দিন প্রতিদিন – ১

‘জয় কালী ফ্লুটস।’

অফিস থেকে ফেরার সময় রোজই দোকানটা দেখে দিব্যেন্দু। দেখাই হয়। সাতজন্মে তাদের পরিবারে কেউ গান বাজনা করেনি। গানের ব্যাপার পরিবারে নেই। কেউ শোনেও না। তাই দোকানটা দেখাই হয়। এর বেশি কোনকালেই হয়নি। শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা।

প্রবল গরম পড়েছিল।

এখন মেঘ হচ্ছে। বৃষ্টিও হচ্ছে। অফিস ফেরতা বৃষ্টির চোটে জয় কালী ফ্লুটসেই আটকে গেল দিব্যেন্দু। গিটার, মাউথ অর্গান, হারমোনিয়াম, তবলা…কত জিনিস।

দিব্যেন্দু মরা চোখে দেখতে লাগল।

হঠাৎ একটা জিনিসের উপর তার চোখ আটকাল। বাঃ। ভালো তো। এটা কাজের।

‘কত দাদা?’

দাম বলল দোকানদার। দিব্যেন্দু দরদাম না করেই কিনে ফেলল।

.

.

বৃষ্টি নামতে দৌড়। শেয়ালদা অবধি দৌড়ে যেতে পারলে বাস ভাড়াটুকু বাঁচে।

বাসভাড়া X মাসের ওয়ার্কিং ডে = সেভিংস। খারাপ না।

ট্রেন শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে আছে। ঝড়ের মতো পাবলিক ছুটছে। ডানদিক থেকে বাঁদিক থেকে। সামনে থেকে পাঁচ নাম্বার বগি। তাদের গ্রুপের ওই একটাই কামরা।

দিব্যেন্দু ছুটল না। জানে সিট রেখে দেবে কামরুল।

কামরুলকে সবাই ভিমরুল বলে। কামরুল রাগে না। কিংবা রাগলেও দেখায় না। হাওয়া খারাপ হচ্ছে। রাগ দেখিয়ে লাভ নেই।

দিব্যেন্দু ঢুকতেই কামরুলের চোখ খুশিতে ভরে উঠল, ‘এসো এসো।’

দিব্যেন্দু বসল। উইন্ডো সিট। সিটে বসার আগে একটু দেখে নেয় দিব্যেন্দু। লোকজন খুব হারামি। একবার ফাঁকা সিট দেখে বসার পর দেখা গেল কেউ হেগে রেখে দিয়েছিল।

লোকজন ট্রেনে কী করে হাগে কে জানে। হাগার পর ছোঁচে কোথায়? কই, তার তো হাগা পায় না এতো। সেদিন গোটা রাস্তাটা কী করে ফিরেছিল সেই জানে।

তাস সাফল করছে তাপস। আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কালকের পেমেন্টটা পাইনি কিন্তু।’

দিব্যেন্দু ফোন বের করে বলল, ‘দিয়ে দিচ্ছি। ভাবখানা এমন করছ, যেন পালিয়ে যাব।’

তাপস খিকখিক করে ওর বিশ্রী হাসিটা হেসে বলল, ‘শালা বাঙাল, কাঁটাতার পেরিয়ে এসেছিস। কবে আবার ও পারে চলে যাবি।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘চোপ শালা, পোকা খোর।’

তাপস কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কামরুল অন্য কথা তুলল। অন্য কথা তোলার দায় কামরুলেরই থাকে। না তুললেই সব ঝামেলা শেষমেশ হিন্দু-মুসলমানেই চলে যাবে। কামরুল বলল, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ কীভাবে হারলো দেখলে?’

তাপস বলল, ‘নেদারল্যান্ডের কাছে তো? হবেই তো। যে দেশে মোল্লা নেই, সে দেশ উন্নতি করবেই।’

কামরুল দাঁত বের করল। এটা ছোট। গায়ে লাগছে না।

ট্রেন ছাড়ল। বিকাশ বলল, ‘আদা তিনশো টাকা কেজি। খাব কী রে ভাই? কার পেছনে গুঁজব?’

তাপস বলল, ‘আদা খাবি না। যেটার দাম বেশি, সেটা খাবি না।’

বিকাশ চুপ করে গেল। সে কথা কম বলে।

তাপস দিব্যেন্দুর দিকে তাকাল, ‘কীরে বাঙাল, তুই দেখলি আমি টেক্কা দিয়েছি, তারপর তুই ট্রাম্প করলি? এই শুঁটকি মাছের বুদ্ধি নিয়ে খেলতে আসিস?’

দিব্যেন্দু ফ্যাকাসে মেরে গেল। অন্যমনস্ক হয়ে ভুল করে ট্রাম্প করে দিয়েছে। তাপস এবার ছাড়বে না। দিব্যেন্দু গলা তুলল, ‘ঠিক আছে গেড়ি গুগলি। থাম। অনেক হয়েছে। বাড়ি গিয়ে মাংস রান্নার সময় আরও দু’থাবা চিনি দিয়ে দিস।’

তাপস বলল, ‘খেলতে পারিস না, খেলতে আসিস কেন?’

ও পাশ থেকে একটা বাচ্চা ড্যাবড্যাব চোখে তাদের দেখছে। দিব্যেন্দু সেটা দেখে চুপ করে গেল।

এক-একটা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াচ্ছে, আরও লোক উঠছে। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অফিসে মারাত্মক ঝামেলা হয়েছে আজ। চাকরিটা যাবে যাবে করছে। দিব্যেন্দুর কাঁধের কাছটা কেমন দপ দপ করছে। প্রেশার বেড়েছে। ওষুধ খেতে হবে।

তাপসের বক বক আর উল্লাসে গোটা রাস্তাটা কাটল।

তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।

স্টেশনে ট্রেন থামার পরে অপেক্ষা করল না দিব্যেন্দু। দৌড়ে সাইকেল স্ট্যান্ডে গিয়ে সাইকেল নিয়ে সাইকেলে উঠে পড়ল। দাঁড়ানো যাবে না। পায়খানা পেয়েছে।

প্রতিদিন ঠিক এই সময়টাই পায়খানা পায়। ট্রেন দাঁড়ালেই। ঠিক কোন টাইমটেবিলে এটা হয় জানা নেই।

মুখে মারিতং বীর তাপস ভেজা বেড়ালের মতো স্টেশনেই দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনে বাতেলায় অন্ধকার করে দেওয়া তাপস বাড়িতে খুব একটা কথা বলে না।

তাপসের বাড়িতে যেতে ভালো লাগে দিব্যেন্দুর। তখন কী ভদ্র!

তাপসের বউ বাঙাল। বাড়িতে পারে না। বাঙাল বউয়ের উপর সব ফ্রাস্ট্রেশন ট্রেনে ঝাড়ে।

বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক কষ্টে পায়খানা আটকে দিব্যেন্দু মফস্‌সলের রাস্তায় সাইকেল দৌড় করাচ্ছে।

.

রুমা জানলা দিয়ে দেখছিল দিব্যেন্দু আসছে। দৌড়ে দরজা খুলে দিল।

দিব্যেন্দু সাইকেল ফেলে জামা প্যান্ট খুলে গামছা নিয়ে বাথরুমে দৌড়ল।

দশ মিনিটে শান্তি নেমে এল।

দিব্যেন্দু এরপর স্নান করবে কুড়ি মিনিট ধরে। গান বর্জিত জীবন। একটাও গান বেরোবে না। কোনও হু হাও না।

আধঘণ্টা পর সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে লুঙ্গি পরল।

ফতুয়া পরে ব্যাগ থেকে জয় কালী ফ্লুটস থেকে কেনা জিনিসটা বের করে রুমাকে ডাকল, ‘এসো দেখি।’

রুমা ঘরে ঢুকল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘এসো। কাছে এসো।’

রুমা আরেকটু এগিয়ে এল।

দিব্যেন্দু অভ্যস্ত হাতে রুমার চুল ধরল, ‘এসেছিল আজ? তোর নাং?’

রুমা চুপ করে রইল। কথা বলল না।

দিব্যেন্দু হাতে নিল জিনিসটা। তবলার হাতুড়ি। ছোট অথচ কার্যকর।

মেঝেতে বসে রুমার বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুলে এক বাড়ি মারল। রুমা আর্তনাদ করে মেঝেয় বসে পড়ল।

রক্ত বেরোচ্ছে।

দিব্যেন্দু রুমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘আজকেই কিনলাম। এটা কাজে দেবে। যাও, মুড়ি গরম করে নিয়ে এসো।’

রুমা ফ্যালফ্যাল করে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে আছে।

তার ব্যাকগ্রাউন্ডে তাদের প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ছবিগুলো কোলাজ করা। রুমার এক ভাই করে দিয়েছিল…

‘যখন মারবে, তখন দেখবে যেন পোশাকের উপর দিয়ে মারে। তাতে লাগে কম।’

পলা বলল।

পায়ে ব্যান্ডেজ করতে হয়েছে। ইনজেকশন পড়েছে। ব্যথা হচ্ছে ভীষণ।

ওষুধের দোকানে জিগ্যেস করেছিল কী হয়েছে। রুমা বলেছে পায়ে হাতুড়ি পড়েছে। দোকানদার বিশ্বাস করছিল না।

এই দোকানেই পলার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল রুমার। পলার হাত ভেঙে দিয়েছিল ওর বর। এখন অনেকটাই ঠিক আছে। আজ পলার হাতে ইস্তিরি ঘষে দিয়েছে। কালো হয়ে ভয়াবহ দেখাচ্ছে।

রুমা বলল, ‘তোমাকে যখন ইস্তিরি দিল, তখন কি জামা পরেছিলে?’

পলা মাথা নাড়ল, ‘না। স্নান করে এসেছিলাম। কী মনে হয়েছিল, ছ্যাকা দিয়ে দিল।’

আজমত স্টোরের গেটের পাশ দিয়ে ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। রাত আটটা বেজে গেছে। বৃষ্টি প্রচুর হয়েছে। রাস্তা ভেজা।

দিব্যেন্দু যেমন রুমাকে সন্দেহ করে, পলার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সেটা না। পলার বাবার কাছে ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে পনেরো লাখ টাকা পণ চেয়েছিল। পলার বাপের বাড়ি তেরো লাখ জোগাড় করতে পেরেছিল। ওই দু’লাখের জন্যই মার খেতে হচ্ছে এখনও। ওর বরের ইচ্ছে হলেই পলাকে মারে।

রুমার পায়ে বেশ ব্যথা হচ্ছে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটছে।

পলা বলল, ‘সেই যে ছেলেটা, যাকে নিয়ে তোমাকে সন্দেহ করে, সে এখন কোথায় আছে?’

রুমা মাথা নাড়ল, ‘জানি না।’

পলা বলল, ‘আমার বাবাকে ফোন করেছিল। বলেছে এই সপ্তাহের মধ্যে টাকা না পেলে যেভাবে শুয়োর মারে, সেভাবে রড গরম করে আমার ওখানে…’

পলার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

রুমা তাদের বাড়ির সামনে পৌঁছতে দেখল পাড়ার কোন এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে দিব্যেন্দু গল্প করছে। পাড়ায় দিব্যেন্দুর ইমেজ অত্যন্ত ভদ্র সভ্য একজন মানুষের। রুমা ফিসফিস করে বলল, ‘আমি ঢুকলাম। সাবধানে যাও।’

পলা বলল, ‘ঠিক আছে।’

দিব্যেন্দু দেখল রুমা ঘরে ঢুকছে। সে কিছু বলল না। যার সঙ্গে দিব্যেন্দু কথা বলছিল, সেই ভদ্রলোক বললেন, ‘কী হয়েছে বউমা? খুঁড়িয়ে হাঁটছ যে?’

রুমা বলল, ‘ওই রান্না করতে গিয়ে…’

দাঁড়াল না সে। দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। বাইরে থাকলে রাতে দিব্যেন্দু এসে বলবে সে ওই লোকটার সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করছিল। রুমা যখন বলবে লোকটা তার বাবার বয়সি, তখন দিব্যেন্দু বলবে সুগার ড্যাডি বোঝো? বোঝো না? কোথায় কী ফুল ফুটিয়ে রাখছ আমি কী করে বুঝব? আমি তো বুঝতে পারব না।

রুমা ঘরে ঢুকে গেল। ফোনে প্রত্যুষের নাম্বার ডায়াল করল। ফোন এখনও অফ। রুমা হাল ছাড়ে না। রোজই একবার চেষ্টা করে।

দিব্যেন্দু হুট করে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।

রুমার হাতে ফোন দেখে বলল, ‘কী হল? কাকে ফোন করছিলে?’

রুমা বলল, ‘কাউকে না।’

দিব্যেন্দু স্থির চোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যথা হয়েছে পায়ে?’

রুমা ঘাড় নাড়ল। দিব্যেন্দু বসার ঘরে গিয়ে টিভি চালাল।

.

রুমা শ্বাস ছাড়ল। ফুলসজ্জার রাতে দিব্যেন্দু জিগ্যেস করেছিল, ‘প্রেম করেছ কোনও দিন?’

রুমা মাথা নেড়ে ‘না’ বলেছিল।

দিব্যেন্দু খাটে শুয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলেছিল, ‘আমার ছিল। কেটে গেছে। খুব ভালোবাসত। শোন, প্রেম টেম নিয়ে এত চাপ নেবে না। ওগুলো পাস্ট লাইফ। অত চাপের তো কিছু নেই।’

রুমা বলেছিল, ‘না, সত্যি নেই।’

দিব্যেন্দু স্থিরচোখে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আমাদের আগে বন্ধু হওয়া দরকার। তাই না?’

রুমা তাও বলেনি। রাত কেটে গেল। পরের দিন দিব্যেন্দু কেমন মায়াভরা চোখে তার সঙ্গে কথা বলল। ভালো ভালো চকলেট এনে দিল। তিন চার দিন কেটে গেল। রুমার মনে হল সে খুব বড় কোনও অন্যায় করছে। তার এভাবে লুকিয়ে রাখা ঠিক হচ্ছে না। রাতে ক্রিম মাখতে মাখতে বলেছিল, ‘একজন ছিল। কথা হত ফোনে। এটুকুই। আর কিছু না।’

দিব্যেন্দু খুশি গলায় বলল, ‘এই তো। সব বলা উচিত। ঠিক করেছ।’

রুমা একটু একটু করে বলতে শুরু করল।

হাসি হাসি মুখ করে সব কথা শুনছিল দিব্যেন্দু।

তারপর রাত বাড়তেই শুরু হল অকথ্য অত্যাচার…

‘আদা কত? পঁয়ত্রিশ টাকা শ? কী বল?’

বলভদ্র দামটা শুনে দাঁড়িয়ে গেলেন। মাথাটা কেমন বন বন করছে। জিনিসের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে সামলানো যাচ্ছে না আর। গিন্নি বলল আদা আনতে, তিনিও হ্যাঁ-হ্যাঁ করে বেরিয়ে এলেন। দোকানে একটু আদা আর কাঁচালঙ্কা নেওয়ার পর বলছে পঞ্চাশ টাকা। প্রথমে ঠাহর করতে পারছিলেন না, দামটা কোনটার বেড়েছে। আদা, না কাঁচালঙ্কার। এবার পরিষ্কার হল।

টাকা মিটিয়ে পোস্ত কেনার আগে একবার জোরে দম নিয়ে নিলেন। এটা করতে হয়। পোস্ত কিনতে গেলেও বুকে একটা ধাক্কা লাগে। তবে পোস্ত বরাবরই মহার্ঘ্য। ভোটের আগে জনগণের দাম যেমন বেড়ে যায় আদার মতো, পোস্তর ব্যাপারটা সেরকম নয়। পোস্ত সারাবছরই ঘ্যাম নিয়ে থাকে।

দিব্যেন্দুকে দোকানে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল বলভদ্রের। ভারি ভালো ছেলে। মিষ্টি ভাষী। সম্মান করে বড়দের। এরকম ছেলে দেখলে মন ভালো হবেই।

দিব্যেন্দু তাকে দেখে হাসল, ‘ভালো তো দাদা?’

বলভদ্র বললেন, ‘ভালো আর কী দেখলে হে? আদা সাড়ে তিনশো। ভাবো! এবার তো আদা পাদা লবনচাদা বলার আগেও টাকা দিতে হবে মনে হচ্ছে।’

কথাটা বলে একচোট হেসে নিলেন বলভদ্র। জমেছে জোকটা। লিখে রাখতে হবে। দিব্যেন্দু হাসল না। কেমন গুটিশুটি মেরে গেল।

বলভদ্র অপ্রস্তুত হলেন, ‘আহা, তুমি আবার খারাপ ভাবলে নাকি?’

দিব্যেন্দু লাজুক গলায় বলল, ‘না না দাদা। ঠিক আছে।’

জোকটা তার মতো লোকের হিসেবে অশ্লীল হয়ে গেছে বুঝে বলভদ্র মেক আপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন, ‘আজ তো ছুটি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ দাদা।’

বলভদ্র বললেন, ‘তো আজ চলে এসো আমাদের বাড়ি। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে যাও।’

দিব্যেন্দু অবাক হল, ‘আজ?’

বলভদ্র বললেন, ‘হ্যাঁ, চলে এসো। তোমার বউদি তো অনেক দিন ধরেই বলছিল। কী খাবে বল? খাসি না ইলিশ?’

দিব্যেন্দু আমতা আমতা করতে লাগল, ‘আজ? মানে দাদা, আজ…’

বলভদ্র দিব্যেন্দুর হাত চেপে ধরলেন, ‘ওসব কথা শুনবো না ভাই। আজকেই আসতে হবে। অনেক ডেট পিছিয়েছ। আর না।’

দিব্যেন্দু নিমরাজি হয়ে মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে দাদা। যাব।’

বলভদ্র খুশি হলেন, ‘ঠিক আছে। এসো তবে। আমি মাছ আর মাংস নিয়েনি।’

পোস্ত নিয়ে বলভদ্র হন্তদন্ত হয়ে মাছ বাজারের দিকে রওনা হয়ে গিন্নিকে ফোন করলেন, ‘হ্যাঁ, শোন, দিব্যেন্দুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে। দুপুরে বলে দিয়েছি।’

গিন্নি শান্ত গলায় বলল, ‘বাজার নেই কিছু নেই, এখন প্রায় দশটা বাজে।’

বলভদ্র বললেন, ‘ও যা করবে তাই খেয়ে নেবে। দিব্যেন্দু ভারি ভালো ছেলে।’

ফোন কেটে বলভদ্র চোখ বন্ধ করে হিসেব করে নিলেন। যা টাকা আছে হয়ে যাবার কথা।

ঠিক আছে। যা হবে দেখা যাবে। কিনে নেওয়া যাক।

সাড়ে দশটা নাগাদ বাজার হল।

স্কুটির সামনে ব্যাগ ঝুলিয়ে বলভদ্র রওনা দিলেন। বৃষ্টির মধ্যেই রোদ উঠে গেছে। তাতে প্রবল গরম লাগছে। স্কুটি চালালে যদিও হাওয়া লাগায় গরম কম লাগে।

বাড়ির সামনে এসে স্কুটি রেখে আগে তালা খুললেন তিনি। সাধারণত কোথাও গেলে বাড়ির দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে দিয়ে যান।

দরজা খুলে আবার স্কুটির থেকে ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে বললেন, ‘এই নাও। করে ফেলো।’

গিন্নি বললেন, ‘করছি।’

বলভদ্র বললেন, ‘গলার কাছটা কিছু একটা দাও। দিব্যেন্দুর বউয়ের সামনে আবার গল্প করতে বসে যেও না দাগটা আমার সিগারেটের ছ্যাকায় হয়েছে।’

গিন্নি ঘাড় নাড়লেন।

বলভদ্র সিগারেট ধরালেন। দিব্যেন্দুকে দিয়ে একটা পলিসি করাতেই হবে। নইলে এ মাসের টার্গেট ফুলফিল হবে না। জীবনে কত জ্বালা!

দিব্যেন্দু মিষ্টি নিয়ে এসেছে। বলভদ্র প্যাকেটটা নিয়ে বললেন, ‘আরে, আবার এসবের কী দরকার ছিল? এসো এসো।’

রুমাকে নিয়ে দিব্যেন্দু ড্রইংরুমে ঢুকল।

বলভদ্র বললেন, ‘বস।’

রুমা খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। বলভদ্র বললেন, ‘বউমার কী হয়েছে?’

রুমা সসংকোচে বলল, ‘চোট লেগেছে।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘খুব চিন্তায় আছি বুঝলেন দাদা, পা বেশ ফুলেছে। একজন ভালো ডাক্তার দেখাতে পারলে ভালো হত।’

বলভদ্রের স্ত্রী রুপালী ঘরে ঢুকেছিলেন। দিব্যেন্দুর কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার। দিব্যেন্দু কত খেয়াল রাখে স্ত্রীর।

বলভদ্র বললেন, ‘সরকারবাবুকে দেখিয়ে নাও। ভালো ডাক্তার। অনেক দিন ধরে প্র্যাকটিস করছেন।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আজকেই দেখাচ্ছি।’

রুমা চুপ করে বসে রইল।

বলভদ্র তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বউমাকে নিয়ে ঘরে যাও।’

রুপালী রুমাকে নিয়ে তাদের বেডরুমে গেলেন। রুপালী বললেন, ‘দিব্যেন্দু খুব খেয়াল রাখে তোমার?’

রুমা ঘাড় নাড়ল।

রুপালী গলা থেকে কাপড় সরালেন। রুমা সেটা দেখে বলল, ‘এটা সিগারেটের ছ্যাকা। তাই না?’

রুপালী বললেন, ‘ওই আর কী, লেগে গেছিল।’

রুমা বুকের কাপড় সরাল। ডান স্তনে গোল করে ছ্যাকার দাগ। রুপালী বড় বড় চোখ করে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। রুমা কাপড় ঠিক করে নিয়ে বসল। রুপালী বললেন, ‘দেখে তো মনে হয় না!’

রুমা বলল, ‘আপনার বরকে দেখেও মনে হয় না।’

রুপালী বললেন, ‘কিছু ভেবেছ?’

রুমা বলল, ‘একজন আছে। রোজ ফোন করি। একদিন ফোনে পাবো নিশ্চয়ই। সেদিনের অপেক্ষায় আছি।’

বলভদ্রের ডাক এল, ‘ভাত বেড়ে দাও। দুটো বাজতে চলল।’

রুপালী শশব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘চল। দেরি করলে অন্য সমস্যা হবে।’

দিব্যেন্দু আর বলভদ্র টেবিলে বসেছে। রুপালী খাবার দিতে শুরু করলেন। বলভদ্র বললেন, ‘তোমরা দুজনেই বসে যাও। আবার দাঁড়িয়ে আছ কেন?’

রুমা বসল। বলভদ্র বললেন, ‘দুই পরিবার মিলে কোথাও বেড়াতে যেতে হবে। কী বউমা, কোথায় যেতে ভালো লাগে তোমার? পাহাড় না সমুদ্র?’

রুমা থালায় আঁকিবুঁকি কাটছিল। বলভদ্রের প্রশ্ন শুনে বলল, ‘সমুদ্র।’

বলভদ্র বললেন, ‘বাঃ। খুব ভালো। বুঝলে দিব্যেন্দু, ছুটি ম্যানেজ কর। আমরা গোয়া ঘুরে আসব।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘সে তো অনেক খরচ দাদা।’

বলভদ্র বললেন, ‘আরে সে লোক আছে আমার। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ওসব নিয়ে ভেবো না। ডিসেম্বরেই ব্যবস্থা করছি। ওই সময়টা ওখানে কার্নিভাল হয়। পঁচিশে পৌঁছব, একবারে ইয়ার এন্ডিংটা কাটিয়ে ফেরা যাবে, কী বল?’

রুপালী ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘গোয়ায় শুনেছি পাবলিক প্লেসে স্মোক করলে খুব বড় অ্যামাউন্ট ফাইন করে। গোপাল ঠাকুরপোরা গেছিল, বলছিল।’

বলভদ্র বললেন, ‘সে দেখা যাবে। হোটেলের রুমের ভেতর কে কী করছে, কে কী খাচ্ছে, সেটা তো আর দেখতে আসবে না। ওই মেটে কারিটা দাও তো।’

রুপালী মেটে কারি এগিয়ে দিলেন। বলভদ্র বললেন, ‘আমার এই জিনিসটা দারুণ লাগে। আর ভালো লাগে মুরগির কচকচি। যেন ছেলেদের…’ রুমার দিকে তাকিয়ে জিভ কাটলেন বলভদ্র।

দিব্যেন্দু চুপ করে খেয়ে যাচ্ছিল। বলভদ্র দিব্যেন্দুকে বললেন, ‘মেটে কারিটা খাও ভাই, তোমার বউদি এটা খাসা রাঁধেন। খেয়ে বল।’

দিব্যেন্দু নিল।

খেতে আরও দশ মিনিট সময় লাগল। রুমাকে নিয়ে রুপালী ঘরে গেলেন। বলভদ্র সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘বুঝলে দিব্যেন্দু, একটা ইনসিউরেন্স এসেছে। ডেথ বেনিফিট প্রচুর টাকার। একবার দেখতে পারতে।’

দিব্যেন্দু বলভদ্রর কথা শেষ হবার আগেই বলল, ‘হ্যাঁ, শুনছিলাম আপনি সেদিন কাউকে একটা বোঝাচ্ছিলেন। আমি যদি আমার বউয়ের নামে করি? ও তো চাকরি করে না।’

বলভদ্র বললেন, ‘হ্যাঁ, করা যাবে। একটু কমপ্লিকেশন আছে। দেখেনি। করে নিও।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমার নামে তো পলিসি আছেই। ওর নামেও থাক।’

বলভদ্র খুশি মনে মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ। তুমি যে বউমার কথা এতো চিন্তা কর, সেটা খুবই ভালো।’

দিব্যেন্দু লাজুক হাসল।