৫০
রাত দেড়টা। লুকা সাঁতরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। ফোন বাজতে শুরু করল তার, দেখল সুখেন ফোন করছে। ধরল, ‘বল।’
সুখেন যতটা সম্ভব গলাটা কান্না কান্না করে বলতে শুরু করল, ‘দাদা, তোমার তো দয়ার শরীর। গ্রামের বাড়িতে আমার বুড়ি মা থাকে, মা-র টিবি হয়েছে। টাকা পাঠাতে হয় দাদা। তুমি যদি এখন এরকম শাস্তি দাও, তাহলে কী করে হবে?’
লুকা বলল, ‘তুই কোথায়?’
সুখেন বলল, ‘পাশের বস্তিতে বসে আছি দাদা। কী করব, কী খাব, বুঝতে পারছি না।’
লুকা বলল, ‘বুঝেছি। আমার গাড়ির কাছে আয়।’
সুখেন ভয়ে ভয়ে বলল, ‘মারবে না তো দাদা?’
লুকা বলল, ‘না। মারব না। আয়।’
ফোন কেটে দিল লুকা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুখেন কাঁচুমাচু মুখে এসে হাজির হল।
লুকা সন্দিগ্ধ গলায় বলল, ‘কাছেপিঠেই ছিলিস। তাই না?’
সুখেন বলল, ‘তোমাকেই দেখছিলাম। কী করব বল দাদা? তুমি যা শাস্তি দিয়েছে, আমি যে কী করব, তাই ভালো করে বুঝে উঠতে পারছি না।’
লুকা বলল, ‘বুঝে উঠতে পারছিস না? তুই জানিস না কী করেছিস?’
সুখেন লুকার পা জড়িয়ে ধরল, ‘ভুল করেছি দাদা। মাফ করে দাও।’
লুকা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। উঠে দাঁড়া। রাস্তার মাঝখানে ন্যাকামি করবি না।’
সুখেন উঠল না, ‘না দাদা। তুমি যতক্ষণ না মাফ করবে, আমি উঠব না।’
লুকা বলল, ‘হয়েছে রে বাপ, হয়েছে, মাফ করলাম। এবার ওঠ।’
সুখেন উঠে দাঁড়াল।
লুকা বলল, ‘বল এবার। তোর মা সত্যিই অসুস্থ?’
সুখেন বলল, ‘খবর নিয়ে দেখো। তোমাকে মিথ্যে বলব আমি? তোমার যা নেটওয়ার্ক, আমি জানি না?’
লুকা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, ‘হেবি রেগে গেছিলাম আমি। ভাবছিলাম তোর লাশ নামিয়ে দিই। এত পাখা গজিয়েছিল তোর?’
সুখেন বলল, ‘দেখো দাদা, আর হবে না। তুমি বললে মালটাকে আমিই খুঁজে গুলি করে দিয়ে আসব।’
লুকা হাত নাড়ল, ‘না না। তার দরকার হবে না। মালটাকে ছেড়েও দিয়েছি।’
সুখেন আকাশ থেকে পড়ল, ‘সে কী গো দাদা? ছেড়ে দিয়েছ মানে কী?’
লুকা বলল, ‘হ্যাঁ। কী করব? অর্ডার ছিল। কাজ হয়ে গেছে, ছেড়ে দিয়েছি।’
সুখেন বলল, ‘কী অর্ডার ছিল?’
লুকা রেগে গেল, ‘জুতো খাস কেন বুঝতে পারিস? যা তোর জানার দরকার নেই, সেটা জানতে যাবি কেন তুই?’
সুখেন কান ধরল, ‘আবার ভুল করে ফেলেছি দাদা।’
লুকা বলল, ‘ঠিক আছে। আমাদের লাইনে অনেক ব্যাপার থাকে। তোর সেটা জানা উচিত। কথাবার্তা এমন বলিস যেন কিছুই বুঝিস না!’
সুখেন বলল, ‘ওই মালটার জন্য তুমি আমাকে মারতে যাচ্ছিলে দাদা, একটু তো জানতে ইচ্ছে হয়ই, ও কিছু না। ছেড়ে যখন দিয়েছ, তখন থাক। তোমার কথা বলো, শুনি।’
লুকা আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘আমি কি গল্পদাদু রে শালা?’
সুখেন বলল, ‘এ মা, তা কেন? ভালোমন্দের কথা কি বলতে ইচ্ছে করে না তোমার সঙ্গে? তুমি হলে আমাদের সবার দাদা।’
লুকা বলল, ‘তা ঠিক। আজ বিজনদার সঙ্গে দেখা হল। এই মার্কেটেও বিজনদা পার্টি ছাড়েনি। একটা কথা মনে রাখবি সুখেন, এই যুগে যারা এখনও দাঁতে দাঁত চেপে আদর্শের লড়াই করে যাচ্ছে, তাদের মারার জন্য যদি কোনও শুওরের বাচ্চা লুকা সাঁতরাকে টাকা দেয়, লুকা তার খাল খিচে নেবে।’
সুখেন বলল, ‘বিজনদাকে মারার জন্য টাকা দিয়েছে নাকি?’
লুকা মাথা নাড়ল, ‘না না, তা না। যদি দেয়, তাহলে কী করব তাই বললাম। বিজনদার সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগে। আমায় অনেক জ্ঞান দিল, ভালো হয়ে যা এই সব। আমি বললাম, আমি তো ভালোই। বিজনদা আমার পিঠে চাবড় মারল। বলে মানুষের জন্য ভালো কিছু কর। তুই বল সুখেন, আমি কি ভালো কাজ করি না? এই তো এখানের মেয়েদের জন্য কত কিছু করি।’
সুখেন খুক খুক করে কেশে বলল, ‘তা তুমি করো। তুমিই এখানের ভগবান।’
লুকার ফোন বেজে উঠল। সুখেন দেখল লুকা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘তুই এখন যা। আমার কাজ আছে।’
সুখেন বলল, ‘কোথায় যাব দাদা?’
লুকা জোর পায়ে হাঁটতে শুরু করল, ‘জাহান্নামে যা।’
লুকা গলিতে ঢুকেছে। সুখেন দূরত্ব রেখে হাঁটতে শুরু করল।
লুকা একরকম দৌড়ে শমিতার ঘরের দিকে গেল। সুখেন দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা ঝুঁকি নিতে হবে। মরলে মরবে। কিন্তু কৌতূহলে মরে যাওয়ার থেকে এমনি মরে যাওয়া ভালো।
শমিতার ঘরের পিছনে গলি শেষ হয়ে গেছে। সুখেন ‘জয় মা’ বলে পাইপ বেয়ে ছাদের উপরে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে ছাদের উপর থেকে ভেতরের বারান্দায় উঁকি মারল। যে মেয়েকে এনেছিল, সে মেয়েটা চিৎকার করে কাঁদছে, ‘আমি এখানে থাকব না, আমায় ছেড়ে দিন।’
এতটা কষ্ট করে উপরে উঠে সুখেনের বুক হাপরের মতো ওঠা নামা করছিল। পাশের বিল্ডিং থেকে তাকে দেখতে পাবার প্রবল ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সুখেন নামল না। ছাদের উপর থেকে আবার উঁকি মারল। মেয়েটাকে শমিতার দুজন মেয়ে জোর করে ধরে হাতে ইনজেকশন দিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মেয়েটা অচৈতন্য হয়ে গেল।
প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তে সুখেন শিস দিয়ে ফেলে। এবার দিতে গিয়েও বহু কষ্টে নিজেকে আটকাল। ধরা পড়লে এবার আর লুকা ছেড়ে দেবে না তাকে!
.
৫১
ব্যাগটা যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। হাওড়ার বাসে উঠে পায়ের তলায় ব্যাগটাকে রেখেছে সে। মাঝে মাঝেই প্রবল কান্না পাচ্ছে। নুরুলের কথা মনে পড়ছে। এভাবে মেরে দিল বাপিদা?
নকল টাকাগুলো ব্যাগে রেখে বাপিদার বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে বাপিদা ফোন করল আরেকবার, ‘সাবধানে যাবে। কেউ যেন বুঝতে না পারে, ব্যাগে কী আছে। বুঝেছ?’
পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ, বুঝেছি।’
বাপিদা বলল, ‘পুলিশ যেন না বোঝে।’
পূর্ণ বলল, ‘এই টাকা তোমার কাছে এল কী করে বাপিদা? অত দূরে বসে এখানে এত টাকা?’
বাপিদা বিরক্ত গলায় বলল, ‘যা বলেছি, সেটা করো। এত প্রশ্ন জিগ্যেস করে কোনও লাভ নেই। দিনের আলো থাকতে থাকতে বেরিয়ে যাও।’
ফোন কেটে গেল। বাস স্ট্যান্ডে গিয়েও পূর্ণ শুনতে পেল সবাই নুরুলের ব্যাপারেই কথা বলছে। কাল বন্ধ ডাকা হয়েছে। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে বলে মিছিল হবে বিকেলে।
হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে ব্যাগ কাঁধে নিয়েই পূর্ণ ট্রেনের টিকেট কাটল। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসেছে। এর মধ্যে অনেকে উঠেও পড়েছে। তাও সিট পাওয়া গেল। পূর্ণ পায়ের তলায় ব্যাগ রেখে বসল। সামনের লোকটা নিবিষ্ট মনে খবরের কাগজ পড়ছে। পূর্ণর বুক ধড়ফড় করছে। স্টেশনে অনেক পুলিশ ছিল। একবার যদি তারা তাকে ধরে ফেলত, তাহলে কী হতো?
সাঁতরাগাছিতে একটা লোক উঠল। ট্রেনে ভিড় নেই, অথচ লোকটা তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। পূর্ণর ফোন বাজতে শুরু করেছে। পূর্ণ ফোন ধরল, বাপিদা বলল, ‘তোমাকে উলুবেড়িয়া অবধি যেতে হবে না। পরের স্টেশনে নেমে যাও। তোমার সামনে যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে ব্যাগ নিয়ে যাবে।’
পূর্ণ লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখল। মাঝবয়সি লোক। গাট্টাগোট্টা চেহারা। সে সঙ্গে সঙ্গে সিট থেকে উঠে লোকটাকে বলল, ‘বসুন।’
লোকটা বসল। পূর্ণ গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছিল তার। আশেপাশের লোকগুলো কিছু বুঝল নাকি কে জানে। ট্রেন ফুলেশ্বর স্টেশনে দাঁড়িয়েছে। পূর্ণ তড়িঘড়ি নেমে গিয়ে ফেরার টিকিট কাটল। ফোন বাজছে আবার। পূর্ণ ফোন ধরল। বাপিদা বলল, ‘এখনই ট্রেনে উঠো না। একটা ব্যাগ দেবে। নিয়ে ফিরবে।’
পূর্ণ বলল, ‘আবার? রাত হয়ে যাবে তো?’
বাপিদা বলল, ‘হোক। কাজ করছ। সময় লাগলে লাগুক। এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মের একদম শেষ বেঞ্চ, যেটা হাওড়ার দিকে মুখ করে আছে, সেটায় গিয়ে বোস। কারো সঙ্গে কথা বলবে না।’
পূর্ণ বলল, ‘আমায় যদি পুলিশ ধরে? আমি কী করব তখন?’
বাপিদা বলল, ‘কেন ধরবে? তুমি কি কিছু করেছ যে ধরবে?’
পূর্ণ ঘামছিল। বলল, ‘আমি জানি না। তুমি এগুলো কী করছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
বাপিদা বলল, ‘বোঝার জন্য তোমায় টাকা দেওয়া হবে না।’
পূর্ণ বলল, ‘আমার টাকা লাগবে না। আমাকে ছেড়ে দাও।’
বাপিদা বলল, ‘ছেড়ে দিতাম, যদি তুমি চুরিটা না করতে যেতে। তোমাকে তো সৎ ভাবতাম। তোমার মধ্যেও লোভ আছে তার মানে। লোভের জন্য এটুকু তো করতেই পারো, তাই না? প্রথম প্রথম একটু ভয় লাগবে। তারপর আর লাগবে না। চিন্তা কোরো না। যা বলছি করো। ভালো টাকা পাবে।’
পূর্ণ বলল, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর করব না। আমাকে ছেড়ে দাও।’
বাপিদা বলল, ‘বললাম তো তোমায়, যেটা বলছি করো। নইলে নুরুলের মতো দশা করব।’
পূর্ণ বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা। যাচ্ছি।’
ফোন কেটে দিল বাপিদা।
পূর্ণর অসুস্থ লাগছিল। সে কোনমতে হাঁটতে হাঁটতে ওভারব্রিজ পেরিয়ে বাপিদার বলা বেঞ্চে গিয়ে বসল। বেঞ্চ ফাঁকাই ছিল। অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে।
‘কোথায় যাবেন?’
তার সামনে একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে, পূর্ণ বুঝতে পারেনি। চমকে তাকাল।
পূর্ণ বলল, ‘হাওড়া যাব।’
‘টাকাগুলো নকল কেন?’
পূর্ণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে লোকটার দিকে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যে তাকে চারজন ঘিরে ধরল।
.
৫২
পূর্ব কথা
বাজারের হোটেলে অনেকদিন খাওয়া হয় না। একটা দোকান থেকে ডিম আর ময়দার গন্ধ ভেসে আসছে। এগরোল ভাজছে।
দিব্যেন্দু দোকানের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। যে লোকটা এগরোল ভাজছে, সে জিগ্যেস করল, ‘কী দেব?’
দিব্যেন্দু দাঁত বের করল, ‘দেখছি।’
লোকটা অবাক গলায় বলল, ‘কী দেখছেন?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘এগরোল ভাজছেন, সেটা দেখছি।’
লোকটা বিরক্ত গলায় বলল, ‘নিলে নিন, নইলে সরে যান। ভিড় করবেন না। এমনিতেই ভ্লগারদের জ্বালায় অস্থির। দু-দিন পর পর কেউ না কেউ এসে বলে ভিডিও করব, তোমার প্রচার হবে, খেয়ে নেবো, টাকা দেব না। পরে দেখা যায় দশটা সাবস্ক্রাইবার তার। অনেক মুরগি হয়েছি। আর হব না বাপ। আপনিও কি ভ্লগার নাকি?’
দিব্যেন্দু মাথা নাড়ল, ‘না না। আমি কিছু না। আচ্ছা আমাকে একটা রোল দিন।’
‘ডবল ডিম না সিঙ্গল ডিম?’
‘ডবল।’
‘লঙ্কা দেব?’
‘দিন।’
লোকটা অভ্যস্ত হাতে ডিম ভাঙল। এখন একটু নুন দিয়ে চামচ দিয়ে নাড়াচ্ছে। দিব্যেন্দু মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
পেঁয়াজ কাটা আছে। ডিম ভাজার উপর পরোটা দিয়ে এদিক-ওদিক ভেজে নিয়ে এবার রোলের উপর পেঁয়াজ সাজানোর পালা। দিব্যেন্দু বলল, ‘বাদাম আছে?’
লোকটা বিরক্ত গলায় বলল, ‘বাদাম কে দেয়?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি খাই। বাদাম দিন না।’
লোকটা বলল, ‘বাদাম নেই।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি বাদাম কিনে আনছি।’
লোকটা তাড়াতাড়ি রোলটা বানিয়ে দিব্যেন্দুর হাতে দিয়ে বলল, ‘টাকা দিন, দিয়ে ফুটুন। বাড়িতে গিয়ে বাদাম দিয়ে নিন।’
দিব্যেন্দু টাকা দিয়ে রোলটা নিয়ে বাড়িতে এল।
‘রুমা।’
রুমা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল।
দিব্যেন্দু বলল, ‘বাদাম দে তো।’
তুই সম্বোধন শুনেই রুমা বুঝেছে দিব্যেন্দুর মেজাজ ঠিক নেই। সে বলল, ‘দেখছি।’
রান্নাঘরে গেল। না। বাদাম নেই।
দিব্যেন্দু বাইরের ঘরে দাপাচ্ছে।
রুমা বেরিয়ে বলল, ‘আমি বাদাম নিয়ে আসছি। নেই।’
দিব্যেন্দু রোলটা ছুঁড়ে মারল রুমার গায়ে, ‘শুধু বাইরে গিয়ে লোকের গায়ে ঢলানোর ইচ্ছা না?’
রুমা কাঁপতে শুরু করেছে। দিব্যেন্দু রোলটা মেঝে থেকে তুলে বলল, ‘তুই খা। খা।’
খেতে না চাইলেও গোটা রোলটা রুমার মুখের মধ্যে জোর করে পুরে দিল দিব্যেন্দু। রুমা খেতে পারল না। বমি করে দিল। দিব্যেন্দু চুলের মুঠি ধরে বলল, ‘ষাট টাকা তোর বাপ দেবে রে মাগী? তোর বাপ দেবে?’
.
বর্তমান সময়
.
দোকানটার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দিব্যেন্দু। বুকের কাছটায় ব্যথা করছে। বেশ্যাপাড়ার গুন্ডাগুলো বহুত পিটিয়েছে। এ ব্যথা বেশ কিছুদিন থাকবে।
রোলের লোকটা তাকে দেখে বলল, ‘কী বাদাম দাদা? বাদাম দেব?’
দিব্যেন্দু হাসল, ‘আছে?’
লোকটা বলল, ‘এনেছি। আপনার মতো দু-চার পিস আছে, বলে বাদাম ভালো লাগে।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘দাও।’
লোকটা বাদাম ভাজছে। বাদামটা একটু একটু করে কালো হচ্ছে। দেখতে দিব্যি লাগছে। দিব্যেন্দু মুগ্ধ হয়ে দেখছে। পেঁয়াজ শসার সঙ্গে বাদামও দেওয়া হবে। তার উপরে সস। এখানে দামি সস দেয় না। কুমড়োর সস দেয় মনে হয়। লাল, হলুদ, খয়েরি সসের বন্যা। যা দেবে দিক। খিদে পেয়েছে। খেতে হবে। বাড়িতে রুমা নেই। রান্না নেই। বাইরেই খেতে হবে। আগে রোল খাবে। তারপর ফুচকা খাওয়া যেতে পারে। তারপর ঘুগনি।
ঘুগনির মধ্যে একটা গোটা সেদ্ধ ডিম ভেঙে দেয়। নরম কুসুমটা ছড়িয়ে পড়ে। আলাদা ব্যাপার থাকে তাতে। ভাবতেই জিভে জল চলে এল।
মানিব্যাগ কিনতে হয়েছে। এটিএম থেকে শুধু পাঁচশো বেরিয়েছে। দিব্যেন্দু সেটা দিল। দোকানদার বিরক্ত গলায় বলল, ‘খুচরো দিন।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘খুচরো নেই।’
লোকটা রেগে গিয়ে বলল, ‘তাহলে রাস্তা দেখুন।’
দিব্যেন্দুর মাথা গরম হচ্ছে। এখন রাগ ঝাড়ার জন্য রুমা নেই। কার উপর ঝাড়বে?
দোকান থেকে সরে গেল সে। টাকা খুচরো করতে হবে।
উফ্, কী ঝামেলা! রক্ত উঠছে মাথায় একটু একটু করে।
একটা গাড়ি দাঁড়াল বাজারের মধ্যে। ‘এই এদিকে।’
একী! সেই গুন্ডাগুলো না? উফ্! তাকে ডাকছে আবার! রাগ এবার ভয়ে পরিণত হচ্ছে।
.
৫৩
গাড়ির ভেতরে হালকা মিষ্টি একটা মদের গন্ধ ভাসছে। দিব্যেন্দু ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আমাকে আবার এখন কী করতে হবে?’
দিব্যেন্দুর পাশে যে বসেছিল, সে দিব্যেন্দুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘তোমার বান্টু টেস্ট হবে কাকা।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘মানে?’
‘মানে আবার কী? তোমারটা কী পজিশনে আছে, ঠিক করে দাঁড়ায় নাকি, ফাংশান করে নাকি, দেখতে হবে না?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘এসব কী? আমার খিদে পেয়েছে?’
‘এই কে আছিস, একে কিছু খাইয়ে দে।’
গাড়ি দাঁড়াল একটা ধাবায়। তুমুল ঝাল দিয়ে একটা মাটন তড়কা দেওয়া হল। খেতে দারুণ লাগছিল। দিব্যেন্দু উশ আস করে সাতটা রুটি খেয়ে নিল।
‘উরিব্বাস। মামা তো ভালোই খেতে পারো।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘খিদে পেয়েছিল। আপনারা খাবেন না।’
‘না না। খাব না। তুমি খাও। পাঁঠা বলির আগে পাঁঠাকে খাওয়ায়, দেখো না?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘মানে?’
‘মানে বুঝতে হবে না। খাও।’
খেয়ে নিল। আবার পান দেওয়া হল তাকে।
গাড়িতে উঠে ঘুমও পেয়ে গেল দিব্যি। একটা ছেলের কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েও পড়ল সে।
ঘুম ভাঙতে দেখল আবার সেই পাড়ায় গলির মুখে চলে এসেছে। ছেলেগুলো তাকে বলল, ‘চলো। ভেতরে চলো।’
চারদিকে তাকাল দিব্যেন্দু। এখন অনেক রাত হয়েছে। বাইরে তেমন কেউ নেই। ছেলেগুলোর সঙ্গে তাকে শমিতার ঘরে নিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল।
লুকা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তারপর? কেমন লাগল আবার আসতে?’
দিব্যেন্দু ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আমাকে কেন আনা হয়েছে?’
লুকা বলল, ‘ওই ঘরে ঢোকো। বুঝে যাবে।’ দরজায় তেল চিট চিট করছে। একটা বেলফুল দিব্যেন্দুর হাতে দিল লুকা। ‘যাও যাও।’
দিব্যেন্দু দরজা ঠেলে ঢুকল।
পরমুহূর্তেই চমকে উঠল।
খাটে রুমা শুয়ে আছে। চোখে মুখে কত মেক আপ। সে ফিসফিস করে বলল, ‘শালা। পুরো বেশ্যার মতোই লাগছে তো।’ মাথায় রক্ত উঠতে বেশিক্ষণ লাগল না, ‘এই মাগী, ওঠ, এই।’ রুমার কাঁধ ধরে জোরে ঝাঁকাতে শুরু করল সে।
রুমার ঘুম ভেঙে গেছিল। দিব্যেন্দুকে দেখে সে শিউরে উঠল। দিব্যেন্দু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘দেখেছিস তো মাগী, আমি জানতাম, এটাই তোর আসল জায়গা। তুই এই জায়গায় আসবি বলেই জন্মেছিলি।’
রুমার মনে হচ্ছে সে কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না তার সামনে আবার দিব্যেন্দু ফিরে এসেছে। দরজা ঠেলে লুকা ঢুকল। দিব্যেন্দুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘যাও সোনা, তুমি অন্য ঘরে যাও।’
দিব্যেন্দু একঝটকায় লুকার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার বউ, আমি বুঝব!’
লুকা সপাটে একটা চড় কষালো, ‘যা বলছি, তাই করবি শুয়োরের বাচ্চা। চল ফোট। এর মধ্যেই সব ভুলে মেরে দিয়েছিস?’
জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল। দিব্যেন্দু সিঁটিয়ে গেল। লুকা চিৎকার করল, ‘যা।’
দিব্যেন্দু সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল। রুমা কাঁপছিল। লুকা বলল, ‘আমাকে বলা হয়েছে আপনার সামনে এই লোকটাকে নিয়ে আসতে। আমি কারো ইন্সট্রাকশন শুনে কাজটা করেছি। আমি জানি এই লোকটা একটা ব্র্যান্ডেড শুয়োর।’
রুমা কাঁদছিল। বলল, ‘আমার সঙ্গে আপনারা এরকম করছেন কেন?’
লুকা বলল, ‘আমি জানি না। বিশ্বাস করুন। আমি কেয়ার টেকার মাত্র। আপনি যেতে চাইলে চলে যেতে পারেন। কিন্তু হাতে সময় বড় কম। পনেরো দিনের মধ্যে শমিতার কাছ থেকে আপনাকে এ পাড়ার হাল-হকিকত, খদ্দেরের সঙ্গে ডিল করার কায়দা, সব শিখতে হবে। তারপর ওরা আপনাকে নিয়ে যাবে। সেখানে কী করবে তাও জানি না। আপনি আজ চলে গেলে হয়তো ওরা আবার এই জানোয়ারটার সঙ্গে ঘর করতে পাঠিয়ে দেবে। সেটা কি ভালো হবে?’
রুমা বলল, ‘কী পাপ করেছিলাম আমি? কী করে আমি এরকম একটা খারাপ মেয়ে হয়ে যাব?’
লুকা মাথা নিচু করল, ‘জানি না দিদি। এটুকু জানি, যারা আপনাকে এগুলো করতে বলছে, এই ট্রেনিং নিতে বলছে, তারা ছোটখাটো কেউ না। লুকার মতো লোকও তাদের কথা শুনতে বাধ্য।’
রুমা বলল, ‘আমাকে বেশ্যা বানিয়ে দিল ওরা?’
লুকা বলল, ‘এটার উত্তর আমি দিতে পারব না বিশ্বাস করুন।’
রুমা চুপচাপ কেঁদে যেতে লাগল।
.
৫৪
জানলা দিয়ে বাইরের রাস্তায় তাকিয়ে আছে অরিত্র। একটার পর একটা গাড়ি যাচ্ছে। মাথার মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা।
তার দোষেই এণাক্ষী হারিয়ে গেল। তার জন্যই। কেন সে ওকে একা ছেড়ে দিল সেদিন?
ইনভেস্টিগেশন সেন্টার থেকে তাকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, সব জায়গায় এ বিষয়ে আলোচনা না করতে। পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে এণাক্ষীকে খুঁজে বের করতে। আজেবাজে লোককে বললে নাকি খুঁজে পাওয়ার চান্স কমে যাবে। অরিত্র এটাই বুঝতে পারছে না। এরকম আবার হয় নাকি? একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর তার কথা কাউকে বলা যাবে না?
ফোনটা বাজতে শুরু করল। অরিত্র দেখল নীল ফোন করছে। ধরল সে, ‘হ্যাঁ, বলুন।’
নীল বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলার জন্য ফোন করলাম। মনে হয় এই কথাটা আপনাকে জানানো দরকার।’
অরিত্র বলল, ‘প্লিজ বলুন।’
নীল বলল, ‘ম্যাডামের ফোনের লাস্ট লোকেশন হোটেলেই পাওয়া গেছিল। তারপরে সিম নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা চিন্তার।’
অরিত্র উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ‘তাহলে ও নিজের ইচ্ছেয় কোথাও যায়নি, সেটা তো প্রমাণ হল? যেভাবে ওর ক্যারেকটার অ্যাসাসিনেট করা হচ্ছে, সেটা তো আর হবে না। তাই না?’
নীল বলল, ‘আপনি রেগে যাচ্ছেন। এই সময়টা মাথা ঠান্ডা রাখা উচিত।’
অরিত্র বলল, ‘এই সময়টা আপনার এলে কী করতেন আপনি? ঘরে বসে থাকতে পারতেন?’
নীল বলল, ‘আমরা দেখছি তো। আপনি ভাববেন না। আরও এক্সটেনসিভ সার্চ অপারেশন শুরু করা হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি একটা না একটা খবর পাওয়া যাবে।’
কলিং বেল বেজে উঠল। অরিত্র বলল, ‘ধরুন একটু। কে এল দেখি।’
দরজা খুলল অরিত্র। দরজা খুলে স্তব্ধ হয়ে গেল। এণাক্ষী দাঁড়িয়ে আছে! তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল, ‘তুমি?’
এণাক্ষী যেন অনেকক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। তার দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে রইল।
অরিত্র তড়িঘড়ি এণাক্ষীকে হাত ধরে সোফায় বসিয়ে ফোনটা তুলল, ‘হ্যালো…অফিসার।’
নীল বলল, ‘হ্যাঁ। আমি ধরে আছি। কী হয়েছে?’
অরিত্র বলল, ‘এণাক্ষী ফিরে এসেছে।’
নীল বলল, ‘বাঃ। ভালো খবর। আমি কি একবার আসতে পারি?’
অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। প্লিজ আসুন। আমি ওয়েট করে আছি।’
তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। হাতে চিমটি কেটে দেখল। এণাক্ষীকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কোথায় গেছিলে তুমি? আমি কত খুঁজেছি জানো তোমাকে? পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।’
এণাক্ষী করুণ গলায় বলল, ‘আমার কিছু মনে নেই।’
অরিত্র বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি খাটে শোবে চলো। আমার মনে হয় তোমার রেস্ট নেওয়া দরকার।’
এণাক্ষী বলল, ‘আমি খারাপ মেয়ে নই। বিশ্বাস করো। আমি পার্টিতে কারো সঙ্গে খারাপ কিছু করতে যাইনি।’
অরিত্র লজ্জা পেল, ‘এভাবে না প্লিজ। তুমি শোও। এস।’
এণাক্ষীকে ধরে বেডরুমে নিয়ে গিয়ে খাটে বসাল অরিত্র। এণাক্ষী একা একা বিড়বিড় করতে লাগল, ‘ওরা আমাকে অনেক চাপ দিয়েছে। ফোন করতে দেয়নি। আমি বার বার তোমাকে ফোন করতে চেয়েছি, ফোনে পাইনি। আমি…কে নিয়ে গেছিল আমায়…’
অরিত্র বিস্মিত হয়ে বলল, ‘কে নিয়ে গেছিল?’
এণাক্ষী অরিত্রর দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিল, ‘জানি না। আমি বুঝতে পারছি না।’
অরিত্র বলল, ‘কে দিয়ে গেল তোমায়?’
এণাক্ষী মাথা নাড়ল, ‘জানি না। আমাকে ফ্ল্যাটের নীচে নামিয়ে দিয়ে গেল। তার আগে আমি মনে হয় ঘুমোচ্ছিলাম। আমি জানি না।’
অরিত্র এণাক্ষীকে শুইয়ে বাইরে গিয়ে নীলকে ফোন করে সব বলল। নীল বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে ম্যাডামের একটা মেডিকাল টেস্ট করাতে হবে।’
অরিত্র বলল, ‘আবার মেডিকাল টেস্ট কেন?’
নীল বলল, ‘অনেকগুলো কারণ হতে পারে। হতে পারে যারা নিয়ে গেছিল তারা বেআইনি অরগ্যান ব্যবসায়ী। কিংবা বদ মতলব ছিল। আপনি ওকে নিয়ে…ওহ আপনার গাড়িটা এখন নেই তো। ঠিক আছে। আমি আসছি। আপনি তৈরি থাকুন।’
অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইল।
