৩
লাঞ্চ মাথায় উঠল। আবার বেরিয়ে পড়লাম। এক বড়ো কর্তা তার গাড়িতে বেড়োচ্ছিলেন। আমাকে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে দেখে তার অ্যাম্বাসেডারের সামনে বসতে বললেন। বড়োকর্তাও আলিপুর কোর্টে যাচ্ছেন, পনেরো বছর পুরোনো একটি খুনের মামলায় তাকে হাজিরা দিতে হবে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কীসের দরকারে যাচ্ছি? আমি আর তাকে খুলে বললাম না, শুধু বললাম মতিদা পাঠাচ্ছেন। তাতেই কাজ হল। যত বড়ো অফিসারই হোন ফোর্সের একটা গোপনীয়তা থাকে, তাকে কেউ অযথা ভাঙতে চান না। কেবল জিজ্ঞাসা করলেন—কার কাছে যাবে? নাম বললাম- রন্তিদেব সেন। অ্যাম্বাসেডারের রিয়ার ভিউ মিররে দেখলাম কর্তার চোখ কপালে উঠল।—আরে বাপ, উনি জজসাহেবদেরও সাহেব!
—উনি তাহলে জজসাহেব নন?
কর্তা বললেন—উনি পেশকার, সেকেন্ড এডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জাজেসের। কিন্তু পান্ডিত্যে আর দাপটে উনিই রাজা।
কর্তা সাবধান করে দিলেন—বেশি চটাবে না।
সেকেন্ড এডিজের এজলাসের সামনে এসে দেখি গমগম করে কোর্টরুমে মামলা চলছে, একঘর লোক, শামলা পরিহিত উকিলদের দল, মক্কেলদের বাড়ির লোকজন, সাক্ষীরা, কয়েকজন সাংবাদিকও আছে, তারা যদিও আমাকে চিনতে পারেনি, আর কয়েদের ভেতরে আসামিরা। জি আর ফাইলের কেস উঠেছে, পুলিশ আসামিদের হাজির করেছে। কোর্ট ইন্স্পেকটারকে আড়ালে জিজ্ঞাসা করলাম—রন্তিদেব সেন কোনজন? সে আঙুল তুলে দেখালে, জজসাহেবের সমান্তরালে কাঠের পোডিয়ামের নীচে বসে আছেন, ক্ষীণতনু এবং মোটা গোঁফের একটি লোক, কপালের ওপর রিডিং গ্লাস আর সামনে টাইপরাইটার। কোর্ট ইনস্পেকটার নিজের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে বসতে বললেন—ঘণ্টাদুয়েকের আগে কথা বলার টাইম পাবেন না, কেস আছে নাকি?
আমি উত্তর না দিয়ে, একজন হাবিলদারকে ডাকলাম। তার হাতে পাঁচটা টাকা ধরিয়ে বললাম, দুখানা বাপুজি কেক কিনে আনতে।
জজসাহেব চেয়ার ছেড়ে যখন উঠলেন তখন বেলা পড়ে এসেছে। কোর্টচত্বরে স্বস্তির হাওয়া, খাজাগজা বিক্রি হচ্ছে। কোনোরকমে রন্তিদেবকে পাকড়াও করে নিজের পরিচয় দিলাম, আর অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোর্ট চত্বর থেকে বের করে এনে রাস্তার পাশের একটি চায়ের দোকানের ঝুপড়িতে নিয়ে এলাম। দোকানে ভিড় ছিল না, আমরা বাদে আর দোকানি। আমাদের চা দিতে বলায় দোকানি ব্যস্ত হয়ে পড়ল, সেই সুযোগে রন্তিদেবকে পাখি মারা যাওয়ার বিষয়টি বললাম। বিস্তৃত বিবরণে যাইনি, মোটের ওপর এই বললাম যে—খান বিশ পাখি নানা জায়গায় মারা গেছে। বুঝতে পারলাম, তাকে বলা ভুল হয়েছে। সারাদিন এজলাসের কাজ সামলে রস্তিদেবের মাথা বোধহয় বারুদ হয়ে ছিল, তাতে আগুন পড়ল। ভদ্রলোক বেজায় চ্যাঁচামেচি জুড়লেন।
আমি যে একজন পদস্থ পুলিশ অফিসার সে খেয়াল তার আর রইল না। খেয়াল করলাম, চ্যাঁচামেচির ফাঁকে ফাঁকে তিনি একটি ইংরেজি বাক্য একাধিক বার আউড়াচ্ছেন—‘ফল অফ আ স্প্যারো, ফল অফ আ স্প্যারো’।
চ্যাঁচামেচি করে ভদ্রলোক একসময় থামলেন বটে, কিন্তু মুখের খেঁকুড়ে ভাবটা গেল না। মোটকথা বুঝতে পারলাম পাখি আর পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে ওর মতামত খুবই কড়া ও একরোখা, তা বলে তাকে অযৌক্তিক বলা যাবে না।
পাখিরালয়ের নামে যেসমস্ত টুরিস্ট লজ তৈরি হচ্ছে তা তার মোটেই পছন্দ নয়, অপটু সংরক্ষণবিদরা এসে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে তুলেছে। সরকারও নানা সময়ে পাখি ধরে বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও সংগ্রহশালায় পাঠাচ্ছে, তাতেও তার আপত্তি। গরম চা গলায় ঢেলে নির্বিকার স্বরে বলতে থাকলেন যে তিনি পাখিদের স্বাভাবিক বাসস্থানের পক্ষে ও ইত্যাদি।
রন্তিদেবের মেজাজ আর খুড়ির চা প্রায় এক সঙ্গে ঠান্ডা হল। তখন জানতে চাইলাম, এই যে আপনি ‘ফল অফ আ স্প্যারো’ বারবার বলছিলেন, সেটা কী বস্তু?
ভদ্রলোক খেঁকিয়ে উঠলেন—পুলিশে চাকরি করেন বলে কী বিন্দুমাত্র পড়াশুনা নেই! এটা বস্তু নয়। এটি একটি বই। আত্মজীবনী। সালিম আলির। নাম ‘ফল অফ আ স্পারো’, নাম শুনেছেন, সালিম আলির?
ঘাড় হেলালাম-ইন্ডিয়ান বার্ডস।
মনে পড়ল একসময় এই বইটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে বলা হত প্রতিটি শিক্ষিত ভারতীয়র বইয়ের র্যাকে ইন্ডিয়ান বার্ডস-এর এক কপি পাওয়া যাবে। গীতা, বাইবেল বা কোরানের সমতুল্য বই। এমনকি আমার বাবার বুক শেলফেও আমি এক কপি ইন্ডিয়ান বার্ডস দেখেছি, রবীন্দ্র রচনাবলীর পাশে। বুঝতে পারলাম, রন্তিদেব ‘ফল অফ আ স্প্যারো’ নামটির সঙ্গে চড়াই-এর মারা যাওয়ার ঘটনার মিল খুঁজে পেয়েছেন। আমার মুখে সালিম আলির নাম শুনে রন্তিদেব আবার খেঁকিয়ে উঠলেন।
তার বদমেজাজটাই তার স্বাভাবিক মেজাজ বলে মনে হল, কখনই তিনি প্রসন্ন মুডে থাকেন বলে মনে হল না!
আমাকে বললেন—আপনারা ইন্ডিয়ান বার্ডস পড়ে সালিম আলিকে ঈশ্বরজ্ঞানে পুজো করতে পারেন, বাট আই বেগ টু ডিফার। সালিম আলিকে নিয়ে মাধব গ্যাডগিলের মূল্যায়ন পড়ে দেখবেন। একটা অন্য স্কুল অফ থটস। একজন শিক্ষিত পরিবেশবিদের গবেষণালব্ধ কাজ যেমন হওয়া উচিত। ক্যামেরা আর শোলার হ্যাট পড়ে খেলনাবাটি নয়।
রস্তিদেবের কথার পিঠে বলে ফেলেছিলাম—সালিম আলিই তো ভারতে প্রথম বিজ্ঞানসম্মত পক্ষীচর্চা শুরু করেছিলেন?
ভদ্রলোক বিরক্তি নিয়ে বললেন—ভারতে অরনিথোলজি যে মানুষটার হাত ধরে এসেছে তার নাম স্যার আলান অক্টাভিয়ান হিউম। স্যার আলান পেশায় ছিলেন ব্রিটিশ রাজকর্মচারী, আর নেশায় ছিলেন পক্ষীবিদ, বিচিত্র জীবন তাঁর। পাখির চর্চা যেমন করেছেন তেমনি ভাবে প্রেতচর্চাও করেছেন, মিস্টিক উপাসনা করেছেন, গুরুবাদী সাধনা, কী নেই! এক তিব্বতনিবাসী গুরুর আদেশে তিনি ভারতোদ্ধারে নামেন। স্যার আলানই জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা, আশা করি ইতিহাস বইয়ে পড়েছেন। অল্পবয়েসে, যখন স্যার আলেন সেন্ট্রাল প্রভিন্সের ইটাওয়ার জেলাশাসক ছিলেন তখন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক পাখির সংগ্রহশালা গড়েছিলেন। স্পেসিমেন সংগ্রহ, স্টাফিং, সবই করতেন। এমনকি পাখি বিষয়ক জার্নালও প্রকাশ করতেন। সিপাহি বিদ্রোহের সময় তার এই সংগ্রহটি ধ্বংস হয়ে যায়। সিমলায়, রটনি হিলসে, পরবর্তীকালে তিনি এক মস্ত বড়ো পাখির সংগ্রহশালা কাম লাইব্রেরি বানিয়েছিলেন। সেটাই ছিল এশিয়াটিক বার্ডের বৃহত্তম সংগ্রহশালা। খোঁজখবর করে দেখবেন। আপনি যে এই সালিম আলির কথা বলছেন, তিনি শ্রীমতি ইন্দিরা গাঁধির বেজায় প্রিয়পাত্র ছিলেন। মিসেস গাঁধিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সালিম আলি ভরতপুর পাখিরালয় বানালেন। তাতেই ক্ষান্ত হলেন না। পাখিরালয় হওয়ার আগে ওই জমিটি চারণভূমি ছিল, গোরু-মহিষ চড়ে বেড়াত। আলি সাহেবের তা মোটেই সহ্য হল না। বার্ড সাঞ্চুয়ারিতে কেটল কেন থাকবে! সাহেবরা বরাবরই কেটল ক্লাসের ওপর খাপ্পা। তিনি রাজনৈতিক অলিন্দে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে ও কলকাঠি নেড়ে ভরতপুর পাখিরালয় থেকে গোরু-মহিষ বিতাড়ন করলেন। গোরু-মহিষের প্রবেশ অবধি নিষিদ্ধ হল। কয়েকবছর পর পাখিরালয়ের এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, নামেই পাখিরালয়, অথচ কোনো পাখি নেই। কেন বলতে পারেন?
দীর্ঘ লেকচার আর খিদেয় ক্লান্ত ছিলাম। মাথা কাজ করল না। রন্তিদেব নিজের উৎসাহে বলে গেলেন—গোরু-মহিষ না থাকায় বছর ঘুরতেই ঘাস লম্বা হতে শুরু করল। পরিযায়ী পাখিদের নামবার জায়গা সংকুচিত হয়ে এল। বুঝুন এবার ঠেলা।
আমি কথা ঘোরাবার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম—আমাদের কাছে একটাই ব্লু আছে। গ্রামের একটি বাচ্চা একজন সন্দেহভাজনকে দেখেছে। লোকটি বাচ্চাটিকে বলেছে—বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে।
রন্তিদেব বললেন—আহ্, বুলবুলি কী চড়াই সেটা কথা নয়। কিছু পাখি আছে যারা ধান, ধানের বীজ খায়। আদি অনন্ত কাল ধরে খেয়ে আসছে। বুলবুলি খায়, চড়াই খায়। কবি কেন চড়াই না লিখে বুলবুলি লিখেছেন, যদি আমায় জিজ্ঞাসা করেন, বলব, পাতি ছন্দ মেলাতে।
আমি জানতে চাইলাম—পাখি ধান খেয়েছে বলে রেগেমেগে গ্রামের চাষিরা কি পাখি মারতে পারে?
রস্তিদেব হাতে ধরা চায়ের খুরি দূরে ছুড়ে ফেললেন, আমাকে বারণ করে নিজেই চায়ের দাম মেটালেন, প্যান্ট ঝেড়ে উঠবার আগে গলার স্বর নরম করে বললেন—দেখুন পুলিশ মশাই, গ্রামের মানুষের ন্যাচারাল কমন সেন্স এই আমাদের চেয়ে ঢের ভালো। চাষিরা খুব ভালোরকম জানে পাখি ধান খাবে, পঙ্গপাল ফসল নষ্ট করবে। এর থেকে বাঁচবার জন্য চাষিরা কাকতাড়ুয়া বানিয়েছে, শিঙা ফোঁকে, ক্যানেস্তারা পিটোয়। তাই বলে ধান খেয়েছে বলে তারা চড়াই মারবে আমার বিশ্বাস হয় না। আমি দেখেছি, বেগুন খেয়েছে বলে শিয়ালকে লাঠিপেটা করেছে, তবু মারেনি।
আমি সেদিন রন্তিদেবের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। যেসময়ের কথা সেই দশকে কলকাতা নানা গুজবের ওপর ভেসেছে। স্বাভাবিক বুদ্ধির মানুষ গণেশমূর্তিকে দুধ খাওয়াতে গেছে, গ্রামের গাছে মানুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ-এর পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছে। মাস-হিস্টিরিয়া সেসময় জলভাতের মতো ব্যাপার ছিল। ওয়াই-টু-কে বলে একটা ভয়ানক জিনিসের নাম শোনা যাচ্ছে, যা নাকি দু হাজার সাল এলে সব কম্পিউটারকে অচল করে দেবে। আমার প্রাথমিকভাবে এটাই মনে হচ্ছিল, পাখিদের মারবার পেছনেও তেমন কোনো গুজব কাজ করছে।
রন্তিদেবের মতামতকে গ্রাহ্য করলেও আমি সন্দেহটাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারিনি।
রন্তিদেব কিছুদূর হেঁটে গিয়ে আবার ফিরে এলেন, যেন চিৎকার করবেন, তবু পারছেন না, এমন ভঙ্গিতে বললেন—দেখুন, আপনারা পুলিশ, আমাদের থেকে অনেক কড়া নার্ভের লোক। খুন রাহাজানি নিয়ে আপনাদের নিত্য কারবার। তবু বলছি একটা খুন হল খুনই। মানুষের খুন হলেও খুন, পাখির খুন হলেও খুন। প্লিজ, পাখি মেরেছে বলবেন না, এটা ঠান্ডা মাথায় খুন করা। ইটস এ মার্ডার।
রন্তিদেব চলে গেলে আমিও বাঁচলাম। আলিপুর চত্বর থেকেই বেরিয়ে এলাম, দুবার বাস পালটে কলেজ স্ট্রিটে গেলাম। কফি হাউসে চিকেন কবিরাজি খেয়ে বুক আর পেট শান্ত হল। ইন্ডিয়ানার দোকানে গিয়ে খোঁজ করায়, কপালজোরে এক কপি দা ফল অফ আ স্প্যারো’ পেয়ে গেলাম। দাম মিটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্ট্রিট থেকে বউবাজার এলাম, কিন্তু অফিসে গেলাম না। লালবাজারের পেছনে মার্ভেল অপটিক্যাল’, চশমার দোকান। সেখানে গিয়ে ভানু সমাদ্দারকে পাকড়াও করলাম।
