২
আমি তখন লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগে জুনিয়ার ইনস্পেকটার, চাকরির বয়েস পাঁচ কী সাত বছর। নামেই জুনিয়ার ইনস্পেকটার, আসলে চ্যালাগিরি করছি। আর চ্যালাগিরি করার যে কী আনন্দ তা যে-কোনো উপযুক্ত চ্যালামাত্র বুঝবে। আমার গুরু ছিলেন গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়ার ইনস্পেকটার শ্রী মতি লাহিড়ী। তিনি আদর্শ গুরু, তাই আদর্শ গুরুর মতোই তিনি গুরুগিরি ফলান না, উলটে চ্যালাকে যথেচ্ছ চড়ে বেড়ানোর সুযোগ দেন। কেবলমাত্র চ্যালা বিপদে পড়লে মতিদা আবির্ভূত হয়ে সুতোর জট ছাড়িয়ে দেন। কলকাতায় তখনও সহজ খুন, মামুলি জালিয়াতি। মতি লাহিড়ীকে সেসব সল্ভ করতে লালবাজার ছেড়ে বেরোতে হয় না, ডেস্কে বসে কেস সল্ভ হয়ে যায়। স্টোনম্যান যদিও মতিদাকে খুব ভুগিয়েছিল, তখন লালবাজারমুখো হওয়ার সময় পাননি, ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে টহল দিয়ে বেরিয়েছিলেন। তবে সে গল্প অন্য কোনোদিন। মতিদার হাতে অঢেল সময়, অফিসে বসে স্টেটসম্যানের ক্রসওয়ার্ডস করেন, আর জুনিয়ারদের শুধু এদিকে-ওদিকে ঘুরে আসতে বলেন। কাজের ব্যাপারে না, তার উদ্দেশ্য জুনিয়ারদের চোখকান খুলুক। এইভাবে খোঁচড়দের চিনলাম, গড়ের মাঠে ঘোড়সওয়ার পুলিশের সঙ্গে আড্ডা দিলাম, শাল্লা এক একটা ঘোড়ার মাইনে কত জানিস! টেলিকম সেকশানের টেকনিশানদের সঙ্গে এক কাউন্টারে বিড়ি ফুঁকি। সেভাবেই জানতে পারলাম, সবার ফোন ট্যাপ হয়, আই মিন সবার, ফ্রম সিপি টু সিএম!
একদিন সকালে ডিপার্টমেন্টে ফোন এল। মতিদা রিসিভ করে কথা বললেন। আড়ি পেতে শুনলাম। স্টেট আই ডি থেকে ফোন করেছে। মতিদা রিসিভার কর্ডেলে নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—কানাই ভবানী ভবনে গিয়ে এই ডিপার্টমেন্টে দেখা কর তো।
বলে মতিদা একখানি প্যাড খুলে ঘষঘষ করে লিখে আমার সামনে ধরলেন।
আমি ভাবলাম ডিপার্টমেন্টের নাম বুঝি লিখলেন, কাগজখানা হাতে নিয়ে দেখি, সেখানে লেখা, রুম ২১বি।
আমার বিস্ময় আন্দাজ করে মতিদা স্টেটসম্যানের ওপার থেকে বললেন—ঘর নয়, আস্ত সেকশান, যদি না ডিপার্টমেন্ট।
মতিদার বাক্যগঠন ছিল ইংরেজি ধাঁচের, সেকেলে সিটি কলেজের গ্র্যাজুয়েট, বিষ্ণু দে-র সরাসরি ছাত্র।
আমি কাগজ বুকপকেটে গুঁজে ভবানী ভবনের উদ্দেশে রওনা দিলাম। পুলের গাড়ি নিলাম না, ট্যাক্সি ধরলাম।
ভবানী ভবনে সি আই ডির বাড়িতে ঢুকে এদিক-ওদিক খুঁজছি, কোনোভাবেই ২১বি পাই না, ঘরের নাম্বার দেখে কোনতলা তাও বোঝার উপায় নেই। দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাদের উত্তরে মনে হল, তারাও বোধকরি জানে না। কোনো রকমে ২১ নম্বর রুম পাওয়া গেল। ক্যান্টিন। ক্যান্টিনে ঢুকে ক্যাশিয়ারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ২১ এর বি-টা কোথায়? সে লোক ক্যাশ থেকে নেমে এসে আমাকে পথ দেখিয়ে ক্যান্টিনের লাগোয়া রান্নাঘরে নিয়ে ঢোকাল। গ্যাসের সিলিন্ডার, ডেকচি পেরিয়ে এসে দাঁড়ালাম একখানি খুপরি ঘরের সামনে। দরজার ওপরে লেখা রুম নং ২১ বি, নেসেসারি সার্ভেলেন্স সেকশান। বাপের জন্মে এমন সেকশানের নাম শুনিনি। ভবানী ভবনের ক্যান্টিনের রান্নাঘরের ভেতর যে সেকশান!
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখি আধো-অন্ধকার ঘর, একখানি বাল্ব জ্বলছে। ঘরের ছাদের ওপর দিয়ে দোতলায় যাবার সিঁড়ি উঠে গেছে। সে ঘরে একটিমাত্র লোক, একজোড়া চেয়ার টেবিল আর টেবিলের ওপর তাড়া তাড়া খবরের কাগজ।
লোকটি আমাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—আপনি লালবাজার থেকে আসছেন?
ক্যান্টিনের ক্যাশিয়ার আমার পেছনে দরজা বন্ধ করে চলে গেল। আমি একটি চেয়ার টেনে বসলাম।
লোকটি বলল——আমার নাম রাখহরি। এই সেকশানের ইনচার্জ, আগে দুজন ছিলাম, মি মণ্ডল লাস্ট উইক রিটায়ার করেছেন। আমি অনুমান করলাম তার আসনে আমি বসেছি।
রাখহরি বলল-আমি ভাবছিলাম মতিবাবু আসবেন।
যেখানে ভবানী ভবন ভরতি গোয়েন্দা, এত এত মেজো-সেজো অফিসার গিজগিজ করছে, তখন লালবাজারে খবর পাঠানোর কী ছিল আমি তার মাথামুণ্ডু বুঝলাম না। অনেকসময় কলকাতা-কেন্দ্রিক কেস হলে সি আই ডি লালবাজারের দ্বারস্থ হয়।
—মতিবাবু লেজেন্ড, তার ওপর আমার একটা…এখানে সব ঘাপলা, ধুর। আমি আর লালবাজার বনাম সি আই ডির দ্বৈরথে ঢুকতে চাইলাম না। সে লড়াই আদি অনন্তকাল চলছে আর চলবে।
রাখহরি আমাকে বসিয়ে রেখে খবরের কাগজের তাড়া হাতড়ে চারখানি দৈনিক খবরের কাগজ বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
—আপনি কি এখানে খবরের কাগজের ওপর নজর রাখেন?
রাখহরি একগাল হেসে বলল- এসব বলবেন না দাদা, ফ্রি প্রেস, আমাদের দেশে।
খবরের কাগজের পাতা উলটে রাখহরি একটি নির্দিষ্ট পাতা আমার সামনে মেলে ধরল, সেখানে এক কলাম খবরের চারিদিকে লাল দাগ দেওয়া। সেই দাগ রাখহরিই যে দিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। পরপর বাকি খবরের কাগজগুলিরও একটি নির্দিষ্ট পাতা খুলল, প্রতিটিতেই দাগ। আমি ঝুঁকে পড়ে খবরটি পড়লাম।
খবরগুলির মোদ্দা কথা, বর্ধমানের নিজস্ব সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন যে দুই দিন আগে গ্রামবাসীরা দেখতে পেয়েছে কয়েকশো চড়াই মৃত, পড়ে আছে। তাদের গলা নৃশংস ভাবে কাটা, লোকাল থানা মনে করছে স্থানীয় ক্লাবের শয়তানি।
রাখহরি বলল- সেম নিউজ, আলদা আলাদা গ্রাম, কোনোটা বর্ধমান, কোনোটা বা হুগলি। পাঁচতলি, নিজনগ্রাম, বড়লা আর সুমারই।
আমি ঝুঁকে খবরের কাগজেগুলির ডেট দেখলাম, এক মাসের মধ্যে ঘটনাগুলি, এখনও টাটকা বলা যায়।
রাখহরি বলল—প্রথম পাঁচতলির খবরটা দেখেছিলাম। অতটা গুরুত্ব দিইনি। গ্রামে চাষিরা নানারকম কিটনাশক স্প্রে করে তো, ভেবেছিলাম, কোনো একটা ডিজাস্টার ঘটে গিয়ে থাকবে। নিজনগ্রামের খবরটা মিস হয়ে গেছিল, সব তো আর মনে রেখে একটা প্যাটার্ন বোঝা সম্ভব নয়। তার পর বড়লার খবরটা যখন দেখলাম তখন পুরোনো কাগজ খুঁজতে বসলাম। দেখি, নিজনগ্রামেও এক ঘটনা, মোটের ওপর। অনেক পাখি একসঙ্গে মারা গেছে। এই দেখুন, একটি নিউজে লোকাল স্কুলের জিয়োলজি টিচার আর বিজ্ঞান মঞ্চের সম্পাদকের মতামতও ছেপেছে। তারা বলছে, এসব মানুষেরই কারসাজি। বুঝতেই পারছেন, পাখি মারা গেছে দেখলে অনেকেই ভূতের ভয়টয় পায়।
—আপনার নিজের দপ্তরকে জানিয়েছেন?
—বড়লার ঘটনাটা ধরার পরপরই। খবরের কাগজগুলো যদিও আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এখনও লিঙ্ক করতে পারেনি। আমি ডিপার্টমেন্টে জানানোর একদিন পরে সুমারই-এর ঘটনাটা ঘটে। সেখানে খেতের ওপর দেখা গেছে শয়ে শয়ে পাখি মরে পড়ে আছে। খবরের কাগজে এর বেশি বর্ণনায় যায়নি। আমি একটা নোটবুক বের করে খবরগুলির প্রকাশের তারিখ আর ঘটনাগুলি সংক্ষেপে লিখে নিলাম।
রাখহরি বললেন—ঠান্ডা মাথায় মেরেছে, তবে মানুষ তো জাতেই শিকারি, আমার কোথায় তবু খটকা লাগল! চারটে জায়গার নিউজ পাশাপাশি না রাখলে বোধহয় প্যাটার্নটা বুঝতে পারতাম না।
—ডিপার্টমেন্টে কে দেখছে?
—আমার বলা উচিত হবে না।
আমি রাখহরির কথায় বিরক্ত হলাম।
—লালবাজারের ইনভলভমেন্টটাই এখানে পুরোপুরি নিয়ম-বহির্ভূত। আপনার খটকা লেগেছে তাই মতিদাকে তলব করেছেন।
রাখহরি গলা নামিয়ে জানিয়ে দিল—সেভাবে কেসটা সি আই ডিতে কেউ-ই দেখছে না, তবে সিদ্ধার্থ নামের একজন সদ্য জয়েন করা জুনিয়র ইনস্পেকটার ফাইলটা নিজের কাছে রেখেছে। কেস পাখি পেরিয়ে কোনো সিরিয়াস অ্যাঙ্গেলে ঘুরলে তবেই সি আই ডি নামবে।
রাখহরির ২১বি নং ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সিদ্ধার্থের খোঁজ করলাম।
যতই নিজে পুলিশ হও, আর পুলিশের অফিসে পুলিশকেই খোঁজ, সরকারি অফিসে অফিসারকে খুঁজে পাওয়া সহজ কম্মো নয়। যদিও, এক্ষেত্রে, ২১বি-এর তুলনার সিদ্ধার্থকে খুঁজে পাওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। আমি সিদ্ধার্থের আসল নাম গোপন করলাম। বর্তমানে, সিদ্ধার্থ সি আই ডি-এর উচ্চপদস্থ কর্তা, কিন্তু তখন সে বছর পঁচিশের ছটফটে অফিসার, চোখে হালকা চশমা, চেহারা আর হাবভাব দেখে মনে হয় কাণ্ডজ্ঞান বাঁধা দিয়ে পুলিশের চাকরি নেয়নি।
সে আমাকে কনুই ধরে দোতলার করিডোরে এনে দাঁড় করিয়ে বললে- দাদা, এই পেটি কেসে লালবাজারকে আবার কেন ইনভলভ করতে হল!
সিদ্ধার্থ মোটামুটি একটা প্রাথমিক তদন্ত সেরে রেখেছে। জুনিয়র অফিসার বলে সে আর লালবাজারের ইনভলভমেন্ট নিয়ে প্রয়োজনের বেশি মাথা ঘামাল না, বরং তার প্রাথমিক তদন্তের নির্যাসটুকু আমাকে জানিয়ে রাখল।
পাঁচতলার ঘটনাটা পুলিশের কান অবধি পৌঁছোয়নি। কিন্তু নিজ গ্রামের ঘটনায় লোকাল থানা ঘটনাস্থলে গেছিল। গ্রামের থেকে খানিক দূরে একটা বাগানের মধ্যে পাখিদের মারা হয়েছে। বিষ নয়, একেবারে গলা কাটা হয়েছে। তবে সংখ্যাটা শয়ে শয়ে নয়, নিজনগ্রামে গুনতি করে ৪৭টি পাখি মারা হয়েছে, লোকাল থানা নাম্বারটা কম করে দেখালেও ৬০-এর বেশি নয়। নিজনগ্রাম ফাঁড়ি স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে দেখেছে, ওইদিন গ্রামে কোনো উৎসব, বা মোচ্ছব ছিল না। আপাতভাবে তাই পাখিহত্যার কোনো উদ্দেশ্য নেই। ফাঁড়ির ইনচার্জ স্যাম্পেল কালেক্ট করে পোস্ট মর্টেমের জন্য পাঠিয়েছিল। কিন্তু সে সময় মশাগ্রামে বাসডুবির ঘটনাটা ঘটে যাওয়ায় মর্গে পাখিদের জায়গা হয়নি। স্যাম্পেল বরফে রাখা হয়নি। এই ঘটনার দুদিন পরই বড়লার ঘটনা, ততদিনে সি আই ডি-এর নজরে চলে এসেছে। তা বাদে লোকাল থানাকেও বড়লার লোকেরা জানিয়েছিল। সি আই ডি যতক্ষণে স্পটে পৌঁছোয়, পাখিদের মৃতদেহ ডোমেরা এসে তুলে নিয়ে গেছে, পচতে শুরু করেছিল। খবরের কাগজে পড়ে ঘটনাটা সি আই ডি-র নজরে আসে। তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিজনগ্রামের থেকে আলাদা কিছু নয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কিছু স্যাম্পেল আইস বক্সে করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এসেছে, অবশ্যই বিষক্রিয়া নয়। তাতে বড়োকর্তারা সন্তুষ্ট, কারণ পাখিকে বিষ দিলে সেই বিষ কোনো ভাবে খাবারেও মিশেছে কিনা সেটা হেডেক হয়ে দাঁড়াত, হয়তো খাবারেই মেশান হয়েছিল, পাখিরা ভুলক্রমে খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু সেই পসিবিলিটি আর নেই। রিপোর্ট বলছে নিশ্চিত ভাবেই কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে পাখির গলা আধ ইঞ্চি চিরে দেওয়া হয়েছে। বড়োকর্তারা হালকা ভাবে নিলেও বড়লা থানা বিষয়টা হালকা নেয়নি, তারা তিলে তাল দেখছিল। বড়লা থানা নিজের খোঁচড়দের মাঠে নামায়, খোঁচড়রা গ্রামের নানা প্রান্তে কান পাতে। বড়লা ছাড়িয়ে তারা নিজনগ্রাম আর পাঁচতলিতেও খবর আনতে যায়। নানারকম কথা শুনতে পায়, যার বেশিরভাগটাই খবর হিসেবে নয়েজ, আলাদা করে খুনি বা খুনের মোটিভ সম্পর্কে কোনো ইনফরমেশান পাওয়া যায়নি। সেই হিসেবে আপাতত আমরা ধরে নিতে পারি যে খুনি আউটসাইডার, এই তিন গ্রামের বাসিন্দা নয়। খোঁচড়দের কাছ থেকে পাওয়া অপর একটি খবর যদিও বেশ অন্যরকম। গ্রামের লোক মনে করছে এটা কোনো তান্ত্রিকের কাজ। তারা মনে করে পাখিদের মধ্যে মানুষের আত্মা থাকে, দুষ্ট তান্ত্রিক পাখি বধ করে আত্মাকে কবজা করতে চায়। পুলিশের নজরে তিনটি গ্রাম বা তার সংলগ্ন শ্মশানে কোনো তান্ত্রিকের খবর নেই। তাই একে গাঁয়ের লোকের গল্পগাছা ভেবে আপাতত আমরা সরিয়ে রেখেছি। দ্বিতীয় আর একটি মত উঠে আসছে, কেউ পাখিদের মেরে পাখিদের গলার ভেতরে কিছু খুঁজছে। ঘটনা হল, এই ভ্রান্ত ধারণায়, কিছু খ্যাপাটে লোকও বিচ্ছিন্ন ভাবে একটা-দুটো পাখি মারার চেষ্টা করে। গ্রামের লোকজনই তাদের বকাঝকায় শান্ত করে, অন্যথায় উত্তমমধ্যমও দেয়। যাই হোক, কেসটা হপ্তা দুয়েক পড়েছিল, তারপর লাস্ট ঘটনাটা ঘটে, বর্ধমানের সুমারই-এ। বাকি সব বিবরণ আগের মতোই, আমি প্রায় পুলিশের সঙ্গেই স্পটে যাই। খেতের আল থেকে দূরে সংখ্যায় প্রায় চল্লিশ কী সত্তরটা পাখিকে পূর্বের কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। আগের ঘটনাগুলিতে যেমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না, এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আছে। খেতের মজুরের আট বছর বয়সি ছেলে। সে দুপুরবেলা শ্যালোর জলে খেলছিল, তখন দেখতে পায় একটি লোক আলের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ছেলেটিও আলের ওপর দিয়ে হাঁটা দেয়। লোকটি যেখানে এসে দাঁড়ায়, সেখানে ততক্ষণে পাখিদের মৃতদেহ পড়ে আছে। ছেলেটি ভয় পায়, লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে যে সে এই পাখিদের মেরেছে কিনা! লোকটি উত্তরে জানায় ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে’। এই বলে লোকটা পিঠে ঝোলা নিয়ে হাঁটা দেয়। ছেলেটির আর পিছু নেওয়ার সাহস হয়নি, সে তার বাপ-দাদাকে ডাকতে দৌড়য়। আমাদের প্রাথমিক ধারণা এই যে লোকটি পাখিদের মেরে শ্যালোর জলে হাত ধুতে এসেছিল। দুপুর রোদে মানুষের দেখা পাবে আশা করেনি। এত এত পাখির বডি দেখে ছেলেটা খুবই শকড়, ন্যাচারালি, লোকটার চেহারার মোটামুটি একটা বর্ণনা দিতে পেরেছে। আমাদের ধারণা, সন্দেহভাজন ব্যক্তির বয়েস সত্তরের আশেপাশে, বুড়োটে চেহারা, চুলের রং সাদা, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। আশেপাশের থানাকে সাবধান করা হয়েছে।
সিদ্ধার্থ তার প্রাথমিক তদন্তের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল, আমিও একটা সিগারেট চেয়ে নিলাম।
আমার মনে কয়েকটি প্রশ্ন এসেছিল, বেশ বুকভরে দম নিয়ে আমি সিদ্ধার্থের থেকে জেনে নিলাম।
সে জানাল—যে অঞ্চলের ঘটনা সেখান থেকে বর্ডার অনেক দূর, তাই বর্ডার পেরিয়ে কোনো দুষ্কৃতি আসবে এমন সম্ভাবনা নেই। স্থানীয় স্তরেও অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত সমস্যা নেই, গ্রামগুলি বর্ধিষ্ণু, মূল জীবিকা চাষবাষের। গ্রামের প্রাচীন লোকেরাও মনে করতে পারেনি এইভাবে একাধিক পাখিকে মারার ঘটনা তারা আগে দেখেছে কিনা। পাখিশিকারি যদি হয়, তারা পাখি মেরে ফেলে রেখে কেন যাবে তার যথাযথ উত্তর পাওয়া যায়নি। কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ঘটনাগুলি ঘটেনি, কখনও খেতের ধারে, কখনও বা গ্রামের দিঘির এক পাড়ে, তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থলের আশেপাশে বড়ো আদাড়বাদাড় বা বাগান রয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ, সেখানেই পাখিদের বসতি। কেবলমাত্র চড়াইদের ধরা হয়েছে। অন্য কোনো পাখির ওপর অত্যাচারের খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশের তরফ থেকে প্রাণীকল্যাণ ও বন দপ্তরে নোট পাঠানো হয়েছিল। তারাও প্রাথমিক তদন্তে মনে করছে মানুষকে ভয় দেখানো ছাড়া এইভাবে পাখিহত্যার আর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে না!
সিদ্ধার্থ আমার প্রশ্নের উত্তরে আরও জানাল যে—সুমারই থেকে যে স্যাম্পেল কালেক্ট করা হয়েছিল তাদের শরীরে কোনো বড়ো রোগের চিহ্ন নেই। অন্তত পাখিদের থেকে মানুষ বা গৃহপালিত জন্তুতে ছড়াতে পারে এমন কোনো রোগের জীবাণু স্যাম্পেলে নেই। সুতরাং, কেউ রোগ ছড়ানোর আতঙ্কে পাখি মেরেছে সেটা বলা যাবে না। তবে মানুষের মন, তা অনেক ভুল ধারণার বশবর্তী হয়। গ্রামের টিউকল আর নদীনালার জল এই ঘটনার পর টেস্ট করা হয়েছে। বহুকাল যাবৎ সুমারই আর পাঁচতলিতে আর্সেনিকের সমস্যা আছে, তা নতুন কিছু নয়। এক কথায় নাথিং নিউ, নাথিং এলার্মিং।
সিদ্ধার্থকে আমার কার্ড দিয়ে বললাম, কোনো ইনফরমেশান পেলে যেন অবশ্যই যোগাযোগ করে। কলকাতার বাইরে আমাদের যাওয়ার এক্তিয়ার নেই। সেও বেশ সাগ্রহেই কার্ড পকেটে পুরল, আমি বুঝলাম, এই কেস যদি সল্ভ হয়ও তার ক্রেডিট লালবাজার না ভবানী ভবন পেল তা নিয়ে কারওর মাথা ব্যথা থাকবে না।
সিগারেট ফেলে, সিদ্ধার্থকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।
ট্যাক্সি নিয়ে এসে লালবাজারের সামনে নামলাম, লাঞ্চ হয়নি, সিঁড়ি দিয়ে উঠে ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছি, দেখি মতিদা হস্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। আন্দাজ করলাম, ডিসি সাহেব তলব করেছেন। আমাকে দেখে শান্ত গলায় জানতে চাইলেন—ওই পাখির কেসটা? আমি অবাক—আপনি কী করে জানলেন দাদা? কাঁধ চাপড়ে বললেন, ভবানী ভবনটাও তো কলকাতার জুরিসডিকশানেই।
আমি অল্প হেসে, সম্মতি জানিয়ে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম, কী মনে হল, ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—দাদা কোনো পক্ষীবিশারদ চেনাজানা আছে আপনার?
মতিদা বুকপকেট থেকে ছোটো একটি নোটপ্যাড বের করলেন।
এই নোটপ্যাডটি তার সর্বক্ষণের সঙ্গী, খবরের কাগজ থেকে ইন্টেলিজেন্স ব্রিফিং সব কিছুর নোট রাখেন। আবার কাউকে কিছু বলবার হলে, মুখে না বলে নোটপ্যাডের খসখসে কাগজ টেনে লিখে হাতে ধরিয়ে দেন।
ঘষ ঘষ করে লিখতে লিখতে বললেন—লোকটা রেয়ার। রেয়ার স্পিসিজ। বাংলার আলপথ নিয়ে ওঁর একটা হেব্বি বই আছে। গবেষণা করে দেখিয়েছেন, যে আমাদের দেশে মোট যত আলপথ আছে শুধু তা এক করে চাষ করলেই দেশের খাদ্যসংকট বলে কিছু থাকবে না। বাই প্যাশন, হি ইজ এন অরনিথোলজিস্ট, পক্ষীবিদ। যদিও পেশাগত ভাবে সরকারি কর্মচারী। কিন্তু রোয়াবটা নবাবের। তাই সামলে।
মতিদা নোটপ্যাডের কাগজ হাতে ধরিয়ে ছুটলেন।
আমি দেখি মতিদার নোটপ্যাডের কাগজটায় লেখা আছে–রন্তিদেব সেন, আলিপুর জাজেস কোর্ট, সেকেন্ড এডিজে।
