আবার লালবাজার
ডেকার্সে কোনোরকমে ডিম চাউমিন খেয়ে কানাইদের তাড়াতাড়ি লালবাজার ফিরতে হল। জয়েন্ট সিপি ডেকে পাঠিয়েছেন। কেস ফাইলগুলো নিজের চেম্বারে রেখে কানাই ফের ছুটলেন জয়েন্ট সিপিকে সংক্ষেপে কেসের অগ্রগতি বুঝিয়ে আসতে। আজকে বিকেলের প্রেস কনফারেন্সে কেসটার ব্যাপারে প্রেসকে সিলেক্টিভ ব্রিফ করা হবে। কমিশনার নিজে প্রেসের সঙ্গে কথা বলবেন। তাই গুরুত্ব আলাদা, যদিও প্রেস নিজেরাই ইতিমধ্যে অনেকটা খবর পেয়ে গেছে। কানাই জয়েন্ট সিপিকে বলে এলেন, আপাতত যেন প্রেসকে এই জানানো হয় যে ঘটনায় হোটেলের মালিক, ম্যানেজার ও দুই কর্মচারীকে আটক করা হয়েছে।
নিজের চেম্বারে ফিরে এসে কানাই একটি অতি দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন।
সৌভিক নেভিকাট এর প্যাকেট এগিয়ে ধরে বলল—সাসপেনশানেই আরামে ছিলেন কিনা?
কানাই আর একবার সশব্দে নিশ্বাস ত্যাগ করে প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট তুলে নিলেন। সৌভিক আগুন ধরল।
—কে খুনি কিছু বুঝতে পারছেন?
কানাই একটি ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—এই কেসটা ফিলজফিক্যালি ‘কে খুনি’-এর কেস না। এখনও কেসটা কীভাবে খুনটা হল সেই জায়গাটায় এসে আটকে আছে।
—খুনিকে একবার ধরতে পারলেই চাবকে কী করে ক্রাইম করল সেইটে বের করা যাবে।
কানাই সৌভিকের কথায় পাত্তা না দিয়ে বললেন—অপরাধের সমাধান করা আসলে একটা রাস্তা খুঁজে পাওয়া আর সেই রাস্তায় এক পথিকের মুখ দেখার মতো। সূত্রের জঙ্গলের মধ্যে কোথাও একটা রাস্তা আছে, একটা রাস্তা চলে গেছে কোন ভয়ংকর ক্রাইমের দিকে। এই রাস্তার শেষটা কিন্তু আমরা জানি। শেষটা অবশ্যই হবে কোনো ভয়ংকর ঘটনা, খুন, চুরি, এই কেসে যেমন ডবল হোমিসাইড। আমরা যেটা জানি না সেটা হল রাস্তাটা কী আর সেই রাস্তায় কে বা কারা হাঁটল!
অনেক কেসে রাস্তাটা পরিষ্কার চেনা যায়। সূত্রের জঙ্গলে পথ হারাতে হয় না। যেমন এই কিছুদিন আগে খবরে পড়লাম, কোনো একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সোসাইটির চেয়ারম্যানকে চাপাতি দিয়ে মাথায় মেরে সেপটিক ট্যাঙ্কে ফেলে দিয়ে গেছে। এখানে পুলিশের কাছে রাস্তাটা পরিষ্কার। কে বা কারা চেয়ারম্যানের মাথায় আঘাত করেছে, তারপর টানতে টানতে সেপটিক ট্যাঙ্ক অবধি নিয়ে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে যদি নিয়ে যায় তাহলে এ এল সি পেনের আলো মারলে ব্লাড স্টেইন স্পষ্ট হয়ে যাবে। ফাইনালি সেপ্টিক ট্যাঙ্কে ফেলে দিয়েছে। অল ক্লিয়ার। কিন্তু কে করেছে সেইটা আমরা শুধু জানি না। অর্থাৎ এই পথে হাঁটার সম্ভাবনা কার আছে! তখন আমাদের মোটিভ, অ্যালিবাই, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ খতিয়ে দেখতে হয়।
আবার অনেক কেসে খুনির একটা অবয়ব বোঝা যায়। পেপারে দেখছিলাম লেক মার্কেট এরিয়ায় ভোরবেলা একটা বডি পাওয়া গেছে। লোকাল পুলিশ গিয়েই বডিটা চিনতে পেরেছে, একটা তোলাবাজকে কেউ বা কারা খুন করে ফেলে দিয়ে গেছে। আশেপাশে কোন অস্ত্র বা ব্লাড স্টেইন নেই। তাই কী করে খুন করল, ফরেনসিক পোস্ট মর্টেম না হলে বলা মুশকিল। কিন্তু কে বা কারা এই তোলাবাজকে খুন করতে পারে, যাকে খুনির অবয়ব বললাম, তা লোকাল পুলিশও বুঝতে পারছে। সে জন্যে গোয়েন্দা বিভাগের প্রয়োজন নেই। এই কেসে তোলাবাজের কিছু প্রতিপক্ষকে ধরে জেলে পুরে বেশ বাটাম দিলেই খুনের পদ্ধতিটা জানা যাবে।
কানাই থামলেন। সৌভিক জানে দুপুরে খাওয়ার পর প্রথম সিগারেট ধরালে কানাই দার্শনিক হয়ে পড়েন, যেহেতু গোয়েন্দা, কানাই-এর দর্শনের কথাও আসলে ক্রিমিনোলজির টেক্সটবুক!
সৌভিক বলল–আমাদের কেসে রাস্তা আর সেই রাস্তায় কে হাঁটল দুটোই ধোঁয়াশায়।
এটাই একটা ভালো রহস্যের প্রাথমিক গুণ। কানাই বললেন—সহদেব আর রজনীকান্তকে কী করে বিষ দেওয়া হল, সেটাও আমরা বুঝতে পারছি না আর কে বিষ দিল—সেটাও আমাদের আন্দাজে নেই। অর্থাৎ আমরা কিছু অভিযুক্তদের ধরেছি ঠিকই কিন্তু কোনো মোটিভ বুঝে উঠতে পারছি না। খুনির কোনো অবয়বও আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সাক্ষ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিক প্রমাণও এমন কিছু নেই যেখান থেকে আমরা রাস্তাটার একটা আন্দাজ করতে পারি। আবার মৃত ছেলেদুটিও এতটাই সাধারণ যে তাদের হত্যা করার কোনো সহজবোধ্য কারণ আমাদের চোখে পড়ছে না। এইবার এই কথাটাকেই ঘুরিয়ে দেখা যাক, ছেলেদুটি এতই সাধারণ, যে তাদের খুন করার কোনো কারণ নেই, তবুও তাদেরকে খুন হতে হল। পুলিশে কাজ করার সূত্রে, আই মিন, অপরাধবিজ্ঞান থেকে আমরা কী জেনেছি?
সৌভিক বলল—সাধারণ মানুষকে খুন হতে হয় যদি তারা ক্রিমিনালদের কোনো বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে। অনিচ্ছাকৃত খুন হলে অথবা কোনো দুর্ঘটনাতেও সাধারণ মানুষের প্রাণ যায়। এবাদে একটা কারণ অবশ্যই…
সৌভিকের কথার খেই ধরে কানাই বললেন—সিরিয়াল কিলার। আপাতভাবে কাকে খুন করবে সেটা সিরিয়াল কিলারদের বিবেচ্য নয়। কোন গোষ্ঠীর মানুষকে খুন করবে সেটা বিবেচ্য হলেও হতে পারে। স্টোনম্যান যেমন ফুটপাথবাসীদের মেরেছে শুধু।
সৌভিক সিগারেটে টান দিতে ভুলে গেল।
—স্টোনম্যানই লালবাজারের শেষ সিরিয়াল কিলার নয়। এরপরেও লালবাজারে মাল্টিপল সিরিয়াল কিলিং-এর কেস এসেছে। সেই সিরিয়াল কিলাররা যদিও সুপারি কিলার, যারা টাকা নিয়ে একাধিক খুন করেছে, এদের খুনের নির্দিষ্ট মোটিভ থাকে। স্টোনম্যানের ঘটনায় শিক্ষা নিয়ে লালবাজার তাই সিরিয়াল কিলিং-এর কথা প্রেসে বলে না।
সৌভিক কানাই এর কাছে জানতে চাইল—সিপি সাহেবকে বলেছেন?
-–বলেছি, একটা পসিবল কারণ হিসেবে, কারণ আমি বাকি সম্ভাবনাগুলোকেও উড়িয়ে দিচ্ছি না। জয়েন্ট সিপির নিজের মাথাতেও সেটা ছিল, তাই মিডিয়াকে পুরো খবর দেওয়া হয়নি। কলকাতায় পাইস হোটেলে সিরিয়াল কিলার জানতে পারলে বুঝতে পারছিস মিডিয়ার রেড লেটার ডে হয়ে যাবে। পানওয়ালার সামনে বুম ধরে জিজ্ঞেস করবে সিরিয়াল কিলারকে চেনে কিনা! হতেও তো পারে ছেলেদুটি কোনো অশুভ চক্রে জড়িয়ে পড়েছিল। বা এমন কিছু জেনে ফেলেছিল যা ওদের জানার কথা নয়। সে কারণে দক্ষ সুপারি কিলারের হাতে খুন হতে হল।
সৌভিক জিজ্ঞেস করল- আমি কি এই শেষ সম্ভাবনাটা খতিয়ে দেখব?
—এগজ্যাক্টলি, এখন সেটাই তোর কাজ। সাব-ইনস্পেকটারটার সঙ্গে যোগাযোগ রাখ। ফরেনসিকের রিপোর্টগুলো বিকেলের মধ্যে এলে আমাকে জানাস। আর ছেলেদুটোর বোর্ডিং হাউসের আশেপাশে তোর খোঁচড়দের ফিট কর। এরা কেমন ছেলে ছিল, বোর্ডিং-এর বাকিদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল। বোর্ডিং-এ কোনো নেশার লুপ আছে কিনা, কলেজে এদের বন্ধুবান্ধব কারা। কাউকে সন্দেহ হলে তার পিছনে খোঁচড় লাগিয়ে দিবি। আর একটা জিনিসও তোকে করতে হবে। সন্ধে থেকে এই ছেলেদুটি কোথায় ছিল আমি জানতে চাই, বোর্ডিং আর জগমোহিনী ছাড়া আর কোনো জায়গায় গিয়েছিল কি না, বিকেলে কী কিছু খেয়েছিল? অটোপসির রিপোর্ট বলেছে অম্বলের ধাত আছে ছেলেগুলোর। এই দিকটাও তোকে দেখতে হবে।
সৌভিক মোবাইলে নোট করে নিল।
—যদি সিরিয়াল কিলার হয়?
—তাহলে পরের ইন্সিডেন্টের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া সব চেষ্টা ভোগে যাবে। বলে কানাই সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞার রিপোর্টে চোখ রাখলেন।
সৌভিক চেম্বার ত্যাগ করল। কানাই ভাবলেন আজ বিকেলের স্বাস্থ্যপান আর হল না।
