১০
এখানে নিজেদের নাম, ঠিকানা, পরিবারের মেম্বার কজন এসব লিখুন।
ঠিকানা?
জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় প্রভাস।
বানপুর স্টেশনে সরকারি কর্মী তাকিয়ে বলে, হ্যাঁ, ওপারে যেখানে বাড়ি, সেই ঠিকানা। এখানে আর তোমাদের ঠিকানা কোথায়?
কথাটি বুকে বিঁধে গেল সুধাময়ীর। একটু আগে ইন্ডিয়ায় ঢুকেছেন তাঁরা। এই স্টেশনে নামার পর প্ল্যাটফর্মের উপর অনেকগুলো চেয়ার পাতা। সাদা চাদর দেওয়া বড় সার দেওয়া টেবিল। প্রতিটি টেবিলের সামনে লাইন করে দাঁড়াতে বলা হয়েছে সদ্য ট্রেন থেকে নামা মানুষদের। ইংরাজিতে সাদা কাপড়ের উপর নীল কালিতে প্রিন্ট করে লেখা রেজিস্ট্রেশন ডেস্ক।
সুধাময়ী প্রভাসের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে। তিনি এগিয়ে এলেন। বললেন, যেহান থিক্যা আইছি ওইডা তো আর আমার ঠিকানা নাই! এহেনে আইছি নতুন ঠিকানার লাইগ্যা! দেবা না তোমরা?
সরকারি কর্মী পাশের টেবিলের যুবকের দিকে তাকিয়ে ইংরাজিতে বললেন, ইমোশনাল ফিলজফি! উই শুড নট ওভার রিয়াক্ট!
তারপর নরম করে সুধাময়ীকে বললেন, মাসি, আমাদের এখানে যারাই ইস্ট পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসছে, তাদের নাম ঠিকানা লিখতে হবে। কারণ কারা সত্যিই দাঙ্গার জন্য পালিয়ে আসছে, আর কারা সুযোগ বুঝে চলে আসছে ইন্ডিয়ায় থাকতে, এটা দেখতে হবে। এখন তো আর রিফিউজি স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে না!
সুধাময়ী বুঝলেন না। বললেন, বাবা, আমরা এক নতুন মানুষ। আমাদের কোনও দ্যাশ নাই। আমরা ইন্ডিয়ায় থাকতে আইছি। তোমরা থাকতে দাও। এটাই আমাগো ঠিকানা।
প্রভাসের দিকে তাকিয়ে এবার সরকারি কর্মী বললেন, দেখুন ভাই আপনাদের পিছনে কত বড় লাইন। এই মানুষগুলোর অবস্থা আপনাদের মতোই। উনি আপনার কে হন? মা! ওনাকে বুঝিয়ে সরিয়ে নিয়ে ওখানে ওই শেডের নীচে বসান। আর আপনি সবার নাম ঠিকানা বলুন। আমরা যে কাগজটা দেব, সেটা না পেলে কোনও ক্যাম্পে আপনাদের জায়গা হবে না।
প্রভাস যুগীগঞ্জের ঠিকানা বলল। সকলের নাম। সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। সন্ধ্যার মুখ কঠিন। প্রভাস বুঝতে পারছে না সন্ধ্যার মুখে রাগ রাগ ভাব কেন?
সুধাময়ীর কাছে তপু আর বাবু। তারা এদিন ওদিক তাকাচ্ছে। প্রভাসদের নাম ঠিকানা লেখা হয়ে গেল। এবার রমাপদ, সুবল, রতনরা লাইনে। সন্ধ্যা বসে আছে প্ল্যাটফর্মের পাশে একটা সিঁড়ির উপর। সন্ধ্যার পাশে এসে বসল প্রভাস। সন্ধ্যার রাগের কারণ জানার কথা প্রভাস এর মধ্যেই ভুলে গিয়েছে। প্রভাস ভাবছে এরপর কী? তাকে একটা কাগজ দেওয়া হয়েছে। সেখানে কিছু একটা স্ট্যাম্প দেওয়া। আর বড় করে পাঁচ সংখ্যাটা লেখা। মানে তার পরিবারে তারা পাঁচ জন। লোকটি বলেছে, আপনারা অপেক্ষা করুন। এখনই বেরোবেন না।
সন্ধ্যাকে প্রভাস প্রশ্ন করল, বাচ্চারা কিছু খেয়েছে?
সন্ধ্যা বলল, আমরা এখানে কতদিন থাকব?
প্রভাস বলল, মানে কী? আমি আর তুমি একসঙ্গে এসেছি। মা কী বলেছে সেটাও তুমি শুনেছ। আমাদের উপর কি নির্ভর করছে যে আমরা কবে ফিরব? আমরা কি এখানে বেড়াতে এসেছি?
সন্ধ্যা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, বাচ্চাদের কথা ভাবতে হবে না। কুসুম খুব কাঁদছে। ওর কী লাগবে দেখো। ও কিছু খাবে কিনা জিজ্ঞাসা করো।
প্রভাস একটু অবাক হল। কুসুমের খিদে পেয়েছে কিনা সেটা তার দাদা রমাপদ, তার বউদি, তার বাবা মা বুঝবে! সে এসব জানতে যাবে কেন?
বিরক্ত প্রভাস উঠে গেল সুধাময়ীর দিকে। সুধাময়ী প্রভাসকে দেখে খুব স্বাভাবিকগলায় বলল, এহেনে চা দেবে না? এতক্ষণ আইলাম! চা টা কিছুই তো দেয় না। শুনছি রিফিউজিদের ইন্ডিয়া স্টেশন থিইক্যাই খাওন দাওনের ব্যবস্থা করে। আমরা তো অহন রিফিউজি।
প্রভাস স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে। মা তুমি এইসব কী বলো? আমরা এদের এখানে আশ্রয়ের জন্য আসছি। দয়া করে আমাদের জায়গা দেবে কিনা সেটাই জানা নাই। আর তুমি চা জলখাবার চাচ্ছ কেন?
সুধাময়ী বললেন, নিজেরে রিফিউজি ভাবা শুরু কর! তর কথা শুইন্যা মনে হয় নারানগঞ্জ বাজারে দোকান খুলতে যাবি একটু পর। বাচ্চাদের ক্ষুধা লাগছে। তাই চা খাবার চাইছি।…
সকলে তাকান সামনে। শুনুন মন দিয়ে। বাইরে তিনটে লরি আছে। একে একে সকলে দলে ভাগ হয়ে লাইন দিয়ে লরিতে উঠুন। একই পরিবার একসঙ্গে উঠবেন। ওঠার পর দেখে নেবেন বাচ্চারা সঙ্গে আছে কিনা। এই লরি আপনাদের নিয়ে যাবে ক্যাম্পে। আপাতত সেখানেই থাকতে হবে। একজন লোক চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে। রিহ্যাবিলিটেশন থেকে লোক আসবে। তারা সব বুঝিয়ে দেবে। তবে আপনাদের দেশের অবস্থা নর্মাল হলে আবার ফিরে যেতে হবে। আমাদের রিফিউজি পলিসি এখন এটাই।
রমাপদ, প্রভাস, আর সুবলের পরিবার একটি লরিতে উঠল। চারটে লরি দাঁড়িয়ে আছে। সকলের হাতে মালপত্র। লরি ছাড়ার আগে সকলকে দেওয়া হল একটা করে ঠোঙা। তার মধ্যে মুড়ি, দুটো তেলেভাজা আর কিছু বাতাসা। খিদে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল সকলের পেটে।
প্রভাস মজুমদার শক্ত মানুষ।
লরিতে ওঠার আগে বসে এই প্রথম প্রভাস মজুমদারের চোখে জল এল। সুখ আর স্বস্তি, এই দুটোই তার পরিবারের জীবন থেকে চলে যাচ্ছে। তার কিছু করার নেই। কেন? টাকা-পয়সা থাকলে তবু সে কলকাতায় গিয়ে চেনা মানুষের কাছে গিয়ে উঠতে পারত। কয়েকদিন থেকে নিজের বাসা ভাড়া নেওয়া যেত। সুবিনয় কাকা সেরকমই বলেছিলেন।
তার সেরকম কেউ নেই। দাদার কাছে গোটা পরিবার নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ঠিকানাও সে জানে না। মায়ের কাছে আছে। কিন্তু মা তা চাইছে না, সন্ধ্যা তো নয়ই।
আজ প্রভাস মহীতোষ মজুমদারের স্ত্রী, কুমিল্লার রায়চৌধুরী পরিবারের মেয়ে সুধাময়ীকে ভিক্ষার লাইনে দাঁড় করিয়ে দিল? খুলনার নামী উকিলের কন্যা সন্ধ্যাকে আশ্রয় খুঁজতে হবে কোনও এক বস্তি অথবা ক্যাম্পে! এ ওরই ব্যর্থতা। কেন সে সমাজের উঁচুতলার কেউ হতে পারল না? কেন সে গ্রাম ছেড়ে ঢাকার কোনও বনেদি পাড়ায় থাকে না?
চলো…চলো…উঠে পড়ো…। দুজন রেলকর্মী প্ল্যাটফর্মের কাছে এসে তাড়া দিচ্ছে। হঠাৎ আবার রিফিউজি আসা বেড়েছে পূর্ববঙ্গ থেকে। তাই রেলকর্মীদের এই নতুন কাজ হয়েছে। সরকারের পুনর্বাসন আর উদ্বাস্তু দপ্তরের অফিসারদের আসা-যাওয়া বেড়েছে। তবে এখন আর আগ্রহ নেই। বিরক্ত লাগছে। এভাবে আর কতদিন চলবে? ওপারে গোলমাল মানেই এপারে মানুষের ভিড়, সরকারি কর্মীদের ঝঞ্ঝাট বাড়ে। রেলকর্মীদের চিৎকারে সম্বিৎ পেয়ে প্রভাস এগিয়ে যায়।
দাদাভাই ভাবতে আছেন এরপর কী? তাই না?
প্রভাস উঠল। দেখল নিঃশব্দে একটি মানুষ তার পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দাড়িগোঁফ নেই। মাথার চুল ছোট করে কাটা। সাদা ধুতি আর ফতুয়া পরা। কাঁধে কাপড়ের একটা ব্যাগ।
প্রভাস বলল, আপনি?
লোকটি বলল, আমার নাম ফকিরচাঁদ! আসল নিবাস আছিল নেত্রকোণা। মোহনগঞ্জ নাম শোনছেন?
প্রভাস মাথা নাড়ে।
ফকিরচাঁদ দুঃখিত মুখে বলল, ওহ্, শোনেন নাই? খারাপ লাগল। আমার তো ধারণা মোহনগঞ্জ খুবই বিখ্যাত স্থান। বিরাট হাওড় আছে!
প্রভাস বলল, আপনি এই ট্রেনে আসলেন? নেত্রকোণা থেকে এত ঘুরে?
ফকিরচাঁদ বলল, না তো! আমি আইছি চোদ্দো বছর আগে!
প্রভাস বিস্মিত হল! বলল, ওহ! তাহলে কাজটাজ পেয়ে গেছেন। স্টেশনেই কাজ?
ফকিরচাঁদ বলল, সেসব না। যখনই ওই পারে অত্যাচার শুরু হয়, আবার সব পলাইয়া আসতে শুরু করে, তখনই আমি স্টেশনে স্টেশনে ঘুইব়্যা বেড়াই।
প্রভাস অবাক হয়ে বলল, স্টেশনে স্টেশনে!
ফকিরচাঁদ বলল, এই ধরেন এই স্টেশন, আবার ওদিকে বনগাঁ আছে। এই আর কী।
প্রভাস বলল, কিন্তু কেন?
ফকিরচাঁদ বলল, একটা বিশেষ দরকারে! একজনের আসার কথা আছে। সেই লাইগ্যা। কবে কখন সে চইল্যা আসব, কওন যায় না। আমারে না দ্যাখলে আবার সে হারায় যাইব! আমার দ্যাখা শ্যাষ। এই টেরেনে সে নাই। আবার পরের টেরেন রাইতে। অখন চলেন। লরি ছাইড়্যা দিবে! চলেন চলেন। প্রভাসের হাত ধরে ফকিরচাঁদ প্ল্যাটফর্মের বাইরে নিয়ে এল।
প্রথম লরিতেই বসে আছে সন্ধ্যা, সুধাময়ী আর ছেলেমেয়েরা। পাশেই রমাপদরা। কুসুম বসেনি। দাঁড়িয়ে। প্রভাসকে দেখে তার মুখে স্বস্তির হাসি। সন্ধ্যার মুখে ছিল উদ্বেগ। প্রভাসের মুখের দিকে তাকিয়ে তার অস্বাভাবিক লাগল। থমথম করছে। তার হাতে ঠোঙা। প্রভাস না এলে সে খাবে না বলে দুটো ঠোঙাই রেখে দিয়েছে।
প্রভাসের সঙ্গে আর একটি মানুষ। এ আবার কে? অন্য পরিবারের?
সন্ধ্যা কোনও কথা না বলে পাশে সরে গিয়ে প্রভাসকে বলল, বোসো। প্রভাসের দেখাদেখি ফকিরচাঁদও বসে পড়ল। মুখ বাড়িয়ে বলল, দিদিভাই প্রণাম।
সন্ধ্যা হাসে। এই লোক তার থেকে বয়সে বড়। দেখেই বোঝা যায় ওকে দিদিভাই আর প্রণাম বলে কেন? সন্ধ্যা আঁচল দিয়ে ভালো করে মুখ মুছল। হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নিল।
প্রভাসের সঙ্গে ফকিরচাঁদকে দেখে এক সরকারি কর্মী চোখ নাচিয়ে বলল, কী পেলে?
ফকিরচাঁদ মাথা নাড়ে। সরকারি লোকটি ফকিরচাঁদের কাঁধে হাত দিয়ে চাপড়ায়।
ফকিরচাঁদ বলল, এখন কই যাইবেন জানেন না তো?
প্রভাস মাথা নাড়ে, নাহ্। জানে না।
ফকিরচাঁদ বলল, জায়গার নাম কুপার্স। এরা কয় ক্যাম্প। আসলে পুরা জংলা জায়গা। মিলিটারিদের গোডাউন, হাসপাতাল, বন্দুক রাখার ঘর এইসব আছিল। সেই যুদ্ধের সময়। দেশভাগেরও আগে। যুদ্ধ বন্ধ হইলে মিলিটারিরা চইল্যা যায়। এইসব রইয়্যা গ্যাছে। তাই সাতচল্লিশ থিইক্যা এহেনেই আইন্যা রাখছে রিফিউজিদের। একটা গুদামে অনেক পরিবার। খুব কষ্ট! এখনও একই অবস্থা। হপ্তায় দেয় চাইর টাকা। জমি জমা কিছু কিছু দিছে। পাট্টা নাই, মালিকানা নাই। সকলে পায় নাই। আমাগো দিছে এক দোচালা টিনের ঘর। আমাগো মানে হইল আমরা যারা পঞ্চাশে আইলাম। বেশিরভাগ চাষের কাম করা লোক। আবার আমাগো মতন কিছু আছিল যারা চাষবাস জানি না। দোকান বাজারে কাম কাজ করা লোক। একটা কথা কই! আপনাগো অনেক বেশি কষ্ট আছে কপালে।
প্রভাস বলল, কেন?
ফকিরচাঁদ বলল, এক তো কুপার্সে যেহেনে থাকতি দেবে, সেইহ্যানে আপনাগো থাকার মতো জায়গাই নয়। মা জননী আর দিদিভাইরে দেইখ্যাই বুঝছি। মা জননী যখন গর্মেন্টের সান্যাল স্যারের লগে কথা কয়, তহন আমি দাঁড়ায়ে শুনছি সব কথা। আপনেরা লেখাপড়া করা মানুষ। যেভাবে থাকতে হইব, সে আপনাগো মতন না। তাই অশেষ কষ্ট। কতদিন থাকতে হইব জানা নাই।
প্রভাস বলল, আমারও জানা নাই। আমাদের চলবে কীভাবে? এখানে নিয়ম কী? এরা কাজ টাজ দেবে?
ফকিরচাঁদ বলল, আপনাগো জইন্য কী নিয়ম এইডা জানা নাই। তয় আপনাগো মনে কয় এহেনে থাহা হবে না।
প্রভাস চমকে তাকায়। বলে তার মানে?
ফকিরচাঁদ বলে, আমি তো ত্যামনই দেহি।
কী দ্যাখেন?
আপনাগো কোনও এক ট্রেনে তোলা হচ্ছে!
প্রভাস বলল, এটা কীভাবে দেখলেন?
ফকিরচাঁদ শুকনো মুখে বলল, কী জানি। হঠাৎ চক্ষের সামনে একটা দৃশ্য দ্যাখলাম।
সন্ধ্যার কানে কিছু কিছু কথা আসছে। ফকিরচাঁদের শেষ কথাটা শুনে সে চকিতে প্রভাসের হাত চেপে ধরল। প্রভাস তাকাল সন্ধ্যারই দিকে। প্রভাসও অবাক। লোকটার কি কোনও অলৌকিক শক্তি আছে? আশ্চর্য কথা হল, প্রভাস নিজেই ভাবছিল একটু আগে যে, এখন যেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এটাই কি তাদের স্থায়ী ঠিকানা হবে? নাকি আবার অন্য কোথাও নিয়ে যাবে? আর সবথেকে বড় প্রশ্ন হল, ইন্ডিয়া সরকার তাদের কতদিন রাখবে? আবার কি পাঠিয়ে দেবে বর্ডার পেরিয়ে? ঠিক সেই সময়েই ফকিরচাঁদ এরকম একটা কথা বলল কেন?
চারদিকে ফাঁকা জমি। কিছু কিছু জঙ্গল হয়ে আছে। একটা জলাশয়। সেই ঝিলের দক্ষিণে একটা বিল্ডিং। ফকিরচাঁদ সঙ্গে আছে। কেন আছে বোঝা যাচ্ছে না। চোরজোচ্চোর নয় তো?
লরি আসার সঙ্গে সঙ্গে কিছু বাচ্চা জুটে গিয়েছে। একের পর এক পরিবারকে নামতে দেখে তারা হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। এগিয়ে এসেছে কয়েকজন মানুষ। বোঝা যায়, তারা এখানে আগে থেকেই আছে। টিনের সারি দেওয়া কিছু দোচালা দেখা যাচ্ছে। প্রভাস আর রমাপদর পরিবার লরি থেকে নেমে এল। লরিচালক নেমে এসে বলল, এখানে দাঁড়াও তোমরা। আর এই কাগজে সই দাও। সই করতে জানো তো? নয়তো টিপছাপ দাও!
প্রভাসের মুখে একঝলক রক্ত উঠে এল। মহীতোষ মজুমদারের পরিবার টিপছাপ দেবে? তবে কিছু না বলে সে সই করে দিল একটা কাগজে।
রমাপদ প্রভাসকে বলল, এই তাহলে ঠিকানা? দোচালা টিনের ঘর?
প্রভাস বলল, জানি না। কিছুই জানি না।
রমাপদ বলল, এখানে থাকুম ক্যামনে?
ফকিরচাঁদ এগিয়ে আসে। বলে, থাকুম ক্যামনে এই কথাটা কক্ষনো কইয়েন না আর ভাই। বরং মনে মনে ভাবেন এইখানেই থাকতে পারবেন। টিনের দোচালা আপনাগো লগে তো না। এসব যারা বহু বছর ধইব়্যা আছে তাগো। মনে রাইখেন অহন আর আপনেরা সরকারের কাছে অতিথি না। আদরের আশা কইরেন না। আর এহেনে যাদের দ্যাহেন আশেপাশে তারাও আপনাগো বন্ধু না। কারণ কী জানেন? আপনেরা তো এদের সুযোগ সুবিধায় আবার ভাগ বসাইতে আইলেন। যত মানুষ বাড়বে ক্যাম্পে, ততই সরকারের খরচ বাড়বে। আর যত খরচ বাড়বে, ততই কম কম ডোল দিবে।
রমাপদ বলল, ডোল! মানে কী?
ফকিরচাঁদ বলল, আসল নাম ভিক্ষা! কিন্তু অনুদান, সহায়তা, পুনর্বাসন প্রকল্প এসব বলে সরকার। পার্টির নেতারা। আসলে তো ভিক্ষা। যে কাগজ দিল আপনাগো, সেই কাগজ দেখাইয়া কাইল সকালে যাইবেন উদ্বাস্তু অফিসে। তারা আর একটা কাগজ দিবে। সেটা দেখাইলে আপনেদের নামে ডোল চালু। সপ্তাহে চার টাকা পাইবেন। তারপর দ্যাখেন গিয়া কোথায় পাঠায়!
রমাপদ বলল, কোথায় আবার পাঠাবে?
ও, আপনি জ্যোতিষী? তাইলে আমার বোনের একটা ব্যবস্থা করে দ্যান। ওর বর রয়ে গেছে পূর্ববঙ্গে। মেয়েটা সারাক্ষণ কাঁদে।
ফকিরচাঁদ বলে, আমি জ্যোতিষী না। হাত দেখা, ঠিকুজি এইসব পারি না। তবে কোনও কোনও সময় কিছু মানুষরে দ্যাখলে আমার সামনে একটা ছবি আসে। সিনেমার মতো। বোঝলেন?
প্রভাস বলে, সেগুলো মিলে যায়?
ফরিকচাঁদ হাসে। বলে, উদ্বাস্তুদের লগে কী কী হয় কোনও ধারণা নাই আপনাগো। আট দশ বছর আগে আইলে আরও বেশি বোঝতেন। ঘুসুড়ি ক্যাম্পে কী হইছিল শোনেন। কলেরা শুরু হইল। পোকামাকড়ের মতো মরত্যাছে। সরকার তখন তাদের পাঠায়ে দেয় বিহারে। দাগদি ক্যাম্পে।
ফকির বলে চলে, সেহেনে রুখা জমি দেখাইয়া তাদের কয়ে দেয়া হইল, এহেনে চাষ করো। নিজেদের ফসল নিজেরাই পাইবা। যেহেনে রাখা হইল তাদের সেইডা ছিল পুরাতন জেলখানা। দাগদি ক্যাম্পের জমিতে ঘাসই জন্মায় না, তো ফসল। বিহার সরকার তার আগে কৃষি ফার্ম করছিল। কিছু হয় নাই। রিফিউজিদের সেহেনেই পাঠানো হইল। খাওয়া জুটছিল না। শেষমেষ তারা ফিরে আসায় তাগো শাস্তি হইল। তাদের কার্ড দেওয়া হইল না। এইরকম হাজার কাহিনি আছে। আপনেরা এইরকম একটি কাহিনির মইধ্যে ঢুইক্যা পড়ছেন। আমার মুখের ভাষা কড়া লাগতাছে? মিঠা কথা যদি অসত্য হয়, তাইলে সেডার দাম নাই। তিক্ত কথা শোনবেন বেশি কইব়্যা।
আপনারা কতজন? পিছন থেকে এসেছে কয়েকজন।
প্রভাস বলল, আমরা দুই পরিবারে দশ জন।
লোকটি বলল, ঠিক আছে। মালপত্র নিয়ে আসুন। তাদের সঙ্গে প্রভাস, রমাপদ, সুধাময়ী, সন্ধ্যা, কুসুম, রমাপদের মা বাবারা ছেলেমেয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল।
কিছুটা এগোতেই বাঁশবন। রাস্তা নেই। তবে মানুষের যাতায়াত আছে। তাই ঘন সবুজ ঘাসপাতার মধ্যেই একটি সিঁথির মতো পথ তৈরি হয়েছে। বাঁশবাগানের পিছনেই বিল্ডিং। অর্ধসমাপ্ত। ইটের গাঁথনি। মাথায় টিনের চাল। দরজা জানালা লাগানো হয়নি এখনও। মাটি থেকে কিছুটা উপরে একটি লম্বা বারান্দা। সেই বারান্দা ধরে একের পর এক ঘর। ঘরগুলো বেশ বড়। সিমেন্টের মেঝে। লোকটি বলল, এই হল আপাতত আপনাদের থাকার জায়গা।
প্রভাস আর সন্ধ্যা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। বাবু বলল, আমরা এখানে থাকব?
সন্ধ্যা বলতে চাইল, হ্যাঁ। কিন্তু কথা বলতে পারছে না। তার চোখ জলে ভরে আসছে। এই তাদের ঠিকানা?
ফকিরচাঁদ বলল, সার, এইডা তো স্কুলঘর। অ্যারা এহেনে কদ্দিন থাকতে পারবে?
লোকটি একটু গম্ভীর হয়ে বলল, সে আমি জানি না ফকির।
বোঝা গেল, ফকির বেশ পরিচিত এখানে। সে বলল, তাইলে এদের কার্ডে এই ঠিকানা থাকবে?
লোকটি বলল, রিফুজি অফিসে গেলে এসব জানা যাবে। আমার শুধু কাজ এই স্কুলঘরে পাঁচটা পরিবারকে এনে তোলা। তারপর দেখা যাক।
ফকিরচাঁদ বল, তারপর কী, এইডা আপনে জানেন না তা কী হয় সার?
লোকটি অস্বস্তিভরা মুখ নিয়ে বলল, জানলে বলতাম। এদের আসার তো বিরাম নেই। এরা তো তবু জ্যান্ত আসছে। তোমার মনে আছে এক সময় কত মরা মানুষও ট্রেনে এসেছে! আপাতত এরা এখানেই থাকবে।
আমরা কোন ঘরে? সুধাময়ীর কণ্ঠ।
লোকটি বলল, সব ঘরের সাইজ এক। একটা ঘর ছোট। সেটা ছেড়ে দিন। আপনারা যে যার ঘরের সামনের বারান্দায় রান্না করবেন। পিছনে আছে জলের কল। আর দুটো পায়খানা। কাল সকালে অফিসে আসবেন কাগজ নিয়ে।
সুধাময়ী সবার আগে এগিয়ে গেলেন। প্রথম ঘরে ঢুকে হাতের ব্যাগ নামিয়ে রাখলেন। জানালার ফ্রেম আছে। জানালা নেই। তবে প্রত্যেক ঘরে একটা করে টেবিল রাখা কাঠের। ঘর তৈরির আগেই কি স্কুলের টেবিল কেনা হয়েছে? এরকম তো হয় না, নাকি এই টেবিল আনা হয়েছে রিফিউজিদের রাখা হবে বলে? খাট নেই। বিছানা নেই। তোশক নেই। চাদর নেই।
ফাঁকা ঘরের মধ্যে হাজির হলেন সুধাময়ী। মেঝেতে বসে পড়লেন। ব্যাগের মুখ সেফটিপিন দিয়ে আটকানো। সেই ব্যাগ খুলে সুধাময়ী বের করে আনলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব ও সারদা মায়ের একটা ছোট ফটো। আর একটি মোটা বই। কাগজের মলাট দেওয়া। বইয়ের নাম গীতবিতান। শুধু এই বইটিই এনেছেন সুধাময়ী।
সুধাময়ী ফটো এবং বই দুটিকেই কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে টেবিলে রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন!
