চড়াই-হত্যা রহস্য – ৮

ট্রেন মদনপুর পৌঁছোল। আমি আর সিদ্ধার্থ প্ল্যাটফর্মে নামলাম। মদনপুর ফাঁড়ির দুজন কর্মী এসে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিল। দুজনের পরনে খাকি উর্দি, টুপি, একজন সাব-ইনস্পেকটার পাড়ুই, অন্যজন কনস্টেবল, অশোক বা অমল, কী নাম বলেছিল আর মনে পড়ছে না। তাদের বাইকের পেছনে বসে আমরা চৌখুপির উদ্দেশে চললাম। সাব-ইন্‌স্পেকটার পাড়ুই চাইছিল পথে একটা ধাবায় আমাদের লাঞ্চ করিয়ে দিতে। সে কথায় কান দিলাম না, ট্রেনে হাবিজাবি খেয়ে পেট ভরে ছিল। বাইক বাসরাস্তা ছেড়ে, পাড়ার পথ ধরল। আমি পাড়ুইয়ের বাইকের পেছনে বসে ছিলাম। সিদ্ধার্থ বসে ছিল কনস্টেবলের বাইকে। পাড়ুই বলল—এটা রামচন্দ্রপুর যাওয়ার রাস্তা, এখান থেকে সোজা গেলে আমরা নগরউখরা হয়ে উত্তর ২৪ পরগনায় ঢুকে পড়তে পারব। চৌখুপি যাওয়ার জন্য সামনের মোড় থেকে আমাদের বাঁয়ে মাটির রাস্তা ধরতে হবে। খানাখন্দময় রাস্তা, হেলমেট নেই, বাইক থরোথরো কাঁপছিল। পাড়ুই জিজ্ঞাসা করল—প্রত্যক্ষদর্শী ছেলেদুটোর সঙ্গে আমরা কথা বলব কিনা?

আমি পালটা জিজ্ঞাসা করলাম-কেস রিপোর্টে সব ঠিকঠাক লেখা হয়েছে না চেপেচুপে লেখা?

পাড়ুই বলল—চাপাচুপির কিছু নেই স্যার। ওই ব্যাধটা তন্ত্রচর্চা করে। কেস দাঁড় করিয়ে দেব।

সিদ্ধার্থের মুখে যেটুকু শুনেছি তাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ পাইনি।

পাড়ুই-এর কানের কাছে মুখ এনে চ্যাঁচালাম—আমবাগানের লোকটার গায়ে কী ছিল সেটা রিপোর্টে লেখনি কেন?

পাড়ুই ভুল করে ব্রেকে চাপ দিল। বাইক একটা ঝটকা দিয়ে আবার স্বাভাবিক গতি নিল।

—ভুল হয়ে গেছে স্যার। আমি জানি স্যার লোকটা কী পরেছিল। ছেলেটা বলেছিল। লোকটা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ছিল। সাদা রং-এর। মাথা গামছায় মোড়া। পাজামা গুটিয়ে হাঁটু অবধি তোলা। পিঠে একটা ঝোলাও ছিল। দৌড়ানোর সময় অল্প খোঁড়াচ্ছিল।

পাড়ুই রাস্তার থেকে চোখ না সরিয়ে আমার দিকে মুখ ঘোরাল–অনেস্ট মিস্টেক স্যার। রিপোর্টে ঢুকিয়ে নেব।

আমি জানি এইরকম কেসে কত দায়সারা ভাবে রিপোর্ট লেখা হয়। প্রথম খবর পেয়ে হয়তো মদনপুর ফাঁড়ি কেসের গুরুত্বও অনুধাবন করতে পারেনি। সি আই ডি আসছে শুনে সাব-ইনস্পেকটার জামাকাপড় কেচে পরে নিজে স্টেশানে এসেছে পরিস্থিতি সামাল দিতে।

পাড়ুইকে জিজ্ঞাসা করলাম-ব্যাধটার আইডেন্টিফিকেশান হয়েছে?

পাড়ুই জানাল—করেছি স্যার, ছেলেটা থানায় এসেছিল, ওই যে ছেলেদুটো আমবাগানে গেছিল তাদের মধ্যে একজনকে তলব করেছিলাম। ছেলেটার নাম মফিজুল।

—তারপর?

—মফিজুল ব্যাধকে চিনতে পারেনি।

বাইক মাটির রাস্তায় নামল। ঝাঁকুনি আরও তীব্র হল, দুধারে ধানখেত তার মধ্যে দিয়ে হাইটেনশানের লাইন চলে গেছে।

কলকাতায় সারাজীবন কাজ করে গ্রামে এলে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়। মনে হয় যেন ডিপ স্পেসে চলে এসেছি। যেখান থেকে পৃথিবী অবধি যোগাযোগ করতে আলোকবর্ষ কেটে যাবে। কোনো পুরোনো শত্রু এখানে আমাকে মেরে ফেলে দিলে বাড়ির লোক তা জানতেও পারবে না। কোমরের কাছে ধাতব শক্ত বস্তুটিকে জামার ওপর দিয়ে স্পর্শ করলাম। শীতলতা, মনে বলও এল।

ধানজমিতে বীজতলা তৈরির কাজ চলছে। শ্যালোর থেকে জল উঠে নালা দিয়ে বয়ে এসে শুকনো জমিকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। সেই জলে শেষ দুপুরের আলো। মাটির রাস্তার পাশে মিটারখানেকের নয়ানজুলি, তাতে হাঁটুসমান জল। জিজ্ঞাসা করাতে পাড়ুই জানাল —দুদিন আগে রাতে কালবৈশাখী হয়েছিল। আমি অনুমান করলাম, খুনি কেন পাজামা গুটিয়ে রেখেছিল। এখনও কী চেষ্টা করলে একটা ফুটপ্রিন্ট পাওয়া যাবে না! বের-জালে হাতের ছাপ পাওয়া খুব শক্ত। সিদ্ধার্থকে বলে ওই বের-জালটাকে স্টেট ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তার গাড়িঘোড়া বেশি দেখছিলাম না। পাড়ুই বলল—গ্রামের দক্ষিণে রামচন্দ্রপুর যাওয়ার অন্য একটি রাস্তা আছে। সেটা ধরে আড়াই কিলোমিটার হাঁটলেই বাসরাস্তা। সে রাস্তায় ভ্যানরিকশা চলে। গ্রামের লোকেরা সেই পথে সাধারণত যাওয়া-আসা করে। স্টেশান যেতে হলে তারা এই উত্তরের রাস্তা নেয়।

মজুমদারদের আমবাগানে বাইক ঢুকে পড়ল। একটা গাছতলায় এসে পাড়ুই আর কনস্টেবল বাইক থামাল, আমরা নামলাম, পাড়ুই বলল—আমরা চেক করেছি স্যার, গ্রামের কেউ গতকাল আউটসাইডারকে দেখেছে কিনা।

কনস্টেবলটি বলল—জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেলে দেখা মুশকিল।

আমরা জঙ্গলের পথে হাঁটছিলাম। ঝোপঝাড়, শুকনো পথ, কিন্তু জায়গায় জায়গায় কাদা জমেছে। সিদ্ধার্থ কাদামাটির দিকে খেয়াল রাখছিল। জঙ্গলের পথে সময় অনুমান করা মুশকিল। পাঁচ কী সাত মিনিট পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছোলাম। পাতার ফাঁক গলে আলো এসে ক্রাইমসিনের ওপরে পড়েছে। জালটাকে পুলিশ সিজ করেছে, জীবিত পাখিগুলিকে ছেড়ে দিয়ে মৃত পাখিগুলিকে পুড়াবার ব্যবস্থা করেছে। কালকের বীভৎস ঘটনার চিহ্ন হারিয়ে গেছে প্রায়। ঝুঁকে পড়ে দেখলে মাটিতে কালো চাপা দাগ দেখা যাবে। শুকিয়ে যাওয়া পাঁক ভেবে ভুল হতে পারে। অভ্যস্ত চোখ জানে ওই কালো দাগগুলি আসলে শুকনো রক্তের। চালের বড়ো দানা কয়েকটি চোখে পড়ল। সিদ্ধার্থ গ্লাভস পরে রক্তলাগা শুকনো মাটি আর চালের গুঁড়োর স্যাম্পেল সংগ্রহ করছিল।

.

জঙ্গলের মধ্যে পাতার খসখসানি শুনতে পেলাম। পুলিশি অভ্যাসমত ডানহাত কোমরে গেল। আমগাছের পেছন থেকে একটি হাড়গিলে লোক বেরিয়ে এসে চিনচিনে গলায় বলল—আমার নাম সুটি মণ্ডল। আইজ্ঞে, আমার বক্তব্য আছে।

যে জঙ্গলে পাখিদের নিরাপত্তা নেই, সেই জঙ্গলে অন্য কোনো প্রাণীর নিরাপত্তা থাকতে পারে না। মজুমদারদের বাগানের ছমছমে ভাবটা আমাদের বুকের ভেতরে সেঁধিয়ে গেছে।

একটা হাড়গিলে, কোঁকড়ানো চুলের লোক যখন দুই হাত তুলে গাছের পেছন থেকে বেরিয়ে এল আমার হাত তখন রিভলভারের বাঁটে, আড়চোখে দেখলাম সিদ্ধার্থ স্যাম্পেলের ব্যাগ মাটিতে নামিয়ে রেখে পজিশান নিয়েছে। আমাদের অপর দুই সহকর্মী, যদিও, বেশ রিল্যাক্সড। জঙ্গলের ভয়ের তারাও যেন অংশ। লোকটা আন্দাজ করতে পেরেছিল, এই বাগানে একলা তাকে দেখে আমরা ঘাবড়ে যাব। সে দুই হাত তুলে তাই দাঁড়িয়ে ছিল। তার খালি গা, সাদা ধুতি এলোমেলো ভাবে কোমর থেকে হাঁটু অবধি জড়ানো।

লোকটি ফের বলল—আজ্ঞে আমি সুটি, ওই বাগানের কোণে আমার ঘর।

সুটির চেহারার বর্ণনা এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়, বিভূতিভূষণের আরণ্যকের জঙ্গলের দেবতা বা অপদেবতা টাঁড়বারোর চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য আছে বলে অনুমান করি। সুটির শারীরিক ভঙ্গিটি ছিল রক্ষণাত্মক। আমি রিভলভার থেকে হাত সরালাম।

সাব-ইনস্পেকটার পাড়ুই-এর কর্তব্যবোধ হঠাৎ জেগে উঠল। সে উর্দির সব প্যাকেট হাতড়ে একটা ছেঁড়াখোঁড়া কাগজ বের করে আনল। কন্সটেবল তার দিকে একটা পেন এগিয়ে দিল। পাড়ুই ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করল—কী বক্তব্য আছে তোর?

—কালকের মার্ডার নিয়ে কথা আছে।

—মার্ডার। পাড়ুই-এর গলায় যেন ব্যঙ্গ।

আমি পেছন থেকে বললাম—মার্ডার করতে দেখেছিস?

সুটি তখনও হাত তুলে দাঁড়িয়ে, বলল—আজ্ঞে, আমার বাপ দেখেছে খুনিরে।

পাড়ুই জিজ্ঞাসা করল—তা তোর বাপ কই?

—বাপের আজ ধুম জ্বর। কাল সারাটাদিন রোদের মধ্যি ছিল।

পাড়ুই সশব্দে নোট নিচ্ছিল, কলকাতার অফিসারদের সামনে যতটা দক্ষতা দেখানো সম্ভব তার পক্ষে! নোট থেকে দৃষ্টি তুলে সে সুটিকে বলল—তা কাল আসিসনি কেনে? টাইটেলটা মণ্ডল বললি না?

—আজ্ঞে হুজুর, বলে সুটি হাত নামাল, কাল বিডিও অফিসে শ্রম দিতে যেতে হইছিল। বিল্ডিং রঙের কাজ। সন্ধেতে যখন ঘরে আইলাম, তখন পোলাগুলান কইল মজুমদারদের বাগানে কী হইছে। রাতে খাওনের সময় বাপ কয় খুনিরে আমি দেখছি। সেই ইস্তক ধুম জ্বর বাপের গায়ে। আপনাগো মোটরবাইকের আওয়াজ শুইন্যা আমি দৌড়োতে দৌড়োতে আইলাম।

—আজ কাজে যাসনি?

—সকালটা গেসলাম, এখন রং শুকায়।

—কয়টা পোলা তোর?

—তিনটে হুজুর।

পাড়ুই ঘাড় নাড়ল—একটার মাথায় টাক?

—তারকেশ্বর গিয়ে মুড়ায়ে আনছি।

পাড়ুই আমাদের দিকে ফিরে বলল—কাল দেখেছি, আট-দশ বছরের ছেলে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম- স্কুলে যায় তারা?

সুটি লজ্জিত হল—বড়োটা যায়। বাকি দুটান্ বাগান দেখাশোনা করে। –তোদের বাগান আছে? পাড়ুই জানতে চাইল।

—হ, এইসব বাগান পার্টিশানের আগে আমাদেরই ছিল। এই বাগান, এই দিঘি। পরে মজুমদাররা কিনি নিল। এখন কোনায় বিঘেখানিকের হিসেব।

—তা তোর ছেলেগুলো কাল কিছু দেখছে? পাড়ুই-এর কথায় স্থানীয় উচ্চারণ চলে আসছিল।

সুটি মাথা নাড়ল-আজ্ঞে, বাপ দেখছে কর্তা। বুড়া বাপ। চোখে যদি ও হ্যায় ভালো দেহে না, কানটা মোটামুটি চলে।

—বাপের বয়স কত? পাড়ুই নোট নিচ্ছিল।

আমি পাড়ুইকে থামালাম। কেস ডায়ারি সাজানোর জন্য অনেক তথ্য নেওয়া হয়ে গেছে, আরও অনেক নেওয়া যাবে। আমগাছের পাতার মধ্যে দিয়ে আলো মরে আসছে। সুটিকে গতকালের ঘটনা বলতে বললাম। খুব একটা গুছিয়ে বলতে না-পারলেও, সে বললে, দুপুরে উঠানে বসে পাখি তাড়ানোর কাজ করার সময় তার বাপ, মনোজ মণ্ডল, একটা লোককে দেখে। তার কাঁধে জাল। মনোজ জিজ্ঞাসা করলে লোকটি নাম বলেছে, ‘বিশু’।

আমরা চমকে উঠলাম। প্রথমবার এই কেসে অভিযুক্তের একটা নাম শুনলাম।

পাড়ুই বলল—গ্রামে যেকটা বিশু আছে ধরে আনি স্যার? রাতটা বড়োবাবুর ফ্ল্যাটে থেকে যাবেন। যদি প্রবলেম না হয়।

কনস্টেবল স্থানীয় লোক। সে বলল-গ্রামে গোটা সাতেক বিশু তো আছেই!

পাড়ুই হাঁক দিয়ে সুটিকে বলল—বাপকে নিয়ে থানায় আসতে হবে। বিশুকে চিনিয়ে দিতে হবে, বুঝলি।

আমি পাড়ুইকে থামালাম—বিশু নামটা সত্যি নাও হতে পারে।

সিদ্ধার্থও সহমত হল- কাছাকাছি কিছু হতে পারে, বিশ্বনাথ, বিকাশ … সুটি ইতস্তত করে বলল—আজ্ঞে স্যার, বিশু যেই হোক, হ্যায় আমাদের গ্রামের লোক না।

পাড়ুই ধমকে উঠল—তুই সব বুঝে গেছিস?

—বাপ যখন হ্যারে জিগালো জাল নিয়া তুমি কই যাও। হ্যায় কয়, মাছ ধরতে যাই কাকা। বাপের সেই টাইমেই একটা খটকা লাগছিল। বুড়া মানুষ তো; ঠাউর করতে পারে নাই। খাওনের টাইমে হঠাৎ কয়, ওরে হারামি, তুমি আমারে মিছা কথা কইলা। আমি জিগাই, কী হইল, কী হইল। বাপ কয়, হেই লোক যে কয় মজুমদারদের দিঘিত মাছ ধরনের লাইগ্যা যাই। এইডা পুরাই মিছাকথা।

পাড়ুই রুক্ষভাবে জিজ্ঞাসা করে—মিছাকথা তো বটেই, কিন্তু তোর বাপ কেমনে বুঝল?

—দিঘি তো ফাঁকা স্যার।

—ফাঁকা? পাড়ুই চমকাল।

সেচের জল নেওনের লইগ্যা সব জল নিয়া নিছে। দিঘির মাঝামাঝি কাদামাটি আছে বটে। এ বাদে বেবাক ফাঁকা দিঘি।

—কাল রাতে যে বৃষ্টি হল? ভুলভাল কথা কইতে আইছোস? আসল কথাটা পাইড়া ফ্যালা তো, তোর ওই পোলাগুলান পাখি মারছে, তাই না? এহন পুলিশি কাজকারবার দেইখ্যা ভড়কে গেছস, আর বুড়া বাপের কাঁধে বন্দুক রাখচোস। এক চাপড়াইয়া বানচোত তোগো সব শয়তানি পানচার কইরা দিমু।

সুটি পাড়ুই-এর ধমক খেয়ে হাঁটু মুড়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বসে পড়ে, বলে—মা তারার দিব্যি হুজুর। আমাগো জমি জিরেত হুজুর, বাল-বাচ্চার সংসার। আমরা এই পাপ করি না।

পাড়ুই এসে সুটির কান ধরে তুলল। আমাদের বাধা দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমি চাইছিলাম, পাড়ুই তার নিজের বের-জালে নিজেই জব্দ হোক।

পাড়ুই সুটির কান ছেড়ে হাত খামচে ধরে টানতে টানতে বাগানের উত্তরের পথে হাঁটতে শুরু করল। যে পথ দিয়ে আমরা বাগানে প্রবেশ করেছি, এই পথ তার উলটোদিকে। ঝোপঝাড় ভেঙে কিছুদূর এগিয়ে, সে থমকিয়ে কনস্টেবলকে জিজ্ঞাসা করল—দিঘিটা এইদিকেই তো? কনস্টেবল ঘাড় নাড়ল।

তার হাবভাব দেখে স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম, সে একটা গণ্ডগোল আন্দাজ করতে পারছে। পাড়ুই তার পুলিশিকাজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে চাইছিল। গজরাতে গজরাতে বলল—এক্ষনি দুধ কা দুধ হয়ে যাবে। তুই শালা গুল মারতে গিয়ে ধরা পড়েছিস। তুই জানিস না কার পাল্লায় পড়েছিস!

আমি আর সিদ্ধার্থ আশেপাশে নজর রাখতে রাখতে এগোচ্ছিলাম। মিনিট পাঁচ থেকে দশের মধ্যে নাটকের যবনিকা পতন হল। আমাদের সামনে সাত বিঘার মজুমদার দিঘি, বা উচিত অর্থে বলতে গেলে মণ্ডল দিঘি। দিঘির দূরতম প্রান্তে কালো দাগের মতো কাদা দেখা যাচ্ছে, বাকিটা খটখটে শুকনো, জায়গা বিশেষে ফুটিফাটাও।

পাড়ুই সুটির হাত ছেড়ে দিল। কনস্টেবল পাড়ুইকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল—চৌখুপির মাটিতে এঁটেলের ভাগ খুব বেশি, সব জল শুষে নেয়। ভারী বর্ষা না হলে জল দাঁড়াই-ই না।

সিদ্ধার্থ বোধহয় জঙ্গলের মধ্যে কিছু একটা দেখতে পেয়েছে। সে ফের বাগানে প্রবেশ করল।

সুটির থেকে এখনও অবধি বিশেষ কোনো খবর পাওয়া যায়নি যা কাজে লাগতে পারে। বিশু আসল নাম কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। এমন খুনি নিশ্চয়ই আগে থেকে ভেবেচিন্তে নিজের একটা নাম নিয়ে রেখেছে। সাধারণত সিরিয়াল কিলাররা নিজেদের অপরাধ জগতের নামেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে। মনোজ মণ্ডল যখন খুনিকে তার নাম জিজ্ঞাসা করেছিল, সে স্বাভাবিকভাবেই আগে থেকে ভেবে রাখা নামটা বলেছে। এ সত্ত্বেও বলা যায়, সুটির বাপ খুনিকে দেখেছে। চোখে কম দেখে, কিন্তু কানে শোনে ভালো। পাড়ুইকে, যথেষ্ট হয়েছে বলে, আমি সুটিকে জিজ্ঞাসা করলাম—বাপ তো কানে ভালো শোনে, খুনিটার বয়েস কত হবে বলতে পেরেছে?

সুটি বলল—আমি জানতে চেয়েছিলাম হুজুর, কীরকম বয়েস তার। বাপ বলে এই তোগো বয়সই হইব। তিরিশ-চল্লিশ।

আমি অবাক হলাম। এর আগে অবধি আমার সূত্রগুলি নির্দেশ করছিল, খুনি বয়স্ক লোক। তা তবে ভুল, অন্যথায় আমাদের মানতে হবে যে একাধিক খুনি আছে। আমি একাধিক খুনির ধারণা মানতে পারব না। আমার কাছে কেসটা এখনও মাস-মার্ডারের, মাস-হিস্টিরিয়ার নয়। একজন গোয়েন্দার পক্ষে পক্ষপাত খুব খারাপ জিনিস, আমি বোধহয় সেটাই হয়ে পড়ছিলাম—বায়াসড আর অবসেশড।

সিদ্ধার্থ বাগানের ভেতর থেকে ডাক দিল।