১২
ইডেনে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে ডিজি মিটিং ডেকেছিলেন, কলকাতা সংলগ্ন জেলাগুলির পুলিশ সুপারেরা ছিলেন, পরিবহন কর্তারা ছিলেন, সি এ বি-র প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। বড়োকর্তাদের লেজ ধরে লালবাজার থেকে আমরাও গেছিলাম। এ ধরনের মিটিং-এ নোট নেওয়া ছাড়া আমাদের কী বা কাজ থাকতে পারে, কখনো কখনো তাও নিই না, বড়োকর্তারা (এই মিটিং-এ মূলত ডিজি নির্দেশ দেন) নির্দেশ দিলে কাগজে নোট নেওয়ার অভিনয়ও করেছি। বড়োকর্তা সি এ বি- এর কর্তাদের সামনে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন, খেলোয়াড় আর দর্শকদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হল কম। একবার এক বড়োকর্তা বলেও ফেললেন, স্টেডিয়াম আর লজিস্টিকগুলো তো কলকাতা পুলিশ দেখে নেবে, আর জেলার দর্শকদের জেলা পুলিশগুলো ম্যানেজ করবে তাই গোটা মিটিংটা সংবাদমাধ্যমকে দেখানোর জন্য আর টিকিট বিক্রির হুজুগ তুলতে।
ডিজির পেছনের আসনে দেখলাম সিদ্ধার্থ বসে আছে। ডিজিকে মিটিং চলাকালীন ফাইল-নোট এগিয়ে দিয়ে সহায়তা করছিল। বইমেলা মিটলে ওর বিয়ে, যখন আর কোনো পুলিশি ব্যস্ততা থাকবে না।
আর্দালিকে দিয়ে সে একটা চিরকুট আমাকে পাঠাল, তাতে লেখা—কথা আছে।
আমি ভাবলাম, আবার থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে এমন কোনো তথ্য পাব যা জেনেও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।
মিটিং ভাঙলে সিদ্ধার্থ আমার জামার হাতা ধরে টানতে টানতে রাইটার্সের অলিন্দে নিয়ে এল। –এ কী, তোমাকে ভবানী ভবনে ফিরতে হবে না? অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
সিদ্ধার্থ ছদ্ম-বিস্ময় নিয়ে বলল—সে কী, শোনেননি, আমাকে ডেপুটেশানে রাইটার্সে পাঠিয়েছে, ডিজি সাহেবের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি করে!
তাহলে এই কারণেই ডিজি-এর পেছনের চেয়ারে তাকে দেখেছিলাম। মনে মনে খুশি হলাম, সকলে তো আমাদের মতো ল্যাদাভোদা থেকে যাবে না, জুনিয়র ইনস্পেকটার হয়ে ঢুকে, সিনিয়র হয়ে রিটায়ার। ইভোলিউশানই প্রাণীকুলের ধর্ম। গোয়েন্দা হিসেবেও কানাইচরণ অপরিহার্য নন। কাল অন্য কেউ দু-ধাপ পদোন্নতি পেয়ে তাকে সরিয়ে দেবে।
ডিজির চেম্বারের মুখোমুখি সিদ্ধার্থের অ্যান্টিচেম্বার, প্লাইউডের পার্টিশান দেওয়া, দরজার সামনে আর্দালি বসে আছে, পাশে একটি পোর্টেবল টাইপরাইটার নিয়ে মহিলা পি-এ। চেম্বারের টেবিলের ওপর দুটি ফোনের লাইন, সিদ্ধার্থের হাতে পেজার! চমকৃত হলাম, না বলে পারলাম না, করেছ কী হে!
সে হাসল, আমাকে বসতে বলল, নিজেও গদি আঁটা চেয়ারে বসল।
—সেদিন ওভাবে পথে দাঁড়িয়ে কথা বলার জন্য খুব দুঃখিত। আজ একটু জমিয়ে কথা হোক। ঠান্ডা না গরম? উত্তরের অপেক্ষা না-করে সিদ্ধার্থ বেল টিপে দুজনের জন্য চিনি ছাড়া কালো কফি আনতে বলল। আর্দালি সেলাম ঠুকে চলে গেল।
—সেই পাখি মার্ডারের কেসটায় নতুন একটা ঘটনা ঘটেছে। সিদ্ধার্থ বলল।
আমি নিস্পৃহভাবে বললাম—এখনও কেসটার কথা মনে রেখেছ!
আমার ব্যঙ্গক্তিকে সে পাত্তা দিল না। —ভবানী ভবন থেকে চলে আসায়, এখন সময়মতো অনেক খবর কানে আসে না। যে কথাটা আপনাকে বলার তা হপ্তা খানেক পুরোনো তো বটেই। আমি জেনেছি দিনদুয়েক।
—নতুন করে কিছু ঘটেছে?
—না, তবে ঘটতেও পারত। ঘটনাটা শুনুন।
আর্দালি এসে আমাদের দুজনের জন্য টেবিলের ওপর দু-কাপ কফি রাখল, আমি কফিতে চুমুক দিয়ে সিদ্ধার্থের অনুমতি নিয়ে সিগারেট ধরালাম।
—আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু কেসটা সল্ভ করার জন্য সি আই ডি সত্যি ঝাঁপিয়েছিল। একটা সময় এমন দাঁড়িয়েছিল আমরা সব মিলিয়ে তিনশো জন খোঁচড়কে কেবলমাত্র এই কেসের জন্য পথে নামিয়েছিলাম। তা বাদে লোকাল থানার খোঁচড়, ম্যানপাওয়ার পাঁচশোর কাছাকাছি ছিল। পরে, যখন আপনার কথামতো জাল গুটিয়ে দুটো গ্রামের ওপর নজর রাখতে শুরু করি তখন হাতে জনা তিরিশকে রেখে বাকিদের ছুটি করে দিই। ডিপার্টমেন্টের অনেকে এই ব্যাপক তদন্তের কথা জানতেন, বেশিরভাগের আপত্তিও ছিল, হাসাহাসিও হয়েছে। তা যাকগে, এভাবেই বোধকরি হবে—কথা চালাচালি হতে হতে, তদন্তের বিষয়টি এক প্রাক্তন খোঁচড়ের কানে গেছিল। লোকটার নাম বলব না, সংগত কারণেই। প্রাক্তন খোঁচড় বলছি কারণ তিনি অবসর নিয়েছেন, বহুদিন হল, বয়েসও তার অনেক। কিন্তু কানগুলো সজাগ, অনুমান করি—বর্তমান খোঁচড়দের থেকে তিনি এই পাখি মারার কেসটা শুনে থাকবেন।
—এর বাকি ইন্দ্রিয়গুলো ঠিকঠাক আছে? চোখ, মুখ?
—তা আছে। শুধু স্মৃতিশক্তিটা দুর্বল। কিন্তু আমাদের কাজ চলে যাবে। খোঁচড়টি এখন অবসর নিলেও তার খোঁচড়স্বত্তা অবসর নেয়নি। এই লোকটির বাড়ি উ. ২৪ পরগনার কার্তিকপুরে, বারাসাতের কাছে। সপ্তাহখানেক আগে ইনি গ্রামের একটি পুকুরে মাছ ধরতে যাচ্ছিলেন, দুপুরবেলা। গ্রামের আদারবাদাড় পেরোনোর সময় তিনি একজন সন্দেহভাজনকে দেখতে পান। সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি বাগানে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরছিল। সেও খোঁচড়কে দেখতে পায়। খোঁচড় কিছু বলবার আগেই লোকটি দ্রুতপায়ে হাঁটা দেয়। খোঁচড় বয়স্ক মানুষ তাই তার পক্ষে ধাওয়া করা সম্ভব হয়নি। লোকটির লম্বা পায়জামা ছিল, সাদা পাঞ্জাবি আর চটের শাল। কাঁধে কাপড়ের ঝোলা।
—মুখ দেখতে পেয়েছে?
—ইয়েস সেটাই পয়েন্ট, মুখ দেখতে পেয়েছে। প্রথমটা দেখে খোঁচড় বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল চোর-ছ্যাঁচোড় হবে, অথবা জমির দালাল। ওদিকে উদ্বাস্তু ইস্যু আছে, অনেক জমির দালাল ঘোরাঘুরি করে। পরে, খোঁচড়ের মনে পড়ে যে পাখি-মার্ডারের কেসেও আমরা এইরকম একজনকে খুঁজছি। একজন বর্তমান খোঁচড়কে সে ঘটনাটা জানায়।
—মুখের বর্ণনা দিয়েছে?
—বর্ণনা যা দিয়েছে তা বিশেষত্বহীন, কিন্তু একটা অন্য কথা সে বলেছে যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। খোঁচড় সন্দেহভাজন ব্যক্তিটিকে চিনতে পেরেছে।
—এঃ? বল কী!
—হ্যাঁ। খোঁচড়ের বক্তব্য বহুকাল আগে, নকশাল পিরিয়ডে খোঁচড় এই লোকটাকে দেখেছে। সে যদিও নাম মনে করতে পারেনি, অনেক কিছুই নাকি ভুলে যাচ্ছে আজকাল। কিন্তু, সে নিশ্চিত, এই লোকটাকে সে বরাহনগর সাইডে একবার দেখেছিল। তখন লোকটা নকশাল করত। বরাহনগরেই লোকটার বাড়ি ছিল কিনা সেটা খোঁচড় বলতে পারেনি। সেই সময় বরাহনগরে নকশাল ঘাঁটি ছিল, রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে বিপ্লবী ছাত্র-কর্মীরা বরাহনগরে হাজির হয়েছিল। লোকটিও সেভাবে এসে থাকবে। পুলিশের সঙ্গে বরাহনগরের একটা রেডে এই খোঁচড় গেছিল। খবর ছিল, কয়েকজন নকশাল একটা বাড়িতে বোমা বাঁধছে। পুলিশ সেদিন কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ আসার খবর পেয়ে দলবল চম্পট দেয়। খোঁচড় এই লোকটিকে কোনও রকমে ধরতে পেরেছিল, কিন্তু ধস্তাধস্তি করে লোকটি পালিয়ে যায়।
এটা নিঃসন্দেহে খুব গুরুতর একটা তথ্য, যা আমাদের এযাবত সব তদন্তকে উলটে দিতে পারে। সিদ্ধার্থ আমার মনের ভাব ধরতে পেরে বলল- লোকটা যদি নকশাল হবে, তাহলে কি তার বয়েস সত্তর হওয়া সম্ভব?
—চৌখুপির মনোজ মণ্ডল ঠিকই বলেছিল। অল্পবয়েসী লোক, নকশাল আমলের সময় যুবক হলে, এখন তার বয়েস পঞ্চাশের কোঠায়।
—একটা বাচ্চার কাছে যে বুড়ো একজন অতিবৃদ্ধের কাছে সেই-ই জোয়ান।
—তোমার প্রাক্তন খোঁচড় যখন বরানগরে লোকটাকে ধরেছিল, তখন তার কেমন বয়েস ছিল?
সিদ্ধার্থ বলল—খোঁচড় বলছে, তখন এরা বাচ্চা ছেলে ছিল। যদিও নকশাল মুভমেন্টের গোটাটাই কিন্তু ছাত্র যুবকদের নিয়ে নয়, ইনফ্যাক্ট সুশীতল রায়চৌধুরি, চারু মজুমদারদের কথাই ভাব।
—ফুটপ্রিন্ট রিপোর্টেও বয়েস সত্তরের কাছাকাছি আন্দাজ করা হয়েছিল। কারণ জীর্ণ পায়ের পাতা। কিন্তু এটাও বলা হয়েছিল, পায়ের দাগ আঘাত থেকেও আসা সম্ভব।
—সেটাই আমার মাথাতেও এসেছে। পরে হয়তো এই লোকটা ধরাও পড়েছিল। এবং পুলিশি অত্যাচারও সইতে হয়েছিল। ইনফ্যাক্ট মেরে পায়ের পাতা ফাটিয়ে দেওয়া তো খুব কমন একটা প্র্যাকটিস। তোমার মনে আছে, সুমারই গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী বাচ্চা ছেলেটা, যে শ্যালোতে লোকটাকে দেখেছিল, তারও মনে হয়েছিল যে এ বুড়ো লোক। সেটাও ভুল, লোকটার হয়তো অকাল বার্ধক্য এসেছে।
সিদ্ধার্থকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলাম না। সে কফিতে শেষ চুমুক দিতে দিতে হাসল—প্লিজ এখন নকশাল খুঁজতে পাঠিও না।
—আরে না না, রামোঃ, সেটা তো আমি আমাদের ফাইলেই পেয়ে যাব। সরোজ দত্তের ফাইলটা পাঠাব নাকি?
সিদ্ধার্থ হা-হা করে হেসে উঠল—পাঠিও পাঠিও, কোনোদিন গবেষণা করলে পারমিশান ছাড়া ছাপিয়ে দেব।
সিদ্ধার্থকে ফের ধন্যবাদ জানিয়ে উঠতে যাব, সে বলল—কার্তিকপুরে গেলবার চাষবাস খারাপ হয়েছে শুনিনি, তোমার সেই লিস্টে কি কার্তিকপুরের নাম ছিল?
—যতদূর মনে পড়ে, কার্তিকপুরের নাম ছিল না, আমি তবু আর একবার দেখব।
সিদ্ধার্থ একটি টেলিফোন আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি মানিব্যাগ হাতড়ে মার্ভেল অপটিক্যালের ভানু সমাদ্দারের ফোন নাম্বার বের করলাম। ভানু সব শুনে কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল—গেলবারের লিস্টিতে কার্তিকপুর নেই! হতেও পারে… গোয়েন্দাসাহেব, এই বছর সবে নতুন ধান উঠেছে। কয়েকটা দিন সময় দিন, এবারের হিসেবটা দেখি।
সিদ্ধার্থ লাউড স্পিকারে শুনছিল, সে ভানুর কথা শুনে টেবিল বাজিয়ে উঠল।
