১৬
লাল রঙের উৎসব শুরু হয় এই সময়টায়। রাঙা মাটি। আর লাল ফুলে চারদিক ভরে আছে। আমের নতুন পাতা। সেও তো লাল। দূরে দূরে পাহাড় শ্রেণি। এই স্কুলে যাওয়া আর ফেরার সময়টায় ভারি ভালো লাগে বাবুর। স্বাধীনতা পায়। আর তপুকে সামলাতে হয়। যেন সে অনেক বড় এক গার্জিয়ান। তপুও তো দাদা বলতে অন্ধ। যা বলে, সেটাই যেন তার কাছে শেষ কথা।
সামনে কাঠের কালভার্ট। মুরদাং খালের উপরে। নামেই খাল। বর্ষার সময় যেন নদী। যায় তীর ছাপিয়ে। এটা পেরিয়ে যেতে হয় স্কুলে। ফেরাও একই পথে। স্কুল ছুটির সময় কখনও সখনও আঙ্গা চলে আসে। তপুও ভর্তি হয়েছে স্কুলে। বাবু আর তপুর সঙ্গে রয়েছে আঙ্গা। কোপারামের বোন। সেই কোপারাম, প্রথমদিন যে প্রভাসকে দেখিয়েছিল জমি।
কোপারাম এখনও রয়ে গিয়েছে প্রজেক্ট অফিসে। ওদের বাড়ি সাত নম্বর পাহাড়ের কাছে। কয়েকদিন পর পর দাদা কোপারামের সঙ্গে গ্রামে আসে আঙ্গা। আঙ্গার বয়স তপুর মতোই বা একটু বেশি। এগারো বারো বছর। তবে তাকে দেখায় বড় আর শক্তপোক্ত। সাত নম্বর পাহাড়ের পাশে তুলং গ্রামে কোপারামের ঘর।
সকালে, দাদার সঙ্গে আসে আঙ্গা। আবার কারও না কারও সঙ্গে ফিরে যায় গ্রামে একটু বেলা হলে। ওর হাত দিয়ে কোপারাম বাড়িতে পাঠায় সংসারের টুকিটাকি জিনিস। তেল, নুন, সবজি এসব। মোহন সামন্তর দোকান থেকে কেনে। আবার মাঝেমধ্যেই বাবুর স্কুল ছুটির পর আঙ্গার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। বাবু জানতে চায়, কোথায় যাচ্ছে আঙ্গা?
আঙ্গা হাসে, বলে না।
অশ্বত্থ আর পলাশের ছায়াঢাকা পথ পেরিয়ে একের পর এক প্রকাণ্ড পাথর। প্রতিটি পাথরই যেন একটি করে ক্ষুদ্র পাহাড়। এরকমই দুই পাথরের মধ্যে রয়েছে কয়েকটা ঝরনা। ঝোরার এই জলে স্কুল থেকে ফেরার পথে মুখে হাতে জল দেওয়া আর জল খাওয়া কী আনন্দের। এই ঝোরার সন্ধানও দিয়েছে আঙ্গা। এই স্কুল ছুটির সময়গুলোয় সূর্য এখানে যেন বিশ্রাম করে। ভুঁইচাপা, বনগোলাপ, নীলকণ্ঠ পাখির রঙিন ছবির মধ্যে সকালে জঙ্গলের দিকে হেঁটে যায় কালো গ্রানাইটের পাথরে খোদাই করা গোন্দ অথবা হালবা পুরুষের দল।
মহুয়া, তেঁতুল, কাঠ আনতে সঙ্গী হয় তাদের ঘরওয়ালীও। তাদের অনেক সময়ই ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত। বাবুর এই চোদ্দো বছর বয়সে অজানা শিহরন হয়। ওই মেয়েদের দল হাসতে হাসতে যায় তাকে আর আঙ্গাকে দেখে।
সুন্দরপুরের আশেপাশের গ্রামে গোন্দ আদিবাসী বেশি থাকলেও কিছু গ্রাম আবার হালবা আদিবাসী অধ্যুষিত। দণ্ডকারণ্যে এই দুই আদিবাসী বেশি। গোন্দ ভাষা এখনও বাবু বুঝতে পারে না। হালবা কিছু কিছু বোঝে। উদ্বাস্তুদের জন্য হয়েছে মাধ্যমিক স্কুল। প্রথম প্রথম মা আসত বাবু আর তপুকে পৌঁছে দিতে। এখন নিজেরাই আসে। উদ্বাস্তু পরিবারগুলির জন্য এই স্কুল করে দেওয়া হলেও হিন্দি পড়তে হয়। এটা এক সঙ্কট। তারা হিন্দি জানে না। হিন্দি শেখা আছে ফকিরচাঁদের। সুতরাং সে কাজ পেয়েছে হিন্দি শেখানোর। ওই করে ঘুরে ঘুরে।
সুধাময়ী একটি আশ্চর্য স্কুল শুরু করেছেন। স্কুল তো নামেই। আসলে ঘরের সামনের দাওয়ায় তিনি পড়ান বাংলা। ছিন্নমূল বাবা মায়ের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে এই ছেলেমেয়েগুলো যেখানে এসে পড়েছে, সেই রুক্ষ শুষ্ক এই দেশে আর দশ বছর পর তারা বাংলা বলতে ভুলে যাবে। তাই সুধাময়ী এখন সময় করে সপ্তাহে কয়েকদিন ছেলেমেয়েদের বাংলা পড়াচ্ছেন।
স্কুল ছুটি হয়েছে। তপু একা একা সামনে যাচ্ছে। মাঝমধ্যেই দৌড়ে যায়। আঙ্গা একটা নীল ফুল লাগিয়েছে মাথায়। তপুর মাথাতেও লাগিয়ে দিয়েছে। বাবু আর আঙ্গা হাঁটছে পিছনে। সামনে তপু এগিয়ে যাচ্ছে।
বাবু বলল, তোদের গ্রামে স্কুল আছে। সেখানে যাস না কেন?
আঙ্গা নিজের হাতের দিকে দেখায়। বাবু দেখে চাকা চাকা দাগ।
আঙ্গা বলে, পানি অনেক নীচে। পাহাড়ের পাশে। মোটা দড়ি। জল তুলতে হয়। গরমের সময়ে আগে না গেলে পানি পাওয়া যায় না। তাই স্কুলে যাওয়া হয় না রোজ। আর ফাদার বলেছে, রোজ না গেলে স্কুলে গিয়ে লাভ নেই। কিন্তু কে পিনেকা পানি তুলবে?
বাবু বলে, যারা কাঠ কাটতে যায় তারা, তোর দাদা বউদি। ওরা ফেরার সময় এই ঝোরা থেকে জল নিয়ে যেতে পারে না?
আঙ্গা হাসে, ওদের মাথায়, হাতে থাকে কাঠ, মহুয়ার ঝোলা। জল নেবে কোন হাতে?
বাবু বুঝতে পারে একটা কথা। সে আর আঙ্গা হয়তো একই অঞ্চলে একটু কাছে দূরে বসবাস করে। কিন্তু তাদের দুজনের জীবনের মধ্যে অনেক ফারাক।
হঠাৎ তপু পড়ে গেল। কী হল? পাহাড়ের দিকে চেয়ে চেয়ে হাঁটছিল বাবু। আঙ্গা চিৎকার করে উঠে ছুটে গেল সামনের দিকে। হুই সাপ!
বাবুর মাথা ঘুরে গেল। সাপ?
আঙ্গা ততক্ষণে তপুর কাছে গিয়ে পা তুলে নিয়েছে নিজের কোলে। বাবুর চকিতে মনে পড়ল বাড়ির কথা। তপুকে এর আগেও ঘরে সাপ ধরেছিল। তপুকে বারংবার সাপ ধরে কেন? না এবার শুধু ধরেনি। কেটেওছে। তপুর মুখ যন্ত্রণায় নীল!
হঠাৎ বাবু দেখল, আঙ্গা তপুকে পিঠে তুলে নিয়ে ছুটছে উলটোদিকে। বাবু হকচকিয়ে গেছে। আঙ্গার দিকেই ছুটে গেল বাবু। বলল, আমার পিঠে দে।
আঙ্গা সেকথা কানে নিচ্ছে না। হরিণীর মতো ছুটছে। তার পিছনে বাবু। এই দৃশ্য দেখেও যেন বিশ্বাস হয় না।
হঠাৎ রাস্তায় সাইকেল। নিরাপদকাকা। নিরাপদ সাইকেল থামায়। বলে, কী হল?
বাবু বলে, সাপ!
নিরাপদ তৎক্ষণাৎ আঙ্গাকে থামায়। তপুকে কোলে নিয়ে এবার সে ছুট দেয়। ডিসপেনসারি এখনও দূরে।
আঙ্গা হঠাৎ থেমে গেল। আড়াআড়ি অন্যদিকে ছুটে গেল। বাবু ডাকল, আঙ্গা…এদিকে…আঙ্গা…
আঙ্গা পিছনে ফিরে তাকায়। তারপর হাতের ইশারায় বলে, আসছি। তুমি যাও।
নিরাপদ যা ভয় পেয়েছে, তাই। ডাক্তারবাবু নেই। হঠাৎ করে এক জ্বর হচ্ছে ঘরে ঘরে। কম্পাউন্ডার আছে।
নিরাপদ বলে, সাধনদা, এরে সাপে কাটছে!
সাধন কম্পাউন্ডার। বলে, ইনজেকশন দিতে হবে। কিন্তু একমাস হল ইনজেকশনের অর্ডার করেছি, আসেনি।
সর্বনাশ! তাহলে উপায়? এখান থেকে তো সদর হাসপাতাল যেতে ষোলো মাইল। মেয়েটা মরে যাবে নাকি?
ডিসপেনসারির সারি দেওয়া ওষুধের ব়্যাকের দিকে তাকিয়ে সাধন কম্পাউন্ডার বলল, এই যে শিশি বোতল দেখতে পাও, এই রংবেরং ওষুধ দিয়ে কি এই গ্রামের সব মানুষের চিকিৎসা চলে? মধ্যপ্রদেশ সরকার তো এসব উদ্বাস্তুদের গ্রামের বোঝা মনে করে। আর দণ্ডকারণ্য প্রজেক্টের কর্তাদের কাছে শুধু কাগজে কলমে দেখানো যে কটা গ্রাম সেটল করা হল। মানুষগুলো যে কীভাবে বেঁচে আছে সেই খবর কে রাখে?
হঠাৎ দূর থেকে দেখা গেল ফকিরচাঁদকে। সে বাবুকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে আসছে। সে আসার আগেই বাবু তার কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ফকিরজেঠা…তপুকে…সাপে…।
চমকে উঠল ফকিরচাঁদ। আবার? এই তল্লাটে সাপে কাটা যেন এক মহামারী হয়ে উঠছে। ইনজেকশন দ্যান? আকুল হয়ে সাধনকে বলল, ফকিরচাঁদ।
সাধন নীরব।
নিরাপদ অধীর হয়ে বলল, ফকিরদাদা কিছু ব্যবস্থা করো! ইনজেকশন নাই।
হঠাৎ ঘরের মধ্যে তিরের গতিতে ছুটে এল আঙ্গা। তার হাতে কিছু ঘাসপাতা। জলে ভেজা। তপুর কাছে বসে পড়ে সেই ঘাসপাতার একাংশ সাপ যেখানে দংশন করেছে, সেখানে লাগাচ্ছে। বাকি অংশ তপুর মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে বিন্দু বিন্দু করে তপুর মুখ ফাঁক করে ফেলল। কেউ বুঝে উঠতে পারছে না কী হচ্ছে এসব?
তবে সাধন কিছু আন্দাজ করছে। সে আঙ্গার কাছে প্রশ্ন করল। তারপর ত্বরিৎ বেগে সেই ঘাসপাতা নিয়ে নিজের ডিসপেনসারি রুমে গিয়ে গুঁড়ো করে জলে মিক্স করে নিয়ে আঙ্গার হাতেই দিল। আঙ্গা আবার সেই দ্রবণ কিছু ঢেলে দিল তপুর গলায়। আর কিছু সেই ক্ষতস্থানে।
সাধন নীরবতা ভেঙে বলল, যস্মিন দেশে যদাচার। এই ওষুধ, এই চিকিৎসা হল আদিবাসীদের। আমরা নিরুপায়। ওদের অশিক্ষিত অসভ্য বলে আমরা ওদের গ্রামে গিয়ে মেডিকেল ক্যাম্প করাই, আজ ওদের ওষুধেই ভরসা করতে হচ্ছে!
কী আশ্চর্য! তপু সুস্থ হয়ে উঠল। অচেতন ভাব কেটে গেল। ততক্ষণে প্রভাস আর সন্ধ্যা তো বটেই, গ্রামের অনেকেই এসে গিয়েছে ডিসপেনসারিতে। বাবু আঙ্গার দিকে তাকায়। সেই চোখে কৃতজ্ঞতা।
কুপার্স থেকে দণ্ডকারণ্যে আসার পর প্রভাস আর সন্ধ্যা পড়েছিল অথৈ জলে। চোখে জল আসত। শেষ পর্যন্ত এই বিদেশ বিভূঁইয়ে! মানুষ নেই, শহর নেই, রাতে দূর থেকে ভেসে আসে জীবজন্তুর ডাক। তপুকে একবার সাপ জড়িয়ে ধরেছিল পায়ে। সেই দৃশ্য দেখে পাথর হয়ে যায় সন্ধ্যা। ফকিরচাঁদ ছিল বলে রক্ষা। আশ্চর্য উপায়ে তৎক্ষণাৎ একটা কাঁসার বাটি ছুড়েছিল অন্যদিকে।
সেই তরঙ্গ পেয়ে সাপটি নিমেষের মধ্যে অন্যদিকে তাকিয়েছিল। ফকিরচাঁদ নিমেষের মধ্যে তপুর পায়ের থেকে সেই সাপ ছাড়িয়ে ছুড়ে মারে বাইরে। অলৌকিক দৃশ্য দেখছিল সন্ধ্যা। আজ আবার সাপের কামড় তপুকে। এবারও তপু বেঁচে গেল? এই মেয়ের কী আছে ভাগ্যে?
ডাক্তার মহেন্দ্র পাণ্ডেও ফিরেছেন। গম্ভীর মানুষ বিমর্ষ। বন্দিপুরীতে জোর করে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছে। আজ পর্যন্ত ডক্টর মহেন্দ্র পাণ্ডে কোনও মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারে জানতে চাননি। সপ্তাহে তিনদিন আসেন। বাকিটা সামলায় সাধন কম্পাউন্ডার। অ্যান্টি ভেনোম ছিল না? জানতে চাইলেন ডক্টর পাণ্ডে। সাধন মাথা নাড়ে, না সাপ্লাই আসেনি।
সাধন বিড়ি দিয়ে বলে, এভাবে কাজ করা যায়? চোখের সামনে ছেলেবুড়ো বাচ্চা মরে যাবে? কিছু করতে পারব না!
ফকিরচাঁদ বিড়িতে টান দিয়ে বলে, আপনে করবেন কী? যতটা ওষুধ পাইবেন, তার থিইক্যা রোগী বেশি। তয় অনেক ওষুধ আছে যেগুলির আবার পাখা থাকে। উইড়্যাই যায়!
মানে? সাধন অবাক!
ফকিরচাঁদ নির্লিপ্ত হয়ে বিড়িতে টান দিয়ে বলে, ডাক্তারসাহেব আপনের দিকে ওইভাবে তাকাইলো ক্যান? ডাক্তার জানে না, কোন ওষুধ আছে, কোনটা নাই?
সাধন বলে, তার মানে? কী বলছ?
ফকিরচাঁদ বলে, সাপে কাটা ইনজেকশান কয়টা আইছিল এই মাসে? কয়টা কামে লাগছে? এইডা তো আপনের খাতায় লিইখ্যা রাখছেন, তাই না? প্রজেক্ট ডিরেক্টরের মেডিকেল ইউনিট যহন আসে তাদের হিসাব দেখাইতে হয় না? সেই মেডিকেল ছ্যামড়াডা ডাক্তার থাকলে এই ঘরে আসে না। তাই না? সে শুধু তক্কে থাকে, কোনদিন ডাক্তার আসে না! এইডা বেশ ভালো ব্যবস্থা!
সাধন বলে, ফকির, তুমি কী বলতে চাও?
কী কইতাছি, হেইডা আপনে ভালোই বোঝতাছেন। এরপর য্যান আমারে বোঝাইতে না হয়। এই আলমারি থিইক্যা অনেক ওষুধই ওই মেডিকেল ইউনিটের ছ্যামড়ার ব্যাগে চইল্যা যায়। আপনার মতো মাইনষের জন্য এই দণ্ডকারণ্য প্রজেক্ট সোনার হাঁস দেওয়া ডিম। যে যেমন কইব়্যা পারেন শুধু কামায়ে লন। আমি আপনেরে দুইদিন সময় দিলাম কম্পাউন্ডার সার। যত ওষুধ পাচার করছেন, সব য্যান আবার ওই আলমারির তাকে আমি দ্যাখতে পাই। নইলে আপনের খবর আছে!
সাধন থরথর করে কাঁপছে। তার চোখে জল। বলল, ফকির…ফকির…তুমি কাউকে বোলো না। রায়পুরে আমি পরিবার ফেলে রেখে এখানে পড়ে আছি। বউয়ের শরীরে রক্ত নেই। সারাক্ষণ ভোগে। বাবা শয্যাশায়ী। মা আগেই মরে গেছে। আমিও তো সেই সাতচল্লিশে চলে আসি ওপার থেকে। ছিলাম ধুবুলিয়া ক্যাম্পে। রায়পুরে পাঠিয়ে দেয় উনষাটে। আমি তোমাদের মতোই এক উদ্বাস্তু। সামান্য মাইনে। তাও সময় মতো আসে না।
ফকিরচাঁদ নরম চোখে তাকায়। বলে, তাই বইলা এই মানুষগুলোর জীবনের দাম নাই? আপনে ওষুধ সরাইয়া ফ্যালবেন! আর আমরা সেই ওষুধ না পাইয়া মইব়্যা যামু!
সাধন বলল, আমার মাথার ঠিক থাকে না ফকির। এতগুলো পেট। একার রোজগার। বউটার চিকিৎসার থেকেও ভালো খাওয়া দরকার। আমি নিজেই এখানে পড়ে আছি। কে দেখবে? মেয়েটা একা। তার পড়াশোনা বন্ধ। হাসপাতালে আয়ার কাজও করে।
আমাদের সবার নিজেদের মতো একটা সর্বনাশের জীবন ফকির। একটা দেশভাগ আমাদের আজ শুধু ভিখারিই না, চোর বানিয়ে দিল! আজ যদি প্রভাসের মেয়ে মরে যেত, ওর খুনি হতাম আমি। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল সাধন।
ফকিরচাঁদের মায়া হল। সে বলল, কাইন্দো না কম্পাউন্ডার। ওপার থিইক্যা আমরা আইছিলাম ক্যান? বাঁচার লাইগ্যা! তাই না! আমরা কী ভাবছিলাম? এপার বাংলা ছাইড়্যা যাইতাছি আর এক বাংলায়। একই জল, একই বাতাস, একই গাছপালা। একই ভাষা। অথচ দ্যাহো এই সীমান্তপারের বাংলা আমাগো কী রাখল তাদের কাছে? তারা তাড়ায়ে দিল এই জঙ্গলের দ্যাশে। আর এহেনেও যদি আমরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু হই, তাইলে কারে দোষ দিবা!
সাধন বলল, আমি কাল যাব জগদলপুর। নিয়ে আসব ওষুধ। জানি, কোন দোকানে দেওয়া হয়। তাদের বলব ইন্সপেকশন হচ্ছে। আর এই কাজ করব না। তুমি কাউকে বোলো না।
ফকিরচাঁদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বলে, আপনে বাড়িতেও ওষুধ লইয়া যান না? বউয়ের জন্য?
সাধন চমকে ওঠে। মাথা নাড়ে। বলে, শুধু সুফলার জন্য ভয়! কী হবে মেয়েটার? আজকাল তো খুব কাশে! এবার টেস্ট করাবো। আমার দেখে তো ভালো লাগে না। টিবি না তো? টিবি হলে তাকে তো ওখানে রাখা যাবে না। নিজেও মরবে। পরিবারকেও মারবে!
ফকিরচাঁদ চমকে ওঠে! সুফলা? তার চোখ স্থির। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে।
সাধন অবাক হয়।
ফকিরচাঁদ জানতে চাইল, সুফলা?
সাধন বলে, হ্যাঁ, আমার মেয়ে। কেন?
আপনের ঘর কই ছিল?
সাধন বলে কেন, তুমি তো জানো? পাবনা, মল্লিকপুর।
ফকিরচাঁদ বলে, পাবনা…পাবনা…। তারপর বসে পড়ে। মাথা নাড়ে।
সাধন অবাক হয়। ফকিরচাঁদ শক্ত মনের মানুষ বুদ্ধিমান। সে এসেছে এই গ্রামে পাঁচ বছর। কিন্তু তার আগে থেকেও যারা ছিল, তাদেরই অনেকে সমীহ করে ফকিরকে। কারণ একটাই। ফকিরের মাথাটা বেশ পাকা।
ফকিরচাঁদ একমাত্র সমীহ করে মহেন্দ্র ডাক্তারকে। কারণ মহেন্দ্র ডাক্তার একমাত্র মানুষ যিনি নিজের মতো করে থাকেন। চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি নেই। সপ্তাহে নিয়ম করে তিনদিন আসেন।
সাধন বলল, ও আমি দেখেই বুঝেছি। হাসপাতালে আয়ার কাজ। বাচ্চা মেয়েটার টিবি হয়েছে। এতদিনের আমার চোখ ভুল করবে না। এখন তাকে কে নিয়ে যাবে সেই কাংকের হাসপাতালে? সেখানেই টিবি চিকিৎসার কেন্দ্র। আমি তো যেতে পারব না। মেয়েটা আমার হারিয়ে যাবে!
ফকিরচাঁদ শ্বাস ফেলে বসে। তারপর ধীর কণ্ঠে বলে, আমি যাব!
সাধন অবাক, বলে, মানে?
ফকিরচাঁদ বলে, আইজ থিইক্যা তোমার মাইয়া আমারও মাইয়া। সুফলারে আমিই নিয়া যামু হাসপাতাল। আমিই অরে সুস্থ কইরা দিমু।
