গরমকালের ফুলকপি

গরমকালের ফুলকপি

কানাই-এর মনে হল অনেক সময় সহজতম সমাধানটি চোখের সামনে থাকলেও দেখা যায় না। স্কুলে থাকতে দেখতেন, স্কুলের মাস্টারমশায়রা ব্ল্যাকবোর্ডে আঁক কষতে কষতে খেই হারিয়ে ফেলেন, তারপর বোর্ড থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে গোটা বোর্ডখানিতে নিজেই কী লিখেছেন বোঝার চেষ্টা করেন।

সাব-ইনস্পেকটার ভূঁইঞা ফুলকপির কথা জিজ্ঞেস করামাত্র সার্ভার নরেন উৎসাহের সঙ্গে উত্তর দিল- কাল তো স্পেশালে ফুলকপি ছিল!

মেনুর ব্যাপারে নরেন সবচেয়ে ভালো জানে, তার কাজ কাস্টমারদের থেকে অর্ডার নেওয়া। ভুঁইঞা যদিও স্পেশালের উদ্দেশ্য বুঝতে পারল না। মনোহর খোলসা করে বলল- স্যার, রোজই একটা দুটো আইটেম স্পেশাল রান্না করা হয়। যেমন বাজারে মরশুমি সবজি আর মাছ পাওয়া যায় আর কী! অল্প পরিমাণে করা হয়। শুধু মাত্র রেগুলার কাস্টমারদের জন্য। কাল রাতে ফুলকপির ডালনা হয়েছিল।

—বোর্ডে ফুলকপির কথা লেখা নেই কেন? সৌভিক জিজ্ঞেস করল।

—বোর্ডে থাকে না, র‍্যাকের বালতিতে স্পেশাল রাখি না। অল্প করে রাঁধা হয় তো। রেগুলার কাস্টমাররা নরেনকে জিজ্ঞেস করে নেয় ডেইলি কী স্পেশাল। তারপর কেউ স্পেশাল চাইলে নরেন রান্নাঘর থেকে স্পেশাল এনে রেগুলার কাস্টমারদের দেয়।

কানাই বুঝতে পারলেন বালতির স্যাম্পেলে ফুলকপি ডালনা কেন পাওয়া যায়নি। রহস্যের ধরন দেখে তিনি এটাও বুঝতে পারছেন, গতরাতের দুই হতভাগ্য অন্তত ফুলকপির ডালনা অর্ডার করেনি।

সৌভিক তবু একবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য নরেনকে জিজ্ঞেস করল। নরেন বলল–না, কালকের দাদাবাবুরা তো স্পেশাল নেয়নি।

কানাই দিনের সেরা ব্লু-টা পেয়ে গেছেন। ফুলকপি অর্ডার হয়েছিল কি না তার থেকে বড়ো প্রশ্ন ফুলকপি এল কী করে এই গরমের দিনে। কানাই শ্যামকান্তের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন—এই গরমে ফুলকপি কোথায় পেলে?

শ্যামকান্ত উত্তর দেওয়ার আগে মনোহর বলল—স্যার বাবার ভীমরতি। গত কাল সকালে দেখে গলি দিয়ে এক ঠেলাওলা যাচ্ছে, তার ভ্যানে এক গাড়ি ফুলকপি। আমি বললাম, বাবা নিয়ো না, নিয়ো না, কবেকার বাসি শীতের ফুলকপি, ও নিয়ে আর কী হবে! দর চাইলে, গোটা গাড়ি তিরিশ টাকা! একটা ফুলকপি গড়ে পঞ্চাশ পয়সাও পড়বে না। এই শুনে বাবা আর লোভ সামলাতে পারল না। অর্ধেক গাড়ি ফুলকপি কিনে বসল। বলে, ফেলে ছুড়ে যদি দশটা ফুলকপিও ভাল বেরোয় তবেও লাভ। কাস্টমার ধরে রাখার জন্য স্যার। কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না স্যার, মাইরি।

—সেই ফুলকপির ডালনা আছে এখনও? সৌভিক জিজ্ঞেস করল।

—রান্নাঘরে দেখুন, থাকবে, ভাঁড়ারঘরেও কাঁচা ফুলকপি কয়েক পিস আছে। রান্নাঘরের এখন কী কন্ডিশান তো জানিনে।

কানাই আবার তার দলবলকে হোটেলের কর্মচারীদের থেকে দূরে ডেকে নিলেন।

ক্রাইম সিনে তার যা দেখাশুনার ছিল তা হয়ে গেছে। এবার নির্দেশগুলো দিয়ে কানাই নিজে লাঞ্চের জন্য ডেকার্স লেনে যাবেন, বহুদিনের অভ্যাস, দুপুরে ভাত খান না।

প্রথমে পালা সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞার। কানাই তাকে নির্দেশ দিলেন—প্রথমেই খুঁজে বের করো কোন ফেরিওয়ালা ফুলকপি বেচতে এসেছিল। তাকে থানায় তুলে আনবে। সে যদি আর অন্য কোনো পাইস হোটেলে ফুলকপি বিক্রি করে থাকে সেটাও জানা দরকার। সোর্স লাগিয়ে দেখ, জগমোহিনীর সঙ্গে এই লোকালিটির অন্যান্য পাইস হোটেলগুলোর সম্পর্ক কেমন! ব্যবসায়িক কারণে কি শত্রুতা আছে? অবশ্যই সিভিল ড্রেসের স্টাফদের নিয়ে একটা সার্চ চালাও। বেশিদূর যেতে হবে না, এক কিলোমিটারের মধ্যে সার্চ চালাও, যতটা হয়, জানি ম্যান পাওয়ার কম! অন্তত রাস্তার পাশের ভ্যাট, ড্রেন, কেউ বিষের প্যাকেট বা পাউচ ফেলে গেছে কিনা বিশেষ ভাবে দেখবে! তোমার বানানো ইনিশিয়াল রিপোর্টগুলো সৌভিককে দিয়ে যাও। লালবাজারের তরফে সৌভিক তোমার সঙ্গে যোগাযোগে থাকবে, প্রয়োজন পড়লে আমিও যোগাযোগ করতে পারি।

ভূঁইঞা নিজের ব্যাগ থেকে রিপোর্ট বের করে সৌভিকের হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করল—এই সাসপেক্টদের কি করব স্যার? ছেড়ে দেব?

—পাগল হয়েছ নাকি, নেগলিজেন্সি বা ১৪৪-এর কিছু একটা কেস মেরে তিন চার দিন ভেতরে রাখার ব্যবস্থা করো। ভিক্টিম দুজন, সহদেব আর রজনীকান্ত যে বোর্ডিং-এ থাকত, কী যেন নাম—নিউ এজ, হ্যাঁ নিউ এজ-এর দু তিনটে বোর্ডার আর মালিকদের ক্লোজ ওয়াচে রাখো। কানাই বললেন।

ভুঁইঞা স্যালুট ঠুকে শ্যামকান্তদের নিয়ে চলে গেল।

কানাই ফরেনসিকের ফোটোগ্রাফার শিবুকে ডাকলেন। —কাল রাতেই যদি তুই থাকতিস শিবু, খুব ভুল হয়ে গেছে।

—কাল দাদা হুগলির দিকে একটা ইন্সিডেন্টে গেছিলাম। শিবু বলল। কানাই জিজ্ঞেস করলেন-কী ক্যামেরা এনেছিস, ম্যানুয়াল না ডিজিটাল?

—দুটোই আছে, যেটা বলবেন, ৩৫ মিমির ম্যানুয়াল এনেছি, কিন্তু ম্যানুয়ালের ছবি ওয়াশ করতে দুদিন লাগবে দাদা, স্টুডিয়োতে চাপ চলছে।

—আমি বাপু তোদের ওই কম্পিউটারের ধান্দায় নেই। ডিজিটাল জুমে আমার লাভ নেই। তুই বরং ৩৫ দিয়ে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল কিছু ছবি তুলিস, যেন হোটেলের খাওয়ার ঘরটা পুরো দেখা যায়। না হয় ডিজিটালে কয়েকটা টেবিলের ক্লোজ তুলিস।

শিবু ফোটো তুলতে হোটেলের ভেতর চলে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন কানাইচরণ, সৌভিক আর ফরেনসিক এক্সপার্ট ড. মাইতি।

ড. মাইতির দিকে তাকিয়ে কানাই হেসে ফেললেন-জানি দাদা, আপনাকে যত কাজ বলব, অত কাজ আপনার সেকশান করে উঠতে পারবে না। কিন্তু আমার কাজ বলে রাখা। সৌভিক ড্রেনে, রাস্তায়, বেঞ্চে রেড মার্কার ফেলে রেখেছে। সেগুলো একটু স্পেশালি দেখবেন, যদি ব্লাড স্টেইন বা পয়জনের কোনো ট্রেস পান। অন্তত হোটেলের মালিক আর বাকি তিনজনের বডিপার্টসের একটা কেমিক্যাল অ্যানালিসিস হলে ভালো হয়, এদের মধ্যে কেউ কোনোভাবে বিষ বহন করেছিল কিনা সেইটে জানা দরকার। নিউ এজ বোর্ডিং-এর বাকি বোর্ডারদের কেমিক্যাল টেস্টিং-ও হওয়া প্রয়োজন, যদিও সেটা আপনাদের সময়ে কুলোবে কিনা আমি জানি না। ফাইনালি, ফর কনফারমেশান, হোটেলের ঘরের একটা থার্মাল ইমেজার বা এ এল সি কিছু একটা প্লিজ করান। যাতে অন্তত ছেলেদুটো কোথায় খেতে বসেছিল, কোথায় মুখ থুবড়ে পড়ল সেটা কনফার্ম হওয়া যায়।

কানাই-এর আদেশ বা অনুরোধ শুনে ড. মাইতি নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

বাকি রইল সৌভিক; কিন্তু কানাই আর তাকে কোনো নির্দেশ দিলেন না। দুপুর গড়াতে চলল। সৌভিকের পিঠ আলতো করে চাপড়ে কানাই বললেন—চল, আর এখানে থেকে কিছু করার নেই। ডেকার্স লেনে গিয়ে লাঞ্চটা সেরে ফেলা যাক।

কানাইদের টয়োটা কোয়ালিস ছুটল ডেকার্স লেনের দিকে।