১
সৌভিক বলল—হয়েছেটা কী এই শহরের! সব সহজ মার্ডার আর সহজ জালিয়াতির কেসে ভরে গেছে। কেউ একটা কঠিন খুন করতে অবধি শেখেনি। দিদিমণি মুখ বেঁকালেন-সহজ খুন, সহজ জালিয়াতি এ আবার কেমনধারা কথা! খুন মাত্রেই গা ঘিনঘিনে একটা ব্যাপার।
—সে তো সাধারণ মানুষের জন্য। পুলিশের কাছে যখন একটা কেস আসে সেটা কঠিন না সহজ- সেভাবেই দেখা হয়।
দিদিমণি সৌভিকের যুক্তি মানতে পারলেন না, কিন্তু সৌভিকের কথা ফেলে দেওয়ার মতোও না। দিদিমণি কথা এড়াবার জন্য বললেন—কঠিন কেস চাইছ তো, কলকাতা শহরে একটা যদি সিরিয়াল মার্ডারারের আবির্ভাব হত তাহলে তো কাপড়ে-চোপড়ে হয়ে যেত।
—স্টোনম্যান তো এসেছিল।
—ধরতে তো পারনি, পুলিশকে নাকানিচোবানি খাইয়ে ছেড়েছিল।
সৌভিক ঢোঁক গিলে বলল—একটা শহরে একজনই সিরিয়াল মার্ডারার আসে। ও আর আসবে না। একটাই স্ক্রানটন-স্ট্রাংলার বা শার্লটস-এর টাকো বেল মার্ডারার। যে শুধুমাত্র টাকো বেল রেস্টুরেন্টের কর্মচারীদের খুন করত।
কানাইচরণ, সৌভিক আর দিদিমণির কথাবার্তায় নাক গলালেন, অল্প কেশে বললেন—কলকাতা শহরে কিন্তু স্টোনম্যানের পরেও সিরিয়াল কিলার এসেছে।
সৌভিক আর দিদিমণি চমকে উঠলেন—সে কী! ওই পাইস হোটেলের কেসটা নাকি, নাকি অন্য কোনো ব্যাপার, পুলিশ ধামাচাপা দিয়েছে?
কানাই হাতের ইশারায় মাছি ওড়ালেন- ধুর ধুর, ওইসব কনফিউজিং কেস না! আর একটা কী দুটো মার্ডারও নয়, সেই কিলার শয়ে শয়ে মার্ডার করেছিল। আসল, একদম সিরিয়াস সিরিয়াল কিলার, কিন্তু সঠিক অর্থে কলকাতা নয়, যদিও কলকাতার পঞ্চাশ কিলোমিটারের মধ্যে।
দিদিমণি বললেন—এতবড়ো কেস, খবরের কাগজে চোখে পড়েনি তো।
সৌভিক বলল—আরে ধ্যার, সে না হয় কলকাতার উপকণ্ঠেই হল, তবু শুনি।
দিদিমণি সৌভিককে থামিয়ে বললেন—না না ভাই, এটা সিরিয়াল কিলিং নয়, এটা জেনোসাইড না কী বলে, পলিটিকাল মার্ডার বোধহয়!
কানাইচরণ অল্প হাসলেন—জেনোসাইডই বলা চলে, তবে মানুষের নয়।
দিদিমণি আর সৌভিক ফের চমকে উঠল, সৌভিক বলল — আর নেওয়া যাচ্ছে না, এবার পুরো ঘটনাটা শুনতেই হবে।
কানাই ঠোঁট উলটে বললেন—সে তো অনেক বড়ো ঘটনা, বলতে শুরু করলে রাত হয়ে যাবে।
—তা হোক আমি তোমায় ট্যাক্সি করে, আর আপনাকেও দিদিমণি, বাড়ি পৌঁছে দেব। সৌভিক আশ্বস্ত করে বলল।
—অত রাত অবধি থাকলে যে প্রচুর মদ খেয়ে ফেলব।
—অল্প অল্প করে খাও। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে।
—তাতেও কী কম নেশা উঠবে! কানাই উদ্বিগ্ন হলেন।
দিদিমণি সজোরে টেবিল চাপড়ে বললেন—এইবার ভালোয় ভালোয় শুরু না করলে, আমি থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করব।
কানাই দুইহাতে মদের গ্লাস, পকোড়ার ট্রে আর বাদামের ডিশ সামলালেন। লালবাজারের পাশেই সেসিল বার, আজ শুক্রবার, বিকেল, গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়ার ইনস্পেকটার কানাইচরণ, তার জুনিয়ার ইনস্পেকটার সৌভিক আর রেকর্ডস সেকশানের কর্মচারী দিদিমণির সপ্তাহান্তিক জমায়েত। সাসপেনশান উঠে যাওয়ার পর কানাই কথা দিয়েছিলেন সৌভিক আর দিদিমণিকে ট্রিট দেবেন, আজকের বিল তাই তার ঝুলিতে যাবে। সে-কথা ভেবে কানাই ঈষৎ বিচলিত ছিলেন! দিদিমণি আর সৌভিকের সঙ্গে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে আড্ডা দিতে পারছিলেন না। দিদিমণির বকুনি শুনে কানাই আমতা-আমতা করে বলতে শুরু করলেন।
—আজ থেকে কুড়ি বছর আগের ঘটনা। হ্যাঁ, ঘটনা বললে খুব ভুল হবে না। নব্বই-এর দশকের শেষদিক। ইন্টারনেট নামটা লোকজন শোনা শুরু করেছে, কিন্তু যেমন কম্পিউটারের কাজ কী সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছিল না তেমনি ভাবেই ইন্টারনেটের কাজও বলতে পারবে না, গ্লোবাল ওয়ার্মিং গ্লোবাল কুলিং ইত্যাদি সত্ত্বেও কলকাতায় ভালোই ঠান্ডা পড়ছে, গরমকালে ব্যাপক গরম। আজ বলতে গিয়ে মনে হচ্ছে যে এসব অনেকদিন আগের কথা, অথচ কুড়ি বছর আর কী এমন সময়! ঘটনাটা বলার সময় হয়তো তাই একাধিকবার দিন-তারিখ-মাস ওলটপালট হয়ে যাবে, অক্টোবরের ঘটনা গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে জানুয়ারির গায়ে। সেসব আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। একদিন কী এক সপ্তাহের বিষয় নয়, টানা তিন বছর ধরে ঘটে চলা ঘটনারা। টানা তিন বছর ধরে লোকটা শয়ে শয়ে খুন করেছে, এই দেখুন এই ২০১৮-তে বসেও, বলতে গিয়ে আমার হাতের লোম খাড়া হয়ে গেল।
