১৪
পরবর্তী কাজ ছিল মধুসূদন চক্রবর্তীর সঙ্গীসাথিদের খুঁজে বের করা। মধুসূদন মারা গেলেও তিনি যে স্টাডি সার্কেলটি বানিয়েছিলেন তার সদস্যরা জীবিত থাকতে পারে। যেহেতু সেই সার্কেলের সদস্যরাও সেসময় জেলবন্দি ছিল সুতরাং তারাও নকশাল আন্দোলনে জড়িত ছিল—ধরে নেওয়া যায়। তাদের মধ্যে কেউ হয়তো মধুসূদনের পরিবেশ-প্রীতি নিজের মধ্যেও আবিষ্কার করে। আমি তাই চাইছিলাম মধুসুদনের জেলমেটদের খবর সংগ্রহ করতে। দমদম সেন্ট্রাল জেলের নকশাল পিরিয়ডের বন্দিতালিকা আনিয়ে লাভ হল না। মধুসূদন জেলে ছিলেন আট-আটটা বছর—থাকতেন জেলের জেনারেল ওয়ার্ডে—জেলের নথির স্তূপ দেখে আর সেই নথি বিশদে ঘেঁটে দেখবার প্রবৃত্তি হল না। আমি অন্য পথে ভাবলাম।
মধুসূদন যদি পরিবেশ ও জীবজন্তু নিয়ে এতই পড়াশুনা করে থাকবেন তাহলে তার থেকে আউটপুট কী? বই লিখলেন, জার্নাল ছাপালেন? এত বিদ্যে পেটে নিয়ে কেবল লোকটা বৈদ্যবাটি স্টেশানের রেলগেটে কাটা পড়তে পারেন না। গবেষণার তো একটা প্রকাশ থাকবে। গবেষণা সংক্রান্ত লেখালিখি যদি করে থাকেন, একক ভাবে ছাপালেন, নাকি যৌথ গবেষণা? আমি মধুসুদনের কাজের সূত্রে তার সঙ্গীসাথিদের চেনবার চেষ্টা করছিলাম।
প্রথমে কলকাতা ইউনিভার্সিটির বটানি আর জুলজি বিভাগের কয়েকজন অধ্যাপককে ফোন করলাম। তারা দুঃখের সঙ্গে জানালেন যে তাদের গবেষণার ক্ষেত্রে ওই নামে কাউকে চেনেন না, নামও শোনেননি। এর পর স্টেট ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যানিমাল হাজব্যান্ডি বিভাগে খোঁজ নিলাম। তারা তিনদিন সময় নিল, তাদের বিভাগের একজন সহসচিব মতিদাকে ফোন করে জানাল যে তাদের নথিপত্রে ও নাম নেই। তারা নিজেদের আর্কাইভ আর লাইব্রেরি ঘেঁটে দেখেছে। সহসচিব ভদ্রলোক মতিদাকে একটি সুপরামর্শ দিলেন। তাদের বিভাগের সংগ্রহশালা আকারে বড় নয়, আমরা যেন বই ও জার্নালের ব্যাপারে ন্যাশনাল লাইব্রেরির সঙ্গে দেখা করি। সরকারি দপ্তর সচরাচর অপর দপ্তরকে সহায়তা করে—এমন সুনাম নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টি অন্যরকম ঘটল।
ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে আমি নিজে গেলাম, কয়েকজন সহকর্মীকে সঙ্গে নিলাম, বই ঘাঁটার সুবিধা হবে। ডেপুটি লাইব্রেরিয়ানের ঘরে সারা দিন গ্যাঁট হয়ে বসে রইলাম। লাইব্রেরিয়ান তার কম্পিউটারে বইয়ের ক্যাটালগ দেখলেন। বললেন—লাইব্রেরি পুরোপুরি ডিজিটালাইজড হয়নি। যদিও পরিবেশ-প্রকৃতি ও জীবজন্তু সংক্রান্ত বইয়ের বিভাগে লেখক মধুসুদন চক্রবর্তীর উল্লেখ নেই। এই নামের কাছাকাছি কয়েকজন লেখক রয়েছেন। ডেপুটি লাইব্রেরিয়ানকে বলে সেই বইগুলিই আনালাম। ইতিমধ্যে আমার সহকর্মীরা আর তিনজন লাইব্রেরির কর্মচারী মিলে জার্নালের কলনাম্বার ধরে মধুসুদনকে খুঁজছে। তবু মধু পাওয়া গেল না। আমি বইগুলির লেখকদের নাম-ঠিকানা বা জীবনপঞ্জি ঘেঁটে দেখলাম। মধুসূদন চক্রবর্তীর সঙ্গে মিলছে না। একটা গোটা দিন শুধু এই বই ঘাঁটতে বেরিয়ে গেল। অথচ লোকটার হদিস পাওয়া গেল না। রাত এগারোটার সময় শেষমেশ হাল ছেড়ে দিলাম। ডেপুটি রেজিস্ট্রার হাই তুলতে তুলতে বললেন—আপনারা লিটল ম্যাগাজিনের দিকটা কেন দেখছেন না?
আমি ক্লান্ত গলায় জবাব দিলাম—ক্যাটালগ দিন।
ভদ্রমহিলা, ডেপুটি রেজিস্ট্রার বললেন—ওটা তো আমাদের কাছে নেই। আপনি বরং লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে খোঁজ করে দেখুন।
পরদিন মতিদার থেকে ঠিকানা জেনে একটি লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে হাজির হলাম। লাইব্রেরিটি হাজরার কাছে একটি জীর্ণ তিনতলা বসত বাড়ির দোতলায়। একতলায় বই বাঁধাইয়ের কাজ হয়। তিনতলার বারান্দায় জামাকাপড় দড়িতে মেলা দেখে মনে হল-মানুষ থাকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলে, দোতলার দরজার সামনে লাইব্রেরির বোর্ড ঝুলছে-সমরেশ লিটল ম্যাগাজিন চর্চা পরিষদ।
সকালে ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছিল। লালবাজারে হাতের কিছু কাজ সেরে ভরদুপুরে লাইব্রেরিতে হাজির হয়েছিলাম। মনে আছে, সেদিন কনকনে ঠান্ডা পড়েছিল। লাইব্রেরির দরজা ধাক্কা দিতে গিয়ে দেখি দরজার কপাট ভেজানো। চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। বাইরে থেকে লাইব্রেরিকে আকারে ছোটো মনে হয়েছিল, প্রবেশ করে বুঝলাম গোটা দোতলা জুড়ে লাইব্রেরি, দেয়াল ধরে ছাদ অবধি বইয়ের আলমারি উঠে গেছে, তাতে নানামাপের পত্রপত্রিকা রাখা। ঘরের মাঝখানে একফালি লম্বা টেবিল, তার দুধারে চেয়ার পাতা। দুজন পড়ুয়া বসে ম্যাগাজিনের পাতা উলটাচ্ছিল। ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে লাইব্রেরির জানালা বন্ধ করে রাখা, টিউবলাইট জ্বলছে। আন্দাজ করলাম এই ঘরটিই রিডিং রুম। ঘরের লাগোয়া তিনটি দরজা, একটি পাল্লায় লেখা লাইব্রেরিয়ান, বাকি দুটি ঘর বোধহয় লাইব্রেরির ম্যাগাজিন রাখবার জন্য ব্যবহৃত হয়।
লাইব্রেরিয়ান মধ্যবয়স্ক পুরুষ, পৃথুল, মাথায় অল্প চুল। আমি যখন দরজা নক করে তার ঘরে ঢুকলাম ভদ্রলোক চেয়ারে বসে ঢুলছিলেন। দরজা খোলার আওয়াজে তন্দ্রা ভেঙে বললেন—বলুন!
আমি নিজের পরিচয় দিয়ে প্রয়োজনের কথা বললাম- মধুসূদন চক্রবর্তী নামে কাউকে চেনেন?
ভদ্রলোক টাক চুলকে জিজ্ঞাসা করলেন—লিটল ম্যাগে লেখেন?
আমি নিশ্চিত বলতে পারলাম না, লাইব্রেরিয়ান বললেন—নাম শুনে তো মনে পড়ছে না এঁর কোনো লেখা পড়েছি। আপনি আমাদের কালেকশান দেখুন না কেন! কোনো মেম্বারশিপ লাগবে না। আমাদের মেম্বারশিপ নেইও। পুরোটাই চ্যারিটি।
গতকাল সারাদিন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে খাটাখাটুনির পর, আমার আর ম্যাগাজিনের আলমারি ঘেঁটে দেখার ক্ষমতা ছিল না। লাইব্রেরিয়ানকে সেকথা বললাম। ভদ্রলোক চিন্তিত মুখে বললেন—আর কোনো ইনফরমেশান, কী বিষয়ে লেখেন, কত বয়েস?
বেঁচে থাকলে বয়েস হত ষাট-পঁয়ষট্টি, পরিবেশ, ইয়ে পাখিটাখি নিয়ে লিখতেন, সম্ভবত।
লাইব্রেরিয়ান মাথা নাড়লেন- না স্যার মনে পড়ছে না। তবে আমাদের পরিবেশ সংক্রান্ত অনেকগুলো ম্যাগাজিন আছে, আপনি উলটে দেখতে পারেন।
আমি তার প্রস্তাবে পাত্তা না দিয়ে বললাম—নকশাল করতেন, মারা গেছেন।
ভদ্রলোক যেন বাতাসের গন্ধ শুঁকছেন, এমন মুখ করে বললেন—বৈদ্যবাটির মধু চক্রবর্তী নয়তো?
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম- হ্যাঁ অবশ্যই, হতেই পারে।
ভদ্রলোক নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য বললেন—ট্রেনে কাটা পড়েছিলেন কি?
—আলবাত, বৈদ্যবাটি রেলগেটে।
—বিলক্ষণ জানি মশায়, বলে লাইব্রেরিয়ান সন্দেহের সুরে বললেন—কিন্তু তিনি পরিবেশ নিয়ে লেখালিখি করতেন বলে তো শুনিনি।
আমি অবাক হলাম—আপনি তাহলে মধুসূদনকে কী করে চিনলেন? লাইব্রেরিয়ান একগাল হাসলেন—আরে মশায়, আমি নিজেও তো বৈদ্যবাটির লোক। বলে তার বুকে টোকা দিলেন।
আমি বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম -অতঃপর কী করা যায়। ওদিকে লাইব্রেরিয়ান একমনে কথা বলে যাচ্ছিলেন যে তিনি আদতে বৈদ্যবাটির লোক, এই লাইব্রেরিতে চাকরি করেন, সমরেশ রায়চৌধুরি ব্যানার্জি মারা যাওয়ার আগে ট্রাস্টি করে এই লাইব্রেরিটা বসিয়ে দিয়ে গেছেন ইত্যাদি হরেক অপ্রাসঙ্গিক তথ্য।
উঠতে যাব, এমন সময় লাইব্রেরিয়ান জিজ্ঞাসা করলেন—সালটা যেন কত?
—কিসের সাল?
—ডিমাইসের, কত সালে কাটা পড়লেন?
—নাইন্টিফোর-নাইন্টিফাইভ।
ভদ্রলোক চেয়ার ছেড়ে উঠে বিড়বিড় করতে করতে তার ঘরে রাখা আলমারিটির দিকে গেলেন। কাচের পাল্লা সরিয়ে একটা সেকেল ফোটোগ্রাফ রাখবার মতো বড়ো ডায়ারি নামিয়ে টেলিফোনের পাশে রাখলেন।
—একটা হেল্পই আপনাকে করতে পারব। এটা আমার পার্সোনাল কালেকশান বলতে পারেন। রাজ্যে যত অল্পখ্যাত, প্রায়-অখ্যাত লোক মারা যাচ্ছেন এটা তাদের নিয়ে লেখা অবিচুয়ারির কালেকশান। এনাদের মৃত্যুর খবর কোনো বড়ো কাগজ ছাপেনি, অথচ লিটল ম্যাগাজিনে যাকে বলে ঘটা করে শোকবার্তা ছাপা হয়েছে। আমি তার পেপার কাটিং নিয়ে রাখি, এইভাবে দেখুন পাতায় পাতায় কবি, শহরের নাট্যকারদের, মাঝারি মাপের পার্টিলিডারের, বছর বছর মৃত্যুর খতিয়ান সেঁটে রেখে দিয়েছি। রিসার্চারদের মধ্যে এর একটা ভ্যালু আছে। লাইব্রেরিটাকে তো টিকিয়ে রাখতে বলে। এই ডায়ারিটা লাস্ট পাঁচ বছরের। বলতে বলতে ভদ্রলোক বুঝি নিজের পিঠে অদৃশ্য চাপড় মারছিলেন।
আমি আদেশের সুরে বললাম—খোঁজা শুরু করুন। খানিক খোঁজাখুঁজির পর এক পাতার একটি শোকবার্তা পাওয়া গেল, ছাপা হয়েছে ‘পাললিক আজকাল’ পত্রিকার বিয়াল্লিশতম পাতায়, লাইব্রেরিয়ান আঙুল দিয়ে পাতার নীচের দিকে দেখালেন। লেখাটির শিরোনাম—নকশাল আন্দোলনের জননেতার প্রয়াণ। লিখেছেন বিশ্বেশ্বর সেন। লেখকের নামে আমার চোখ আটকাল। মনে পড়ল, চৌখুপি গ্রামের বৃদ্ধ মনোজ মণ্ডলকে খুনি নিজের নাম বলেছিল—বিশু। ডায়ারিটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে লেখাটা পড়লাম।
লেখাটিতে মধুসূদনের পিতামাতার পরিচয়, শৈশব, স্কুল-কলেজ সংক্রান্ত তথ্য আছে, যদিও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েই লেখক বেশি আলোচনা করেছে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাকি জীবনটা মধুসূদনের আর্থিক কষ্টে কেটেছে। দুই দিদি পরপর দুবছরে মারা যায়। সম্পত্তি বলতে ছিল বৈদ্যবাটির বাড়ি, রোজগারপাতি ছিল না, দুইঘর ভাড়াটে ছাড়া। অবিচুয়ারিটিতে মধুসূদনের পাখি ও পরিবেশ-প্রীতি নিয়ে আলগোছে দুই লাইনের মন্তব্য-জেলে থাকতে মধুসূদন পরিবেশ ও জীবজন্ত সম্পর্কিত বই পড়তে আগ্রহী হয়ে ওঠে, পরবর্তীকালে ফিরে আসেন নিজের পুরোনো পড়াশুনার বৃত্তে।
লাইব্রেরিয়ান টেবিলের উলটোদিক থেকে বললেন—এই একটা লেখাই চোখে পড়েছিল, মধু চক্রবর্তী মারা যাওয়ার পরে। এটাই ‘পাললিকের’ প্রথম সংখ্যা, তারপর থেকে প্রায় নিয়মিত বেরচ্ছে, কখনও ষান্মাসিক, কখনও ত্রৈমাসিক। ভাগগিস কেটে রেখেছিলাম।
—বিশ্বেশ্বর সেন কে? একে চেনেন, ইনিও কি বৈদ্যবাটির?
–ইনি লেখক, পাখিপাখালি নিয়ে এর লেখালিখি দেখেছি। আমি ডায়ারির পাতা থেকে সযত্নে সাঁটা অবিচুয়ারির জেরক্স সযত্নে ছিঁড়ে নিয়ে বললাম—বিশ্বেশ্বরের লেখালিখির স্যাম্পেল বের করুন, ঝটপট।
লাইব্রেরিয়ান তুড়ি বাজিয়ে বললেন—পাঁচ মিনিটে আনছি। এই যাব আর এই আনব। হেলতে দুলতে উনি পাশের ঘরে গেলেন বা অন্য ঘরগুলিতে, আমি অপেক্ষা করছিলাম। ভাবছিলাম এর পরের ধাপ হবে—–যে যে পত্রিকায় বিশ্বেশ্বর লেখালিখি করে তার সম্পাদকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা।
পাঁচমিনিটের আগেই লাইব্রেরিয়ান ঘরে ঢুকলেন, তার হাতে চার-পাঁচটি একই আকারের লিটল ম্যাগাজিন। টেবিলের ওপরে ম্যাগাজিনগুলিকে তাসের মতো ছড়িয়ে দিলাম। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত পাললিকের কপি।
—অনেক জায়গাতেই লেখেন, বেশি খুঁজে কাজ কী, পাললিকেই পেয়ে যাবেন। এই সংখ্যাগুলি দেখুন, লেখা থাকবে।
পাঁচটার মধ্যে তিনটির সূচিপত্রে বিশ্বেশ্বরের নাম রয়েছে। শিরোনামগুলি অদ্ভুত—যত পাখি তত ধান, ইঁদুর না চড়াই কে বেশি ক্ষতিকর এবং সর্বশেষটি হল—বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে।
সন্দেহ রইল না যে আমি বিশ্বেশ্বর সেনকেই খুঁজছি, বিশ্বেশ্বরই পাখির খুনি। পাললিকের একটা সংখ্যা নিয়ে বিশ্বেশ্বরের লেখা পড়া শুরু করলাম—তিন পাতার প্রবন্ধ। প্রবন্ধ না বলে অবশ্য ম্যানিফেস্টো বলা ঠিক হবে। চড়াইদের ওপর হিংসার কথা তাতে নেই। বিশ্বেশ্বর সরকারি পরিসংখ্যান ও ব্যক্তিগত নিরীক্ষার হিসেব করে দেখিয়েছেন চড়াই যত ফসলের ক্ষতি করেছে সেই পরিমাণ ফসল বাঁচানো গেলে একটা ছোটোখাটো দেশকে খাইয়ে-পরিয়ে রাখা যেত। পাললিকের অপর একটি সংখ্যা উলটালাম, বত্রিশ পৃষ্ঠার কাগজ, অনেকগুলো কবিতা, দুটি গল্প আর খুচরো প্রবন্ধ। সূচিপত্রের লেখক-কবিদের সারিতে বিশ্বশ্বরের নাম মাঝামাঝিতে রয়েছে। ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকার সুন্দর কৌশল। এই সংখ্যায় বিশ্বেশ্বর লিখছেন—আদি অনন্ত কাল ধরে পঙ্গপাল কীভাবে ভারতে ফসলের ক্ষতি করেছে। লাইব্রেরি বলেই দুপাতার লেখাটা বসে-বসে পড়ে ফেললাম। নিবন্ধটি, যাকে বলে, টু দা পয়েন্ট, এদিক সেদিকের কোনো কথা নেই, বাক্যবিন্যাস অসঙ্গত নয়, ছোটো ছোটো প্যারা, ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, নিজের বুদ্ধিমতো আঁক কষে শেষের এক প্যারাগ্রাফে যুক্তির জাল গুটিয়েছেন।
যে দুটি লেখা পড়লাম তাতে কোনোরকম হিংসার কথা নেই। পাখি আর ফসলের সম্পর্ক লেখককে ভাবিয়েছে, অথচ করণীয় কী হতে পারে, সে বিষয়ে লেখক মন্তব্য করেননি। ফলে পাখি মারার মতো ঘৃণ্য কাজ যে বিশ্বেশ্বর করে থাকতে পারেন সেটা পুলিশকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে। এই প্রসঙ্গে বলি, নিবন্ধগুলিতে বিশ্বেশ্বর সেন যেসব তথ্য দিয়েছেন সরকারি পরিসংখ্যান ঘেঁটে আর যেসব ঐতিহাসিকদের লেখা উদ্ধৃত করেছেন তা আদৌ যথাযথ কিনা আমি পরীক্ষা করে দেখিনি। যেসব আঁক কষেছেন, তার অনেকটাই আমার তার ছেলেমানুষি বলে মনে হয়েছে, যদিও সেগুলি নির্ভুল কিনা তা অঙ্কের মাস্টারমশায়রা আমার চাইতে ভালো বলতে পারবেন। তার সিদ্ধান্তসমূহ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ণিত হয়েছে কিনা তাও আমার বোধবুদ্ধির বাইরে। বিশ্বেশ্বরের লেখা পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছিল নিবন্ধগুলিতে যুক্তির জোর খাটানো আছে, লেখাগুলি পক্ষপাতদুষ্ট, এমন উদ্ভট গবেষণা আকাশ থেকে পড়তে পারে না, এর পেছনে ইন্ধন আছে। বিশ্বেশ্বর কোনো গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকলে বিষয়টি অন্যভাবে দেখতাম, কারণ গবেষণাকেন্দ্রগুলি দিনদিন আরও বড়ো মগজধোলাই কল হয়ে উঠছে। বিশ্বেশ্বরের মগজধোলাই সেপথে হয়েছে বলে মনে হয় না। সে স্বশিক্ষিত বলেই আমার ধারণা। সে কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলে এতদিনে তার খবর আমাদের সামনে চলে আসত। অবশ্য হতেও পারে, বিশ্বেশ্বর প্রাণীবিদ্যা বা পরিবেশবিদ্যার অধ্যাপক, কিন্তু তাঁর মূল গবেষণার বিষয় ভিন্ন। মনের অন্ধকারে বিশ্বেশ্বর যে উদ্ভট চিন্তা লালন করেন তার প্রকাশ ঘটে চলেছে লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে। আমি বিশ্বেশ্বরের সেই অন্ধকার মনটাকে দেখতে আর বুঝতে চাই।
লাইব্রেরিয়ানের অনুমতি নিয়ে পাললিকের সবকটি সংখ্যা তদন্তের স্বার্থে সিজ হল। লাইব্রেরিয়ান বললেন—আরও পত্রপত্রিকায় এনার লেখা দেখেছি, খুঁজলে কয়েকটা কপি পাব।
ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম যে তার দরকার হবে না।
এখন কাজ ছিল বিশ্বেশ্বরকে খুঁজে বের করা, লাইব্রেরিয়ানকে বললাম- লোকটা কে, থাকে কোথায় আর কী করে?
লাইব্রেরিয়ান অবাক হয়ে বললে- আহা মশায়, আমি চিনি মানে লেখালিখি দেখি এদিক-সেদিক, নানা পত্রপত্রিকায়। এই লাইনে একেই চেনাজানা বলে।
—পরিচয় নেই?
—কস্মিনকালেও নেই, এই কাগজটিও ডাকে পাঠায়। বলে লাইব্রেরিয়ান আমার থেকে একটি কপি চেয়ে নিয়ে পত্রিকার পেছনের পাতায় দেখাল—এই যে এদের ঠিকানা, ব্যাককভারে এটা দাগ দিয়ে নীচে, প্রকাশের সাল-তারিখ, সম্পাদকের নাম-ঠিকানা লেখা। রেজিস্ট্রেশান নাম্বার নেই।
সম্পাদকের নাম—সাধনা পাল। বৈদ্যবাটি। বৈদ্যপাড়া। পিননম্বর।
—আপনি নিশ্চিত, এরা ডাকে কপি পাঠায়, নিজের হাতে কেনেননি? লাইব্রেরিয়ান হেসে বললেন—এত কাগজ কিনতে গেলে তো ট্রাস্ট উঠে যাবে মশায়। সব কমপ্লিমেন্টারি কপি।
—ও আচ্ছা।
লাইব্রেরিয়ান টেবিলের ওপার থেকে ঝুঁকে পাললিকের সম্পাদকের নাম পড়ে বললেন—এ-ও বৈদ্যবাটি।
বিষয়টি আমিও খেয়াল করেছি, জানতে চাইলাম-চেনেন নাকি?
—না মশায়, ফিমেলদের খবর রাখি না।
আমি বিদ্রুপ করে বললাম—আপনি লিটল ম্যাগাজিনের লোক হয়ে নিজের পাড়ার সম্পাদককে চিনবেন না, ধুর তা হয় নাকি!
ভদ্রলোক বিজ্ঞভাবে বললেন—বেশিরভাগ আসল সম্পাদকই নিজের বউকে সম্পাদক বানিয়ে কাগজ চালায়। সরকারি অফিসে কাজ করলে স্বনামে পত্রিকা করা মুশকিল!
সাধনা পাল তবে আসল সম্পাদকের নিকটাত্মীয়া হতে পারেন। আমি কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করলাম—আপনি বৈদ্যপাড়ায় কখনও পাললিকের সম্পাদকের খোঁজ করতে যাননি?
—না মশায়। অত সময় কই। সকাল সকাল ট্রেন ধরে হাওড়ায় আসি। লাইব্রেরি বন্ধ করে ফিরতে ফিরতে হয়ে যায় রাত দশটা। এখন মেলা চলছে বলে রিডিং রুমে ভিড় কম। এসময় নাহলে অন্তত কুড়িটা লোক অলটাইম বসে থাকে। লোক বলতে তো আমি একা। ও আচ্ছা, এই একটি ব্যাপার, আপনার এই সম্পাদককে দরকার না? আপনি মশায় মেলায় গিয়ে দেখতে পারেন। বৈদ্যবাটি অবধি যেতে হবে না।
—কোন মেলায়?
—লিটল ম্যাগাজিন মেলায়, জানেন না বুঝি? রবীন্দ্রসদন-নন্দন চত্বরে চলছে তো। আজই শেষ দিন, পাললিকের স্টল থাকতেও পারে।
লাইব্রেরিয়ান টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি তিনভাঁজ করা কাগজের ফোল্ডার বের করলেন। লিটল ম্যাগাজিন মেলার ব্রোশিওর। কোন কোন পত্রিকা অংশগ্রহণ করেছে তার তালিকা।
—রেজিস্ট্রেশান না থাকলেও মেলায় স্টল নেওয়া যায়?
—নেওয়াই যায়, তেমন কড়াকড়ি কিছু নেই। ব্রোশিওর দেখে লাইব্রেরিয়ান বললেন—স্টল নাম্বার দুশো কুড়ি, মুক্তমঞ্চের পাশে। হ্যাঁ এই তো লেখা—আজকেই শেষ দিন।
