জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা
প্যারাডাইস লজ থেকে লালবাজার, ফেরার এই দশ মিনিট পথ সৌভিক আর কৌতুহল ধরে রাখতে পারছিল না। কানাইচরণ শুধু বলছিলেন—এখন আওয়াজ না করে ভাবছি, সব বলব।
লালবাজারে নিজেদের চেম্বারে দুজন যখন ঢেকুর তুলতে তুলতে ফিরে এলেন, কানাই-এর টেবিলের ওপর ফোটোগ্রাফার শিবুর কাছ থেকে আসা একটা পার্সেল জায়গা পেয়েছে। কানাই পার্সেল সরিয়ে রেখে, একটা সিগারেট ধরালেন, সৌভিককেও দিলেন।
জঙ্গলের মধ্যে যখন পথ পাওয়া যাচ্ছে না, –তখন দুটো গাছের মাঝে যদি এতটুকু আগাছাহীন ফাঁক থাকে তার মধ্যে দিয়েই পথের খোঁজ করতে হয়। এই কেসটায় সেই সামান্য ফাঁকটুকু হল ফুলকপি আর ডাল। কানাই সিগারেট খেতে খেতে বলছিলেন। —প্রথম কেসে মৃতদের প্লেটে ফুলকপি কী করে এল আর দ্বিতীয় কেসে কী করে ডাল এল। শুধু এটুকু বুঝতে আমি আজকের গবেষণা করলাম। এই গবেষণার রেজাল্টটা আগে জানান দরকার। কেস রিপোর্টেও এটা লিখতে হবে। প্রথম ক্ষেত্রে একদল লোক খাচ্ছে, এমন সময় বাইরে থেকে একজন এসে তাদের পাতে ডাল ঢেলে দিল। যেই ডাল ঢেলে দিল, ঘটনাটা কিন্তু হোটেলের ওয়েটারদের চোখে পড়েছিল। তারা হইহই করে উঠল। তোর মনে থাকবে, প্যারাডাইসে আমরা খাওয়ার সময় একবার গোল হয়েছিল। তাই এরকম কিছু যদি জগমোহিনী বা নীলুদার হোটেলে হয়ে থাকত, ওয়েটাররা আমাদের বলত। এখনও চাইলে তুই পুলিশ কাস্টডিতে ফোন করে জেনে নিতে পারিস। দ্বিতীয়ত, প্যারাডাইসে একজন সাধারণ লোক খাচ্ছিল, আমার খোঁচড় নিজের খাওয়া শেষ করে লোকটার কাছে যায় এবং বলে এই আমার বাটিতে অনেকটা সবজি রয়ে গেছে আপনি কি নেবেন? লোকটি বেশ বিরক্ত হয়, এবং জানায় যে সে নেবে না। কারণ, হয়তো, লোকটির মনে হয়ে থাকবে, বাটিতে আপত্তিকর কিছু থাকবে, ড্রাগসের কথা মাথায় আসতে পারে, নিউজপেপারে বিষের কথাও নিশ্চয়ই পড়েছে। এই দুই নাটক থেকে বোঝা গেল যে এভাবে বিষাক্ত ফুলকপি অন্যের পাতে পৌঁছোবে না। এইবার এল তৃতীয় সম্ভাবনা। আমার এক খোঁচড় তার খাওয়া শেষ না করে এক আস্ত বাটি ডাল টেবিলে রেখে বিল মিটিয়ে উঠে যায়। দূরের কোণের টেবিল থেকে আমি লক্ষ করি, উলটোদিকের চেয়ারের একজন জেনারেল পাবলিক ডালটা নিজের থালায় নির্দ্বিধায় ঢেলে নিল। মজার ব্যাপার হল, ঘটনাটা ওয়েটারদের চোখেও পড়েনি। চোখে না পড়াটাও স্বাভাবিক, কারণ ওয়েটাররা দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছে, খাওয়ার টেবিল তাদের আই-লেভেল থেকে নীচুতে।
সৌভিক বলল- ঠিক আছে, মেনে নিলাম, একটা জোরালো সম্ভাবনা, হতেই পারে, ওই বিষাক্ত ফুলকপি বা ডাল আসলে আগের লোকের ফেলে যাওয়া এঁটো। নীলুদার হোটেলে এমনটা হয়েও থাকতে পারে, আমরা থার্মোগ্রাফে দেখেওছি যে উলটোদিকে খুন হওয়ার খানিক আগেও কেউ বসে ছিল। কিন্তু জগমোহিনীতে তো উলটোদিকে কেউ ছিল না। ভিক্টিমরা যদি উঠে গিয়ে অন্য টেবিলের ফেলে যাওয়া ফুলকপি নিয়ে আসত, তাহলে তো ওয়েটারদের চোখে পড়ত। ভিক্টিমরা একবার দাঁড়ালে তারা ওয়েটারদের আই লেভেলে চলে আসবে।
—জগমোহিনীতেও টেবিলের উলটোদিকে কেউ ছিল। কিন্তু জগমোহিনীতে থার্মোগ্রাফের সুযোগ না থাকায় আমরা সেটা বুঝতে পারিনি। নীলুদার হোটেলের সার্ভারও কিন্তু প্রথমে অস্বীকার করেছিল উলটোদিকে কেউ বসার কথা! আমার মনে হয়, পাইস হোটেলে সারাদিন এত লোক যাওয়া আসা করছে যে এরা ব্যাচ ধরে ধরে টেবিলের লোকেদের উপস্থিতি মনে রাখে না। মানে আগের ব্যাচের লোকজনের হিসেব আগের ব্যাচেই শেষ। স্মৃতিতে তার কোনো ছাপ থাকছে না। জগমোহিনীতে আমরা যদি থার্মোগ্রাফ করতেও পারতাম, আর তাতে যদি উলটোদিকে কারও উপস্থিতি বোঝাও যেত, তবু আমার বিশ্বাস যে ওয়েটাররা কিছু মনে করতে পারত না, কারণ জগমোহিনী নীলুদার হোটেলের চেয়ে অনেক বেশি খদ্দের পায়।
—এই অবধি মেনে নিলাম, যে উলটোদিকের টেবিলে কেউ বসে ছিল, যে ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার অবশিষ্ট রেখে টেবিল থেকে উঠে যাচ্ছে আর সেই খাবার তুলে নিয়ে খেয়ে, চুরি করাই বলা যায় একে, উলটোদিকের লোক মারা যাচ্ছে। প্রায় বলা যায়, মৃতদের লোভই তাদের মারা যাওয়ার কারণ। কিন্তু আপনি খুনির দিক থেকে এই ব্যাপারটা ভেবে দেখুন। খুনি এখানে প্রত্যক্ষভাবে বিষপ্রয়োগ করছে না, সে বিষ-মাখা খাবার ফেলে যাচ্ছে। কারণ সে পাইস হোটেলের খদ্দেরদের মানসিকতা জানে। যেমন আপনি আগে বলেছেন যে খদ্দেররা দিনের-খাওয়া খেতে আসছে, তারা এঁটো পাত থেকে ফুলকপি তুলে নেবে। কিন্তু নীলুদার হোটেলে ডালে বিষ পাওয়া গেছিল! ভিক্টিম আগের লোকের বাটির ডাল তুলেছিল, অথচ এক্সট্রা ডালের দাম মাত্র দশটাকা। আর এক বাটি ডাল প্রয়োজন হলে সে ওয়েটারের কাছেও চাইতে পারত, চুরি করার প্রয়োজন হত না। খুনি তাই খুন করতে চাইলে ডালে কেন বিষ মেশাবে, সে খাসির মাংসতে বিষ মেশাবে, যেমন জগমোহিনীতে ফুলকপির স্পেশালে বিষ মিশিয়েছিল।
কানাই ফুরিয়ে আসা সিগারেট অ্যাসট্রেতে ঘষে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন—এইখানেই আমরা খুনিকে বুঝতে ভুল করেছি আর খুনিও নিজে মস্ত ভুল করে বসে আছে। আমরা পাইস হোটেলের ব্যাপারে একটি কী দুটি বিষয় জানি বলে খুনিও পাইস হোটেলকে বুঝে নিয়েছে—হয়তো তা নয়। তুই ঠিক বলছিস, নিশ্চিতভাবে খুন করতে চাইলে প্রতিবার স্পেশালে বিষ মেশাবে, তাতে উলটোদিকের লোককে আকৃষ্ট করা সোজা। প্রথমদিন তাই করেছিল, তাহলে দ্বিতীয়দিন কেন রেগুলার আইটেমে বিষ মেশাতে গেল! কারণ অন্যকে খুন করতে সে চায়নি, খুনি চেয়েছিল আসলে নিজেকেই খুন করতে। ইয়েস, এটা সিরিয়াল কিলিং এর ঘটনা নয়, আমার সিদ্ধান্ত, এটা রিপিটেড অ্যাটেম্পট অফ সুইসাইড।
—সুইসাইড?
—হ্যাঁ, খুনি বলব নাকি এবার আত্মহত্যাকারী বলাই ভালো, প্রথমদিন জগমোহিনীতে আসে। মনে মনে ঠিক করে এসেছে আত্মহননের পথ বেছে নেবে। কী কারণে আত্মহত্যা করবে সেটা যদিও আমরা এখনও জানি না। স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর আগে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ আর একবার অনুভব করতে অনেক আত্মহননকারী চায়, বহু কেসে দেখা গেছে। আমাদের কেসেও আত্মহননকারী তার প্রিয় খাবার খেয়ে মারা যেতে চায়। তাই সে সেদিনের স্পেশাল ফুলকপি অর্ডার করে। সঙ্গে ডাল আসে। ডাল খাওয়া শেষ করে। ফুলকপিতে বিষ মেশায়, কিন্তু ফুলকপি আর খাওয়া হয়ে ওঠে না। ইতস্তত করতে থাকে, ইতিমধ্যে টেবিলে অন্য খদ্দেররা এসে পড়ে। আত্মহত্যাপ্রবণ লোকটি উঠে পড়ে। নতুন খদ্দেরদুটি স্পেশালের ফুলকপি দেখে নিজের পাতে লুকিয়ে নেয়। সম্ভবত, ভাতের স্তূপের মধ্যে ফুলকপিগুলো লুকিয়ে নিয়েছিল। এবং পরিণতি যা হয়েছিল, আমরা ইতিমধ্যেই জানি। আত্মহত্যাপ্রবণ ছেলেটি সম্ভবত স্থানীয় ছেলে, তার কানে এই মৃত্যুর কথা চলে গেছে। হয়তো সে আপশোশ করে, কিন্তু সে তো নিজের প্রাণ নিতে বদ্ধপরিকর! তাই সে অন্য একটি হোটেলে যায়—নীলুদার হোটেল। এইবার সিদ্ধান্ত নেয়, কোনো কারণে ফের যদি তার উদ্যোগে খামতি থেকে যায়, সে আর স্পেশালে বিষ মেশাবে না, সে বিষ মেশায় মামুলি ডালে। স্পেশাল খায়, খাসির মাংস, মৃত্যুর আগে খাসির মাংস খেয়ে নিজেকে হয়তো শেষবারের মতো সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে। বোধহয় পাইস হোটেলের খাসির মাংসের এমন কোনো গুণ আছে যা মৃত্যুমুখী মানুষকেও জীবনে টেনে আনে। লোকটির আর ডাল খাওয়া হয় না। এবারের মতোও মনোবাসনা ত্যাগ করে উঠে পড়ে। কিন্তু যেটা এই খুনি বুঝতে পারেনি, যে সামান্য ডালও পাতে তুলে নেওয়ার লোক পাইস হোটেলে আছে।
সৌভিক মাথা নাড়ল—কেস দাঁড়িয়ে গেছে, একটাই প্রশ্ন, বিষ কী করে হোটেলে নিয়ে এল? তোমার মনে হয় না, রাইস ট্যাবলেটের পুরিয়া খুলে হোটেলে বসে ডালে মেশালে সেটা কিছু লোকের চোখে পড়ত?
অনভ্যাসের ভাতডাল খেয়ে কানাইচরণের দিবানিদ্রা পাচ্ছিল, হাই তুলতে তুলতে তুড়ি দিয়ে বললেন—জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ আপাতত পাওয়া গেছে, সেই পথে কে গেল, সেইটে বোঝা বাকি! আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার আন্ডারে কতগুলো পাইস হোটেল আছে? সবগুলোকে ওয়াচে রাখা যায় কি?
—কোনোদিন থানায় পোস্টিং পেলে বুঝতেন, শ-দেড়েক পাইস হোটেল আছে ওই চত্বরে, কতগুলো স্কুল-কলেজ আছে বলুন তো! কলকাতা ইউনিভার্সিটি আছে!
—আমার ধারণা, এত বার ভুলের পরেও লোকটি থামবে না, সুইসাইড-এর অ্যাটেম্পট নেবেই, যতক্ষণ না সাকসেসফুল হচ্ছে।
সৌভিক বলল-আমি এক্সট্রা কয়েকটা পেট্রোল কার পাঠানোর ব্যবস্থা করছি নজরদারির জন্য।
—তাই কর বাপ, সিপিসাহেবকেও বলে-টলে রাখিস, আমি আর চোখ মেলে থাকতে পারছি না। বলতে বলতে কানাই দিবানিদ্রা দিলেন।
