সন্ধিক্ষণ – ১৩

১৩

কুশদা?

পিছনে তাকিয়ে প্রভাস দেখল কুসুম। হাতে দুটো ব্যাগ। মুখে হাসি।

এতদিন হয়ে গেল পাশাপাশি দুটো ঘরে তারা। কুসুমের সঙ্গে কথাই হয় না। তবে দেখা হয়। কুসুম যে কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এটা কখনও ভাবেনি কেন প্রভাস? এই মুহূর্তে একটা অপরাধবোধ স্পর্শ করল।

নিমেষে মনে পড়ল, সে নিজেই কুসুমকে বলেছিল যে, একদিন সে কুসুমকে সুবিমলের কাছে পৌঁছে দেবে। অথচ এখানে এসে একদিনও সে কুসুমের কাছে প্রশ্ন করেনি, সে কেমন আছে। এখানে আসার আগে কখনও ভাবেনি, স্রেফ দুবেলা খেতে পাওয়া আর রাতে মাথার উপর ছাদ থাকা কত বড় এক চাহিদা মানুষের। আর সেটা করতেই সময় চলে যাচ্ছে।

প্রভাস অনেক সকালে বেরিয়ে যায়। রানাঘাট, কৃষ্ণনগরের দিকে কয়েকদিন, আর অন্য কয়েকদিন নৈহাটির দিকে যায় প্রভাস। রানাঘাট থেকে কাপড় জামা কেনে। আর সেগুলি বিক্রি করে ওইসব জায়গায়। তবে এই রুটিনের পাশে আর একটা নতুন কাজ নিতে হয়েছে কিছু মাস হয়ে গেল। মহিলা সমিতিতে অনেক প্রোডাক্ট জমা হয়।

ঘরে ঘরে কলোনির মেয়ে বউরা নানারকম জিনিস তৈরি করে। মহিলা সমিতির কাছে জমা দেয়। সেগুলো সন্ধ্যা আর সুধাময়ী লিখে রাখে। তারপর সেইসব মালপত্র নিয়ে রমাপদ, সুবল, রতন আর কলোনির অন্য পুরুষেরাও বিক্রি করতে যায়। রমাপদ কলকাতায় বৈঠকখানা বাজারে এক ওষুধের দোকানে কাজ করে। তার কাছেই প্রভাস শুনেছে ওই বাজারে এসব মাল বিক্রি হয়ে যায়। একদিকে নিজের মাল তোলা, আর বিক্রি করা। আর অন্যদিকে সমিতির নানরকম পণ্য নিয়ে দোকানে দোকানে সাপ্লাই করা।

কলোনির বাঁশবাগানের একাংশ কেটে একটুকরো জমি বেরিয়েছে। সেই জমিতে টিন দিয়ে ঘেরা হল। মাথায় টিনের চাল। সেখানে সেলাই মেশিন কিছু আনা হয়েছে। আর কিছু বেঞ্চি। একটা চেয়ার টেবিল। টেবিলে বসেন সুধাময়ী। যাদের ঘরে জায়গা নেই, তারা এখানে এসে সেলাই মেশিনে বসে। আর ঘরে যারা সেলাই করে তারা জামাকাপড় সেলাই করে কিংবা ঘরে বানানো নানারকম সামগ্রী নিয়ে আসে।

সুধাময়ী প্রত্যেক মেয়ের নামে একটি করে খাতা করেছেন। সেখানেই লেখা থাকে সে কবে কী জিনিস দিয়েছে। সেইমতো দাম স্থির করে সেইসব জিনিস বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। চার মাস পর থেকে দেখা গেল মেয়েরা কিছু কিছু করে টাকা পাচ্ছে। তাদের জিনিস বিক্রি হয়েছে। প্রথম মাসের টাকা পেয়ে মেয়েদের চোখে জল এসেছে। নিজেদের রোজগার। নিজেদের সম্মান। সুধাময়ীর নাম তারা দিয়েছে বড়দি!

১৯৬৪ সাল শেষ হতে যায়। সামনেই আসছে শীত।

দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর কেটে গেল সুধাময়ীদের ইন্ডিয়া চলে আসা। মাত্র এক বছরে উদ্বাস্তু পরিবারের মাথার উপর ছাদ কিংবা ক্ষুণ্ণিবৃত্ত্বির স্থায়ী সংস্থান হবে এমন কপাল করে কেউ আসেনি। প্রভাসরা এখনও থাকে স্কুলঘরে। অথচ যারা নিজের জমি, ঘর পেয়ে গিয়েছে, তাদের ঘরের মেয়ে বউরাও এখন সুধাময়ীর ভক্ত।

একটিমাত্র মানবজীবন। মানুষ নিজের ভাগ্য নাকি নিজেই নিয়ে জন্মায়। অথচ যুগ যুগ ধরে তার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে অচেনা অজানা কিছু মানুষ। যুদ্ধবাজ, রাজনীতিক, রাজা-মহারাজারা। দিল্লির ভাইসরয় হাউসে বসে মানচিত্র কাটাকুটি হল। আর টাঙ্গাইল, নেত্রকোণা, রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর, সিলেটের গরিব মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ সীমান্ত পেরোতে গিয়ে পোকামাকড়ের মতো মরে গেল। এখনও যাচ্ছে।

এরা কি নিজের ভাগ্য নিয়ে এসেছিল? নাকি ভাগ্য টাগ্য বলে কিছু হয় না!

প্রভাস সবথেকে খুশি হয়েছে যে, ইদানীং অর্ডারও আসছে। তার মানে মহিলা সমিতির জিনিসের গুণমান ভালো হচ্ছে। প্রভাস চমৎকৃত। সুধাময়ী স্বামীহারা হয়ে একসময় নারানগঞ্জে দোকানে সেলস কাউন্টারে কাজ করেছেন। তাই এই জিনিসপত্র বিক্রি কিংবা মানুষ কী কী পণ্য চায় সেসব সম্পর্কে অল্প ধারণা আছে। কিন্তু এভাবে যে একটি সমিতি গঠন করে রিফিউজি কলোনির মেয়েদের কাছে রোজগারের রাস্তা খুলে দেবেন এবং সেটা বেশ ভালোই চালাতে সক্ষম হবেন, এটা ভাবা যায়নি।

গোটা ক্যাম্প এখন সুধাময়ীকে সমীহ করে। নানারকম সাংসারিক বিষয়ে আসে মেয়েরা পরামর্শ নিতে। শুধুই কাজ নয়, সুধাময়ী একটি আশ্চর্য কাজ করেন। তিনি এই মেয়েদের একটি করে গীতবিতানের গান কাগজে লিখে দেন। আর বলেন, বাড়িতে গিয়ে সময় করে পড়বা। তারপর বোঝবার চেষ্টা করবা। আমারে আইস্যা জানাইবা কী বোঝলা। সকলে শুনুম আমরা। গান গাইতে হইব না। গানের কথাগুলোন পইড়া কী বোঝছ, সেটা বলবা।

এরকম খেলা মেয়েরা আগে পায়নি। তারা এখন অনেক গীতবিতানের গান জানে। সুধাময়ী নিঃশব্দে তাদের সাংস্কৃতিক মন রচনা করছেন।

ক্রমেই সন্ধ্যাও যেন এক নেশা পেয়ে গিয়েছে। ঘরে ঘরে আজকাল চাপা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ কোন মেয়েরা কতরকম নতুন জিনিস বানাতে পারে। কার আয় কত বেশি হবে? কার মালের আবার অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে! কলোনিজীবনে এটাও কি এক নিঃশব্দ বিপ্লব নয়? ভাবে প্রভাস। কুসুমও কি সেই দলে আছে? কুসুম কী তৈরি করে? ওর হাতের ব্যাগে কী আছে?

প্রভাস বলল, কুসুম কী খবর? তুমি এখানে! কোথায় গিয়েছিলে?

কুসুম বলল, কলকাতায়। আমার খবর তো তুমি নাওনি এতদিন হইয়া গেল।

প্রভাস অপ্রস্তুত হয়ে বলল, হ্যাঁ সত্যিই তাই। তবে রমাপদর সঙ্গে কথা হয়। সবই জানতে পারি।

কুসুম বলল, তবু পাশের ঘরে থাকি। দ্যাখাই হয় না, কথাও হয় না। আমার কথা ভুইল্যা গেলে!

প্রভাস হাসে, ভুলব কেন, আমার তো একটা কাজ বাকি আছে। তোমাকে সুবিমলের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কুসুম বলল, আমরা কবে ফিরুম কুশদা?

ট্রেন থেকে নেমে বাসে করে ওরা যাবে কলোনিতে। প্রভাস বলল, চলো চা খাই। তুমি দুপুরে কিছু খেয়েছ?

কুসুম বলল, চপ মুড়ি।

প্রভাস বলল, এখন কেক দিয়া চা খাও। এই বাংলায় এসে দেখছি কেক দিয়ে চা খাওয়ার একটা রীতি আছে। চায়ের দোকানের বয়ামে দু-তিনরকম কেক থাকে। আমি তো খাই। তুমি খেয়েছ?

কুশদা, আজ তোমারে একটা কথা বলি?

প্রভাস অবাক হয়। বলে, হ্যাঁ বলো।

কুসুম একদৃষ্টিতে প্রভাসের দিকে তাকিয়ে। বলল, কুশদা তোমরা কুষ্টিয়া থিইক্যা যুগীগঞ্জে আইলা, সেই সময় প্রথম তোমাগো লগে আমাগো পরিবারের চেনাজানা হয়। তারপর থেকে দুই পরিবারের সম্পর্ক। একবার দাদার লগে তুমার ঝগড়া হইছিল খেলা লইয়া। তুমি আমাগো বাড়ি আসা বন্ধ কইব়্যা দিইলা। আমি একা একা কান্দতাম। কাউরে কইতে পারি না। তহন অত বুঝি নাই। পরে বুঝছি তোমারে আমার খুব ভাল্লাগতো। আজও লাগে। একখান কথা কও। আমারে দেইখ্যা তুমার কোনওদিন কিছুই মনে হয় নাই?

প্রভাস হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর বলল, হ্যাঁ মনে হতো। তোমাকে বিয়ে করতে ইচ্ছা হয়েছে। তখন তো বাবা নাই। মা একা লড়াই করছে। আমাদের দুই ভাইয়ের পড়ালেখা বন্ধ করেনি। আর সেই সময় মা যখন থাকত না, আমরা স্কুল থেকে সোজা তোমাদের বাড়ি যেতাম। সেখানে চিনি কাকি আমাদের ভাত খাওয়াত। মা রোজ তোমার মাকে বলত যে, চিনি আমি বাড়িতে ভাত রাইখ্যা আসছি। সব নষ্ট হইব। তুই রোজ ক্যান ওদের খাওয়াস? আমার ভাতগুলোন কে খাবে?

প্রভাস বলল, তোমাদের অবস্থা ভালো ছিল। রমাপদ আমার জন্য এক্সট্রা খাতা আনত। এই বাড়ির মেয়েকে আমার ভালো লাগা মানে এই লোকগুলোর ভরসা নষ্ট করা। আমরা তো কুষ্টিয়া থাকতাম। তাই আমাদের মুখের ভাষা অনেকই কলকাত্তাই টাইপ। এটা শুনতাম।

প্রভাস বলল, সন্ধ্যার যেমন খুলনার। কুষ্টিয়ায় আমাদের সঙ্গে আমার বাবা, কাকা, পিসিরা কোনওদিন ঢাকা, নারানগঞ্জ, ময়মনসিংদের ভাষায় কথা বলেনি। বাবার খুব ইচ্ছা ছিল আমাদের দুই ভাইকে কলকাতায় পড়াবে। তাই আগে থেকেই আমাদের মুখের ভাষা ওরকম যাতে হয় সেটাই চেষ্টা করতেন।

কুসুমের মুখ আলোয় উদ্ভাসিত। সে বলল, কুশদা তোমার আমাকে ভালো লাগত? কখনও বলোনি কেন?

প্রভাস বলল, মায়ের জন্য।

কুসুম বলল, মানে? এখানে আবার জেঠিমার কী ব্যাপার?

প্রভাস বলল, মা আমাদের দুই ভাইকে বারবার যা শিখিয়েছে, তা হল, তোমার কথায় আর আচরণে কোনওদিন এমন কাউকে কষ্ট দেবে না, যে তোমাকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে। কুসুম, রমাপদ আমাকে বন্ধুর মতো বিশ্বাস করত। করেও। মা বলে, বিশ্বাস আর ভালোবাসা একবার ভেঙে গেলে শত চেষ্টাতেও আগের জায়গায় ফেরে না। দাগ রয়ে যায়। আর সম্পর্ক বদলে যায়।

কুসুম বলল, তার মানেই কি এই যে, তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে চাইবেন না তারা? তুমি কি জানো মা তোমারে খুবই পছন্দ করত। আমার সঙ্গে বিবাহ দিতেও রাজি ছিল।

প্রভাস বলল, এটা কী বলছ? কীভাবে জানলে?

কুসুম বলল, তুমি যখন কলেজে পড়ো তখন একবার বাবা কইছিল, ভাইফোঁটায় লব আর কুশকে ডাকো না ক্যান? মা উত্তর দেয়, না ওদের ডাকার দরকার নেই। কথাটা আড়াল থিইক্যা শুইন্যা আমার খুব আনন্দ হয়। তোমারে ভাইফোঁটা? এইডা তো স্বপ্নেও ভাবি নাই।

প্রভাস বলল, চিনি কাকি হয়তো অন্য কারণে বলেছে।

কুসুম বলে, না। সেই রাইতে মা আমারে জিগাইছিল যে, যে আমি তোমাদের ভাইফোঁটা দিতে চাই কিনা? আমি কোনও কথা কই নাই। মা শুধু কইছিল, ঠিকই বুঝছি। কিন্তু এইডা হবে কিনা জানা নাই। সুধার মান-অপমান এত বেশি যে, সে এইসব কথা ভাববে না। এর বেশি, মা কিছুই কয় নাই। আমি বুইঝ্যা যাই যে, মায়ের অমত ছিল না। তুমি ক্যান কইলা না?

প্রভাস বলল, আমার সঙ্গে তোমার একটা সম্পর্ক আছে এটা জানতে পারলে রমাপদর আমার উপর থেকে বিশ্বাস চলে যেত। তোমার বাবা-মায়েরও। আমার মায়েরও।

কুসুম বলল, তাই তুমি দুটো জীবন নষ্ট করলে?

প্রভাস বলল, দুটো জীবন মানে কী? সন্ধ্যার উপর আমার তো কোনও নালিশ নেই। বরং তাদের ফ্যামিলি উকিল টিচারের ফ্যামিলি। আমি কাপড়ের দোকান চালাই। আমার সঙ্গে তারা যে বিয়ে দিয়েছে এটাই অনেক বড় ব্যাপার। সন্ধ্যা আজ পর্যন্ত কোনও অভাবেরও কথা উচ্চারণ করেনি। আমাকে সে ভালোবাসে, আমিও।

একটু থেমে বলল, আমি যতটা জানি সুবিমলও তো তোমাকে সুখে রেখেছে। তুমিও তাকে ভালোবাসো। কুসুম, যা হয়নি সেই নিয়েই মানুষ সবথেকে বেশি আফশোস করে, হা হুতাশ করে। অথচ যা আছে, সেটার মূল্য দেয় না। আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল কী জানো? আমরা ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কেঁদে মরি। কিন্তু যে ভালোবাসা না চাইতেই পাই, তাকে বুঝতে পারি না।

কুসুম বলে, আমার লগে কঠিন কঠিন কথা কইবা না। এত কঠিন কথা আমি বুঝি না। আমার একটা কথা শোনো কুশদা। আমি সুবিমলরে পছন্দ করি। সে আমার কোনও অযত্ন করে না। কিন্তু তাও তোমার কথা ভাবতাম। কেন জানো? এই দুনিয়ার সব মাইয়ার মনে একটা ছবি থাকে। নিজের পছন্দের মাইনষের ছবি। কখনও সখনও সেই ছবি কাউরে ছোটবেলা থিইক্যা দেইখ্যা গাঁথ্যা যায়। হঠাৎ কোনও পুরুষ সামনে আইলেই সেই লুকানো মনটা চিৎকার কইব়্যা মাইয়ামানুষরে কইয়া দ্যায়, এই যে…এই যে…এই সেই মানুষ।

কুসুম আকাশের দিকে তাকায়। বলে, মাইয়ামানুষ এই মনের মইধ্যে থাকা মানুষরে লইয়াই গোটা জীবনের সব কষ্ট, সব অপমান, সব দুঃখ ভুইল্যা থাকে। আমার সেই মানুষ তুমি! এর লাইগ্যা তোমারে আমি এইডা কইতাছি না যে, আমারেও তুমি এভাবেই মনে করো। তাছাড়া আমি জানি একবার যহন তোমার মনে হইছিল যে, আমারে বিয়ে করা যায়, যত ছোটবেলার ছেলেমানুষিই হোক, তোমার মনই তো কইছিল কথাডা। আজও সেই ভালোবাসা কুথাও না কুথাও আছেই।

বলতে বলতে কুসুম চোখ রাখে প্রভাসের চোখে, মন কি হারায়ে যায় কুশদা? এই যে অনেকে বলে আমার যে মন ছিল, তা হারায়ে গ্যাছে। এইডা কীভাবে হয়? সেই মনডা হারায় গেলে কি আবার নতুন মনের জন্ম হয়? তাইলে কি মাইনষের জীবনে অবিরাম নানারকম মনের আনাগোনা হয়!

কুসুম শ্বাস ফেলে বলল, যাউক এসব কথা। আসল কথা কই। আমি হালে একখান চিঠি লেখছি চট্টগ্রামে। জানি না সেই চিঠি পৌঁছাইছে কিনা। আমি তো ঠিকানা জানি না। আন্দাজে আন্দাজে লিখছি। আমার মনে হয়, দাদা আমারে লইয়া বনগাঁ বর্ডার দিয়া যশোর দিয়া আসার কথা ভাবতেছে। দাদা বউদি মা বাবা কবে যাবে জানি না। তবে এমনিতেই তাদের অনটন। তার মইধ্যে আমি এক বোঝা। আমি চইল্যা যাইতাছি। আজ তোমারে এই কথাগুলোন কইতে পারলাম, এইডা আমার শান্তি। তোমরা কি ফেরত যাইবা কুশদা?

প্রভাস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, এটা ভালো করছ। রমাপদর শ্বশুরবাড়ি তো যশোর। সেখানে শুনছি এখন শান্ত। আমরা আর ফিরব না মনে হয়। কেন জানো? আমাদের গ্রামে আর থাকতে দেবে না।

স্টেশনের বাইরে বাসস্টপ আসার আগে ছোট বাজার। সেখানে পরপর দোকান। একটি দোকানে কচুরি বিক্রি হচ্ছে। প্রভাস বলল, তুমি চলে যাচ্ছ কুসুম। চলো আজ কচুরি জিলাপি খাওয়া যাক।

কুসুম চকিতে তাকিয়ে বলল, আমার চইল্যা যাওয়াডা কি তোমার কাছে আনন্দের সংবাদ কুশদা, যে মিষ্টি মুখ করাইতেছ?

প্রভাস ম্লান হয়ে বলল, না…সেরকম নয়।

কুসুম হাসতে হাসতে বলল, সন্ধ্যাদি খুবই ভালো মানুষ জানি। আর আমার কথাগুলোন শুইন্যা আজ যদি তুমি আমার হাত ধরতে চাইতা কিংবা আমারে তুমি অহনও কত ভালোবাসো এই বইল্যা আমার লগে মাঝেমধ্যে দেখা কইরতে চাইত্যা, তাইলে বরং আমি বেশি ধাক্কা খাইতাম কুশদা! এই যে তুমি সেসব কিছুই করলা না, কেমন এক ভালা মনের পরিচয় দিলা, এইডা আমার ক্যান ভাল্লাগলো জানো? আমি বুঝলাম, আমার মন ভুল লোকরে নিজের মইধ্যে স্থান দেয়নি!

কুসুম চোখে আঁচল চাপা দেয়। প্রভাস অপ্রস্তুত। কুসুম বলল, আমারে একটু কাঁদতে দাও কুশদা। তোমার সামনে, তোমার জইন্য তো কোনওদিন কাঁদি নাই।

প্রভাস স্তব্ধ হয়ে রইল। কয়েকমিনিটের মধ্যে ধাতস্থ হয়ে কুসুম কচুরি হাতে নিয়ে দোকানিকে বলল, দাদা, শালপাতার পাতায় যে তরকারিটা দ্যান, সেটা এত ছোট কেন? চারটে কচুরিতেও এক পাতা, দুটো কচুরিতেও এক পাতা। পাতার সাইজ বাড়ান।

বলে হাসতে হাসতে কুসুম প্রভাসের দিকে তাকিয়ে বলল, এদিককার কথা কেমন শিখা নিছি দ্যাখলা! কেউ ধরতেই পারবে না আমি কুন দ্যাশের!

কলোনির কাছে বড় রাস্তায় বাস থামল। কুপার্স ক্যাম্প তৈরি হয়েছে অনেক বছর। কিন্তু এখন যে দাঙ্গার জেরে লাগাতার উদ্বাস্তু আসছে তাদের সামাল দেওয়ার জন্য কিছু কিছু ট্রানজিট ক্যাম্প হয়েছে। এতগুলো মাস কেটে যাওয়ার পরও সেগুলোর বিশেষ কোনও উন্নতি হয়নি।

সমস্যা একটা নয়। চারদিকে জংলা। মাঝে মধ্যেই ডোবা। ফলে প্রচণ্ড মশা। কলোনি জীবনে দুটো জিনিস লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ম্যালেরিয়া আর যক্ষ্মা। ছিন্নমূল মানুষেরা সকলেই যে পূর্ব পাকিস্তানে জমিদার, ধনী, মধ্যবিত্ত ছিল এমন নয়। কিন্তু যেমনই হোক, এরকম মনুষ্যেতর জীবন কাটাতে হয়নি।

দুজনে বাস থেকে নামার পর প্রভাস দেখল কলোনির রাস্তায় ঢোকার মুখ থেকে পুরোটা অন্ধকার। এই নতুন এক সমস্যা। সন্ধ্যা হলেই রাস্তার ল্যাম্প নিভে যাচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ডাইনে বাঁয়ে জঙ্গল। জায়গায় ছোট নর্দমা আর ডোবা। কুসুম এর আগে কখনও এত রাতে ফেরেনি। আজ সে দাদার সঙ্গে কলকাতা গিয়েছিল। রমাপদর ফিরতে দেরি হয়। তাই কুসুম একা একা চলে এসেছিল।

তারপর রানাঘাট স্টেশনেই দেখা হল প্রভাসের সঙ্গে। কুসুমের হাতের ব্যাগে এমন অনেক কিছু আছে যা সে অতি উৎসাহে কিনেছে। সে ধরেই নিয়েছে আজ বাদে কাল সে ফিরবে পূর্ববঙ্গে। যশোর প্রতাপপুরে পৌঁছতে পারলেই হল। তারপর সেখানে এসেও সুবিমল নিয়ে যাবে তাকে। তাই দাদার শ্বশুরবাড়ির কয়েকজনের জন্যেও কেনাকাটা করেছে কলকাতা থেকে। বউদির বাড়ি, অথচ বউদির যাওয়া হচ্ছে না।

রমাপদ বলেছিল, কুসুম একা যাবে কেন? তুমিও বাচ্চাদের নিয়ে যাও। কিন্তু বউদি ভয় পাচ্ছে, যা অবস্থা আবার যদি আটকে যায়। এখানে এভাবে রমাপদ আর শ্বশুর শাশুড়িকে একা রেখে সে যেতে চায় না। তাই বর্ডার পর্যন্ত যাবে রমাপদ। তারপর তাকে নেওয়ার জন্য আসবে বউদির দাদা রমেশ।

প্রভাস আর কুসুম রাস্তা ছেড়ে মাটির পথে নামল। প্রভাস বলল, সাবধানে আসো। আমার হাত ধরবে?

কুসুম বল, না, পাইব়্যা যামু। তুমি আগে আগে চলো!

প্রভাস বলল, এমনিতে চিন্তা নেই। সোজা চলবে। সোজা পথে খাদ খাদান নেই গর্তও নেই।

মিনিট সাতেক হাঁটার পর দেখা গেল টিমটিম করে প্রদীপ মোমবাতি হারিকেনের আলো। কুপার্স ক্যাম্পের দোচালা ঘর গোডাউন, অফিস, আর দোকানঘরের সামনে লোকজন। এবার একটু একটু আলো। বাঁদিকে জলাশয়ের পাশ থেকে তারা যাবে নিজেদের আশ্রয়ের দিকে।

প্রভাস বলল, কুসুম, আমাকে একবার ফকিরচাঁদের ঘরে যেতে হবে। মাকে নিয়ে কাল ও যাবে ডিসপেনসারিতে। তুমি এই দোকানের সামনে দাঁড়াও। আমি আসছি।

কুসুম বলল, আবার দাঁড়াব কেন? এমনিতেই দেরি হইছে। আরও দেরি হইলে সবাই আবার চিন্তা করব। আমি বরং আগাই।

প্রভাস ইতস্তত করে বলল, অন্ধকারে…!

কুসুম হেসে বলল, কিছু হইব না। তাছাড়া আমার লগে তোমারে ফিরতে দেখলে সন্ধ্যাদি যদি কিছু ভাবে!

প্রভাস বলল, ঠিক আছে।

প্রভাস বাড়ি ফেরার পর সুধাময়ী বললেন, কাল ডিসপেনসারিতে যামু। ফকিরচাঁদকে কইছিস?

প্রভাস বলল, হ্যাঁ। ফকিরদা আসবে সাড়ে ন’টায়। তোমার নিজের শরীর ঠিক আছে?

সুধাময়ী বললেন, হ্যাঁ। কলোনির মাইনষের রোগভোগ য্যান হইতে নাই। আমারে মাইয়াগুলোন আইস্যা আইস্যা কয় ওষুধ পাওয়াই যায় না। লাল নীল সবুজ কী সব রংগোলা জল দ্যায়। চতুর্দিকে সবাই রোগে ভুগতাছে। মলিনা, কাজল, জবা, সুন্দরী, ওদের বর, ছেলেমেয়ে সবার জ্বর, কাশি। অসুখ সারে না। কাইল তাই যামু। ডিসপেনসারিতে কাল বড় ডাক্তারের ডেট। হপ্তায় দুইদিন সে আসে।

প্রভাস বলল, মা, আমরা এখানে অনেক নতুন। যেভাবে সব ব্যাপারে তুমি নিজেকে জড়াচ্ছ আমাদের উপর রিলিফ অফিসের রাগ হতে পারে। আমাদের সাথে যারা এসেছে, তারা কেউ কোনও কথা বলে না। শুনলাম সুবল, রতনরা জমি পেতে পারে। নাম লিখিয়েছে।

প্রভাস বলল, উদ্বাস্তু পরিষদের সমীর পাল ওদের কাছে নাম চেয়ে নিয়েছে। ওরা পেয়ে যাবে জমি। তারা তোমাকে ভয় পায়। তোমাকে নাকি কলোনির অনেকে এখন নেতা মনে করে।

সুধাময়ীর সামনে গীতবিতান। সারাদিনের কাজশেষে তিনি সন্ধ্যার পর স্নান করেন। তারপর জপ ও ধ্যান। এরপর বসেন গীতবিতান নিয়ে। তিনি বললেন, কুশ, এই লাইনগুলো শোন। বউমা তুমিও শোনো।

‘শক্ত যা তাই সাধতে হবে, মাথা তুলে রইব ভবে

সহজ পথে চলব ভেবে, পড়ব না, পাঁকের পরে পড়ব না। ’

এটা হইল স্বদেশ পর্যায়ের গান। প্রথম লাইন শুনতে চাইস?

সন্ধ্যা বলল, প্রথম লাইন জানি মা!

সুধাময়ী বলল, বলো তাহলে। ভুল শব্দ বলবা না। আগে পরিপূর্ণ মুখস্থ করবা, নয়তো বলবা জানি না! এবার বলো, শুনি!

সন্ধ্যা চোখ বুজে বলল, ‘আমি ভয় করব না ভয় করব না, দুবেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না।’

সুধাময়ী হাসলেন। বললেন, হ্যাঁ, এইডাই হল আমাগো মন্ত্র। আমাগো আর কিছু হারানোর নাই কুশ! আমরা পলায়ে আইছি নিজের ঘর দেশ ছাইড়্যা। জান বাঁচানের লগে। এহেনে তার থিইক্যা আর কী খারাপ হইব! এইবার শুধুই লড়াই করুম! আর পলাইমু না! এই গানের লাস্ট লাইনটা মনে রাখস।

প্রভাস বলল, লাস্ট লাইন কী?

সুধাময়ী বললেন, ‘বিপদ যদি এসে পড়ে, সরব না, ঘরের কোণে সরব না।’

সুধাময়ীর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *