পার্ল রেস্টুরেন্ট

পার্ল রেস্টুরেন্ট

হেঁদুয়ার পার্ল রেস্টুরেন্টের মালিক শ্যামল কানুনগো। এই অঞ্চলের অন্যান্য পাইস হোটেলের তুলনায় পার্ল রেস্টুরেন্ট বেশ হাল আমলের। দেয়ালে রঙিন টাইলস বসানো, নীল রঙের পার্টিশান খাওয়ার ঘর আর রান্নাঘরকে আলাদা করেছে। হোটেলের সামনে সরু গলি। কানাইদের গাড়ি সাতটা দশে পার্লের সামনে এসে থামল। আকাশে বজ্রগর্ভ মেঘ থেকে তখন সবে দু-একটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। শহরের গরম ভাবটা কেটে গেছে।

পার্লের মালিক শ্যামল কানুনগো ধূপধুনো দেখিয়ে ক্যাশবাক্স খুলছিলেন। কানাইদের দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি পুজোর পাটটা সেরে নিলেন। ভূঁইঞার ফোন পেয়ে তিনি আন্দাজ করেছিলেন সন্ধেটা ভালো কাটবার নয়। নীচু গলায় ভুঁইঞা জানতে চাইল-কর্মচারীদের বলেননি তো কানুনগোসাহেব? শ্যামল কানুনগোর পাকানো চেহারা, ছিটের জামা, দরজি দিয়ে বানানো প্যান্ট। চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে শ্যামল কানুনগো মাথা নাড়লেন।

কানাই বলল—কোন জায়গায় বসলে এই খাওয়ার জায়গাটা গোটাটা দেখা যাবে বলুন তো?

শ্যামল কানুনগো বললেন—যে কোনো একটা টেবিলে বসে পড়ুন, আজ তো একেই বৃষ্টি, কপাল মন্দ।

—না না, খাওয়ার ঘরে না, একটু দুরে, রান্নাঘরে বসা যায়?

আপনারা মালিক, যেখানে খুশি বসুন, রান্নাঘরে বসুন, গলির ওদিকে বোসেদের রোয়াকে হাত পা ছড়িয়ে বসুন, পার্টিশান নামিয়ে দিচ্ছি, সব দেখতে পাবেন।

ভুঁইঞা আর সৌভিক গিয়ে বোসেদের রোয়াকে রুমাল পেতে বসল। কানাই ঢুকলেন রান্নাঘরে। শ্যামল কানুনগো কানাইকে দেখিয়ে বটঠাকুরকে বলে গেলেন—দেশ থেকে এসেছে, আমাদের জ্ঞাতি, হোটেলের কাজকর্ম দেখবার শখ দাদার। চা খাইয়ো ঠাকুর।

কানাই একটি মুরগির ডিমের খালি ক্রেট টেনে তার ওপর বাবু হয়ে বসলেন, যতটা আরাম করে বসা যায় আর কী! ব্যাচ শুরু হওয়ার আগে বটঠাকুর এক কাপ চা আর সুজি বিস্কুট দিয়ে গেল। আটটা থেকে রেস্টুরেন্টে লোকজনের আনাগোনা শুরু হল আর সাড়ে আটটা থেকে বৃষ্টি। নটার পর থেকে হোটেলে যেসব খদ্দের আসছে তাদের সবার মাথায় ছাতা আর সবাই খেয়ে খাতায় নাম সই করে যাচ্ছে। সাড়ে নটার দিকে বৃষ্টি ধরে এল। তখন হোটেলে ভিড় অল্প বাড়ল। কানাই বৃষ্টি ধরে আসার ফাঁকে বারকয়েক বেরিয়ে ধুমপান করে এসেছেন। সৌভিক আর ভুঁইঞা মশার অত্যাচারে জেরবার হচ্ছে। সাড়ে দশটার সময় শ্যামল কানুনগো রান্নাঘরে এসে জানলেন—এই শেষ ব্যাচ!

ব্যাচে চার-পাঁচটে টেবিলে লোক বসেছে। ডাল ভাত দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে আলুভাজা। বটঠাকুর কানাই-এর সঙ্গে দেশের গল্প করছিল। কানাইও বাঁকুড়ার কোনো কাল্পনিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলকে নিজের দেশ ভেবে নিয়ে কথা বানিয়ে যাচ্ছিল। ওয়েটার এসে বলল—তিন নম্বরে একটা ছানার কালিয়া। বটঠাকুর—ওরে বাবা, সে তো আবার বানাতে হবে, বল গে দশটা মিনিট, দিচ্ছে।

বটঠাকুর গল্প ছেড়ে উঠছিলেন, কানাই জিজ্ঞেস করলেন—কালিয়া ফুরিয়ে গেছে নাকি ঠাকুর?

—ওই তলানি আছে, ইস্পেশাল, অল্প করে বানাই!

কানাই ডিমের ক্রেট থেকে লাফিয়ে উঠলেন, ওয়েটারকে ডেকে নীচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন—কোন টেবিল স্পেশাল অর্ডার করেছে?

ছেলেটি তিন নম্বর বলে হাত তুলে দেখাল। পার্ল রেস্টুরেন্টের এক কোণের টেবিল। এক জন মাত্র লোক দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেও এই টেবিলে দুজনকে একসঙ্গে খেতে দেখে কানাই কোনো সন্দেহ করেননি। আর একটি লোক বোধহয় আগের ব্যাচের ছিল। কানাই ধীর পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খাওয়ার ঘরে ঢুকলেন। কানাই-এর ধারণা হল, রোয়াক থেকে সৌভিক নির্ঘাৎ তাকে খাওয়ার ঘরে ঢুকতে দেখে থাকবে। কানাই চুল আঁচড়ানোর ভঙ্গি করে, সৌভিককে ইশারা করলেন-আসতে হবে না। তিন নম্বর টেবিলের কাছে গিয়ে লোকটির ঘাড়ের উপর দিয়ে উঁকি দিয়ে কানাই দেখলেন ছেলেটি ডালে-ভাতে মেখে খাচ্ছে, একপাশে আলুভাজা। টেবিলের উলটোদিকে আগের লোকের ফেলে যাওয়া এঁটো বাসন, এখনও পরিষ্কার হয়নি। কানাই নিশ্চিত হলেন, এই ছেলেটি এই ব্যাচেই বসেছে। উলটোদিকের লোকটি আগের ব্যাচের ছিল, যার খাওয়া গড়িয়েছিল পরের ব্যাচ অবধি।

কানাই উলটোদিকের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়লেন। ছেলেটি মুখ তুলে তাকাল না, খেতে থাকল একমনে। কানাই টেবিলের দিকে আড়াআড়ি তাকালেন। টেবিলের ওপর কনুই তুলে বসে এক পলের জন্য ছেলেটিকে খেয়াল করার চেষ্টা করলেন। বয়েস কুড়ি-একুশ, চোখের নীচে কালো দাগ, জামাকাপড় দেখে মনে হয় আর্থিক অনটন নেই। কানাই দেয়ালের গায়ে ঠেকানো জলের জগটি হাত দিয়ে সরিয়ে দিতেই বেরিয়ে পড়ল একটি নুনদানি, যার গড়ন অন্যান্য টেবিলের গুটিকয় নুনদানিগুলির থেকে আলাদা। ছেলেটি আচমকা উঠে পড়ল, খাওয়া শেষ না করে, যেন খুব বিরক্ত হয়েছে। কানাই ডেকে বলল–ও ভাই এই যে আপনার নুনদানিটা, আপনারই তো?

ছেলেটা থমকে দাঁড়াল, ফের কানাই-এর টেবিলের কাছে ফিরে এসে কানাই-এর হাত থেকে এক ঝটকায় নুনদানিটা নিতে যাওয়ার চেষ্টা করলে কানাই খপ করে ছেলেটার হাত ধরে ফেললেন।

কানাই ভেবেছিলেন ছেলেটি পালানোর চেষ্টা করবে।

কিন্তু ছেলেটি পালানোর চেষ্টা করল না। চুপচাপ কানাই-এর উলটোদিকে নিজের খালি চেয়ারে বসে পড়ল।

কানাইচরণ বললেন—স্পেশাল আসছে, খেয়ে নাও।

ছেলেটি ডালভাতের ভেতর আঙুল চালাতে চালাতে বলল- আপনি পুলিশের লোক, না? আমাকে ধরবেন?

কানাই বললেন—ধরে হবেটা কী! তুমি তো মরতে চাও, আজ না হয় তিন বছর মামলা চলার পর।

ছেলেটি মাথা নীচু করে থাকল। রান্নাঘর থেকে ওয়েটার এসে ছানার কালিয়ার বাটি রাখল। কানাই ছানার কালিয়ার বাটির ওপর নুনদানি উপুড় করে দিলেন। নুনদানি থেকে নুনের বদলে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইডের কালো দানা ছানার কালিয়ার বাটিতে মিশে গেল।

কানাই জিজ্ঞেস করলেন—ভাত আর দেবে?

ছেলেটি মাথা নাড়ল। ডাল মাখা ভাত সরিয়ে, থালার মুক্তোর মত সাদা ভাত আলাদা করে তাতে বাটি থেকে ছানার ডালনা পুরোটা ঢালল।

গোয়েন্দা কানাইচরণ এতক্ষণ ছেলেটির হাতের কবজি ধরে ছিলেন, এইবার ছেলেটির কবজি ছেড়ে দিয়ে বললেন—আমরা নাম ঠিকানা জোগাড় করে বাড়িতে খবর দিয়ে দেব। সুইসাইড নোটটা খুঁজলে পাব তো?

ছানার কালিয়ায় মাখা ভাতের দিকে ছেলেটি মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।