দিন প্রতিদিন – ২৫

২৫

‘রুমা নেই। অফিস যেতে হবে। অফিস না গিয়ে কি ঘরে বসে বসে ছিঁড়ব নাকি?’

বিড়বিড় করতে লাগল দিব্যেন্দু। ঘুম থেকে উঠলে রুমা চা করে দেয়। রুমার বাবা-মাকে বের করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। অন্য কেউ হলে ঘুম আসত না। দিব্যেন্দু অন্য ধাতুতে গড়া। তার কিছু যায় আসে না।

ঘুম ভাঙার পর চিৎকার করল, ‘রুমা।’

কেউ সাড়া দিল না। উঠে বিড়বিড় করতে শুরু করল।

বাইরে বেরিয়ে দেখল পাড়ার লোকজন দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে। সে বিশেষ পাত্তা দিল না। রুমার বাবা-মা নিশ্চয়ই কাউকে নালিশ করেনি। ফার্স্ট ট্রেনে ফিরে গেছে। ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজল সে। বাথরুমে গিয়ে তৈরি হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আলমারি খুলে জামা-প্যান্ট বের করল।

রুমা গুছিয়ে রাখে বলে সব জামাকাপড় মেঝেতে ফেলল দিব্যেন্দু। ফিরলে রুমাকে সব গোছাতে হবে। রান্নাঘরে গিয়ে বাসন কোসন মেঝেতে ফেলে দিল। বসার ঘরে রুমা সোফার উপর কাপড় রেখেছিল। সব সরিয়ে দিয়ে ঘরের দিকে হিংস্রপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল, ‘আয় এবার। সব তোকে দিয়ে পরিষ্কার করাব। এলেই বুঝবি কেমন লাগে। বাঁচিয়ে রাখব না তোকে, কুপিয়ে মারব। আয় একবার।’

তৈরি হতে সময় লাগল। মোজা খুঁজে পাচ্ছিল না। আগের দিনের ফেলে রাখা মোজা পরেই বেরোতে হল। অন্যান্য দিন আটটা পঁচিশে বেরোয়। সাইকেলে উঠে ঝড়ের গতিতে স্টেশনের দিকে যেতে থাকে। এদিন একইভাবে বেরিয়ে খানিকটা যাওয়ার পর তার মনে পড়ল তালা দিতে হবে। বাড়িতে কেউ নেই। আবার ফিরে তালা দিয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেখল রুমার বাবা-মা দাঁড়িয়ে আছে। ওহ্‌। এরা তাহলে ফার্স্ট ট্রেনে ফিরে যায়নি। কোথায় গেছিল তাহলে? দিব্যেন্দু বেশি ভাবতে গেল না। তাকে দেখে দুজনেই সিঁটিয়ে গেল। দিব্যেন্দু জোর পায়ে ওদের কাছে গিয়ে বলল, ‘কোথাকার কোন বেশ্যাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলি। নিশ্চয়ই বাবু পেয়ে গেছে একটা। ফ্যামিলিতে সবাই কী এরকমই?’

রুমার মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘কী আর বলবো বাবা তোমায়, তুমি সোনার টুকরো ছেলে। আমার মেয়েটাই খারাপ। কোথায় কী করে এসেছে আমি জানি না। যদি কোনও খোঁজ পাই, তোমায় জানাবো।’

ট্রেন ঢুকছিল। দিব্যেন্দু দুজনকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ট্রেনের দিকে দৌড়ল। রুমার বাবা-মা বিহ্বল চোখে দেখল দিব্যেন্দু ট্রেনে উঠে পড়েছে।

তাপসও একই সঙ্গে উঠল। বসার পরে বলল, ‘শ্বশুর-শাশুড়ি না তোর? স্টেশনে ছাড়তে এসেছে নাকি। মাইরি বলছি, বাঙালদের জামাই আদরের তুলনা নেই।’

দিব্যেন্দু শান্ত গলায় বলল, ‘আমার বউ পালিয়েছে।’

তাপস আর কামরুল তার দিকে হাঁ করে তাকাল।

দিব্যেন্দু হড়বড় করে বলে চলল, ‘প্রেম ছিল কোথাও একটা। প্রেম করত মনে হয়। সকালে পালিয়ে গেছে। শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছিল। ওদের রাতে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে কোথায় গেছিল জানি না। স্টেশনে এসে দেখি, এখানেই বসে আছে।’

কামরুল বলল, ‘ধুস, ইয়ার্কি মারছ।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘তাস দাও। ইয়ার্কি মারার কিছু নেই এখানে। বউ পালিয়ে গেছে বলে ইয়ার্কি মারব নাকি? এটা কি ঘটিদের মাংস রান্না? অকারণে চিনি দিয়ে দেব?’

তাপস রাগল না। বলল, ‘এ ভাই, তুই অফিস যাচ্ছিস? থানায় কমপ্লেইন করিসনি?’

ট্রেন চলছে বনবাদাড় পেরিয়ে। একটা ছোট খাল পেরোল। কামরায় প্রবল ভিড়ের মধ্যে এক আমলকি বিক্রেতা উঠেছে। বিভিন্ন গলার স্বরে আমলকির গুণাগুণ বোঝাচ্ছে।

দিব্যেন্দু বলল, ‘বউ পালিয়েছে, তাতে কমপ্লেইন করার কী হল? তোমার বউ পালায়নি কখনও?’

তাপস বলল, ‘ওরে, এভাবে পালালে মেয়েরা আর ফেরে না।’

দিব্যেন্দু রাগী চোখে তাপসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক ফিরবে। চিন্তার কিছু নেই।’

তাপস বলল, ‘ছি ছি ছি…কী লজ্জার। তুই বুঝতে পারছিস কী লজ্জার?’

দিব্যেন্দু তাপসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘লজ্জার না? লজ্জার? দেখাচ্ছি।’

তাসগুলো শাফল করছিল কামরুল। তার হাত থেকে সব তাস নিয়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিল দিব্যেন্দু। উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে লাগল, ‘লজ্জার? শালা লজ্জার? লজ্জার কী আছে?’

লোকজনকে ঠেলতে শুরু করে একটু একটু করে এগোতে শুরু করল সে। তাপস ডাকল, ‘এই দিব্যেন্দু, কী করছিস? কোথায় যাচ্ছিস?’

চলন্ত ট্রেনে দিব্যেন্দু সবাইকে ঠেলে ঠুলে দরজার কাছে গিয়ে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল। তাপস আর কামরুল শক্ত করে ধরে ফেলল। দিব্যেন্দু একই কথা বিড় বিড় করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেল, ‘লজ্জার? লজ্জার কী আছে? লজ্জার কিছু নেই। বউ পালিয়েছে তো কী হয়েছে? পালাতেই পারে। লজ্জার কিছু নেই। কিছু নেই লজ্জার…’

২৬

কেমন শান্ত একটা বিছানা। এসি চলছে একবারে কম তাপমাত্রায়।

ঠান্ডা হয়ে আছে চারদিক।

কতদিন পরে এত ভালো ঘুম হল। কত যুগ সে ঘুমোয়নি। রাতে এমনিতেও ঘুম হতো না। কোনও রাতে তাকে দিব্যেন্দুর পাঙ্খাপুলার হতে হয়েছে। কোনও রাতে একটু ঘুমিয়েছে হয়তো, পিঠে লাথি খেয়ে উঠে পড়তে হয়েছে।

তীব্র ব্যথা থাকত সারা শরীরে।

তার পরিবর্তে এত সুন্দর ঘুম, ভাবাই যায় না। বেশ কয়েকবার উঠতে গিয়েও ওঠেনি সে। অনেকক্ষণ পরে যখন উঠে বসল, কাচের কাছে গিয়ে দেখল, জানলার বাইরে একটা সুন্দর শহর দেখা যাচ্ছে। কোন শহর এটা? কলকাতা?

রুমের ফোন বাজছে। রুমা ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’

‘ঘুম হল? নাকি আরেকটু ঘুমোবেন?’

রুমা হাসল, ‘জানি না। অনেক দিন পরে ভালো ঘুমোলাম।’

‘খুব ভালো। খিদে পেয়েছে?’

খিদের কথায় টের পেল, সে বুঝতে পারেনি এতক্ষণ। পেটটা সত্যিই খালি লাগছে। বলল, ‘হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন। খিদে পেয়েছে।’

‘আপনি প্রায় চোদ্দো ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। খিদে তো পাবেই। দরজা খুলে বেরিয়ে আসুন। করিডোরটা যেখানে শেষ হবে, সেখানেই খাবার ব্যবস্থা আছে।’

ফোন রেখে রুমা ঘর থেকে বেরোল। একটা লম্বা করিডোর। হাঁটতে শুরু করল সে। লোকটা ঠিকই বলেছে। একটা ঘরে চারটে টেবিল পাতা। একটা টেবিলে একজন মেয়ে বসে আছে। রুমা ঘরে ঢুকতে মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা কোন জায়গা?’

রুমা বলল, ‘জানি না তো। আপনি জানেন?’

মেয়েটা মাথা নাড়ল, ‘না। জানি না। ঘুম ভাঙার পর আমাকে এখানে খেতে আসতে বলা হল।’

মেয়েটা হাত তুলে ব্যুফে টেবল দেখাল। বিভিন্ন রকম খাবার সাজানো আছে। ভাত, মাংস, মাছ। রুমা সেদিকে একবার তাকিয়ে বলল, ‘আপনি খাবেন না?’

মেয়েটা বিমর্ষকণ্ঠে বলল, ‘আমার বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে। খুব ঝগড়া করে বেরিয়েছি। তবু…’

রুমা বলল, ‘কী নাম আপনার?’

মেয়েটা বলল, ‘এণাক্ষী।’

রুমা বলল, ‘খেয়ে নিন। আপনি বলুন, কী কী আনবো, নিয়ে আসছি।’

এণাক্ষী বিহ্বল চোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।’

রুমা একটা প্লেটে ভাত, ডাল, একটু পনির নিয়ে এসে এণাক্ষীর সামনে রেখে বলল, ‘খেয়ে নিন। খালি পেটে থাকা ঠিক না। আমারও খুব খিদে পেয়েছে। বাড়িতে থাকলে এত খিদে পেত না। কিন্তু এখানে খুব খিদে পেয়েছে। আমার মনে হচ্ছে আমি কোথাও বেড়াতে এসেছি। খুব মজা লাগছে।’

এণাক্ষী অবাক চোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার ভয় লাগছে না? এরা তো আমাদের আইসিসের কাছে বেচে দিতে পারে? আরও ভয়ংকর কত কিছু করতে পারে। তাও ভয় লাগছে না?’

রুমা ভাত ডাল নিয়ে এসে এণাক্ষীর সামনে বসে খেতে শুরু করল, ‘না। লাগছে না। আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখান থেকে বেরোলে সব নরকই ভালো লাগে।’

এণাক্ষী মাথা নিচু করল, ‘আমার বর হঠাৎ পাল্টে গেল। আমাকে যা ইচ্ছে বলতে শুরু করল। কিন্তু কোনওদিন আমার গায়ে হাত তোলেনি। কত কিছু কিনে দিত!’

ডালটা ভারি সুন্দর হয়েছে। রুমা আরও ভাত আর ডাল নিয়ে এসে বসল, ‘তাহলে আপনি ওদের কথায় রাজি হয়ে চলে এলেন কেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘আমি রাজি হইনি কিছুতেই। কোন এক পার্টিতে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি এদের ছাড়ব না। আমি বাড়ি যাব। তখন কত চিৎকার করলাম, কিছুতেই শুনল না। শুধু বলে গেল খেয়ে নিন। খালি পেটে থাকবেন না। আশ্চর্য!’

রুমা খেতে খেতে বলল, ‘আমার বর আমাকে গল্প করত। ইসলামিক স্টেটে মেয়েরা কী ভয়াবহ অবস্থায় থাকে। তার তুলনায় নাকি আমি ভালো আছি। আমার এখন কোনও ভয়ই লাগছে না। বিশ্বাস করুন।’

এণাক্ষী বলল, ‘আপনার বরের জন্য মন খারাপ লাগছে না?’

রুমা হাসি মুখে বলল, ‘একেবারে না।’

এণাক্ষী মনমরা হয়ে বলল, ‘আমার লাগছে। লোকটা কেমন পাল্টে গেল।’

রুমা বলল, ‘খেয়ে নিন না। তারপর মন খারাপ করবেন না হয়।’

এণাক্ষী খেল না। চুপ করে বসে রইল।

২৭

একা একা দিন কাটানো বড়ই বিরক্তিকর। বাপিদার কড়া নির্দেশ আছে, বাড়ির ভেতরে কাউকে ঢোকানো যাবে না। এদিকে পূর্ণর দিন কাটতে চায় না। টিভিতে কী আর দেখবে? চ্যানেল বেশিবার পাল্টাতে গেলেও ভয় লাগে, পাছে রিমোট খারাপ হয়ে যায়। তখন আবার বাপিদা বকা ঝকা করবে।

সিসিটিভির ছেলেগুলো এখনও আসেনি। বাপিদা বলেছে এবার অন্য জায়গা থেকে ছেলেপিলে আসবে।

ছাদে বসে কিছুক্ষণ পাড়ার লোকজনকে দেখল পূর্ণ। এখন গরম কাল। শীতের মতো কেউ আর নরম রোদে বসে থাকে না। সবাই গরমে ফ্যান বা এসি চালিয়ে ঘরে বসে থাকে। পূর্ণর গরম লাগে না। এসিও লাগে না। গরিবের এসি না চালানোই ভালো। যখন কাজ থাকবে না, তখন বড় কষ্ট হবে। বদ অভ্যাসগুলো মানুষকে শেষ করে দেয়।

ওই নাম্বারটা বাপিদাকে দেওয়ার পর থেকে আর ফোন বাজেনি। পূর্ণর ইচ্ছে হল একবার ওই মহিলার সঙ্গে কথা বলবে। বাপিদা নাম্বার নিয়ে কী করল, জানতে হবে। ফোন করল সে।

ফোন সুইচড অফ বলছে। ধুস।

পূর্ণর হঠাৎ ঠাকুরঘরের কথা মনে পড়ল। প্রথমে জিভ কাটল সে। ছি-ছি। লোকের বাড়িতে আবার উঁকি ঝুঁকি মারবে?

পরক্ষণে মনে হল, কী আছে? একবার দেখে আসাই যায়। দেখে আসার মধ্যে তো কোনও পাপ নেই। বাপিদার বাড়ির সব কিছুই সে দেখেছে। ঠাকুরঘরের আলমারিটা দেখলে কী হয়েছে?

পূর্ণ কিছুক্ষণ ছাদে পায়চারি করে ঠাকুরঘরে গেল। ড্রয়ার থেকে লুকনো চাবিটা বের করে আলমারি খুলল। বাপরে! এগুলো কী? কতগুলো ছোট ছোট বাক্স। কোনদিন দেখেওনি সে। আজব! বের করতে গিয়ে একবারে নীচের খোপে চোখ গেল। ওরে বাবা, কতগুলো টাকার বান্ডিল। এত টাকা রেখে গেছে? টাকাগুলো হাতে নিয়ে দেখল। ও হরি! এ তো দু’হাজার টাকার নোট। এগুলো তো সব বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। সেদিনই পালের দোকানে দাঁড়িয়ে খবর দেখছিল। বাপিদা জানে না? এ তো বলাও যাবে না। বললে জেনে যাবে সে আলমারি খুলেছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে পূর্ণ একটা বান্ডিল বের করে রেখে দিল। এত সমুদ্র! এর থেকে একটা বান্ডিল না পাওয়া গেলে কী আর হবে? সুন্দর করে আলমারিটা বন্ধ করে চাবিটা আগের জায়গায় রেখে দিল সে।

দু’হাজার টাকার নোট! বাপরে! কতগুলো আছে এখানে? গুনতে শুরু করল পূর্ণ। একশোটা। একশোটা দু’হাজার টাকার নোট মানে? ওরে বাবা রে! দু’লাখ টাকা? এত টাকা কোনদিন সে একসঙ্গে দেখেনি। অথচ কেমন অবলীলায় বাপিদা রেখে দিয়েছে। এরাই হল বড়লোক। আর তার মতো লোকেরা সব ছোটলোক। এরা মালিকপক্ষ হবে না তো কে হবে?

ফোন বাজছিল। পূর্ণ দেখল, বাপিদা। সঙ্গে সঙ্গে ধরল, বাপিদা বিরক্ত গলায় বলল, ‘তুমি আবার ওই নাম্বারে ফোন করছ কেন?’

পূর্ণ বলল, ‘কোন নাম্বারে?’

বাপিদা বলল, ‘ওই যে মেয়ের নাম্বারটা আমায় দিয়েছিলে?’

পূর্ণ অবাক গলায় বলল, ‘সে কী? তুমি সেটা কী করে জানলে?’

বাপিদা বলল, ‘ও জানা যায়। জার্মানিতে অনেকরকম ব্যবস্থা আছে। আমি জেনে যেতে পারি। তুমি অকারণ ওই নাম্বারটায় ফোন করছ।’

পূর্ণ ভয় পেল। বাপিদা বেশ রেগে গেছে। সে বলল, ‘ঠিক আছে। আমি ফোন করব না আর। হাত পড়ে গেছিল।’

বাপিদা বলল, ‘সে হাত পড়েছে না পা পড়েছে, আমার জানার দরকার নেই। তুমি আর ফোন করবে না।’

পূর্ণ বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা। আমি আর ফোন করব না।’

বাপিদা বলল, ‘তুমি কোন ঘরে এখন?’

পূর্ণ বলল, ‘ছাদে। আচ্ছা…’

টাকার কথাটা বলতে গিয়ে চেপে গেল পূর্ণ।

২৮

এণাক্ষী খুব কম খেল।

রুমা তার উল্টোটা। কতদিন পরে দিব্যেন্দুর চিন্তা না করে খেতে পারছে!

খাওয়া শেষ হবার পরে হলের কোণের বেসিনে মুখ ধুতে না ধুতেই শাড়ি পরিহিত এক মহিলা প্রবেশ করল।

এণাক্ষী সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, ‘আপনি আমাকে নিয়ে এসেছেন?’

মহিলাটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বললেন, ‘না। আমি আপনাকে নিয়ে আসিনি। আমি স্নিগ্ধা। আপনাদের মেন্টর বলতে পারেন।’

এণাক্ষী নাক মুখ কুঁচকে বলল, ‘মেন্টর? এখানে কি কোনও গেম চলছে নাকি?’

স্নিগ্ধা হাসল, ‘আপনারা দুজনেই খুব কঠিন একটা ফেজে ছিলেন। আপনাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে নিশ্চয়ই আপনারা বসে বসে খেতে চাইবেন না? আমাদের লক্ষ্য আপনাদের স্বনির্ভর করে তোলা। আপনারা রোজগার করতে পারবেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। সেজন্যই আমি এখানে এসেছি।’

রুমা স্নিগ্ধার কথা কিছুই বুঝছিল না। এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু বুঝতে পারছেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘না। কী করতে হবে আমাকে?’

স্নিগ্ধা হাসল, ‘বিভিন্ন রকম কাজ আছে। আমরা কয়েকটা পরীক্ষা করব, সাইকোমেট্রিক টেস্ট হবে। এগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নেবো, আপনাদের কোন কাজে লাগানো হবে।’

এণাক্ষী রেগে গেল, ‘আমি কারো কেনা গোলাম না। আমাকে অজ্ঞান করে, আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এখানে আনা হয়েছে। আমাকে আটকে রাখলে ফল ভালো হবে না।’

স্নিগ্ধা ট্যাব বের করে কয়েক সেকেন্ড সেটা নাড়াচাড়া করে বলল, ‘আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে কাজ করতে দিতে চান না। আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। খুব ভালো করে জানেন আপনার বাড়ি থেকে আপনার ফিরে যাওয়াটা মেনে নেবে না। তাহলে আপনি এই সময়ে কী করতেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘দ্যাটস নান অফ ইয়োর বিজনেস। আমাকে ফেরানোর ব্যবস্থা করুন।’

স্নিগ্ধা কয়েক সেকেন্ড এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে আপনি ট্রেনিং নিতে, আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী নন?’

এণাক্ষী মাথা নাড়ল, ‘না।’

স্নিগ্ধা বলল, ‘বেশ। আপনি আপনার ঘরে চলে যান। আপনাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

এণাক্ষী বলল, ‘আমার একটা ফোন লাগবে।’

স্নিগ্ধা বলল, ‘রুমে আপনার খাটের ওপরেই ফোন রাখা হয়েছে। আপনি ফোন করতে পারেন।’

এণাক্ষী ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

স্নিগ্ধা রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনিও কি ফিরতে চান?’

রুমা মাথা নাড়ল, ‘একেবারেই না। আমি ফিরে যেতে আসিনি। কী করতে হবে আমাকে?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘আপনার মধ্যে বেশ কয়েকটা ন্যাচারাল ট্যালেন্ট আছে। আপনি কী করতে পারেন, আপনি নিজেই জানেন না।’

রুমা অবাক হল, ‘কী করতে পারি?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘আপনি পুনর্জন্ম পেয়েছেন রুমা। কিন্তু আপনি কি আমরা যা বলবো, সেগুলো মেনে নিতে পারবেন?’

রুমা বলল, ‘আমি তো জানি না কী করে বাকি জীবনটা চলবে। যিনি ফোন করেছিলেন, তার ভরসাতেই বাড়ি ছেড়ে এসেছিলাম। কী করতে চান বলুন।’

স্নিগ্ধা রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার পায়ে এখনও ক্ষত আছে। আপনি এখনও ঠিক করে হাঁটতে পারছেন না। আপনাকে কয়েকটা ওষুধ দেওয়া হয়েছে। আপনার রুমে রাখা হয়েছে। আপনি প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধগুলো খেতে পারবেন?’

রুমা বলল, ‘হ্যাঁ।’

স্নিগ্ধা বলল, ‘আপনি চাইলে আপনাকে সময়মতো মনে করিয়ে দেওয়া হবে।’

রুমা মুগ্ধ হল। এত যত্ন? ভাবা যাচ্ছে না! সে বলল, ‘আমাকে একটু বলুন না আমাকে কী করতে হবে? খারাপ কোনও কাজ না তো?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘খারাপ কাজ বলতে কী বোঝেন?’

রুমা একটু না ভেবে বলল, ‘শরীর বিক্রির ব্যবসা। আমি এই ভয়টাই পাচ্ছি। আপনারা কি এরকম কিছু করাবেন?’

স্নিগ্ধা হাসল, ‘পৃথিবী এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে রুমা। শুধু মাত্র ওই আদিম ব্যবসাটা ছাড়াও অনেক কাজ আছে।’

রুমা বলল, ‘কীরকম?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘সব একদিনে শিখে নেবেন?’

রুমা বলল, ‘আমার টেনশনটা তো দূর করুন।’

স্নিগ্ধা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। এণাক্ষী এসে চিৎকার করে বলল, ‘ফোন যাচ্ছে না। কী ফোন দিয়েছেন?’

২৯

সাহেব ডেকে পাঠিয়েছে।

দিব্যেন্দু সাহেবের চেম্বারে গিয়ে নক করল।

‘কাম ইন।’

দিব্যেন্দু ঘরে ঢুকতে সাহেব বলল, ‘কী হয়েছে তোমার? শুনলাম ফ্যামিলি প্রবলেম?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘একটা প্রবলেম হয়েছে। আমার বউকে পাচ্ছি না। মনে হয় পালিয়ে গেছে।’

সাহেব চোখ কপালে তুলে বলল, ‘পাচ্ছ না? কী করে করলে? আমি তো রোজ দেখতে চাই ঘুম থেকে উঠে যে আমার বউ নেই। কিন্তু পারছি কই?’

দিব্যেন্দু বুঝল না সাহেব ইয়ার্কি মারছে।

সে বলল, ‘এমন কিছু কঠিন ব্যাপার না। মাঝে মাঝে মারবেন। ধরুন একদিন পায়ে হাতুড়ি মারলেন, একদিন গরম ইস্ত্রি হাতে লাগিয়ে দিলেন, মাঝে মাঝেই চড়-থাপ্পড় মারলেন…’

সাহেব হো-হো করে হেসে উঠে বলল, ‘উফ্‌, তুমি নিজের দুঃসময়েও এরকম মজার কথা বলতে পারো, আই মাস্ট অ্যাডমিট, ইউ আর এ গুড স্পোর্ট।’

দিব্যেন্দু অবাক হয়ে সাহেবের দিকে তাকাল।

সাহেব বলল, ‘তুমি একটা কাজ কর, আজকের দিনটা অফিস করতে হবে না। আমি তোমাকে ফুল পেইড ছুটি দিচ্ছি। ঘুরে আস কোনও জায়গা থেকে। নাকি বাইরে ঘুরতে যাবে? আমি ব্যবস্থা করে দেব?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না স্যার। তার কোনও দরকার নেই।’

সাহেব বলল, ‘আলবাত দরকার আছে। একজন ইয়ং ম্যান এত ভেঙে পড়লে কী করে হবে? যাও, যাও। তোমায় ছুটি দিলাম। ঘুরে এসো। যেদিন খুশি জয়েন কর। আমি কিছু বলব না।’

সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে দিব্যেন্দু নিজের টেবিলে এল। সুদেব এসে পিঠ চাপড়ে দিল, ‘এ ভাই। কী হয়েছে?’

দিব্যেন্দু ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘কিছু না। একটু বেরোতে হবে।’

সুদেব বলল, ‘ডাউন লাগছে তোকে। একটা জায়গায় যাবি?’

দিব্যেন্দু সুদেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই তো জানিস আমার বউ…’

সুদেব বলল, ‘বউ? ক’টা বউ চাস?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কোথায়?’

সুদেব বলল, ‘আমার একজন আছে। চলে যা। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। নাম্বার নে।’

দিব্যেন্দু নাম্বার নিয়ে বেরোল। অফিসের বাইরেই হলদে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকে। তার বলা ঠিকানা শুনে ট্যাক্সিওয়ালা ভিউয়িং মিরর দিয়ে তাকে দেখে নিল।

দিব্যেন্দু পাত্তা দিল না। মাথা কাজ করছে না। কেন যে সে সুইসাইড করতে গেছিল!

এ বছর বর্ষা নেই। ঘোর গ্রীষ্ম শহরটাকে রোদ যেন পুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে ঘাম। অফিসে এসির মধ্যে থাকলেই ভালো হতো।

ট্যাক্সিওয়ালা নামিয়ে দিয়ে গেল রাস্তার মোড়ে। দিব্যেন্দু সুদেবের দেওয়া নাম্বারে ফোন করল। ফোন রিং হয়ে গেল। কেউ ধরল না।

সুখেন চায়ের দোকানে বসে ছিল। দিব্যেন্দুকে ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় দেখে এগিয়ে এল, ‘কোথাও যাবেন নাকি স্যার?’

দিব্যেন্দু সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমায় অফিসের একজন বলল একজনের কাছে যেতে। সেখানে একটা কাজ ছিল আর কী।’

সুখেন চোখ ছোট করল, ‘কার কাছে বলুন তো? কী নাম?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘শমিতা।’

সুখেন অবাক চোখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারও ওখানে কাজ?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কেন? আর কার কার আছে ওখানে কাজ?’

সুখেন সামলে নিয়ে বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন। আপনি কি আমাকে টাকা দেবেন বাকিদের মতো?’

দিব্যেন্দু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘আমার টাকা বেশি নেই।’

সুখেন বলল, ‘ঠিক আছে। আসুন।’

সুখেন হাঁটতে শুরু করল। তার পেছন পেছন দিব্যেন্দু। কিছুটা যাবার পর একটা ঘরের দরজা দেখিয়ে বলল, ‘যান।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘থ্যাংকস।’

সুখেন বলল, ‘লোকে পাঁচশো দেয়। আপনি পঞ্চাশ টাকা তো দিন।’

দিব্যেন্দু পকেট হাতড়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করল। সুখেন সেটা নিয়ে বলল, ‘তাই দিন। চা খাওয়া যাবে একটা। কতরকম লোক আসছে আজকাল।’

সুখেন গেল না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।

দিব্যেন্দু কলিং বেল টিপল। দরজা খুলল।

শমিতা দিব্যেন্দুকে দেখে বলল, ‘কী চাই?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আপনি কি শমিতা? সুদেব নাম্বার দিয়েছে। ফোন করেছিলাম। ধরছিলেন না।’

শমিতা দরজা ছেড়ে দিল, ‘আসুন।’

দিব্যেন্দু ঢুকে গেল। শমিতা সুখেনকে দেখে মুখ ঝামটা দিল, ‘কীরে? দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’

সুখেন বলল, ‘আমি নিয়ে এলাম তো। কাট দিবি।’

শমিতা বলল, ‘ফোট। আমার লোক আছে। সেই পাঠিয়েছে।’

সুখেন হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

শমিতা দরজা বন্ধ করে দিল।

দিব্যেন্দু চারদিক দেখছে। কেমন তেল চিটচিটে জায়গাটা। তার ঘরের মতো না। শমিতা বলল, ‘কত টাকা?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘পাঁচশো। বউ পাওয়া যাবে?’

শমিতা খিল খিল করে হেসে বলল, ‘এখানে সবাই বউ। যা, ওই ঘরটায় যা।’

একটা ঘর দেখিয়ে দিল শমিতা।

দিব্যেন্দু চারদিক দেখতে দেখতে ঘরটায় ঢুকল।

রুমার বয়সি একটা মেয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজছে। তাকে দেখে বলল, ‘সকাল সকাল ইচ্ছে হল? হেবি রস তো তোর?’

দিব্যেন্দু পকেট থেকে হাতুড়িটা বের করে হাতে নিল।

এই মেয়েটা কি রুমার মতো হবে?