জগমোহিনী ভোজনালয়

জগমোহিনী ভোজনালয়—দিবারাত্র থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

বটুক সমাদ্দার লেন উত্তর কলকাতার আর পাঁচটা মাঝারি মাপের গলির থেকে কোনো ভাবে আলাদা নয়। উত্তরে মাইলটাক এগিয়ে গেলে শিয়ালদহ স্টেশন, দক্ষিণে কলেজ স্ট্রিট। তার মাঝে আপাত শান্ত গলি, গলির একদিকে ত্রিফলা আলো বসেছে, আর একদিকে খোলা নর্দমা। গলির দুদিকে রং উঠে যাওয়া দোতলা বাড়ির সারি। গলিতে বড়ো গাড়ি ঢুকতে পারবে না, মোটরসাইকেল বা মারুতি ঢুকে যাবে। কানাইচরণদের কোয়ালিস গলির মুখে এসে দাঁড়াল। সৌভিক গাড়ির ভেতর বসে ফরেনসিক এক্সপার্টের সঙ্গে ফোনে ঝগড়া করছিল। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের নিজস্ব ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফরেনসিক সহায়তা সেলের বিশেষজ্ঞকে সে তলব করেছিল। কিন্তু তারা এখনও লালবাজার থেকে রওনা হতে পারেনি। সৌভিক তাদের শেষবারের মতো তাগাদা দিয়ে ফোনটা কেটে দিল। কানাইচরণ কোয়ালিস থেকে নেমে পড়লেন। গলির মুখে কৌতূহলী মানুষের ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে কানাই এগুলেন, গলির মুখে কলকাতা পুলিশের পেরিমিটার টেপ দেওয়া, একজন কনস্টেবল পাহারা দিচ্ছে। কানাইচরণ আর সৌভিক পেরিমিটার টেপ তুলে গলিতে ঢুকলেন। গলির মধ্যে মানুষের চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একজন বিনা উর্দির পুলিশ-কর্মী কানাইচরণকে দেখে হাসি হাসি মুখ করে এগিয়ে এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল- স্যার আমি সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা। আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার থেকে এসেছি। আমি আপনাকে চিনি কিন্তু। ট্রেনিং-এর সময় ক্লাস নিয়েছিলেন।

কানাইচরণ ভুঁইঞাকে জিজ্ঞেস করলেন—ফার্স্ট রেস্পন্ডার কে ছিলেন?

—স্যার, গণ্ডগোলের খবর শুনে, প্রথমে একটা পেট্রল ভ্যান এসেছিল। তারপরই আমি ফোর্স নিয়ে চলে আসি। সিচুয়েশান বুঝে আমি আমাদের থানার বড়োবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। কন্ট্রোল রুমের সঙ্গেও কথা হয়। আমাকে কয়েকটা নির্দেশ দেওয়া হয়, আমি সেগুলো পালন করেছি যথাসাধ্য।

—ইনভেস্টিগেটিং অফিসার কে ছিল?

—কেসটা আপনার কাছে যাবে বলেই বোধহয় আর লোকাল থানার কাউকে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার-এর চার্জ দেওয়া হয়নি।

কানাইচরণ সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞাকে পেছনে রেখে গলির মধ্যে এগুলেন। দুদিকের বাড়ির জানালাগুলিতে মুখের সারি। সেদিকে একবার তাকালেন। তারপর ভূঁইঞাকে বললেন—সাইডে সরে এস। ফরেনসিক আসবে। ভূঁইঞা বড়ো পদক্ষেপ ফেলে রাস্তার যেদিকে লাইটপোস্ট সেদিকে চলে এল। সৌভিক কানাই-এর নির্দেশ বুঝে পকেট থেকে একটা গোল লাল কার্ড বের করে রাস্তার ওপর ফেলে রাখছে। ফরেনসিকের লোক এসে ফুটপ্রিন্ট আর অন্যান্য নমুনা সংগ্রহের কাজ করবে। অলটারনেট লাইট সোর্স বা এ এল সি পেন চাঁদনির বাজারে ঘুরলেও পাওয়া যাবে। এ এল সি পেন-এর আলো ফেলে ফরেনসিক প্রাথমিক ভাবে দেখে নেবে, তারপর দরকার মতো আরও পরীক্ষাও করতে পারে।

ভুঁইঞা হাতের ফোলিও ব্যাগ থেকে কাগজের তাড়া বের করে বলল—একটা প্রাথমিক রিপোর্ট বানিয়েছি স্যার, শুনবেন?

—পরে শুনব, আগে ক্রাইম সিনটা দেখে নিই। কোন বাড়িটা?

—আর দুটো বাড়ি ছেড়ে, বাঁ দিকে, সাইনবোর্ড আছে একটা।

কানাই দ্রুতপায়ে দুটো বাড়ি টপকে একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাড়ির দেয়ালে শ্যাওলা পড়েছে, চুনসুরকি খসে গিয়ে বটের চারা গজিয়েছে। এককালে বাড়িটির নিশ্চয়ই রং ছিল এখন দেয়ালে কেবল সবজেটে ভাব। রাস্তার পাশ থেকে বাড়ির দেয়াল শুরু হয়ে গেছে। কোনো বারান্দা নেই। লম্বা লম্বা জানালাওয়ালা চৌকো ঘর। কানাইচরণ সানগ্লাস খুলে প্রধান দরজার ওপরে তাকালেন। একটি কাঠের সাইনবোর্ড ঝুলছে। তাতে লেখা জগমোহিনী বোর্ডিং হাউস এন্ড ভোজনালয়।

.

বাড়ির সদর দরজাটি কানাইচরণের উচ্চতার থেকে চার ইঞ্চি ছোটো। তিনজনে মাথা বাঁচিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলেন। কানাই দেখলেন যে ঘরটিতে তারা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন সেটি দৈর্ঘ্যে প্রস্থে ছয় ফুট বাই আট ফুট। আদতে একটি সিঁড়িঘর, দোতলায় উঠবার পাকা সিঁড়ি উঠে গেছে, সিঁড়ির নীচে মিটার বক্স, দলাপাকানো ইলেকট্রিক তারের জটাজুট। অবশিষ্ট অপ্রশস্ত প্যাসেজে একটি কাঠের বেঞ্চি রাখা। কানাই আন্দাজ করলেন দোতলায় বোর্ডিং হাউস, এই সিঁড়িঘরটি জগমোহিনী হোটেলের ওয়েটিং রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কাঠের বেঞ্চিটি সেই সাক্ষীই দিচ্ছে। সৌভিক কাঠের বেঞ্চের ওপর ফরেনসিকের জন্য আর একটি রেড কার্ড ফেলে রাখল।

সিঁড়িঘরের অন্ধকার দূর করতে দিনের বেলাতেও বাল্ব জ্বালাতে হয়েছে। বেঞ্চ যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে আর একটি দরজা, উচ্চতায় আগেরটির থেকেও ছোটো। দরজা আগলে পাহারা দিচ্ছে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার দুই কনস্টেবল। তারা কানাইদের দেখে সেলাম ঠুকল। কানাইও পালটা সেলাম ঠুকে সিঁড়িঘরের লাগোয়া এই একমাত্র দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখলেন পাইস হোটেলের খাওয়ার ঘর। এই ঘরটি আকারে প্রকারে বেশ বড়ো, বলা যেতে পারে বাড়িটির অধিকাংশ জায়গা জুড়েই এই ঘরটি। ঘরের মধ্যে চৌকো, কাঠের টেবিল রয়েছে দশটি। এক একটি টেবিলে চারজন বসে খেতে পারে। টেবিলের সঙ্গে ফোল্ডিং চেয়ার আছে, কানাই ঝুঁকে দেখলেন চেয়ার আর টেবিলগুলি লোহার শিকল দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে রাখা—চুরি যাওয়ার ভয়ে। দরজার পাশে হোটেলের মালিক বা ম্যানেজারের বসার উঁচু একটি কাঠের চেয়ার আর স্ট্যান্ড। স্ট্যান্ডের ওপর হাতবাক্স রাখা। ঘরটির অন্যপ্রান্তে আরও দুটি দরজা রয়েছে। সেগুলি দিয়ে গেলে বাড়িটির পেছনের দিকে যাওয়া যাবে। কানাই ভূঁইঞাকে জিজ্ঞেস করলেন—ওই ঘরদুটো কীসের?

—একটা রান্না ঘর, আর একটা ছোটো ডাইনিং রুম, সেখানে মাটিতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। মালখানা রান্নাঘরের সঙ্গে।

কানাই ফের ঘরখানা খুটিয়ে দেখলেন। ঘরের দেয়াল জুড়ে মনীষীদের ছবি—নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ। পুরোনো দিনের সুইচবোর্ড, ওপেন ইলেকট্রিক ওয়ারিং। ঘরের যে দেয়ালটি রান্নাঘরের দিকে সেই দেয়ালে প্রমাণ সাইজের দুটি জানালা। সেই জানালা দিয়ে এতটাই আলো আসছে যে এই ঘরে দাঁড়িয়ে সিঁড়িঘরটিকে অন্ধকার বোধ হচ্ছে। কানাই হোটেলটির যাওয়া-আসার পথ আর একবার ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করলেন। হোটেলটিতে দশ চারে চল্লিশজন লোকের বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ভিড়ের সময় আরও কিছু লোক মাটিতে বসে খেতে পারে। লোক বেশি হলে সিঁড়িঘরে বেঞ্চ রয়েছে, সেখানে চেপেচুপে বসলে পাঁচ জনের জায়গা হবে। অপ্রশস্ত গলিতে জনাচারেক লোক দাঁড়িয়ে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করলে যাওয়া-আসার পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। কেউ যদি খেতে আসে, সে বটুক সমাদ্দার লেন থেকে মাথা বাঁচিয়ে জগমোহিনীর সিঁড়িঘরে প্রথম ঢুকবে। ভিড় থাকলে, বাম হাতের কাঠের বেঞ্চিটিতে বসে অপেক্ষা করবে। তারপর ডাক এলে, উঠে এগিয়ে গিয়ে বামহাতের দরজা দিয়ে খাওয়ার ঘরে এসে ঢুকবে এবং একটি চেয়ার দখল করে বসবে। রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে পরিবেশক এই ঘরে এসে ঢুকবে ও পরিবেশন করবে। খাওয়া হলে লোকটি উঠবে, কারণ তাকে বিল মেটাতে হবে। বিল না মিটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই যেহেতু খাওয়ার ঘরের দরজা আগলে ম্যানেজার বা মালিকগোছের কেউ একজন বসে আছেন। সেই ম্যানেজার খদ্দেরের থেকে টাকা নিয়ে, নিজের ক্যাশবাক্সে পুরবে, এর পর খদ্দেরটি যে পথে এসেছিল সেই পথেই চলে যাবে। সুতরাং, ক্যাশবাক্স আগলে যে বসে আছে, সে গোটা ডাইনিং রুমটিকে দেখতে পাচ্ছে, কারা ডাইনিং রুমে ঢুকল আর বেরুল এইটেও তার জানা। কিন্তু সে শুধু জানে না, ভিড়ের সময়, সিঁড়িঘরে কারা বসে অপেক্ষা করছে। আর কারাই বা ভুখা পেটে বটুক সমাদ্দার লেনে দাঁড়িয়ে চেয়ার-টেবিল ফাঁকা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। কানাইচরণ হোটেলের অর্গানাইজেশান বুঝতে পেরে আংশিক সন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু মনে হল, একটা অংশ তবু যেন বলা হল না। এবার তাই মনে মনে না ভেবে তিনি ভূঁইঞার দিকে তাকিয়ে ফের গোটাটা আর একবার বললেন। পাশ থেকে সৌভিক সব শুনে বলল—সব ঠিকই আছে। কিন্তু যারা খেয়ে উঠল তারা হাত কোথায় ধোবে?

কানাই আপশোশ করে বলে উঠলেন—ইস, তাইতো, বেসিনেও একটা রেড মার্ক ফেলিস।

ভুঁইঞা বলল—ওই বসে খাওয়ার ঘরে একটা বেসিন আছে স্যার। জলের কানেকশান আছে। প্লাস রান্নাঘরের মেঝেতে একটা টেপাকল পোঁতা আছে। এ বাদে আর জলের লাইন দেখিনি।

সৌভিক গেল জলের লাইনগুলিতে রেড মার্ক মারতে। কানাইচরণ হোটেলের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলেন। মেঝেময় ভাতের টুকরো, ডালের দাগ, রান্না করা সবজির অংশ পড়ে আছে। রাতে মেঝে মোছার সুযোগ স্বাভাবিক ভাবেই হোটেলের কর্মচারীরা পায়নি। কানাইচরণ আরও ঝুঁকে টেবিল আর চেয়ারের সারির মধ্যে দিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। খালি চোখে বিশেষ কিছু দেখতে পেলেন না। কোথাও রক্তের দাগ নেই। পিঁপড়ের সারি দেখতে পেলেন, বাসি খাবার খেতে এসেছে। ইঁদুরও থাকতে পারে, মানুষের পায়ের শব্দ পেয়ে লুকিয়েছে। কানাই উঠে দাঁড়িয়ে এইবার চেয়ার-টেবিলগুলির দিকে তাকালেন। টেবিলের অবস্থা মেঝের থেকেও খারাপ। থালা, বাটি আর গ্লাস ছড়িয়ে আছে টেবিলের ওপর, অর্ধভুক্ত খাবার শুকিয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। খোলা জানালা দিয়ে মাছি এসে ভনভন করছে। কানাইচরণ সৌভিকের কাছ থেকে লেটেক্স-এর দস্তানা চেয়ে নিলেন। সৌভিক নাক উঁচু করে গন্ধ শোঁকবার চেষ্টা করল। খাবার পচে যাওয়ার গন্ধ পেল। কানাইচরণ বাকিদের এগোতে মানা করে কেবলমাত্র নিজে এগিয়ে গেলেন ঘরের মাঝামাঝি একটি টেবিলের দিকে। এই টেবিলটি দূর থেকে তার চোখে পড়েছিল। অন্যান্য টেবিলের মত বাসি থালাবাসন এই টেবিলে নেই। কানাই দুই লাফে এসে দাঁড়ালেন টেবিলটির পাশে। টেবিলের ওপর কোনাকুনি চক দিয়ে দুটো গোল দাগ দিয়ে রাখা। কানাই ভুঁইঞাকে জিজ্ঞেস করলেন—ভিক্টিমরা এই টেবিলে বসেছিল?

—হ্যাঁ স্যার, মুখোমুখি, কিন্তু সাইড করে। মার্ক করে রেখেছি।

সৌভিক জানতে চাইল—কোনো গ্যাসের লাইন এই বাড়ির ওপর দিয়ে গেছে কি?

—কাল রাতে দেখে তো মনে হল না। আর একবার ভালোভাবে চেক করতে হবে। ভূঁইঞা জানাল।

কানাই দরজার দিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। নিজের হাত মাটির আনুভূমিক অবস্থায় এনে আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন জানালার গ্রিল ছোঁবার। ব্যর্থ হলেন। সৌভিক বলল–ফুট চারেক-এর ডিস্টেন্স হবে, জানালা থেকে টেবিলটার। আর তাছাড়া জানালার পাশে আরও একটা টেবিল আছে!

কানাই ফের দুই লাফ দিয়ে পুরোনো অবস্থানে ফিরে এসে দাঁড়ালেন, ঘরে ঢুকবার দরজার পাশে। ভূঁইঞা জিজ্ঞেস করল—রান্নাঘরটা একবার দেখবেন স্যার?

কানাই মাথা নাড়লেন—পরে, আগে ফরেনসিক আসুক। তারপর আরও একবার ভালো করে দেখে নেব। এখন বাইরে চলো।