অপারেশন ট্রেইটর – ২৫

২৫

মন্ত্রণালয়ের ওয়েটিং রুমে বসে আছে নির্মল। আনোয়ার সাহেব ফোনে ব্যস্ত।

মামাবাড়ির লোকেদের নিয়ে চট্টগ্রাম গেছে দীপা। মেসেজ করে জানিয়েছে। এর পর কতদিন কথা বলবে না, কে জানে। বাড়ি গেলে বার বার তাকে জিগ্যেস করেছে যাবে নাকি। নির্মল ছুটি পায়নি বলায় খুব রাগারাগি করেছে। নির্মল হাল ছেড়ে দিয়েছে। কাঁহাতক আর বোঝানো যায়।

ফোনে সাদিকের বাড়ির এন্ট্রির সিসিটিভির লাইভ ফুটেজ দেখছিল নির্মল। কেউ নেই আপাতত। কাসেম একবার বেরিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে ঢুকে গেছে। বাইরে থেকে অন্য কারো গাড়ি আসেনি সারাদিনে। এত ঘটনাহীনতাই অবাক করছে। সব কিছু কেমন অদ্ভুতভাবে শান্ত। এত শান্ত কেন হবে? ভ্রু কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করছিল।

মন্ত্রীর পি এ এসে বলল, ‘ভেতরে যান।’

আনোয়ার ফোন রেখে নির্মলকে ব্যস্ত গলায় বললেন, ‘চলো, চলো।’

ফিরোজ হাসান ফোন করছিলেন। তারা ঘরে ঢুকতে ইশারায় বসতে বললেন। বেশ কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলার পর ফোন রাখলেন মন্ত্রী। আনোয়ার আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলুন।’

আনোয়ার বললেন, ‘সাদিক শেখের প্রচুর বিদেশী মুদ্রা বিনিময়ে যোগ পাওয়া গেছে। লেনদেনের নথির কোনও ঠিক নেই।’

ফিরোজ বিরক্ত গলায় বললেন, ‘মানে? তিনি একজন গণ্যমান্য ব্যবসায়ী। দেশের সম্পদ। বিদেশি খুনিদের থেকে আপনার তার দিকেই চোখ পড়ল? আমি শুনেছি সব বাইরের বুলেট পাওয়া গেছে। সাদিক কী করবে এখানে?’

নির্মল বলল, ‘সাদিককে ঠিক লাগছে না জনাব। ওর অনেক সমস্যা আছে।’

ফিরোজ নির্মলের দিকে তাকালেন, ‘বাংলাদেশের ইয়ং ম্যানেদের এই হল সমস্যা। কী নাম আপনার?’

নির্মল নাম বলল।

ফিরোজ বললেন, ‘ও, সংখ্যালঘু? এই তো। আপনারা হলেন আমাদের দেশের পোস্টার বয়। ওসব দেখলে হবে না। প্রায় সব ব্যবসায়ীরই এসব আছে। তার সঙ্গে অপরাধজগতের কিছু নাই মিয়াঁ। ভাববেন না। এত সবকিছু নিয়ে ভাবার কোনও দরকার নেই।’

নির্মল কুঁকড়ে গেল একটু। এই ধর্মের জায়গাটা এলে সে বরাবর কুঁকড়ে যায়। এবারেও সমস্যাটা হল। ‘ওকে জনাব।’

ফিরোজ আনোয়ারকে বললেন, ‘আপনি সাদিককে জ্বালাতন করবেন না। জ্বালাতন করার মতো ছেলে সাদিক না। ওকে ওর কাজ করতে দিন।’

আনোয়ার বললেন, ‘জি জনাব।’

মন্ত্রীর চেম্বার থেকে বেরিয়ে আনোয়ার বললেন, ‘মন খারাপ কোরো না নির্মল। মন্ত্রীরা আজ আছে, কাল নেই। তুমি থাকবে, তোমার কাজ থাকবে। যারা ধর্ম দিয়ে মানুষকে ভাগ করে, তাদের আসলে চোখ বন্ধ থাকে। তুমি তোমার কাজটা করে যাও।’

নির্মল বলল, ‘সাদিকের সারভেইলেইন্সটা করে যাব?’

আনোয়ার বললেন, ‘হ্যাঁ।’

গাড়ি অবধি যাওয়ার আগে মন্ত্রীর পি এ ছুটে এসে আনোয়ারকে বললেন, ‘স্যার আপনাকে ডাকছেন।’

আনোয়ার বললেন, ‘আবার কী হল? চলো দেখি।’

পি এ বলল, ‘শুধু আপনাকে স্যার।’

নির্মল গাড়িতে বসল। আনোয়ার কিছুক্ষণ পর গম্ভীরমুখে বেরিয়ে ড্রাইভারকে বললেন, ‘চলো।’

ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করলেন। আনোয়ার গলা খাকড়িয়ে বললেন, ‘নির্মল, মন্ত্রী বলছেন তোমাকে এই কেসটায় এখন রাখা যাবে না। সেনসিটিভ ব্যাপার। আপাতত ছ মাস তুমি পুলিশ ট্রেনিং ইন্সটিটিউটটা দেখো। আমি সময়মতো আবার তোমাকে ডেকে নেব।’

নির্মল বলল, ‘ওকে স্যার। আপনি যেমন বলবেন।’

সে মোটেইই অবাক হয়নি। এ ধরনের কিছু না হলেই বরং সে বেশি অবাক হতো। ভালোই হল। এবার দীপার মামার ফ্যামিলির সঙ্গে নিশ্চিন্তে দেশ ঘোরা যাবে।

.

ফ্ল্যাটে ফিরে নির্মল জুতো খুলে সোফায় চুপ করে বসে রইল।

এ যেন একপ্রকার গলা ধাক্কা দিয়ে দিল তাকে। দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইল সে।

মোবাইলটা সামনে পড়ে আছে। এ ক’দিন সাদিকের বাড়ির সামনের সিসিটিভিগুলো দেখা অভ্যাস হয়ে গেছিল। সে অভ্যাসবশতই ফোনটা হাতে নিয়ে অ্যাপ খুলল।

রাত বারোটা এখন। সাদিকের বাড়িতে একটা কালো সেডান ঢুকে গেল।

নির্মল মোখলেশকে ফোন করল। সাদিকের বাড়ির সামনের ফুটপাথে মোখলেশ শোয়। মোখলেশের ফোন বেজে গেল। পরপর তিনবার চেষ্টার পর ফোন ধরল, ‘জি স্যার।’

‘কোথায় ছিলে?’

‘ঘুমায় পড়সিলাম সার। বলেন।’

‘একটা বড় গাড়ি ঢুকল। দেখেছ?’

‘না সার। দেখা হয় নাই।’

বিরক্তিতে ফোন ছুঁড়ে মারল নির্মল।

.

২৬

‘আমরা এখন কী করব?’ রাণা প্রশ্ন করল।

অপরিসর অপরিচ্ছন্ন একটা ঘর। ঢাকার ভেতরেই। রাজশাহীর ট্রেনে খানিকটা গিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে এসেছে অমল। আপাতত সেখানে আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। অমল সিম বের করে রেখেছে ফোনের।

রাণার প্রশ্নের উত্তরে অমল চিন্তিতগলায় বলল, ‘সাদিক আমার অনেকদিনের টার্গেট। তিলে তিলে রুমানের কভার তৈরি করেছি আমি। সাদিকের কাছে আমাকে যেতেই হবে।’

রাণা বলল, ‘পুলিশ ফ্ল্যাটের হদিশ পেয়ে গেছে যে?’

অমল বলল, ‘সেটা অন্য কারণেও হতে পারে। হতে পারে ওরা সাদিকের দলের সবার বাড়িতেই যাচ্ছে। আমরা তো চলে এসেছি। কেন গেছিল তা এখনও ক্লিয়ার না। সাদিককে ফোন করতে হবে।’

রাণা বলল, ‘কখন করবেন?’

অমল বলল, ‘দেখছি কখন করা যায়। অবশ্য ফোন ট্যাপ হবে। অন্য পথ লাগবে।’

রাণা বলল, ‘অন্য পথ?’

অমল চোখ বন্ধ করল, ‘একটু ভাবি। ভাবতে দাও।’

রাণার বিরক্ত লাগছে। মনে হচ্ছে কী কুক্ষণে যে ওই লোকটার কথা শুনে সে ঢাকায় আসতে গেছিল? দিব্যি চলছিল সব কিছু।

অন্য একটা অস্বস্তিও হচ্ছে তার। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে অমলের সমস্যা বাড়িয়েছে সে, আসগরকে সরিয়ে দিয়ে। কিন্তু ঠিক কী করত সে? আসগরকে দেখলেই রাগ হচ্ছিল। অদ্ভুত নির্লিপ্ত টাইপের লোক, যে কুয়ালালামপুরে তাকে ওরকম একটা পরিস্থিতিতে ফেলে মজা দেখছিল। হয়তো সেটাও সাদিকের নির্দেশেই করেছিল, কিন্তু কিছুতেই আসগরের উপর থেকে রাগটা সরছিল না তার। কোনও কোনও মানুষের উপর কারণ ছাড়াই ভীষণ রাগ হয়। আসগর সেরকম একটা লোক। সমাজের ময়লা বললে কি ময়লারও অপমান হয়? ট্রাফিকিং-এর সঙ্গেও তো যুক্ত থাকে সাদিক, আসগরও নিশ্চয়ই যুক্ত ছিল। বেশ করেছে সে! যা করেছে, ঠিক করেছে।

অমল চোখ খুলল, ‘চুপ করে বসে থাকলে হবে না রাণা। আমাদের কাজে নামতে হবে। তার আগে সাদিকের কাছে যেতে হবে। রাত হলে বেরোতে হবে। এখন ক’টা বাজে?’ অমল ঘড়ি দেখে বলল, ‘আর আধঘণ্টা। তারপর বেরোব। ওকে?’

রাণা ঘাড় নাড়ল। বুঝতে পারছিল অমল ছটফট করছে। ওর মাথার মধ্যে এখন কী চলছে? রাণা কী করত অমলের জায়গায় থাকলে? দেশে পালাত? কী আশ্চর্য! শুরুতেই পালানোর কথা মনে হল কেন? অমলরা নিশ্চয়ই পালায় না? এসব সিচুয়েশনে কাজ করতে হয় ওদের।

নিজের মনেই হাসল রাণা। উস্তাদ লোকটা তাকে কেন এ কাজে পাঠাল? লোকটা শুধু অমলকে মারতেই পাঠিয়েছে। এখানকার কোনও কাজ যে তাকে দিয়ে হবে না, উস্তাদ সেটা খুব ভালো করেই জানে। সে রগচটা, রাগী, এ কথা লোকটা জানে না, হতে পারে না।

সম্ভবত অমলকে মারার পর অন্য খেলা শুরু হতে পারে। তাকে ধরিয়েও দিতে পারে উস্তাদ! উফ, কী বাজে একটা কাজে ফেঁসে গেল। প্রাণপণে মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করতে শুরু করল রাণা। এই পরিস্থিতিতে কয়েকটা দিন আন্ডারগ্রাউন্ড হলে পুলিশ বা ব়্যাবের ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। অমল সাদিককে হাতছাড়া করতে চাইবে না। গা ঢাকা দেবে না। কী করবে তবে?

শিকারের কাছে বেশি দিন থাকলে দুর্বল হবার মানসিকতা তার কোনকালেই ছিল না। তবু উস্তাদের আদেশ মেনে অমলকে ওড়ানোর চিন্তাটা তার মাথাতে কিছুতেই আসছে না। কোনও কোনও লোক থাকে, যাদের সঙ্গে থাকলে বা কথা বললে বোঝা যায় তারা আদতে ক্ষতি করার লোক নয়। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বলছে অমল খারাপ কাজ করতে পারে না। যদি খারাপ কাজ করত, তাহলে কি কিছুই বোঝা যেত না? কিন্তু সেদিন রাতে অমল বেরিয়েছিল…কেন? জিগ্যেস করবে? থাক।

আধঘণ্টা কেটে গেল। অমল উঠে দাঁড়াল, ‘চলো। বেরোন যাক।’

রাণা বলল, ‘এখন?’

অমল মাথা নাড়ল, ‘কিছু করার নেই। ঘরে বসে থাকলে চলবে না। কাজ বন্ধ থাকলে বিপদ বাড়বে। চলো।’

.

২৭

সন্ধে নেমেছে।

বৃষ্টি পড়ছে। জানলায় চোখ রেখে চুপ করে বসেছিল রুমা। আজকাল অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হয়। বুকটা হঠাৎ করেই কেমন করে ওঠে। ঘুমের ঘোরে আতঙ্ক আসে। অদ্ভুত সব দুঃস্বপ্ন আসতে শুরু করে।

এই ভয়টা কোত্থেকে আসে সে জানে না। তবে এলে শরীর খারাপ লাগে।

‘সাহেব আইসে।’

জরিনা নিচুগলায় বলে গেল। রুমা সামলে বসল। সাদিক চিন্তিত মুখে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খাটে বসল, ‘কেমন আছ তুমি?’

রুমা বলল, ‘ভালো। আপনি?’

সাদিক মাথা নাড়ল, ‘একবারেই ভালো নাই। আসগরের কথা শুনছ?’

রুমা ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ। শুনছি।’

সাদিক বলল, ‘বুঝতে পারতাস কেমন ভয়ের কাজ করি? আজ আছি, কাল কখন আজরাইল চইলা আইব, কেউ জানি না।’

রুমা সাদিকের দিকে ভালো করে দেখল। চোখের তলায় কালি পড়েছে। বোঝা যাচ্ছে, সাদিক বেশ টেনশনে আছে। সে বলল, ‘বুঝছি। আপনি একটু শান্ত হন।’

সাদিকের ফোন বাজতে শুরু করল। সাদিক ফোন ধরল, ‘কী হইল?…হ…বুঝছি…ব়্যাব নজর দিছে? ঠিক আছে। দেখা যাব।’

ফোন রেখে সাদিক ঘামতে শুরু করল। রুমা বলল, ‘কী হইল?’

সাদিক বলল, ‘ব়্যাবের কয়েকটা লোক ঘুরতেছে। কী চায় বুঝছি না।’

রুমা বলল, ‘কেউ নাই? আপনি তো অনেকরে চেনেন।’

সাদিক বলল, ‘চিনলে হবে? তুমি বুঝবা না। কতজন যে কত ধান্দায় ঘুরতাছে, সবার আলাদা আলাদা ধান্দা। আমি বুঝতাছি না কী করুম।’

রুমা বলল, ‘আপনার লগে একখান কাগজ ছিল। দিমু?’

সাদিক খানিকটা চমকাল, ‘কে দিছে?’

রুমা খাটের তোশকের তলা থেকে একটা কাগজ বের করে সাদিকের হাতে দিল। একটা চিরকুটে লেখা, ‘ফ্ল্যাটে পুলিশ এসেছিল। আমরা দুজন সাইডে থাকলাম। কাগজ ছিঁড়ে দেবেন। খোদা হাফেজ।’

সাদিক রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুমান আইছিল?’

রুমা বলল, ‘আনোয়াররে দিয়া পাঠাইছে।’

সাদিক বলল, ‘ওর ফ্ল্যাটেও পুলিশ চলে গেছে?’

রুমা বোঝার চেষ্টা করছিল, সাদিক অমলের ব্যাপারে কী ভাবছে। সে বলল, ‘আপনার কাছের লোক বলে পুলিশ গেছে?’

সাদিক টাওয়েল নিয়ে মুখে জমে থাকা ঘাম মুছল, ‘পুলিশ তো না, তুমি বোঝো না, বললাম তো। পুলিশ না। ব়্যাব গেছে।’

রুমা বলল, ‘আপনি টেনশন করেন ক্যান?’

সাদিক বলল, ‘কারণ আছে। বুঝবা না।’

রুমা রাগের ভান করল, ‘আপনি শুধু কন বুঝবা না, বুঝবা না, আপনি বোঝায়ে দেখেন না।’

সাদিক মাথা নাড়ল, ‘তোমার বুইঝা কাম নাই। কামিজ খোল।’

রুমা নগ্ন হল। সাদিক রুমাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ। রুমার বুকে মাথা গুঁজে বলল, ‘মাথায় হাত বুলায়ে দাও।’

রুমা অবাক হল। তবে সাদিকের মাথায় হাত বোলাতে শুরু করল। সাদিক বলল, ‘খুব চিন্তা গো সাকিনা, খুব চিন্তা।’

রুমা বলল, ‘কোথাও চইলা যাওন যায় না?’

সাদিক সোজা হয়ে বসল, ‘এইটা তুমি ভাইবা বললা?’

রুমা বলল, ‘না। এমনিই মনে হইল।’

সাদিক বলল, ‘আমার মাথায় আসে নাই জানো। কথাটা খারাপ কও নাই। মাঝে মাঝে মাইয়া মাইনষের বুদ্ধিও নেওন লাগে। আমি দু-দিন দুবাই ঘুরতে যাইতেই পারি। কে কী কইব? তুমি যাবা আমার লগে?’

রুমা বিস্মিত হল, ‘আমারে নেবেন আপনি?

সাদিক বলল, ‘হ। আমার আর ভাল্লাগে না কিছু। একা একা কই যামু? তুমি আমার লগে যাবা। আমি ব্যবস্থা করতাসি।’

রুমা বলল, ‘কবে যাবেন?’

সাদিক বলল, ‘কালই যামু। সব ঠিক কইরা ফেলুম, তুমি ভাইব না।’

রুমা বলল, ‘ভাবি যাবে না?’

সাদিক জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না। ও থাকবে। ও গেলে ওগো সন্দ হইবে।’

রুমা বলল, ‘কাগো সন্দ হইবে?’

সাদিক বলল, ‘আছে। তুমি বুঝবা না। আমি যাই। ব্যবস্থা করি।’

ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল সাদিক।

রুমা কামিজ পরে নিল। বাইরে গিয়ে দেখল জরিনা টিভি দেখছে। সে বলল, ‘চল। বাজার যামু।’

জরিনা অবাক হল, ‘এখন যাবা?’

রুমা বলল, ‘হ। কাম আছে। চল।’

জরিনা উঠল, ‘চলো।’

দুজনে বেরোল। গলিটা অন্ধকার। রুমা খানিকটা যাওয়ার পর থমকে দাঁড়াল। পেছনে কেউ আসছে। সে ঘাড় ঘোরাল। কেউ নেই। জরিনাকে বলল, ‘কে রে?’

জরিনা ভয় পেয়ে রুমার হাত চেপে ধরল। রুমা চিৎকার করল, ‘কে ওখানে?’

অন্ধকার চিরে একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসতে শুরু করল। রুমা জোর পায়ে আলোর দিকে হাঁটতে শুরু করল।

ভিড়ের মধ্যে পৌঁছে দেখল মূর্তিটা আর ফলো করছে না।

জরিনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ভয় লাগে আপা।’

অন্য সময় হলে রুমা ভয় পেত না। এখন হঠাৎ করেই একটা অস্বস্তি হল। তার পরিচয় যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে কি ওরা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে?

.

২৮

নির্মল বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙল, কোনমতে ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’

‘তুই কোথায়?’ সোহানের উত্তেজিত গলা ভেসে এল।

নির্মল বলল, ‘কেন?’

‘আনোয়ার স্যার খুন হয়েছেন।’

‘মানে?’

‘মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছিলেন। সেখানেই কেউ শ্যুট করেছে। ওখানেই স্পট।’

ফোন কেটে দিল নির্মল। মাথা কাজ করছে না। আনোয়ার স্যার কি সাদিকের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেছিলেন? ওরা কি তার ব্যাপারেও কিছু জেনে গেছে?

তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল সে। আনোয়ার স্যার তার বাবার মতো। সব সময় আগলে রাখতেন। এমন লোক হঠাৎ করে নেই হয়ে যাওয়া একটা বিরাট ধাক্কা। বাইক না নিয়ে যাওয়াই ঠিক করল। গাড়ি বের করল। মাথা পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে। ড্রাইভ করতে গিয়ে পা কাঁপছে। গাড়ি চালাতে চালাতে চারদিকে দেখে নিল। কেউ ফলো করছে নাকি বোঝা যাচ্ছে না। আনোয়ার আলিকে মেরে দিল? অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয়!

স্যারের বাড়ির সামনে বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। খানিক দূরে গাড়ি পার্ক করে বাড়ির ভেতর ঢুকল সে। থমথমে হয়ে আছে গোটা বাড়ি। বডি শোয়ানো। ম্যাডাম পাথরের মতো বসে আছেন। দু’চোখে জলের ছিটেফোঁটাও নেই। সোহান বলল, ‘তুই ঘুমোচ্ছিলি?’

নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ। বডি পোস্ট মর্টেমে কখন যাবে?’

‘এখনই। এই রে, সোবাহান স্যার তোকে ডাকছে কেন?’

নির্মল দেখল সত্যি সত্যিই সোবাহান স্যার হাত নেড়ে তাকে বাড়ির বাইরে যেতে ইশারা করছেন। সে বেরিয়ে গেল। সোবাহান এসে বললেন, ‘কী ভীষণ আনফরচুনেট না?’

নির্মল মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

সোবাহান বললেন, ‘কাল রাতেও কথা হল। তোমার ব্যাপারে মিনিস্টার স্যারের অর্ডারটাও বললেন। বলছিলেন নির্মলের সঙ্গে ব্যাপারটা ঠিক হল না।’

নির্মল বলল, ‘ইটস ওকে স্যার। যেমন অর্ডার আসবে, মানতে তো হবেই।’

সোবাহান বললেন, ‘হ্যাঁ। সেটাই। তুমি আজকেই জয়েন করে যেও। আমাদের অফিসে তোমার অ্যাক্সেসটা বন্ধ করার অর্ডার আছে। আমার কিছু করার নেই বুঝলে তো? উপর মহলের অর্ডার, আমি কী করতে পারি বল? আনোয়ার স্যারও থাকলেন না, ওর দায়িত্বটা আমাকেই নিতে হবে। সমস্যা বেড়ে গেল।’ সোবাহান দুঃখি মুখ করার চেষ্টা করলেন। তিনি যে বিন্দুমাত্র দুঃখিত না, তা দিব্যি বোঝা গেল।

নির্মল বলল, ‘ঠিক আছে স্যার। যেমন বলবেন, তেমনই হবে।’

সোবাহান নির্মলের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘অনেক দায়িত্ব বেড়ে গেল আমার। আমি চেষ্টা করছি তোমাকে অফিসে ফিরিয়ে আনার। ভেবো না তুমি। মন খারাপ কোরো না। যেভাবে কাজ করছিলে সেভাবেই করো। তোমার সার্ভিস রিভলভার অফিসে জমা দিয়ে দিও।’

নির্মলের মুখটা তেতো হয়ে যাচ্ছিল। সোবাহানকে সে কোনকালেই পছন্দ করে না। মিষ্টি মুখের আড়ালে এভাবেই ছুরি চালায়। ইচ্ছে ছিল আরও কিছুক্ষণ আনোয়ার স্যারের মৃতদেহের কাছে থাকে, কিন্তু সোবাহানের মতো লোক থাকলে সেখানে থাকা সম্ভব না। সে ঠিক করল বাসায় ফিরে যাবে।

হাঁটতে শুরু করল। অনেক লোক আসছে। পাড়ার কৌতূহলী লোকের ভিড়ও বাড়ছে।

গাড়ির সামনে এসে নির্মল দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির পেছনের কাচে কেউ ইট মেরে গেছে। কাচের অনেকটা অংশ ভেঙে গেছে।

ফোন বাজছে। দীপা ফোন করছে। ধরল সে, ‘বল।’

‘কী গো, কী হয়েছে? আনোয়ার স্যার নাকি খুন হয়েছেন?’

‘হুঁ। এখানেই আছি।’

‘তুমি ঠিক আছ তো? কোথায় ছিলে তুমি?’

‘ঘুমোচ্ছিলাম। বাসায় ছিলাম।’

‘আমি ফিরছি। আজকেই চলে আসছি।’

‘আসতে হবে না। ভেবো না। তোমরা ঘোর। চিন্তা করতে হবে না।’

‘চিন্তা করতে হবে না মানে? আমি চিন্তা করব না তো কে করবে? তোমার চিন্তা করার নতুন লোক হয়েছে নাকি?’

‘আমি স্যারের বাসায় আছি। পরে কথা বলছি। ফিরতে হবে না। অসুবিধা নেই।’

‘ঠিক তো?’

‘হ্যাঁ। ঠিক আছি। রাখলাম।’

ফোন কেটে নির্মল গাড়ির কাচ দেখল। আশেপাশে কেউ নেই। শ্বাস ছাড়ল। কেউ কি লোক লাগাল তার পেছনে?

.

২৯

লতিফ চৌধুরী তার ঘরে পায়চারি করছে। মাঝে মাঝেই দাড়িতে হাত বুলোচ্ছে। লতিফের বয়স পঁচাত্তর পেরিয়েছে, তবু চেহারায় এখনও যথেষ্ট শক্তি আছে। ছেলে সফিক একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে। আব্বা এখন যেমন গম্ভীর হয়ে আছে, কথা বলা যে যাবে না, বুঝতে পারছে।

লতিফ অনেক দিন পর বাসার বাইরে বেরোবে। নতুন পাঞ্জাবি আনা হয়েছে। পান দেওয়া হয়েছে। নিজে নিজেই বক বক করে যাচ্ছে সে।

‘দাঁড়ায় আছ ক্যান? কিছু বলবা?’ হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল লতিফ।

সফিক মাথা চুলকে বলল, ‘টেকা লাগব।’

লতিফ পকেট থেকে গার্ডার দেওয়া এক তাড়া নোট বের করে সফিকের দিকে ছুঁড়ে মারল, ‘লও। উড়াও।’

সফিক নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। নোটের তাড়া মেঝেয় পড়ে গেছিল। তড়িঘড়ি সেটা তুলে পকেটস্থ করে বলল, ‘আপনি কই যাবেন?’

লতিফ বলল, ‘সেটা তোমার জানবার দরকার নাই। নিজের কাজ করো।’

সফিক ঘাড় নাড়ল। হর্নের শব্দ পাওয়া গেল ঘরের বাইরে থেকে। লতিফ ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। সফিক অবাক হয়ে দেখল আব্বা হুজুর একটা বড় গাড়িতে গিয়ে উঠল।

গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়া কেউ নেই। লতিফকে দরজা খুলে গাড়িতে তুলে ড্রাইভার দরজা বন্ধ করে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করল। লতিফের ঘরে এসি নেই। গাড়ির এসি একেবারে হিমশীতল করে দিচ্ছিল। সে মৃদু গলায় বলল, ‘ড্রাইভার সাহেব, একটু গরম করা যাইব না?’

ড্রাইভার গাড়ির তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিল। এবার লতিফের আরাম লাগল। আহ্লাদিত গলায় বলল, ‘এবার ঠিক আছে।’

ড্রাইভার নিঃশব্দে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল। লতিফের ভারি মজা লাগছিল। কী ভালো গাড়ি! দেশটা পাকিস্তান থাকলে এরকম গাড়ি তারও থাকত। জীবনে যা চাইত তাই পাওয়া যেত। এমন ভাগ্য, কিছুই হল না। বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।

একটা ছোট অথচ ছিমছাম বাড়ির ভেতর গাড়ি প্রবেশ করল। ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দিল।

লতিফ গাড়ি থেকে নামামাত্র একজন সুবেশ যুবক এসে বলল, ‘আইয়ে।’

লতিফ খুশি হল। এরা অনেক সম্মান দিচ্ছে তো তাকে। দেওয়ার কথা ছিল না। দিচ্ছে এই অনেক।

ঘরের ভিতর মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক লতিফকে দেখামাত্র সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উর্দুতে বলল, ‘আসুন জনাব। আসুন।’

লতিফের চোখে জল চলে এল। তাকে সোফায় বসানো হল।

মাঝবয়সি ভদ্রলোক হাসিমুখে বলল, ‘আমি সঈদ। আপনার দেশে এই প্রথম আসা আমার।’

লতিফ তওবা করে বলল, ‘এসব কী বলছেন জনাব? এটা তো আপনাদেরই দেশ। আমাদের দেশ বলে শরমিন্দা করছেন আমায়!’

সঈদ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নাড়াল, ‘ওসব আমায় বলবেন না জনাব। এই দেশ এখন আর পাকিস্তানের নেই। থাকলে এভাবে লুকিয়ে আসতে হতো না। শুনলাম সাদিক শেখও দেখা করতে আসতে পারবে না?’

লতিফ দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ। আমাকে একাই আসতে হল। সাদিকের উপর অনেকের নজর পড়েছে।’

সঈদ বলল, ‘স্বাভাবিক। হিন্দুস্তানিরা পেছনে লেগে পড়েছে। আপনাদের দেশ তো ওরাই দখল করে নিল। কেউ কিছু বলবে না, সবাই শুধু ওদের খিদমত খাটার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।’

লতিফ বলল, ‘বেতমিজ জনাব। সবাই বেতমিজ। তবে সুখবর হল, দেশে আমাদের পন্থী মানুষও সংখ্যায় ওদের সমান সমান। কোথাও কোথাও বেশি। ইনশাল্লাহ, ভালোয় ভালোয় ভোটটা হয়ে গেলে আমাদের আর এ দেশের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে হবে না।’

সঈদ বলল, ‘ঠিক আছে। সেটা ভবিষ্যতের ব্যাপার। আর ভবিষ্যতকে নিরাপদ করাই আমাদের কাজ।’

লতিফ ঘাড় নাড়ল, ‘সেটা আমরা পারব জনাব। ইন্ডিয়ার হাত থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আমরা বাঁচাবোই।’

সঈদ একটা ট্যাব বের করে লতিফের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘চারটে মাদ্রাসা। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল আর রাজশাহী। এই চারটে মাদ্রাসায় আপনার ভালো কন্ট্রোল আছে শুনেছি।’

লতিফ ঘাড় নেড়ে বলল, ‘জি জনাব। আমি যা বলবো, এরা তাই করবে।’

সঈদ খুশি হয়ে বলল, ‘আপনার বলার সময় এসে গেছে জনাব।’

লতিফ আনন্দে অনেকবার হাত কচলে ফেলল।

.