অতঃপর ফরেনসিক

অতঃপর ফরেনসিক

নতুন দুই ব্যক্তি কানাই ও সৌভিকের পূর্বপরিচিত। প্রথমজন লালবাজারে গোয়েন্দা বিভাগের নিজস্ব ফরেনসিক সেলের ডেপুটি ডিরেক্টর ডক্টর মাইতি আর অন্যজন তার অধস্তন, ফোটোগ্রাফার শিবু। ড. মাইতি দীর্ঘদিন স্টেট ফরেনসিক ল্যাবে ছিলেন, পুলিশমহলের পরিচিত মুখ। লালবাজারে তার কাজের খ্যাতি আছে। তার চুলের লম্বা পাকগুলো যেন শুধুমাত্র তার বয়সের কারণে নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাকে প্রাজ্ঞ করেছে। ছিপছিপে লম্বা চেহারা ডক্টর মাইতির হাতে ব্রিফকেস, ফরেনসিক কিট। অন্যদিকে শিবু এই সেদিনও ফোটোগ্রাফির স্টুডিয়ো চালাত, পরীক্ষা দিয়ে বছর দুই হল সার্ভিসে ঢুকেছে। লালবাজারে সবেধন নীলমনি ফরেনসিক ফোটোগ্রাফার বলতে এই শিবুই, সারাদিন কলকাতার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত চরকিপাক খেতে হয়। বটুক সমাদ্দার লেনের ছবি তুলেই দৌড়োতে হবে সাউথে।

কানাইচরণ লালবাজারের ফরেনসিকে লোকের অভাব আর তাদের ব্যস্ততা সম্পর্কে অবগত। তা সত্ত্বেও কানাই নিজের বিরক্তি আর রাগ গোপন করতে পারলেন না। গতকাল রাতে ঘটনার পর ক্রাইম সিনে যেভাবে একজন ইন্টার্নকে পাঠানো হয়েছে সেটাকে ক্যালাসনেস ছাড়া আর কিছু বলা চলে না। কানাই আর সৌভিককে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে ড. মাইতি গলা চড়িয়ে হেসে বললেন—শুধু আমিই আসিনি, অটোপসি রিপোর্টটাও নিয়ে এসেছি। ফুড স্যাম্পেল টেস্টিং ও হয়ে গেছে। কানাই নিজের বিরক্তি আর রাগ গিলে জানতে চাইলেন—কীসের বিষ দিয়েছে?

—মোস্ট কমন ইন দা সাব কন্টিনেন্ট! রোডেন্ট কিলার, মানে ইঁদুর মারার বিষ।

সৌভিক চমকে উঠে কানাই-এর দিকে তাকাল, খানিক আগেই হোটেলের মালিক শ্যামকান্তকে কানাই ইঁদুর-এর বিষের কথা জিজ্ঞেস করছিল। কানাই আড়চোখে সৌভিককে দেখলেন।

ডক্টর মাইতি বললেন—বাজারে বিক্রি করা ইঁদুর মারার বিষ নয়, বাজারের বিষগুলো হল অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড। এখানে ওয়ারফারিন গোত্রের একধরনের দুর্লভ রোডেন্ট কিলার প্রয়োগ করা হয়েছে। অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, কিন্তু ওয়ারফারিনের ব্যাপারটা হল, ওয়ারফারিন জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। ইনফ্যাক্ট ওয়ারফারিন ওষুধ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। যদিও খুঁজলে বড়োবাজার কলেজ স্ট্রিট-মৌলালি চত্বরের অন্তত দশটা পাইকারি সাপ্লাইয়ের দোকানে রোডেন্ট কিলার ওয়ারফারিন পাওয়া যাবে। হাট বাজারের লোকেরা রাইস ট্যাবলেট কিনে তার সঙ্গে নানা রকম সাপ্লিমেন্ট মিশিয়ে ইঁদুরের বিষ বানায়। আমরা একে রাইস ট্যাবলেট বলি। খুব টক্সিক, সাবকন্টিনেন্টে টোটাল বিষে মৃত্যুর মধ্যে বলা যায় ফিফটি পার্সেন্টেরই কারণ ইঁদুর মারার বিষ।

কানাই জিজ্ঞেস করলেন—ভিক্টিমদের জামা কাপড়ে আর গায়ে হাতে ওয়ারফারিনের ট্রেস পাওয়া গেছে?

—হাতে পাওয়া গেছে। তারা যে থালা থেকে খাবার খাচ্ছিল, সেই স্যাম্পেলে ট্রেস আছে। তাই বলা যেতে পারে তারা নিজের হাতেই বিষ নিয়েছে। ইনফ্যাক্ট, আগে বা পরে কোনো জায়গায় নয়, এই হোটেলে খেতে বসেই পয়জন গিলেছে। বাই দ্য বাই, হোটেলের রান্নাঘর থেকে যে স্যাম্পেল কালেক্ট করা হয়েছিল তাতে কিন্তু বিষ নেই। সেটা থাকলে, অবভিয়াসলি, ক্যাজুয়ালটি অনেক বেশি হত।

—ভিক্টিমদের জামাকাপড়ে? মানে কীসে করে বিষটা তারা বয়ে আনলো? জিভের নিচে রেখে তো আর খেতে আসেনি নিশ্চয়ই

—ভিক্টিমদের জামাকাপড়ে কোনো ট্রেস নেই, কীসে করে তারা বয়ে আনল, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারব না। কিন্তু হোটেলের খাবারে নেই, ভিক্টিমদের থালায় শুধুমাত্র বিষ আছে, আবার ভিক্টিমদের হাতে ছাড়া শরীরের কোথাও কোনো ট্রেস নেই—সবমিলিয়ে বলা যায় সুইসাইড অ্যাটেম্পট নয়। নিঃসন্দেহে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে।

সৌভিক ডক্টর মাইতির কথা শুনতে শুনতে হোটেলের চার কর্মচারীর দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে ডক্টর মাইতির কথা শুনতে পাওয়া যাবে না। তাদের চোখেমুখেও উৎকণ্ঠার চিহ্ন আর রাত জাগার ক্লান্তি। সৌভিক সেদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে, নিচু গলায় ডক্টর মাইতির কাছে জানতে চাইল—বিষের পরিমাণ কতটা?

—পিপিএমটা রিপোর্টে আছে, এগজাক্ট ফিগারটা দেখে বলতে হবে, কিন্তু পরিমাণ বেশি নয়, কিন্তু যেটা বললাম, খুব স্ট্রং পয়জন, ওরিজিনাল ফর্মে। অল্পেই ভালো কাজ করে দেবে। বলে ডক্টর মাইতি একগাল হাসলেন।

কানাই-এর মুখচোখ দেখে সৌভিক বুঝল ইঁদুর মারার বিষ ভুল করে, নিছক ভুল করে নিহতদের পাতে চলে আসবে, এই যুক্তি কানাই মেনে নেবেন না। সে ড. মাইতিকে বলল—আর পেট ওপেন করে দেখা হয়েছে, বললেন না! সেখানে কী কী অবজেক্ট পাওয়া গেছে?

ড. মাইতি বললেন—নরমাল খাবার-দাবার। এসব কেসে যা হয় আর কী, বাই দা বাই ছেলেদুটির বোধহয় অম্লাশয়ের ধাত ছিল। বিকেলের থেকে ফাস্টিং-এ ছিল, পেট থেকে যা স্যাম্পেল পাওয়া গেছে তাতে ডাল ভাত মাছ তো আছে। আর কোনো একটা সবজি, প্যাথলজিস্ট সন্দেহ করছেন ফুলকপি।

কানাই আঁতকে উঠলেন—ফুলকপি, এই গরমকালে, ফুলকপি কোথা থেকে আসবে!

—সেটা আমি জানি না মশায়, ওটা এগ্রিকালচারের কেউ আমার থেকে বেটার বলতে পারবে। রিপোর্ট বলছে ফাইবারাস সাবস্ট্যান্স আছে। প্যাথোলজিস্ট খালি চোখেও ফুলকপির টুকরো দেখেছেন।

কানাই বললেন—আমাকে জেরায় কর্মচারীরা জানিয়েছে, মাছ ভাত ডাল আর আলুভাজা। ব্যাস, কোনো সবজির কথা বলেনি কিন্তু। অবশ্য আলুকে যদি না সবজির মধ্যে ধরা যায়।

কানাই-এর কথায় মাইতি সায় দিয়ে বললেন—ভিক্টিমদের খাবারের স্যাম্পেল থালা থেকে তুলে কেমিকাল ল্যাবে পাঠিয়েছিলাম। তারাও বলছে যে ফুলকপি নেই, আপনি যা বললেন তাই আছে।

কানাই খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন—একটা বড়ো ক্লু পাওয়া গেল তাহলে, যদিও সেটা একটা বড়ো ফুলকপি।

সৌভিক হাসল, বলল—মেনুবোর্ডেও কিন্তু কোথাও ফুলকপি লেখা নেই, ফুলকপি পকোড়া বা ডালনা, কিছুই নেই। এই বৈশাখ মাসে ফুলকপি আসবেটাই বা কোথা থেকে!

কানাই-এর মনে পড়ল, গত রাতে ফরেনসিকের ছেলেটি ভিক্টিমদের থালা বাসন সিজ করে নিয়ে গেছিল। কানাই ড. মাইতির কাছে জানতে চাইলেন—স্যাম্পেলে ফুলকপি না-ও থাকতে পারে, কিন্তু ওদের থালায়, মাখা ভাতে কি ফুলকপি ছিল?

—সেটা তো জানি না, আমাদের কাছে স্যাম্পেল এসেছে শুধু।

—কিন্তু থালা-বাটি শুদ্ধ সিজ করা হয়েছিল তো কালকে?

ডক্টর মাইতি হতাশ গলায় বললেন—আসলে কাল রাতের ছেলেটি নতুন। সে ভেবেছে বিষ মাখা ভাতের একটা সেফ ডিসপোজাল করে দিলেই হল। তাই স্যাম্পেল কালেক্ট করে বাকিটা অটোক্লেভে পুড়িয়ে দিয়েছে।

কানাই হতাশা প্রকাশ করার আর ভাষা খুঁজে পেলেন না, সৌভিক বলল—কাউকে যদি ধরা না যায়, মায়ের দিব্যি আমি ওই ইন্টার্নকেই গারদে পুরব।

ড. মাইতি পরিস্থিতি সামলাতে বললেন—একটা ইনফরমেশান দিতে পারি। চারটে বাটি থেকে সবমিলিয়ে স্যাম্পল নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও কিন্তু বিষ নেই। ফলে বলাই যায়, হাই চান্স আছে যে ফুলকপির থেকেই পয়জন ট্রান্সমিট করেছে। কিন্তু যেহেতু ফুলকপির আর স্যাম্পেল নেই, আমরা খুব জোর দিয়ে সেটা বলতে পারব না। পেটের সাবসটান্সে সব কিছুতেই বিষ-এর ট্রেস আছে।

কানাই ডক্টর মাইতি-এর যুক্তি বুঝতে পারলেন, কিন্তু ফুলকপির উৎস আন্দাজ করতে না পেরে সৌভিকের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা পাশে দাঁড়িয়ে কানাইদের সঙ্গে ড. মাইতির কথোপকথন শুনছিল। সে বলল—স্যার, একবার এই সাসপেক্টদের ফুলকপির ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করলে হয় না!