১৩
লালবাজারের রেকর্ডস সেকশান নকশাল আন্দোলন চলাকালীন ও পরবর্তীকালের পুলিশি ধরপাকড়ের ফাইল আমার টেবিলে পাঠিয়ে দিল। যারা ধরা পড়েছিল তাদের বেশিরভাগই জেল খেটেছেন, বেশ কিছুজন মুচলেকা দিয়ে সাতাত্তরের আগে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন, অনেকের জেল থেকে বেরোতে আশির মাঝামাঝি হয়ে গেছে। শত শত পাতার ফাইল দেখে আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। এই রেকর্ডটি যারা বানিয়েছেন তারা নমস্য ও রসিক, ফাইলের ওপরে একপাতা হাতে-লেখা নোট রয়েছে-
ইহা ১৯৬৮ থেকে ১৯৮২-এর সময়কালে নকশাল আন্দোলন সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় ধৃত অপরাধীদের তালিকা হইলেও, যিনি এই তালিকাটি ভবিষ্যতে দেখিবেন, এটি মাথায় রাখিবেন, পুলিশি নথির বাইরেও বহু ধরপাকড় হয়েছিল। যাহাদিগকে শেষ অবধি আদালত অবধি পৌঁছান গিয়াছিল ইহা তাহাদের তালিকা। যাদের সেই সৌভাগ্য হয়নি, সেই সকল নাম এইখানে পাওয়া যাবে না। পুলিশের এনকাউন্টারে মৃতদের তালিকা এবং নিখোঁজদের নামও পাওয়া যাবে না। ধন্যবাদান্তে—আর জি
রাজনৈতিক আন্দোলনে ধরা পড়া লোকেদের অপরাধী’ বলা রাজনৈতিকভাবে সঠিক কিনা বলতে পারব না। কিন্তু ঢাউস ফাইলটি অচিরেই আমার মাথাব্যথার কারণ হল। পাতা উলটে বুঝতে পারলাম বহু নাম একাধিকবার এসেছে, কারণ তারা একাধিকবার ধরা পড়েছে। অনেককে যেসব মামুলি ধারায় কেস দেওয়া হয়েছে তাতে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এনারা নকশাল আন্দোলনে ছিলেন। আমার ধারণা পাতি চোর-জোচ্চোরদের নামও এই তালিকায় ঢুকে গেছে। তা-বাদে ফাইলের ওপরে তৎকালীন কর্তার স্বীকারোক্তিটি তো আছেই। এতসব মেনে নিয়েও এই শ্রমসাধ্য কার্যে প্রবৃত্ত হলাম। এখন যেটা মূল প্রশ্ন দাঁড়াল, এত নামের ভিড়ে কাকে খুঁজব আর কী খুঁজব! দুটি নাম এখনও অবধি এই তদন্তে আমার সামনে এসেছে—এক, বিশু আর দুই মধুসূদন চক্রবর্তী। বিশুর পদবি জানা নেই। যেহেতু বর্তমান ফাইলটি এক অর্থে ক্রিমিনাল রেকর্ডস, তাই ধৃতদের অপরাপর নামও নথিভুক্ত হয়েছে। কারওর ডাকনাম বিশু কিনা সেইটে দেখা যেতে পারে। মধুসূদন, মধু, মধুময় সবই দাগাব, অন্যদিকে বিশ্বজিৎ, বিশ্বরূপ মিলিয়ে একটা তালিকা বানানো যেতে পারে। লাইব্রেরির তালিকায় মধুসূদন চক্রবর্তী নামের কেউ নেই, সুতরাং এই তালিকার সঙ্গে সেই পুরোনো তালিকাটি মিলিয়ে লাভ হবে না। মধুসুদন চক্রবর্তী বা বিশু যদি ফল অফ আ স্প্যারো বা চড়াই উতরাই’ পড়েও থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে সে স্থানীয় কোনো লাইব্রেরি থেকে বইটি তুলেছে। লাইব্রেরির তালিকা মাথা থেকে সরিয়ে সাম্প্রতিক তালিকায় মন দিলাম।
যত তাড়াতাড়ি ফাইলটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, ক্লাস্তিও তত তাড়াতাড়ি গ্রাস করল। এই বিপুল করণিক কাজ করার ধৈর্য আমার কোনো কালেই ছিল না। অলিন্দে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খেয়ে মাথা হালকা হল। ফের পাতার পর পাতা আঙুল দিয়ে দিয়ে ধৃতদের তালিকা পড়ছি, তাদের শারীরিক বর্ণনা আর অপরাধের বর্ণনা পড়ছি, বিচারকের রায় দেখছি। মতিদা ঘরে ঢুকলে তার দিকে একগোছা পাতা এগিয়ে ধরে বললাম- খুঁজে দেখুন তো বিশু বা মধুসুদন চক্রবর্তী নামে কেউ আছে নাকি।
মতিদা গ্রাহ্য না করে, ফাইলের প্রথম পাতাটা উলটে দেখলেন।
—নকশালবাড়ি ডকুমেন্ট, পাখি এসে নকশালবাড়িতে বসেছে তাহলে…।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম—অন্য কোনো উপায় থাকলে বলুন।
—কী ইনফরমেশান চাই?
—ওই যে দুটো নাম বললাম সে নামে কেউ ছিল কিনা!
মতিদা জানতে চাইলেন—নকশাল পার্টির অফিসে ফোন করে জিজ্ঞাসা করছিস?
কাজের সময় লোকটার রসিকতা অসহ্য লাগে।
—সেটা কী আর একটা দুটো পার্টি!
মতিদা গম্ভীরভাবে বললেন—ঠিক ঠিক, সাতাত্তরের পর থেকে কতবার যে ভেঙেছে আর কতবার যে জুড়েছে, তার কোনো হিসেব আছে! আবার এক পার্টির ভেতরে এই গ্রুপ, ওই লাইন, ওই সাব-গ্রুপ, নিজেরাই বা কী করে মনে রাখে বলত?
—ভেতরে লোক আছে?
মতিদা হা হা করে হাসলেন, বললেন—ক্ষেপেছিস, খোঁচড়! তাও নকশাল পার্টির ভেতরে! যেদিন ঢোকাতে পারব সেদিন রাষ্ট্রপতির পুলিশ অ্যাওয়ার্ড আমার কপালে, দেখে নিস। গোপনীয়তা আর ঘেটোশিপের ব্যাপারে এরা নটোরিয়াস। কাউকে ঢুকতে দেবে না, পুলিশকে তো আরওই না। অথচ দ্যাখ, সেই যুগ থেকে আজকের টাইমে আমাদের ফেস কত পালটে গেছে। বলে মতিদা নিজেই নিজের থুতনি নেড়ে বললেন—এখন আমাদের কত সুন্দর হিউম্যান ফেস!
আমি তর্জনী দিয়ে নাম মেলাতে মেলাতে বললাম—এখন নকশাল মুভমেন্ট হলে তাহলে চারুবাবু আর সরোজ দত্তকে মরতে হত না?
মতিদা উত্তর দিলেন না, বুক পকেট থেকে তার বিখ্যাত নোটবই বের করে, একটা কাগজ ছিঁড়ে তাতে খসখস করে লিখে আমার সামনে রাখলেন, বললেন—আধাঘণ্টা নিদ্রা দেব, জ্বালাসনি!
আমি কাগজটা তুলে দেখি তাতে লেখা—অনিকেত দাশগুপ্ত, সি আই টি হাউজিং।
—কে এই লোক? অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
—এক্সপেল্ড নকশাল। জেল খেটেছেন। এখন রিসার্চ করেন, সাবজেক্ট বিবিধ—নকশাল আপরাইজিং, সোশ্যালিজম এটসেটরা, কিন্তু তোর আসল পরিচয় দিস না যেন। বলে মতিদা মুখের ওপর রুমাল দিয়ে তন্দ্রা গেলেন।
মতিদার কথামতো পুলিশের পরিচয় গোপন করে পরদিন সি আই টি আবাসনে অনিকেত দাশগুপ্তের ফ্ল্যাটে দুপুর বারোটা বাজার আগে-আগে উপস্থিত হলাম। নকশাল ধরপাকড়ের ফাইল পড়বার সময় একটা নামে চোখ আটকেছিল—সহজ সেন, বয়স ২২, বাড়ি বারুইপুর, ধরা পড়ার সাতদিনের মাথায় দমদম সেন্ট্রাল জেলের হাসপাতালে মারা যায়। বেঁচে থাকলে সহজ সেনের বয়স আমার বড়দার বয়সি হত। আমি সহজ সেনের ভাই সাজলাম, সেই মতো একটা আই-কার্ড বানানো হল। নকশাল ফাইল থেকে সহজ সেন সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে দু-তিনপাতার একটা কাল্পনিক ফাইল বগলে রইল। পুলিশের ফিটফাট জামা কাপড় ছেড়ে জিন্স আর পাঞ্জাবি গায়ে চাপালাম, কাঁধে ঝোলাব্যাগ।
তিনতলায় অনিকেত দাশগুপ্তের ফ্ল্যাট। কলিংবেল টেপবার পর এক বৃদ্ধ দরজা খুললেন, তার এঁটো হাত, বুকের কাছে ধরা। ঘোলাটে চোখ, দড়ি আঁটা চশমা বুকের কাছে ঝুলছে, নাক উঁচিয়ে জানতে চাইলেন—কাকে চান?
আমি ঢোঁক গিলে জিজ্ঞাসা করি—অনিকেত দাশগুপ্ত?
—আমিই, কী চাই বলুন?
—রিসার্চের ব্যাপারে কিছু সাহায্য দরকার ছিল।
ভদ্রলোক বিরক্তিসহকারে বললেন—কী রিসার্চ?
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই দরজা ছেড়ে দিয়ে বাঁ-হাত তুলে ঘরের অন্য প্রান্তে রাখা সোফাটি দেখালেন—ওইখানে বসুন, আসছি।
আমি অনিকেতের পেছনে দরজা ভেজিয়ে সোফায় এসে বসলাম। সোফাময় বই, বইয়ের ওপর বই, আলমারিতে বই, বইয়ের সেলফে বই, খাটিয়ার ওপর বই, ডাইনিং টেবিলের ওপর বই, সেই টেবিলের প্রান্তে সবেধন নীলমণি চেয়ারটিতে গুটিশুটি মেরে বসে অনিকেত ভাত খাচ্ছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে একবার বললেন—খেতে বললাম না, মাসি একজনের রান্না করে দিয়ে যায়।
অনিকেতের গলার স্বরে রুক্ষতা আছে, অথচ আন্তরিকতাও অস্পষ্ট নয়। শীর্ণ চেহারা, লম্বায় দরজার সমান, সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে হাঁটছিলেন। খেয়ে উঠে থালাবাসন সরিয়ে অনিকেত চেয়ারটি টেনে আমার সামনে বসলেন। তার হাতে জেলুসিলের শিশি। ছিপিতে অ্যান্টাসিড ঢেলে বললেন—ফিফটি পার্সেন্ট অফ নকশাল যে অম্বলে ভোগেন এটা জানেন?
আমি হাসলাম, অনিকেতও হাসলেন। তিনি নিজের গলার রুক্ষতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। নীচু গলায় জানতে চাইলেন—কীসের রিসার্চ যেন বলছিলেন?
ভুয়ো পরিচয় দিয়ে শুরু করি-আমার নাম সাম্য সেন, আমি শহিদ সহজ সেনের ছোটোভাই। আমি দাদাকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানানোর চেষ্টা করছি। ইচ্ছে আছে, দাদার আদর্শ, দাদার লড়াই-এর সঙ্গে সঙ্গে দাদার যারা সহযোদ্ধা ছিল, একেবারে যাকে বলা যায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক তাদের সঙ্গে কথা বলে দাদার জীবনকে পরদায় দেখানোর চেষ্টা করব, যদিও সিনেমা না, ডকু।
অনিকেত নাক উঁচু করে বললেন—এ কি বারুইপুরের সহজ সেন?
—হ্যাঁ, বারুইপুর, পেয়ারাবাগান। দাদা সেভেন্টি থ্রি-তে মারা যায়। দমদম জেলে।
অনিকেত সন্দেহজনকভাবে আমাকে দেখে বললেন—আমি তো তার বাড়ি গেছি, আপনাকে তো দেখিনি।
—আপনাকেও আমি আমাদের বাড়িতে দেখিনি, মেজদা ছিল কি?
আমার উত্তরে অনিকেত খুশি হলেন, মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বললেন—তা ছিলেন, তা ছিলেন।
—সদ্য গেছিলেন?
—এই বছর দেড়েক আগে, আমার পরবর্তী বইয়ের কাজে।
আমি নিজের ভুয়ো আই কার্ড দেখিয়ে বললাম—আমি কলকাতায় থাকি না, বম্বেতে পড়াশুনা, সেখানেই চাকরি। একমাসের ছুটি নিয়ে এসেছি।
—ভালো করেছেন, কিন্তু মুশকিল হল আমি মুভমেন্ট চলাকালীন সহজকে চিনতাম না। আরও বলা ভালো, সহজ যখন ধরা পড়েছে, আমি তখনও শ্রীকাকুলামে, সেখানে বসে আমি সহজের মৃত্যুর কথা জানতে পারি। হি রিফুইজড টু কমপ্লাই উইথ জেল হসপিটাল।
আমি চুপচাপ বসে রইলাম। জানি না এই ভুয়ো পরিচয় নিয়ে আসা ঠিক হল কিনা, অনেকগুলো মানুষের নানামাপের আবেগ
অনিকেত সোফার পেছনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমায় উদ্দেশ্য করে বললেন—আপনার আর কিছু জানার আছে? আমিও সম্বিৎ ফিরে পেলাম। হাতে ধরা ফাইল অনিকেতের দিকে এগিয়ে দিই—আমার আসার উদ্দেশ্য দাদার ব্যাপারে জানতে নয়। আমি দাদার একজন সহকর্মীর ব্যাপারে জানতে চাই। আসলে আমি চেষ্টা করছি দাদার সহযোদ্ধাদের মুখে দাদার কথা শুনতে।
—কী নাম বলুন?
আমি ফাইল খুলে দেখালাম, পাতার নীচের দিকে এমনি কিছু নাম লেখা, আমি তর্জনী দিয়ে শেষ নামটির দিকে অনিকেতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। অনিকেত চোখে চশমা এঁটে পড়লেন—মধুসূদন চক্রবর্তী।
—দাদা এনার কথা বাড়িতে বেশ কয়েকবার বলেছেন। মেজদার মুখে শুনলাম। কারণ দাদা যখন মারা যাচ্ছে, আমি নেহাত শিশু, আমার কিছু মনে নেই।
অনিকেত বললেন—এর সঙ্গে সহজ কি এক ওয়ার্ডে ছিল?
—সেটা আমিও নিশ্চিত নই, মেজদারও মনে নেই, দাদা ধরা পড়ার পর জেল হেফাজত হয়। বাড়ির লোক দাদার মৃত্যুর আগে একবার দেখা করতে পেরেছিল। মা আর বড়দা গেছিল। তখনও বলে থাকতে পারে।
অনিকেত মাথা নাড়লেন-মনে পড়ছে না ভাই, নকশাল মুভমেন্ট নিয়ে রিসার্চ করি বলেই তো এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে বসে নেই, কত নাম, কত লোক হারিয়ে গেল। কত মাল ঘাপলা মেরে আম্রিকা কেটে পড়ল। আপনি বরং ভাই পুলিশের কাছে যান, ওদের ডাটাবেস যদি দেখতে পারেন।
আমি ইতস্তত করে বললাম- আমি পুলিশের কাছেই প্রথমে গেছিলাম। ওরা দূরদূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছিল। একজন ডেপুটি গোছের লোক দয়াপরবশ হয়ে আপনার নাম করল।
অনিকেত হো হো করে হাসলেন। সেই হাসির শব্দে শীতের দুপুরে তার ফ্ল্যাটের জানালা কেঁপে উঠল।
—পার্টি থেকে আদর্শগত বিচ্যুতির কারণে বহিষ্কার হওয়ার পর থেকে দেখছি পুলিশ আমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে। বলে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে বইয়ের সেলফের দিকে এগুলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, উঠে যাব কিনা। অনিকেত তাক থেকে নানা মাপের ডায়ারি নামিয়ে ভারি চশমার ওপর দিয়ে পড়ছিলেন।
একবার আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন—কীরকম চেহারা কিছু জানা আছে?
পাখি খুনিদের চেহারার আদল যেটুকু জেনেছি সেটা বলা যেত কিন্ত সেটা ‘সহজ সেনের ভাই’-এর পক্ষে জানা সঙ্গত মনে হল না। অনিকেত আমার ভুয়ো পরিচয় ধরে ফেলতে পারেন। বললাম—চেহারা তো জানি না।
—বয়েস? নকশাল মুভমেন্টের সময় কেমন বয়েস ছিল?
—বলতে পারব না।
অনিকেত খেঁকিয়ে উঠলেন—তাহলে জানোটা কী!
আসলে পুলিশ হলে কী হবে, অনিকেতের দাবড়ানি খেয়ে আমি সত্যি চমকে উঠেছিলাম। নীচু গলায় জানালাম —বোধহয় খুব পড়াশুনা করা মানুষ হবেন।
অনিকেত তার হাতের ডায়ারি সরিয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালেন।
—পড়াশুনা করা মধুসূদন চক্রবর্তী?
—হ্যাঁ, মানে দাদা বলেছিল, যে খুব পড়াশুনা করা মানুষ।
অনিকেত তার ডায়ারির মলাটে চাপড় মেরে চেঁচিয়ে উঠলেন—আলবাত আছে, আলবাত চিনতাম, পড়াশুনা করা, খুব পড়েন, কী পড়াশুনা করত দাদা কিছু বলেছে?
—নাহ্ সেইটে জানা নেই।
—পরিবেশ প্রকৃতির বই পড়ত, জীবজন্তুর বই? তাইতো? অনিকেত নিশ্চিত হতে জানতে চাইলেন।
আমি বেশ বিস্মিত হয়েছিলাম, কিন্তু অনিকেতকে বুঝতে দিলাম না।-–আপনি চেনেন?
অনিকেত ডায়ারি স্বস্থানে রেখে এসে চেয়ারে বসলেন। বললেন—যে মধুসূদন চক্রবর্তীর কথা আপনার দাদা বলেছেন, তিনি যদি এই লোক হবেন, তাহলে বিলক্ষণ চিনতাম। আমিও এক্সপেলড আর মধুসুদনও এক্সপেলড, আমি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে বিতাড়িত, আর সে জেলে ঢুকবার আগেই বিতাড়িত। হাহাহা।
আমি ফাইল খুলে বললাম—তার সম্পর্কে বলুন, আমি নোট নিলে অসুবিধা নেই তো?
—অবশ্যই নেই। কিন্তু… অনিকেত পলকয়েক চিন্তা করে বললেন, —সহজ আর মধুসূদন কি একসঙ্গে ওয়ার্ডে ছিল, আমার মনে পড়ছে না। আমি আশ্বস্ত করে বললাম—সেটা আমি ডাবল চেক করে নেব। আপনি মধুসূদনের কথা বলুন, আপনি কি তার সঙ্গে এক ওয়ার্ডে ছিলেন?
—না না না না, অনিকেত মাথা ঝাঁকালেন।—আমি মধসূদনের সঙ্গে এক ওয়ার্ডে ছিলাম না, কিন্তু একই জেলে ছিলাম। ধরা পড়বার আগে আমি পার্টি সার্কেলে মধুসূদনের নাম বারকয়েক শুনে থাকব। তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতাম না। আমাদের বাড়ি ছিল মালদা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যা করেছি তা উত্তরবঙ্গে। আর মধুসূদন দক্ষিণবঙ্গে, বাড়ি কোথায় ঠিক বলতে পারি না। তবে সিটি কলেজের ছাত্র, পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শিবপুরে ঢুকেছিল, পড়া শেষ করেনি। সে পড়ুয়া ছিল এ-কথা সত্য কিন্তু পলিটিকাল স্টাডিজে তার কতটুকু গভীরতা ছিল আমার সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। নানা বিচিত্র বিষয়ে শুনেছি তার আগ্রহ ছিল। ঘটনা হল, কলকাতা-হাওড়ার পার্টির মধ্যে তাকে বেশ আঁতেল হিসেবেই দেখা হত। নকশাল পার্টিতে আঁতেল হিসেবে একবার চিহ্নিত হয়ে যাওয়া আদৌ খুব আনন্দের বিষয় নয়। এইসব সূত্রেই, আজ আ ব্যাড এগজামপল, মধুসূদনের কথা শুনে থাকব। আমি দিনাজপুর থেকে ধরা পড়ি, পরে আমাকে দমদম জেলে নিয়ে আসা হয়। জেলের ভেতরেও পার্টির নানা দলবাজি, হরেক গ্রুপ, দলাদলি। মধুসূদন আগে ধরা পড়েছিল, বা তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জেলে সে অন্য ওয়ার্ডে থাকত। আমি তখনও তাকে দেখিনি। পরবর্তীতে মধুসূদনকে একদিন আবিষ্কার করি স্পোর্টসের সময় পাঁচিলের ধারে বসে একখানি মোটা বই পড়ছে, ওয়াইল্ড লাইফ সংক্রান্ত। কথা হয়নি সেদিন, পরবর্তীকালেও কোনোদিন মুখোমুখি আলাপ হয়নি। তার আর আমার চর্চার জায়গা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, কিন্তু তার পড়াশুনার কথা মাঝেমধ্যে কানে আসত। ওয়ার্ডমেটদের জিজ্ঞাসা করে মধুসূদনের পরিচয় জানলাম। জেল-সুপারকে ধরে সে নাকি জেল লাইব্রেরি ব্যবহার করার পারমিশান পেয়েছে। রাজনৈতিক চর্চায় তার আগ্রহ নেই। পশুপাখি আর গাছপালা নিয়ে পড়াশুনা করছিল।
—এখন মধুসূদন চক্রবর্তীকে কোথায় পাব?
অনিকেত সন্দেহজনক হাসি হাসলেন- হ্যা হ্যা, সেটাই তো আসল। হাঁটুতে চাপড় মেরে দাঁড়িয়ে, পিঠের আড় ভেঙে ধীর পায়ে তার বইয়ের আলমারির কাছে গেলেন। কাগজের ফাইলের সারি, অনিকেত আঙুল দিয়ে খুঁজে খুঁজে একটি নির্দিষ্ট ফাইল পেড়ে আনলেন, লক্ষ করলাম, ফাইলের হলুদ মলাটে সাদা একফালি কাগজ সাঁটা, লেখা- এম।
—আপনি সবার খোঁজ রাখেন?
অনিকেত রুক্ষভাবে বললেন—সেটা কি সম্ভব! …এই যে মধু চক্রবর্তী। ওহ্, সে তো মারা গেছে। রেললাইনে কাটা পড়ে, নাইনটি ফোরে, বৈদ্যবাটি। অনিকেত ফাইলের মলাট বন্ধ করে দড়ির গিঁট দিলেন। তার শেষ শব্দটিতে আমি আটকে গেছি—বৈদ্যবাটি। জানতে চাইলাম-ঠিকানা জানেন?
অনিকেত চেয়ারে এসে বসলেন, মাথা নাড়লেন। মধুসূদন মারা গেছে পাঁচ বছর হল, তাই হয়তো বৈদ্যবাটি থানা মধুসূদন চক্রবর্তীর নাম তাদের তালিকায় পায়নি, আমি থুতনিতে হাত দিয়ে ভাবছিলাম—আর একটা রাস্তা বুঝি বন্ধ হয়ে এল, এবার তদন্তকে কোনদিকে ঘোরানো যায়!
অনিকেত চশমা মুছছিলেন, আমি ভেবেচিন্তে একটা শেষ চেষ্টা করে দেখলাম—জেলের ওয়ার্ডে মধুসুদনের বন্ধুবান্ধব ছিল?
—বন্ধুবান্ধব ছিল কিনা জানি না, পরিবার পরিজনদের কথাও বলতে পারি না, ইন্টারভিউতে তাকে দেখিনি। কী জানেন, এমন লোকদের পেছনে গুণমুগ্ধদের ছোটোখাটো ভিড় জমতে বেশি সময় লাগে না, তাই না?
সহমত হলাম। —স্টাডি সার্কেল?
—মধু চক্রবর্তীকে ঘিরে থাকা বৃত্তটিকে স্টাডি সার্কেল বলা ঠিক হবে না। কারণ স্টাডি, যা করার মধুই করত বলে শুনেছি, বাকিরা সার্কেলে ঘুরত।
আরও কিছু হয়তো বলতে যাচ্ছিলাম, অনিকেত হাত তুলে আমাকে থামালেন, চোখ থেকে চশমা নামিয়ে বললেন—দিবানিদ্রা দেওয়ার সময়। আজকের ইন্টারভিউ শেষ। আর এর পর এলে ভুয়ো পরিচয় দিয়ে আসবেন না। আমি তো পার্টি থেকে এক্সপেল্ড। সুতরাং পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতেই পারি।
আমি জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পাইনি কী করে তিনি আমার আসল পরিচয় ধরে ফেলেছিলেন। আমার ফ্ল্যাট-ত্যাগের অপেক্ষা না করে অনিকেত পাশের ঘরে চলে গেলেন। আমি ফ্ল্যাটের দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে এলাম।
