জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব

জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব

কানাই-এর নির্দেশ পেয়ে সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকর্মীটিকে চেঁচিয়ে বলল—নিয়ে আয়!

বড়োরাস্তায় পুলিশের জিপ থেকে জগমোহিনীর মালিক শ্যামকান্ত, তার ছেলে মনোহর, বটঠাকুর আর ছোকরা সার্ভার নরেনকে নামিয়ে দুজন পুলিশ গলিতে ঢুকল। সন্দেহভাজন চারজনকে এখনও হ্যান্ডকাফ পরানো হয়নি, কোমরে দড়ি পরেনি। সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা এদের আটকে রেখেছে ঠিকই কিন্তু সন্দেহের লিস্টে রাখেনি। চারজনের ওপরেই রাতজাগার ধকল পড়েছে, এদের মধ্যে শ্যামকান্ত বৃদ্ধ, গোটা ঘটনায় তার হোটেলের মানসম্মান জড়িয়ে গেছে, কানাইচরণের সামনে দাঁড়িয়ে সে ভয়ে কাঁপছিল। মনোহরকে আর নরেনকে দেখে কানাই-এর মনে হল, এই দুজন যথেষ্ট শক্ত আছে। এদের দুজনের পক্ষে খাবারে বিষ মিশিয়ে দেওয়াও অসম্ভব নয়। বটঠাকুরকে দেখে মনে হল, দু-দুটো মানুষের মৃত্যুর ধকলের চেয়ে নিজের নেশার জোগানে ঘাটতি তাকে কাবু করে রেখেছে।

কানাইচরণ চারজনের পরিচয় জানতে চাইলেন আর পরিবার-পরিজন বিষয়ে দুচারটে মামুলি কথার মধ্যে দিয়ে চারজনকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। শ্যামকান্ত হাত জোড় করে জবাব দিচ্ছিল।

কানাইচরণ জানতে চাইলেন—আগে এই হোটেলে এরকম কিছু হয়েছে? —কোনোদিনও না বাবু, সত্তর বছরের সেবা। শ্যামকান্ত জবাব দিল।

কানাই আঙুল উঁচু করে হোটেলের ঘরের দিকে দেখিয়ে জানতে চাইলেন—হোটেলে তো বেশ পোকামাকড় আছে দেখলাম, এদের মারতে বিষ দেওয়া হয় নাকি?

—ব্লিচিং দিই হুজুর। রাতের বেলায়। কাস্টমাররা চলে গেলে। কোনোদিনও কমপ্লেন আসেনি।

—আর ইঁদুর মারতে?

—খাঁচা পাতি। আর ওই ড্রেনে ব্লিচিং দিই। এখানে সব বাড়িতে ইঁদুর, বাবু। কানাই শ্যামকান্তকে আরও গোটা দুই মামুলি প্রশ্ন করে, তারপর মনোহরকে জেরা করা শুরু করলেন। মনোহরের গায়ে গতরাতের স্যান্ডো গেঞ্জি, সে কানাই-এর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে ছিল।

কানাই জিজ্ঞেস করলেন—কাল ওই দুটো ছেলে কী কী অর্ডার করেছিল?

মনোহর জবাব দিল—মাছের থালি।

—কী কী থাকে তাতে?

—মাছ, ডাল, আলুভাজা আর একবার ভাত।

—একবারই ভাত নিয়েছিল?

—আর একবার নেওয়ার চান্স পায়নি। মনোহরের উত্তর শুনে সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা থাপ্পড় মারতে যাচ্ছিলেন—সাহেবের কথার ভালোভাবে উত্তর দে, না হলে মার্ডার কেস দিয়ে লাইফ হেল করে দেব। কানাই থামতে বললেন। মনোহর চোখ নামিয়ে নিল।

কানাই—ওদের টেবিলে আর কেউ ছিল?

—না সার।

—আগে পরে কেউ আসেনি?

—সব সময়ই লোক আসছে যাচ্ছে। নাঃ ওদের সঙ্গে কেউ তো ছিল না। টেবিলে দুজনই ছিল। না রে? বলে মনোহর সার্ভার ছোকরা নরেনের দিকে তাকাল। নরেন মাথা নাড়ল। আর কেউ ছিল না।

কানাই এর মনোহরকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল না। তিনি তাই নরেনকে পরের প্রশ্ন করলেন।

—আমি যদি তোদের হোটেলে খেতে এসে মাছভাত অর্ডার করি, তুই সেটা কীভাবে থালায় সাজিয়ে দিবি? বাটিতে মাছ দিবি, নাকি পাতে?

নরেন প্রশ্ন বুঝতে পেরেছে, সে বলল—তুমি দাদাবাবুর কাছে মাছ ভাত চাইলে আমি প্রথমে গিয়ে থালায় ভাত বাড়ব। বাটিতে ডাল দেব, আর একটা বাটিতে মাছের ঝোল দেব। থালায় আলুভাজা দেব। লেবু লঙ্কা দেব।

—মাছের ঝোল শুধু? মাছ দিবি না?

—মাছ ভাজা হলে বাটিতে দিয়ে যাব।

শ্যামকান্ত নরেনের কথার মাঝে বলে উঠল—বাবু এই হোটেলের নিয়ম এই। বাটিতে শুধু ঝোল দেওয়া হয়। তাজা মাছ ভাজা হলে তা একটা রেকাবিতে রেখে কাস্টমারদের সামনে এনে ধরা হয়। কাস্টমাররা এঁটো হাতে দেখায় যে কোন পিসটা নেবে। আমরা সেটাই তাদের দিই। এইটা আমাদের এই অঞ্চলের স্পেশালিটি।

কানাই বললেন—বাঃ দারুণ ব্যাপার তো! তা তুই এই যে ভাত ডাল মাছের ঝোল এইগুলো বাটিতে দিলি, এগুলো কি রান্নাঘরে গিয়ে নিয়ে আসতে হল?

মনোহর নরেনকে বলতে না দিয়ে বলল—সার, ওকে রান্নাঘরে যেতে হয় না। রান্নাঘর থেকে খাওয়ার ঘরে বালতি করে খাবার এসে যায়। আমরা শুধু সার্ভ করি।

কানাই জগমোহিনীর খাবার পরিবেশনের রীতি বুঝতে চাইছিলেন, তার কাছে এখন তা অনেকটাই পরিষ্কার। ভূঁইঞার কথার সঙ্গে এদের বক্তব্যে ফারাক নেই। বটঠাকুরকেও জিজ্ঞাসা করার কিছু নেই। এমনিতেই বেচারার চোখ ঢুলে আসছে। যদিও বটঠাকুরই এখনও অবধি প্রধান সন্দেহভাজন। ফরেনসিক এসে এদের পা থেকে মাথা অবধি গবেষণা করলে এমনিতেই বেরিয়ে আসবে যদি এদের মধ্যে কেউ নিজের হাতে বিষ মিশিয়ে থাকে। ফরেনসিক না আসা অবধি কানাইচরণ হোটেলের এই চার লোকের সঙ্গে গল্প জুড়লেন। কার বাড়ি কোথায়, রোজ দিনে আর রাতে কত লোক হয়, কতজনা খাতায় খায়, এইসব। সৌভিক এতক্ষণ নোটবুকে জেরার তথ্য লিখে রাখছিল, কানাইকে খেজুরে আলাপ জমাতে দেখে সে একবার ক্রস-চেক করতে ফের জগমোহিনী ভোজনালয়ের ভেতর প্রবেশ করল। সিঁড়িঘর পেরিয়ে বাম দিকের দরজা দিয়ে খাওয়ার ঘরের মুখে এসে দাঁড়াল। কোনো কাস্টমার এই ঘরে ঢুকলেই তার প্রথম চোখে পড়বে দেয়ালে টাঙানো কাঠের বোর্ডে লেখা মেনু। জগমোহিনীর বাড়ির অবস্থা যতই পড়তির দিকে হোক না কেন, মেনুর বোর্ড নিয়মিত বার্নিশ করান হয়, খয়েরি বোর্ডের ওপর সাদা রঙের তুলির টানে খাবারের নাম আর দাম লেখা। সবার ওপরে মাছ ভাতের থালি, চল্লিশ টাকা। সবজির থালি, মাংসের থালি আর মুরগির থালি। এর পর ছানার ডালনা, বড়ির ঝোল, কাটাপোনার ঝোল। শেষে এসে চাটনি, দু-তিনরকম। সৌভিক ঘরের আর এক কোণের দিকে তাকাল, যেখানে রান্নাঘরে ঢুকবার দরজা। দুই ইটের গাঁথনির দেয়ালে গভীর কুলুঙ্গি, দু-তিনটে স্টেইনলেস স্টিলের বালতি রাখা। তার ওপর এখন মাছির ঝাঁক। বালতিগুলোর পাশে পরিষ্কার থালা সাজিয়ে রাখা। সৌভিকের মনে হল, হোটেলের লোকজন হয়তো মিথ্যে বলছে না। খাওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সৌভিক সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এল। সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ তাকে থামতে হল। দোতলার ঘরে তালা দেওয়া। প্রহরারত পুলিশকর্মীটি সৌভিককে জানাল- দুজন বোর্ডার ছিল, তারা সকালে কলেজে বেরিয়েছে, ছোটোবাবু অর্থাৎ ভূঁইঞা বোর্ডারের গতিবিধিতে মানা করেনি। সৌভিক আন্দাজ করল, বোর্ডারগুলো ভয় পেয়ে পালিয়েছে। সৌভিক সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে আবার যখন বটুক সমাদ্দার লেনে এসে দাঁড়িয়ে দেখল দুজন লোক গলির মুখে পেরিমিটার টেপ টপকে কানাইচরণের দিকে এগিয়ে আসছে। কানাইও তাদের দেখে শ্যামকান্তদের ছেড়ে গলির মুখের দিকে হাঁটা দিলেন।