চড়াই-হত্যা রহস্য – ৬

এবার একটা গ্রামের গল্প বলি। গ্রামের নাম চৌখুপি, নদীয়া জেলার ছোটো একটি গ্রাম। কল্যাণী থেকে প্রথমে বাস, তারপর ভ্যানরিকশায় যেতে হবে। গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা চাষবাষ, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রামে সুখেশান্তিতে বাস করে। একটি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল আছে, প্রায় একশো বছর আগে একদিন চৌখুপির মজুমদারদের চণ্ডীমণ্ডপে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় দু-দণ্ড জিরিয়েছিলেন। তার ডায়ারিতে চৌখুপির উল্লেখ আছে। গ্রামের হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলটির নাম তাই বিভূতিভূষণের নামে। জঙ্গল-জংলা পরিবেষ্টিত গ্রাম, একটি দিঘি আছে, মজুমদার দিঘি, আপাতভাবে নিরুপদ্রব গ্রাম, তবে বর্ষার পর প্রতিবার ম্যালেরিয়ার উৎপাত হয়।

চৌখুপির অন্যতম বাসিন্দা মণ্ডল পরিবার। দরিদ্র বললে অসংগত হবে না, অল্প কিছু জমিজায়গা আছে, তা চাষবাষের নয়। সেসব জমি বিক্রি করতে পারলে মণ্ডল পরিবারের সুরাহা হতে পারত। কিন্তু চৌখুপির মতো পাড়াগাঁ অঞ্চলে ক্রেতা নেই। সুটি মণ্ডল, বয়েস একত্রিশ, এখন পরিবারের কর্তা, তার বউ আর তিন নাবালক ছেলে। সুটির অন্যান্য ভাইয়েরা সেলাই আর সোনার কাজ শিখে বম্বে আর কানপুরের মতো শহরে গ্রাসাচ্ছাদন করেছে, কালেভদ্রে তারা দেশে আসে। সুটির কোনো নির্দিষ্ট জীবিকা নেই। পারিবারিক জমিতে আম-জাম-কাঁঠালের গাছ আছে। ফলনের সময় ফল বিক্রি করে সংসারে কয়েকমাসের টাকা আসে। ধান রুইবার আর কাটবার সময় সুটি মজুর খাটতে যায়। বিডিও অফিসের কাজে কয়েকবার গেছে। মোটকথা, সংসার চলে যায় আর কী! সংসারে আরও একজন প্রাণী আছে, সুটির বাপ মনোজ মণ্ডল, বয়েস নব্বই, অশক্ত, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ।

গরমের দুপুরে তাদের চালাঘর থেকে মিটার পঞ্চাশ দূরে তালপাতা বিছিয়ে, তার ওপর মনোজ শুয়ে ছিলেন। মনোজের শরীরের ওপরে আমগাছের ছায়া, হাতে ধরা একটি দড়ি। মনোজ আধোঘুমে, একবার চোখ খুলে তাকাচ্ছেন, আর হাতে ধরা দড়িতে টান দিচ্ছেন। সংসারে তার এই একমাত্র কাজ। মণ্ডলদের পারিবারিক বাগানের দেখাশোনা করে সুটি আর সুটির ছেলেরা। গাছে কীটনাশক স্প্রে করার পয়সা নেই। পোকামাকড়কে আটকানোর উপায় নেই। পাখিদের দূর করার জন্য সুটি লিচু গাছের ডালে একটা তলা-ফুটো বালতি বেঁধেছে। বালতিটা হাট থেকে ভাঙা লোহার দরে কিনে আনা। বালতির ফুটোর মধ্যে দিয়ে সুটি একখণ্ড পাথরের ঢেলা বেঁধে দিয়েছে, তাতে দড়ি আটকানো। নীচে দাঁড়িয়ে দড়িতে টান দিলে বালতির ভেতর থেকে ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ হয়, নাগাড়ে।

সুটির ছেলেদের ওপর দায়িত্ব পাখি তাড়ানোর। তারা দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে বনবাদাড়ে চড়তে যায়, বা ঘরে ঘুমায়। তারা দাদুকে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে, তালপাতার ওপর বসিয়ে দিয়ে যায়। যদিও তার ওপর পাখি তাড়ানোর ভার, কিন্তু মনোজ অশক্ত শরীরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। বারবার চোখ জড়িয়ে যায়, তালপাতা আর ধুলোমাটিতে গড়িয়ে পড়েন। ঘুম ভাঙলে ক্ষণে ক্ষণে তার মনে হয় কেউ বুঝি হেঁটে যাচ্ছে, শুকনো

পাতার খড়খড়, চোখে ঝাপসা দেখেন। জানতে চান—কে যায় হোথা?

হয়তো গোসাপ। হয়তো কিছুই না। শুধুই হাওয়া। মনোজ ফের তন্দ্রায় যান।

একদিন ক্রমাগত পাতার খসখসে তন্দ্রা ভেঙে মনোজ ঘণ্টা টানতে টানতে বললেন—কে যায় হোথা?

গোসাপ বা হাওয়া নয়, মানুষ উত্তর করল—আমি মেসোমশায়।

—ও তুমি! বলে মনোজ আশ্বস্ত হলেন।

লোকটি বোধহয় আশা করেনি এই ভরদুপুরে আমবাগানে কেউ থাকবে। মনোজের প্যাকাটি হয়ে যাওয়া শরীর, রোদে পোড়া-গা, আর পাতার স্তূপ। মাটির উপর শুয়ে থাকলে আলাদা করে মানুষটাকে ঠাউর করা মুশকিল। মনোজ ফের শুয়ে পড়তে পড়তে চোখ কচলে বললেন—কে তুমি, নাম কী?

উত্তর এল-বিশু।

মনোজ চৌখুপিতে অন্তত তিনজন বিশুকে চেনেন। আশেপাশে পাঁচটা গ্রাম ধরলে অন্তত দশজন বিশু আছে।

এদের মধ্যে কোনো-এক বিশু হবে আন্দাজ করে নিয়ে মনোজ বললেন—সুটি তো বিডিও আপিসে গেছে।

লোকটি বলল—ও তাই নাকি, তা আসবে কখন?

মনোজ বিশুকে দেখবার চেষ্টা করছিলেন, আসলে বুঝতে চাইছিলেন দশজন বিশুর মধ্যে লোকটি কোনজন।

—এসে পড়বে, ও কি কাঁধে জাল নাকি? মনোজ দেখলেন লোকটির হাতে ধরা একটি জাল। পিঠে একখানি ঝোলা।

লোকটি স্বীকার করল, জালই বটে।

মনোজ জিজ্ঞাসা করলেন—মাছ ধরতে যাচ্ছিস নাকি বাপ?

—হ্যাঁ মেসোমশাই।

—কোথায় ধরবি? যমুনায়?

—সে অনেক দূর। পুকুরে ধরব।

—তা মজুমদারদের পুকুরে মাছ ভারি আছে ঠিকই।

লোকটা কখন চলে গেছে মনোজ ঠাউর করতে পারেন না। কিন্তু মনোজের মাথার খচখচ ভাবটা যায় না, বিশু তাকে একটা ভয়ানক মিছে কথা বলে গেছে।