চড়াই-হত্যা রহস্য – ১০

১০

মদনপুর থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত পেরিয়ে গেছিল। পুলিশ-গিন্নিরা কর্তাদের বাড়ি ফেরা নিয়ে বিচলিত হয় না। খাবো কিনা জিজ্ঞাসা করে গিন্নি পাশ ফিরে ঘুমাল। জামাকাপড় পালটে যখন শুতে এলাম তখন রাত তিনটে। ভোরে উঠে ফিটফাট জামা পরে ভবানী ভবনের দিকে দৌড়োতে হল, অফিসে ফোন করে বললাম, সেকেন্ড হাফের আগে ঢুকতে পারব না।

প্রশাসনিক পরিভাষায় অল হ্যান্ডস ডাউন মিটিং এর অর্থ—কোনো একটি ঘটনাকে সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এক টেবিলে বসবে। প্রতিটি দপ্তরের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি বিবেচিত হবে। সর্বোপরি, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে একটা সমন্বয় তৈরি করার চেষ্টা করা হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইডেনে ক্রিকেট ম্যাচ বা গড়ের মাঠে বইমেলার জন্য যেমন দমকল, সিভিল ডিফেন্স, সি এ বি বা গিল্ড, পুলিশ ও পরিবহন দপ্তর একসঙ্গে বৈঠক করে বড়ো কোনো অপরাধ ঘটলেও, অথবা সম্ভাব্য নাশকতা বা অপরাধ আগে থাকতে সামাল দিতে, পুলিশের একাধিক দপ্তর, গোয়েন্দা, রাউডি সেকশান ইত্যাদি, ফরেনসিক সবাই মিলে অল হ্যান্ডস ডাউন বৈঠক করে থাকে। প্রশাসনিক মহলে এ ধরনের বৈঠক নিয়ে যেমন বিতৃষ্ণা আছে, তেমনি সব দপ্তর চেষ্টা করে তাদের দিকটা মিটিং-এ ভালো ভাবে তুলে ধরতে।

সিদ্ধার্থ আমাকে যে অল হ্যান্ডস ডাউন মিটিং-এ ডেকেছে, সেখানে লালবাজারের সরকারি হিসেবে এখনও কোনো ভূমিকা নেই। ভবানী ভবনে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলাম, আমার কাজ হতে চলেছে বাকিদের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত শোনা। নিজের মতামত চেপে যাওয়াই ভালো। কিন্তু আমি যে ভুল ভেবেছি, তা অচিরেই বোঝা গেল।

সিদ্ধার্থের ঘরে পৌঁছে দেখি তার চেয়ার ফাঁকা। আর্দালি বলল, কনফারেন্স রুম থ্রি-সিতে পাবেন। থ্রি-সি শুনে নাক কুঁচকালাম, থ্রি অর্থে থার্ড ফ্লোর, আর সি মানে কনফারেন্স রুম সি।

সাধারণত, অফিসের কনফারেন্স রুম-এ সবচেয়ে বড়ো সভাঘর, কমিশনার উপস্থিত থাকলে ব্যবহার করা হয়। কনফারেন্স-বি তে তিরিশ-চল্লিশজন লোক বসতে পারে, প্রোজেক্টর ইত্যাদি থাকে, লালবাজারে বি জাতীয় কনফারেন্স রুমে মিটিং পরিচালনা করেন ডিসি পদমর্যাদার অফিসারেরা। আর কনফারেন্স রুম-সি হল নিতান্তই সেজো-মেজো অফিসারদের চা-বিড়ি খাওয়ার এবং পিএনপিসি করবার জায়গা। থ্রি সি-তে পৌঁছে দেখি সিদ্ধার্থ টেবিলের এক কোণে একা বসে আছে।

একে কনফারেন্স রুম না বানিয়ে, চায়ের ক্যান্টিন বানালে হয়তো উচিত কাজ হত। আঁটোসাঁটো দেয়াল, অর্ধচন্দ্রাকৃতি টেবিল, তার চারিধারে পাঁচটি চেয়ার, আর দ্বিতীয় সারিতে আরও খান পাঁচেক চেয়ার, সেগুলোর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।

রুমে কোনো প্রোজেক্টর নেই, একটা ব্ল্যাক বোর্ড, টেবিলের ওপর ফোন। সিদ্ধার্থ নিজের সামনে খান দুই ফাইল আর কিছু কাগজ ছড়িয়ে বসে ছিল।

আমি বিরক্তিতে বলে ফেললাম—এই তোমাদের অল হ্যান্ডস ডাউন…! সিদ্ধার্থ কাঁচুমাচু হয়ে বলল- সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাহেব থাকবেন বলেছিলেন। সাহেবের পি এ লাস্ট-মিনিটে বলল, রাইটার্স থেকে তাকে ডেকে পাঠিয়েছে।

মজা করছ—এই চায়ের দোকানে সুপারিনটেন্ডেন্ট মিটিং করতে আসবেন! সিদ্ধার্থ গা বাঁচাতে বলল—বেশি ডিপার্টমেন্ট তো তদন্ত করছে না।

—অন্তত প্রাণীসম্পদ বিভাগ, পরিবেশ, বন দপ্তর?

—শুনেছি নাকি তারাও তদন্ত করছে, আমি ইনভাইট করেছিলাম। বলে সিদ্ধার্থ হাত দিয়ে ফাঁকা চেয়ারগুলি দেখাল।

আমি বিরক্তিতে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সিদ্ধার্থ বসতে বলল।

—তার মানে এই আমি আর তুমি, এই মিলে অল-হ্যান্ডস।

সিদ্ধার্থ হেসে বলল—মানুষের দুটো হাতই তো যথেষ্ট দাদা।

আমি চেয়ার টেনে সিদ্ধার্থর মুখোমুখি বসলাম। সে ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—আপনার মুড ভালো করবার জন্য একটা ভালো খবর। সি আই ডি একটা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশানের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে লালবাজার হোমিসাইড আর সি আই ডি একসঙ্গে কাজ করবে।

আমি অবাক হয়ে কাগজটা নিজের দিকে টেনে নিলাম। সিদ্ধার্থ ও আমাকে তদন্তের যুগ্ম দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের মূল উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো, পূর্বোক্ত ঘটনাগুলির অভিযুক্ত বা অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা এবং স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে কোওর্ডিনেট করে মানুষের মন থেকে ভয় দূর করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া। অনুমান করি, এই নির্দেশের পেছনে মতিদার অবদান আছে। তার জুনিয়র বিনা দায়িত্বে মাঠে ময়দানে তদন্ত করে বেড়াচ্ছে সেটা জানাজানি হলে তার ওপর চাপ আসতে পারত। সিদ্ধার্থ বলল—আপনি শিওর অর্ডারটা জানতেন না। কাল বিকেলে চিঠি করা হয়েছে। আমি আজ সকালে হাতে পেলাম।

আমি মাথা নাড়লাম—সোজাসুজি এখানে এসেছি।

সিদ্ধার্থ বলল—আরও একটা খবর আছে। ফরেনসিকটা ফার্স্ট ট্র্যাক করতে পেরেছি। দুদিনের মধ্যে আঁকশির রিপোর্ট এসে গেছে। ফুটপ্রিন্টও কয়েকদিনের মধ্যে পেয়ে যাব।

—কিছু পাওয়া গেছে?

—প্রত্যাশামতোই, না, আঁকশিতে রক্তের দাগ নেই। হাতের ছাপ আছে, তা তো থাকবেই, ব্যাধের নিজের আঁকশিতে তার হাতের ছাপ থাকবে না তো কার থাকবে। মদনপুরের বড়োবাবুর সঙ্গে কথা হল, ফরেনসিক রিপোর্ট শুনে বললেন—তিনি সেকেন্ড আঁকশিটাও আজই পাঠাচ্ছেন, উনি নিশ্চিত এটায় পাওয়া যাবেই।

—যাকগে যাক, ফরেনসিক আর হ্যান্ডপ্রিন্ট নিজের কাজ করুক, এই কেসটা এইভাবে সল্ভ হবে না। বলে আমি নড়েচড়ে বসলাম।

এই সুযোগ, আমি ভাবলাম, এইবার কেসের রাশ নিজের হাতে নেওয়ার সময় এসে গেছে। যে অর্ডারে লালবাজার আর ভবানীভবন তদন্তের যুগ্ম দায়িত্ব পেয়েছে সেই কাগজে মতিদা সূক্ষ্ম ভাবে নিজের একটি চাল রেখে দিয়েছেন। আমি আর সিদ্ধার্থ তদন্তের যৌথ দায়িত্বে থাকলেও বকলমে আমিই তদন্তের প্রধান গোয়েন্দা, যেহেতু সিনিয়রিটিতে আমি সিদ্ধার্থের চেয়ে এগিয়ে। সে কথা যদিও মতিদার বুদ্ধিমতো, সরাসরি অর্ডারে লেখা হয়নি।

আমি সিদ্ধার্থকে বোঝানোর চেষ্টা শুরু করি। যদিও তার অনুমতি বিনাও আমি সরাসরি সার্চের সরাসরি নির্দেশ দিতে পারতাম। তার পদমর্যাদার কথা ভেবে সেটা করতে চাইনি।

—সিরিয়াল মার্ডার-এর কেসের সঙ্গে সাধারণ মার্ডারের কেসের একটা প্রাথমিক তফাত আছে। সিরিয়াল মার্ডারের কেসে আমাদের হাতে অভিযুক্ত অগুনতি। যে কেউই কাজটা করে থাকতে পারে। এই কেসে বর্ধমান, কলকাতা, দুই চব্বিশ পরগনা আর নদীয়া মিলিয়ে একটা বৃত্ত আঁকলে প্রায় দেড় কোটি, কী তারও বেশি মানুষ আমাদের সাসপেক্ট। আপাতত ধরে নিই যে খুনি বুড়ো লোক, ফলে দেড় দু ঘণ্টার বেশি ট্রাভেল করে তার পক্ষে নির্দিষ্ট গ্রামে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নয়, আবার দেড় দু ঘণ্টা উজিয়ে ফেরত আসাও অসম্ভব নয়, কিন্তু কষ্টকর। খুনি অল্পবয়েসের হলে এই গণ্ডির ভেতর মেদিনীপুর, বাঁকুড়াও এসে যেতে পারে, অথবা বর্ডার মুর্শিদাবাদ। পুরুষ বা নারী খুন হয়ে থাকলে, আমাদের হাতেগুনতি সাসপেক্ট থাকে। বাড়ির লোকজন, কর্মস্থল বা ব্যবসায়ী সম্পর্কের মানুষজনের খুন করার উদ্দেশ্য থাকে। সেইক্ষেত্রে এলিমিনেশান আমাদের ভরসা, অর্থাৎ কারা কারা এই খুন করে উঠতে পারবে না, এলিবাই কী, কে ঘটনাস্থল থেকে দূরে ছিল, কার মোটিভ নেই বা আছে। ফরেনসিক ধরে, আমরা নেতি নেতি করে এগোতে থাকি। অন্যথায়, কোনো বিশেষ সূত্র পেলে, সেই সুতো ধরে টান দিই। কারুর সুনির্দিষ্ট মোটিভ পেলে তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক শুরু হয়। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, খুন থেকে সাসপেক্টের লাভক্ষতি দেখা হয়। এই সিরিয়াল কেসের সাসপেক্ট দেড়-দু কোটি মানুষ, তাদের নেতি নেতি বাদ দিতে হলে, আমাদের জীবন কেটে যাবে, অস্তিলাভ হবে না।

সিদ্ধার্থ আমার কথা মন দিয়ে শুনছিল। থ্রি-সি-এর দরজা ঠেলে একজন বয়স্ক লোক ঢুকে দ্বিতীয় সারির চেয়ার টেনে বসল। সিদ্ধার্থ তাকে দেখেও দেখল না। লোকটা বুকপকেট থেকে একটা কাগজ বের করে পেনসিল দিয়ে নোট লিখছিল। অফিসে বসদের একাধিক চোখ আর কান থাকতে হয়, আমি আন্দাজ করলাম লোকটি সি আই ডি অফিসের ভেতরের খোঁচড়। আমি পাত্তা না দিয়ে সিদ্ধার্থকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাই।

—সিরিয়াল মার্ডারে তাই ফরেনসিক বা অন্যান্য সূত্রের ওপর খুব ভরসা করে লাভ নেই। ফরেনসিক রিপোর্ট আর নানা সূত্র ধরে খুনির একটা অবয়ব তৈরি হতে পারে মাত্র। ভাবো, কাল যদি ফুটপ্রিন্টের রিপোর্টে বলা হয় যে, খুনির পায়ে কাটা দাগ আছে, আমাদের লাভটা কী হবে, যতক্ষণ না আসল লোকটাকে ধরতে পারছি। হাজার হাজার লোকের পায়ে কাটা দাগ আছে।

—আই এগ্রি, খুনিকে ধরতে পারলে নিশ্চিত হতে ফুটপ্রিন্ট তখন কাজে লাগবে!

—ফলত, আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, এই কেস আমাদের সেভাবেই সল্ভ করতে হবে, যেভাবে সিরিয়াল মার্ডার সল্ভ করা হয়।

—সেটা কীভাবে?

—সার্চ শুরু করতে হবে।

—সার্চ তো হচ্ছে, দক্ষিণবঙ্গের সব থানাকে জানান হয়েছে। খোঁচড়রা রাস্তায় ঘুরছে।

—ফল পেয়েছ?

সিদ্ধার্থ ইতস্তত করে বলল—না, এখনও অবধি না।

—পেলে ভালো। কিন্তু এই গোরু খোঁজা না করে, গোরুকে প্রথমে একটা জায়গায় টেনে আনি, তারপর চেনা-জায়গায় তাকে খুঁজি। তুমি সেই জোকটা জানো, একটা লোক সমুদ্রের বিচের একধারে কিছু একটা খুঁজছিল। একজন দেখতে পেয়ে বলল,—দাদা এখানে কী খুঁজছেন?—আমার ঘড়িটা ওদিকে খুলে পড়ে গেছে। —তা ওদিকে গিয়ে খুঁজুন, এদিকে কেন খুঁজছেন। লোকটা বলল- ওদিকে যা অন্ধকার, এদিকে আলোয় বেশ খুঁজতে সুবিধা হচ্ছে।

সিদ্ধার্থের হাসি পেল না, সে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করল—আপনি টোপ ফেলবার কথা ভাবছেন?

সিদ্ধার্থের পুলিশি শিক্ষা ওর মাথায় কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। ও যদি মেনে নিতে পারে যে পাখিদের হত্যা বস্তুত সিরিয়াল কিলিং, তবে আমি যে পন্থাগুলি বলতে চলেছি সেগুলো বুঝতে পারার অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

—জ্যাক দা রিপারকে ধরবার জন্য গোটা লন্ডন শহর না চষে, বরং আমরা নিজেরা একটা হোয়াইটচ্যাপেল ডিস্ট্রিক্ট বানিয়ে ফেলি। জ্যাককে আমাদের তৈরি হোয়াইটচ্যাপেল টোপ ফেলে ডেকে আনি। তারপর, বাকিটা অপেক্ষা।

—একটা ছদ্ম ক্রাইসিস তৈরি করা হবে?

—একেবারেই তাই। যেহেতু চড়াই পাখিই এখানে বধ্য, তাই চড়াইকে টোপ করা হোক। খুনিকে খুনির অস্ত্রে ঘায়েল করা। যেভাবে ব্যাটা চালের দানা ছড়িয়ে পাখিদের ডাকে আমরাও সেভাবে টোপ ছড়াব।

—মাস ক্যাম্পেনিং করব, লোকের মুখে মুখে গুজব ছড়িয়ে দিতে পারি।

—অনেকদিন সময় লেগে যাবে। বরং নিউজপেপারের দিক থেকে যাওয়া যাক।

—বিজ্ঞাপন দেবেন?

—না না। আমার প্ল্যানটা অন্য। দুটো গ্রামকে পছন্দ করো, ভানু সমাদ্দারের লিস্ট থেকে, যেখানে আগের বছর চাষবাসের ক্ষতি হয়েছে আর খুনির নজরেও এখনও পড়েনি। এই দুটি গ্রামের নামে খবরের কাগজের পাতায় পরপর কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে মিথ্যে খবর বেরোক। প্রকাশিত খবরে পাখির উল্লেখ থাকবে না, চাষের কী হাল, ক্ষয়ক্ষতি, চাষীরা কী ভাবছে এই গোত্রের খবর থাকবে। মোটকথা গ্রাম দুটোর নাম খুনির চোখে পড়ুক।

—বুঝতে পেরেছি, জালি খবর। কিন্তু এই ধরনের খবর তো খুবই সূক্ষ্ম হতে হয়, সরাসরি তো আমরা খুনিকে আহ্বান করতে পারি না। এমন সূক্ষ্ম খবর খুনিকে আদৌ উত্তেজিত করবে কি?

—সেটা ঠিক, খুনির মেরিট লেভেল কিন্তু আমরা এখনও জানি না। সেইজন্যেই দুটো গ্রাম থাক। একটার খবর হবে—মোটাদাগের, এই যেমন চাষবাসের খুব ক্ষতি হয়েছে ইত্যাদি, আরেকটায় খবর হোক, সূক্ষ্ম, গ্রামের রাস্তাঘাটের হাল ইত্যাদি।

সিদ্ধার্থ নোট করে নিতে নিতে বলল- হয়ে যাবে, ‘আজকের সময়’ কাগজে একটা চাষবাসের পাতা আছে, সাপ্তাহিক, সেখানে পরপর তিন সপ্তাহ খবরটা বেরোক। তার পরেও ফলো আপ করা যেতে পারে।

—আর তোমার যা ম্যানপাওয়ার আছে সেগুলো নিয়ে এই দুটো গ্রামে টার্গেট করো।

সিদ্ধার্থ আপত্তি করল না, কিন্তু বুঝতে পারলাম তার মেনে নিতে আপত্তি আছে। যতই হোক, এমন জালি খবর মানে অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া। খুনি হয়তো দুটো খবর দেখতে পেল, কিন্তু সেসব তাকে প্ররোচিত করল না। সে তৃতীয় একটি গ্রামে হানা দিল। তখন এতগুলো ম্যানপাওয়ার নষ্ট। আমি আশ্বস্ত করে বললাম—গোটাটা না হোক, মেজরিটি অফ দা ম্যানপাওয়ার এই দুটো গ্রামে যাক।

সিদ্ধার্থ নোট থেকে চোখ তুলে বলল—হয়ে যাবে কানাইদা।

নোট গুটিয়ে সিদ্ধার্থ উঠতে যাচ্ছিল, সে ভেবেছে অল হ্যান্ডস ডাউন মিটিং শেষ। আমি ভেবে এসেছিলাম, এই মিটিং-এ আমার বিশেষ কোনো ভূমিকা থাকবে না, কিন্তু দায়িত্ব যখন আমার ঘাড়ে চেপেছে তখন সে দায় পুরোটা না নামিয়ে আমি উঠব না। আমার কাঁধে তদন্তের ভার থাকলেও সিদ্ধার্থের নির্দেশে তদন্ত এগোবে, কারণ জেলায় জেলায় ভবানী ভবনের মতো ইন্টেলেজেন্স লালবাজারের নেই।

সিদ্ধার্থ চেয়ার টেনে বসে, রুমের তৃতীয় লোকটির দিকে আড়চোখে তাকাল।

আমি বললাম- আমি একটা ডেটাবেস সার্চ চাইছি।

সিদ্ধার্থ আকাশ থেকে পড়ল। —ডেটাবেস সার্চ, কীসের ভিত্তিতে সার্চ করব, কী এমন ইনফরমেশান আছে আমাদের হাতে? বুড়ো লোক, পাখি মারার ক্রিমিনাল রেকর্ডস?

—সেটাও করে দেখতে পার, তবে ক্রিমিনাল রেকর্ডস ঘেঁটে বিশেষ লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না।

—তাহলে আর কোন ডেটাবেস? ভোটার লিস্ট মেলাব? সিদ্ধার্থের কথা শুনে তৃতীয় ব্যক্তিটি ফিক করে হেসে ফেলল।

আমি সিদ্ধার্থের ফাইলের থেকে একটি সাদা কাগজ টেনে নিলাম। পকেট থেকে পেন বের করে লিখলাম—বয়েস সত্তর, দা ফল অফ এ স্প্যারো, বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, নদীয়া, ২৪ পরগনা।

সিদ্ধার্থ অবাক, জিজ্ঞাসা করল-এর মানে কী?

—মানে হয়তো কিছুই না, কিন্তু আমি একটা চান্স নিতে চাইছি। অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার থেকেও অনেক বেশি আন্দাজে ছোড়া ঢিল।

—বয়েস সত্তর বুঝতে পারলাম। কিন্তু ফল অফ স্প্যারোটা কী বস্তু? এই জেলাগুলিরই বা কোন ডাটাবেস সার্চ করব?

—কাজটা খাটনির জানি, ফলও না মিলতে পারে। তবে কাজটা না-করলে আমার একটা আক্ষেপ থেকে যাবে। ফল অফ আ স্প্যারো একটা বই-এর নাম। পক্ষীবিদ সালিম আলির লেখা। অন্য একটা সূত্রে আমি এই বইটির নাম জানতে পেরেছিলাম। খুবই বিখ্যাত বই, আত্মজীবনী।

—ওয়েট ওয়েট, আপনি কি লাইব্রেরি সার্চের কথা ভাবছেন?

—অবশ্যই তাই। ধরে নিচ্ছি খুনি এই বইটির সঙ্গে পরিচিত। বিগত দশকে সে এই বইটা লাইব্রেরি থেকে তুলে পড়েছে। কিনে পড়েনি, লাইব্রেরি থেকে তুলেই পড়েছে, এটাও ধরে নিলাম। এই ছটা জেলার মহকুমা আর জেলা লাইব্রেরি থেকে কতজন এই বইটা চেক আউট করেছে আমি জানতে চাই। যতদিন লাগে লাগুক, কিন্তু এই ইনফরমেশানটা চাই।

সিদ্ধার্থ হতোদ্যম হয়ে বলল—কোথায় একটা গোয়ারতুমি হয়ে যাচ্ছে কানাইদা। আমি পরপর সমস্যাগুলো বলছি, কেমন! প্রথমত আপনি খুনির একটা মেরিট লেভেল কল্পনা করে নিচ্ছেন, সেটা একপেশে কল্পনা। খুনি পড়ুয়া হবে, এর কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। দ্বিতীয়ত, সাবডিভিশনাল আর ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরিগুলো ছাড়াও জেলায় অসংখ্য সরকারি, আধা সরকারি আর ক্লাবের লাইব্রেরি আছে। তাদের কাছেও এই বইটা থাকতে পারে। আমাদের সার্চ স্পেসের বাইরেই সেই হিসেব থেকে যাচ্ছে। আর লাস্টলি, এতসব ভেবেও যদি সার্চ করতে যাই, তা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার শামিল হবে। লাইব্রেরিগুলোর ডিজিটালাইজেশান এখনও হয়নি। ম্যানুয়ালি এই গোটা খবরটা জোগাড় করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। লাইব্রেরির খাতা মিলিয়ে খুঁজতে হবে।

—তোমার প্রথম দুটো বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত। এটা একটা চান্স, আমি জুয়াটা খেলছি। হাজার খানেক সাসপেক্টের নাম পাওয়া গেলেও, সংখ্যাটা কমই আমার মতে। স্টোনম্যানের সময় লালবাজারের হাতে দশহাজারের কিছু বেশি সম্ভাব্য খুনির নাম ছিল। এটাও ঘটনা যে আমি ধরে নিচ্ছি খুনির পাঠাভ্যাস আছে। ক্রিমিনাল প্রোফাইলিং করার সময় গোয়েন্দার কল্পনা তো তাতে মিশবে। এটাকে এড়ানো যাবে না। লাস্টলি, লাইব্রেরির খাতা উলটানোর ব্যাপারটা আদৌ তেমন নয়। অনেকদিন বোধহয় লাইব্রেরি যাওয়া হয় না তোমার। সেলফে বইটা থাকলে বই-এর বাইন্ডিং-এ বরোয়িং স্লিপ থাকবে, বইটা লাইব্রেরিতে আসা ইস্তক কারা কারা চেক আউট করেছে তাদের কার্ড নাম্বার স্লিপ থেকে পাওয়া যাবে। সেই নাম্বার ধরে লাইব্রেরির খাতা মেলালে মেম্বারের নাম, বয়েস, অ্যাড্রেস ইত্যাদি তথ্য বেরিয়ে আসা উচিত।

সিদ্ধার্থ মাথা নেড়ে বলল—বইটা কলে থাকলে?

—কল ব্যাক করা হবে। মেম্বারকে চিঠি করে বইটা ফেরত নিয়ে আসা হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিকমে বসে কল ট্যাপিং করছ আর এই সার্চটা করতে পারবে না!

—আরে, আপনি কলট্যাপিং-এর কেসের সঙ্গে এই কেসের তুলনা করছেন, কী ধরনের কেসে কল ট্যাপ হয় আপনি তো জানেন। সিদ্ধার্থ গলা নামিয়ে বলল।

আমি কনফারেন্স রুমের চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। সিগারেট ধরালাম। ভবনের ভেতরে তখনও স্মোক ডিটেকটার বসেনি, সিগারেট নিয়ে কড়াকড়ি আজকের তুলনায় বেশ কম।

—একটা গল্প বলি তোমাকে, শোন।

সিদ্ধার্থ বড়ো বড়ো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

—কোথা থেকে এই গল্পটার উৎপত্তি আমি জানি না, একটা ক্রাইম কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে আমাকে দেরাদুন যেতে হয়েছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন, পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা ডুডেজা, এখন প্রয়াত, জীবদ্দশায় কমব্যাট ট্যাকটিক্সে তার মতো প্রবল পাণ্ডিত্য এদেশে অন্তত আর কারওর ছিল বলে আমার জানা নেই। পদাতিক আর নৌসেনার ক্রিয়াকৌশল আর ইতিহাস গুলে খেয়ে মিশিয়ে দিয়েছেন। কনফারেন্সে ডা ডুডেজা, প্রদীপ জ্বালিয়ে উদবোধন করে দু-চারটে কথা বলবেন, আমি মূলত সেটুকু শুনতেই গেছিলাম। এই গল্পটা ডা ডুডেজার মুখে শোনা। রাজার বিরুদ্ধে একদল বিদ্রোহী সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। অভ্যুত্থান পুরোপুরি সফল হয়নি আবার পুরো ব্যর্থ—তাও বলা যাবে না। সৈন্যসামন্ত নিয়ে বিদ্রোহীরা রাজধানী অবধি পৌঁছোতে পারেনি। যদিও দেশের একটা বড়ো অংশ তাদের দখলে চলে গেছে। সে অঞ্চলে আর রাজার শাসন নেই। রাজা ভাবছে বরাতজোরে খুব বেঁচে গেছেন। সেনাপতি ভাবছে রাজার অনুগত সেনার কর্মকুশলতাতেই বিদ্রোহীদের রাজধানীতে আসা আটকানো গেছে, কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। বিদ্রোহীদের মতলব ভালো না। রাজধানীর বাইরে তারা আপাতত চুপচাপ আছে, সুযোগ বুঝে শক্তি বাড়িয়ে ফের মাথা তুলবে। দেশের অংশ নয়, গোটা দেশটাতে তারা শাসন করতে চায়। অন্যদিকে, রাজাকে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না, তিনি মানতে পারছেন না যে দেশের একটা বড়ো অংশে তার কথা চলবে না। তিনি সেনাপতিকে আদেশ দিলেন যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ফের সামরিক অভিযান করতে হবে। বিদ্রোহীদের তুলনায় রাজার অনুগত বাহিনী অনেক বড়ো। সেখানে হাতিঘোড়া, সৈন্যসামন্ত আর অস্ত্রের অভাব নেই। সেনাপতি অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ মানুষ তবে বয়েসের ভারে ন্যুব্জ এবং আত্মতুষ্ট। বহু যুদ্ধে জেতবার খেতাব তার মাথায় রয়েছে। তিনি বুদ্ধি খাটিয়ে একটি যুদ্ধনীতি বানালেন। তার সৈন্যরা চারদিক থেকে প্রথমে বিদ্রোহীদের ঘিরে ধরবে, তারপর ধীরে ধীরে ফাঁস গুটিয়ে আনবে। যেভাবে অজগর শিকার ধরে, তাকে পেঁচিয়ে ধরে পিষে মারে। পরিকল্পনাটির নামও তাই দেওয়া হল—অজগরনীতি। মুশকিল হল, দেশ তো আর অজগরের ফাঁসে পড়া খরগোশ নয়, বিদ্রোহীরা দেশের হাজার হাজার মাইল জায়গা দখল করে রেখেছে। তার একটা বড়ো অংশ পাহাড়-নদী আর জঙ্গলে ঘেরা। রাজা কিন্তু সেনাপতির বুদ্ধিমত্তার ওপর ভরসা রাখলেন। অভিযান শুরু হল। ছোটোখাটো সংঘাত জারি রইল, মাঝারি মাপের কয়েকটি মুখোমুখি যুদ্ধ হল, দুপক্ষ কয়েক রাউন্ড কামান দাগলে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফাঁসটি কিছুতেই তৈরি হচ্ছিল না। ফাঁস বানাবার জন্য মাঝেমধ্যেই সেনারা রাজধানী থেকে এতদূরে চলে যাচ্ছিল যে তাদের কাছে রসদ পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না। পাহাড় পর্বত অতিক্রম করে ফাঁসটিকে আঁটোসাটো করে রাখাও দুষ্কর। বিদ্রোহীদের ক্রমাগত বাধা তো ছিলই। বছর ঘুরতে চলল, যুদ্ধ অবিরাম চলছে, জিনিসের দাম বাড়ছে, সৈন্যদের মৃত্যু হয়ে চলেছে, সেনাপতি ফাঁস বানানোর নানা পরিকল্পনা তখনও করে চলেছেন। অবশেষে রাজার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। বুড়ো সেনাপতিকে বরখাস্ত করে রাজা সহ সেনাধ্যক্ষকে বাহিনী পরিচালনার দায়ভার দিলেন। সহ-সেনাধ্যক্ষের বয়েস ছিল কম। মাথামোটা বলেও বাহিনীতে তার দুর্নাম ছিল। সে বললে, অনেক হয়েছে, এত জটিল আর সূক্ষ্ম পরিকল্পনার কোনো প্রয়োজন নেই। রাজার বাহিনীতে সৈন্যের সংখ্যা বিদ্রোহীদের থেকে কয়েকগুণ বেশি, তাহলে কেন আমরা সর্বশক্তি দিয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ে যাব না। সেই যুদ্ধ ভয়ংকর হবে, রক্তক্ষয়ী হবে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্রোহীদের পতন নিশ্চিত করবে।

সিদ্ধার্থ অসহিষ্ণু হয়ে বলল- শেষটা বুঝে গেছি, নীতিবাক্যও মেনে নিলাম। একটা ক্রড সার্চ, হয়ে যাবে, হোক। বলে সে আর তৃতীয় ব্যক্তিটি কনফারেন্স রুম ত্যাগ করল।

আমি টেবিলের নীচে পা ছড়িয়ে দিয়ে সিগারেটে শেষ টান দিতে দিতে ভাবলাম-আমার গল্পের গুঁতোয় ডিসি-এসিরা কাত হয়ে যাচ্ছে, সিদ্ধার্থ তো সামান্য জুনিয়র অফিসার।