চড়াই-হত্যা রহস্য – ১১

১১

মতিদা সব শুনেটুনে বললেন—সময় যা লাগবে লাগুক, বড়োকর্তাদের দিকটা আমি সামলে দেব। পুজোর মিটিং শুরু হলে সবাই এমনিতেও ভুলে যাবে। এইসব কেসে সময় লাগে, দু একদিনের মামলা নয়।

আমি সুযোগ বুঝে বললাম—স্টোনম্যানের কেসটা তো আজও সল্ভ হল না, হোয়াইটচ্যাপেলও আনসল্ভড। এখানে ছ-টা জেলা জুড়ে সার্চ চলেছে।

মতিদা বললেন—হাল ছেড়ে দিস না তাই বলে। জানবি, নতুন করে কোনো ঘটনা না ঘটলে কেউ ফাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করবে না। মিডিয়ার চাপও নেই।

—না না হাল ছাড়িনি, সার্চও চলছে, টোপও ফেলা আছে।

—এর মধ্যে আবার মার্ডার হওয়ার চান্স আছে? হলে রুখতে পারবি? আমি ভেবেচিন্তে বললাম—রুখতে পারব কিনা জানি না। প্রিভেনশান তো লালবাজার দেখছে না।

মতিদা মাথা নাড়লেন—ওটা সি আই ডি আর লোকাল থানা বুঝে নেবে।

—খুনি নতুন করে পাখি খুন করবে কিনা সেটা যদি আমাকে জিজ্ঞাসা কর, তাহলে বলব, সেই চান্স কম। রাজ্য জুড়ে কালবৈশাখী চলছে, দুটো ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। এসবের মধ্যে জুত করে পাখি মারার হাতেকলমে সমস্যা আছে। খানাখন্দ, আদারবাদাড়ে জল জমে আছে। আমার মনে হয় না, বর্ষাটা না-গেলে নতুন করে কিছু হবে।

আমার হাতে ফরেনসিক রিপোর্টগুলো ছিল। সিদ্ধার্থ ভবানী ভবন থেকে ফ্যাক্স করে পাঠিয়েছে। ফুটপ্রিন্ট স্টাডির রিপোর্ট আগেই এসেছে, পাখিদের ময়না তদন্তের রিপোর্ট আর কেমিক্যাল অ্যানালিসিস দুটো নতুন। দুই সপ্তাহ লেগেছে সব পরীক্ষা মিটতে।

মতিদা জানতে চাইলেন–কেসটার কী অন্যরকম কোনো অ্যাঙ্গেল আছে? এই যেমন, মানুষের মনে ভয় তৈরি করা, বা তন্ত্রচর্চা, পাখিগুলো হয়তো দুরূহ কোন রোগে ভুগছিল, এরকম কোনো বিষয়?

আমি ভেঙে ভেঙে বললাম, কারণ পুরোপুরি নিঃসংশয় আমিও নই-আ-মা-র তা মনে হয় না। মারার পর কোনো প্রোপাগান্ডা চালানো হয়নি। পাখিদের ডেডবডির স্যাম্পেল কালেক্ট করা হয়েছিল। স্যাম্পেল কারণ, তিরিশ-চল্লিশটা পাখির ময়নাতদন্ত করা সম্ভব নয়, চারটে ডেডবডি নেওয়া হয়ছিল। ফরেনসিকে চড়াই-এর শরীরে দুরূহ কোনো রোগের উল্লেখ নেই। বিষ প্রয়োগ করা হয়নি। স্রেফ গলা কাটা হয়েছে, মসৃণ কোনো অস্ত্র দিয়ে, চড়াই-এর আকার দেখে বলা যেতে পারে অস্ত্রটিও ছোটো হওয়া স্বাভাবিক। আঁকশি হতেই পারে। এক ব্যাধকে ধরা হয়েছিল। তার আঁকশিতে চড়াই-এর রক্ত পাওয়া যায়নি। মৃত চড়াইদের কোনো বডি পার্ট মিসিং ছিল না! ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, এককথায় খুন করা ছাড়া খুনির আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হচ্ছে না। মার্ডার ইন্টেনশান, ক্লিয়ার নয়। যদি ইন্টেনশান থাকেও সেটা সূক্ষ্ম।

—এই যে বলছিলিস, চড়াই ধান খায়, সে কারণে মেরে থাকতে পারে? -অনেক পাখিই দানাশস্য খায়। চিরকাল খেয়ে এসেছে। চাষিরাও জানে। ব্যবস্থাও নেয়। তোমার রেফার করা রস্তিদেব বলছিল। আমি যদিও এই সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দিইনি। কিন্তু সেক্ষেত্রে মোটিভটা খুবই অস্পষ্ট।

মতিদা হাত উলটে বললেন—তাহলে মেনে নিতে হয় কোনো বিকৃত মস্তিষ্কের লোক এই কাজ করেছে। অ্যাসাইল্যামগুলিতে খোঁজ চালাবি?

—বিকৃত মস্তিষ্ক তো বটেই, তা না হলে অতটুকু পাখিদের কেউ খুন করতে পারে না। অ্যাসাইলামে খোঁজ নেওয়ার দিকটা ভাবা যেতে পারে। যদিও, আমার মনে হয় না খুনির কোনোদিন সাইকোলজিকাল ডায়াগনসিস হয়েছে।

—তাহলে ঘুরেফিরে সেই প্রোপাগান্ডার দিকেই যাচ্ছে। যে প্রোপাগান্ডার শিকার খুনি নিজে, আর যে প্রোপাগান্ডা সে ছড়াতে চায়।

—আমিও এটাই ভাবছি। একটা যৌক্তিক বোধ, যা তার আচরণকে সমর্থন করছে। আর একটা জিনিস, ফুটপ্রিন্ট রিপোর্টটাও আছে, সেটা বলা হয়নি। রিপোর্টে লোকটার নির্দিষ্ট বয়েস আন্দাজ করা সম্ভব হয়নি, স্বাভাবিকভাবেই। পায়ে অসংখ্য দাগ আছে, যা থেকে মনে করা হচ্ছে লোকটির বয়েস সত্তর হতেও পারে, হাটুরে লোক। যদি বাস্তবে তারচেয়ে কমবয়েসি হয় সেক্ষেত্রে পায়ের নিচের দাগগুলি কোনো ম্যাসিভ আঘাত থেকে তৈরি হয়ে থাকবে।

মতিদার সঙ্গে সেদিন কেস নিয়ে এই অবধি কথাবার্তা হল। আমাকে বললেন, কয়েকটা দিনের জন্য ঘুরে আসতে। তার এমন প্রস্তাবে আমি সন্দেহ করিনি, যে তিনি আমাকে কেস থেকে সরিয়ে দিতে চাইছেন। সিরিয়াল মার্ডারের কেসে গোয়েন্দাদের মাথায় অসম্ভব চাপ পড়ে। গোয়েন্দাদের মাথা সাফ করানোর জন্য তাদের ছুটিতে পাঠানো সাধারণ ব্যাপার। ঊর্ধতন অফিসারটি যে আমার কেসটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সেটা ভেবে বরং ভালো লাগল। কয়েকটা দিন ঘুরে আসাই যায়, ফিরে এলে পুজোর অ্যাসাইনমেন্ট শুরু হবে।

দীর্ঘ গোয়েন্দা উপন্যাসে যেমন কমিক রিলিফ একান্ত জরুরী, দীর্ঘ তদন্তেও গোয়েন্দাদের বিরতি প্রয়োজন। পরিবার-পরিজনদের দিকে মুখ তুলে তাকানো দরকার। মতিদার পরামর্শ মেনে হপ্তাখানেকের ছুটি নিয়ে গিন্নি আর আমি পুরী বেড়াতে এলাম। ছুটির প্রথম দিন দুয়েক, মাইরি কানের কাছে চড়াই-এর চি-চি ডাক শুনেছি। পুরীর সমুদ্র সৈকতে পাখির দাপট আছে, এমন দাবি কোনো সিজনড টুরিস্ট করবে না। ভাগ্যবানেরা পুরীর সি-বিচে সিগাল দেখতে পায়। ছোটোবেলা থেকে পুরী যাচ্ছি, হালে দেখছি, পর্যটকদের ভিড় যত বাড়ছে পুরীতে তত কাকের সংখ্যা বাড়ছে। যাই হোক, পুলিশ অ্যাসোসিয়েশানের হলিডে হোমের একটা ডবল বেড রুম ভাড়া নিয়েছিলাম। গিন্নিকে ছুটি দিয়ে কয়েকদিন নিজে হাত পুড়িয়ে রান্নাবান্না করব। রুমের জানালা খুললে একদিক থেকে সমুদ্রের লোনা হাওয়া আর অন্যদিক থেকে স্বর্গদারের মড়া পোড়ানোর গন্ধ ছুটে আসছে। গিন্নিকে যখন হুট করে বলেছিলাম পুরী যাওয়ার কথা সে বেচারি বেজায় অবাক হয়েছিল। অল্পবয়েসিরা পুরী যায় হনিমুন করতে। বয়স্করা তীর্থ করতে আসে কারণ, হাঁটুর আর গাঁটের ব্যাথা নিয়ে এর চেয়ে দুরে যাওয়া যাবে না। আমি দেখলাম, কয়েকটা দিন ছুটি কাটানো নিয়ে কথা, সেটা যত সস্তায় মেটে ততই ভালো। গিন্নি আর আমার ফুসফুসে পুরীর হাওয়া যত প্রবেশ করছিল ততই আমার মাথা থেকে লালবাজার-কলকাতা আর চড়াইয়ের তদন্ত হারিয়ে যাচ্ছিল। কোনো রকমে রান্না সারছিলাম —ডালভাত, মাছভাজা; বাকি সময়টা গিন্নিময়। পারশে বলে যেটা পুরীর হোটেলে চালানো হয়, সেইটে খেয়ে চিরকাল বিস্বাদ লেগেছে, তবু খাই। জাস্ট সার্ডিন বা ইন্ডিয়ান ম্যাকারেলের বাচ্চা। হলিডে হোমের ম্যানেজারকে একদিন ঘরে নেমন্তন্ন করে ডালভাত আর ঝিঙে চিংড়ি পোস্ত খাওয়ালাম। সে ব্যাটা বললে–ই ডল পতলা অছি।

কলকাতায় ফেরার পরবর্তী একমাসে সিদ্ধার্থের সঙ্গে বারবার দেখা হচ্ছিল। ইডেনের ম্যাচ নিয়ে মিটিং, দুর্গাপুজোর প্রিপারেশান শুরু হয়ে গেছে। কমিশনার সাহেব ফোর্সের সব দপ্তরের সঙ্গে দফায় দফায় বসছেন, ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এসবের মধ্যে সিদ্ধার্থের সঙ্গে চোখাচুখি হলে সে মাথা নাড়ায়। নতুন কোনো খবর নেই। তখন মনে পড়ে, তাইতো, মাসকতক আগে কিছু পাখিকে খুন করা হয়েছিল। তার একটা তদন্তও শুরু হয়েছিল। এখন সব অলীক। মতিদা একদিন বললেন—হাওয়া শুঁকে বুঝতে পারছি মরশুমি ফুল ফুটছে। তোর সঙ্গে সি আই ডির যে ছেলেটা বার্ডকিলিং-এর কেসটায় ছিল, তার সঙ্গে এক বড়োকর্তার মেয়ের এনগেজমেন্ট পাকা। পৌষমাসটা গেলে বিয়ে। ছেলেটা অনেক ওপরে উঠবে।

এই কথা শুনে, কেন চাকরি পাওয়া মাত্র গ্রামের দিকের একটি মেয়েকে পরিবারের কথা শুনে সম্বন্ধ করে বিয়ে করে ফেলেছি এমন একটা দুঃখবোধ আসতে পারে মাত্র! তাই নিরুত্তর থাকি। জানি, পিএনপিসিতে মতিদার আগ্রহ আছে।

সিদ্ধার্থ একদিন ফোন করে জিজ্ঞাসা করল—অমুক দিনের মিটিং এ থাকছ?

ডিজি-সি আই ডি-এর ডাকা মিটিং। রাইটার্সে। বললাম—থাকব।

—মিটিং শেষ হলে আমার জন্য অপেক্ষা কোরো। বলে সিদ্ধার্থ ফোন রেখে দিল। অনুমান করি তার জীবনে ব্যস্ততা বেড়েছে। নির্দিষ্ট দিনে, রাইটার্সে হাজির হলাম। সত্যি বলতে, অর্ধেক চান্স ছিল সিদ্ধার্থ তদন্তে নতুন কোনো খবর শোনাবে, বরং সে বিয়ের কার্ড দেবে এইটে বেশি প্রত্যাশিত ছিল। মিটিং শেষ হলে তার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম—স্টাফ ক্যান্টিনে গিয়ে বসা যাক।

সিদ্ধার্থ বলল –এখনই দৌড়োতে হবে। তার আগে একটা জিনিস তোমাকে দেওয়া দরকার। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলাম। বড়োকর্তারা নিজেদের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাদের চোখ এড়িয়ে একটা লাল-সাদা থামের পেছনে এসে দুজনে দাঁড়ালাম। সিদ্ধার্থ লেদারের ব্যাগ থেকে একটা হলদে কাগজের ফাইল বের করে আমার দিকে ধরল।

—ওয়েল, আমরা ভাগ্যবান, তুমি ভেবেছিলে হাজারটা নাম আসবে, এসেছে সাতশোটা।

—কী এটা? ফাইলটা হাতে নিয়ে জানতে চাইলাম। ফাইলের ভেতরে একদিস্তে টাইপ করা কাগজ। তাতে বিভিন্ন লোকের নাম আর ঠিকানা ক্রমসংখ্যা মিলিয়ে লেখা।

—যেটা তুমি চেয়েছিলে। দক্ষিণবঙ্গের ছ-টা জেলায় ‘দা ফল অফ আ স্প্যারো’ কারা কারা তুলেছে তাদের তালিকা, নাম, ঠিকানা আর বয়েস। লাইব্রেরির মেম্বারের বয়েস সত্তরের ওপরে ধরা হলে সবমিলিয়ে পড়ে থাকছে একশো কুড়িটা নাম, নামের পাশে স্টার দেওয়া আছে। একটু সময় লাগল, কিন্তু…এনজয়।

—ও সেই পাখির কেসটা, গুড বলে একটা পাতা উলটে দেখলাম, ঠিকই আছে মনে হচ্ছে, বললাম—তাহলে তো এই একশো কুড়ি জনের একটা ফলো আপ করতে হয়। একশো কুড়ি জনের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য লাগবে। সিদ্ধার্থ তার ছদ্ম-অসহায়তা দেখাল, সে ফলো আপের দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক।

—কানাইদা ঘাড়ের ওপর পুজো, ইডেনে ম্যাচ, গড়ের মাঠে বইমেলা, ফেব্রুয়ারিতে একটা বিগ্রেড সমাবেশ আছে। তোমার মনে হয়, এই ডিটেল ইনফরমেশাল এখন আমাদের ম্যানেজ করা সম্ভব?

ছেলেটার ধারালো কথাতেও মাখন মেশানো থাকে, যাকে বলে মিছরির ছুরি। ও হয়তো জানত যে আমি ডিটেল রিপোর্ট-এর জন্য চাপ দেব, সেই কারণেই স্টাফ ক্যান্টিনে বসতে চায়নি, কথাবার্তার জল গড়িয়ে যেতে পারত। এমনও হতে পারে এই লাইব্রেরির তথ্য সে কয়েক সপ্তাহ আগে পেয়েছে, আমার কাছে চেপে গিয়ে পুজোর ব্যস্ততা আসা অবধি অপেক্ষা করেছে যাতে ফলো আপটা না-করবার একটা জুতসই অজুহাত দিতে পারে।

আমি পালটা বিদ্রুপ করে বললাম—গুড, এই রিপোর্ট তাহলে আমাদের ফাইলে থাক। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আবার ফাইলের ধুলো ঝাড়া যাবে।

সিদ্ধার্থ কাঁধ ঝাঁকাল। আমি বললাম—এটা তো আর্দালির হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিলেই পারতে।

সিদ্ধার্থ একগাল হাসে—মোক্ষম ধরেছ, আসল উদ্দেশ্য ছিল এইটা দেবার…। বলে লেদারের ব্যাগ থেকে সে একটি লাল রঙের সিঁদুর মাখানো খাম বের করল—আমার বিয়ের কার্ড, এতদিনে নিশ্চয়ই শুনেছ।

পুজোর হইচই নির্বিঘ্নে মিটে যাওয়ার পর চেষ্টা করলাম তদন্তে গতি আনবার। এখন হপ্তাদুয়েকের বিশ্রাম, তারপর ইডেনে টেস্ট ম্যাচ আর বইমেলার ব্যস্ততা শুরু হবে।

ইতিপূর্বে সিদ্ধার্থ খবরের কাগজে কয়েকবার চাষবাস সংক্রান্ত ভুয়ো খবর ছাপিয়েছিল। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল খুনিকে প্ররোচিত করা। পরবর্তীতে আমি লালবাজারের প্রভাব খাটিয়ে মাঝারি মাপের তিনটে কাগজে ফলো আপ স্টোরি ছাপালাম। সপ্তাহ ঘুরল, নতুন কোনো খবর এল না। একটি গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান সংবাদপত্রের দপ্তরে চিঠি লিখে ভুয়ো খবরের প্রতিবাদ করেছেন। দৈনিকটি চিঠিটা বাতিল করে লালবাজারের হাতে তুলে দিয়েছে। আমি খবর নিয়ে দেখেছি, পঞ্চায়েত প্রধানের নাম-ঠিকানা ভুয়ো না। বেচারা নিজের গ্রামের নিন্দে দেখে চিঠি লিখে ফেলেছে।

মোট কথা—আসল খুনি টোপ খাচ্ছে না। অথচ আমার বিশ্লেষণ বলছিল নতুন কিছু ঘটে যাওয়া সময়ের অপেক্ষামাত্র। শরৎকাল, আকাশ ফরসা, পরিষ্কার ঝোপঝাড়। বাসে করে অফিসে আসার সময় ট্রাম লাইনের তারের ওপর থেকে কা-কা শব্দে চমকে তাকাই।

একদিন লাঞ্চের পর অফিসে বসে মাছি তাড়াচ্ছিলাম, কাজের চাপ নেই বললেই চলে। বিকেলের দিকে আলিপুর কোর্টে একটা তামাদি কেসের হাজিরা দিতে যেতে হবে। সিগারেট ধরাতে গিয়ে টেবিলের ওপর লাইটার খুঁজে পেলাম না। মতিদার কাছে দেশলাই থাকে, লুকিয়ে চুরুট খান। হাঁক দিতে গিয়ে দেখি ভদ্রলোক ভাতঘুমে ঢুলছেন। ড্রয়ারে খুঁজলে পুরোনো দেশলাইবাক্স মিলতেও পারে। একদম নীচের ড্রয়ারটি হাতড়াতে গিয়ে দেখি সেই এক কোণে পড়ে আছে, দা ফল অফ আ স্প্যারো-রন্তিদেব সেনের মুখে বইটির নাম শুনে ইন্ডিয়ানা থেকে কিনেছিলাম। ঘড়িতে দেখলাম হাতে কিছু সময় আছে। দা ফল অফ আ স্প্যারো পড়া শুরু করলাম। অতি স্বাদু বই, তা রন্তিদেব যাই বলে থাকুন না কেন! হাজিরার কথা ভুলে বইয়ে ডুবে গেছিলাম, চূড়ান্ত অপেশাদারি ব্যাপার আর কী! নেক্সট ডেটে বিচারকের কাছে ঝাড় আর পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে তিরস্কার খেতে হবে। এর মধ্যে মতিদা কখন জেগে উঠেছেন খেয়াল হয়নি। আমাকে বললেন, ‘চড়াই উতরাই’ পড়ছিস? বেড়ে বই।

আমি শুধরে দিলাম—দা ফল অফ আ স্প্যারো।

—ও তাই হল। বলে ভদ্রলোক উঠতে যাচ্ছিলেন।

—তুমি অনুবাদ করলে? চমৎকার নাম দিয়েছ।

মতিদা হাসলেন—ওরে বোকা, আমার পেটে কি আর অত বিদ্যে আছে, সুভাষ মুখুজ্জ্যের করা অনুবাদ, এন বি টি ছেপেছে, আমি তো বাংলাতেই এই বই পড়েছি।

আমি অবাক হলাম—এইটে আগে বলবে তো! তার মানে লাইব্রেরিগুলো থেকে দা ফল অফ আ স্প্যারো না তুলে খুনি ‘চড়াই উতরাই’-ও তুলে থাকতে পারে। গোটা তদন্তটাই এবার আমাদের কেঁচেগন্ডুষ করতে হবে।

—এই, কেঁচেগন্ডুষ মানে যেন কী?

মতিদা জানতে চাইলেন। উত্তর দিলাম না। ঝড়ের বেগে সিদ্ধার্থের ফোন নাম্বার ডায়াল করেছি। সিদ্ধার্থ ফোন ধরে শান্তভাবে আমার বক্তব্য শুনল আর ঠিক ততটাই আবেগবর্জিতভাবে জানাল যে তার পক্ষে নতুন করে তদন্ত করা সম্ভব নয়। আমি চাইলে নিজের উদ্যোগে কাজটা করতেই পারি। সে ভালোমত জানে, লোকাল থানাগুলিকে দিয়ে কাজটা করানোর মত প্রভাব লালবাজারের নেই। বড়োকর্তাদের কাছে নালিশ করে লাভ নেই, কর্তাদের চাপ সিদ্ধার্থ বর্তমানে ভালোভাবেই সামলে দিতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

ফোন রেখে দিতে যাব, সিদ্ধার্থ বলল- আজ সকালে নেসেশারি সার্ভেলেন্সের রাখহরি দেখা করতে এসেছিল, বলল তোমার নাম্বারটা সে খুঁজে পাচ্ছে না। ২১বি। মনে আছে তো?

বলতে ইচ্ছে করছিল—চুলোয় যাক রাখহরি। বড়োকর্তাদের আদরের জামাইকে তো সে কথা বলা যায় না।

সিদ্ধার্থ আমার রাগ বা বিরক্তি আন্দাজ করে অনুনয় করল- দাদা আমি কিন্তু আপনার সাইডে, আমিও চাই কেসটা সল্ভ হোক। অ্যাক্টিভলি অংশ নিতে না-পারলেও আমি আপনার সঙ্গে আছি। আপনি কাইন্ডলি আমার জুতোয় পা গলিয়ে ভাবুন।

—তোমার তো নাগরাই জুতো ভাই। বলে রিসিভার ক্রেডলে রেখে দিলাম।

দুপুরটা মাটি হয়ে যেতে বসেছিল। না-হল বইপড়া, না-হল কোর্টে হাজিরা দেওয়া, আর না-হল কোনো তদন্ত, উলটে জুনিয়ার অফিসাররা রোয়াব দেখাচ্ছে।

সিদ্ধার্থকে ফের ফোন করে ভিজে বেড়ালের মতো বললাম- যাব। রাখহরিকে থাকতে বল।

অবসন্ন মন নিয়ে ২১বি-এর দরজা ধাক্কা দিলাম। সিদ্ধার্থের ওপর যত না রাগ হচ্ছিল, তার চাইতে হতাশা আমাকে ঢের বেশি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমাদের সামনে একটা সুযোগ এসেছিল, কেবলমাত্র রিসোর্সের অভাবে সেই সুযোগ নষ্ট হতে বসেছে। এখন রাখহরির কাছে এলেও নতুন করে কী বা সূত্র মিলতে পারে! হয়তো আবার কোথাও চড়াই পাখিদের গণখুন করা হয়েছে, হয়তো খুনি এবার বাঁকুড়া কী দিনাজপুর অবধি চলে গেছে, সি আই ডি-এর কাছে খবরও নেই। সংবাদপত্রগুলি একফালি খবর করে দিয়ে দায় সেরেছে। সেটাই হয়তো রাখহরির চোখে পড়েছে। সে কর্তব্যবশত আমাকে জানাতে চায়, আর আমি জানি, আমার হাত-পা বাঁধা, কাজের কাজ আখেরে কিছু হবে না।

রাখহরি ২১বি-এর দরজা খুলে দিয়ে বলল—আজ সকালে একটা জিনিস দেখে বেশ সন্দেহ হওয়ায় সিদ্ধার্থবাবুর কাছে গেছিলাম। পাখিসংক্রান্ত বিষয় শুনে বললেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

—আবার মেরেছে?

রাখহরি যেন আমার কথা শুনতে পায়নি—আপনার ফোন নাম্বারটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এত কাগজ জমেছে এই ঘরে।

আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, ভাবছিলাম, এখান থেকে বেরিয়ে সোজা পানশালায় গেলে এখনও বিকেলটাকে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচানো সম্ভব।

রাখহরি নিজের চেয়ার টেনে বসল। টেবিলের ওপর খুলে রাখা খবরের কাগজের চার নাম্বার পাতা বের করে, আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—চিঠিপত্র বিভাগটা দেখুন।

আমি খেয়াল করলাম – আজকের তারিখের কাগজ, শহর সংস্করণ, কলকাতার সবচেয়ে নামি সংবাদপত্র।

ঘটনাচক্রে এই কাগজে আমরা ভুয়ো সংবাদগুলো ছাপাইনি। এই সংবাদপত্রটির নিরপেক্ষ বলে সুনাম আছে। পুলিশ আর পলিটিকাল পার্টির প্রেশারে তারা কাজ করে না।

চার নম্বর পাতার নীচের এক কোণে রাখহরি লাল মার্কারের ছোটো বৃত্ত বানিয়ে রেখেছে। বৃত্তের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি। চিঠির বক্তব্য এইরকম-

গ্রামে গ্রামে চড়াই পাখিদের দাপটে ফসলের প্রভূত ক্ষতিসাধন লক্ষ করা যাচ্ছে। দিন দিন ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, একথা জানা সত্ত্বেও যে রাজ্য সরকার সমস্যাটির বিষয়ে উদাসীন। মধুসুদন চক্রবর্তী। বৈদ্যবাটী।

রাখহরি খবরের কাগজের বাকি পাতাগুলি উলটাতে উলটাতে বলল—মনে হল, চিঠিটা আপনার কাজে লাগতে পারে।

কী বিষম কাজে লাগতে পারে তা রাখহরি জানে না। আমি এমন একটি মোক্ষম সূত্রই চাচ্ছিলাম। সিরিয়াল মার্ডারার নিজের কাজের জন্য আত্মতুষ্ট হবেই, তার প্রচার চালাবে, এটা স্বীকৃত, যুগে যুগে, দেশে দেশে, এই চিঠি কাকতালীয় হতে পারে না। সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেছিল। ভেতরে ভেতরে আমি উত্তেজনায় ফুটছিলাম।

—ফোন আছে আপনার কাছে?

রাখহরি তর্জনী তুলে ক্যান্টিনের দিকে দেখাল।

চারনম্বর পাতাটি হাতে মুড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, রাখহরি একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল-ওটা সরকারি সম্পত্তি, আপনার জন্য এক কপি জেরক্স করে রেখেছি।

কলকাতার এক নম্বর কাগজটি লালবাজারের তদন্তে সাহায্য করবার ব্যাপারে ঐতিহাসিকভাবে নিরুৎসাহী। বস্তুত বিভাগীয় সম্পাদককে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ফল হিতে বিপরীত হতে পারে। চিফ এডিটার কমিশনারকে ফোন করে কড়কে দিল, চাই কী, একটা আস্ত খবরও ছাপিয়ে দিতে পারে – পুলিশের হাতে সাংবাদিক নিগ্রহ। অথচ খবরের কাগজে ছাপার ওপর ভিত্তি করে তদন্ত করা পুলিশের রুটিন ব্যাপার। লালবাজারে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তা আগে থাকতে আন্দাজ করে সংবাদপত্রগুলির দপ্তরে খোঁচড় বসিয়ে রেখে গেছেন। আমি ভবানী ভবনের ক্যান্টিন থেকে নিজের অ্যাড্রেস-বুক ঘেঁটে একটি খোঁচড়কে ফোন করলাম। খোঁচড়টি সংবাদপত্রের দপ্তরে ডেস্ক এডিটর, বিদেশি নিউজ এজেন্সির পাঠানো খবর অনুবাদ করার কাজ। দফতরের অনেকদূর অবধি তার চেনাজানা আছে। সে ঘুম জড়ানো গলায় হ্যালো বলল। ক্যান্টিনের ফোনে এসব কথা বলা উচিত হবে না মনে করে খোঁচড়কে ফোনের সামনে থাকতে বলে ফোন ছেড়ে দিলাম। প্রায় লাফিয়ে দোতলায় উঠে সিদ্ধার্থের ঘরের দিকে ছুটে গিয়ে শুনি সে ঘরে নেই। আর্দালি দরজা আগলে বসে ছিল, বললাম—একটা ফোন করতে হবে। সে আমাকে চিনে থাকবে, আপত্তি করল না।

খোঁচড়কে বুঝিয়ে বললাম—মধুসূদন চক্রবর্তীর চিঠিটার একটা কপি আমার চাই, পোস্টকার্ডের দুদিকের ছবি সমেত। মধুসূদন চক্রবর্তী আগে কোনোদিন তাদের কাগজে চিঠি লিখে থাকলে তার কপিও পাঠাতে হবে।

খোঁচড় গাঁইগুই করছিল, দু-তিনদিনের আগে জানাতে পারবে না, নতুন বিভাগীয় সম্পাদক খুব কড়া লোক, চিলি না জাপানে কোথায় গতকাল রাতে ভূমিকম্প হয়েছে ইত্যাদি। আমি তাকে ধমক দিয়ে বললাম- সারাটা রাত পড়ে আছে, তোমাদের তো নাইট ডিউটি, ভোরের মধ্যে আমার চিঠির কপি চাই।

আমি অবশ্য ভোর হওয়া অবধি অপেক্ষা করিনি, বাড়ি চলে এসেছিলাম। পরদিন অফিসে এসে দেখি টেবিলের ওপর একটা খাম, তাতে টাইপ করে আমার নাম লেখা। ভেতরে মধুসূদন চক্রবর্তীর সাম্প্রতিক চিঠির একটা কপি, সঙ্গে টাইপ করা একটা নোট। খোঁচড় লিখেছে—মধুসূদন লোকটা আগেও দপ্তরে চিঠি লিখেছে। এবার প্রথম এর চিঠি ছাপা হল। আগের চিঠিগুলোর কপি নেই। ছাপা হলে আর্কাইভে থাকত। প্লিজ বিকেল পাঁচটার আগে ফোন করবেন না।

নোটে স্বাক্ষর নেই।

আমার আর্দালি বলল, লালবাজারের গেটে কানাইচরণের নাম করে আজ সকালে একজন খামটা রেখে গেছিল। আমি ভাবলাম, আহা বেচারা নিশ্চয়ই সারারাত ডিউটি করে এখন ঘুমাচ্ছে। অফিসে ধরা পড়ার ভয়ে টাইপ করে চিঠি লিখেছে, স্বাক্ষর করেনি, রাতে নিশ্চয়ই আমার চেম্বারে ফোন করেছিল।

মধুসূদন চক্রবর্তীর চিঠির কপি বের করে দেখি সেটিও টাইপ করা একটি ইনল্যান্ড লেটার। খবরের কাগজের দপ্তরের ঠিকানাটা অবধি ইংরেজিতে টাইপ করেছে। ভেতরের বক্তব্য বাংলায়। বৈদ্যবাটি পোস্ট অফিসের ছাপ আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম—সিদ্ধার্থকে জানাবার দরকার নেই। নিজের সাধ্যমত তদন্ত চালাই, যৌথ তদন্তের আদেশ যখন আছে তখন ওপরওয়ালা আমার একার ইনভলভমেন্টে আপত্তি করবেন না।

বৈদ্যবাটি থানায় ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম মধুসূদন চক্রবর্তীর খোঁজ চাই, বৈদ্যবাটির বাসিন্দা।

সিদ্ধার্থ লাইব্রেরির খোঁজে যতদিন সময় নিয়েছিল তার চেয়ে ঢের কম দিনে বৈদ্যবাটি থানার উত্তর পেলাম। থানার জবাবটি আশ্চর্যজনক, বৈদ্যবাটিতে মধুসূদন চক্রবর্তী বলে কেউ নেই, অসংখ্য চক্রবর্তী আছে, অনেক মধুসূদন আছে, কিন্তু দুইয়ে দুইয়ে মিলছে না। আমি আশা করছিলাম, অন্তত জনাদশেক মধুসূদন চক্রবর্তীকে পাওয়া যাবে, যারা বৈদ্যবাটির বাসিন্দা, তারপর ফুটপ্রিন্ট মেলানো যেত। সত্তরের ওপর বয়েস কিনা দেখা যেত। বৈদ্যবাটির অফিসার ইন চার্জ বললেন যে তারা রেশানের লিস্ট মিলিয়ে দেখেছেন, সুতরাং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

মনে আছে, ফোন ছেড়ে দিয়ে মধুসূদন চক্রবর্তীর চিঠির কপির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। আমার সামান্য বুদ্ধি বলছিল, মধুসুদন চক্রবর্তী যদি সত্যি খুনি হয় সে কেন স্বনামে চিঠি লিখবে! আর স্বস্থান থেকে কেনইবা সেই চিঠি পোস্ট করবে! যদি মধুসূদন চক্রবর্তী সত্যি খুনি হয়ে থাকে, নিজের কীর্তি সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা থাকবে। কিন্তু গোয়েন্দার বুদ্ধি এই সহজ যুক্তিকে মানে না, গোয়েন্দা কানাইচরণ ভেবেছিল, এই চিঠির মধ্যে তদন্তের সূত্র লুকিয়ে আছে, যা মেনে চললে এই দীর্ঘ তদন্তপ্রক্রিয়াটি সমাপ্ত হবে।