধাময়ী বললেন, তোমরাও সংসারে ট্যাকা আনতেছ, এইডা ভাবতে ক্যামন লাগে? তোমাদের ট্যাকা তোমরা নিজের কাছে জমাইবা। পুজোর সময় সেই ট্যাকায় ছেলেপিলের জামা কিনবা, ক্যামন হবে? ঝগড়ার সময় তোমাগো যাতে পুরুষগুলোন কইতে না পারে যে, তারা খাইট্যা খাইট্যা মইব়্যা গেল, আর তোমরা কোনও রোজগার করো না, বইয়া বইয়া খাও। এইডা শোনতে ইচ্ছা করে কারও?

সুধাময়ী মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার দিকে তাকাইয়া কও, তোমরা কাম কাজ কইব়্যা টাকা রোজগার করতে পারো, কিন্তু করতেছ না! এইবার থিইক্যা কামে লাগতে হইব। যে যা পারি, সেই কাম করুম। সেলাই পারো, সেলাই করো। ঝুরি বোনতে পারো, তাই করো। পুতুল বানাইয়া আলপনা দেবা, তাই দাও। মনে রাইখ্যো, দিনরাত নিজেদের মইধ্যে আঁকচা আঁকচি কইব়্যা নিজেরাই নিজেদের ছোট কইব়্যা দিতেছ!

যে যা পারবা সেই কাম করবা। আমি কথা কইছি অফিসে। আমরা কাম করুম। ভিক্ষার ডোল আমরা আর নিমু না। নতুন লড়াই লড়ব, নিজের শক্তি দিয়া।

অমিতেশ রায়ের থেকে সুখবর আনল ফকিরচাঁদ। সরকার ঠিক করেছে, এখানেও সেল্ফ হেল্প গ্রুপের স্পেশাল রিফিউজি লোন দেবে। কো-অপারেটিভ করে। এটা হবে একটা পাইলট প্রজেক্ট। হলে অন্য ক্যাম্পেও শুরু হবে।

কুপার্স ক্যাম্পের অদূরে একটি ছোট্ট অস্থায়ী কলোনিতে বাঁশবাগানের পাশের জমিতে সুধাময়ীর নেতৃত্বে গড়ে উঠল একটি স্বনিযুক্তি সংগঠন। নাম দেওয়া হল ‘আপনজন মহিলা সমিতি’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *