১০
কামরায় উঠে দিব্যেন্দু দেখল তাপস মুখ চুন করে বসে আছে। কামরুল শাফল করছে।
দিব্যেন্দু বলল, ‘কী হল তোমার? মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ পেছন ভিজিয়ে চলে গেছে।’
তাপস রেগে গিয়ে বলল, ‘ওরে বাঙাল, আমার কী হয়েছে, সেটা বললে তুই বুঝবি? তোর সে বুদ্ধি আছে?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘বোলো না। কে বলতে বলেছে?’
কামরুল বলল, ‘দাদার পকেটে পঞ্চাশটাকা ছিল। কে ভিড়ের মধ্যে তুলে নিয়েছে।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘চিনি কেনার টাকা নাকি? মাংসে দিতে?’
তাপস জ্বলন্ত চোখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চিনি কতটা সায়েন্টিফিক জানিস? রান্নায় মাপমত দিলে চিনি অনেক কাজে দেয়।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘হাফ চামচটাকে মাপ মতো বলে। চার কাপকে না।’
তাপস বলল, ‘কী রে বাঙাল, আজ এত বুলি ফুটছে কেন? সুখবর আছে নাকি? বউ কি বাচ্চা বিয়োবে?’
দিব্যেন্দু দাঁত বের করল, ‘প্রমোশন হয়েছে।’
কামরুল বলল, ‘মিষ্টি ছাড়া চলে এলে? খাওয়াবে না?’
তাপস বলল, ‘সেই তো! বাঙালরা তো আমাদের মতো কিপটে হয় না। তুই মিষ্টি আনলি না?’
ট্রেন ছেড়েছে। অন্য সিটে যারা তাস খেলছিল, তারাও দিব্যেন্দুর খবরটা শুনে হই হই করে উঠল। শোনপাপড়ি উঠেছিল। তাই খাওয়াতে হল।
তাপস ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আজ যা ওয়েদার আছে, তার উপর এই সুখবর, বাঙাল আজ বাড়িতে কাঁটাতার পার করে দেবে।’
বিচ্ছিরিভাবে হাসল তাপস।
দিব্যেন্দু তাসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যারা নিজেরা পারে না, তারা লোকের কাজকর্ম নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করে। চিনি খেয়ে খেয়ে তোমার শক্ত হয় না।’
তাপস রেগে গেল, ‘বার বার চিনিকে অ্যাটাক করবি না।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘তুমি যখন অ্যাটাক কর, তখন কোনটা ছেড়ে দাও?’
তাপস সুর করে বলল, ‘ওরে বাঙাল, বুঝেছি। প্রমোশনের গরম মাড়াচ্ছিস তাই না? কত মাইনে বেড়েছে তোর?’
দিব্যেন্দু গোটা রাস্তা ফিক ফিক করে হাসতে থাকল। অন্যান্যদিন তাপস গরম নেয়। আজ কিছুতেই আপার হ্যান্ড নিতে পারল না। স্টেশন নেমেই অবশ্য বেগ পেয়ে গেল। ঝড়ের গতিতে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি এসে শ্বশুরের সামনেই জামা প্যান্ট খুলে বাথরুমে ঢুকে গেল।
রুমা চা বসাল। রুমার মা ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ‘ছেলেটা এতটা রাস্তা তেতেপুড়ে এলো, কিছু খেতে দিবি না?’
রুমা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘মুড়ি দেব একটু পরে। ভেবো না। ও ঠিকই চেয়ে খেতে পারে।’
মা রেগে গেল, ‘এই জন্যই তো এত ঝামেলা হয়। কখন কোনটা দরকার বুঝিস না? তোকেই তো দেখতে হবে।’
রুমা বলল, ‘কেন? খিদমৎ খাটার জন্য বিয়ে দিয়েছো নাকি?’
মা বলল, ‘শোন রুমা, যদি তুই এরকম চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলিস, আমি কিন্তু জামাইকে বলে দেব তুই মাঠে প্রত্যুষের সঙ্গে কী করছিলিস। বলব দেখবি?’
রুমা বলল, ‘বলে দাও। গলা নামিয়ে কথা বলছ কেন? গলা তুলেই বল। তোমরা সবাই মিলে আমাকে একবারে ফ্যানের সঙ্গেই ঝুলিয়ে দাও না, তাহলেই তো বেঁচে যাই।’
মা রাগী চোখে তার দিকে তাকিয়ে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দিব্যেন্দু বাথরুম থেকে স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে বেরিয়ে ঘরে গিয়ে রুমাকে ডাকল। ‘এদিকে এসো।’
রুমা ভাবলেশহীন মুখে বেডরুমে ঢুকল।
দিব্যেন্দু বলল, ‘দরজা বন্ধ কর।’
রুমা বলল, ‘বাবা-মা আছে। এখন বন্ধ করলে খারাপ দেখাবে।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘খারাপ দেখাবে কেন? খাট কিনে দিয়েছে শ্বশুর-শাশুড়ি, ওরা জানে না মেয়ে-জামাই কী করবে?’
রুমা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার পা কাঁপছে।
দিব্যেন্দু বলল, ‘দরজা বন্ধ না করলে এখানেই শাড়ি খুলে দেব। ভালো লাগবে সেটা?’
রুমা সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দিল।
দিব্যেন্দু বলল, ‘কাছে এসো।’
রুমা কাছে গেল।
দিব্যেন্দু অফিসের ব্যাগ থেকে একটা ছোট গয়নার বাক্স বের করে বলল, ‘কানের দুল। পরে নাও।’
রুমা অবাক হয়ে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে রইল।
১১
‘যাও। বাবা-মাকে দেখিয়ে এসো।’
রুমা কানের দুল পরে চুপ করে বসে আছে। দিব্যেন্দুর কথা শুনে উঠে দাঁড়াল।
দিব্যেন্দু ডাকল, ‘শোনো।’
রুমা দাঁড়িয়ে পড়ল।
দিব্যেন্দু বলল, ‘এবার একটা বাচ্চা নিতে হবে। লোকে জিগ্যেস করছে। এক বছর তো হল।’
রুমা কিছু বলল না।
দিব্যেন্দু বলল, ‘কীরে? কথা বলছিস না কেন? অন্য প্ল্যান আছে নাকি? ছেলেটাকে ডাকব? ল্যাঙটো হয়ে ওর সঙ্গে শুয়ে থাকবি?’
রুমা দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একা একা বাচ্চা নেওয়া যায় কি?’
দিব্যেন্দু স্থিরচোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চেষ্টা করছি। দেখছি কী করা যায়। ডাক্তার দেখাব। তুই তাই বলে অন্য লোকের সঙ্গে শোয়ার তাল করবি?’
রুমা বলল, ‘মাকে দেখিয়ে আসি।’
দিব্যেন্দু রুমার চুল ধরে তাকে কাছে আনল। রুমা শব্দ করল না। দিব্যেন্দু বলল, ‘মা বাবাকে বলেছিস আমি পারি না?’
রুমা মাথা নাড়ল। দিব্যেন্দু বলল, ‘বললে এখানেই পুঁতে রেখে দেব।’
চুল ছেড়ে দিল সে। রুমা ঘর থেকে বেরোল। মা-বাবা টিভি দেখছিল। রুমা মাকে বলল, ‘এই যে, ও দিয়েছে।’
মা সেটা দেখে খুশি হয়ে বলল, ‘কী ভালো। আমি বলি না। আমাদের জামাই সোনার টুকরো।’
দিব্যেন্দু ঢুকল। মাটিতে শুয়ে পড়ে শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম করল। রুমার মা আপ্লুত হয়ে গেল, ‘এ কী বাবা! থাক থাক। এরকম করলে খুব লজ্জা লাগে।’
দিব্যেন্দু প্রণাম সেরে মাটিতে বসে বলল, ‘মা-বাবা ভগবানের রূপ। প্রণাম তো করতেই হবে। আমার নিজের বাবা-মা নেই। আপনারাই আমার বাবা-মা। কেমন আছেন আপনারা?’
রুমার মা বলল, ‘ভালো আছি বাবা।’
রুমার বাবা বলল, ‘অফিসে সব ঠিক ঠাক তো?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ। এই তো, আজ প্রমোশন পেলাম। কঠিন পরীক্ষা ছিল। আমি চেষ্টা করেছিলাম। অনেক পড়াশুনা করতে হয়েছিল। ভেবেছিলাম পেয়ে যাব। তাই হয়েছে। মাইনে বাড়ল। এখন অনেক দায়িত্ব এসে পড়েছে। আচ্ছা, আমি রুমাকে টাকা দিয়ে যাচ্ছি। আপনারা কাল বাজারে গিয়ে পুজোর বাজার করে নেবেন। আমিই নিয়ে আসতাম। কিন্তু তাহলে আপনারা পছন্দ করে কিনতে পারবেন না।’
রুমার মা লজ্জায় পড়ে গেল, ‘এমা বাবা, আবার এসব কেন?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আবার আমাকে আপনি এরকম বলছেন? আমার বাবা-মা থাকলে কি এরকম বলতো? এগুলো তো আমার কর্তব্য।’
রুমার মা বলল, ‘আমি সবাইকে বলি। আমার জামাইকে দেখে শেখা উচিত। এত ভালো একটা ছেলে।’
দিব্যেন্দু উঠে দাঁড়াল, ‘আপনারা টিভি দেখুন। আমি ও ঘরে…’
রুমার মা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘কিছু খাবে বাবা? করে দেব?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আপনার সেই ঝিঙে দিয়ে রুই মাছের ঝোলটা খেতে ইচ্ছে করছে মা। সময় পেলে একটু করে খাওয়াবেন?’
রুমার মা বলল, ‘নিশ্চয়ই। এ আবার কী কথা? আমি এখনই করে দিচ্ছি।’
দিব্যেন্দু ঘর থেকে বেরোতেই রুমার মা বলল, ‘দেখেছিস? এরকম ছেলে পাবি আজকালকার দিনে? তোর তাতেও মন ভরে না। আর কী করতে হবে ওকে? ঠিক আর কী করলে তোর মন পাওয়া যাবে বলতে পারিস?’
রুমার বাবা ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
রুমার মা বলল, ‘ও কিছু না। তুমি টিভি দেখো। এই, তুই রান্না ঘরে আয়।’
রুমার মা রুমাকে নিয়ে রান্নাঘরে গেল। বলল, ‘শোন, আমি তোকে ভালো করে বোঝাই। মেয়েরা হচ্ছে ঘরের লক্ষ্মী। পুরুষ মানুষ বাইরে থেকে কাজ করে আসে। তেতেপুড়ে কত কষ্ট করে রোজগার করে। ঘরে এসে সব সময় তাদের মাথা ঠান্ডা নাও থাকতে পারে। তার জন্য তুই যেভাবে জামাইয়ের নামে মিথ্যে কথা বলে যাচ্ছিস, সেটা কি ঠিক? এমন সোনার টুকরো ছেলে পাবি আজকালকার দিনে?’
রুমা মা’র দিকে তাকিয়ে রইল।
মা বলল, ‘দেরি করবি না। একটা বাচ্চা নিয়ে নে। দেখবি সব ঝামেলা ঠিক হয়ে যাবে। সব সংসারেই এরকম সমস্যা শুরুর দিকে হয়। একটা বাচ্চা এলে তখন দেখবি ধীরে ধীরে আর ঝামেলা হবে না। তুই হবার আগে তোর বাবা আমাকে কম মেরেছে? আমার এই হাতের কালো দাগটা দেখ। মেরে কালশিটে ফেলে দিয়েছিল। তাতে কি আমি ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেছিলাম? তোদের সহ্যশক্তি এত কম, উফ!’
রুমা ক্লান্ত গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। বুঝেছি। বার বার এক কথা বলতে হবে না।’
দিব্যেন্দুর গলা ভেসে এলো, ‘রুমা একবার শোনো।’
মা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘যা যা। জামাই ডেকেছে।’
রুমা ঘরে গেল।
দিব্যেন্দু দরজা বন্ধ করে রুমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এস, চেষ্টা করি। একটা ওষুধ খেয়েছি।’
রুমা দাঁড়িয়ে পড়ল।
দিব্যেন্দু রুমার শরীর খাবলাতে শুরু করল।
১২
পাশের বাড়িতে পিউদিকে পড়াতে আসত প্রত্যুষদা। সেভাবে দেখেনি কোনও দিন। ক্রিসমাসের মেলা বসেছিল বড় মাঠে। সেখানেই হঠাৎ করে দুজনে মুখোমুখি হয়ে গেছিল।
রুমা চোখ সরায়নি। কেমন যেন ভালো লেগে গিয়েছিল প্রত্যুষদাকে। সে কথা বলেছিল নিজে থেকেই, ‘আমি একা চলে এসেছি। বাড়িতে বলিনি।’
প্রত্যুষদা বলেছিল, ‘সে কী? তোমার বাড়ি থেকে চিন্তা করবে না?’
রুমা বলল, ‘সন্ধে সাতটার আগে ফিরলে করবে না।’
প্রত্যুষদা বলেছিল, ‘চল। আমি তোমাকে বাড়ি দিয়ে আসি।’
সেই শুরু। রাস্তা দিয়ে সে আগে যাচ্ছে। একটু দূরত্বে প্রত্যুষদা। কী অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
বাড়ি ফেরার পর রাতে অনেকক্ষণ জেগে ছিল।
পরের দিন প্রত্যুষদার সাইকেলটা দেখে গুটি গুটি পায়ে বাড়ির বাইরে গিয়ে বসেছিল। পড়িয়ে বেরনোর সময় প্রত্যুষদা একটু হাসল। রুমা সেটুকুতেই একবারে ক্লিন বোল্ড। ধীরে ধীরে সকলের অলক্ষ্যে একটু একটু করে জমাট বাঁধতে শুরু করল তাদের গল্পটা।
মেলা শেষের মাস খানেক পরে ওই মাঠেই দেখা করেছিল তারা। প্রত্যুষ জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। সেই প্রথম।
পাড়ার ভজা তাদের ফলো করেছিল। সেই মাকে নিয়ে এসেছিল…
.
দিব্যেন্দু মোবাইল ঘাঁটছে। রুমা চুপ করে শুয়ে আছে। দিব্যেন্দু আলো নিভিয়ে রুমাকে বলল, ‘মা-বাবা জানে তোমার কেসটা?’
রুমা উত্তর দিল না।
দিব্যেন্দু জোরে রুমার পিঠে চিমটি কাটল।
রুমা বলল, ‘না।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘বলা উচিত। বাড়ির মেয়ে বাইরে প্রেম করে বেড়িয়েছে, বাবা-মার জানা উচিত না?’
রুমা বলল, ‘তুমি জানো তো। তাহলেই হবে।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি জানি? কোথায় আর জানি? একদিন সামনা-সামনি কথা বলব। দেখব কেমন তোমার হিরো।’
রুমা চুপ করে রইল।
দিব্যেন্দু বলল, ‘কী কী করেছ? কতটা? যেরকম পানুতে দেখায়, সব?’
রুমা ক্লান্ত গলায় বলল, ‘তোমাকে বলেছি তো ওসব হয়নি।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘হলেও বলবে নাকি? তুমি খুব চালাক। হলেও বলবে না।’
রুমা বলল, ‘বলব না কেন? তুমি কম মেরেছ আমায়? মার না খাওয়ার জন্য হলেও কিছু করলে বলে দিতাম।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘তোমার গরম লাগছে না?’
রুমা বলল, ‘না।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমার লাগছে। কাপড়-চোপড় খুলে শোও।’
রুমা বলল, ‘তোমার লাগছে যখন তুমি খুলে শোও।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি বলছি তো। আমরা চেষ্টা করতে পারি। সবাই বলছে বাচ্চা হওয়া দরকার।’
রুমা বলল, ‘তুমি ডাক্তার দেখাও।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘তোমার ইচ্ছা করে খুব, তাই না? আমি যখন বাড়ি থাকি না, কার সঙ্গে ইচ্ছে মেটাও?’
রুমা বলল, ‘তুমি তো সিসিটিভি বসিয়েছ। কেন জিগ্যেস করছ? কেন বার বার একই কথা বলছ?’
দিব্যেন্দু উঠে বসল। রুমার পিঠে খুব জোরে একটা কিল মেরে বলল, ‘বেশ করেছি। আমি জানি তুই কী করে বেড়াস। বাড়ি থেকে কী করে এসেছিস, আমি ডেকে তুলব তোর বাপকে? গিয়ে বলব?’
রুমার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। সে উঠে বসে শ্বাস নিতে চেষ্টা করল। দিব্যেন্দু বলল, ‘নাটক শুরু করে দিয়েছিস? তোর জন্য কানের দুল আনলাম আর তুই নাটক করছিস এখন?’
রুমা কোনমতে বলল, ‘আমি কি আনতে বলেছিলাম তোমায়?’
দিব্যেন্দু হঠাৎ ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল। রুমা বুঝল বাজে কোনও কথা বলবে। দিবেন্দু তাইই বলল, ‘শোন না। তোর বাবা-মা ওই ঘরে কী করছে এখন?’
রুমা বলল, ‘জানি না।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি তো চাইলেই জানতে পারব। দেখবি?’
রুমার গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সে বলল, ‘কী করে?’
দিব্যেন্দু ফোন বের করে দেখাল। ফিসফিস করে বলল, ‘ওই ঘরে স্পাই ক্যামেরা আছে দেখ। এই দেখ তোর বাবার গায়ে তোর মা পা তুলে দিয়েছে।’
রুমার বমি পাচ্ছিল। শরীর জুড়ে প্রবল অস্বস্তি শুরু হল। চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো হতো হয়তো এখন…
১৩
গলিটার উল্টোদিকের চায়ের দোকানে চুপ করে বসে ছিল সুখেন। দুটো ছেলে কথা বলছে। সুখেন সেটাই শুনছে। একটা ছেলে বলল, ‘তুই ঠিক জানিস?’
অপরজন উত্তরে বলল, ‘হ্যাঁ। আমি ঠিক জানি। ওই পায়েলের সুগার ড্যাডি আছে। আমি ওকে গাড়ি থেকে নামাতে দেখেছি।’
বলে দুজনেই খিক খিক করে হাসল। প্রথমজন বলল, ‘ওই বুড়োটা পারে?’
‘পায়েলকে জিগ্যেস করব।’
কিছুক্ষণ হেসে দুজনেই চুপ করে গেল। চা শেষ করে প্রথমজন বলল, ‘এ ভাই। আজকের দিনটা ছেড়ে দে। এখানে শুনেছি গুন্ডা থাকে।’
দ্বিতীয়জন অভয় দিল, ‘আমি আছি তো। তুই আমার সঙ্গে থাকবি।’
সুখেন এবার ঘাড় ঘুরিয়ে দুজনের দিকে তাকাল। দুজনে তার ঘাড় ঘোরানো দেখে খানিকটা চমকাল।
সুখেন বলল, ‘বাজেট?’
দুজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। দ্বিতীয়জন বলল, ‘হাজার।’
সুখেন বলল, ‘আসুন।’
প্রথম জন ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘আজ থাক। আমি বাড়ি যাব।’
সুখেন বলল, ‘দেখুন, আমি থাকলে আপনাদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না। তাছাড়া গ্রাম থেকে নতুন প্রোডাক্ট এসেছে। খারাপ লাগবে না। চলুন।’
দ্বিতীয়জন প্রথমজনকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে। রাস্তা পার হয়ে সুখেন অভ্যস্ত ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে পাপিয়ার ঘরে গিয়ে নক করল।
দরজা খুলে গেল। পাপিয়া বেরিয়ে এসেছে। সুখেন ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যান। দরকার হলে আমার নাম্বার রেখে দিন। সমস্যা হলে ফোন করবেন।’
দ্বিতীয় ছেলেটা সুখেনের নাম্বার নিয়ে প্রথমজনকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। পাপিয়া ঘরের ভিতরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল, ‘ফুলি, দেখ তো।’
ফুলি এলে পাপিয়া সুখেনের দিকে ঘুরে বলল, ‘দুশো নিস না। দুশো বড় বেশি। এত কমিশন নিস তুই!’
সুখেন বলল, ‘চলে এই টাকায়? তুই বল।’
পাপিয়া ব্লাউজের ভেতর থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে সুখেনের হাতে দিয়ে বলল, ‘ভুল কিছু বলিসনি। ঠিকই। এই টাকায় চলে না।’
সুখেন বিড়ি ধরিয়ে বলল, ‘লকডাউনের পর থেকে ব্যবসা খুব মন্দা যাচ্ছে। লোকে নাকি কী সব পুতুল বের করেছে। সেসব দিয়েই কাজ হয়ে যাবে।’
পাপিয়া ফ্যাকাসে মুখে বলল, ‘আমিও শুনেছি। মোবাইলে দেখলাম। হ্যাঁরে, এর পরে আমাদের কী হবে রে?’
সুখেন বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয় বাসের তলায় মাথা দিয়ে দি। এভাবে দালালি করে চলে না। লটারি বেচবো ঠিক করলাম, ছেলেগুলো এমন তাড়া দিল, হল না। বাবা কত করে বলল পড়াশুনাটা ছাড়িস না। তখন শুনলাম না। এখন এই দশা।’
পাপিয়া বলল, ‘এসব বলা পাপ। বলিস না। তুই না থাকলে আমাদের কী হবে?’
সুখেন শ্বাস ছাড়ল। গলির বাইরে সাহেবের গাড়ি দাঁড়িয়েছে। পাপিয়া বলল, ‘কদিন ধরে সাহেব আসছে, লক্ষ্য করেছিস?’
সুখেন বলল, ‘হ্যাঁ। দেখেছি। নতুন মেয়ে আনবে শুনছিলাম তো।’
পাপিয়া গলা নামিয়ে বলল, ‘তেরো বছরের দুটো মেয়ে নিয়ে এসেছিল। কার থেকে এনেছিল কে জানে। সারাদিন কাঁদছে।’
সুখেন বলল, ‘গরীবের মেয়ে। বিক্রি করে দিয়েছে। সাহেবের আসার অন্য কারণ আছে। আমি শুনেছি, সাহেব নাকি বলেছে মাসোহারা বাড়াতে হবে। এত কম টাকায় তোদের সিকিউরিটি দেওয়া যাচ্ছে না।’
পাপিয়া হতাশ চোখে বলল, ‘আমিও শুনেছি সে কথা। সব কিছুর দাম বাড়ছে। আমাদেরই বাড়ছে না।’
একটা লোক গলিতে ঢুকল। সুখেন সচকিত হল, ‘দাঁড়া তো, এ লোকটা অনেক দিন পরে এসেছে। দেখি কী করে।’
পাপিয়া কিছু বলার আগেই সুখেন হাঁটতে শুরু করল। লোকটা ফোন করছে, সুখেন সেটাই শুনতে চেষ্টা করল। লোকটা বলছে, ‘হ্যাঁ, কাল সিসিটিভি লাগবে। লোক যাবে। আমি বলে দিয়েছি। তুমি সব ঘরে ক্যামেরা লাগানোর কথা বলে দেবে। হ্যাঁ, ও আমি বুঝে নেবো। টাকা পাঠিয়ে দেব। কী? জার্মানি থেকে টাকা পাঠানো সমস্যা? ও আমি বুঝব। টাকা পেয়ে যাবে। ঠিক আছে, রাখছি…না, দেশে ফেরার চান্স নেই এখন…ঠিক আছে। ঠিক আছে।’
লোকটা গলা নামিয়ে কথা বললেও সুখেন ঠিকই সব শুনতে পেল। কাকে আবার ঢপ মেরেছে মালটা, দেশের বাইরে থাকে নাকি! কী যা তা!
লোকটার পেছনে এসে ফিসফিস করে বলল সে, ‘স্যার, কলেজ গার্ল?’
লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ে রুমাল দিয়ে কপাল মুছে বলল, ‘একটা ঘর পাচ্ছি না। দালাল তো? শমিতার ঘরে নিয়ে চল তো। পাঁচশো দেব ঠিক ঘরে নিয়ে গেলে। আমার সঙ্গে চালাকি কোরো না, পুরোনো লোক, তুলে নিয়ে এমন গুঁতবো বাপের নাম ভুলে যাবে। চল দেখি।’
১৪
ঘরে ঘরে ক্যামেরা লাগছে। পূর্ণ তদারকি করছে।
বাপিদা ছেলে পাঠিয়েছে। টাকা দিয়ে দিয়েছে। তার কাজ দেখে নেওয়া।
কিন্তু কাজ পুরো হল না। মইয়ে চড়ে যে ছেলেটা ক্যামেরা লাগাচ্ছিল, আচমকা মই ভেঙে পড়ে গেল। মই যে ভাঙতে পারে, পূর্ণ ভাবতে পারেনি। কোনমতে ধরে তুলে পাড়ার লোক ডেকে ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল।
বাপিদাকে ফোনে জানাতে বাপিদা বলল, ‘কী করছিলে তুমি? দেখোনি?’
পূর্ণ বলল, ‘আমি কী করব? আমি তো কাজ দেখছিলাম। মই ভেঙে পড়ে যাবে, তুমি কখনও দেখেছ?’
বাপিদা বলল, ‘পাড়ার লোককেও বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়েছ?’
পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। কী করব? না ঢুকলে অত বড় চেহারার ছেলেটাকে কী করে নিয়ে আসতাম?’
বাপিদা বলল, ‘তাও ঠিক। তুমি বাড়ি যাও। আমি ছেলেটার কোম্পানিতে ফোন করে দিচ্ছি। ওরা সামলে নেবে।’
পূর্ণ বলল, ‘ঠিক আছে। তাই হবে।’
হাসপাতালে ছেলেটাকে রেখে আবার ফিরে এল পূর্ণ।
তার কপালেই এসব হয়। কত ছেলে এসি লাগাচ্ছে, কতজন ফ্যান লাগাচ্ছে, বড় বড় বিল্ডিংয়ে উঠে কতজন আবার রঙ করছে ঝুলে ঝুলে, তাদের কিছু হল না, এ বাড়িতেই এসব হতে হল। মানে অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়। একেই বলে কপাল।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল সে। বাপিদা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করবে। আবার কিছু না কিছু করে ক্যামেরা লাগবে। লেগে যাক বাবা। যদি এত করে ক্যামেরা লাগাতে চায়, তার কী যায় আসে। যার মাছ, সে যেদিক দিয়ে খুশি কাটুক।
আবার সেই নাম্বার থেকে ফোন আসছে। পূর্ণ ধরল, ‘আবার আপনি ফোন করেছেন?’
‘শুনুন না। আপনি সত্যি বলছেন আপনি এই সিমটা তুলেছেন?’
‘হ্যাঁ। মিথ্যা বলব কেন? আমি মিথ্যা বলি না। মিথ্যা বলার দরকার পড়ে না।’
‘আপনি একটু দোকানে জিগ্যেস করে দেখবেন কার সিম দিয়েছে?’
‘দোকানে? হ্যাঁ জিগ্যেস করেছিলাম তো।’
‘কী বলল?’
‘বলেছে অনেকে এরকম সিম রাখে। রিচারজ না করলে সে সিম আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানি সেই নাম্বার আরেকজনকে দিয়ে দেয়। আপনি যাকে খুঁজছেন, তিনি সেই নাম্বার আর রিচারজ করেননি বলেই আমার কাছে এসেছে এই সিমটা।’
‘ও। তাহলে কী হবে?’
‘কী হবে? আপনি কাকে চাইছিলেন বলুন। আমি যোগাযোগ করে দেখব?’
‘কুমুদপুরে। প্রত্যুষ হালদার। কিন্তু প্রত্যুষদা আর কুমুদপুরে থাকে না।’
‘কোথায় থাকে?’
‘আমাদের এলাকা থেকে ওকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
‘কেন? চোর-ডাকাত ছিল নাকি?’
‘না। তা ছিল না।’
‘তবে?’
‘আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।’
‘ও তাই বলুন। তাকেই আর পাচ্ছেন না, তাই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন খুঁজছেন তাকে?’
‘আমার বর আমাকে খুব মারে। আমার বাড়ির লোকও আমার বরের সঙ্গে আছে। আমি প্রত্যুষদাকে খুঁজছি। ওকে খুঁজে পেলে পালাবো। আমি আর পারছি না বিশ্বাস করুন। রোজ মারে আমাকে। অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে আছি।’
‘আপনি পুলিশকে জানান।’
‘কী হবে? পুলিশ আমার কী করবে? সেই তো একটা হোমে দেবে। আমি কী করব সেখানে? আমার বাবা-মা বেঁচে আছে। তারা আমার কথা বিশ্বাস করছে না। অন্য লোকে কেন করবে?’
‘দেখুন আমি বোকা সোকা মানুষ। তার উপর অন্য লোকের বাড়িতে থাকি। আমি কী করে বুঝব বলুন তো?’
‘আমি আর পারছি না।’
ওপাশ থেকে মেয়েটা কাঁদতে শুরু করল। পূর্ণ চুপ করে শুনল। তার খারাপ লাগছে। কিন্তু সে কী করবে? সে নিজেই তো অন্য লোকের ভরসায় থাকে। তার অত বুদ্ধিও নেই।
বাপিদা আবার ফোন করছে। সে ধরল, ‘বল।’
‘ফোন বিজি কেন তোমার? কার সঙ্গে কথা বলছিলে?’
‘আরে আর বল কেন? একটা মেয়েকে ওর বর খুব মারে। আমাকে ফোন করে নালিশ করছিল।’
দাঁত বের করল পূর্ণ।
বাপিদা বলল, ‘তাই? দাও তো আমাকে নাম্বারটা!’
