নীলুদার হোটেল
জগমোহিনীর ভোজনালয়ের কেসটা কানাই-এর হাতে আসার পর তিন দিন কেটে গেছে। নতুন কোনো ঘটনার খবর কানাই-এর কানে আসেনি। তদন্তে ও বিশেষ কোনো অগ্রগতি নেই। জগমোহিনী ভোজনালয়ের ফরেনসিক রিপোর্ট ড. মাইতি পাঠিয়েছেন। রাস্তায়, ড্রেনে আর কাঠের বেঞ্চে পরীক্ষামূলক ভাবে আলো ফেলে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। যদিও গোটা রাস্তা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি, সময় ও লোকবলের অভাবে। রাস্তার নির্বাচিত অংশেই শুধু পরীক্ষা করা হয়েছিল। ড. মাইতি রান্নাঘর থেকে ফুলকপির বালতি খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই স্যাম্পেলে বিষ নেই। থাকার কথাও নয়, কারণ সেখানে বিষ থাকলে ক্যাজুয়ালিটি আরও বেশি হত। যে চেয়ার-টেবিলে ছেলেদুটি বসেছিল সেখানে থার্মোগ্রাফ করা হয় কিন্তু ঘটনার পর অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ায় থার্মোগ্রাফ কিছু বুঝতে পারছে না, যেমন অন্যান্য চেয়ারগুলি সম্পর্কেও থার্মোগ্রাফ নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছে না। হোটেলের চার কর্মচারীর হাতের ও শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে স্যাম্পেল নিয়ে কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করা হয়েছিল। কিছু পাওয়া যায়নি।
সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞার সঙ্গে বিগত তিনদিন সৌভিক কো-অরডিনেট করেছে। ভুঁইঞা নিউ এজ বোর্ডিং-এ নিহতদের বন্ধুদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে আর সৌভিক ওদের পেছনে খোঁচড় লাগিয়ে রেখেছিল। ছেলেগুলি চা সিগারেটের নেশা করে। কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতার অ্যাঙ্গেল বোঝা যায়নি। ভূঁইঞা তার দলবলকে নিয়ে পেরিমিটার সার্চও করেছিল, সন্দেহজনক কিছু নেই। যদিও যে বিষটি দেওয়া হয়েছে, ওয়ারফারিন, তা মোটেই দুর্লভ নয়। সামনেই বড়ো বাজার, যেখানে খোঁজ করলে অন্তত দশটি দোকানে রাইস ট্যাবলেট পাওয়া যেতে পারে। যে ঠেলাগাড়ির চালক ফুলকপি বিক্রি করেছিল, তাকে ভুঁইঞা খুঁজে বের করেছিল, জিজ্ঞাসাবাদের পর সবজি বিক্রেতাটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জগমোহিনী বাদে আরও দুটি হোটেল ঠেলার ফুলকপি কিনেছিল। তাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
এই যেখানে গোয়েন্দাদের তদন্তের অগ্রগতি সেখানে মিডিয়া লাফিয়ে লাফিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। সরাসরি কিছু না বললেও ঠারেঠোরে মিডিয়া কভারেজ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে বিষয় গুরুতর ও লোকজনের হোটেল-রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময় সাবধান থাকা উচিত। সিলেক্টিভ লিক দিতে গিয়ে এই হয়েছে মুশকিল। সিলেক্টিভ লিক দেখে মিডিয়া আরই বুঝে ফেলে যে লালবাজার চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে, জয়েন্ট সিপি নিজে উদ্যোগ নিয়ে জগমোহিনীর মালিক শ্যামকান্ত, মনোহর আর দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে আপাতত অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর কেস দিতে বলেছেন। তাতে কানাইচরণের একদিকে সুবিধা হয়েছে, অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর কেস থাকার ফলে আপাতত ওই চারজন জামিন পাচ্ছে না, পুলিশ হেফাজতে রাখা হবে। প্রয়োজন পড়লে কানাই ডেকে জেরা করতে পারবেন।
এই যখন অবস্থা তখন কানাই আরও ঝুঁকে পড়ছেন সিরিয়াল কিলার তত্ত্বের দিকে। সূত্রগুলো যদিও আধভাঙা, তাই অপেক্ষা করছেন যদি সিরিয়াল কিলারই হয় তবে তার পরের শিকারের জন্য। প্রথম ঘটনায় ফরেনসিক আর পুলিশের দিক থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে বেশ কয়েকটা বড়ো ভুল থেকে গেছে। জয়েন্ট সিপি ক্রাইম-এর চেম্বারে গিয়ে কানাই নিজে বলে-কয়ে রাজি করিয়েছেন, একজন ফরেনসিক এক্সপার্ট যেন অন্তত রাত বারোটা অবধি লালবাজারে থাকে। জয়েন্ট সিপি ক্রাইম এক সপ্তাহের জন্য এই ব্যবস্থা করতে রাজি হয়েছেন এই শর্তে যে এই সময়ের মধ্যে কানাই রহস্যের সমাধান করবেন। কানাই আর সৌভিকও গভীর রাত অবধি নিজেদের চেম্বারে থাকছেন। কন্ট্রোল রুমকেও বলা আছে, বিষ প্রয়োগ আর হোটেল সংক্রান্ত কোনো কেস এলে যেন কানাইচরণকে এত্তেলা দেওয়া হয়।
সুতরাং, কন্ট্রোল রুম থেকে কাঙ্ক্ষিত ফোনকলটি পাওয়া মাত্র কানাই সৌভিককে ঝাড়া দিলেন, সৌভিক মোগলাই পরোটা খেয়ে, টেবিলের ওপরে উঠে তন্দ্রা দিচ্ছিল। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁয়েছে। কন্ট্রোলরুমে খবর এসেছে দশটা পঞ্চাশে, রাত সাড়ে দশটার ঘটনা। কানাই কন্ট্রোল রুমকে নির্দেশ দিয়েছেন আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার সাব-ইনস্পেকটার ভূঁইঞাকে এখনই ঘটনাস্থলে পাঠাতে। ফরেনসিক সেলে ডক্টর মাইতিকে পাওয়া গেল, যদিও শিবু নেই, সে সি আই ডি-র একটা কেসের ব্যাপারে সাউথ ২৪ পরগনায় গেছে।
সদলবলে কোয়ালিসে চেপে কানাইচরণ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছোলেন ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে এগারোটায়। পথে গাড়ির কাচ নামিয়ে কানাই তিনবার ট্রাফিককে খিস্তি করেছেন।
কন্ট্রোলরুমের কাছে যেটুকু কানাই শুনেছিলেন, গাড়িতে আসার সময় কানাই ডক্টর মাইতি আর সৌভিককে সেটুকু জানিয়ে রাখলেন। ফের পাইস হোটেলে একজনের মারা যাওয়ার খবর মিলেছে। এইবারের হোটেলটির নাম নীলুদার হোটেল, আমহার্স্ট স্ট্রিট পোস্ট অফিসের কাছে হোটেলটি। রাতের খাওয়া-দাওয়া চলছিল, হোটেলে বেশি লোক ছিল না। এমন সময় পরিবেশক লক্ষ করে যে একটি খাওয়ার টেবিলে একজন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। হোটেলের মালিক খবরের কাগজের সূত্রে জগমোহিনীর ঘটনাটা জানত। মালিক নিজেই লালবাজার কন্ট্রোল রুমের নাম্বারে ফোন করে জানায়। কন্ট্রোল রুম আমহার্স্ট স্ট্রিট থানাকে ইনফর্ম করে। মৃতের নাম দেবোত্তম দাস, বয়েস চল্লিশ আন্দাজ, লোকাল মেসে থাকে। ভিক্টিম মালিকের মুখচেনা, আমাদের আগের কেসের মতোই। কিন্তু এই কেসে ভিক্টিমের পেশাটা গোলমেলে। হোটেলের মালিক নীলু গোঁসাই জানিয়েছে, দেবোত্তমকে সে চিট ফান্ডের এজেন্ট হিসেবে চিনত।
আমহার্স্ট স্ট্রিট থেকে একটি গলি, রামশরণ লাল স্ট্রিট, উত্তর দিকে ঢুকে গেছে। স্ট্রিটের প্রথম হোটেলটিই নীলুদার হোটেল। হোটেলের দুদিকে দেয়াল আর বাকি দুদিক আমহার্স্ট স্ট্রিট আর রামশরণ লাল স্ট্রিটের দিকে উন্মুক্ত। হোটেলে ঢুকবার জন্য আলাদা দরজা নেই। রাত্রে রাস্তার দিকের খোলা অংশগুলি বন্ধ করবার জন্য বিশাল কোলাপসিবল। আঁটোসাঁটো রান্নাঘর। আয়োজন দেখে মনে হয় জগমোহিনীর মতো অত পসার নেই। সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা তলব পাওয়া মাত্র ফোর্স নিয়ে চলে এসেছে। হোটেলটিকে ঘিরে ফেলা হয়েছে পেরিমিটার টেপ দিয়ে, ট্র্যাফিক ব্যারিকেড দিয়ে ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। মিডিয়ার কাছে নির্ঘাত খবর চলে গেছে, আর না গেলেও তারা আর কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। রাস্তার ওপর তখন ট্রাফিক সামলানো এক ঝক্কি হবে।
আমহার্স্ট স্ট্রিটের ওপর গাড়ি রেখে কানাইচরণ নীলুদার হোটেলের সামনে চলে এলেন। সেখানে তখন ভূঁইঞা হোটেলের কর্মচারীদের ধমকধামক দিয়ে জেরা করছে। কানাইকে দেখে সেলাম ঠুকল। কানাই জিজ্ঞেস করলেন-মালিক কোন জন?
একজন মাঝবয়সী, টাকমাথা আর ধুতিপরা লোক উত্তর করল- আজ্ঞে, আমি সার, নীলু গোঁসাই।
ভুঁইঞা উদ্যোগ নিয়ে বাকি কর্মচারীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। রান্নাঘরে বটঠাকুর বাদে আর এক মশালচি। আলাদা করে কোনো সুপারভাইজার নেই। ওয়েটার কাম ম্যানেজার কাম সুপারভাইজার একটি বছর আঠারোর ছেলে, নাম সোম বিশ্বাস। গুটখা খেয়ে তার দাঁতে কালো ছোপ পড়ে গেছে। চুল ব্যাকপ্রেস করা, তেলে চকচক করছে।
কানাই জিজ্ঞেস করলেন—টেবিলে আর কেউ ছিল?
—না সার, একাই খাচ্ছিলেন। সোম বিশ্বাস উত্তর দিল।
—হোটেল তখন কত জন ছিল?
—তা হবে সাত আট জন। লাস্ট ব্যাচ খাচ্ছিল সার। সোম জানাল।
পাশ থেকে ভুঁইঞা বলল—এবার সবাইকে আটকে রেখেছি স্যার।
কানাই মাথা নাড়লেন। সোমকে কানাই ফের জিজ্ঞেস করলেন—কী অর্ডার করেছিল?
ডাল ভাত আর সবজি,—সয়াবিন।
কানাই জিজ্ঞেস করলেন—ফুলকপি অর্ডার করেনি?
সোম উত্তর দেবার আগে পাশ থেকে মালিক নীলু গোঁসাই অবাক হয়ে বলল-এই গরমের দিনে ফুলকপি তো হয় না সার।
কানাই আর কথা বাড়ালেন না। খাওয়ার জায়গার দিকে এগিয়ে এলেন। ফুটপাথ থেকে দু-ফুট ওপরে হোটেলের খাওয়ার জায়গা। ছোটো সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। সৌভিক ইতিউতি রেড মার্ক ফেলছিল আর ডক্টর মাইতি খাওয়ার ঘরে উঠে একটি টেবিলের ওপর ফরেনসিক কিট খুলতে ব্যস্ত।
কানাইকে দেখে বললেন—প্রথমেই একটা থার্মোগ্রাফ করা দরকার। আগের বার অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ায় কোন কাজের কাজ হয়নি।
ফরেনসিক কিট থেকে যে বস্তুটি ডক্টর মাইতি তুলে নিলেন সেটা দেখতে একটি রিভলভারের মত, শুধু রিভলভারের নলটি যা নেই। নলের জায়গায় একটি মনিটর। মনিটর-এর সঙ্গে হাতল লাগান। সন্দেহজনক বস্তুর উপর তাক করলে মনিটরে থার্মাল ইমেজ ফুটে ওঠে। স্বাভাবিক তাপমাত্রার সঙ্গে সন্দেহজনক বস্তুটির কোনো অংশের তাপমাত্রার পার্থক্য থাকলে মনিটরে ধরা পড়ে। ডক্টর মাইতি আর কানাই দেয়াল সংলগ্ন একটি টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখানে তখনও দেবোত্তম দাসের বড়ি পড়ে আছে।
নীলুদার হোটেলের টেবিলগুলি আকারে ছোটো, খাওয়ার ঘরের পরিধিও জগমোহিনীর তুলনায় অর্ধেক, প্রতিটি টেবিলের সঙ্গে দুটি মুখোমুখি চেয়ার। ডক্টর মাইতি তার থার্মাল ইমেজার প্রথমে তাক করলেন ঘরের অন্যান্য চেয়ারগুলির দিকে। কানাই মনিটরের দিকে তাকালেন। নীল রঙের মনিটর, চেয়ার টেবিল ঘরের দেয়াল সেখানে সব কিছু নীল হয়ে দেখা যাচ্ছে। থার্মোগ্রাফ মানুষের শরীরের উষ্ণতা বুঝতে পারলে অথবা অন্য কোনো উষ্ণতর বস্তু, মনিটরের নীল রং হলুদ থেকে লাল হতে থাকে। ড. মাইতি যখন অন্যান্য চেয়ারগুলিতে থার্মাল ইমেজার তাগ করছিলেন, তখন অধিকাংশ চেয়ার নীল রঙে দেখা গেল, হাতেগোনা কয়েকটিতে হলুদ রঙ দেখাল। অর্থাৎ সেখানে কেউ খেতে বসেছিল। কানাই গুনে দেখলেন হলুদরঙা চেয়ারের সংখ্যাটা নীলু গোঁসাই-এর হিসেবের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, সাত-আটজন খেতে বসেছিল।
ড. মাইতি তার যন্ত্র দেবত্তোম দাসের মুখোমুখি থাকা চেয়ারটির ওপরে তাগ করলেন। কানাই মনিটরে দেখলেন হলুদ রং।
কানাই কিছু বলে উঠবার আগে ড. মাইতি নিজে থেকেই বললেন—থার্মাল ইম্প্রেশান অনেকক্ষণ থেকে যায়, সন্ধের দিকেও যদি কেউ এই চেয়ারে বসে থাকে তার উষ্ণতা থার্মোগ্রাফে ধরা পড়তেই পারে।
—কোনোও ভাবে কি বোঝা যায়, ঘটনার সময় বা ঘটনার আগে কেউ এই টেবিলে খাচ্ছিল কিনা?
ড. মাইতি সৌভিককে ডেকে বললেন—মৃতদেহটিকে চেয়ার থেকে অল্প উঁচু করে ধরতে। সৌভিক আদেশ পালন করল, ড. মাইতি দেবোত্তম দাসের চেয়ারে ইমেজার তাগ করলেন, মনিটর গাঢ় হলুদ হয়ে উঠল। ড. মাইতি কানাইকে বললেন—হলুদের তীব্রতা দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে দুটি চেয়ারের হলুদই একই ইন্টেনসিটির, অর্থাৎ দেবোত্তম দাস যখন খাচ্ছিল—সে সময় বা তার অল্প আগে-পরেই এই চেয়ারে কেউ বসেছিল।
কানাই ভূঁইঞাকে হাঁক দিয়ে হোটেলের ওয়েটার সোমকে ফের নিয়ে আসতে বললেন। ভুঁইঞা সন্দেহভাজনদের রামশরণ লাল স্ট্রিটের একধারে সার দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। সোমের কলার ধরে হোটেলের খাওয়ার জায়গায় নিয়ে এল। সোমকে দেখে মনে হল যে সে দ্বিতীয়বার তলব হওয়ায় বেশ ভয় পেয়েছে, দুই হাত বুকের কাছে জড়ো হয়ে আছে।
—এই টেবিলে আর কেউ ছিল না, তুই শিওর? কানাই জিজ্ঞেস করলেন।
সোম ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল—হ্যাঁ সার। উনি একাই খাচ্ছিলেন। রোজই একাই খান।
কানাই-এর সামনে একটা বিরাশি সিক্কার চড় উড়ে এল। ভূঁইঞার পাথরের মত শক্ত হাত গিয়ে পড়ল সোমের গালে। সোমের শরীর ছিটকে গিয়ে পড়ল একটি টেবিলের পায়ায়। ভূঁইঞা আরও মারতে যাচ্ছিল, কানাই বাধা দিলেন। —আমি এই ভাবে কেস সল্ভ করি না ভূঁইঞা। ভুঁইঞা সামলে নিল।
কানাই হাঁটু গেড়ে সোমের সামনে বসলেন। কপালের কোণ দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। কানাই নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে রক্ত মুছে দিয়ে সোমকে ফের জিজ্ঞেস করলেন—এই লোকটা খেতে বসার আগে এই টেবিলে কে বসেছিল?
সোম কেঁদে ফেলল।—সার বিকেল থেকেই অনেক লোক বসছে সার। ওর আগে একটা বাচ্চা ছেলে খাচ্ছিল। কিন্তু ওর সঙ্গে খায়নি সার। এই লোকটা বসার আগে ওই ছেলেটা উঠে গেছে।
—কত আগে উঠে গেছে? ঠিক আগে? না খানিক আগে, কতক্ষণ আগে?
সোম কী বলবে বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
কানাই বুঝিয়ে বললেন—তুই যখন এই লোকটাকে খাবার দিতে এলি, তখনও আগের লোকের থালা বাসন টেবিলে আছে? নাকি নেই?
সোম এইবার বুঝতে পারল, বলল- হ্যাঁ ছিল, আমিই টেবিল পরিষ্কার করেছি।
—আগের ছেলেটার ফেলে যাওয়া কতটা খাবার ছিল? কী কী অর্ডার করছিল, ভেবে উত্তর দে।
সোমকে উত্তর দিতে ভাবতে হল না, সে বলল—বেশি খাবার বাঁচেনি সার, পাতের সাদা ভাত কিছু ছিল। বাটির সব ফাঁকা ছিল সার। ছেলেটা খাসির মাংস আর ডাল অর্ডার করেছিল।
—কী ডাল?
—মুসুর ডাল, রেগুলার ডাল।
কানাই অল্প হাসি হাসি মুখ করে সৌভিকের দিকে মুখ তুলে তাকালেন, সৌভিক নোট নিতে ব্যস্ত। কানাই হাঁটু ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ভুঁইঞা এসে সোমকে টেনে তুলল।
কানাই তার ডানহাতের দিকে একটি ফাঁকা টেবিলের লাগোয়া চেয়ারে বসে সোমকে ডেকে নিলেন। উলটোদিকের চেয়ারে তাকে বসতে বললেন।
—যা জিজ্ঞেস করব ভালো করে ভেবে বলবি।
সোম ঘাড় নাড়ল।
—এই ধর আমি আগের ছেলেটা। আমি এখন খাসির মাংস আর ডাল খাচ্ছি। আমার খাওয়া শেষ। এইবার পরের লোকটা এসে একই টেবিলে বসল। বলে কানাই সৌভিককে ডেকে উলটোদিকের টেবিলে বসালেন। এখন আমার পাতে খাবার আছে, কিন্তু ওর পাতে নেই। ওকে দেখা মাত্র আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলাম। বলে কানাই নিজে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে থাকলেন—এইবার টেবিলে একা ওই লোকটা বসে আছে। তুই অর্ডার নিতে এসে দেখলি, লোকটা একা টেবিলে। আর কেউ নেই, আগের লোকের ফেলে যাওয়া থালাবাটি এখনও কিন্তু টেবিলে। কিন্তু তুই টেবিল এখনই পরিষ্কার করলি না, শুধু অর্ডার নিয়ে চলে গেলি। তাইতো? কেন টেবিল পরিষ্কার করলি না?
সোম মাথা নেড়ে বলল-হাতে ন্যাতা নেই তো, তাই আগে খাবার এনে দিই, কাস্টমার খেতে শুরু করে তারপর, পুরোনো কাস্টমারের থালা তুলে নিই।
—গুড, তাহলে তুই লোকটার থেকে অর্ডার নিলি, রান্নাঘরে গিয়ে খাবার নিয়ে এলি। সয়াবিন আর ডাল, মুসুর ডালই তো? হ্যাঁ, তারপর খাবার রেখে আবার কুলুঙ্গি থেকে ন্যাতা এনে টেবিলের উলটোদিকটা মুছে দিলি আর এঁটো নিয়ে চলে গেলি। বল, এরকমই করেছিলি, ভেবে বল, ভয় নেই।
সোম ঘাড় হেলাল। —এরকমই করেছিলাম সার, সেম, সার, সেম।
কানাই হেসে সোমের পিঠ থাবড়ে দিলেন। —আগের ছেলেটার মুখ মনে আছে, আগে দেখেছিস?
—মাইরি বলচি সার, একদম মনে নেই, আগে কোনোদিন দেখিনি, সার, নতুন কাস্টমার, বাচ্চা ছেলে। কলেজের স্টুডেন্ট হবে।
কানাই বললেন—ঠিক আছে, একটা লোক আসবে, তাকে বলবি যা যা দেখেছিস, সে আগের ছেলেটার ছবি আঁকবে। ভেবে চিনতে বলবি কিন্তু, এই পুলিশ সার কিন্তু না হলে আবার ঠ্যাঙাবে।
বডির পাশ থেকে ফরেনসিক এক্সপার্ট ড. মাইতি কানাইকে ডাকলেন।
কানাই আর সৌভিক এগিয়ে গিয়ে দেখল, ড. মাইতি হাতে লেটেক্সের গ্লাভস পরে মৃতের থালার ভাত ঘাঁটছেন। ডালে ভাতে মাখামাখি, থালার একপাশে সয়াবিন।
কানাইকে ড. মাইতি বললেন—ইনিশিয়ালি দেখে তো মনে হচ্ছে আবার রোডেন্ট কিলার! গ্যাঁজলা উঠছে মুখ থেকে, চোখ কপালের দিকে ঠেলে উঠেছে, খুব হাই ডোজ, বলাই বাহুল্য। পয়জনটা খুব রেডিলি পাওয়া যায় না হলে যেভাবে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে, নিশ্চিত ভাবে বলা যেত আগের কেসটার সঙ্গে মিল আছে। যাই হোক, যা স্যাম্পেল নেওয়ার সেগুলো তো নিয়েই নিচ্ছি। কেমিক্যাল আর অটোপসি রিপোর্ট আপনি কালকের মধ্যে পেয়ে যাবেন। আর শিবুকে বলছি কাল ফার্স্ট আওয়ার বা ভোরের দিকে এসে যেন ছবিগুলো তুলে নেয়। আমি যদিও আমার বেসিক ক্যামেরায় কিছু ছবি তুলেই নিলাম, ইন কেস। আপনার কথা কানে এল, সাসপেক্টের ছবি আঁকাতে হবে।
কানাই ড. মাইতিকে উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর। কানাই ড. মাইতির কাছে একটি ল্যাটেক্স গ্লাভস চেয়ে নিলেন। দুটো আঙুল দিয়ে পাতের ডাল মাখা ভাত ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন—এটা কী ডাল আন্দাজ করতে পারছেন ড. মাইতি?
—শুকিয়ে গেছে, মুসুর ডাল কি, কাল কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করে কনফার্ম করব।
কানাই চুকচুক শব্দ করে বললেন—এইটে দেখুন, বাটিভরতি ডাল, পাতেও ডাল।
ড. মাইতি অবাক হয়ে বললেন—চোখে পরেনি, বাটিতেই যদি ভরতি ডাল থাকে, তাহলে পাতের ডাল কোথা থেকে এল! আমি শিওর, পাতের ডালেই বিষ পাব।
—সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায় কি, পাতের ডাল আর বাটির ডাল এক জায়গা থেকে আসেনি, মানে কোনো একটা ডাল অন্য কেউ অর্ডার করেছিল, বা অন্য কোনো সোর্স থেকে এসেছে?
ড. মাইতি শ্রাগ করলেন—উপায় কী! ফুলকপির বদলে এইবার ডাল নিয়েই তাহলে পড়ি, স্যাম্পেলগুলো কুইক তুলে নিই।
—তবু প্যাথোলজিস্টকে বলবেন, স্টমাকে ফুলকপি আছে কিনা একবার যেন নিশ্চিতভাবে দেখে, দরকার হলে কেমিক্যাল অ্যানালিসিসের জন্য অবশ্যই পাঠাবেন। বলে কানাই গলা তুলে ভূঁইঞাকে ডেকে বললেন—হোটেলের মালিক নীলু গোঁসাইকে নিয়ে আসতে।
কানাই ড. মাইতিকে বিদায় জানিয়ে হোটেলের ক্যাশবাক্সের সামনে এসে দাঁড়ালেন। রান্নাঘরে ঢুকবার দরজার একপাশে মালিকের বসার টুল, টুলের পাশে ক্যাশবাক্স। ক্যাশবাক্সে এখন তালা দেওয়া। ক্যাশবাক্সের ওপরে দেয়ালে টিনের পাতে মেনু লেখা। সৌভিক একটা ঘুসি মেরে ক্যাশবাক্সের তালা ভেঙে ফেলল, ভেতরে খুচরো আর নোট। কানাই ঘাড় উঁচু করে মেনু পড়ছিল। সৌভিককে বললেন—অনেকদিন পাইস হোটেলে খাওয়া হয় না জানিস, কাল দুপুরে ভাবছি ডেকার্স কাটিয়ে দেব, তোর বউদিকে বলব সকালে হালকা রান্না করতে।
সাব-ইনস্পেকটার ভুঁইঞা মালিক নীলু গোঁসাইকে নিয়ে এল।
কানাই নীলুকে দেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে মেনু পড়তে শুরু করলেন—মাছের থালি, ডিমের থালি, সয়াবিন, মিক্সড সবজি, আলুভাজা, মাছভাজা, চিকেন, চাটনি…খাসির মাংস কই, বোর্ডে নেই কেন?
নীলু দূর থেকে সোমকে থাপ্পর খেতে দেখেছে, তাই তার হাত বুকের কাছে জড়ো করে রাখা। কানাইকে সে উত্তর দিল- স্যার, খাসির মাংস আমাদের স্পেশাল, রোজ হয় না। খাসি খাওয়ার লোক এই পাড়ায় নেই বেশি।
সৌভিক জিজ্ঞেস করল- ফুলকপি স্পেশাল হয় না কোনোদিন?
—হয়, শীতকালে, খাসিটাই স্পেশালে বেশি করি স্যার।
—মেনু কি রিপিট হয়? কানাই জানতে চাইলেন।
—না স্যার রিপিট করতে পারি না। থালির সঙ্গে একবাটি ডাল আসে, তা না হলে ডাল আলাদা ভাবে অর্ডার করতে হবে।
কানাই উত্তর শুনে সেকেন্ড কয়েক চুপ থাকলেন। তারপর, প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে না, যেন নিজেকেই বলছেন, এমনভাবে বললেন—আচ্ছা কেউ, খাসির মাংসের সঙ্গে ডাল আলাদা করে কেন অর্ডার করবে। খাসির মাংস ৯০টাকা, এর সঙ্গে ১০ টাকার ডাল! খাসির মাংসের সঙ্গে গোটা ভাতটা মেখে নেবে না?
নীলু ভাবল তাকেই বোধহয় জিজ্ঞেস করা হচ্ছে।—স্যার, এক-একজনের এক-একরকম খিদে, কেউ বেশি খায় কেউ কম, কেউ ফেলাছাড়া করে খায়। নিতেই পারে, খাসি আর ডাল, অনেকে খাসি আর ডিমও অর্ডার করে।
কানাই ভুঁইঞাকে নির্দেশ দিলেন নীলুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এইখানে আর তদন্তের কিছু নেই। ভুঁইঞাকে দু-একটা মামুলি নির্দেশ দিয়ে কানাই সৌভিককে বললেন—চল এইবেলা তাড়াতাড়ি কেটে পড়ি, এইবার মিডিয়া এসে পড়ল বলে। ক্রাইম সিনে যেন ঢুকতে না পারে, স্টাফদের বলে দে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিবুকে পাঠা ছবি তুলতে, ওয়াইড অ্যাঙ্গেল অবশ্যই তোলে যেন। এই কেসেও আমার একটা টাইমলাইন দরকার, দেবোত্তম সন্ধে থেকে কোথায় ছিল, কী খাচ্ছিল, এইসব।
ড. মাইতি স্যাম্পেল কালেক্ট করছিলেন, কানাই তাকে গুডনাইট বলে শেষবারের মতো একবার দেবোত্তম দাসের মৃত শরীরের পাশে দাঁড়ালেন। মুখ থুবড়ে পড়েছে ভাতের থালার ওপর। চশমার ডাঁটি মাথার চাপে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। মুখে আর চুলে ডাল ভাত মাখামাখি। কানাই মৃতের মাথা থালার ওপরে তুলে ধরে থালার দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলেন। ড. মাইতি কানাই-এর কাছ থেকে লেটেক্স গ্লাভস চেয়ে নিলেন সেফ ডিসপোজালের জন্য।
কানাই আর সৌভিক শুভরাত্রি জানিয়ে যখন গাড়িতে উঠছেন তখন বিভিন্ন মিডিয়ার চারটি ওবি ভ্যান আমহার্স্ট স্ট্রিটে পার্ক করছে। মধ্যরাতেও রাস্তায় হাজারখানেক লোক, পুলিশ ভিড় সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে।
