‘সব কি বুঝিয়ে বলতে হবে নাকি’

‘সব কি বুঝিয়ে বলতে হবে নাকি’

কানাইচরণ জুতোপালিশের লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন—জুতোপালিশের সঙ্গে সঙ্গে যদি মনটাও একেবারে ঝকঝকে পালিশ করে দেওয়া যেত!

লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের স্পেশাল সেলের সিনিয়র ইনস্পেকটার কানাইচরণের চাকরি জীবনের বিগত পঁচিশ বছরের অভ্যাস এই যে বউবাজার স্ট্রিটে নেমে অফিসে ঢুকবার আগে একটিবার জুতোটি পালিশ করিয়ে নেন। ডিপার্টমেন্টের আধুনিকীকরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানাইও লেদার শু পরা ছেড়ে দিয়েছেন। কাপড়ের স্নিকার্স পরেন। অভ্যাসে তবু বদল হয়নি, শু ক্রিমের বদলে বউবাজার স্ট্রিটের জুতো পালিশওলা টুথব্রাশে জল লাগিয়ে স্নিকার্স পরিষ্কার করে দেয়। লালবাজারের মার্ডার কেস ও নানাবিধ সমস্যার মধ্যে ডুবে যাওয়ার আগে কানাই-এর এইটুকু বিলাস। সম্প্রতি নানা ঝামেলায় জড়িয়ে ডিপার্টমেন্টে ক্লোজড হয়েছেন। জয়েন্ট সিপি ক্রাইম বলেছেন, লালবাজারে বসে থাকুন, কিন্তু কোনো কেস ফাইল আপাতত দেব না। কানাইচরণ তাই আসা-যাওয়ার মধ্যে আছেন। জুনিয়ার ইনস্পেকটার সৌভিকের খাতায় ডেকার্সে খাচ্ছেন আর যথেচ্ছ ধূমপান চলছে। মনে মনে এই আশায় আছেন যে কোনোদিন একটি জমাটি কেস আসবে আর জয়েন্ট সিপি বাধ্য হবেন সাসপেনশান তুলে নিতে।

জুতোপালিশের লোকটি কখনও কানাইচরণের দিকে চেয়ে দেখে না। তার নজর কানাই-এর স্নিকার্সে। কানাই ভাবলেন–বড়ো খাঁটি জীবিকা, ডিসি থেকে সিপি থেকে হাবিলদার, এ ব্যাটা সবাইকে চেনে তাদের জুতো দিয়ে। রোজই ভাবেন লোকটির নাম জেনে নেবেন, কিন্তু আজ অবধি আর হয়ে ওঠেনি। জুতোপালিশের লোকটি নিজের কাজ করতে করতে কানাইচরণকে বলে—স্নিকার্সে কোনো লাভ নেই বাবু, যতই পালিশ কর, জুতোর ওপর আলো ঝকঝক করে না।

কানাই খুচরো গুনে, পাওনা মিটিয়ে লালবাজারে ঢুকে পড়েন। রিটায়ারমেন্টের আর বছর কয়েক বাকি। মাথার কোঁকড়ানো চুল সাদা কালোয় অর্ধেক মিশে গেছে, ঝুপো গোঁফ। মুখের গড়ন দেখে অচেনা লোক ভাবে খবরের কাগজের সাংবাদিক! রোগা তিনি কোনোদিনই ছিলেন না, কিন্তু তাকে মোটাও বলা যাবে না। উচ্চতা পাঁচ-সাত, বেশ গাট্টাগোট্টা চেহারাই বলা চলে। চোখে মোটা ফ্রেমের প্লাস পাওয়ারের চশমা। লিফট থেকে বেরিয়ে কানাই নিজের চেম্বারে ঢুকলেন। সেখানে ইতিমধ্যেই হাজির হয়েছে জুনিয়ার ইনস্পেকটার সৌভিক। কানাইকে চেম্বারের পরদা ঠেলে ঢুকতে দেখে সৌভিক তাড়াতাড়ি বেয়ারাকে ডেকে বলল—চা আর এক প্যাকেট নেভি কাট কিনে আনতে।

কানাই কোনো কথা না বলে সৌভিকের টেবিলের ওপর রাখা খবরের কাগজ টেনে পড়া শুরু করলেন। সৌভিক নিজের চেয়ারে বসে কেস ফাইল পড়ছিল। চেম্বারে এসে ঢুকল জয়েন্ট সিপির আর্দালি।

সে একটা সেলাম ঠুকে বলল—স্যার। সাহেব আপনাকে তলব করেছেন।

কানাই পেপার থেকে মুখ না তুলে বললেন—বলো, আসছেন।

আর্দালি ফের সেলাম ঠুকে চলে গেল।

কানাই-এর মেজাজ মুহূর্তে চাঙ্গা হয়ে উঠল। কানাই বললেন—সৌভিক বুঝলি, সাসপেনশান উঠে গেল।

সৌভিক কেস ফাইল সরিয়ে বলল—কী করে বুঝলে? এমনি কোনো কনসাল্ট করতে ডাকছেন হয়তো।

—ব্যাটা আর্দালি, লাস্ট কয়েক মাস আমাকে দেখে সেলাম অবধি ঠোকেনি। ভেবেছে, ফোর্সে বুঝি আমার দিন ঘনিয়ে এল। আজ দু-দুটো সেলাম কেমন ঠুকল লক্ষ্য করিসনি!

সৌভিক হাসল—যাক, আজ ডেকার্সে তাহলে আমি একটা ট্ৰিট পাচ্ছি। কানাই ধীরেসুস্থে জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ক্রাইম) এর ঘরের সামনে এলেন। চেম্বারের বাইরে দুই অল্প বয়সি মহিলা বসে আছে। কানাই চিনতে পারলেন। বাংলা সিরিয়ালের দুই পরিচিত অভিনেত্রী, ছোটো রোল, কিন্তু জনপ্রিয়তায় টালিগঞ্জের সিনিয়ার হিরোইনদের লজ্জায় ফেলে দেবেন।

কানাই তাদের নমস্কার করে বললেন—আপনারা কি স্টকিং-এর কেসে দেখা করতে এসেছেন?

দুজনের মধ্যে তুলনায় অল্পবয়সি অভিনেত্রীটি অবাক হয়ে বললেন—আপনি কি গোয়েন্দা, আমরা তো এখনও কাউকে বলিনি।

কানাই গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন—কাউকে বলেননি মানে পুলিশকে বলেননি। কিন্তু নিউজ পেপারের পেজ থ্রি রিপোর্টারকে নির্ঘাৎ বলেছেন। আজকের ট্যাবলয়েডেই দেখলাম মনে হল। চিন্তা করবেন না। সিপি প্রোটেকশান দিয়ে দেবেন। একটু অসহায় অসহায় মুখ করে বলতে হবে কিন্তু। সামনে নাহলে দুর্গাপুজা আছে, আমাদের ম্যানপাওয়ার তো বেশি নয়।

অভিনেত্রীটি কানাই-এর দিকে কৃতজ্ঞতাসুলভ দৃষ্টিতে তাকালেন। কানাই তা দেখেও না দেখে জয়েন্ট সিপির ঘরে ঢুকে গেলেন। ওক কাঠের বিস্তৃত টেবিলের ওপাশে জয়েন্ট সিপি বসে আছেন। তার মুখোমুখি, টেবিলের অন্যপ্রান্তে, কানাই-এর দিকে পিঠ করে আর এক উর্দিধারী বসে ছিলেন। কানাই কাঁধের ব্যাজ দেখে বুঝলেন—ডেপুটি কমিশনার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট। কানাই-এর ঘরে ঢোকার শব্দ শুনেও তিনি পেছন ঘুরে দেখলেন না। কানাই এতে আরও উৎফুল্ল হলেন। ডিসি ডিডি-র অমতেই তাহলে সিপি ক্রাইম বাধ্য হচ্ছেন সাসপেনশান তুলে নিতে।

কানাই সিপি ক্রাইমকে জিজ্ঞাসা করলেন—খুব ক্রিটিকাল কেস কি স্যার?

সিপি ক্রাইমের বয়েস কানাই-এর সমান। গায়ের রং মাজা, চোখের মণি দুটো ওপর দিকে ঠেলা, তাতে তাঁর পদের ভার কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে। দেহের গড়ন ভারীর দিকেই। প্রেসিডেন্সির ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। কানাইকে বললেন—বুঝে নিয়েছেন তাহলে, যাক; এক্ষুনি ক্রাইম সিনে চলে যান তাহলে।

—চলে তো যাব স্যার, কিন্তু কোন কেস স্যার! খবরের কাগজে তো কোনো মেজর ইনসিডেন্ট দেখলাম না। কাল রাতের দিকে হল নাকি। আমার বাড়িতে নিউজ পেপারের মফস্সল সংস্করণটা আসে, তাই লেটেস্ট খবরগুলো পাই না।

সিপি ক্রাইম বিরক্ত হয়ে বললেন—ওঃ জানেন না তাহলে, আন্দাজে বললেন?

—ক্রিটিকাল কেস এলেই স্যার ডিপার্টমেন্টের আমাকে মনে পড়ে কিনা। বলে কানাই ডিসি ডিডি-র দিকে তাকালেন। তিনি তখন টেবিলের ওপর রাখা পেপারওয়েট ঘোরাচ্ছিলেন। কানাই অনুমান করলেন, কেসটা পাবলিক মাইন্ডে এফেক্ট ফেলতে পারে। রাতের ইন্সিডেন্টও যদি হয়, এতক্ষণে টিভি বুলেটিনে এসে যাওয়ার কথা। লালবাজারে কানাঘুষোও শুরু হয়ে যেত। কিন্তু সৌভিক তাকে কিছু বলেনি। অর্থাৎ লালবাজার থেকে মিডিয়াকে এখনও অবধি সেন্সার করা হচ্ছে। পরে সিলিকটিভ লিক দেওয়া হবে। যাতে মানুষজন উদ্‌বিগ্ন না হয়।

সিপি ক্রাইম টেবিলে চাপড় মেরে বললেন—ডবল হোমিসাইডের কেস। নর্থ ক্যালকাটায়। একটা পাইস হোটেলে ভাত খেতে খেতে দুটো ছেলে টেবিলের ওপর লুটিয়ে পড়ে। ইনিশিয়ালি লোকজন ভেবেছিল, খাবারে কিছু আছে, ছেলেগুলো অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বি আর সিং হাসপাতালে বডি দুটো ট্রিটমেন্টের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওরাই ডেথ কর্নফার্মড করেছে। কাল রাতের ঘটনা। লোকাল থানা কাল রাতে কেসটা দেখছিল। আজ সকালে ডিডি কেসটা নিজেদের হাতে নিয়েছেন।

কানাই প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, সিপি হাত তুলে কানাইকে থামিয়ে দিলেন। একটা চৌকো, ছোটো আর হলুদ রঙের ফ্ল্যাশ কার্ড তুলে তাতে ঘষঘষ করে লিখে তিনি কানাই-এর দিকে এগিয়ে দিলেন।

—অ্যাড্রেস লিখে দিলাম, আর ব্রিফ করার সময় নেই। দেখছেন তো, বাইরে লোকজন বসে আছে।

কানাই জিজ্ঞেস করলেন-আমার সাসপেনশানটা কি তাহলে উঠে গেল স্যার?

সিপি ক্রাইম হতাশ গলায় বললেন—সেটাও কি বলে দিতে হবে, বুঝে নিন ভাই।

.

কানাই ঘরে এসে দেখলেন সৌভিক পকেটে সানগ্লাস আর হাতে তিন তিনখানা স্মার্টফোন নিয়ে বেরোবার জন্য তৈরি হয়ে বসে আছে। কানাই ঠিকানা লেখা অ্যাড্রেসটা সৌভিকের টেবিলে ছুড়ে দিলেন।

সৌভিক জিজ্ঞাসা করল—লোকাল থানাকে ইনফর্ম করতে হবে? কানাই ড্রয়ার খুলে নিজের ধুলো পড়ে যাওয়া নেমপ্লেটটি বের করে, সেটি মুছে টেবিলের ওপর রেখে, তাতে একটা আঙুল বুলিয়ে, সৌভিকের দিকে তাকালেন লোকাল থানা বোধহয় আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা। ইনফর্ম কর যে আমরা যাচ্ছি। ইনভেস্টিগেটিং অফিসার যেন অবশ্যই থাকে। আর ফরেনসিকের কাউকে আর ফোটোগ্রাফারকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিনে পৌঁছোতে বল।

সৌভিক ফোন করতে যাচ্ছিল, কানাই বাধা দিলেন। গাড়িতে উঠে ফোন করবি। এখন ঝটপট চল। কাল রাতের ক্রাইম সিন, এখন যে কী কন্ডিশানে আছে ভগবান জানেন।

লালবাজারের চাতালে লালবাতি লাগানো টয়েটা কোয়ালিস কানাই আর সৌভিকের জন্য অপেক্ষা করছিল। গাড়িটিকে দেখে কানাইচরণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। সাসপেনশানের দিনগুলো বাসে ট্রামে জার্নি করতে হয়েছে। সরকারি চাকরির এটুকুই তো সুখ। সৌভিককে সেন্টিমেন্টটা বুঝতে দিলেন না। হুটার বাজিয়ে গাড়ি ছুটল বটুক সমাদ্দার লেনের দিকে।