নিদ্রাভঙ্গ

নিদ্রাভঙ্গ

কানাই-এর ঘুম ভাঙলো ক্রিমিনাল রেকর্ডস সেকশানের দিদিমণির গলা শুনে।

—কি মশায় দিনের বেলা পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছেন?

কানাই চেয়ারের মধ্যে ঢুলে পড়েছিলেন। দিদিমণিকে টেবিলের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেকে সামলে উঠে বসে দিদিমণিকে আপ্যায়ন করলেন। দিদিমণি ক্রিমিনাল সেকশানের রেজিস্টার। কানাইচরণ যতদিন ক্লোজড ছিলেন ততদিন দিদিমণি তামাদি হয়ে যাওয়া কেসের ফাইলপত্তর জোগান দিয়ে কানাইকে চাঙ্গা রেখেছিলেন। বয়স্ক, পৃথুলা মহিলা। তাঁতের শাড়ি আর সোনালি ফ্রেমের চশমা পরেন। বেয়ারাকে ডেকে কানাই নিজের আর দিদিমণির জন্য চা আনালেন। চা খেতে খেতে দিদিমণি নানাধরনের গল্প জুড়লেন। ইতিমধ্যে সৌভিকও এসে পড়েছে আর চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছে যে সিপিকে আজকের মতো সে ম্যানেজ করে এসেছে। চা আর গল্প ফুরানোর পর দিদি কানাই-এর টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কেস ফাইলে উঁকি দিলেন। বয়সের দোষে কানাই তাকে মানা করতে পারলেন না। দিদিমণির মনোযোগ ঘোরানোর জন্য কানাই বললেন—অনেকদিন সেসিল বারে যাওয়া হয় না, যাবেন একদিন?

দিদিমণির মনোযোগ ঘোরানো গেল না, তিনি শুধু ‘হুঁ” বলে সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞার রিপোর্ট পড়ার চেষ্টা করলেন। এবং ব্যর্থ হলেন। কেস ফাইল ছেড়ে দিদিমণি এর পর শিবুর তোলা ছবিগুলি নিয়ে পড়লেন। কাষ্ঠং শুষ্কং কেস ফাইলের চেয়ে অন্তত ছবিগুলি তার কাছে মনোরঞ্জক ঠেকল।

—বাবা, কী গ্রুসাম ব্যাপার মশায়। ভাতের থালার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে! কলেজ লাইফে কত যেতুম পাইস হোটেলে। তখন তো এইসব একদম ছিল না।

কানাই জিজ্ঞেস করলেন—কতদিন আগের কথা সেসব?

দিদিমণি দুষ্টু হেসে টা টা করে চলে গেলেন। কানাই চেম্বারের পরদার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর চোখ নামালেন টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কেস ফাইল আর ফোটোগুলোর দিকে। কানাই সব কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত হলেন। তার চোখ পড়ল ফরেনসিক ফোটোগ্রাফার শিবুর তোলা একটি ছবির দিকে। ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে তোলা জগমোহিনী ভোজনালয়ের ছবি। জগমোহিনীর দরজা দিয়ে ঢুকে ক্যাশবাক্সের পাশে দাড়িয়ে গোটা খাবার ঘরটির ছবি তুলেছে শিবু। কানাই কিছুক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সৌভিককে ডাকলেন।

—ছবিটায় কিছু মিসিং দেখতে পাচ্ছিস?

সৌভিক চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে কানাই-এর হাতে ধরা ছবিটির দিকে তাকাল, আট বাই ছয় এর প্রিন্ট, কোনো এফেক্ট মারা হয়নি। ব্রোমাইড ওয়াশ করে শিবু ছবি দিয়ে গেছে। সৌভিক তার স্মৃতি থেকে অপরাধস্থলটিকে মেলানোর চেষ্টা করল। ঘরে টেবিল আর চেয়ারের সারি, নীচে এঁটো খাবার পড়ে আছে। দূরের টেবিলে ভিক্টিমদের বাসি বাসনগুলো নেই, কারণ ফরেনসিকের শিক্ষানবিশ সেগুলো সেফ ডিজপোজালে নিয়ে গেছিল। চক দিয়ে দাগ কাঁটা আছে। কুলুঙ্গিতে খাবারের বালতি অবধি আছে।

—না, সবই তো আছে দেখছি। আমরা সেদিন যেমন যেমন দেখেছিলাম। সৌভিক বলল।

—সেদিন যা দেখেছিলাম, সেগুলো তো আছেই, কিন্তু যা থাকার কথা সেরকম কিছু কিছু জিনিস নেই। ইনফ্যাক্ট, এখন বুঝতে পারছি সেদিনও ছিল না। আমাদের চোখে পড়েনি।

সৌভিক নিজের মাথা ছবির সামনে নিয়ে এল। –কই না, কী থাকবে? টেলিভিশন?

—সেসব না, দেখছিস, অনেক টেবিলে নুনদানি নেই, আর অন্য টেবিলে আছে?

—হ্যাঁ। সৌভিক গুনে বলল- চারটিতে আছে, বাকি ছয়টায় নেই, ভিক্টিমদের টেবিলেও নেই। এতে অস্বাভাবিক কী আছে। চারটে নুনদানি তো আছে। সেগুলিই বাকিরা ব্যবহার করবে।

কানাইচরণ তার টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র থেকে আর একটি ফোটো বের করে আনলেন। আজ সকালে ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে তোলা নীলুদার হোটেলের তোলা ছবি। আমহার্স্ট স্ট্রিটের দিকে দাঁড়িয়ে নীলুদার খাবার ঘরের ছবি তুলেছে শিবু। কানাইচরণ প্রিন্টের ওপর হাত রাখলেন। ম্যাট ফিনিশ চকচক করছে। সৌভিক ছবিতে নুনদানি খোঁজার চেষ্টা করল।

—কই এই ছবিতে তো কোনো নুনদানিই নেই।

কানাই আঙুল ঠুকে বললেন—ভালো করে খেয়াল কর, নুনদানি নেই, কিন্তু ছোটো ছোটো কয়েকটা বাটি টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে। দেখতে পাচ্ছিস? সস্তার হোটেল, হয়তো আলাদা করে নুন-মরিচের দানি রাখেনি, ছোটো পাত্রে নুন রেখেছে সুবিধামতো। কিন্তু এখানেও সব টেবিলে নুনদানি নেই। ব্যস্ততার সময় ওয়েটাররা খাবার সার্ভ করবে, নাকি টেবিলে টেবিলে নুন পৌঁছে দেবে!

সৌভিক নুনের পাত্রগুলি দেখতে পেয়েছে, সে সন্দেহের সুরে বলল—কী বলল—কী বলতে চাইছেন দাদা, কেউ নুনদানি চুরি করেছিল?

—করে থাকলে আমি আশ্চর্য হব না। প্রথমে নুনদানি চুরি করল, তারপর সেই নুনদানিতে করেই বিষ নিয়ে এল। নুনদানিতে রাইস ট্যাবলেট গুঁড়ো করে আনলে একটা লাভ আছে, নির্দিষ্ট বাটিতে বিষ নিখুত ভাবে ফেলা যাবে, খাবারে, বিষ মিশেও যাবে।

—কিন্তু চুরি করা নুনদানি নিয়ে এলে তো ধরা পড়ে যাওয়ার চান্সও থাকবে?

কানাই একমুহূর্ত ভেবে বললেন—হতে পারে, পরপর কয়েকদিন নুনদানি চুরি করা হল। হোটেলে নুনদানি যথেষ্ট নেই, এই অজুহাতটা তৈরি করা গেল। ফলে শুধু একা অপরাধী নয় আরও অনেকে নিজস্ব নুনদানি নিয়ে আসবে। তাহলে অপরাধীর নিজস্ব নুনদানি হোটেলের কর্মচারীদের চোখে পড়বে না।

—এত কষ্ট করবে কেন? একটা পুরিয়া বানিয়ে আনলেই হত। তারপর সুযোগ বুঝে মিশিয়ে নিত।

—সেক্ষেত্রেও সমস্যা এটাই যে কেউ আলাদা করে খেয়াল করে ফেলবে। সৌভিক কানাই-এর যুক্তি মেনে নিয়ে বলল—নুনদানির ব্যাপারটা কি চেক করে দেখব?

কানাই কাগজপত্র আর ছবি ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন—নিজেরাই গিয়ে চেক করব, গাড়িটাকে লালবাজারের সামনে আসতে বল। আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার লকআপে শ্যামকান্ত আর নীলু গোঁসাই আছে না?

সৌভিক তাড়াতাড়ি গাড়ির ব্যবস্থা করল। লালবাজার থেকে আধ মাইল দূরে কোয়ালিস পার্ক করা ছিল। কানাই আর সৌভিককে নিয়ে কোয়ালিস যখন আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায় পৌঁছোল ততক্ষণে বিকেল পাঁচটা, একটা গুমোট গরম শহরকে ছেয়ে ফেলেছে। ভূঁইঞাকে মেসেজ করে সৌভিক জানিয়ে রেখেছিল যে তারা আসছে। ভূঁইঞা, কানাই আর সৌভিককে খাতির করে প্রথমে বড়োবাবুর ঘরে নিয়ে গেল। অ্যাপায়ন আর পালটা সৌজন্য পেরিয়ে কানাই ভুঁইঞার ঘরে এসে সিগারেট ধরিয়ে নীলু গোঁসাই আর শ্যামকান্তকে কাস্টডি থেকে নিয়ে আসতে আদেশ দিলেন। অনিচ্ছাকৃত খুনের চার্জ দিয়ে আপাতত হোটেলের কর্মচারীদেরকে পুলিশ লকআপে রাখা হয়েছে। দুই হোটেলের দুই মালিক এসে কানাই এর সামনে হাতজোড় করে দাঁড়াল। তাদের চোখ দেখে মনে হবে পুলিশকে তারা আর জীবনে বিশ্বাস করবে না। দুজনের কোমরে দড়ি বাঁধা। তিনজন কনস্টেবল পাহারা দিচ্ছে।

কানাই বললেন—আমি জানি তোমরা দোষী নও। আমি কথা দিচ্ছি পরের দিন কেস কোর্টে উঠলে তোমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের ল-ইয়ার আদালতে বলবে যে তোমরা নির্দোষ। কিন্তু তার জন্য আমাদের আসল দোষীকে কিন্তু খুঁজে বের করতেই হবে। তা থেকে আমরা এইটুকু দূরে দাঁড়িয়ে আছি। তোমরা যদি একটা খবর দাও, ব্যস তাহলেই…।

তুলনায় অল্পবয়েসি নীলু গোঁসাই কাতর গলায় বলল- আমি কিছু জানি না। স্যার, আমাকে ছেড়ে দিন।

—আহা, কী জিজ্ঞেস করছি আগে শুনে নাও। তোমাদের হোটেল থেকে কি ইদানিং নুনদানী, নুনের বাটি চুরি-টুরি হয়েছে?

নীলু উত্তর দেবার আগে শ্যামকান্ত বলে উঠল—হ্যাঁ হ্যাঁ বাবু, খুব, ওই ছেলেদুটো মারা যাওয়ার আগের হপ্তাখানেক জুড়ে প্রায় প্রতিদিন একটা-দুটো করে নুনদানি দেখি ভ্যানিশ। প্রথম প্রথম সার বুঝতে পারিনি। একসময় দেখি টেবিল জুড়ে একটাও নাই। স্টকে তো থাকে, আরও কয়েকটা প্লাসটিকের পাত্র দিলাম, দুদিনে সেটাও ফাঁকা হতে শুরু করল। কী ছিঁচকে চোর সার, দুটাকার জিনিস! এসব তো হোটেলে হয়েই থাকে, দুটাকার জন্য কী আর কাস্টমারের সঙ্গে বাওয়াল করা চলে। ছেলেদের বললাম, দুদিন চুপচাপ থাক, টেবিলে টেবিলে নুন দেওয়ার দরকার নেই, আপসেই দেখবি চুরি থেমে গেছে, তার মাঝে এই খুনের কেস। বলতে বলতে শ্যামকান্তের গলা ধরে এল।

কানাই নীলু গোঁসাই এর দিকে তাকাল।

—সেম কেস স্যার, নুন-লঙ্কার বাটি দেখি স্যার ঝেপে দিচ্ছে। আগেও আমাদের হোটেলে চামচ, চাটনির বাটি চুরি হয়েছে। সব পাতাখোরদের কাজ সার। গলিয়ে বিক্রি করে সার। আমি কয়েকটা পিসকে চিনি স্যার। ঠিকানা নেবেন?

কানাই বললেন—না ঠিকানায় আর কাজ নেই, তোমরা কাল পরশুর দিকে ছাড়া পেয়ে যাবে।

কনস্টেবলরা নীলু আর শ্যামকান্তকে নিয়ে চলে গেল।

সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা আর সৌভিক থ মেরে দাঁড়িয়ে ছিল।

—কানাই ধমকে বলল এখনও কি আমাকে বলে দিতে হবে কী করতে হবে!

সৌভিক আর ভূঁইঞা সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে পড়ল। আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার জুরিসডিকশানে ভূঁইঞার হিসেবে নথিভুক্ত পাইস হোটেলের সংখ্যাই একশো তিন, এ বাদে আরও ত্রিশ কী চল্লিশ বেআইনি খাওয়ার ঘর রয়েছে। কানাই নির্দেশ দিলেন খাতায় কলমে থাকা হোটেলগুলো দিয়ে শুরু করতে। তারমধ্যে খবর পাওয়া না গেলে তখন বেআইনি হোটেলের দিকটা দেখা যাবে। ভূঁইঞা আর সৌভিক দুজনে কাজ আধাআধি ভাগ করে লিস্ট ধরে পাইস হোটেলে ফোন করা শুরু করল। কানাই প্রথম দিকে শুধু সিগারেট খাচ্ছিলেন আর ভুঁইঞার টেবিলের ওপর থাকা পেপারওয়েট ঘোরাচ্ছিলেন। পরে দুই অধস্তনের কাজের দ্রুততা দেখে বুঝলেন এইভাবে চললে তিন-চার ঘণ্টা লেগে যাবে সব হোটেলে খবর নিতে। কানাই নিজের মোবাইল থেকে লিস্টের নীচের দিকে থাকা হোটেলগুলিতে ফোন করা শুরু করলেন।

ছটা চল্লিশে কানাই যে খবর আশা করছিলেন তা পেয়ে গেলেন। ভূঁইঞা জানাল—হেঁদুয়ার একটি পাইস হোটেল বলছে লাস্ট কয়েকদিন ধরে খুব নুনদানি চুরি হচ্ছে।

কানাই অপেক্ষা করলেন না। ভুঁইঞা ফোর্স নিতে বলছিল, কিন্তু কানাই মানা করে দিলেন। ভুঁইঞাকে উর্দি পালটে সিভিল ড্রেসে আসতে বললেন। থানার পাশেই ভুঁইঞার কোয়ার্টার, ভুঁইঞা উড়তে উড়তে গিয়ে জামাকাপড় পালটে উড়তে উড়তেই ফিরে এল। কানাই, সৌভিক আর ভুঁইঞাকে নিয়ে কোয়ালিস এবার চলল হেঁদুয়ার দিকে।