৩
নমস্কার ফাদার!
নমস্কার! কেমন আছ?
ভালো আর থাকছি কই? দেখছেন তো অবস্থা? এসব কেন হয় কে জানে!
সাইকেল থামালেন ফাদার রিচার্ড নোভাক। বললেন, তোমাদের কিন্তু এই সময় বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।
রফিকুল ইসলাম মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ ফাদার। কিন্তু আমাদের হাতে তো সবটা নেই। বলতে গেলে কিছুই নেই। আমরা নিজেদের মহল্লায় নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি কোথায় ঠেকাতে?
ফাদার বললেন, এলাকার পর এলাকা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এরকমই দেশ চেয়েছিলে তোমরা? যখন তখন যে কোনও অজুহাতে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, হত্যা করা, এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়াই কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তোমাদের! আমার কিন্তু এই দেশটায় কম দিন হল না। তোমরা চিরস্থায়ী এক অন্ধকারের দিকে যাচ্ছ।
শিক্ষক রফিকুল ইসলাম মাথা নিচু করে শুনছিলেন। বললেন, ফাদার আপনার প্রতিটি কথাই ঠিক। আমিও তাই মনে করি। আমি আপনার কাছে, আপনাদের মতো বিদেশি মানুষদের কাছে করজোড়ে জানতে চাইছি, আপনি বলুন, আমাদের কী করা উচিত? এভাবে আর কতদিন চলবে? বিদেশি দেশগুলির এত সব অফিস আছে এখানে, তারা ধমক দিতে পারে না সরকারকে? আয়ুব খানকে? আর এই অশান্তিতে যাদের লাভ হয়, তাদেরকে সবথেকে কড়া সাজা যাতে দেওয়া হয় সেই ব্যবস্থা করতে চাপ দেয় না কেন আমেরিকা, চীন আর ব্রিটেনের মতো দেশগুলি? তাদের সাহায্য তো পায় পাকিস্তান!
ফাদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তোমরাই তো দেশভাগ চেয়েছিলে। আজ তোমরা দেশভাগের মাত্র সতেরো বছর পরই যদি সামলাতে না পারো, তাহলে নিজেদের ব্যর্থতাই তো মেনে নেওয়া হবে! তাই তোমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তোমরা যারা লিবারাল মুসলিম, যারা সত্যিই চাও হিন্দু, খ্রিস্টানও মুসলিমের মতোই সমান অধিকার আর স্ট্যাটাস নিয়ে এই দেশে থাকতে পারে, তাদের অ্যাকটিভ হতে হবে। তোমরা ছাড়া আর কে করবে?
রফিকুল ইসলাম বললেন, তাহলে ফাদার গৃহযুদ্ধ হবে। আর যারা এই দাঙ্গা করে হিন্দুদের দেশছাড়া করছে, তাদের হাতে অস্ত্র জোগাচ্ছে কে? সরকারই। আয়ুবের মিলিটারির সঙ্গে আমাদের মতো নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষরা পারবে কীভাবে? আমরা পড়েছি উভয় সঙ্কটে। এসব সহ্য করতেও পারছি না। আমাদের চোখের সামনে আমাদের প্রতিবেশী হিন্দু পরিবারগুলি, যারা আমাদের এতকাল ধরে সাথী-বন্ধু ছিল, চোখের জল ফেলে চলে যাচ্ছে। মোকাবিলা করার ক্ষমতাও নেই আমাদের।
রফিকুল বলেই চললেন, আরও এক সমস্যা কী জানেন, আমাদের মধ্যেও কিছু অংশ নিজেদের উদার, শিক্ষিত ভাবে, তারা মনে মনে হয়তো এসব সমর্থন করে। এই অস্থির সময়ে প্রকৃত রূপ বেরিয়ে পড়ে উত্তেজিত কথাবার্তায়। আমরা জোর গলায় পাশে দাঁড়িয়ে হিন্দুদের বলতেও পারছি না যে, যেও না। আমরা আছি। কোথায় আমরা আছি? আমরা তো ঠেকাতে পারছি না! তাহলে তারা কী ভরসায় থাকবে? এই স্বাধীনতা, দেশভাগ, আমাদের পাকিস্তান সব কি মিথ্যা হয়ে গেল ফাদার? পশ্চিমারা তো আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিকেও কম কম মুসলমান মনে করে।
জানুয়ারি মাসের গোড়া থেকেই শুরু হয়েছে চরম দাঙ্গা। দাঙ্গা কোথায়? একতরফা দিকে দিকে হিন্দুদের উপর অত্যাচার করছে কট্টর মুসলিমরা। সবথেকে বেশি নিষ্ঠুর আর উগ্র বিহারি মুসলিমগুলো। খুলনার পাশে দৌলতপুরে কয়েক হাজার মিলশ্রমিক মিছিল করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে বাড়িতে। খুলনার মানুষ পালাচ্ছে। দৌলতপুরের বহু গ্রাম হিন্দুশূন্য। এমনকী প্রতিবেশীদের রক্ষা করতে গিয়ে বহু মুসলিম খতম হয়েছে দাঙ্গাকারীদের হাতে।
সেই আগুন ছড়িয়েছে ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জে। জ্বলছে ঢাকা। পালাচ্ছে মানুষ। হজরতবাল মসজিদ থেকে মহানবীর দাড়ির পবিত্র স্মারক চুরি যাওয়ার সংবাদ ছড়াতেই সুযোগ নিয়েছে পাকিস্তান। আর সেই যে ঢাকা এয়ারপোর্টে পাকিস্তানের সামরিক শাসক বলে গেলেন যে, এরপর পাকিস্তানের কিছু হলে আমার দায় নেই, সেই বিবৃতিকেই আসলে যেন সংকেত হিসেবে গ্রহণ করল উগ্র মৌলবাদী মুসলিম সংগঠনগুলি।
ঠিক যেমন ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টকে মহম্মদ আলি জিন্না ঘোষণা করেছিলেন ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে হিসেবে। তাঁকে মুম্বইয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই কথাটির অর্থ কী? ডাইরেক্টর অ্যাকশন কাদের বিরুদ্ধে? জিন্না স্পষ্ট করে বলেননি। কলকাতার দাঙ্গাকারীরা ধরে নিয়েছিল যে, ওটাই সিগন্যাল। সকাল থেকে শুরু হয় দাঙ্গা। সেটাই ছড়িয়ে পড়ে নোয়াখালি, বিহার, পাঞ্জাবে।
ঠিক তেমনই ঘটল এই ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে। আয়ুব খানের গদি এমনিতেই টলোমলো। আর এসব সময় স্বৈরতন্ত্রী শাসকের সব থেকে বড় অস্ত্র হল বিভাজন, সাম্প্রদায়িকতা। সেই ফরমুলার ফাঁদে পা দিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের একাংশ আর অপরাধীর দল। যাদের প্রধান উদ্দেশ্য হিন্দুদের তাড়ানো। তাদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি দখল। অথবা ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে অতি সস্তায় বাড়ি জমি কিনে নেওয়া। এটা যেন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে দেশভাগের পর থেকে।
ঢাকার নতরদাম কলেজের শিক্ষক পাদ্রী রিচার্ড নোভাক সাইকেলে চেপে ঘুরে বেড়ান। অনাথ আশ্রমে গিয়ে কিংবা নিকটবর্তী গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি ইংরাজি শেখান। ওষুধপত্র দেন। আর সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে নিজের বাংলা ভাষার জ্ঞানবৃদ্ধির চর্চা করেন। ফাদার অন্য শিক্ষকদের বলেন, আসলে আমরা যে বাংলাটা জানি সেটা হল অনুবাদের ভাষা। মানুষের মুখের আর মনের ভাষা নয়। তাই ওরা যে অ্যাকসেন্টে কথা বলে, যে শব্দগুলো ইউজ করে, সেটা শেখা দরকার। তাই হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে ফাদার জনপ্রিয়, তাঁর সমধুর স্বভাবের জন্য। সাইকেলে করে শুধু ঢাকা নয়, নারায়ণগঞ্জের গ্রামে গ্রামেও তিনি ঘোরেন।
নারায়ণগঞ্জ গেলে বাজারে তার কাজ হল দোকানিদের সঙ্গে গল্প করা। চা খাওয়া। তাদের পরিবারের খোঁজ নেওয়া। অনেক দোকানি ফাদারকে নিজেদের শুভানুধ্যায়ী হিসেবে দেখে। তাঁর কাছে সমস্যার কথা বলে। ফাদার নোভাক যেন সকলের অভিভাবক। অথচ তিনি যে প্রবীণ এমন নয়। তবু তাঁকে দেখে সম্ভ্রম হয়। সকলের জীবনের কথা তাঁর মনে থাকে। যখনই আসেন, এই মানুষগুলির সঙ্গে শেষবার বলে যাওয়া কথার রেশ টেনে তিনি প্রশ্ন করেন সেইসব সমস্যার অথবা আনন্দের সাম্প্রতিক সংবাদ কী! তিনি মনে রাখেন প্রত্যেককে। স্বজনের মতোই।
১৯৪৯ সালে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে প্রথম স্থাপিত হয়েছিল নতরদাম কলেজ। তবে প্রাথমিকভাবে নাম ছিল সেন্ট গ্রেগরি কলেজ। পাঁচ বছর পর সেটিকে নিয়ে আসা হয় আরামবাগে। তখন থেকেই নাম হয় নতরদাম কলেজ। সেখানে তিনি দর্শনের লেকচারার। পূর্ব পাকিস্তানের ক্যাথলিক চার্চগুলিতে মাঝেমধ্যেই তাঁর ডাক পড়ে। তাঁর সহজ সরল ভাষায় দর্শন ও ধর্মবিদ্যার ব্যাখ্যা শুনতে চায় সকলে।
নারায়ণগঞ্জের জেলেপাড়া আর গোদনাইলে একের পর এক বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গোটা অরাজকতা যে পেশাদার গুন্ডাদের হাতে চলে গিয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। কারণ ঢাকার থ্যাটারিবাজার, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ি, নয়াপল্টন, গেন্ডারিয়ায় হিন্দুদের বাড়ি দোকান সব লুটপাট করে আগুন ধরানোর পাশাপাশি মুসলিমদের দোকানও লুট হয়ে গিয়েছে।
ডি কস্টার সঙ্গে দেখা হল আজ সকালে। ডি কস্টা ফাদারকে বললেন, রিচার্ড আমাদের এক নার্সের বাড়িতে হামলা হয়েছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী করা যায়?
নারায়ণগঞ্জ থেকে এই হিন্দু মেয়েটি আসে ঢাকায়। ফাদার রিচার্ড সেকথা শুনেই সাইকেল চালাতে শুরু করলেন।
ডি কস্টা চিৎকার করে বললেন, এ কী? ওইদিকে কোথায় যাচ্ছ? শোনো! ওদিকে যেও না!
ফাদার বললেন, আসছি।
সাইকেল নিয়ে তিনি রওনা হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের দিকে। এই জমজমাট শহর এখন শুনশান। মাঝেমধ্যেই পুলিশের ভ্যান যাচ্ছে সাইরেন বাজিয়ে। নামকা ওয়াস্তে সান্ধ কারফিউ করা হয়। কিন্তু লাভ কী হচ্ছে? ঢাকা স্টেডিয়ামে সেদিন মিটিং করে হুমকি দেওয়া হল সংখ্যালঘু হিন্দুদের। তখন পুলিশ কোথায় ছিল? ভাবছেন ফাদার।
চিটাগং আর সিরাজগঞ্জ থেকে ট্রেনে চেপে আসা হিন্দু যাত্রীদের টুঙ্গি আর তেজগাঁওতে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নামতে অস্বীকার করলে মারধর, হত্যা চলছে অবাধে। খুলনার ঝামেলাটাই শুরু হল রীতিমতো প্ল্যান করে। কোথায় কাশ্মীরে কী হয়েছে, তার জন্য খুলনা আর দৌলতপুরের হিন্দুদের বাধ্য করা হচ্ছে রিকশা করে যাওয়া চলবে না, খালি পায়ে রাস্তায় বেরোতে হবে। কারণ শোকপালন। হজরত মহম্মদের কেশ চুরি যাওয়ার প্রতিবাদে।
এসব করে এই দেশটা ধ্বংস হতে আর দেরি হবে না। কারণ সরকার আর রাজনৈতিক দলগুলিই উদার আর শান্তিপ্রিয় মুসলিমদের কোণঠাসা করে রেখেছে। আর সর্বোপরি তাদের ঐক্য কোথায়? জাতীয় ফ্রন্টের নেতা আতাউর রহমান, হামিদুল হক, মুজিবুর রহমান, মাহমুদ আলি, অলি আহাদ, তফাজ্জল হোসেন, মানিক মিয়ারা শান্তি বজায় রাখার জন্য পদযাত্রা করছেন বটে, কিন্তু লাভ কিছু হচ্ছে না। ফাদার সাইকেল চালাতে চালাতেই ক্রুদ্ধ হচ্ছেন। মাতা মেরির মুখটা মনে করার চেষ্টা করলেন। হৃদয়কে শান্ত রাখতে হবে। একটি গলিতে ঢুকলেন ফাদার। এদিকেই সেই মেয়েটির বাড়ি!
আজ নিয়ে তিনদিন হল প্রভাস দোকানে যেতে পারছে না। ঢাকেশ্বরী কটন মিলে হামলা চালিয়েছে হাঙ্গামাকারীরা। সদর বাজারের জামাকাপড়ের দোকানের সঙ্গে ঢাকেশ্বরী কটন মিলের সম্পর্ক বহুদিনের। ওই মিলের জামাকাপড় রাখার চলই বেশি। যদিও আরও একটি দুটি কটন মিল আছে। আদমজী গ্রুপ অফ কটন মিলের মালিক নাকি কলকাতায় দাঙ্গায় নিহত হয়েছেন। গতকাল রাতে এই সংবাদ ছড়াতেই আদমজী কটন মিলের মুসলিম শ্রমিকরা হামলা চালাচ্ছে ঢাকেশ্বরী কটন মিলের হিন্দু শ্রমিকদের কোয়ার্টারে। কেউ কোনও খবর যাচাই করছে না। যে যা বলছে, বিশ্বাস করছে। পালটা হত্যালীলা শুরু করে দিচ্ছে।
অসংখ্য মৃত্যুর খবর আসছে। সুহাস, তপন, রতন, নিমাই, মন্টু পাল তারা সব কোথায়? কেমন আছে? ওই কটন মিলের এই কর্মীরা সকলেই প্রভাসের বন্ধু। এদিকে সদর বাজারের দোকানপাট বন্ধ। একআধবার হামলা হয়ে গিয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনের মুসলিম সদস্যরা রুখে দাঁড়ানোয় আপাতভাবে বেঁচে গিয়েছে দোকানপাট। তবে কতদিন? প্রভাস ঘরের মধ্যে ছটফট করছে। স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বাবুর। এভাবে ঘরের মধ্যে কতদিন থাকবে প্রভাস? রোজগার হবে কীভাবে? ঘরে কিছু জমা টাকা পয়সা আছে। সেসব দিয়ে তো আর অনন্তকাল সংসার চলবে না। মালপত্র কিনতে হবে। মহাজনের টাকা মেটাতে হবে। কটন মিলও টাকা পায়। তার নিজের অনেক টাকা বাইরে পড়ে আছে।
সুধাময়ীর কাছে দাঁড়িয়ে প্রভাস বলল, মা, আমাকে একবার বেরোতে হবে।
সুধাময়ী এতদিনে জেনে গিয়েছেন যে কী চলছে চারদিকে। তিনি বললেন, আগুনের মইধ্যে ঝাঁপ দিতে চাইস ক্যান তর বাবার মতোই?
প্রভাস ছোটবেলা থেকেই এই একই কথা শুনে আসছে। যখনই দাঙ্গার খবর কানে আসে, তখনই বাবার কথা টেনে আনে মা।
এবার বিরক্ত হয়ে প্রভাস বলল, মা, আমার রোজগার তো বন্ধ করে দিতে পারি না। জমা টাকা কি আছে আমাদের? তিনদিন হয়ে গেল দোকান খুলি না। বিক্রিবাট্টা বন্ধ। অনেকে টাকা বাকি রেখেছে। তারা কেউ ফেরত দিতে আসে না। এরপর আসবে কিনা তাও বা কেন জানে? এখন কিছু একটা তো করতে হবে। জানতে হবে কী অবস্থা।
সুধাময়ী বললেন, সুলতা আসছিল কাল। তাদের বাড়িতে নাকি কারা আইস্যা কইছে এহেনে আর থাকা ঠিক হইব না। চইল্যা যান আপনেরা! এসব কথা শুনছিস তরা?
প্রভাস অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, সুলতামাসি এরকম বলেছে? আমাদের এলাকায় এরকম কথা?
পিছন থেকে সন্ধ্যা এসে বলল, কেন আমাদের এলাকায় মিছিল হচ্ছে না?
প্রভাসের বুকটা একটু কেঁপে উঠল। এসবের মানে কী? তাদের এই যুগীগঞ্জে কখনও তো এসব হয়নি। কালই লতিফ এসেছিল। বলে গিয়েছে, এখন অনেক গুজব শুনবা! সব কথা কানে লইও না। আমরা আছি এইডা মাথায় রাখো। আজ পইর্যন্ত এখানে কিছু হয় নাই। হইতে দিমুও না আমরা ইনশাল্লাহ! আর কয়েকদিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
এসব কথা কি কথার কথা? সুলতামাসির বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে গেল কারা? তবে কি এতকাল পর তাদের এখানেও ভয়ে ভয়ে থাকা শুরু হল?
সন্ধ্যা বলল, বাজারের খবর নিতে একা যেও না। সুবলদার বাড়ি আগে যাও। সে কী বলে দেখ, দরকারে একসঙ্গে যাও।
কুশদা…কুশদা…কুশদা…
কেউ ডাকছে বাইরে থেকে। গলা শুনে প্রভাস বুঝল, রমাপদ। সদর দরজা খুলে দেখল হাঁপাচ্ছে রমাপদ।
রমাপদ বলল, কুশদা, ফাদার নোভাককে পাওয়া যাচ্ছে না। ফেরিঘাট থেকে নৌকায় উঠেছিল সাইকেল নিয়ে। তারপর নাকি আর পাওয়া যায়নি। কিছু জানো?
প্রভাস বলল, ফাদার? ফাদার এসবের মধ্যে এখানে কেন এসেছে? বাজার তো বন্ধ!
রমাপদ বলল, কটন মিল কোয়ার্টারে নাকি গিয়েছিল ফাদার। কয়েকজন বলছে, কারও বাড়ির খোঁজ করছিল। সেই বাড়ির মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে কটন মিলে যায়। বোটে উঠতে দেখেছে কেউ কেউ। কেউ আবার বলছে বোটে ওঠেনি। পিছন থেকে ছুরি মেরেছে। কিন্তু বেঁচে আছে না মরে গেছে জানে না কেউ।
প্রভাস বলল, ফাদারকে ছুরি মারবে কেন? আদমজী মিলের লেবাররা মেরেছে?
রমাপদ বলল, কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা জানি না।
প্রভাস বলল, পাওয়া যাচ্ছে না এটা কে বলল।
রমাপদ বলল, পুলিশ খুঁজছে পাড়ায় পাড়ায়। জিজ্ঞাসা করছে সবাইকে। তাদের কাছেও খবর গেছে। বিদেশি মানুষ। কিছু হলে তো বড় ব্যাপার হয়ে যাবে। পুলিশের মনেও তাই ভয় ধরেছে। উপর থেকে অর্ডার এসেছে নিশ্চয়।
রমাপদ কথা শেষ হতে না হতে হঠাৎ একটা হইচই শোনা গেল। এতক্ষণ রমাপদ আর প্রভাস বাড়ির সদর দরজার বাইরের ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। সামনে একটা অশ্বত্থগাছ। গোল করে বেদী করা আছে। সেখানে এসে কয়েকজন বসেছে। ঠিক পিছনেই পুকুর। সেখানে মেয়েরা বাসন ধোয়া, স্নান করা, জামাকাপড় কাচার কাজ করে।
বহু মানুষের চিৎকার পুকুরের দিক থেকে ভেসে আসছে। প্রভাস আর রমাপদর কৌতূহল হল। সামান্য কয়েক পা এগিয়ে গেল।
তাদের দেখতে পেয়েই আচমকা কয়েকজন ধেয়ে এল। সামনে এসে বলল, এই যে মালাউনের দল! বাইরে ঘোরাঘুরি করস ক্যান? জাহান্নামে যাইবা?
প্রভাস আর রমাপদ কয়েক পা পিছিয়ে এল। তাদের চোখমুখ বিস্ফারিত! এরা কারা? রমাপদ বলে উঠল, হেই, তরা কেডা? কুথা দিয়ে আইলি এহেনে?
সে আরও বলল, তগো সাহস হয় কীভাবে আমাদের মহল্লায় আইস্যা এইসব কওয়ার! কে তোরা?
যেন এই কথাটির অপেক্ষায় ছিল সেই চার পাঁচজন। একজন বলল, তদের মহল্লা? কোন দিক থিক্যা তদের মহল্লা! অ্যাদ্দিনেও এইডা বুঝস নাই যে, এই দ্যাশে তদের কোনও মহল্লা নাই। সব আমাগো মহল্লা। তরা ভিখারির মতো আছস আমাগো দয়ায়। বুঝছস!
এত কথা কওস ক্যান! বলেই আর এক যুবক এগিয়ে এসে রমাপদকে ধাক্কা মারল। প্রভাসের গায়ে ছিল ফতুয়া। তার গলার কাছ ধরে হিড় হিড় করে নিয়ে এল অশ্বত্থবেদীর কাছে। আর মাথা নিচু করিয়ে একের পর এক লাথি মারতে শুরু করল প্রভাসের পিছনে।
রমাপদ ধাক্কা খেয়ে বিস্মিত আর ক্রুদ্ধ হল। রমাপদর দাদু, রামপ্রসাদ ঘোষ ছিলেন এই যুগীগঞ্জে বকুলপুর পাড়ার দাপুটে এক মহাজন। হিন্দু হলেও তাঁর দাপটে মুসলমানরা পর্যন্ত তটস্থ ছিল। কারণ কাজে অকাজে তাঁর কাছে টাকা হাওলাত করতেই হতো। তাই কেউ তাঁকে চটাতে সাহস করত না। ভর দুপুরে কেউ তাঁর বাগানে ঢুকলে তিনি চিৎকার করে বেরিয়ে আসতেন। আর সরাসরি প্রশ্ন করতেন কার পারমিশনে আসছ? গ্রামের বাগানের আবার পারমিশন কী? তাই সকলে ঠিক বুঝত না। এমনকী পারমিশন কাকে বলে এই ইংরাজি শব্দের মানেও জানত না অনেকে। কেউ তেরিয়া হয়ে জবাব দিলে, তাকে কাছে ডেকে নবাবকে ডেকে মাথা ন্যাড়া করে দিতেন। সে মুসলমান, হিন্দু যেই হোক।
নবাব ছিল তার একনিষ্ঠ ছায়াসঙ্গী আর গ্রামের যম। ছ’ফুট লম্বা শরীর। কালো মিশমিশে গায়ের রং। হয়তো মানুষ খুনও করেছে। মহাজনের টাকা শোধ না করে কেউ প্রতারণা করলে তাকে হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যেতেই হতো। তাই যুগীগঞ্জের রামপ্রসাদ ঘোষের কারণেই হয়তো আজ পর্যন্ত এখানে কোনওদিন হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হয়নি।
আজ সেই রামপ্রসাদ ঘোষের নাতিকে রাস্তায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিচ্ছে এই কয়েকটা চ্যাংড়া? এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে রমাপদ সামনে থাকা লোকটাকে সপাটে চড় মারল।
লোকটা ভাবতেই পারেনি। রমাপদ ভাবার সময়ও দিল না। আবার চড়। প্রভাসের পিছনে লাথি মারা লোকটা ঘাড় ঘুড়িয়ে ব্যাপারটা যখন দেখছে, ততক্ষণে পুকুরের দিক থেকে আরও একদল লোক হাজির হল। এবার তারা ছুটে আসছে অশ্বত্থ গাছের দিকে।
প্রভাস ঘুরে দাঁড়িয়ে যে তাকে লাথি মারছিল, তাকে এক ধাক্কা দিল। টাল সামলাতে না পেরে লোকটি পড়ে গেল মাটিতে। প্রভাসের মাথায় আগুন জ্বলছে। প্রায় দিশাহীনের মতো সামনে একটা বাঁশ পড়ে থাকতে দেখে তুলে নিল হাতে। কিছু না ভেবেই মাটিতে পড়ে যাওয়া লোকটিকে লক্ষ্য করে বাঁশের আঘাত করল উপর্যুপরি। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে যেন সাময়িক থমকে গেল। রমাপদ একসঙ্গে দুজনকে চড় ঘুঁষি দিতে দিতে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে প্রভাস একজনকে বাঁশ দিয়ে মারছে মাটিতে ফেলে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাকি গোটা দল ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ছিটকে পড়ল প্রভাস। বাঁ-হাতে কিছু একটা আঘাত লেগেছে। গরম লাগছে তার। তখনও প্রভাস বুঝতে পারেনি যে বাঁ-হাতে ছুরি লেগেছে। তাকে লক্ষ্য করে এবার দুজন ছুরি মারল। গড়াতে গড়াতে প্রভাস চলে গেল নিজের বাড়ির দরজার দিকে।
চিৎকার শুনে ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সন্ধ্যা। নিমেষে সে বুঝে গেল কী হতে চলেছে। কয়েকটা মুহূর্ত। নিচু হয়ে কিছু একটা তুলে নিল হাতে। গোঙানি মিশ্রিত একটি চিৎকার করে সেই বস্তুটি ছুড়ে মারল সামনে। যে দুজন প্রভাসকে ছুরি মারছিল, তাদের একজনের গায়ে লাগল। সেটি দরজার খিল। মোটা লোকটির মাথায় লাগল। আর একা নয়। পাশের জনকে নিয়েই সে পিছু হঠল মাথায় হাত দিয়ে। সামনে একদঙ্গল দুর্বৃত্ত। আর তাদের মুখোমুখি সেই মুহূর্তে রণরঙ্গিণী এক নারী, সন্ধ্যা। হাতে ততক্ষণে তার উঠে এসেছে ধারালো দা।
এক মুহূর্তে থমকে গেল সকলে। এবার একটি সম্মিলিত চিৎকার আসছে আশেপাশের বাড়ি থেকে। দৌঁড়ে আসছে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। লোকগুলো হতচকিত। তাদের হাতে ছুরি আছে। ইচ্ছে করলেই এই নারী আর পুরুষকে তারা ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। কিন্তু কারা যেন ছুটে আসছে।
চিৎকার করে সন্ধ্যা বলল, আয়…আয়…আয় দেখি সাহস থাকে তো। একটাকে তো খুন করবই। আয় এগিয়ে!
এদিকে আশেপাশের থেকে দ্রুত অগ্রসরমান কিছু পায়ের শব্দ। আড়াল থেকে কীভাবে যেন শুরু হল ইটবৃষ্টি। ইটের টুকরো মাটির ঢেলা এসে পড়ছে অনবরত। কে মারছে ইট। কোথা থেকে আসছে? দাঙ্গাকারীরা হতচকিত হয়ে তাকাচ্ছে চারদিকে।
প্রভাস তখনও অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে। রক্ত ঝরছে হাত থেকে, বুক থেকে। লোকগুলো আরও বিস্মিত। কোত্থেকে ইট বৃষ্টি হচ্ছে? অনেকদিন ধরেই ছাদে ইট ভাঙা খোয়া হয়ে রয়েছে। ছাদে একটা ঘর তোলার পরিকল্পনা ছিল প্রভাসের। সেই ইটের টুকরো আর খোয়া তুলে তুলে বাবু ছুড়ছে। ক্রোধে জ্বলছে তার চোখ!
