৪
ভানু সমাদ্দারকে নিয়ে দু-চারটে কথা না-বলা অন্যায় হবে।
ইতিহাসের পাতায় অনেকের পাকা আসন থাকে, আর ঐতিহাসিক কারণেই অনেক আসন আড়ালে থেকে যায়। সেসব আসন সামনে চলে এলে পাকা আসনগুলি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। ইতিহাসের পাতায় ভানু সমাদ্দারের আসন যদি থাকে তবে তা থাকবে আড়ালে। এই সেসিল বারে বসে আজ রাতে আমি বলতে পারি, ভানুবাবু না থাকলে ইতিহাসের অনেক পাতাই থাকত না।
এক কথায় বলতে বললে, বলব, ভানু সমাদ্দার আসলে খোঁচড়। দু-দশ বছরের খোঁচড় নন, আঠারো বছর বয়েস থেকে খোঁচড়। লালবাজারের খোঁচড় হয়ে তার অর্ধেক সেঞ্চুরি জীবন পেরিয়েছে। ব্রিটিশ পুলিশের জন্য কাজ করে ফ্রিডম ফাইটারদের ধরিয়েছেন। আবার শোনা যায়, সরোজ দত্ত থেকে চারুবাবুকে ধরার পেছনে আসল খবর জুগিয়েছিলেন ভানুবাবুই। তার মরালিটি বলে আদৌ কিছু আছে কিনা তা নিয়ে সেকেলে বড়োকর্তাদের আলোচনা করতে শুনেছি। আমার মনে হয়, ভানু সমাদ্দারের মরাল সেন্সটি থাকুক বা নাই থাকুক, জব্বর লয়ালিটি জ্ঞান আছে। তিনি বরাবর লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র ইনস্পেকটারটির অনুগত। কমিশনার নিজে এসে ভানু সমাদ্দারকে অর্ডার দিলেও ভানু হেসে প্রত্যাখ্যান করবেন। কিন্তু সিনিয়র ইনস্পেকটরের কথায় বিগ্রেডে রাজনৈতিক সমাবেশে গিয়ে বাদামওয়ালার থেকে মামুলি সংবাদ আনতেও পিছপা হবে না। প্রসঙ্গত, মামুলি নাক গলানোর কাজে ভানুর সুনামকে কাজে লাগানোও হত না। যেমন পলিটিকাল পার্টির ভেতরের খবর আনা, কবে বাস পুড়ানো হবে, কবে পিকেটিং হবে, বা ফ্যান্সি মার্কেটে কোন দোকানে সদ্য স্মাগলিং-এর মাল এসেছে, কিংবা ছাট লোহার রেট খাতায় কলমের পেছনে কত চড়ল-পড়ল। এসবের জন্য হাজারটা খোঁচড় লালবাজারের পকেটে আছে। ভানু সমাদ্দার হলেন রাজ-খোঁচড়। লালবাজারের সিনিয়র ইনস্পেকটার একমাত্র তার সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন, সেই হিসেবে ভানু সেসময়ে আমার গুরু মতি লাহিড়ীর খোঁচড়।
লালবাজারের পেছনে ভানুদের পারিবারিক চশমার ব্যবসা। উত্তরাধিকার সূত্রে ভানু তার মালিক। বাপ মারা যাওয়ার পর থেকে সে ক্যাশবাক্স ছেড়ে ওঠে না। যদিও দোকানের সেসময় যা হাল হয়েছিল তাতে ক্যাশবাক্স ছেড়ে উঠলেও বিপদের কোনো আশঙ্কা ছিল না। ভানুদের ‘মার্ভেল অপটিক্যাল’ থেকে একসময় চশমা বানিয়েছেন সুভাষ বোস, শরৎচন্দ্র, এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও ভানুর বাবা চশমা বানিয়ে দিয়েছিলেন। বিলেত থেকে ফ্রেম আনা হয়েছিল। এই কথার সত্যি-মিথ্যে যাচাই করে লাভ নেই, স্বয়ং ভানুও তা পারবেন না। বউবাজার স্ট্রিটের পুরোনো দোকানমাত্ৰ দাবি করে যে সুভাষচন্দ্রের গোল রিম দেওয়া চশমা তাদের বানানো। কে জানে! অন্য দোকানগুলি পরবর্তীকালে আর সুভাষচন্দ্রের যুগের চশমায় আটকে থাকেনি। তারা আধুনিক ফ্রেম এনেছে, ফ্রেমের মেটেরিয়াল পালটে গেছে, কাচের মান বদলেছে। মার্ভেল অপটিক্যাল নাইন্টিজে এসেও সুভাষের গোল ফ্রেম বেচছে আর মেয়েদের জন্য নির্মলা মিশ্রের চশমা। ফলে যা হবার তাই, দোকান চলে না। ভানু বাদে এক কর্মচারী, ছেলেরা নিজেদের মধ্যে বাওয়াল করে বাপের সম্পত্তি থেকে দূরে থাকে। ভানু দোকানে বসে দোকানদারি আর খোঁচড়বৃত্তি চালায়। আর একটি কথা, ভানু জাতে মোহনবাগান, খেলার দিন, মার্ভেল অপটিক্যালের দশ মিটারের মধ্যে পা রাখলে রেডিওর আওয়াজ কানে আসবে। ভানু মারা গেছে আজ বছর ঘুরতে চলল, ছেলেরা সম্প্রতি নিজেদের বিবাদ মিটিয়ে চশমার ব্যবসা উঠিয়ে কাঠিরোলের দোকান দিয়েছে।
আমার সঙ্গে তার সেইবার যে দেখা হল, তখন তার বয়েস আশি পেরিয়েছে। তার সুনাম ও পদমর্যাদার কথা মাথায় রেখেও আমি ঠিক করেছিলাম ভানু সমাদ্দারকেই এই কেসে আমার চাই! এমন লোক যার হাজারটা কান, আর মুখ প্রায় একটাও নেই। যে লোক চারটে জেলার খবর আমাকে এনে দেবে আর এই কেসে লালবাজারের ইনভলভমেন্ট নিয়ে কাউকে কিছু বলবে না। আমি আগে কখনও ভানুর সাহায্য চাইনি। ভানু আমাকে মতিদার সঙ্গে বিলক্ষণ একাধিকবার দেখেছে। হতেই পারে, আমাকে ভানু বিন্দুমাত্র সাহায্য করবে না, কিন্তু লালবাজারে যাওয়ার রাস্তাটা আদৌ সরল নয়, তা সর্পিল।
একটা টুল টেনে বসলাম, গলির ওপরে দোকান, সামনে ডেস্ক, ডেস্কের ওপারে ভানু সমাদ্দার। ডেস্কের ওপর একটি কালো আর ভারী টেলিফোন, ভানুর হাতের নাগালের মধ্যে। টেবিলের অপর কোণে একটি তিন-পাল্লা দেওয়া আয়না, চশমার দোকানে যা আকছার দেখা যায়। দোকানের এক মাত্র কর্মচারীটি তাতে নিজের চুলের টেরি ঠিক করছিল। দোকানের কাচের র্যাকের বেশিরভাগটাই ফাঁকা, অল্প কিছু ফ্রেম সাজিয়ে রাখা। র্যাকের ওপরে নেতাজি ও সুচিত্রা সেনদের বাঁধানো ছবি, সবুজ দেওয়াল।
সন্ধের ঝিমুনি আর লালা জড়ানো গলায় ভানু বললেন—ছোটোবাবুর চোখে কি পাওয়ার ধরা পড়ল?
আমি বললাম—একটা কেসের জন্য এসেছি, আপনার পরামর্শ দরকার।
ভানু মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বললেন—লালবাজারে আর পা তো রাখি না, আজ কুড়ি বছর।
আমি বুঝলাম, ভানু ভদ্রকথায় আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন। ভানুর কথায় পাত্তা না দিয়ে বললাম—টিকটিকিগিরির কাজ না। একটু নাড়ি টিপে রোগীর অবস্থা বলতে হবে।
ভানু ঢুলুঢুলু চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকলেন।
আমি নীচু গলায় বললাম—বর্ধমানের দিকে ধানের বিক্রিবাটা আর ফলন কেমন হচ্ছে জেনে বলতে হবে।
আমি মনে মনে ভেবেছিলাম এই যে, চারটি পাখিমারার ঘটনাই ঘটেছে বর্ধমান আর হুগলি জেলায়। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে…’ ইত্যাদি বলেছে, সুতরাং ধানচাষের অবস্থাটা খতিয়ে দেখা দরকার।
ভানু খানিক চুপ থেকে বললেন—ফলন কেমন জানতে তো মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াতে হবে। অত লোকবল আমার নেই। আপনি বরং লোকাল পিএসকে বলুন।
আমি গলা খাঁকারি দিলাম।
ভানু আমার অস্বস্তি বুঝে বললেন—পিএসকে বলা যাবে না, অ, বুঝেছি। খোঁজখবর করতে সুবিধা হবে ভেবে বললাম—আপনি লোক পাঠিয়ে বর্ধমানের আড়তে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।
—চালের আড়ত তো বর্ধমানে না। ভানু ঊর্ধ্বনেত্রে বললেন।
—তাহলে কোথায়? জানতে চাইলাম।—বর্ধমানকেই তো রাজ্যের ধানের গোলা বলা হয়।
ভানু হাসলেন, তার ফোকলা মুখ দেখতে পেলাম, বললেন —সে তো ভূগোল বইয়ে। বাস্তবে বর্ধমানে ধান সবচে বেশি হয় ঠিকই। কিন্তু চালের পাইকারি বাজার হাবড়ায়। সেখানে খোঁজ করলে হবে?
আমি আর এর কী বুঝি, মাথা নাড়লাম।
ভানু ডেস্কের নীচ থেকে এক পাতা কাগজ টেনে এনে জিজ্ঞাসা করলেন—কী খবর এনে দিতে হবে?
—ঠিক কী খবর খুঁজছি নিজেও জানি না। এই ধরুন এইবছর ফলন কেমন হল, চাষিরা দাম পেল কিনা।
ভানু খসখস করে লিখতে লিখতে বললেন—এইবার তো ফসল ওঠেনি এখনও।
—তাহলে গেলবারের ফলন কেমন ছিল। গেলবার চাষিরা দাম পেল কিনা, যা ইনফরমেশান আপনার মতে আমার জানা উচিত, ধান-চাল সংক্রান্ত।
—আচ্ছা, ভানু বললেন, মানে চালের বাজারের ভেতরের খবর আর কী!
—ঠিক তাই, মানে একটা চাল টিপলেই তো হাঁড়ির ভাত সেদ্ধ হল কি না বোঝা যায়।
ভানু লেখা শেষ করে কাগজটা কর্মচারীর দিকে এগিয়ে দিলেন।
আমাকে বললেন—আড়তে খোঁজ করে খেত খামারের খবর বের করার আইডিয়াটা ভালো। মতিবাবুর কাছে চ্যালাগিরি করছেন তো?
মাথা নাড়লাম। ভানু সমাদ্দার লালা জড়ানো গলায় জিজ্ঞাসা করলেন—সিনিয়ার ইনস্পেকটার হতে আর কত দিন?
—দুহাজার চারে মতিদার অবসর। তারপর কর্তারা চাইলে…।
ভানু সমাদ্দার গদগদ গলায় বললেন—আমাকে যেন দেখবেন।
আমি বোধহয় মনে মনে ভাবছিলাম, ভানু সমাদ্দার ততদিন বাঁচবেন কিনা। ভানু আমার সংশয় আন্দাজ করতে পেরে পেছন দিকে ফিরলেন। দেয়ালে ঝোলানো নেতাজির ছবির উদ্দেশে হাত জোড় করে বললেন—অনেক পাপ করেছি তো, অনেক ভার, সহজে পৃথিবীর মাটি ছেড়ে ওপরে উঠব না।
.
লালবাজারে যখন ফিরে এলাম সন্ধে ঢলে রাত নেমে এসেছে। লালবাজারের করিডোরের অধিকাংশ আলো নেভানো, দূরে দূরে কয়েকটি দুর্বল বাল্ব আর অন্ধকার মিলেমিশে ভৌতিক আবছায়া তৈরি করেছে। একটি রাজনৈতিক দল সন্ধেতে এসেছিল কমিশনারের কাছে হলফনামা দিতে, মনোহরদাস তরাগের কাছ থেকে তাদের মাইকের ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসছে, অফিসারেরা যার যার ঘরের পাল্লা ভেজিয়ে বাড়ি বা যথাস্থানে ফিরে গেছে। যাদের নাইটডিউটি তারাও চুপচাপ অফিসে বসে ডিনারের অপেক্ষা করছে। তিনতলায় কতিপয় বড়োকর্তার সান্ধ্যবাসর থেকে হঠাৎ জোরে হাসির আওয়াজ পেলাম, রাস্তায় গাড়িঘোড়ার আওয়াজও যেন অস্বাভাবিক কম। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরে চেপে বসেছে, জিভ বলছে পানীয় চাই, অথচ রাতের লালবাজার ত্যাগ করে বাড়ি ফেরার বাস ধরতে মন চাইছে না। করিডোরের দুর্বল বালবের মতো বিবেকের একটা সামান্য অংশ যেন জেগে উঠছে, আর বলছে, রন্তিদেব সেনের কথায় ভুল নেই, পাখিগুলো মারা যায়নি, তাদের হত্যা করা হয়েছে, মার্ডার। যেভাবে চার জায়গায় শ-খানেক পাখি মারা হয়েছে সেইভাবে মানুষকে খুন করা হলে সেই ঘটনাকে সিরিয়াল কিলিং বলা হত। সিরিয়াল কিলিং-এর তদন্ত নির্দিষ্ট ধারায় ও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে করা হয়। তাহলে পাখিদের আত্মারা কেন বিচার পাবে না! কাল যদি অপরাধী ধরা পড়ে পুলিশ হয়তো মামুলি কেস দেবে, হয়তো ভয়-দেখানোর কেস দেবে, পরিবেশ সংরক্ষণের বা অ্যানিম্যাল ক্রুয়েলটির কেস দিতে পারে, খুব বেশি হলে চুরি বা মারপিটের কেসে ফাঁসিয়ে দিতে পারে! সে ডিপার্টমেন্ট যা পারে করুক। যে ধারায় অপরাধীকে বাঁধতে চায়, বাঁধুক। আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে পাখি খুনের কেস, আজ থেকে সিরিয়াল মার্ডারের কেস। সুতরাং, সিরিয়াল কিলিং-এর তদন্ত যেভাবে করা উচিত আমি তাই করব। আমি এই কেসটা সি আর পিসি তিনশো দুইয়ের চার্জ দেওয়ার জন্য লড়ছি।
