চড়াই-হত্যা রহস্য – ৯

মদনপুর থানায় এসে মনে হল সভ্যতায় ফিরে এলাম। আজকের মদনপুরকে শহর বলা চলে। আজ থেকে দুই দশক আগে মদনপুর ছিল গঞ্জ। তবু এই যে থানায় বসে আছি, ট্রেনের শব্দ ভেসে আসছে, থানার কর্মীদের বাইকে করে আসা যাওয়ার শব্দ, ভ্যানরিকশার পোঁ-প্যাঁ, মাথার ওপর পাখা ঘুরছে—সব মিলিয়ে একরকম স্বস্তি দিচ্ছিল। কনস্টেবল এসে চা আর তেলেভাজা রেখে গেছে, বড়োবাবু একটা তদন্তের কাজে বেরিয়েছেন, খবর পাঠিয়েছেন যে তিনি জলদি ফিরে আসছেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। পাড়ুই বড়োবাবুর পাশে নিজের টেবিলে বসে মন দিয়ে কেস ডায়ারি লিখছে। তার কাগজের নীচে কার্বন পেপার। এক কপি ডায়ারি সিদ্ধার্থ কলকাতা নিয়ে যাবে। আমি দেখলাম পাড়ুই-এর টেবিলে একখানি ইংলিশ টু ইংলিশ পকেট ডিকশনারি রাখা।

আমার তবু খচখচানি যাচ্ছিল না। আমি চাকরির পরীক্ষা দিয়ে গোয়েন্দা হয়েছি। গোয়েন্দা হওয়ার জন্য আমাকে ট্রেনিং নিতে হয়েছে, রহস্যোদ্ঘাটনের পদ্ধতি জানতে হয়েছে, রিপোর্ট আর চার্জশিট লেখা শিখতে হয়েছে, সিনিয়ারদের শিক্ষানবিশি করতে হয়েছে। আমাকে নিয়মিত ক্রাইম কনফারেন্স আর বিভিন্ন প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে যেতে হয়। মিস মার্পেলের মতো অভিজ্ঞতাময় জীবন আমার নেই, ফেলুদার জিন নেই, শার্লকের ক্ষুরধার বুদ্ধি নেই, ফাদার ব্রাউনের দৈবিক অনুমানক্ষমতা নেই। আমি ক্লাসের সেই ভালো ছেলেটা, যে সারাদিন পড়ে পাশ করেছে। যতদিন এই গোয়েন্দার চাকরি আছে ততদিনই আমি গোয়েন্দা, যেদিন রিটায়ার করব সেদিন থেকে পেনশানের সুদ খাব, গোয়েন্দাগিরি আর করব না। ভাগ্যক্রমে গোয়েন্দা যখন বনে গেছিলাম, ভেবেছিলাম, আর যাই হোক—চাকুরির পরিচিত ফাঁদগুলিতে পা দেব না। কীরকম ফাঁদ? গোয়েন্দাদের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনার দিকে ঝুঁকে পড়া খুব সহজ, তার ফলে কেসের ক্ষতি হয়! অন্ধ গোয়েন্দাও ভালো, কিন্তু স্বল্পদৃষ্টি বা ট্যারা গোয়েন্দার চেয়ে খারাপ কিছু নেই। ইংরেজিতে যাকে বলে, জাম্পিং ইনটু কনক্লুশানস, অর্থাৎ সমাধানের জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকা। সেটা রহস্য সমাধানের পথ নয়, সূত্র যেমন যেমন সামনে আসবে গোয়েন্দাকে তেমন ভাবে নিজের চিন্তাভাবনা বদলাতে হবে। যেহেতু আমি ট্রেনিং নিয়ে গোয়েন্দা বনেছি, প্রতিটা কেসে একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি ফলো আমাকে করতে হয়। পুলিশের তদন্তপদ্ধতি আমাকে মানতে হয়। আমার ক্ষেত্রে তাই জাম্পিং ইনটু কনক্লুশান আরও ভয়ানক, নিজের মুন্ডুটাকে ভারী হালকা রাখতে হয়। পুলিশি তদন্তের প্রতিটা ধাপে দাঁড়িয়েও চারিদিকে চেয়ে দেখি, ভাবি, আর নিজেকে ক্রমাগত প্রশ্ন করি। বাড়িতে বউ আমাকে দেখে বলে, তোমাকে কী রকম যেন গোয়েন্দা বলে মনে হয় না! আমি বলি—তবে, কী মনে হয়। ও বলে, হয়তো খবরের কাগজের রিপোর্টার, ব্যাংকের ক্যাশিয়ার, এরকম কিছু হলে মানাত। আমি তো সচেতন ভাবে চেয়েছি গোয়েন্দা হতে, কিন্তু গোয়েন্দাগিরি না-ফলাতে। বাড়িতে বউ-এর সামনে তো আরওই গোয়েন্দাগিরি নয়।

পাখিদের খুনি একজন সিরিয়াল কিলার এই তথ্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমি কি একটি সূত্রের দিকে এতই ঝুঁকে পড়েছি যে সূত্রটিকে আমার ধারণার খাপে আঁটাতে না পারলে আমি তা উড়িয়ে দিচ্ছি। মনোজ মণ্ডল বলেছেন যে লোককে তিনি দেখেছেন তার অল্প বয়েস! আমি মানতে পারছি না, তাহলে সুমারই-এর লোক কি চৌখুপির খুনি নয়, তাহলে কী কোনো গ্যাং আছে! মাস-হিস্টিরিয়াই কি তাহলে সত্য? পুলিশ ও খোঁচড়দের নজরের ফাঁক গলে দক্ষিণবঙ্গের গ্রামে গুজবের চোরাস্রোত বইছে!

বড়োবাবুর টেবিলের ওপর রাখা তেলেভাজা আর চা ঠান্ডা হচ্ছিল। সিদ্ধার্থ বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে, চেয়ারের হাতলের ওপর পা তুলে কনস্টেবলের সঙ্গে খোশগল্প করছিল। সে আজ একটা ছোটোখাটো আবিষ্কার করতে পেরেছে।

মজুমদারদের দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আমি যখন সুটি মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম, সিদ্ধার্থ তখন আমবাগানে ফের একবার ঢোকে। দিঘির মাঝ বরাবর কাদা মাটি দেখে তার মনে হয়েছিল আমবাগানের ভেতর এখনও দুদিন আগের কালবৈশাখীর চিহ্ন থাকতে পারে। আমগাছের পাতার ফাঁক গলে রোদ ঢোকে কম। জমা জল থাকবে না, কিন্তু কাদা থাকবে। সিদ্ধার্থ লক্ষ করেছিল, জায়গায় জায়গায় বিক্ষিপ্ত কাদা আছেও। কিছুদূর খোঁজার পর সিদ্ধার্থ বাগানের মধ্যে এমন একটি জায়গায় পৌঁছোয় যেখানে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে কাদা থকথকে। স্পষ্টতই সেখানে মানুষের পায়ের ছাপ আছে। সিদ্ধার্থ চেঁচিয়ে আমাদের ডাকে। সিদ্ধার্থের ডাক লক্ষ করে আমরা পৌঁছে যাই। কাদার ওপর পর পর তিনজোড়া পায়ের ছাপ। সিদ্ধার্থ দেখায়, প্রথম ছাপটি শুকিয়ে এসেছে, শক্ত মাটি। মাটি জুতোর আকারের আভাস দিচ্ছে, চপ্পল জাতীয় জুতো, শুকতলার কাটাকুটি শুকিয়ে কঠিন হয়ে আছে। তার পর আধো শুকনো আধা জোলো দুটি পায়ের ছাপ, বিশুদ্ধ পায়ের, জুতো-পরা পায়ের ছাপ নয়। সিদ্ধার্থ অনুমান করল—খুনির পা বেকায়দায় কাদায় পড়ে গিয়ে থাকবে। জুতো ফেঁসে যায়। ধরে নেওয়া জেতে পারে কাদা সেসময় শুকায়নি, এ অবস্থায় জুতোয় পা গলানো বেশ মুশকিলের হতে পারে। খুনি জুতো ছেড়ে, হাত দিয়ে জুতো তুলে, খালি পায়ে দৌড় দেয়।

আদৌ এই পায়ের ছাপ খুনির কিনা তা নিয়ে আমার মনে এখনও সন্দেহ আছে। কেসে এই মুহূর্তে এতই কম সূত্র রয়েছে যে আমরা পায়ের ছাপকে অগ্রাহ্য করতে পারিনি। সিদ্ধার্থ জায়গাটাকে আমগাছের ছোটো ছোটো ডাল দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। সদর থেকে হ্যান্ড এন্ড ফুটপ্রিন্ট স্কোয়াডের টিম এসে ফুটপ্রিন্ট নেওয়ার চেষ্টা করবে। যদিও ফুটপ্রিন্ট থেকে ফুটপ্রিন্টের মালিকের বয়েস নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না, তবু, পারিপার্শ্বিক তথ্যের ভিত্তিতে যদি এই শেষ-রিপোর্টটি বলে দেয় খুনির বয়েস তিরিশ থেকে চল্লিশ-এর মধ্যে, তাহলে আমাকে মেনে নিতেই হবে মনোজ মণ্ডল কানে শুনে খুনির বয়েস ঠিক অনুমান করেছেন। কিন্তু যদি রিপোর্ট অনুমান করে যে খুনির বয়েস সত্তরের কাছাকাছি, তাহলে সিদ্ধার্থ প্রশ্ন তুলতে পারে, আদৌ এটা খুনির পায়ের ছাপ কিনা!

আমি পাড়ুই-এর টেবিলের সামনে এসে ওয়েবস্টারের ডিকশনারিটা তুলে ‘আই’-এর শব্দ খুঁজছিলাম। নির্দিষ্ট শব্দটাকে খুঁজে পেয়ে, শব্দটার ওপর তর্জনী রেখে সিদ্ধার্থকে বললাম—এখন আমরা যে সিচুয়েশানটায় আছি সেটাকে ইমপাসে’ বলে।

সিদ্ধার্থ হো হো করে হাসল। আমি তাকে বললাম যখন সে আমবাগানে পায়ের ছাপ খুঁজছে তখন সুটি আমাকে খুনির বয়েস সম্পর্কে যা বলেছে।

সিদ্ধার্থ পাত্তা দিল না। বলল-এই সুটির বাপের বয়স কত, পাড়ুইদা?

পাড়ুই টেবিলের ওপরে খুলে রাখা নোট দেখে বলল-নব্বই প্লাস।

সিদ্ধার্থ আমাকে আশ্বস্ত করে বলল—এই বয়েসে লোকের কাছে যে কেউ-ই অল্প বয়েসের।

—সত্তর বছরের খুনি হলেও?

—ইয়েস, হোয়াই নট! সুটির বাপের যখন কুড়ি বছর বয়েস, তখন খুনি জন্মায়নি। একে তুমি বাচ্চা বলবে না তো কাকে বলবে!

আমি সিদ্ধার্থের যুক্তিকে অকাট্য না বললেও, একেবারে উড়িয়ে দিতে পারলাম না।

বললাম—লাস্ট হোপ—ফুটপ্রিন্ট, রিপোর্টটা পেলেই আমাকে জানিও।

সিদ্ধার্থ মাথা নেড়ে পাড়ুই-এর সঙ্গে মদনপুরের মরশুমি সবজি বিষয়ক আলোচনায় ডুবে গেল। ঘড়ির কাঁটা সাতটা পেরিয়েছে। যা অবস্থা শেষ ট্রেন ধরেও আজ শিয়ালদা ফিরতে পারলে বেঁচে যাব। বড়োবাবুর টেবিলের ফোন থেকে বাড়িতে কল করে গিন্নিকে বলে দিলাম রাতের খাবার না রাখাই ভালো। পাড়ুই বার বার বলছিল ফাঁড়ির পেছনে সরকারি পুকুর আছে, জাল ফেলা হয়েছে। রাঁধবার অজুহাতে কনস্টেবল পালাল। আমি বলছিলাম, ব্যাধের সঙ্গে কথাবার্তা সেরে শিয়ালদার ট্রেন ধরাই উচিত কাজ হবে। সিদ্ধার্থ স্বাভাবিক ভাবেই, আমার চেয়ে বেশি ডিপ্লোম্যাটিক, সি আই ডি তে আছে। রাজ্যের নানাপ্রান্তে কাজ নিয়ে যেতে হয়, আমাদের মতো খিদিরপুর থেকে শ্যামবাজারের গণ্ডিতে ঘোরাফেরা নয়। হরেক কর্মী আর হরেক দারোগার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকে চলতে হয়। আমাকে বলল, মদনপুর ফাঁড়ি হলেও, ফাঁড়ি ইনচার্জের সঙ্গে হাত না-মিলিয়ে ফিরে যাওয়াটা অসৌজন্য হবে। ফাঁড়ির পুকুরের তাজা মাছ খাওয়ার লোভটাও সিদ্ধার্থ ফেলতে পারছে না। সে বলল—বড়োবাবু ফিরলে, হাত মেলানোও হয়ে যাবে আর ব্যাধকেও দেখে নেব।

আটটা নাগাদ বড়োবাবুর জিপ এল, ফাঁড়ির কর্মীরা তটস্থ। বড়োবাবুর কামরার বাইরে হইচই থেকে মালুম হয় দর্শনপ্রার্থীরাও নড়েচড়ে বসেছে। এক কোণের টেবিল থেকে উঠে এসে পাড়ুই বড়োবাবুর চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়াল।

ফাঁড়ির দোরগোড়া থেকে নানাজনকে নানারকম নির্দেশ দিতে দিতে শেষপর্যন্ত বড়োবাবু নিজের কামরায় এলেন। মধ্যবয়স্ক, মাথায় টাক, কানের কাছে কলপ করা চুল, নোয়াপাতি ভুঁড়ি। আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বারবার দুঃখপ্রকাশ করলেন, একটি কেসের ব্যাপারে তাকে কল্যাণী থানায় যেতে হয়েছিল; এবং কল্যাণী থানায় তার পদমর্যাদার অফিসারেরাই তার সঙ্গে কত দুর্ব্যবহার করে, কেবলমাত্র রাজনীতির নৌকায় টাল সামলাতে পারছেন না বলে তাকে দারোগা বানানো হল না, ইত্যাদি। তার ব্যাচের অন্তত দশ জন ডিএসপি র‍্যাঙ্কে চলে গেছে আর তিনি এই অজ পাড়াগাঁয়ের ফাঁড়ি সামলাচ্ছেন।

পদমর্যাদায় তার তুল্য হলেও আমি আর সিদ্ধার্থ দুজনেই সিনিয়রিটির নিরিখে তার থেকে দশ-কুড়ি বছরের অন্তত ছোটো। তার হীনমন্যতা আমাদের পীড়া দিচ্ছিল। এসব ছোটো গল্পগাছায় আর মন ছিল না। বললাম-ব্যাধটার সঙ্গে কথা বলা যাক।

—সে কী, এখনও বলেননি! বলে বড়োবাবু পাড়ুই-এর দিকে তাকালেন।

পাড়ুই বলল—বাইরেই দাঁড় করিয়ে রেখেছি।

পাড়ুই হাঁক দিয়ে বলল—অ্যাই ব্যাধটাকে নিয়ে আয়।

বড়োবাবু একটা খাতা টেনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখতে ব্যস্ত হলেন। অনুমান করলাম তিনি আর সি আইডি-এর তদন্তে নাক গলাতে চাইছেন না।

একজন হোমগার্ড ব্যাধকে নিয়ে বড়োবাবুর ঘরে ঢুকল। ব্যাধের নাম উইলফ্রেড মুর্মু, শিমুরালি স্টেশানের কাছে তার চায়ের গুমটি, সকালে আর বিকালে দোকান খোলে। দুপুরের সময়টা সে গ্রামের আদারেবাদাড়ে পাখি ধরে। রোদে পোড়া চেহারা, বারমুডা পরা, গায়ে সস্তার গেঞ্জি, মাথা মুড়িয়ে চুল কাটা, চোখের নীচে গভীর কালো দাগ, হাতে পায়ের অনাবৃত অংশে পুলিশি প্রহারের চিহ্ন। অপরাধ স্বীকার করাবার জন্য ইতিমধ্যে উইলফ্রেডকে পুলিশি আতিথেয়তার সম্মুক্ষীণ হতে হয়েছে। বড়োবাবু নিজের খাতা থেকে চোখ না তুলে বললেন—এখনও জবানবন্দি দেয়নি। কড়া লোক।

সিদ্ধার্থ বলল—প্রিলিমিনারি আইডেন্টিফিকেশান তো হয়নি!

বড়োবাবু অবাক হয়ে ফাইল থেকে মুখ তুলে পাড়ুই-এর দিকে তাকালেন, পাড়ুই তাকে সংক্ষেপে প্রত্যক্ষদর্শীর কথা বলল। বড়োবাবু দৃশ্যতই হতাশ হলেন—অঃ ঠিকাছে, করিয়ে দেব।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম-কেস দিয়েছেন?

—আপনারা আসছেন শুনে এখনও দিইনি। বললেই দিয়ে দেব।

—চব্বিশ ঘণ্টা হয়েছে? সিদ্ধার্থ জানতে চাইল। বিরক্তভাবে। বড়োবাবু চাপ হালকা করতে হাসলেন—আজ সকালে তুলেছি।

পাড়ুই নিজের টেবিলের ড্রয়ার থেকে প্লাস্টিকে মোড়া একটি বস্তু এনে বাড়োবাবুর টেবিলের ওপরে রাখল। বড়োবাবু তার ছন্দ ফিরে পেলেন। উইলফ্রেডকে ইশারায় ডাকলেন। উইলফ্রেডের কোমরে দড়ি, দড়ির অন্য প্রান্ত এক হোমগার্ডের হাতে ধরা। হোমগার্ড দড়ি আলগা করলে, উইলফ্রেড এগিয়ে এসে প্লাস্টিকের মোড়ক খুলে একটি লোহার অর্ধচন্দ্রাকৃতি ধারালো অস্ত্র বের করল, আকারে ইঞ্চি পাঁচেক, হাতল নেই, একপ্রান্তে লাল সুতো জড়ানো।

বড়োবাবু ভ্রূ নাচিয়ে বললেন—মালটার কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করেছি। —ফরেনসিকে পাঠাননি?

বড়োবাবু মাথা নাড়লেন-দুইখানা আঁকশি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। একটা ফরেনসিকে দিয়েছি, অন্যটা আপনাদের দেখাব বলে রেখে দিয়েছি।

বড়োবাবুর পুলিশি কাজে আমি অভিভূত হতে পারলাম না। ব্যাধের কাছে আঁকশি পাওয়া অসংগত কিছু নয়।

বড়োবাবু বললেন—এবাদেও এর ঘরে রেইড করে খান দশ-বারো বিভিন্নজাতের রংবেরঙের পাখি পাওয়া গেছে।

—মরা?

—না জ্যান্ত।

—বন্যপ্রাণী অ্যাক্ট-এ আসছে?

বড়োবাবু মাথা চুলকালেন। পাশ থেকে পাড়ুই বলল—টিয়া, ময়না, তিতির।

আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করবার পূর্বেই উইলফ্রেড ভেঙে পড়ল। আঁকশি দুইহাতে মুঠো করে ধরে সে বড়োবাবুর জুতোয় মাথা ঘষতে ঘষতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। পাড়ুই তাকে টানতে টানতে সরিয়ে আনে।

হোমগার্ড পাঁজাকোলা করে উইলফ্রেডকে দাঁড় করাল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম—পাখি মারিস তুই?

উইলফ্রেড কাঁদতে কাঁদতে বললও-না ছার, পাখি মারি না ছার, জন্মে মারিনি।

পাড়ুই মুখ ব্যাকাল—ব্যাধ আবার পাখি মারে না!

—পাখি ধরি ছার। পাখি ধরে বেঁচি। জন্মে মারিনিকো, এই আঁকশি হাতে নিয়ে বলি।

পাড়ুই উইলফ্রেডকে চড় মারবে বলে হাত তোলে-পাখির মাংস খাস না?

—মুরগির মাংস খাই ছার। পাখির মধ্যে মুরগি।

বড়োবাবুও হেসে ফেললেন। —ছাড় ছাড় পাড়ুই, কলকাতার সাহেবদের সামনে মারধোর করিস না। মদনপুরের থানার বদনাম হবে।

সিদ্ধার্থ গ্লাভস পরে আঁকশিটা উইলফ্রেডের হাত থেকে নিজে নিল।

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আঁকশিটা দেখল, ধার পরীক্ষা করল, তারপর উইলফ্রেডকে লক্ষ করে বলল—পাখি মারিস না তো এইটা কেন?

উইলফ্রেড বলল—এটা দিয়ে পাখি ধরি যে হুজুর। এর ধারে আঠা মাখাই, তারপর আঁকশিকে বাঁশের ডান্ডার ডগায় বেঁধে দিই। যেমনটা আমপাড়ার জন্য বন্দোবস্ত হয়। চুপিচুপি বাগানে টিয়াপাখির পায়ের কাছে আঁকশি নিয়ে গিয়ে ঠেকালে পাখি আটকে যায়। খাঁচায় পুরে বেচি।

সিদ্ধার্থ আঁকশি বেকিয়ে আমাকে দেখাল, আঁকশির ধার ভোঁতা বলেই মনে হল।

—চড়াই ধরিস? জানতে চাইলাম।

—না বাবু, দিব্যি কাটছি, চড়াই কে কিনবে!

উইলফ্রেড মিথ্যা বলছে বলে আমার মনে হল না। বড়োবাবু বললেন—কালকেই তিনি এই আঁকশিটিকেও ফরেনসিকে পাঠাবেন। আমি আর সিদ্ধার্থ দুজনেই একমত হলাম যে উইলফ্রেডকে আটকে রাখার অর্থ হয় না। ফরেনসিকে কিছু পাওয়া গেলে তখন আবার ভাবা যাবে। বড়োবাবু নিমরাজি ছিলেন, তার ধারণা, উইলফ্রেডকে ছাড়লে সে মদনপুর ছেড়ে পালাবে। পাড়ুই মধ্যস্থতা করে দিল। সকাল বিকেল থানায় এসে হাজিরা দিতে হবে—এই শর্তে উইলফ্রেডকে ছাড়া হল। কাগজপত্রে সই করাতে উইলফ্রেডকে নিয়ে হোমগার্ড বেরিয়ে গেল।

আমরাও বড়োবাবুর সঙ্গে তার কোয়ার্টারে চলে এলাম। মদনপুরে তিনি একা থাকেন, স্ত্রী-পুত্র কলকাতাবাসী, বড়োবাবু সপ্তাহান্তে কলকাতা যান। কনস্টেবলের রান্নার হাতটি খাসা। মুরগির মাংস গলা দিয়ে নামল না, পুকুরের তাজা রুইয়ের কালিয়া ভালো জমেছিল। খেয়ে উঠে, বড়োবাবুর জিপে চেপে স্টেশানের উদ্দেশে রওনা দিলাম। পাড়ুই এক হাঁড়ি রসগোল্লা জিপে তুলে দিল। বড়োবাবু হাত নাড়লেন। স্টেশানে পৌঁছে রসগোল্লার হাড়ি জিপের ড্রাইভারকে দিয়ে দেওয়া হল। লাস্ট ট্রেন অবধি অপেক্ষা করতে হয়নি, ভাগ্যক্রমে তার আগের ট্রেনটা পেয়ে গেলাম, বসবার জায়গাও মিলল।

শিয়ালদা পৌঁছে সিদ্ধার্থ জানাল—আগামীকাল সকাল দশটায় ভবানী ভবনে অল-হ্যান্ডস ডাউন ব্রিফিং হবে। আমি আমন্ত্রিত।