৭
আমি লালবাজার থেকে সিদ্ধার্থকে ভবানী ভবনে ফোন করলাম। একটা সার্চ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করা দরকার। এই মুহূর্তে আমার হাতে যেটুকু ইনফরমেশান রয়েছে তাতে খুনির খোঁজ খড়ের গাদায় আলপিন খোঁজার মত দুরূহ। কিন্তু সকালে মতিদার ভোকাল টনিকে আর ভানু সমাদ্দারের ধানচাষের খবরের পর হাত গুটিয়ে বসে থাকা অর্থহীন। লালবাজারের হাতে জেলায় জেলায় বিস্তৃত সার্চ করার মতো পরিকাঠামো নেই, যা ভবানী ভবনের আছে। তিনবার বাজার পর সিদ্ধার্থ ফোন তুলল। আমার গলা শুনে বলল—কী কাকতালীয় ব্যাপার দাদা। আপনাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম।
আমার আর সার্চের প্রসঙ্গে যাওয়া হল না। সিদ্ধার্থ বললে—আর একটা ইন্সিডেন্ট হয়েছে, এবার নদিয়ার চৌখুপিতে। অনেক উইটনেস আছে।
—কবেকার ঘটনা? জানতে চাইলাম।
—কালকের।
শুনে আমি বিরক্ত হলাম, কালকের ঘটনা যখন, সিদ্ধার্থের উচিত ছিল আমাকে কালকেই জানানো।
সে আমার বিরক্তি আন্দাজ করে বলল—আমি কাল সি এমের ডিউটিতে ছিলাম দাদা।
আর কথা বাড়ানো উচিত না ভেবে, জিজ্ঞাসা করলাম- তোমরা যাচ্ছ?
—আমি একা যাচ্ছি। আপনি যাবেন?
আমি খুশি হলাম, ছোকরা নিজের গাফিলতি ঢাকার চেষ্টা করছে। বললাম যে—গাড়ি নিয়ে এসে লালবাজার থেকে আমাকে তুলে নাও।
সিদ্ধার্থ শুধরে দিল—গাড়ি নেই দাদা। আমি ট্রেনে যাব। আপনি সাড়ে বারোটার মধ্যে শিয়ালদায় আসতে পারবেন? টাইম টেবিলে দেখলাম একটা গেদে লোকাল আছে, কল্যাণী সীমান্তে নামব।
পাখি মার্ডারের কেসে ভবানী ভবনের গুরুত্ব আর একবার অনুমান করলাম। উপায় কী! সিদ্ধার্থকে কনফার্ম করে ব্যাগ ইত্যাদি গুছিয়ে লালবাজার থেকে বেরোলাম। শিয়ালদায় এসে শুনি ট্রেনের ঘোষণা হয়েছে, এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসবে। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে তখনও গেদে লোকালের দেখা নেই। খানিক হাঁটাহাঁটির পর সিদ্ধার্থর দেখা পেলাম, প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকে। দুপুরবেলার ট্রেন, প্ল্যাটফর্মে ভিড় পাতলা। আমাকে রেলিং-এর দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে সিদ্ধার্থ পরিস্থিতি বলল। শিয়ালদা স্টেশানেই একটা ছোটোখাটো ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং হয়ে গেল। আমিও তাকে ভানু সমাদ্দারের খবরটা বললাম। সার্চের কথা তুললাম না। আপাতত চৌখুপির তদন্তে মন দিতে হবে।
.
সিদ্ধার্থ যা বলল তা মোটামুটি এই যে—
চৌখুপির মজুমদারদের আমবাগানে গ্রামের দুটি ছেলে কামরাঙা পাড়তে গেছিল। নামে আমবাগান হলেও একটি কী দুটি কামরাঙা গাছও আছে। ছেলেদুটি বাগানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ শোনে পাখিদের বিষম কোলাহল। প্রাথমিকভাবে ছেলেদুটি ভাবে হয়তো আমবাগানে শিয়াল বা বাঘরোল বেরিয়েছে। ছেলেদুটি গাছের আড়ালে লুকায়, কিন্তু পাখির চিৎকার থামে না, যা অস্বাভাবিক। শিয়াল বা বাঘরোল দেখলে পাখি উড়ে যাবে। যদিও, অনেকসময় পাখির ছানাকে শিয়ালে ধরলে অন্যান্য পাখিরা গাছের ডালে বসে পরিত্রাহী চিৎকার জোড়ে। গ্রামের মানুষ এসবের সঙ্গে পরিচিত। একটি ছেলে সাহস করে এগিয়ে যায় পাখিদের চ্যাঁচামেচির কারণ বুঝবার জন্য, ডালপালার ফাঁক দিয়ে ছেলেটি একটি লোককে দেখতে পায়। তার মুখে কাপড় জড়ানো, গায়ে পাঞ্জাবি, পরনে পাজামা। সেই মুহূর্তে ছেলেটির চোখে অন্য কিছু পড়েনি। ছেলেটার পায়ের শব্দে লোকটা ঘুরে তাকায় এবং ছেলেটাকে দেখতে পেয়ে যায়। হাতে ধরে থাকা কোনো একটা জিনিস ছুড়ে ফেলে লোকটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে দৌড় দেয়। চৌখুপি আপাতভাবে শান্ত গ্রাম হলেও নদীয়া জেলায় রাজনৈতিক অশান্তি আছে। ছেলেটা ভাবে লোকটা হয়তো রাজনৈতিক দুষ্কৃতি হবে। লোকটা বসে কী করছিল, সেটা বুঝবার জন্য ছেলেটা আরও এগিয়ে আসে। লোকটা যেখানে বসে ছিল সেখানে এসে ছেলেটি একটি বীভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি হয়। জায়গাটায় ঝোপঝাড় নেই, মাটির ওপর একটা মাছ ধরার জাল পাতা, প্রচুর চড়াই পাখি ধরা পড়েছে। পাখিগুলি কিচিরমিচির করে যতটা আওয়াজ করা সম্ভব তা করছে। জালের পাশে স্তূপ করে রাখা গলা কাটা আরও চড়াইদের দেহ ও মুণ্ডু। লোকটা ছেলেটাকে আসতে দেখে একটি চড়াইকে অর্ধমৃত রেখে পালিয়েছে। চারিদিকে রক্ত, চড়াই-এর মুণ্ডু, নিথর দেহ আর কিচিরমিচিরে ছেলেটা বেজায় ঘাবড়ে গেছিল। লোকটাকে ধাওয়া করবার কথা ভাবেনি। সে উলটোদিকে দৌড় দিয়ে তার বন্ধুকে ঘটনা এবং দৃশ্যটা বলে। দুজনে মিলে ছুটে যায় চৌখুপির এক পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়িতে। পঞ্চায়েত মেম্বার বাইকে চেপে ফাঁড়িতে এসে পুলিশকে জানায়। এটা গতকালের ঘটনা, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একটা জাল উদ্ধার করে, আকারে পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুট। স্থানীয়দের মতে এটা একধরনের বের-জাল, ছোটো ফুটো, হাটেবাজারে আকছার বিক্রি হয়। চুনো মাছ ধরবার কাজে লাগে। সাসপেক্ট চড়াই-এর ফাঁদ হিসেবে জালটাকে ব্যবহার করেছিল। ঘটনাস্থলে চালের মিহি গুঁড়ো পাওয়া গেছে। মনে করা হচ্ছে, পাখিদের আকৃষ্ট করার জন্য চালের গুঁড়ো ছড়িয়েছিল। খুবই প্রিমিটিভ ফাঁদ, পাড়াগাঁয়ে যেভাবে শিশুরা পাখি ধরে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান যে লোকটা স্থানীয় নয়। কারণ লোকটা মজুমদারদের আমবাগানের পথ চেনে না, যেদিকে সে পালিয়েছিল, সেদিকে গ্রামের দিঘি। ছেলেটা ধাওয়া করলে লোকটাকে ধরে ফেলতে পারত। লোকাল পিএস বলছে, ছোটো আর ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে সে পাখিদের মুণ্ডচ্ছেদ করে থাকবে, ব্যাধেরা যেমন মাপের আঁকশি দিয়ে পাখি ধরে। সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশ নবগ্রামের এক ব্যাধকে আটক করেছে, এখনও কেস দেয়নি। ব্যাধের থেকে দুটো আঁকশি পাওয়া গেছে। সেগুলো ফরেনসিকে পাঠান হয়েছে। ব্যাধ যদিও অপরাধ স্বীকার করেনি।
আমি জানতে চাইলাম—জীবিত পাখিগুলোর কী হল?
সিদ্ধার্থ বলল- ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
—বাহ যে পালায় সে বাঁচে।
সিদ্ধার্থ আমার ব্যঙ্গ বুঝতে পারেনি। গেদে লোকাল শিয়ালদা এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়েছে। আমি আর সিদ্ধার্থ যার যার সিগারেট নিভিয়ে ট্রেনে চেপে বসলাম। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞাসা করল—আগে ফাঁড়িতে যাব না আগে ঘটনাস্থলে? আমি ক্রাইম সিনেই যেতে চাইলাম, অন্ধকার নামলে আমবাগানে ঢোকা মুশকিল হতে পারে। আমরা শহুরে লোক, কলকাতার আলো দেখে অভ্যস্ত, অন্ধকার চোখে সয় না।
আমার মুখে ক্রাইম সিন শব্দটা শুনে সিদ্ধার্থ বিস্মিত হয়েছে বুঝতে পারলাম। ওর এখনও ধারণা কেউ মানুষকে ভয় দেখাতে পাখিদের খুন করছে। দমদম থেকে একগাদা লোক উঠল, পাবলিক স্পেসে পুলিশের কথাবার্তা বললাম না। খেজুড়ে গল্পগাছা হল, বাদাম, ছোলা লেবু লজেন্স খাওয়া চলল। নৈহাটি পেরুলে ট্রেন ফাঁকা হয়ে আসে। সেই সুযোগে আমি সিদ্ধার্থকে নীচু গলায় বোঝালাম কেন আমার কাছে এই ঘটনাগুলো একটা সিরিয়াল মার্ডারের কেস। ছোকরা আপত্তি করল না।
