লেট নাইট ডবল হোমিসাইড
তিনজনে জগমোহিনী ভোজনালয়ের উলটোদিকের বাড়ির রোয়াকে এসে বসলেন। সৌভিক আর কানাই নেভিকাট ধরালেন, ভূঁইঞা নিতে চাইল না। কানাই একটা টান দিয়ে রোয়াকে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে বললেন—তা বল ভুঁইঞা, একদম শুরু থেকে শেষ অবধি, যতদুর তুমি জানো, যা যা কাল রাতে দেখেছ। এইটে ধরেই বলবে যে আমি কিন্তু কিচ্ছুই জানি না। আর ওই তোমার ইনিশিয়াল রিপোর্ট মুখস্থ করে বোলোনা বাপু। ওই রিপোর্ট আমি পরে পড়ে নেব।
ভুঁইঞা অনেকখানি বাতাস ফুসফুসে নিয়ে বলতে শুরু করল।
—এই যে দেখছেন জগমোহিনী হোটেল, এই অঞ্চলের অনেকদিনের পুরোনো পাইস হোটেল। যেসব স্টুডেন্ট মেসে থেকে পড়াশুনা করে তারা এখানে খেতে আসে, দিনের বেলা অফিস কাছারির লোকজনও খায়। একতলায় হোটেল আর দোতলায় জগমোহিনীরই বোর্ডিং হাউস। চার পাঁচটা ছেলে মেস করে থাকে, জগমোহিনীর কর্মচারীরাও সময়ে অসময়ে থাকে। হোটেলের মালিকের নাম শ্যামকান্ত মাঝি, মালিক কাম ম্যানেজার। তার ঠাকুরদা এই বাড়িটা ভাড়া নিয়ে হোটেল খুলেছিল, তারপর নিজেরাই প্রপার্টিটা কিনে নেয়। আগে কখনও আমাদের কাছে হোটেলের নামে খারাপ কোনোও ইনফর্মেশান আসেনি, এই পাড়াটাও চুপচাপ। নেশাখোরদের একটু উপদ্রব আছে। ছিঁচকে চুরি অবধি, তার বেশি নয়। কালকের ঘটনাটা তাই একেবারেই, যাকে বলে, আনএক্সপেক্টেড। কাল রাত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে দুটি ছেলে জগমোহিনীতে খেতে আসে। ছেলেদুটি মালিকের মুখচেনা, খাতায় খায়। সেই সময় কাস্টমারদের ভিড় ফাঁকা হয়ে আসছিল। এমনিতেই সন্ধের ভিড় দুপুরের ভিড়ের থেকে নাকি কম থাকে। লোকাল ছেলেরা শুধু খায়। ছেলেদুটি তাই আসামাত্র খেতে বসার জায়গা পেয়ে যায়। খাওয়ার ঘরের মাঝখানের টেবিলটিতে মুখোমুখি বসে। আপনি তো স্যার লক্ষ করেছেন, দুজনে একেবারে মুখোমুখি বসেনি, বসেছিল টেবিলের কোনাকুনি। মাছভাতের থালি খাচ্ছিল। এরা ছাড়াও ঘরে আরও গোটা কুড়ি লোক খাচ্ছিল। মনোহর নামে একটি ছোকরা আর নরেন নামে একটা আন্ডারএজ ছেলে খাবার পরিবেশন করছিল। মনোহরকেই জগমোহিনীর ম্যানেজার বলা চলে। শ্যামকান্ত-র একমাত্র ছেলে। শ্যামকান্তের বয়েস সত্তর হবে, ক্যাশে বসে। নরেন মাছ দিয়ে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে দেখতে পায় ছেলেদুটি ভয়ংকরভাবে কাঁপছে, তাদের মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরচ্ছে, চোখ-এর মণি সাদা হয়ে গেছে। আশেপাশের টেবিল থেকে লোকজন উঠে ধরতে যাবে কী যাবে না, ছেলেদুটো থালার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তারপর স্যার, যা হয় আর কী, রোমান মব…উত্তেজিত জনতা…কেউ ছুটেছিল ট্যাক্সি ডাকতে, কেউ পুলিশে খবর দেয়। কেউ আবার মনোহরকে ধরে চড় চাপড় মারা শুরু করে দেয়। অনেক কাস্টমারই এদের পরিচিত। তারা পরিস্থিতি সামলাতে শুরু করে। খাবারে কিছু থাকলে তো আর শুধু দুজন অসুস্থ হবে না। যারা খাচ্ছে সবার হবে। যাই হোক, এর মধ্যেই ট্রাফিক-এর একটা পেট্রোল কার এসে পড়ায় পরিস্থিতি আয়ত্তে আসে। ছেলেদুটো তখনও সেন্সলেস। পেট্রোল অ্যাম্বুলেন্সকে খবর দেয়, ইন দা মিন টাইম আমিও ফোর্স নিয়ে এসে পড়ি আর সঙ্গে সঙ্গে সব উইটনেসকে জগমোহিনী লিভ করতে মানা করে দিই। যারা ট্যাক্সি ডাকতে গেছিল তারাও মিনহোয়াইল ফিরে আসে ট্যাক্সি নিয়ে। ছেলেদুটোকে বি আর সিং-এ নিয়ে যাওয়া হয়। আমি একবার পালস দেখেছিলাম, পাইনি, যাই হোক ফাইনালি হসপিটাল এক্সপায়ার্ড বলে ঘোষণা করে। আমি জগমোহিনী ছাড়িনি। লালবাজারের কন্ট্রোল রুম আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে যে ছেলেদুটো মারা গেছে। আমাকে প্রাথমিকভাবে কী কী করতে হবে কন্ট্রোল থেকে তার একটা গাইডলাইনও দেওয়া হয়েছিল।
—কী কী গাইডলাইন বলেছিল লালবাজার? কানাইচরণ জানতে চান।
—স্যার, ছেলেদুটোর পরিচয় জানতে হবে। ইনিশিয়াল সাসপেক্টদের ধরে রাখতে হবে। ফরেনসিক পাঠাচ্ছিল লালবাজার, তার আগে যেন ক্রাইম সিন কোনোভাবে কেউ নষ্ট না করতে পারে, এইসব। আমি এক এক করে কাজ করা শুরু করে দিই। ছেলেদুটোর পরিচয় হল, দুজনেই লোকাল ল’কলেজের ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। একজনের নাম রজনীকান্ত মন্ডল। বয়েস বাইশ, বাড়ি বাঁকুড়াতে। আর একজনের নাম সহদেব বর্মণ, তেইশ, বাড়ি জলপাইগুড়ি। দুজনেই নিউ এজ বোর্ডিং হাউসে থাকে, রুমমেট, বটুক সমাদ্দার লেন থেকে বেরিয়ে দুটো গলি ছেড়ে ডাইনে ঘুরলে নিউ এজ বোর্ডিং, ওয়াকিং ডিসট্যান্স বলা যেতে পারে। বোর্ডিং-এর ছেলেদের ডেকে পাঠাই, ওদের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তায় বুঝতে পারি, সহদেব আর রজনীকান্ত ইনোসেন্ট ছেলে, পার্টি পলিটিক্স করে না। ড্রাগ অ্যাডিকশানের কোনো প্রবলেম ছিল বলে মনে হয় না। এদিকটা সামলে তারপর স্যার আমি সন্দেহভাজন আর সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। ততক্ষণে মিডনাইট পেরিয়ে গেছে। সবাইকে জগমোহিনীর দোতলায় আটকে রেখেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল যে হয় ফুড পয়জনিং নয়তো খাবারে বিষ মেশানো হয়েছে। আমার সন্দেহ তাই স্বাভাবিকভাবে গিয়ে পড়ে বটঠাকুরের ওপর। বটঠাকুরকে হেল্প করার জন্য দুজন মশালচি আর একটা হেল্পার আছে। বাসন মাজার জন্য দুজন ঝি। কিন্তু দেখলাম বটঠাকুরের ওপর মালিকের অগাধ বিশ্বাস। বটঠাকুরের এই হোটেলে দশ বছরের বেশি হয়ে গেছে। কোনোদিনও অভিযোগ নেই। একটু নেশাটেশা করার দোষ আছে ধরবার মধ্যে কিন্তু তাই বলে খাবারে বিষ মেশাবে সেইটে হবার নয়। এদিকে আবার বটঠাকুর বলছে, অন্য কর্মচারী কেউ বিষ মেশালে তার চোখে ঠিকই পড়বে। বটঠাকুরের চোখ গলে রান্নাঘরে মাছিও গলে না। শ্যামকান্ত আর মনোহরকে জেরা করে জেনেছি সেসময় হোটেলে বিশেষ ভিড়ও ছিল না আর গলিতেও ভিড় পাতলা হয়ে এসেছিল। তাই জানালা দিয়ে কেউ বিষ ছুড়ে দেবে সেটা বেশ অসম্ভব। ছোকরা বয় নরেন বলল, সে এই দুটো লোককে ছাড়া টেবিলে আর কাউকে দেখেনি। দুজন কাস্টমারেরও জবানবন্দি নিয়েছি, তারাও একই কথা বলছে। আমি শেষরাতের দিকে তাই কন্ট্রোলরুমকে জানিয়ে বটঠাকুর, শ্যামকান্ত, মনোহর আর নরেনকে বাদ দিয়ে বাকিদের নাম ঠিকানা লিখিয়ে ছেড়ে দিই। এই চারজনকে থানায় নিয়ে গেছিলাম। এখন আবার নিয়ে এসেছি, গাড়িতে বসিয়ে রেখেছি, আপনি অর্ডার দিলেই নিয়ে আসব।
—গুড। এবার ফরেনসিকের ব্যাপারটা বল, কখন ফরেনসিক এলো আর ক্রাইম সিন তুমি কী রকম দেখেছ?
—স্যার এই জিজ্ঞাসাবাদের মাঝেই ফরেনসিকের একজন আসেন। খুবই বয়েস অল্প তার, আমি আর কিছু জানতে চাইনি, মনে হল কোনো ট্রেনি হবে হয়তোবা। রাতের বেলা কোনো এক্সপার্টকে না পেয়ে কন্ট্রোল তাকে পাঠিয়েছে। সেই ছেলেটিই স্যাম্পেল কালেক্ট করে নিয়ে গেছে। ক্রাইম সিন আমি দেখারই চেষ্টা করিনি। হোটেলের খাওয়ার ঘর, রান্নাঘর আর ছোটোঘর থেকে সবাইকে প্রথমেই সরিয়ে দিয়ে দুটো পুলিশ বসিয়ে দিয়েছিলাম আপনি ট্রেনিং-এর সময় বলেছিলেন স্যার, ফরেনসিক না আসা অবধি এমনকি পুলিশও যেন ক্রাইম সিনে না ঢোকে, যার যেটা কাজ আর কী!
কানাইচরণ সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বললেন—তা খুব ভালো করেছ। কীসের স্যাম্পেল নিয়েছে দেখেছ?
—খুব সিরিয়াসলি কিছু দেখিনি স্যার, ভিক্টিমদের থালাবাসন আর না-খাওয়া গোটা খাবারটাই নিয়ে গেছে। মনে হয়, রান্নাঘরের খাবারের স্টক থেকেও বোধহয় স্যাম্পেল নিয়েছে। আসলে তখন অনেকটা রাত হয়ে এসেছিল, আমারও আর এনার্জি ছিল না। এমনিতেই কাল আমি ওভারটাইমে ছিলাম।
কানাই সিগারেটটা রোয়াকে ঘষলেন, সৌভিককেও তার হাতের সিগারেট ড্রেনে ফেলতে দিলেন না। সৌভিক ভুল বুঝতে পেরে রোয়াকে সিগারেট ঘষল আর ড্রেনের ধারে ফরেনসিকের জন্য একটা রেড মার্ক ফেলে রাখল। কানাইচরণ সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞাকে জিজ্ঞাসা করলেন—সাসপেক্টদের কি অ্যারেস্ট করেছ?
—না স্যার, আপনার পারমিশান ছাড়া আমি কোনো স্টেপ নিচ্ছি না।
—গাড়িতে বসিয়ে রেখেছ বললে না? হাজির করাও।
