সন্ধিক্ষণ – ৯

শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পদ্মা হয়ে লঞ্চ এসেছে গোয়ালন্দ। আরও সহজে আসা যেত। কিছু কম সময় লাগত। কিন্তু অন্য পথে আসা ছাড়া উপায় নেই। এটাই ছিল মোজাম্মেল হকের নির্দেশ। কারণ, তিনি জানেন নারায়ণগঞ্জের থেকেও ঢাকার অবস্থা খারাপ।

ঢাকা জুড়ে চলছে হিংসা। কিন্তু এসব দিকে কী হচ্ছে? একটু সাবধানে আগে জেনে নিতে হবে। তবে গোয়ালন্দ থেকেই কলকাতা যাওয়ার ভিড় সবথেকে বেশি। তাই এখানে অন্তত জমজমাট জায়গা। দোকানপাট, ব্যবসা, পাটের কারবারি, হোটেল। এত ভিড়ভাট্টার মধ্যে কেউ কি হিন্দু পরিবার দেখলে হামলা করবে? মোজাম্মেল হকের মনে হয় না।

দারোগা হিসেবে তিনি খবর পেয়েছেন যে সমস্ত লঞ্চঘাট আর রেলস্টেশনে আবাগীর পুতগুলো দাঁড়িয়ে আছে হাতে অস্ত্র নিয়ে। এই তো ঢাকায় টুঙ্গি, তেজগাঁও স্টেশনে ধরে ধরে নামিয়ে নেওয়া হচ্ছে হিন্দু পরিবারদের। প্রতিবাদ করলে মুসলিমদেরও ছাড়া হয়নি। মোজাম্মেল হক জেনেছেন বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বিহারি মুসলিমগুলো।

এসবের আসল কারণ হল, হিন্দুদের জমি আর বাড়ি দখল করে নেওয়া। গ্রামের জমির বেশিরভাগই ছিল হিন্দুদের। সাতচল্লিশ আর পঞ্চাশের পর প্রায় সবই চলে গিয়েছে। যতটুকু বেঁচে আছে কোনও একটা অজুহাতে সেগুলো দখল করাই লক্ষ্য। শহরে দাঙ্গার কারণ অফিস কোর্ট ইউনিভার্সিটি থেকে হিন্দুদের ভাগিয়ে সেইসব জায়গায় ঢোকার চেষ্টা।

মোজাম্মেল হক ঠিক করেছেন পুরোনো ঢাকার আশেপাশে কোথাও একটা আগে পৌঁছতে হবে। সবার আগে ইস্ট বেঙ্গল রেলের একটা এন ও সি জোগাড় করতে হবে। রিফিউজিদের এই এন ও সি পেপার থাকলে পাসপোর্ট লাগে না।

বিকেল হয়েছে। লঞ্চ এসে ঠেকেছে লঞ্চঘাটে। রমাপদর বোন কুসুমের মাথাটা কাজ করছে না। সে মাত্র কিছুদিনের জন্য এসেছিল বাপের বাড়ি। চট্টগ্রামে রয়ে গেছে তার স্বামী সুবিমল। তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে এখন সে কোথায় যাচ্ছে? তাকে তো বলা হয়েছিল তারা ঢাকা যাচ্ছে!

কুসুমের হতবুদ্ধি লাগছে। আসলে তারা নাকি কলকাতার দিকে চলে যাবে। কতদিনের জন্য? এভাবে কলকাতা যাওয়া যায়? সে যে শুনেছে পাসপোর্ট লাগে। সুবিমল কীভাবে খবর পাবে? সে যখন আসবে যুগীগঞ্জে, তখন? সেখানে রয়ে গেছে মালতীরা। প্রথমে রমাপদ বাড়ি এসে বলেছিল তারা ঢাকা যাবে। সেখানে মালতীর বর নরেন আছে। কিন্তু তারপর সব কেন পালটে গেল?

একসঙ্গে সকলে নামা ঠিক না। সুবিনয় চক্রবর্তী কেবিনে গিয়ে বললেন, আমাকে তোমরা সবাই চেনো না। আমি মুন্সিগঞ্জের হাই স্কুলে পড়াই। নারানগঞ্জেই বাড়ি। সোনাকান্দায় একটা আশ্রম আছে আমাদের। সেখানে মাঝেমধ্যেই থাকি। লতিফরাও আমার পরিচিত। কুশের বাবা আমার বন্ধুর মতো ছিলেন। তোমাদের বলা হয়েছিল ঢাকা যাওয়া হবে। এই দিকটা ঠান্ডা হলে আবার ফিরতে পারবে। কিন্তু দারোগা সাহেবের কাছে খবর পেলাম ঢাকা এখন জ্বলছে। ঢাকায় না যাওয়াই ভালো। তাই ভাবলাম…

সুধাময়ী বললেন, মাস্টারমশায় ভাবাভাবির কিছু নাই! সব শান্ত হইলেও আমরা আর ফিরুম না! এই দ্যাশের মানুষ, এই দ্যাশের মাটি, আর এই দ্যাশের বাতাসে আমাদের আর অধিকার নাই। এ দ্যাশ আর আমার দ্যাশ নাই। যদি অন্যের দয়ায় বাঁচতেই হয়, তাইলে বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়ার দয়ায় বাঁচি গিয়া। এভাবে সারাজীবন কাটাইতে হইব না। আপনে যত তাড়াতাড়ি হয় আমাদের কইলকাতার রেলে তুইল্যা দেন!

সুবিনয় বললেন, বউদি, আপনি হাল ছেড়ে দেবেন! এভাবে ভাববেন না। এসব কতদিন চলবে? বন্ধ হবে একদিন। তারপর আপনারা আবার আসবেন। নিজের ঘর জমি দোকান ফেলে কোথায় যাবেন? আপনারা তো কিছুদিন লবের কাছে চলে যেতে পারেন। সে তো ইন্ডিয়ায়।

সুধাময়ী শান্ত স্বরে বললেন, ওসব কথা থাউক! আপনি বলেন, রেলের সময় কটায়? আমরা কি নামুম অহন? এইডা গোয়ালন্দ?

সুবিনয় শ্বাস ফেললেন। তিনি জানেন সুধাময়ীকে। বন্ধু অবনীমোহন বিয়ে করতে গিয়েছিল কুমিল্লা। সেই বরযাত্রীর দলে ছিলেন সুবিনয়। সেই সময় থেকে সুধাকে দেখছেন। এরকম তেজস্বী এবং জোরালো ব্যক্তিত্বের নারী গ্রামগঞ্জে খুব কম দেখা যায়।

ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত পড়েছেন সুধাময়ী, কিন্তু পড়ার চল বন্ধ করেননি। তিনি মুন্সিগঞ্জ থেকে গেলে বই আনার কথা বলতেন সারাক্ষণ। নারানগঞ্জের বোস কেবিনে খুব আড্ডা হতো অবনীমোহন, সুবিনয় আর বন্ধুদের। নারানগঞ্জের বোস কেবিনের মালিক নৃপেন বোস যোগ দিতেন সেই আড্ডায়।

অবনীমোহন হাসতে হাসতে বলতেন, সুধার বইখান পড়া শ্যাষ হইছে। আরও বই আইন্যা দিও! নতুন বই তার কাছে নিয়া না গেলে আমার খাবারে টান পড়বে। বলে হাসতেন অবনী।

দাঙ্গায় অবনীর মৃত্যুর পর দুই ছেলেকে একাই মানুষ করেছেন সুধাময়ী। নারানগঞ্জে একটা ছোট কাপড়ের দোকানে সেলসগার্ল হিসেবে কাজ নিয়েছিলেন। সেই কাজের ফাঁকেই ছিট কাপড় নিয়ে এসে বাড়িতে সেলাই মেশিনে কাজ শুরু। এভাবেই ছেলেরা বড় হল। তাদের বিয়ে হল। তিনি নিজেই প্রভাসকে বলেছিলেন জামাকাপড়ের দোকান দিতে। আদমজী ঢাকেশ্বরী লক্ষ্মী অন্নপূর্ণা মেহতা—নারানগঞ্জে কটন মিলের শেষ নেই। এক্সপোর্ট করার কাপড় যখন কোনও কারণে রিজেক্টেড হয়ে যায় সেসব কাপড় স্থানীয় দোকানিরা কিনে নেয়।

যার যত সোর্স সে সস্তায় ততো বেশি ভালো কাপড় পেয়ে যায়। এভাবেই প্রভাস ভালোই সংসার চালাচ্ছিল। যদিও সুধাময়ীর বড় ছেলে লব অর্থাৎ প্রদীপ আর এদেশে থাকতে চায়নি। তারা চলে গিয়েছে ইন্ডিয়ায়। তারপর প্রদীপ যতবার এসেছে ছুটি কাটাতে, ততবারই সে নিয়ে যেতে চেয়েছে মাকে।

কিন্তু সুধাময়ীর মধ্যে মাতৃস্নেহ আর নীতিবোধ দুইই প্রবল। তাই প্রভাসকে তিনি পূর্ববঙ্গে স্বামীর ভিটায় ফেলে রেখে যাবেন না। প্রভাসও তো চলে যেতে পারত ইন্ডিয়ায়? যুগীগঞ্জে ঝঞ্ঝাট ঝামেলা না হলেও মাঝেমধ্যে বেশ কিছু হিন্দু পরিবার চলে যেত ওপারে।

যাদের আত্মীয়স্বজন আছে কলকাতায়, তারা কিছুটা মাথা গোঁজার ব্যবস্থা পায়। কিন্তু তাও কতদিন? একটা সময় নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদের করতেই হয়। এদের অনেকেই আসলে থাকে কলকাতা থেকে অনেক দূরের কোনও উদ্বাস্তু ক্যাম্পে কিংবা কলোনিতে। কলোনিতে এখন আর সহজে জায়গা পাওয়া যাবে না।

সুবিনয় বললেন, তোমরা সকলেই নেমে এসো ঘাটে। কোনও ভয় নেই। দারোগা সাহেব আছেন। চাইলে এখানে স্নান খাওয়া সেরে নাও।

স্টেশন মাস্টার তোফাজ্জেল হাসান নিজের ঘরেই ছিলেন। দারোগা মোজাম্মেল হক ঢুকে বললেন, সালাম আলাইকুম হাসান সাহেব!

তোফাজ্জেল বললেন, কতজন?

মোজাম্মেল বললেন, আঠারো-কুড়ি জন। এদের একলগেই তোলা লাগব! এক গেরামের সব! আইচ্ছ্যা একটা কথা কন! রাজবাড়ি, কুষ্টিয়ায় কি অশান্তি আছে? মানে এই যে ফ্যামিলিগুলোনরে আমরা ছাইড়্যা দিমু, অদের পথের কোনও স্টেশনে নামাইয়া যদি কুপাইয়া দ্যায়?

তোফাজ্জেল বললেন, সে আর কী করতে পারি? আমার তো সিকিউরিটি দেওনের কাম না!

মোজাম্মেল হক বললেন, আপনের ফুপাতো ভাইয়ের ব্যাগ ছিনতাই হইছিল গোয়ালন্দ ঘাটে। পুলিশ কোনও গেরাহ্যি করতেছিল না! এসব আমারে আপনেই কইছিলেন। তার ব্যাগে অনেক দরকারি কাগজ ছেল! আপনে আমারে কইছিলেন একডা কিছু ব্যবস্থা কইরতে! মনে পড়ে?

তোফাজ্জেল হাসান বলেন, হ্যাঁ মনে আছে। এই কথা জিগান ক্যান?

মোজাম্মেল হক তোফাজ্জেলের চোখের দিকে তাকিয়ে কেটে কেটে বললেন, আমি তো তখন মুন্সিগঞ্জে ছিলাম! আমার কি আপনের গোয়ালন্দের ঘটনা নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা আছিল? ঘামাইলাম ক্যান? আজ আপনের কথায় বুঝলাম নিজের ডিউটির বাইরে কাম করা ঠিক না। আপনের খালার বাসায় কী য্যান এক ঝামেলা হইছে না? বাসা ছাড়তে কইছে?

তোফাজ্জেল হাসান কয়েক মুহূর্ত চুপ। বললেন, আইচ্ছ্যা আমি দুইজন রেলপুলিশের স্টাফ দিতে কমু কামরায়!

মোজাম্মেল হক বললেন, আপনের মতো মানুষ হয় না তোফাজ্জেল ভাই! আপনের মন কুটিল না। এই যে আপনে স্পষ্ট বুঝাইয়া দ্যান যে, হিন্দুগো পছন্দ না। কোনও ধানাইপানাই নাই। ধানাইপানাই করা মানুষ আমার অপছন্দ।

তোফাজ্জেল চোখ সরু করে বললেন, ঠিক বোঝলাম না! সব হিন্দু চইল্যা যাক এইডা আমি কখন কইলাম!

মোজাম্মেল হক বললেন, কইছেন কইছেন। মনে মনে কইছেন। এই দাঙ্গা হাঙ্গামায় হিন্দুগুলোন পলায়ে যায় রোজ আপনের স্টেশনে আইস্যা, কান্দে আছড়াইয়া পিছড়াইয়া, এইডা আপনের দ্যাখতে খুশি লাগে। তাই যেই আমি কইলাম পুলিশের ব্যবস্থা করেন, আপনের মনে হইল পুলিশ দিলে তো মজা খতম! আর যেই আপনে বোঝলেন আমার কথায় যে, আমারে আপনের দরকার হবে, কারণ হাজার হোক আমি দারোগা, তখনই রাজি হইয়া গ্যালেন।

তোফাজ্জেল হাসানের মুখ ঝুলে গেল। তিনি এক পিওনকে ডেকে একটা কাগজে কিছু লিখে দিলেন। সেই কাগজ নিয়ে সে চলে গেল।

লঞ্চ থেকে নেমে কিছুটা হাঁটতে হবে। সরাসরি স্টেশনে যাওয়ার রাস্তাটা বন্ধ। তাই পিছনের রাস্তা দিয়ে যেতে হবে। নিঃশব্দে চলেছে পরিবারগুলি। কুনকুন একটা শব্দ হচ্ছে। কুসুমের কান্না। তার কোলে ছেলে। কুসুমের শ্বশুরবাড়ির কেউ জানতেও পারছে না যে কুসুমকে চলে যেতে হচ্ছে কলকাতার দিকে।

সন্ধ্যা ভাবছে এটা ভুল হচ্ছে না তো! তাদের উচিত ছিল খুলনায় যাওয়া। হাজার হোক বাপের বাড়ি। চেনা জায়গা। হঠাৎ সব ছেড়ে তারা কেন যাবে ইন্ডিয়ায়? একবার চলে গেলে আর ফেরা যায় নাকি? আর সুধাময়ী এটা কী বললেন, তিনি থেকে যাবেন উদ্বাস্তু হয়ে!

সঙ্গে তো কিছু জামাকাপড়, ঘরে থাকা টাকা আর গয়না ছাড়া কিছুই নেই। ওপারে গিয়ে তারপর? ওখানে সরকার থেকে থাকার ব্যবস্থা হয়? একটা সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায় কীভাবে একটা নতুন সংসার হবে? এই প্রশ্নগুলোর একটাও উত্তর নেই সন্ধ্যার কাছে।

ঠিক সেই সময় তার চোখে পড়ল কুসুম আর প্রভাস পাশাপাশি হাঁটছে। কুসুম প্রভাসের বাহু ধরে আছে! সন্ধ্যার কোলে তপু। প্রভাসের মাথায় কাপড়ের গাঁটরি। হাতে টিনের বড় বাক্স। কাঁধে ব্যাগ। আর বাবুর হাতে দুটো বাক্স।

সন্ধ্যার হঠাৎ তীব্র রাগ তৈরি হল। প্রভাস হঠাৎ কুসুমের পাশে কেন? মালতী ঠারে ঠোরে জানিয়েছে রমাপদের বোন কুসুমের নাকি প্রভাসের উপর টান ছিল। তাহলে দুজনের বিয়ে হয়নি কেন?

সন্ধ্যার মনের মধ্যে আচমকা ফিরে এল শ্যামলদার মুখ। শ্যামলদার পায়ে গুলি লেগেছিল। শ্যামলদা ফিরল, পঙ্গু হয়ে। ক্রাচ নিয়ে হাঁটে। সন্ধ্যাকে বলেছিল, সন্ধ্যা তোমাকে আমি একজন পঙ্গুর সঙ্গে থাকতে বলতে পারব না। আমাকে ক্ষমা কোরো।

সন্ধ্যা স্তব্ধ ছিল। শ্যামলদা বলে যাচ্ছিল, আমিই তোমার বুকে জন্ম দিয়েছিলাম ভালোবাসার। সেই ভালোবাসাই থেকে যাক। আজ তুমি বুঝতে পারছ না, আমার সঙ্গে নিজেকে জড়ালে একদিন তুমি আমায় অনুকম্পা করবে। তারপর আসবে বিরক্তি। আমরা যেন নিজের হাতে নিজেদের ভালোবাসাকে হত্যা না করি।

সন্ধ্যার সঙ্গে শ্যামলের সেই শেষ দেখা। প্রভাসের সঙ্গে তার বিয়ের পর শ্যামল নাকি ফিরে এসেছে। খুলনা কোর্টে প্র্যাকটিস করে। বাবার কাছেই শোনা। তবে ওদের বাড়িতে আর আসে না।

ওপারে গিয়ে রমাপদরা কি তাদের সঙ্গে একই জায়গায় থাকবে? তার মানে তো কুসুমও থাকবে? সন্ধ্যার দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

সন্ধ্যার হঠাৎ সম্বিৎ ফিরল। এসব কথা এখন মনে পড়ছে কেন? আগে তো অনেকবার ভেবেছে! কুসুমকে নিয়ে তার মনে কি কোনও ঈর্ষা তৈরি হচ্ছে? এই অগ্নিবলয়ের মধ্যে প্রভাস আর কুসুম কি আবার কাছাকাছি আসবে? সন্ধ্যা মাথা ঝাঁকায়। না—না, এসব চিন্তা করবে না সে!

গোয়ালন্দ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার আগে মোজাম্মেল হক সকলকে নিয়ে গেলেন একটা দোকানের সামনে। চিঁড়ে মুড়ি, গুড় বাতাসা কিনে নিতে বললেন।

সুবিনয় বললেন, তোমরা পয়সা দিও না। আমি দিচ্ছি। তোমাদের এখন পয়সা রাখা দরকার। প্রতিটা পয়সা হিসাব করে রাখবে। এখন কিছু খেয়ে নাও। অনেকটা পথ বাকি। রাস্তা কেমন জানা নেই। কোনও স্টেশনে আটকে দেবে কিনা তাও বা কে জানে!

সুবল বলল, মাস্টারমশাই এখন কিছু মন চায় না। আমরা সাথে খাবার নিয়া যাই। টেরেনে খামু!

আমি যামু না…আমি যামু না…। সে আমারে খুঁইজা পাবে না। সে আমারে খোঁজবে। আমি ফিরা যাই মাস্টারমশাই। হঠাৎ উচ্চকিতস্বরে কেঁদে উঠল কুসুম। সে প্রভাসের বাহু ধরে কাঁদছে। বলছে, কুশদা, তোমরা সকলে একলগে আছ। একা একা যাইয়া আমি কী করুম!

প্রভাস উতলা হয়ে বলল, কুসুম এসব কী? এখন এসব বলছ কেন? এখন আমাদের ফেরার জায়গা নেই। তোমাকে একা দেখে কী হবে বুঝতে পারছ না? আমাদের সঙ্গে দারোগা সাহেব আছে বলেই আসতে পেরেছি এই স্টেশনে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি সুবিমলের হাতে তোমাকে ফিরিয়ে দেব। প্রভাস কাঁধে হাত রাখল কুসুমের। প্রভাসের কাঁধে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল কুসুম। সন্ধ্যা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

রমাপদ এগিয়ে গিয়েছিল অনেকটাই। সে পিছনে তাকিয়ে দ্রুত আবার ফিরে এল। তার দু’হাতে ব্যাগ। মাথায় একটা বাক্স। রমাপদর ছেলেমেয়ে আছে মা-বাবার কাছে। বউ রজনী কেঁদে চলেছে নিঃশব্দে। মেয়েদের বুকের মধ্যেই সবথেকে বেশি চলছে এক নীরব ভূমিকম্প। কারণ তাদের কারও বাপের বাড়ি বরিশাল, কারও খুলনা। কারও বাবা-মা থাকে টাঙ্গাইল। তারা কেউ জানতেও পারল না যে তাদের মেয়েরা কোথায় চলে যাচ্ছে!

বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর ঘরে আসা একবার। হারিয়ে যায় পুরোনো ঘর। স্বামী চলে গেলে ছেলের সংসার। হারিয়ে যায় পুরোনো ঘর। এই ঘরও স্থায়ী হল না। আবার ঘর ছাড়তে হচ্ছে। মেয়েদের জীবন অন্তহীন এক ভাগের আখ্যান!

গোয়ালন্দ স্টেশনে ট্রেন ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে হুড়োহুড়ি শুরু হল। আগে থেকে বসে আছে বহু পরিবার। সকলেই এ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মোজাম্মেল হকের চোখের ইশারায় সেই দুই রেলপুলিশ আগেভাগে উঠে এই পাঁচ পরিবারের জন্য কিছু সিট দখল করে নিল। তারপর তাদের বসার জায়গা করে দিয়ে নিজেরাও বসল।

মোজাম্মেল হক তাদের কাছে গিয়ে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, এই লোকগুলোনরে আমাদের দ্যাশ ধইব়্যা রাইখতে পারল না। তাই এরা চইল্যা যায়। এ আমাগো লজ্জা। বুঝছ? তাই এদের দর্শনার আগে ছাইব়্যা যেও না! এই টাকা রাখো। খাওনের লাইগ্যা! তোমাগো উপর ভরসা, ইনশাল্লা!

গোয়ালন্দ থেকে শিয়ালদহ ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের ট্রেন ছাড়ল আরও দুই ঘণ্টা পর। ট্রেনের হুইসলের শব্দ যেন ঢেকে গেল কামরায় কামরায় কান্নার কলরোলে! এই মানুষগুলোর দেশ হারিয়ে যাচ্ছে চিরদিনের মতো! নতুন দেশে তারা উদ্বাস্তু? নাকি অনুপ্রবেশকারী? দেশহীন যাত্রীদের নিয়ে ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস ছুটে চলল অজানা ভবিষ্যতের দিকে!

পিছনে পড়ে থাকে রাজবাড়ি। ছুটে যায় কুষ্টিয়া। দর্শনার শেষ আমবাগানের পর একটা মাঠ। একটা বড় জলাশয়। জানালা থেকে দেখা যায় একটা স্টেশন আসছে। লাল বিল্ডিংয়ের মাথায় একটা পতাকা! স্টেশনে ঢোকার আগে ট্রেনের জানালা থেকে সাধারণত সকলে সামনের দিকে তাকায়। দেখতে চায় স্টেশন আর প্ল্যাটফর্মকে।

 এই কামরার বেশিরভাগ লোক পিছনে যতদূর চোখ যায়, তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করছে। কারণ ওই যে আমবাগান, জলাশয়, কলাগাছের সারি আর পিছনে সরে সরে যাচ্ছে, ওই দেশ কি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে? গেদে নামের একটি ছোট স্টেশন চলে গেল। ট্রেন দাঁড়াল না। কিছুক্ষণ পর আর একটা স্টেশন এল।

শব্দ হল ব্রেক কষার। ধীরে ধীরে থেমে গেল ট্রেন। জানালায় জানালায় চা, লুচি আলুর দম আর ‘টাকা বদল’ ‘টাকা বদল’ ডাক দিয়ে বিক্রেতাদের চিৎকার। এই তাহলে ইন্ডিয়া!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *