১৬
সেসিল বারের আলোগুলো নিভে আসছে। কানাইচরণের গল্পের দুই শ্রোতা, দিদিমণি আর সৌভিক, মদের নেশায় আধা-চুর, তবু কান খাড়া করে চড়াইপাখি হত্যার বিবরণ শুনছিল। কানাইচরণ মদ প্রায় খাননি, ঘড়িতে সাড়ে দশটা—এই এতখানি সময় তিনি শুধু দুটো এসি ব্ল্যাকের পেগ নিয়ে নাড়াচাড়া করে গেলেন, সঙ্গে মিক্সড পকোড়া। সেসিল বার এখন ফাঁকা, বারটেন্ডার এসে অনুরোধ করল বিল মিটিয়ে দিতে।
সৌভিক গোটা টাকাটাই নিজের পকেট থেকে দিল। কানাই হাঁপ ছাড়লেন, তার ওপর দিয়ে টাকাটা গেল না। দিদিমণি মোবাইল অ্যাপে ক্যাব ডাকলেন। তিনি যাবেন রাজাবাজার।
কানাইচরণ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—গাড়িতে করে যাওয়ার পথে বাকি গল্পটুকু বলব।
দিদিমণি বললেন—সে কী, খুনি তো ধরা পড়ে গেল, এর পর আর কী বাকি?
সৌভিক টলতে গিয়ে চেয়ার ধরে সামলাল-খুনির মোটিভ।
তিনজনে এসে গাড়ির অপেক্ষায় লালবাজার স্ট্রিটে দাঁড়াল। বাইরের হাওয়া বুক ভরে নিয়ে কানাইচরণ আশিস পালের গল্পে ফিরে গেলেন।
—বাকিটুকু যা বলব তা আশিস পালের মুখে শোনা। এর সত্যি মিথ্যে সব দায় আশিস পালের। আমি তদন্তকারী অফিসার ছিলাম মাত্র। যদিও আমি নিজের ইনপুট আশিস পালের মুখে বসিয়ে দেব, বোঝাবার স্বার্থে। সৌভিক কানাইচরণকে কনুই দিয়ে ঠেলে বলল—তাড়াতাড়ি, দিদিমণিকে নামিয়ে আমাদেরও ফিরতে হবে।
—আশিসকে লালবাজারে তুলে আনলেও আমি সে রাতে তাকে গ্রেফতার করিনি। লক আপে রাখিনি। যেহেতু গোটাটাই লালবাজার আর সি আই ডি-এর যৌথ তদন্ত ছিল, তাই আশিসকে গ্রেফতার করলে সি আইডি-র হাতে তুলে দিতে হত। গ্রেফতারের আগে আমি তাকে একটা রাত নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলাম। আশিসের কথা তার নিজের মুখে শুনতে চেয়েছিলাম। প্রয়োজন হলে, উত্তম মধ্যম দিয়ে তার পেট থেকে কথা বের করতে আমি দ্বিধা করতাম না। ইতিমধ্যে আশিসের ফুটপ্রিন্ট সংগ্রহ করে হ্যান্ড অ্যান্ড ফুটপ্রিন্ট স্কোয়াডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার অফিসে সে এমন ভাব করে বসে ছিল যেন এতদিনে তার কাজের স্বীকৃতি মিলেছে। অনুতাপ ছিল না, ভয় ছিল না, আশিসের চেহারায় আমি গর্ব দেখছিলাম যেন। মতিদা এসে তার চেয়ারে চুপচাপ বসে রইলেন। আমি আশিসকে জিজ্ঞাসা করলাম—বলুন মি পাল, এতগুলো নিরীহ পাখিকে কেন মার্ডার করলেন, আপনি তো ভূগোলের মাস্টারমশায়, লিটল ম্যাগাজিনের নামও এমনকি পেয়েছেন ভূগোলের টেক্সটবুক থেকে। আপনি চাষি নন, প্রাণীবিদ নন। আপনার পাস্ট যেটুকু ঘেঁটেছি, নকশাল করলেও ডাইরেক্ট অ্যাকশানে ছিলেন বলে মনে হয়নি, অবশ্য সেইটে আমার ভুল হতে পারে! তবে, কেন?
আশিস সম্ভবত আমার মুখে মার্ডার শব্দটি শুনে খুশি হয়ে থাকবে, সে বলল—শ্রেণীশত্রু খতম করার থেকে কিছু কম কাজ ছিল না!
—ও আপনি তাহলে আজকাল চড়াইপাখি খুন করে দিনবদলের স্বপ্ন দেখছেন?
আশিস ঠান্ডা মাথায় ধীরে ধীরে পুরোটাই খুলে বলল। আমি ভেবেছিলাম সে আখরোটের মতো শক্ত হবে, কিন্তু স্বীকারোক্তির সময় সে হয়ে উঠল তুলোর মত নরম। আমাদের বলল-নকশাল মুভমেন্টে ধরা পড়ার পর তাকে দমদম জেলে পাঠানো হয়। তার ওপর পুলিশি হেফাজতে অকথ্য অত্যাচার হয়েছিল। জেলে এসে প্রথম সপ্তাহখানেক জেল হাসপাতালে থাকতে হল, তারপর ঠাঁই হল জেনারেল ওয়ার্ডে। শরীর সেরে উঠতে শুরু করলে আশিস জেলের মধ্যেই দল আর দলবাজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একদিন পরিচয় হল একদম অন্য রকম এক বন্দির সঙ্গে, তার নাম মধুসূদন চক্রবর্তী। মধুসূদন আদতে বৈদ্যবাটির লোক হলেও আশিসের সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল না। মধুসূদনের কর্মকাণ্ড ছিল কলকাতা আর হাওড়া-কেন্দ্রিক। জেলের ভেতর পার্টির বই, ম্যানিফেস্টে মধুসূদনের আর মন নেই। মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বেরোনো হবে কি না তা নিয়ে মধু উদাসীন। কেবলমাত্র পরিবেশ আর জীবজন্তুর বই নিয়ে সে বসে আছে। তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জেলবন্দিদের ছোটো একটি বৃত্ত। আশিস সেই বৃত্তের সদস্য নয়। যাই হোক, কাঙ্ক্ষিত মুক্তির দিনগুলি এল, একে একে সকলেই ছাড়া পেলেন। মধুসূদনকে ঘিরে থাকা বৃত্তটি ছোটো হতে হতে একদিন ভেঙে গেল। আশিস আর মধুসুদনও জেল থেকে বেরিয়ে সমাজজীবনে ফিরলেন। পেটের দায় আশিসের কাছে বড়ো হয়ে উঠল, ফলে আশিস টিউশানি শুরু করল। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ওদিকে মধুসূদন বৈদ্যবাটিতে ফিরে এলেন। একই শহরে, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর দুজনের মধ্যে সখ্য তৈরি হচ্ছিল। আশিস অতীতে ভালো ছাত্র ছিল, মধুসূদন ছিলেন ভালো পড়ুয়া। দিনরাত মধুসুদন পড়াশুনাতেই ডুবে আছেন। এর বাইরে রুজিরোজগারের ইচ্ছা তার নেই, বাড়িভাড়ার টাকায় সংসার চলত।
আশিসকে মধুসূদন বলতেন—আমরা শুধু বসন্তের নির্ঘোষটাই শুনলাম, প্রাণের স্পন্দন আর শোনা হল না। আশিস মধুসূদনের সব কথা সেসময় বুঝতে পারত না, কিন্তু দুজনের মধ্যে একটা প্রাণের টান ছিল। মধুসূদন বলতেন—সামগ্রিক ভাবে একটা দলের বিপ্লব অসফল বা ব্যর্থ হতে পারে। সেটা ঐতিহাসিকরা বিচার করবেন, কিন্তু ব্যক্তিমানুষের লড়াই তো থেমে গেলে চলবে না। এখন আর দল করি না বলে, দল আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে বলে, আন্দোলন করব না—এ কেমন কথা! বই মুখে গুঁজে বসে থাকাই কি সেই আন্দোলন! তা হয়তো হবে, আন্দোলনের প্রস্তুতি। আশির মাঝামাঝি থেকে মধুসুদনের পড়াশুনার ঝোঁকটা পরিবেশ-জীবজন্তু থেকে সরে যায়। সে আবার নকশাল আন্দোলনের শিকড়ের কাছে ফিরে আসে। তার এই পরিবর্তনের খবর পার্টির একদা কমরেডদের কাছে পৌঁছোয়নি, কিন্তু আশিস জানত। মধুসুদন স্বভাবে ছিলেন অন্তর্মুখী। নিজের সম্পর্কে বা নিজের গবেষণা সম্পর্কে কাউকে কিছু জানাতেই তার কোনো আগ্রহ ছিল না।
চিনে মাও-এর মৃত্যু এবং দেও শিয়াওপিঙের ক্ষমতায় আসার ফলে প্রচুর নথিপত্র প্রকাশ্যে আসে, পূর্বে যেগুলো সেন্সরড ছিল। মধুসূদন সেসব নথি জোগাড় করে খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করেন। অন্যদিকে আশিসের তখন টিউশানির ভরা বাজার। অথচ মনের মধ্যে সময়াসময়ে খচখচ করে, এত আন্দোলন, এত লড়াই—জেলখাটা সব পেরিয়ে ভূগোলের প্রাইভেট টিউটর হয়ে সে পয়সা কামাচ্ছে! জীবনে ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশিস আর মধুসূদনের পারস্পরিক যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে। যোগাযোগ যত কমতে থাকে, আশিসের মনে মধুসূদনের প্রভাব তত দৃঢ় হয়। সেই মধুসূদন চক্রবর্তী যে শুধু ম্যানিফেস্টো পড়ে বিপ্লব করতে চায়নি বলে পার্টি তাকে আঁতেল বলে দেগে দিয়েছিল, তারপর পরিবেশ-জীবজন্তুতে আগ্রহী, সবশেষে ফের কালচারাল মুভমেন্টের ছাত্র মধুদন চক্রবর্তীকে আশিস প্রায় গুরু হিসেবে মেনে নিয়েছিল। ইতিমধ্যে দাদাদের সঙ্গে ঝামেলা করে আশিস বৈদ্যবাটি ছেড়ে নৈহাটি চলে এসেছে। বছরে হাতে-গুণে একবার কী দুইবার তার সঙ্গে মধুসূদনের দেখা হয় কী হয় না।
রেলগেটে কাটা পরে মারা যাওয়ার একমাস আগে মধুসূদন লোক পাঠিয়ে আশিসকে দেখা করতে বলেছিলেন। আশিস দেখা করে। সাক্ষাতে মধুসূদন আশিসকে একটি দুঃসংবাদ দেন। তার ক্যানসার ধরা পড়েছে। এর বেশি, আশিস অনেক অনুরোধ-উপরোধ করলেও মধুসূদন আশিসকে বলেননি। আশিসের ধারণা, রেলগেটে কাটা পড়বার ব্যাপারটি তাই দুর্ঘটনা নয়, আত্মহনন। যাই হোক, শেষ সেই সাক্ষাতের দিন, মধুসূদন আশিসকে একটি ফোল্ডার দেন, ভেতরে তার নিজের হাতে লেখা দশ পাতার নোট, কিছু জেরক্স। মধুসূদন চক্রবর্তী দুঃখ করে বলেছিলেন—জীবনে দুটো জিনিসকে আমি ভালোবেসেছি, পরিবেশ-প্রকৃতি আর সমাজবিপ্লব, যখন দুটির ভেতর একটিকে বেছে নেওয়ার সময় এল আমি দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিলাম।
ব্যক্তিগত গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে আশিস এই সময় একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ শুরু করে। বিশ্বেশ্বর সেন ছদ্মনাম নিয়ে একটি ছোটো শোকবার্তাও সে লিখেছিল। তখনও সে ভাবেনি যে এই বিশ্বশ্বর সেন নামটির নিয়তি কী হতে চলেছে!
মধুসূদন চক্রবর্তী নিজে পড়ুয়া লোক ছিলেন, আশিস ততখানি নয়! আশিসকে নোটটি পড়ে দেখবার জন্য মধুসুদন বারবার অনুরোধ করেন। আশিস তাকে কথা দেয়, সে পড়বে।
টিউশানির ব্যস্ততায় আশিস নোটের কথা ভুলে গেছিল। মধুসূদনের মৃত্যুর কয়েকমাস পরে সে ফোল্ডারটি খুলে হাতে-লেখা নোট পড়তে শুরু করে। চিনের কালচারাল রেভলিউশান, যা ভারতে নকশাল আন্দোলনের সমসাময়িক এবং পথপ্রদর্শক-মধুসূদন সেই কালচারাল রেভলিউশানের বহু নথিপত্র ঘাঁটতে শুরু করেছিলেন। কীভাবে এই নথিগুলি তার হাতে আসে, তা মধুসূদন লিখে যাননি। আশিস আন্দাজ করে নেন, পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হলেও মধুসূদনের পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। মধুসূদন যেসব তথ্য ঘেঁটে দেখছিলেন, তার বেশিরভাগটাই নকশাল আন্দোলনের সময় অজ্ঞাত বা অল্পজ্ঞাত ছিল। শতাব্দীর তিরিশের দশকে লং মার্চে এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ফরটি নাইনে চেয়ারম্যান মাও পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না প্রতিষ্ঠা করেন। মাও ছিলেন বিপ্লবী, স্বপ্নদ্রষ্টা। দেশকে কেন্দ্র করে তার একাধিক পরিকল্পনা ছিল। ক্ষমতা পেয়ে তিনি তার পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করলেন। ইংরেজিতে চেয়ারম্যানের মাও-এর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে বলা হবে—গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড। তার একাধিক পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক ছিল ন্যূনতম, ভাবালুতাই ছিল বেশি। চিনকে তার ভাবালুতার মোক্ষম মূল্য চোকাতে হয়েছিল। পরবর্তীকালের পার্টি কংগ্রেসে স্বীকার করা হবে, মাও-এর ভুল নীতির ফলে দেশের সমাজ ও অর্থনীতি ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পঞ্চাশের শেষের দিকে চিনে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাতে মৃত্যু হয় লাখ লাখ মানুষের। প্রকৃত সংখ্যাটি কোনোদিনই সামনে আসবে না। মানুষকে নরমাংস ভক্ষণের মতো ভয়ংকর কাজ অবধি করতে হয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষের সময় নিজের সন্তানের মাংস পিতা খেয়েছে—এমন নজিরও আছে।
১৯৫৯-এ মাও রাষ্ট্রনায়কের পদ থেকে সরে যান। নতুন রাষ্ট্রনায়ক হলেন-লিউ শাওচি। যদিও মাও কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে যাবেন, পার্টির একাধিক নেতার বিরোধিতা সত্ত্বেও। ষাটের মাঝামাঝি এসে দল ও ক্ষমতার রাশ ফিরে পেতে মাও-ই আবার ডাক দেবেন—কালচারাল রেভোলিউশানের।
যে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ থেকে এই সব ঘটনার শুরু তার পেছনে মাও-এর একাধিক সিদ্ধান্ত অনুঘটকের কাজ করেছিল। মাও নির্দেশ দিয়েছিলেন গ্রামবাসীদের সংঘবদ্ধভাবে চাষের জমিতে লোহা উৎপাদনের চেষ্টা করতে হবে, দেশের সামগ্রিক লৌহ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে। বলা বাহুল্য, চাষিদের জোর করে চাষজমিতে চুল্লিস্থাপন ও শ্রমে বাধ্য করা হত, ছোটো কৃষি গোষ্ঠীগুলি ভেঙে দিয়ে বড়ো কমিউনে মিশিয়ে দেওয়া হল। গ্রামে গ্রামে চাষিরা গণহারে হালচষা ছেড়ে, লৌহ আকরিক গলানো শুরু করল। সরকারি পরিসংখ্যানে শস্য উৎপাদনে কোনো ঘাটতি দেখা গেল না। বরং শস্য উৎপাদন, সরকারের মতে ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বাস্তবে দেখা গেল, গ্রামে ও শহরে শস্যের প্রবল ঘাটতি, মানুষের হাহাকার। মাও-এর এই সময় আর একটি নীতি ছিল—গ্রেট স্প্যারো ক্যাম্পেন। পরিবেশ আর সমাজবিপ্লবের ছাত্র হিসেবে মধুসূদনকে মাও-এর এই পরিকল্পনা প্রবল ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। মাও চেয়েছিলেন, ফসলের ক্ষতি করে এমন চারটি প্রাণীকে গ্রামবাসীরা মেরে ফেলুক, যার মধ্যে চড়াই অন্যতম। এ বাদেও তিনটি প্রাণী হল—ইঁদুর, মাছি ও মশা। গ্রামের বাচ্চাবুড়ো মাও-এর নির্দেশ মতো মেতে উঠল চড়াই মারতে। কেউ গুলতি দিয়ে মারছে, কেউ ঢাকঢোল বাজিয়ে চড়াইদের সারাদিন দৌড় করাচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে দম হারিয়ে চড়াই নিজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
রাষ্ট্রের প্রচারে নাকি রাষ্ট্রের ভয়ে সরল গ্রামবাসীরা তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধি নির্বাসন দিয়ে এই মারাত্মক কাজে ঢলে পড়েছিল, তা বলা মুশকিল, কিন্তু ফল হয়েছিল মারাত্মক। চড়াই পাখির মৃত্যুর ফলে অন্যান্য কীটপতঙ্গের উৎপাত মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। চড়াই ফসলের পাশাপাশি কীটপতঙ্গকেও খেয়ে থাকে। মোটের ওপর, শস্য-উৎপাদনে বৃদ্ধি তো হলই না, উলটে পরিবেশের নিদারুন ক্ষতি হয়েছিল। পরে, নিজের ভুল বুঝতে পেরে চেয়ারম্যান মাও মানুষের নজর ছারপোকা নিধনের দিকে ঘুরিয়ে দেবেন।
মধুসূদন ভেবেছিলেন যদি কালচারাল রেভলিউশানকে ভারতের প্রেক্ষিতে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে তাহলে ‘গ্রেট স্প্যারো মুভমেন্টই’ বা বাদ যাবে কেন? কালচারাল মুভমেন্ট কি নির্ভুল ছিল, অবশ্যই না, গ্রেট স্প্যারো ক্যাম্পেনও কি নিখুঁত, মোটেও না। পরিণতির কথা ভেবে কেন পিছিয়ে আসব, বরং নিজেদের প্রয়োজন মতো চেয়ারম্যান মাও-এর পরিকল্পনাকে আমরা বদলে নেব। যদি আমরা মাও-এর যুক্তিকে বুঝতে পারি, সেটাই যথেষ্ট—মধুসূদনের মতে। শেষজীবনে এসে এভাবেই, আবার মধুসুদন পরিবেশকে সরিয়ে রেখে সমাজবিপ্লবের পথকেই বেছে নিলেন।
ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে তাঁর পক্ষে আন্দোলনে নামা সম্ভব ছিল না, তিনি ছিলেন অন্তর্মুখীন মানুষ। প্রথম জীবনে স্বাধীন মত প্রকাশ করতে গিয়ে পার্টি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। অনুমান করা যায়, পার্টিই তাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনার প্রভাব তার মনে আজীবন ছিল। মধুসূদন তার চিন্তাসূত্রটি দিলেন আশিস পালকে। বিপ্লববাদ থেকে পুঁজিবাদের পথ বেছে নিয়ে আশিস তখন আত্মগ্লানিতে ভুগছে। চড়াই-সংক্রান্ত মধুসূদনের প্রতিপাদ্য প্রথমটায় মানতে না-পারলেও আশিস পরবর্তীতে মধুসূদনের যুক্তির কাছে ধরা দেবে। মধুসূদনের স্বপ্নপূরণ করাকেই আশিস নিজের মুক্তির পথ হিসেবে দেখবে। সুতরাং, আশিস নিজের বুদ্ধিমতো মধুসূদনের দেখানো পথে চিন্তাভাবনা শুরু করল। চিন দেশকে ভুলে সে ভারতের প্রেক্ষিতে ফসল ও চড়াই-এর ভূমিকা বুঝবার চেষ্টা করছিল। নিজে আঁক কষে দেখল যে চড়াই ফসলের কতটা ক্ষতি করে থাকে। যার প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে তার লেখা নিবন্ধগুলিতে দেখেছি। এই সময় আশিস সিদ্ধান্ত নেয়, বিশ্বেশ্বর সেন ছদ্মনাম নিয়েই পুরোদস্তুর লেখালিখি শুরু করার। নিজের পত্রিকা থাকায় কোনোরকম সম্পাদকীয় কাটাছেঁড়া ছাড়া নিজের লেখা প্রকাশ করতে অসুবিধা নেই। পাললিক কাগজে কবিতা আর গল্প ছাপা আসলে ছিল ধোঁকা, আশিসের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের মতবাদের প্রচার করা। অন্যদিকে সে তার গুরুর নাম ব্যবহার করে নিউজপেপারে চিঠি লেখা শুরু করে। বলতে দ্বিধা নেই, নানারকম নাম ব্যবহার করে পুলিশকে সে ভালোই ঘোল খাওয়াতে পেরেছিল। আশিসের ধারণা ছিল—তার গবেষণার ফল হবে সুদূরপ্রসারী—কিন্তু তার চিঠি ছাপা হল না। পত্রিকার জন্য প্রবন্ধ লিখল, পাত্তা পেল না। তার মনে পড়ল গুরু মধুসূদনের কথা—আন্দোলন শেষ হয়েছে কিন্তু লড়াইটা শেষ হয়নি।
আশিস দেখল-ষাটের দশকের গ্রেট স্প্যারো ক্যাম্পেনের মতো সার্বিকভাবে চড়াই নিধন শুরু করলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। তার উদ্দেশ্য ছিল চাষিদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। সে টার্গেট করল কিছু গ্রামকে, যে গ্রামগুলিতে বছর বছর ফলন কম হচ্ছে। মাঠেঘাটে রাজনীতি করার সুবাদে, গ্রামের লোকজনের থেকে চাষের হালহকিকত জানতে তার সমস্যা হয়নি। প্রথমে আশিস চড়াই খুন করতে এয়ারগান কিনেছিল, গুলতি দিয়ে পাখি মারবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু যেকোন দক্ষ সিরিয়াল কিলারের মতোই আশিস অচিরে বুঝে ফেলবে—কোন পন্থা নিলে কম খাটুনি খেটে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় পাখি খুন করা সম্ভব। গ্রামেগঞ্জের একাধিক হাট থেকে আশিস তার কুকর্মের অস্ত্রগুলি সংগ্রহ করে—বের জাল, আঁকশি। আশিসের বাড়ি তল্লাশি করে এই দুটি বস্তু আমরা উদ্ধার করি।
সৌভিক জিজ্ঞাসা করল—আশিস কি ‘দা ফল অফ আ স্প্যারো’ পড়েছে?
—ইয়েস। ‘চড়াই-উতরাই’ পড়েছে। এক ছাত্রী, এসব ঘটার বহুকাল আগে, তাকে উপহার দিয়েছিল।
কানাইচরণ গাড়ির সামনে থেকে নেমে এসে ক্যাবের পেছনের দরজা খুলে দিয়ে বললেন—লোকটা আমাকে একবার এ-ও বলেছিল যে তাকে যেন আমরা তিনশো দুই ধারায় কেস দিই।
দিদিমণি গাড়ি থেকে নেমে এলেন, তার গন্তব্য এসে গেছে।
—তিনশো দুই দেওয়া হলে নিশ্চয়ই জানতে পারতাম।
কানাই সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন।
—কিন্তু, কেন আশিস সেন সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছিল? সৌভিকও গাড়ি থেকে নেমে এসে জানতে চাইল।
কানাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন—সিদ্ধার্থের পরামর্শ মেনে অ্যানিম্যাল ক্রুয়েলটি অ্যাক্ট আর কন্সপিরেসির মতো মামুলি ধারায় কেস দিয়েছিলাম। কেস চলাকালীন ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে জেল হাসপাতালে আশিসের মৃত্যু হয়। …সিদ্ধার্থের বুদ্ধি-বিচারবোধ আছে, এমনি এমনি ওপরে ওঠেনি।
দিদিমণি সৌভিকের দিয়ে তাকিয়ে বললেন—ভয়ানক চিন্তাভাবনাকে কৌটোর মধ্যে আটকে রাখাই ভালো, দশজন জেনে ফেললে, অন্তত একজনের মাথায় সেটা চিরকালের মত থেকে যায়।
***
