১৫
হাজরা মোড়ে এসে ট্যাক্সি পাওয়া গেল, তার আগে একটা পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে অফিসে ফোন করে দুজন অফিসারকে সাদা পোশাকে এবং সশস্ত্র রবীন্দ্রসদনে আসতে নির্দেশ দিয়েছি। আমি রবীন্দ্রনাথের মূর্তির নীচে অপেক্ষা করব। ট্যাক্সি রবীন্দ্রসদনের মুখে থামলে মিটার দেখে ভাড়া মিটিয়ে নেমে এলাম। সিগারেট ধরালাম। হাজরা থেকে রবীন্দ্রসদন প্রায় উড়েই চলে এসেছি। শহরের অন্যদিকে লালবাজার থেকে রবীন্দ্রসদন আসতে দুই সহকর্মীর সময় লাগবে। ধূমপান করতে করতে মেলার ভিড় দেখছিলাম। মেলায় শেষ দিনের বিকেল, রবীন্দ্রসদন চত্বর গমগম করছে, সুবেশ সুবেশা তরুণ-তরুণীদের ভিড়, তাদের অনেকের বেশভূষা অন্যরকমের, একেই বোধহয় আঁতেল-সাজ বলে। কলকাতা পুলিশের চাকরি করেও এত বড়ো আকারের একটি মেলা সম্পর্কে প্রায় কিছু জানতাম না। খাতায় কলমে দেখেছি যে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মেলাটি হয়, দিন চারেকের মেলা। লালবাজার আর পার্ক স্ট্রিট থানা কোওর্ডিনেট করে চার-পাঁচ জন লাঠিধারী হাবিলদার পাঠিয়ে দেয়। মেলার ভিড় দেখে সেদিন মনে হচ্ছিল আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এই মেলার আকার ডাবল হয়ে যাবে। তখন আর রবীন্দ্রসদনের চাতালে কুলোবে না, হয়তো গড়ের মাঠে হবে, বইমেলার মতো; আর লিটল ম্যাগাজিন মেলার ব্যাপারেও কমিশনার সাহেব অল হ্যান্ডস ডাউন মিটিং ডাকবেন।
দুজন সহকর্মী এসে উপস্থিত হলেন।
—একটি লোকের সঙ্গে কথা বলব, আশেপাশেই থেকো। ঝামেলার প্রয়োজন নেই। তাদের নির্দেশ দিলাম।
তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল, তাদের দেখবার চেষ্টা করে লাভ নেই। ওরা গোয়েন্দা বিভাগের ট্রেনিংপ্রাপ্ত অফিসার, ওদের চোখ আমার ওপর থাকবে।
রবীন্দ্রসদনের গলিপথ ধরে আরও ভেতরের দিকে চলে এসেছি। রাস্তার দুধারে দুফুট দৈর্ঘ্যের স্টল, টেবিল পাতা, টেবিলের ওপর বই, ম্যাগাজিন রাখা। প্রতিটা টেবিলের জন্য দুটি চেয়ার বরাদ্দ, সম্পাদক-সম্পাদিকারা বসে আছেন। গলিপথে ভিড় বাঁচিয়ে হাঁটতে হচ্ছিল, অথচ টেবিলে লিটল ম্যাগাজিন কেনবার জন্য খরিদ্দার তেমন একটা নেই। নন্দনের টিকিট ঘরের পাশে ত্রিপল আর কাপড় খাটিয়ে মঞ্চ বানানো হয়েছে, সেখানে অল্পবয়সি একটি মেয়ে কবিতা পড়ছিল। মঞ্চের নীচে রাখা দর্শকাসন ফাঁকা, লাইব্রেরিয়ান বলেছিল পাললিকের স্টল মুক্তমঞ্চের ধারেকাছে থাকবে।
টেবিলের সামনের দিকে কাগজে অথবা কাপড়ের ব্যানারে পত্রপত্রিকার নাম লেখা। কোনো কাগজ আবার টেবিলের পেছনে মণ্ডপের কাপড়ে, নিজেদের মাথার ওপর ব্যানার ঝুলিয়ে রেখেছে। স্টলের সারি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পত্রিকার নামগুলো পড়তে পড়তে যাচ্ছি। স্টলের সারি যেখানে এসে বাঁক নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেছে সেখানে দাঁড়িয়ে কয়েকটি স্টল পেরিয়ে দেখতে পেলাম ‘পাললিক আজকালের’ স্টল। হাতে লেখা কাগজের ব্যানারটি মণ্ডপের কাপড়ের সঙ্গে সম্ভবত আঠা দিয়ে আটকানো।
স্টলে একজন তরুণী বসে ছিলেন, কলেজে পড়ার বয়েস হবে। কিন্তু শাড়ি আর ভারী গয়নাগাঁটিতে ভারিক্কি দেখাচ্ছিল। প্রথমেই মাথায় এল ইনিই কি তবে সাধনা পাল? তাহলে পাললিকের সম্পাদক একজন মহিলা, এর সঙ্গে বিশেশ্বর সেনের কী সম্পর্ক থাকতে পারে! স্টলের সারিতে আগের দুটি স্টলে বইপত্তর ঘাঁটবার ভান করে, পাললিকের সামনে এলাম। তরুণীটি বুকের কাছে হাতজোড় করে মুক্তমঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমি টেবিলের ওপর রাখা পাললিকের সাম্প্রতিক সংখ্যা হাতে তুলে নিলাম। এই সংখ্যাটি লাইব্রেরিতে দেখিনি। সুচিতে খেয়াল করেছি—বিশ্বেশ্বরের নাম নেই।
—আচ্ছা আপনিই কি সাধনা পাল? নমস্কার করে জিজ্ঞাসা করলাম। তরুণীটি অপ্রস্তুত হয়ে প্রতি নমস্কার করলেন—না মানে, উনি তো মাসিমা।
আমি ক্ষমা চেয়ে বললাম- কিছু মনে করবেন না দিদিভাই, আমি আপনাদের পত্রিকা নিয়মিত পড়ি। কিন্তু আমারই দুভার্গ্য যে সম্পাদকের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। আপনিই কি সম্পাদক?
তরুণী লাজুক মুখ করে বললেন—সম্পাদক তো আশিসদা, এসে পড়বেন এখনই, বোধহয় টয়লেটের দিকে গেলেন, বা স্মোক করতে।
যাক তবে প্রকৃত সম্পাদকের হদিস পাওয়া গেল। আমি পাতা উলটাতে উলটাতে, যেন গুরুতর কোনো বিষয় নয়, আলগোছে জিজ্ঞাসা করি আপনি ওনার মেয়ে বুঝি?
তরুণীটি খিলখিল করে হাসলেন-আমি ওর ছাত্রী। উনি ভূগোলের টিউশানি দেন।
আমি পত্রিকার দাম মিটিয়ে পাললিকের সাম্প্রতিক সংখ্যাটি কিনলাম। সম্পাদকের ছাত্রী বোধহয় খুশিই হলেন—সম্পাদকের অবর্তমানে তিনি একটি সংখ্যা বিক্রি করতে পেরেছেন। আশিস না আসা পর্যন্ত স্টলের সামনে কোনো একটা ছুতোয় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, ঠিক করে নিয়েছি। আশা করি, সহকর্মীদের নজর আমার ওপর আছে।
—আচ্ছা, একটা জিনিস, আপনাদের পত্রিকায় একজন লেখকের প্রবন্ধ প্রায়ই দেখি, নাম বিশ্বেশ্বর সেন, পশুপাখি নিয়ে লেখেন।
তরুণীটি বোধহয় টেবিলের সামনে আমার মতো একটি নাতি-তরুণের একটানা দাঁড়িয়ে থাকায় বিরক্ত হচ্ছিলেন, আচমকা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন—বললাম না, দাদা টয়লেট গেছেন।
—না না দিদিভাই, আপনার ভুল হচ্ছে, আমি আশিসবাবুর কথা বলছি না। তরুণী চোখ উলটে বললেন—কেন ঢঙ করছেন, আশিসদাই যে ছদ্মনামে লেখেন, জানেন না, একা মেয়ে দেখে ডিস্টার্ব করছেন?
আমি মোক্ষম সূত্রটি পেয়ে চুপচাপ পাললিকের স্টলের সামনে থেকে সরে এসে মুক্তমঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালাম। এখান থেকে পাললিকের স্টল আর তরুণীটিকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আশা করি তিনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না। ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দুই সহকর্মীকে ইশারায় ডেকে নিলাম।
—একটা লোক ওই পাললিকের স্টলে আসবে, মেয়েটার পাশে চেয়ারেও বসবে। টানা দুদিন মনিটর করবে। সব ইনফরমেশান আমার চাই। চোখের আড়াল হতে দেবে না। বুঝতে দেবে না যে ওর পেছনে টিকটিকি লেগেছে। ধড়িবাজ লোক কিন্তু। মেয়েটাকে ইগনোর কর। একটা ফুটপ্রিন্ট পারলে জোগাড় কর। না পেলেও চাপ নেই, পরে কালেক্ট করে নেব। আমি ডিরেকশান দেওয়ামাত্র লালবাজারে তুলে আনবে, আর তোলার সময়, ব্যাকআপ নেবে। এর আগেই যদি পাখি ফুড়ুৎ হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে আমার পারমিশান ছাড়াই তুলে নেবে।
সহকর্মী দুজন তাদের কাজ বুঝে নিয়ে আবার ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন। আমি মুক্তমঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। আধঘণ্টা পর একটি লোক এসে পাললিকের স্টলের সামনে দাঁড়াল। লোকটির পরনে ছিটকাপড়ের সাদা ফুলহাতা জামা, জামার হাতা কনুই অবধি তোলা, গলার কাছে একটা শাল জড়ানো, লোকটা অল্প খোঁড়াচ্ছিল। তরুণীটি লোকটিকে দেখে হাসলেন। লোকটি মিনিট কয়েক স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর টেবিলের পেছনে গিয়ে তরুণীটির পাশের চেয়ারে বসল। আমি লোকটার মুখ আনুমানিক কুড়ি গজ দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি। বয়েস আন্দাজ করি, পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে, কিন্তু মুখের বলিরেখা দেখে যে-কেউ বলবে লোকটার বয়েস সত্তর, চুলে পাক ধরেছে। চেহারায় ক্লান্তি আছে, শীর্ণ হাত জামার হাতার থেকে পাইপের মতো বেরিয়ে আছে।
আমি সহকর্মীদের ইশারায় সম্মতি জানিয়ে, নন্দন চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে আসি। পাখি আমার বানানো খাঁচায় পরে গেছে। পরবর্তী দুদিন সহকর্মীরা অসাধারণ পুলিশি দক্ষতায় পাললিকের সম্পাদক আশিস পাল ওরফে বিশ্বেশ্বর সেনের প্রতিটা পদক্ষেপে নজর রাখছিল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তারা গোপনে কথা বলে মোটের ওপর আশিসের পারিবারিক ডিটেল জোগাড় করে নিয়েছে। প্রতিটি আপডেট আমি লালবাজারে বসে প্রতি আধঘণ্টায় পাচ্ছিলাম। রাতেও তারা আশিসের বাড়ির সামনে থেকে নড়েনি, চৌকিদারের বেশে পাড়া টহল দিচ্ছিল।
আশিস পাল থাকে নৈহাটিতে, আদতে বৈদ্যবাটির সন্তান, শঙ্কর পল্লীতে পৈত্রিক বাড়ি। অল্পবয়েসে নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে, শ্রীরামপুর কলেজের ছাত্র ছিল, ভূগোলের, পড়া অসমাপ্ত থাকে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং অকথ্য নির্যাতন চলে তার ওপর। পাঁচ বছর দমদম সেন্ট্রাল জেলে ছিল। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ভূগোলের টিউশানি শুরু করে। পসার ভালো জমিয়েছিল। পার্টির কর্মকাণ্ড-এ তখন থেকে অনাগ্রহী। বছর সাত আগে দাদাদের সঙ্গে ঝামেলা করে মাকে নিয়ে বৈদ্যবাটির পৈতৃক বাড়ি ত্যাগ করে নৈহাটিতে ভাড়া বাড়িতে উঠে আসে। নৈহাটিতে নতুন করে টিউশানির পসার জমায়। চার বছর হল, পত্রিকাটি বের করছে। মা মারা গেছেন দেড় বছর হল, এখন আশিস একা থাকে। বিয়ে থা করেনি। দাদাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।
আমি দেড় দিনের মাথায় আর তর সইতে না পেরে নির্দেশ দিলাম আশিসকে তুলে নিতে। বাকি গল্পটুকু আশিস পালের পেট থেকে বের করতে হবে।
