দিন প্রতিদিন – ৬০

৬০

অদ্ভুতভাবে পরদিন আর সাদিক এল না। রুমা অবাক হলেও কিছু বলল না। জরিনা এসে ঘুরঘুর করে। মেয়েটাকে দেখে বড় মায়া হয়। এইটুকু মেয়ে। সাদিক যদি ওর বাপও হয়, ওর মেয়েকে এখানে রেখে দিল? এরা কেমন ধরনের মানুষ? নাকি এরা দিব্যেন্দুর মতোই মানুষ? নাকি তার থেকেও খারাপ?

দরজার কাছে এসে জরিনা দাঁড়িয়ে আছে। রুমা বলল, ‘কী বলবি? ঘরে আয়।’

জরিনা ঘরে ঢুকে বলল, ‘কিছু খাবা?’

রুমা বলল, ‘খেয়েছি তো। আর খাব না।’

জরিনা বলল, ‘কিছু খাইলে বলো।’

রুমা বলল, ‘বলব। সবাই কোথায় এখন?’

জরিনা বলল, ‘বাজার গেছে।’

রুমা অবাক হল, ‘মেয়েরাও?’

জরিনা হাসল, ‘এখানে তুমি ছাড়া কেউ থাকে না তো। রাতে মেয়ে নিয়ে আসে। ধান্দা করে চলে যায়। এইখানে কয়টা ঘর আছে শুধু সাহেবের।’

রুমা বলল, ‘এখানে শুধু সাহেব আসে?’

জরিনা ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ। আরও আসে। চেনা জানা লোক। তোমার আগে এখানে একজন ছিল। তাকে হঠাৎ করে পাওয়া যাচ্ছে না।’

রুমা বলল, ‘কে ছিল?’

জরিনা বলল, ‘আমিনা আপু। সাহেব এলে আমিনা আপুর কাছে থাকত।’

রুমা বলল, ‘কী হয়েছিল তার?’

জরিনা অদ্ভুতভাবে রুমার দিকে তাকিয়ে হাসল।

রুমা অবাক হল, ‘কীরে? কী হয়েছিল বলবি না?’

জরিনা বলল, ‘কক্সবাজারে নিয়া গেছিল। তারপর আর তারে খুঁজে পাওয়া যায় নাই। সাহেবের অনেক খেয়াল।’

রুমা বলল, ‘কী খেয়াল?’

জরিনা কথা বন্ধ করে টিভি চালিয়ে দিল। রুমা বলল, ‘কীরে? কী খেয়াল বলবি তো?’

কলিং বেল বাজল। জরিনা অবাক হয়ে বলল, ‘সকালে সাহেব আসল নাকি? ও আল্লা! দেখি।’

জরিনা বেরিয়ে গেল। মিনিট খানেক পর এসে বলল, ‘রুমান ভাই আসছেন। আমাকে বাজারে যেতে বলসেন। তুমি কথা বলবা? সাহেবের বন্ধু?’

রুমা কিছু বলার আগেই রুমান ঘরে ঢুকে জরিনাকে ধমক দিল, ‘তুই যা। যা বলছি নিয়া আয়। দেরি করবি না।’

জরিনা ভীত মুখে রুমার দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। রুমান চেয়ারে বসল। রুমা তাকাল। শমিতা শিখিয়েছিল। বেশ্যাবাড়ি সাধারণ ঘরবাড়ির মতো না। এখানে কেউ বলে ঘরে ঢোকে না। এভাবেই হুট হাট করে ঢুকে যাবে।

‘আমাকে আপনার খোঁজ খবর নিতে পাঠানো হয়েছে।’

রুমানের মুখে হঠাৎ কলকাতার বাংলা শুনে অবাক হয়ে গেল রুমা। রুমান বলল, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করার ইন্সট্রাকশন আছে। আগের মেয়েটাকে আমরাই গুম করেছি। আপনার এন্ট্রান্সের জন্য।’

রুমান উঠে পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখে এসে বলল, ‘কোনও রেকর্ডিং ডিভাইস ইউজ করবেন না। ফোন রাখবেন না। সাদিক যা বলবে, সব মাথায় রাখবেন।’

রুমানের দিকে চুপ করে চেয়ে থেকে রুমা বলল, ‘আমাকেও সাদিক ওরকম করে দেবে? গুম করে দেবে? মেরে দেবে?’

রুমান বলল, ‘পারবে না।’

রুমা বলল, ‘এত শিওর হচ্ছেন কী করে?’

রুমান বলল, ‘হচ্ছি। শিওর হবার কারণ আছে বলেই বলছি।’

রুমা বলল, ‘আর আমার ফেরার পথ?’

রুমান বলল, ‘সেটা আপনি ঠিক করবেন। আমি বলব না। পারবেন?’

রুমা চুপ করে বসে থেকে বলল, ‘আপনি করবেন? না আমাকেই করতে হবে?’

রুমান বলল, ‘আমি ব্যবস্থা করব।’

রুমা বলল, ‘নইলে মরতে হবে। তাইতো?’

রুমান উঠে দাঁড়াল, ‘দেখা যাবে। বেঁচে থেকে কী করবেন? কোন লোক বেঁচে থেকে কিছু করতে পেরেছে? আমিই বা বেঁচে থেকে কী করতে পারলাম? এখন যাই। জরিনা এসে যাবে যেকোনও সময়। সাদিক যেন সন্দেহ না করে।’

রুমা বলল, ‘আপনার কলকাতায় বাড়ি?’

রুমান বেরোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল, ‘ভুলে গেছি কোথায় বাড়ি।’

.

৬১

দিল্লি

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। তুষার বই পড়ছিলেন। গল্পের বই।

আশরফ খান দরজায় নক করলেন, ‘আসব স্যার?’

তুষার বললেন, ‘এসো।’

খান চেম্বারে প্রবেশ করে বললেন, ‘কী বই পড়ছেন?’

তুষার হাসলেন, ‘নভেল। আরে তুমি বসো। খবর বলো।’

খান বললেন, ‘মিজান আহমেদ সম্ভবত নেক্সট উইকে সাদিকের কাছে যাচ্ছে। আমাদের কাছে সেরকমই খবর আছে।’

তুষার বললেন, ‘খবরটা কি ঢাকা থেকে এল?’

খান বললেন, ‘না। দুবাই থেকে। আলি জানালো। ঢাকার ইন্টেল জাস্ট কোনও রিপোর্ট করছে না। কবে কী করবে কিচ্ছু বলছে না।’

তুষার ভ্রু কুঁচকালেন, ‘কেন? ঢাকার কী হয়েছে?’

খান বললেন, ‘কিছুক্ষণ আগেও রিপোর্ট করল, বলল সব ঠিকঠাক। তাহলে আলির খবর আলাদা হল কী করে? ঢাকা জানছে না, দুবাই জেনে যাচ্ছে…সামথিং ইজ ফিশি।’

তুষার বললেন, ‘মিজান মুজফফরাবাদ থেকে বেরোবে। সায়ক এই খবরটা দিয়েছিল। কিন্তু ওর নেক্সট ডেসটিনেশন কী, সেটা ও জানতে পারেনি। এবার জিগস পাজলের একটা মিস্ট্রি সলভ হল।’

খান চিন্তিত মুখে বললেন, ‘আই এস আই আবার অ্যাক্টিভ হয়ে গেছে স্যার। ঢাকা একটা বড় কনসার্ন হয়ে যাচ্ছে। এখানে যদি সরকার পাল্টায়, তাহলে…’

তুষার বললেন, ‘অবভিয়াসলি। তবে ডেমোক্রেসিতে সরকার পাল্টাতেই পারে। তার জন্য আমাদের বসে থাকলে চলবে না। আমরা কীসের জন্য বসে থাকব? এগুলো তো আমাদের কন্ট্রোলে নেই। আরেকটা ব্যাপারও আছে। জনমত উপেক্ষা করে কোনও দেশে যদি অহেতুক জনস্বার্থ বিরোধী সরকার চলে, সে দেশের আইনশৃঙ্খলা আরও বেশি করে প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। আই এস আই তখন সেখানে নিশ্চিন্তে অপারেট করবে।’

খান বললেন, ‘তাও ঠিক।’

তুষার বললেন, ‘ঢাকার সেল অ্যাক্টিভ কর। মিজানের অ্যাক্টিভিটির পুরোটা চাই আমার। মিজান এখন কোথায়? দুবাইতেই আছে?’

খান বললেন, ‘হ্যাঁ। খুব কেনাকাটা করছে। প্রচুর সোনা কিনেছে।’

তুষার বললেন, ‘সোনা মানে? গয়না না বার?’

খান বললেন, ‘দুটোই। বার বেশি। সেভেন্টি থার্টি রেশিও। মানে…’

তুষার খানকে শেষ করতে দিলেন না, ‘এভাবে ফান্ড পাঠাবে নাকি? তা মনে হয় না। দুবাই থেকে ঢাকায় ফান্ডিং এর জন্য মিজান সোনার বার কিনে নিয়ে যাবে না। অন্য কিছু করবে।’

খান বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী হবে?’

তুষার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বইটা টেবিলের উপরে রেখে ইন্টারকমে পীযূষকে ফোন করলেন, ‘একবার এসো তো।’

পীযূষ এসে বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’

তুষার বললেন, ‘লাস্ট সাত দিনের ক্রিপ্টো রেট কী আছে?’

পীযূষ বললেন, ‘ডাউনের দিকে। ক্রিপ্টোর এক্সচেঞ্জ কম আছে।’

তুষার বললেন, ‘ডার্ক ওয়েবে?’

পীযূষ বললেন, ‘কেউ কেউ এখন গোল্ড প্রেফার করছে। ক্রিপ্টো অনেকেই নিচ্ছে না।’

তুষার বললেন, ‘সলিড গোল্ড?’

পীযূষ বললেন, ‘সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিগুলোতে সলিড গোল্ডই বেশি প্রেফারেন্স পাচ্ছে।’

তুষার বললেন, ‘হঠাৎ গোল্ডের দিকে ঝুঁকছে কেন সব?’

পীযূষ বললেন, ‘ইন্ডিয়ান মার্কেটে ট্যাক্সের জন্য ক্রিপ্টোর এক্সচেঞ্জ কমেছে। এখনও ইন্ডিয়া-ই এখানকার ইকোনমি কন্ট্রোল করে। সেটা একটা কারণ অবশ্যই।’

তুষার বললেন, ‘আরও কী কী কারণ হতে পারে একটা সার্ভে করে আমাকে জানাও। সামথিং ইজ ভেরি ফিশি।’

খান পীযূষকে বললেন, ‘ঢাকার ডার্ক ওয়েব থেকে কিছু পাওয়া গেছে লাস্ট সাত দিনে?’

পীযূষ বললেন, ‘ওদিকে আর্মস ডিলিং বেড়েছে। সেটা লাস্ট সাত আট মাসে এমনিতেও বেড়েই আছে। ইলেকশন আছে বলে বাড়তে পারে।’

খান তুষারের দিকে তাকালেন, ‘স্যার, আমি কি ঢাকা যাব?’

তুষার মাথা নেড়ে বললেন, ‘না। এখনই না। আমি আরও চার পাঁচ দিন দেখব। ঢাকার ইন্টেল থেকে কিছু খবর না পেলে তারপর বলছি। অবিনাশ কী বলছে বল তো? ঠিক করে রিপোর্ট করছে না কেন? আবার বিগড়েছে নাকি?’

পীযূষ বললেন, ‘অবিনাশ এখন কলকাতায়। আজকেই লোকেশন আপডেট পেয়েছি।’

তুষার বললেন, ‘সে কী? আমায় বলেনি কেন?’

পীযূষ বললেন, ‘আমি তো ভেবেছি আপনাকে বলেছে।’

তুষার বললেন, ‘না। আমি সেটাই জানতে চাই। কন্ট্যাক্ট করো। আমার সমস্ত আপডেট চাই।’

পীযূষ বললেন, ‘ওকে স্যার।’

পীযূষ চেম্বার থেকে বেরোতেই তুষার গম্ভীরমুখে বললেন, ‘খান, অবিনাশের কাজকর্ম মনিটরিং করার সময় এসেছে। আমার কাছে ওর ব্যাপারে বেশ কয়েকটা রিপোর্ট আছে। তার ইনভেস্টিগেশন শুরু হবে। আমার মনে হয় ইস্টার্ন ইন্ডিয়াতে তোমায় অনেক বেশি ভিজিল্যান্ট হতে হবে।’

খান বললেন, ‘ঠিক আছে স্যার। আমি দেখে নিচ্ছি।’

তুষার চিন্তিত মুখে বসে রইলেন।

.

৬২

সবসময় ভয় নিয়ে বেঁচে থাকতে কেমন লাগে? তা সে জানে। দিব্যেন্দু যখন অফিস থেকে ফিরত। যেদিন খুব ভয় পেত, দেখা যেত সেদিন কিছুই করল না। যেদিন শুরুটা হালকাভাবে হল, সেদিনই দেখা গেল হঠাৎ করে গায়ে হাত তুলতে শুরু করে দিত।

জরিনার সঙ্গে গল্প করছিল সে। রাত দশটা বেজেছে। ভাবছিল আর হয়তো কেউ আসবে না, ভাবতে না ভাবতেই কলিং বেল বেজে উঠল। জরিনা বলল, ‘সাহেব আসছে মনে হয়।’

রুমা বলল, ‘দেখ।’

জরিনা উঠে দরজা খুলল। ঠিকই ধরেছে সে। সাদিক ঢুকল। রুমাকে দেখে বলল, ‘কেমন লাগে তোমার এখানে সাকিনা কুমারী?’

রুমা বলল, ‘আসেন।’

সাদিক দরজা বন্ধ করল।

খাটের উপর উঠে বসে অভ্যস্ত হাতে তাকে জড়িয়ে ধরল। যেন কতদিনের চেনা। রুমার শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘তুমি বড়ই সুন্দর। বেশ্যা না হইলে তোমারে বাসায় নিয়া তুলতাম।’

রুমা সাদিকের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনি আমার কাছে আসেন, এটাই আমার বাসা।’

সাদিক বলল, ‘বাঃ, তুমি ভারি সুন্দর কথা কও। কে শিখাইসে তোমারে কথা কওন?’

রুমা বলল, ‘শিখাইবার লাগে নাই। আমি এমনিই কই।’

সাদিক আলো নিভিয়ে দিল। প্রথম দিন তাড়া ছিল। এদিন ধীরে ধীরে রুমাকে বিবস্ত্র করল। রুমাও সঙ্গত করল। তাকে সাদিককে খুশি রাখতে হবে। তার জন্য যা করার, সব করতে হবে।

সাদিক দিব্যেন্দুর মতো নয়। সে শৌখিন মানুষ। রুমার ভালো লাগছিল। নিজেই মরমে মরে যাচ্ছিল সেই জন্য। এই ক্রিমিনালটাকে তার ভালো লাগছে শুধু শরীরের জন্য? তাহলে কি শরীরই সব?

স্খলনের পর রুমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল সাদিক। আবেগপূর্ণ গলায় বলল, ‘তুমি ভালো। খুবই ভালো সাকিনা কুমারী। তোমার জন্য আমি গয়না আনব।’

রুমা আগ্রহী ভাব আনল গলায়, ‘কোন গয়না আনবেন?’

সাদিক বলল, ‘তোমারে এখন কমু না। নিয়া আসুম।’

রুমা বলল, ‘আনবেন।’

সাদিক বলল, ‘আমার এক মেহমান আসব। আমি ভাবসিলাম তোমারে নিয়া যাব তার কাছে। কিন্তু আমার তোমারে ছাড়তে ইচ্ছা করে না। মেহমানের জন্য আমি মাইয়া ভাড়া কইরা আনুম। তুমি আমার রানি হবা।’

রুমার হার্টবিট মিস হল। তবু সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল, ‘মেহমান? কোন মেহমান?’

সাদিক জোরে হাসল, ‘সবে তো আইলা। কত মেহমান আসব এখানে। দেইখা শেষ করতে পারবা না।’

রুমা গলায় ন্যাকামি আনল, ‘এখন আমি নূতন আইসি, তাই আমারে নিয়া আফনের এত আনন্দ। আমি পুরানা হইলেই আফনি আমারে সবাইরে বিলায়ে দিবেন।’

সাদিক রুমার গাল ধরে নাড়ল, ‘না না। তুমি দেখবা।’

সাদিকের ফোন বেজে উঠল। সাদিক সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। ফোন ধরে বলল, ‘বলো…জি, জি…আইতাসি, বাজারে আইসিলাম…আসি।’

ফোন রেখে বলল, ‘বাসার ডাক আইসে।’

রুমা বলল, ‘ভাবি?’

সাদিক হেসে উঠল, ‘ভাবি কও কেন? আমি কি তোমার ভাই হই?’

রুমা বলল, ‘তাহলে কী কমু?’

সাদিক বলল, ‘ভাইবা কমু।’ আলো জ্বালল সে। ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে রুমার হাতের দিকে চোখ পড়তে দাঁড়িয়ে গেল। কালশিটে দাগ আছে হাতে। সিগারেট খেতে গিয়ে দিব্যেন্দু ছ্যাকা দিয়েছিল।

বলল, ‘কোন শুয়ারের বাচ্চার কাম এইডা?’

রুমা সাদিকের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘মইরা গেছে সেইডা।’

সাদিক বলল, ‘তোমারটা?’

রুমা ঘাড় নাড়ল।

সাদিক বলল, ‘তোমারে যে জ্বালাইবে, তুমি শুধু আমারে কইবা। তারপর আমি বুঝুম। বুঝলা?’

রুমা খিলখিল করে হাসল। এই হাসিটা শমিতা শিখিয়ে বলেছিল, এটা নাকি খানকি হাসি। সে খানকি হয়েছে। এরকম হাসি হাসতে হয়। কী অদ্ভুত একটা কথা। কোনও মানে হয়? ভেবেছিল কোনদিনও এই হাসিটা হাসবে না। সাদিকের কথা শুনে সে হাসিটাই হাসল। তার জন্য নাকি একজন পুরুষ লড়বে। তার জন্য? কী অদ্ভুত!

.

৬৩

‘মাথুর, ঘুমিও না। নামতে হবে।’

অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর কলকাতায় প্লেন ল্যান্ড করবে। মাথুর ঘুম ভেঙে সোজা হয়ে বসলেন।

খান বললেন, ‘কী স্বপ্ন দেখছিলে?’

মাথুর ফিক ফিক করে হেসে বললেন, ‘অদ্ভুত একটা স্বপ্ন। বললে বিশ্বাস করবে না তুমি।’

খান বললেন, ‘সেটা কী বলে ফেলো। তার জন্য সাসপেন্স ক্রিয়েট করার কিছু নেই।’

মাথুর বললেন, ‘আরাবিয়ান নাইটস পড়েছ?’

খান বললেন, ‘স্যার তো এখন ওটাই পড়ছেন। তুমি ওই বইটার স্বপ্ন দেখলে?’

মাথুর বললেন, ‘ইয়েস। ওই বইটার স্বপ্ন দেখলাম। আরাবিয়ান নাইটসে রানিদের দুই বোনের নাম কী ছিল?’

খান মনে করার চেষ্টা করলেন। করতে পারলেন না। বললেন, ‘ভুলে গেছি।’

মাথুর বললেন, ‘শাহারজাদি, আর দিনারজাদি। শাহারজাদি রাজা শাহরিয়রকে বিয়ে করবেন। রাজা হিংস্র। দেশের সব মেয়েকে বিয়ে করে খুন করে ফেলছে। বাকি মেয়েদের বাঁচাতে শাহারজাদি রাজাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।’

খান বললেন, ‘রাইট। তা তুমি কী স্বপ্ন দেখলে? তুমিই কি সেই রাজা হয়ে গেছ নাকি? নাকি তুমি রানি হয়ে গেছো?’

মাথুর বললেন, ‘আমি দেখলাম এরা সব দিল্লিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাজা হুমায়ুন টুম্বে বসে রানির কাছে গল্প শুনছে। জাস্ট ইমাজিন!’

খান হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমি এটা স্বপ্ন দেখলে? মানে ভালো কোনও স্বপ্ন দেখতে পারলে না?’

মাথুর বললেন, ‘ভালো স্বপ্ন মানে কলকাতার বিরিয়ানি? সেটা তো গিয়ে নিজের হাতেই চাখব। ওটা নিয়ে ভেবো না।’

প্লেন অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খান সোজা হয়ে বসলেন, ‘ঠিক আছে খেও। অবিনাশকে আগে খুঁজি।’

মাথুর বিরক্ত মুখে বললেন, ‘ওই এক পাবলিক। তোমাদের সব পেয়ারের লোক। ওকে আমার কোনওকালেই পোষায় না।’

খান বললেন, ‘পেয়ারের লোক? আমার তো না। তাহলে তুমি স্যারের কথা বলছ।’

মাথুর বললেন, ‘স্যার ওকে পছন্দ করেন বলে মনে হয় না। তবে…’

মাথুর আর কিছু বললেন না।

খান বললেন, ‘তবেটা কী?’

মাথুর বললেন, ‘পরে বলছি। পৌঁছই।’

খান বললেন, ‘ওকে।’

ল্যান্ডিং, লাগেজ কালেকশন সব মিলিয়ে আধ ঘণ্টা লাগল। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে দুজনে ক্যাব নিলেন। ড্রাইভারকে হোটেলের ঠিকানা বলে জানলার বাইরে তাকালেন খান, ‘অ্যামেজিং সিটি। যতবার আসি, এত ভালো লাগে।’

মাথুর বললেন, ‘অ্যামেজিং বিরিয়ানি, সেটা বলো। আমার দিল্লির বিরিয়ানি কিন্তু কলকাতার মতো লাগে না যাই বলো। এখানকার বিরিয়ানিতে যে আলুর ব্যাপারটা, সেটা অদ্ভুত।’

খান বললেন, ‘তুমি কি ভ্লগার হওয়ার প্ল্যান করছ রিটায়ারমেন্টের পরে?’

মাথুর বললেন, ‘সেরকমই।’

খান ফোন বের করে অবিনাশের নাম্বারে ফোন করলেন। তারপর মাথা নাড়লেন, ‘নট রিচেবল। ওকে ফোনে পাওয়া যাবে না।’

মাথুর শিস দিচ্ছিলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে। ও কলকাতা চেনে তো আমরাও চিনি। চিন্তার কিছু নেই।’

খান চোখ বন্ধ করলেন, বললেন, ‘হোটেলে গিয়ে স্নান করতে হবে। স্নান করা হয়নি।’

মাথুর বললেন, ‘আগে খেয়ে নিলে হতো না?’

খান মাথা নাড়লেন, ‘মোটেই না। দয়া করে এই রিকোয়েস্টটা কোরো না। আগে চেক ইন করি।’

মাথুর ঘড়ি দেখলেন, ‘ঠিক আছে। খিদে যত বাড়বে, তত ভালো।’

খান ফোনটা আবার হাতে নিয়ে অবিনাশকে মেসেজ করলেন, ‘অনলাইন হলে ফোন করবেন। আর্জেন্ট।’

মাথুর সেটা দেখে আবার শিস দিলেন, ‘লাভ হবে না। সম্ভবত এই সিমটা পাল্টেছে। ভাই, গাড়ি দাঁড় করিয়ে দাও। এখানে নেমে যাব।’

খান বললেন, ‘লাগেজ?’

মাথুর ড্রাইভারকে বললেন, ‘হোটেলের ঠিকানা দিয়েছি। লাগেজ হোটেলে নিয়ে গিয়ে জমা করে দিন।’

ড্রাইভার গাইগুই করছিল। মাথুর একটা কার্ড এগিয়ে দিলেন, ‘দিয়ে আসুন। কাজ আছে।’

ড্রাইভার আর কিছু বলল না। গাড়ি চলে গেল। খান বিরক্ত গলায় বললেন, ‘তোমার জন্য আমি স্নান করতে পারলাম না। কী করবে এখন?’

মাথুর নাম্বার ডায়াল করলেন। ও প্রান্ত ফোন ধরতে বললেন, ‘বিলাল? লোকেশন পাঠাচ্ছি। বাইকটা নিয়ে এসো। একটা ইঁদুর ধরতে যেতে হবে। দুজন দুটো বাইক নিয়ে আসবে। ফাইন।’

ফোন কেটে দিলেন মাথুর। খান বললেন, ‘সিরিয়াসলি? বাইক লাগবে? বলিউডের হিরো তুমি?’

মাথুর বললেন, ‘তুমিই তো বলো ইঁদুর যেখানে লুকোয় সেখানে চার চাকা যায় না। আবার আমাকে হিরোগিরির কথা বলছ?’

খান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। ফোন বেজে উঠল। দেখলেন, অবিনাশ ফোন করছে…।

.

৬৪

মানুষের একটা জায়গায় থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে যায়। তারও হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে বাকি জীবনটা এখানে কাটলেও খারাপ হতো না। কী আর হবে? বাজে কোনও রোগে মরে যাবে? তাই হবে! এর বেশি তো আর কিছু হবে না। তার যা জীবন, তাতে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। একটা সুতোর উপর দিয়ে হাঁটার মতো বেঁচে থাকাটা।

শুয়ে ছিল রুমা। সকাল হয়েছে। জরিনা একগাদা পরোটা নিয়ে এল, ‘খাবা না?’

রুমা বলল, ‘এতগুলো পরোটা কে খাবে?’

জরিনা বলল, ‘খাও না। সাহেব টেকা দিয়া গেছে।’

রুমা পরোটা ভেঙে খেল। বাইরে থেকে একটা কোকিলের ডাক শোনা গেল। জরিনা হেসে ফেলল, ‘দেখস? এই সময় কোকিল ডাকে নাকি। কুনো শয়তান পুলার কাণ্ড।’

রুমাও হাসল। কয়েক সেকেন্ড পরোটাটা একটু একটু করে খেয়ে বলল, ‘আমি একটু বাজার যামু। কাজ আছে।’

জরিনা বলল, ‘লোক আছে তো। তোমার যাওনের কী দরকার?’

রুমা বলল, ‘ভালো লাগে বল, সারাদিন এক ঘরে! বোরখা পরে যাচ্ছি। তুই কাউকে বলিস না।’

জরিনা করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘সাহেব জানলে আমারে মাইরা ফেলাইবানে।’

রুমা জরিনার হাত ধরল, ‘তুই দরজায় খেয়াল রাখ। আমি তাড়াতাড়ি আসছি।’

জরিনা বলল, ‘যাও। ঘুইরা আসো।’

রুমা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। ঘরের ছেলেগুলো ছিল না। জরিনা বাইরেটা দেখে এসে বলল, ‘যাও, ফাঁকা আছে। দেরি করবা না কিন্তু। আমি দেখতাসি।’

রুমা ধীরেসুস্থে বেরোল। গলির বাইরে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট কানাগলিতে পৌঁছল। বাজারের মুখে একজন অন্ধ ভিখারি দাঁড়িয়ে আছে। রীতিমতো চিৎকার করে ভিক্ষা করছে সে। রুমা তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মেহমান এলে আমাকে নিয়ে যাবে না। ভাড়াটে নেবে বলছে।’

‘সে কী? কী হবে?’ চিৎকার করতে করতেই হঠাৎ চুপ করে ভিখারি ফিসফিস করে কথাগুলো বলল।

রুমা বলল, ‘কী হবে জানি না। আমি খবরটা দেওয়ার, দিয়ে দিলাম। এভাবে বেরনো রিস্ক আছে। সাদিক জানতে পারলে মেরে দেবে।’

‘ঠিক আছে। যাও।’

ভিখারি আবার চিৎকার করতে শুরু করল। রুমা চারদিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে গেল। জরিনা চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। রুমাকে ঢুকতে দেখে তার ধড়ে প্রাণ এল, ‘শিগগিরি ঢুইকা যাও।’

রুমা ঘরে ঢুকে বোরখা খুলে বসল।

জরিনা বলল, ‘ভালো লাগে না, কও?’

রুমা বলল, ‘হ্যাঁ। ভালো লাগে।’

জরিনা বলল, ‘আমি একদিন পালাইয়া যাব। আমারে যাইতেই হইব।’

রুমা জরিনার দিকে তাকাল। ঠিকই তো। মেয়েটা এই নরকে পচে মরবে কেন? সে ঘাড় নাড়ল, ‘যাস। তোর যেদিন ইচ্ছে হবে পালিয়ে যাস।’

জরিনা বলল, ‘সাহেবরে চেনো তুমি? খুইজা পাইলে কী করবে জানো?’

রুমা বলল, ‘তোরে কিছু করবে না মনে হয়।’

জরিনা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘মদ খাইয়া আইসা মারে আমারে। তুমি কও কিছু করবে না। তুমি সাহেবরে চেনো নাই। তুমি নতুন না এখন? তাই কিছু কয় না। পুরান হইলে তোমারেও ছাড়বে না।’

রুমা শিউরে উঠল। তাকে ছাড়বে না? সাদিকের ভেতরেও কি তবে দিব্যেন্দু জেগে উঠবে? প্রতিটা পুরুষের মধ্যেই কি দিব্যেন্দু আছে? সব কিছু হাতের বাইরে চলে গেলেই সেই পুরুষ জেগে ওঠে বুঝি? সে বলল, ‘ঠিক আছে। ভাবিস না। যখন হবে, তখন দেখা যাবে।’

জরিনা বলল, ‘আমার খুব ঘোরার শখ জানো। আমার বন্ধু আছে সুপ্তা। ও ইন্ডিয়া গেছিল। কলকাতায়। খুব মজা করসিল। আমি কলকাতা যামু।’

রুমা বলল, ‘যাবি। আমরা দুজনেই যামু।’

জরিনা রুমাকে জড়িয়ে ধরল হঠাৎ করে, ‘তুমি খুব ভালো। আমার আম্মুর মতো।’

রুমা কেঁদে ফেলল। এ কান্নাটা অনেকদিন ধরে জমে ছিল। জরিনার এই জড়িয়ে ধরাটুকুর জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল…।